Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৮

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৮

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৮
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎রাত আরও খানিকটা গাঢ় হয়েছে। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে। দিনের কোলাহল যেন ক্লান্ত হয়ে কোথাও গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে। হলুদাভ আলো পড়ে পথটাকে কেমন স্বপ্নময় করে তুলেছে। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। তারমধ্যে দিয়ে মাঝেমধ্যে দু-একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, তারপর আবার নেমে আসছে নিস্তব্ধতা।

‎তালুকদার বাড়ির সামনে কালো বাইক থামাল ইখতিয়ার। ইঞ্জিনের মৃদু শব্দটাও কিছুক্ষণ পর থেমে গেল। মুগ্ধা তড়িৎ নেমে এল।
‎আজ সারাটা পথই সে খুব কম কথা বলেছে। বরং বলা যায়, কোনো কথাই বলেনি। রেস্টুরেন্টে ইখতিয়ারের কথাটার পর থেকেই যেন সে নিজের ভেতর কোথাও হারিয়ে গেছে। বাস্তব-কল্পনা গুলিয়ে ফেলছে মুগ্ধা। গেটের সামনে এসে দাঁড়াল সে। ইখতিয়ারও গাড়ি থেকে নামল।
‎তারপর দুজনেই চুপ।
‎এক অদ্ভুত নীরবতা এসে দাঁড়াল তাদের মাঝখানে।
‎যে নীরবতায় হাজারটা কথা থাকে, অথচ উচ্চারিত হয় না একটাও। মুগ্ধা ব্যাগের ফিতা আঙুলে পেঁচাতে লাগল।
‎ইখতিয়ার তাকিয়ে আছে তার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে।মুগ্ধা সেটা ঠিক টের পাচ্ছে। তবু চোখ তুলছে না।
‎মনে হচ্ছে, চোখ তুললেই হয়তো নিজের মনটাকেও সামলাতে পারবে না। হারিয়ে ফেলবে নিজের সত্তাকে। কিন্তু আর কতক্ষন?
‎মুগ্ধা কিছুক্ষণ পর সৌজন্যবশত বলল,
‎” ভেতরে আসেন।”

‎কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবে বলার চেষ্টা করল সে।
‎কিন্তু নিজের কাছেই কেমন অচেনা শোনাল।
‎ইখতিয়ার কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
‎ইখতিয়ারের প্রতিক্রিয়া না পেয়ে মুগ্ধা চোখ তুলল।
‎দুজনের চোখে চোখ পড়ল। মুহূর্তটা খুব ছোট ছিল।
‎কিন্তু সেই ছোট্ট মুহূর্তের ভেতর যেন অনেকগুলো ঋতু পেরিয়ে গেল। মুগ্ধা থমকে গেল।
‎ ইখতিয়ারের চোখে আজ অন্য কিছু আছে।
‎সেটা রাগ কিংবা অভিমান নয়। কেমন যেন এক ধরনের আকুলতা। যেন বহুদিনের পথহারা কোনো মানুষ হঠাৎ করে নিজের বাড়ির আলো দেখতে পেয়েছে। ইখতিয়ার চোখে চোখ রেখে ধীরে বলল,
‎”সত্যিই যাব?”

‎মুগ্ধা চুপ। তার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। উত্তর দিতে পারল না কোন। কেন পারল না?সে নিজেও জানে না। হয়তো চাইছিল মানুষটা যাক। আবার হয়তো চাইছিল না।
‎দুয়ের মাঝামাঝি কোথাও আটকে গেল সে।
‎মুগ্ধার নীরবতা দেখে ইখতিয়ার হালকা হাসল।
‎সেই পরিচিত হাসি। যেটা আজকাল তার মুখে একটু বেশিই দেখা যায়। তবে আজকের টা যেন তাচ্ছিল্য ঠেকল। তারপর হেলমেটটা হাতে তুলে নিল। মাথায় পরল। বাইক স্টার্ট দিল।
‎ইঞ্জিন গর্জে উঠল রাতের নীরবতার বুকে।
‎একবার শুধু তাকাল মুগ্ধার দিকে। আস্তে করে বলল,
‎”আমি যাচ্ছি, তুমি যাও, সবাবধানে থাকবা”
‎তারপর চলে গেল। রাস্তার বাঁক পেরিয়ে।
‎বাইকের পেছনের আলোটা ছোট হতে হতে একসময় অদৃশ্য হয়ে গেল। মুগ্ধা এখনও দাঁড়িয়ে।
‎স্থির,অচল। যেন কেউ সময়কে কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিয়েছে।
‎হাওয়া এসে চুল উড়িয়ে দিল।মুগ্ধা তাকিয়ে রইল সেই ফাঁকা রাস্তার দিকে।
‎তারপর খুব আস্তে, নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল,
‎” এইটা যদি আগে করতেন…”
‎কথাটা শেষ হলো না। হয়তো বাকিটা সে নিজেও জানে না। কিংবা হয়তো জানে। শুধু বলতে চায় না।

‎ওদিকে ইখতিয়ার যখন বাড়ি ফিরল রাত তখন আরও খানিকটা গভীর। শেখ বাড়িটা আলোয় ঝলমল করছে। ড্রয়িংরুমে এখনও দু-একজন বসে আছে। কারও হাতে চায়ের কাপ। কারও হাতে মোবাইল। ইখতিয়ার ভেতরে ঢুকতেই সবার দৃষ্টি তার দিকে ঘুরে গেল। ইশতিয়াক সোফায় আধশোয়া হয়ে বসেছিল। ভাইকে দেখে ভ্রু নাচাল। বলল,
‎”আজ এত সময় লাগল যে?”
‎ইখতিয়ার তাকালো না। জুতা খুলতে খুলতে বলল,
‎” কাজ ছিল।”
‎” অনেক কাজ ছিল মনে হয়।”
‎ইশতিয়াকের মুখে দুষ্টু হাসি। ইখতিয়ার ভ্রু তুলল। ওভাবে বলল,
‎” তোর সমস্যা?”
‎”না না আমার কোনো সমস্যা নাই। শুধু জিজ্ঞেস করছিলাম আর কি”
‎ইখতিয়ার কথা বাড়াল না। চুপচাপ উপরে যেতে থাকে। পাশ থেকে রাফেয়া বলল,
‎”মুগ্ধা আম্মু কেমন আছে?”
‎মুগ্ধার নাম শুনতেই ইখতিয়ারের বুকে কেমন করে উঠলো। তবে পা থামল না। মুখও খুব একটা বদলাল না। শুধু বলল,

‎”ভালো।”
‎”ফোনে কথা হইছে?”
‎ইন্তিয়া জিজ্ঞেস করলেন। মায়ের মন তো। কিছু তো সন্দেহ করেছে কিছু। তবে ইখতিয়ার এবারো অল্প জবাব দিলো।
‎” হুম।”
‎” বাড়ির সবাই ভালো?”
‎” ভালো।”
‎ বেশি নয়। কয়েকটা শব্দ মাত্র। কেউ বুঝতেই পারল না, কয়েক মিনিট আগেও সে মুগ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। মুগ্ধাকে নামিয়ে দিয়েই এসেছে।
‎কথাগুলো সে এমন স্বাভাবিকভাবে বলল, যেন ব্যাপারটা খুব সাধারণ। যেন এর ভেতরে কোনো গোপন আনন্দ নেই।কোনো নরম অনুভূতি নেই।
‎কিন্তু ইশতিয়াকের চোখ দুটো কেমন সন্দেহভরে চিকচিক করে উঠল।সে কিছু বলল না।
‎শুধু মুচকি হাসল।

‎ইখতিয়ার সেটা দেখেও না দেখার ভান করল।
‎তারপর সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
‎ঘরের দরজা খুলতেই নিস্তব্ধতা তাকে স্বাগত জানাল। একটা ঠান্ডা, শূন্য নিস্তব্ধতা। যেন দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত কোনো বাড়ি। যেখানে মানুষের পদচারণা থেমে গেছে। কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনও দেয়ালে দেয়ালে ঝুলে আছে। বাতাসে স্মৃতির গন্ধ আছে যেন। ইখতিয়ার দরজা বন্ধ করল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে তাকাল।
‎বিছানা,আলমারি,ড্রেসিং টেবিল,জানালা সবকিছু আগের মতোই আছে। তবু কিছু যেন নেই,খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু। মুগ্ধা। মনে হলো ঘরটা নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। মুগ্ধা চলে যাওয়ার পর থেকে ঘরটার ভেতর থেকে প্রাণটাই যেন উঠে গেছে।

‎ইখতিয়ার ধীরে গিয়ে মুগ্ধার ব্যবহৃত ক্লিপ হাতে তুলে নিল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। অতঃপর চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা টের পেল। বিচ্ছেদের ব্যথা । এই দূরত্বটুকু তাকে প্রতিদিন নতুন করে পোড়াচ্ছে।
‎মনে হচ্ছে, নিজের ঘরেই সে অতিথি হয়ে গেছে। তার অস্তিত্ব যেন বিলুপ্ত।

‎ঠিক সেই সময়ে তালুকদার বাড়ির একটা অন্ধকার ঘরে জেগে আছে মুগ্ধা। রাত অনেক হয়েছে।
‎খাওয়াদাওয়া শেষ। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
‎চারপাশে গভীর নীরবতা। শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে বিছানার এক কোণে।
‎মুগ্ধা বিছানায় বসে আছে। কোলের ওপর ফোন।
‎চোখ স্থির স্ক্রিনে। অনেকক্ষণ ধরে,একই জায়গায়,
‎একই ছবিতে। আজ বিকেলে তোলা ছবি।ইখতিয়ারের। রেস্টুরেন্টে বসা অবস্থায়। হয়তো কোনো কথা ভাবছিল। অন্যমনস্ক ছিল ইখতিয়ার।
‎ ক্ষনে ক্ষনে ঠোঁটের কোণে হাঁসি ভাসছিল তার
‎একটা আওয়াজ ছাড়াই হাসি। খুব স্বাভাবিক।
‎খুব অচেতন। সেই মুহূর্তটাই লুকিয়ে ক্যামেরাবন্দি করেছিল মুগ্ধা। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটল।
‎আবার মিলিয়েও গেল।
‎আঙুলের ডগা দিয়ে ছবিটার উপর আলতো ছোঁয়া দিল সে। যেন মানুষটাকে ছুঁতে পারছে।
‎তারপর নিজের ওপরই বিরক্ত হলো। ফোনটা নামিয়ে রাখল। আবার তুলে নিল।
‎আবার ছবিটার দিকে তাকাল।
‎অদ্ভুত মানুষের এই হৃদয় বস্তুটা। যার উপর রাগ হয়, তাকেই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
‎যাকে ভুলে থাকতে চায়, তাকেই সবচেয়ে বেশি খোঁজে। জানালার বাইরে চাঁদটা তখন আকাশে একা ভাসছে। ঠিক মুগ্ধা আর ইখতিয়ারের মতো।

‎সকালটা বরাবরের মতো শান্ত।
‎কলেজ ক্যাম্পাসে এখনও পুরোপুরি ভিড় জমেনি। বিস্তীর্ণ মাঠের ওপর শিশিরের শেষ চিহ্নগুলো রোদের স্পর্শে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটা দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মতো, তার পাতার ফাঁক গলে সূর্যের আলো এসে পড়ছে পথের উপর। কোথাও দু-একজন ছাত্রছাত্রী হাঁটছে, কেউ বেঞ্চে বসে ফোন দেখছে, আবার কেউ ক্লাস শুরুর আগেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে ফেলেছে।
‎এই নিরিবিলি সময়েই কলেজে এসে হাজির হয়েছে ইশতিয়াক।
‎আজ সে স্বাভাবিকের চেয়েও আগে এসেছে।
‎গাড়ি পার্ক করে দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে করিডোর ধরে। মুখে হালকা একটা হাসি লেগে আছে। মানুষ যখন ভেতরে ভেতরে ভালো থাকে, তখন সেই ভালো লাগাটা অজান্তেই মুখে ফুটে ওঠে। ইশতিয়াকের অবস্থাও তেমন।
‎ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত একটা গলা ভেসে এলো।

‎” ওস্তাদ!”
‎ইশতিয়াক ঘুরে তাকাতেই দেখল মাশরুফ দ্রুত এগিয়ে আসছে। চোখেমুখে চিরচেনা দুষ্টুমি।
‎কাছে এসে কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলল,
‎” কি ব্যাপার? আজ সূর্য পশ্চিম দিক থেইকা উঠছে নাকি?”
‎ইশতিয়াক ভ্রু তুলল। চোখ ছোট করে বলল,
‎” কেন?”
‎” তুই কলেজে আগে আইছিস। এইটা তো বিরল ঘটনা।”
‎” ভালো ছাত্ররা আগে আসে।”
‎ইশতিয়াক কলার তুলে বলল। মাশরুম মাশ তাড়ানোর মতো হাত নাচালো। হেসে ফেলল ইশতিয়াক। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
‎মাশরুফ কিছুক্ষণ ইশতিয়াকের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
‎” মুখে এই হাসি ক্যান?”
‎”কোন হাসি?”
‎ইশতিয়াক ভ্রু কুচকালো।
‎” প্রেমে পড়া মানুষের হাসি।”
‎মাশরুফের ঠোঁটে দুষ্টামি। ইশতিয়াক মুখ খোল করে বলল,
‎”প্রেম আর আমি? নারী জাতিকেই বুঝলাম না এখনো”
‎”এত কি কঠিন কাজ?”
‎ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকে তাকায় থাকল। মাশরুফ আবার বলল,
‎”আমি আমার নারীকে চিনি”
‎ইশতিয়াক মুচকি হাসলো। সুর টেনে বলল,

‎”তাইই?”
‎ছেলেটা কলার তুলল। বলল,
‎”ইয়েস , আই নো হার পার্ফেক্টলি”
‎ইশতিয়াক আর পারল না। হেসে কুটিকুটি হলো যেন। চোখেমুখে কৌতুকের ছড়াছড়ি। ওভাবেই বলল,
‎”নারী চরিত্র বেজায় জটিল ভাই, এনাদের বোঝা এত সহজ না,যতই বোঝ ততই কম,যখন পুরোপুরি বুঝবা তখন আর তুমি পুরুষ থাকবা না , তুমি মহাপুরুষ হয়ে যাবা ”
‎”তা ঠিক”
‎ইশতিয়াক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল,
‎”এইসব নারী চিনলে কইত্তে?”
‎” অভিজ্ঞতা।”
‎”কয়দিনের?”
‎” দুই মাস।”
‎কথাটা বলেই নিজেই হো হো করে হেসে উঠল।
‎ইশতিয়াকও আর হাসি চেপে রাখতে পারল না।
‎সকালের শান্ত ক্যাম্পাসে তাদের হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। দূরে রোদের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
‎মাশরুফ আবার বলল,
‎” তবে একটা কথা সত্যি।”
‎”কি?”

‎”মেয়েরা রাগ করলে মনে হয় পৃথিবী শেষ। কিন্তু সেই রাগ ভাঙলে মনে হয় নতুন পৃথিবী শুরু হইছে।”
‎ইশতিয়াকের চোখের সামনে অজান্তেই ভেসে উঠল স্নিগ্ধার মুখ। সেই চাপা হাসি। সেই অভিমানী গলা।
‎তার ঠোঁটের কোণে আবারও হাসি ফুটে উঠল।
‎মাশরুফ সেটা দেখে ভ্রু নাচাল।
‎”দেখছ? আবার হাসতেছিছ।”
‎” চুপ কর।”
‎”না, আমি গবেষণা করতেছি।”
‎” কোন গবেষণা?”
‎”প্রেমে পড়া মানুষের আচরণবিজ্ঞান।”
‎দুজন আবার হেসে উঠল।

‎সকালের রোদ তখন ক্যাম্পাসজুড়ে সোনালি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে লাল ফুল ফুটে আছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে, গাছটা যেন বসন্তের রঙিন আগুন গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে হালকা উষ্ণতা, তবে তার মাঝেও একধরনের সতেজতা আছে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে কলেজ চত্বরের সেই পরিচিত ব্যস্ততা ধীরে ধীরে জমে উঠছে।
‎মুগ্ধা কৃষ্ণচূড়ার নিচে দাঁড়িয়ে। সাদা গাউনের উপর রোদের আলো এসে পড়েছে। খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। ইশতিয়াক একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোন হাতে ছবি তুলছে।
‎মুখে বিরক্তি। অন্তত সে সেটাই দেখানোর চেষ্টা করছে।
‎”এইদিকে তাকা ভাই। এইটা কি মুখ বানাইছিস?
‎মানুষ ছবি তুলতে আইসা প্রতিবন্দীর মতো দাঁড়ায়?”
‎মুগ্ধা ভ্রু তুলল।

‎”আগে ভাই না বলে ভাবি বলতে শেখ, আইছে আমারে প্রতিবন্ধী বলতে, তুই আর তোর ভাই দুইটা প্রতিবন্ধী”
‎”তোর বররে তুই যা খুশি বল,আমারে কিছু বলবি না বলে দিলাম”
‎”শুধু তুই কেন? তোর বউ সহ শ্বশুরবাড়ির লোককে বলব”
‎ইশতিয়াক উত্তর দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো।
‎” এক্সকিউজ মি… আমি কি ভুল জায়গায় চলে আসছি, নাকি কলেজে আজকে কোনো সিনেমার শুটিং হচ্ছে?”
‎মুগ্ধা ঘুরে তাকাল। তারপর মুখে বিস্ময়ের হাসি ফুটে উঠল।
‎”আরিয়ান ভাইয়া! এদিকে যে?”
‎লম্বা গড়নের ছেলেটা এগিয়ে আসছে। সাদা শার্ট।
‎হাতার বোতাম খোলা। মুখে সহজাত আত্মবিশ্বাসী হাসি। কলেজের সাবেক সিনিয়রদের মধ্যে সে বেশ জনপ্রিয় । কথা বলতে জানে, মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে জানে, আর প্রশংসা করতে জানে তারও চেয়ে বেশি। কাছে এসে সে মাথা নাড়ল।

‎” কেমন আছো?”
‎”ভালো। আপনি?”
‎”এখন পর্যন্ত ভালোই ছিলাম।”
‎মুগ্ধা অবাক হয়ে তাকাল।
‎”এখন পর্যন্ত মানে?”
‎আরিয়ান নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‎” এখন একটা সমস্যায় পড়ে গেছি।”
‎” কি সমস্যা?”
‎” এত সুন্দর কাউরে দেখে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা কঠিন।”
‎মুগ্ধা হেসে ফেলল।
‎” আপনি এখনও আগের মতোই ফ্লার্টিং করছেন?”
‎” এইটা প্রশংসা না অভিযোগ?”
‎”দুইটাই।”
‎” আমি প্রশংসা হিসেবেই নিলাম।”
‎পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইশতিয়াক মুখ বাঁকাল। খুব আস্তে বলল,
‎”আরিয়ান না, এইটার নাম নির্লজ্জ।”
‎মুগ্ধা শুনে ফেলল। চোখ রাঙিয়ে তাকাল।

‎আরিয়ান মুগ্ধার দিকে তাকাল।
‎একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বলল,
‎” সত্যি বলতে কি, সাদা রঙটা তোমার জন্যই বানানো মনে হয়।”
‎মুগ্ধা বিব্রত হয়ে হেসে ফেলল।
‎ইশতিয়াক এবার কেশে উঠল। যেন কাঁশতে কাঁশতে তার জীবন বেরিয়ে যাচ্ছে । আরিয়ান হাসল। মুগ্ধাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
‎” হাসলে তোমারে অনেক বেশি সুন্দর লাগে।”
‎মুগ্ধার হাসিটা একটু থেমে গেল।
‎তারপর আবার সৌজন্যমূলক হাসি দিল।
‎” ধন্যবাদ।”
‎আরিয়ান মাথা নাড়ল।
‎” ওয়েলকাম।”
‎পাশেই দাঁড়িয়ে ইশতিয়াক আকাশের দিকে তাকাল। তারপর বিড়বিড় করল,
‎” আল্লাহ, এই মানুষটার প্রশংসার স্টক শেষ হয় না ক্যান?”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৭

‎ঠিক তখনই…
‎তাদের অজান্তে দূরে, পুরোনো একাডেমিক ভবনের ছায়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা একটা দীর্ঘদেহী অবয়ব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এদিকেই।
‎কেউ তাকে দেখল না। কেউ খেয়াল করল না। অথচ আগন্তুক মানুষের দুচোখে যেন বিষের ন্যায় কিছু বিঁধছে। জ্বলছে তার। আচ্ছা!
‎” বিষে বিষ ক্ষয় হয়, তাই বলেই কি বিষে ভরা জীবন? নাকি বিষই ভালোবাসে তোমায় বিষই তোমার আপন!”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here