Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৫

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৫

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৫
রিদিতা চৌধুরী

​রিকশাটি চোখের আড়ালে মিলিয়ে যেতেই সৌহার্দ্যের রগচটা মেজাজের পারদ যেন মুহূর্তেই হিমাঙ্কের নিচে নেমে এল। হ্যান্ডেলে রাখা তার শক্ত মুষ্টিবদ্ধ হাতজোড়া থরথর করে কাঁপছে, আঙুলের গিঁটগুলো সাদাটে হয়ে গিয়েছিল রাগের তীব্রতায়। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সে বাইকটা সজোরে আছাড় মারল কংক্রিটের মেঝেতে। ধাতব দেহটার আর্তনাদ গ্যারেজের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো, কিন্তু সৌহার্দ্যের তাতে বিকার নেই। চোখ বন্ধ করে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল সে, ভেতরে জ্বলতে থাকা দাবানলটা নিভিয়ে ফেলার এক ব্যর্থ চেষ্টা। এরপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হনহন করে হেঁটে গিয়ে নিজের গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বের করে স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে সাথে ঝড়ের বেগে সে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
​পুরো ঘটনাটি এতক্ষণ এক কোণে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল বাড়ির বৃদ্ধ দারোয়ান। তার চোখে-মুখে তখনো ভয়ের রেশ। সৌহার্দ্যের গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই সে নিঃশব্দে এগিয়ে এল পড়ে থাকা বাইকটির দিকে। বাইকটির ডান পাশের আয়নাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, বডিতেও লেগেছে গভীর ক্ষত। দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সৌহার্দ্যর রাগের আগ্নেয়গিরি হয়ে ওঠা দেখে মনে মনে ভাবল, “আহা, ছোট স্যারটা কেন যে এমন বারুদের বস্তা হয়ে থাকে! মানুষটা কি সুন্দর, কিন্তু রাগের মাথায় নিজের এত দামী বাইকটার কী দশাটাই না করল!”

​লোকটা আলতো করে ভাঙা কাঁচের ওপর হাত বুলিয়ে সে খুব সাবধানে, বাইকটিকে টেনেহিঁচড়ে গ্যারেজের এক কোণে সরিয়ে রাখল।
ক্লাস শেষ করে ক্যান্টিনের এক কোণে জটলা পাকিয়ে বসেছে রিদি, সুমি আর সায়েম। রিদি ওদের কাছে কাল রাতের আরবান আর পৃথার সব কথা খুলে বলছে। পৃথার এমন কষ্টের কাহিনী শুনে ওরা যেমন ব্যথিত হলো, তেমনি আরবানের কাছে সে ভালো থাকবে—এই ভেবে কিছুটা স্বস্তিও পেল। কিন্তু সুমি হঠাৎ চিন্তিত কণ্ঠে বলে উঠল, “আমার ভাই ভয় হচ্ছে না জানি, আবার সৌহার্দ্য স্যারের মত ঘ্যাড়তেড়া হয়, তারই তো ভাই!”
​সুমিদের কথায় সায়েম তার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “আরে ভাই চাপ নিসনা, ওই খাটাশ একপিস আসে দুনিয়াতে ওনার মত হবে না, নিশ্চিত!”

​সায়েম আর সুমির কথার মাঝে রিদি একদম চুপ। ইদানীং সৌহার্দ্যের আচরণ ওর কাছে বড় রহস্যময় ঠেকছে। মুখে যত নাটক আর কঠোরতার মুখোশই থাকুক, ভেতরে ভেতরে লোকটা যে তার প্রতি একটু হলেও দুর্বল, রিদির অবচেতন মন বারবার সে কথাই বলছে। যদিও এটা কেবলই ওর ধারণা, তবুও ওই লোকটার মতিগতির কোনো নিশ্চয়তা নেই। রিদি আড়চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে ভাবল, “অসভ্য লোকের মুডটা বুনো বিড়ালের মতো, কখন শান্ত থাকবে আর কখন থাবা বসাবে কেউ জানে না।”
ওরা যখন ক্যান্টিন থেকে কথা বলতে বলতে কলেজ গেটের দিকে এগিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই তুলিকার বিষাক্ত কণ্ঠস্বর ওদের পথ আগলে দাঁড়াল। রিদির দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গমাখা এক কুটিল হাসি হেসে সে বলে উঠল, “বাহ্! তোমার ওপর তো দেখছি প্রফেসরের ভীষণ মায়া। একেবারে নিজের কেবিনে নিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে! আজও দেখলাম ক্লাসে তোমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়া বোঝাচ্ছে। কী দিয়ে বশ করলে বলো তো?”

​সুমি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল, রিদি তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরার কারণে। সে শান্ত পায়ে তুলিকার দিকে এক পা এগিয়ে গেল। রিদির চোখের ভেতর তখন এক অদ্ভুত তেজ, সে খুব শান্ত অথচ ধারালো স্বরে বলল, “আমার প্রেমের মধু দিয়ে বশ করেছি গো! শুধু শরীর ঘেঁষে না, প্রয়োজনে একদম প্রফেসরের কোলে উঠে বসে থাকব, তোমার তাতে কী প্রবলেম আছে?”
​তুলিকা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চিৎকার করে উঠল, “তোমাদের মতো মেয়েরা আর কী পারবে? নিজের শরীর বিলিয়ে দিয়েই তো সুবিধা ভোগ করো!”
​তুলিকার মুখ থেকে এমন অশালীন মন্তব্যের বিষ যখন বেরোল, রিদির শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা যেন রাগে টগবগ করে ফুটতে লাগল। সে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বলল, “ভদ্রভাবে কথা বলো। ক্লাসমেট হিসেবে আজ তোমার অনেক বাজে কথা হজম করেছি, কিন্তু আর একটা বাজে শব্দ যদি মুখ থেকে বেরোয়…”
​রিদির কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তুলিকা আঙ্গুল উঁচিয়ে আস্ফালন শুরু করল, “এই মেয়ে, কার সামনে তেজ দেখাচ্ছো? জানো, আমার বাবা চাইলে তোমাকে এক দিনের মধ্যে কলেজ থেকে বের…”
​তুলিকার কথাটি মাঝপথেই যেন হিম হয়ে গেল। পেছন থেকে ভেসে এল এক গুমোট, গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর, যা পুরো চত্বরকে স্তব্ধ করে দিল— “আপনার বাবা চাইলে কী? আমাকেও বলুন, মিস হোয়াট-এভার?”

​ওরা চমকে পেছনে ফিরতে দেখল,প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে স্থির দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছেন সৌহার্দ্য। তার চাহনি রিদির ওপর নিবদ্ধ থাকলেও প্রশ্নটা সে করেছে তুলিকাকে। এই মুহূর্তে সৌহার্দ্যের উপস্থিতি কল্পনাও করেনি তুলিকা, তার গায়ের রক্ত যেন ভয়ে হিম হয়ে গেল।
​সৌহার্দ্য হঠাৎই অগ্নিঝলসানো কণ্ঠে গর্জে উঠলেন, “স্পিক আপ!”
​তার সেই বজ্রকঠিন আওয়াজে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীরা তো বটেই, এমনকি রিদি আর সুমিও ভয়ে কেঁপে উঠল। তুলিকা আমতা-আমতা করে তোতলানো স্বরে বলল, “স্যার, এ… এই মেয়ে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করছে, তাই…”
​সৌহার্দ্য ওর দিকে ফিরেও তাকালেন না। সে রিদির দিকে এক পা এগিয়ে এলো, তারপর তুলিকার দিকে স্থির জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এক মুহূর্ত পরেই ধমকে উঠে বলল, “সে সরি টু হার!”
​সৌহার্দ্যের চোখের ওই অশুভ সংকেত দেখে তুলিকা ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। মাথা নিচু করে কোনোমতে বলল, “সরি।”

​কিন্তু সৌহার্দ্য যেন বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে উঠলো। পরক্ষনে শীতল কণ্ঠে বলল, “উহু, পছন্দ হয়নি!”
​তুলিকা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সরি আবার পছন্দমতো বলতে হয় নাকি? তার সেই দ্বিধার মাঝেই সৌহার্দ্য গমগমে স্বরে নির্দেশের স্বর ভোসে এলো, “কানে ধরে বলবে, ‘সরি, আমাকে মাফ করে দাও, তুমি নেক্সট টাইম প্রফেসরের কোলে চড়ে বসে থাকলেও আমি তাকাব না।’ দেন শুরু করো, হারি আপ!”
সৌহার্দ্যের রসিকতায় সায়েম খিলখিল করে হেসে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সৌহার্দ্যের সেই গভীর, শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে তার হাসি যেন মাঝপথেই থমকে গেল। অন্যদিকে তুলিকা রাগে গজগজ করতে করতে, অনেকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও কান ধরে সৌহার্দ্যের শিখিয়ে দেওয়া সেই অদ্ভুত কথাগুলো আওড়ালো। কিন্তু সৌহার্দ্যের যেন মন ভরল না! অদ্ভুত এক জেদ চেপে বসল তার মাথায়; মেয়েটিকে দিয়ে একই কথা কয়েকবার বলিয়ে তবেই সে ক্ষান্ত হলো।
​দৃশ্যটা এমন যেন কোনো এক রোবটের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। এরপর সৌহার্দ্য এক পলক নিজের হাতঘড়িতে তাকিয়ে ধীর স্থিরভাবে রিদির দিকে ফিরল। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি একাই যেতে পারবে, নাকি আমি দিয়ে আসব?”

​রিদি দ্বিধা কাটিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, সে পারবে। সৌহার্দ্য তখন হাসপাতালের কয়েকটা ইমার্জেন্সি রোগী ছিলো।তাই সে ড্রাইভারকে ফোন করে আসতে বলল। বিষয়টি দেখে রিদি খুব নিচু গলায়, মিনমিনয়ে বলল, “আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, আমি রিকশাতেই চলে যেতে পারব।”
​রিদির কণ্ঠস্বর কানে যেতেই সৌহার্দ্য যেন ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। তার মেজাজের পারদ এক নিমেষে চড়ে বসল। খুব কড়া গলায় সে নির্দেশ দিয়ে বলল, “তোমার জন্য আজ থেকে রিকশা নিষিদ্ধ!”
​সৌহার্দ্যের এই হঠকারী সিদ্ধান্তে রিদি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝতে পারছে না মানুষটাকে কী বলে সম্বোধন করবে! পরিস্থিতিটা এমন যে, বাংলা সিনেমার নায়িকার মতো কোনো গাছে গিয়ে সজোরে মাথা ঠুকে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেললেই যেন এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মেলে। কী এক অদ্ভুত মানুষের পাল্লায় যে সে পড়ল!

​রিদির সেই হতভম্ব অবস্থার মাঝেই ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে হাজির হলো। সৌহার্দ্য আর দেরি না করে রিদিকে গাড়িতে তুলে ড্রাইভারের সাবধানে নিয়ে যেতে বলে সে হাসপাতালে দিকে পা বাড়ল!
বিকেল গড়িয়ে চারটা বেজে গেছে। কলেজ থেকে ফিরে ক্লান্ত রিদি না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল পেটের ভেতর চিনচিনে খিদের জ্বালায়। ড্রয়িংরুম দিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ একজোড়া বলিষ্ঠ হাত তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। আকস্মিক ধাক্কায় রিদির বুকের ভেতর ধক করে উঠল। ভয়ার্ত চোখে উপরে তাকাতেই দেখল, সৌহার্দ্য ওর দিকে কেমন অদ্ভুত এক ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
​রিদি দ্রুত চোখ নামিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “ছাড়ুন… অসভ্য লোক!”
​সৌহার্দ্য নড়ল না, বরং আরও এক ইঞ্চি এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর এখন আরও গম্ভীর, “কী যেন বলছিলেন তখন ম্যাডাম?”

​রিদি তোতলাতে তোতলাতে বলল, “ক—কখন?”
​সৌহার্দ্যের শরীরী নৈকট্যে রিদির নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাদের মাঝে এখন আর এক ইঞ্চিরও ব্যবধান নেই। লজ্জা আর আড়ষ্টতায় রিদির মুখ দিয়ে কথা সরছে না। সে কোনোমতে মাথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে মিনমিনিয়ে বলল, “প্লিজ… ছাড়ুন। কেউ দেখে ফেলবে।”
​রিদি তার দুহাতে সৌহার্দ্যকে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সে যেন এক অটল পাহাড়। এক চুলও নড়ল না সে। সৌহার্দ্যের কণ্ঠস্বর এখন নেশাতুর, “আসুক! আগে বলো, সকালে কী বলেছিলে?”
​রিদি কাঁপা গলায় বলল, “আ—আপনাকে বলিনি আমি…”
​সৌহার্দ্যের নজর হঠাৎ আটকে গেল রিদির থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর। রিদিকে ভয় দেখানোর জন্য এই নাটক শুরু করলেও, এখন সে নিজেই যেন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। আবেগের অতল গহ্বরে ডুবে গিয়ে সে যখন রিদির ঠোঁটের কাছাকাছি এগিয়ে এল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক ঝটকায় সব ছন্দপতন ঘটল।

​কারো গলা খাঁকারির শব্দে সৌহার্দ্য তড়িৎ বেগে সরে দাঁড়াল। সামনে আরহানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সৌহার্দ্যের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। আরহান তাদের দিকে তাকিয়ে টিপ্পনী কেটে বলল, “বউকে মানতে পারিস না, বলেই বাড়ির এত সুন্দর রুম ফেলে চিপা-চাপায় প্রেম করতে হয়?”
​আরহানের কথা শুনে রিদির মনে হলো, মেঝেটা যদি এই মুহূর্তে দুই ভাগ হয়ে যেত, সে এর ভেতরেই ঢুকে যেত। এই অসভ্য লোকটার জন্য বারবার তাকেই সবার সামনে লজ্জায় পড়তে হয়।
​সৌহার্দ্য বিরক্ত মুখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আশ্চর্য! বাজে বকছিস কেন? ওর চোখে কী যেন একটা পড়ছিল, সেটাই চেক করছিলাম।”
​আরহান ছোট ভাইকে আর বিব্রত করল না। হাসতে হাসতে চলে যাওয়ার সময় বলল, “ওকে, কন্টিনিউ!”
​আরহান চলে যেতেই রিদি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে বলল, “নির্লজ্জ, বেহায়া, অসভ্য লোক!”

​সৌহার্দ্য আগের মতোই বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “স্টক থেকে নতুন কোনো শব্দ আনার চেষ্টা করো, স্টুপিড!” বলেই টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা তুলে নিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
​সৌহার্দ্যের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রিদি বিরবির করে বলল, “বউ মানি না-মানি না বলে আবার প্রেম দেখাতে এলে এমন জায়গায় উষ্ঠা দেব না যে সারা জীবন মনে রাখবে, অসভ্য লোক কোথাকার!” বলেই সৌহার্দ্যর যাওয়ার পথে তাকিয়ে ভেংচি কেটে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালো!
রাত তখন প্রায় আটটা। রিদি আর পৃথা পড়ার টেবিলে মগ্ন, এমন সময় হঠাৎই ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল রিভা। দুজনকে টেনে উঠিয়ে সে মিষ্টি করে হেসে বলল, “ভাবিরা, চলো চলো! তোমাদের জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে!”
​রিদি ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিসের সারপ্রাইজ? কী হয়েছে?”
​রিভা রহস্যময় হাসি দিয়ে উত্তর দিল, “আগে চলোই না, গেলেই বুঝবে!” বলেই সে দুজনকে টেনে ড্রয়িংরুমের দিকে নিয়ে গেল।

সোফায় বসে আছে বছর বিশ-বাইশ বয়সী এক যুবক। চেহারায় রায়েদা শেখের সাথে বেশ মিল। রিভা উত্তেজিত হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, দেখো কারা এসেছে!”
​রিভান রিদিকে চিনতে পারল—মায়ের ফোনের গ্যালারিতে রিদির ছবিতে ভরা, এমনকি তাদের দুই ভাইবোনের ছবির চেয়েও রিদির ছবি সেখানে বেশি! রিদিও তাকে দেখে হেসে এগিয়ে গেয়ে, কুশল বিনিময় করল। এরপর পৃথার সাথেও পরিচয় করিয়ে দিল রিভানকে। রিদি আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে সোজা রান্নাঘরের দিকে ছুটল কিছু নাস্তা তৈরি করতে। সাথীর থেকে জানতে পারল, ফাহানের বিয়েতে যোগ দিতেই এসেছে রিভান। সবাই মিলে একসাথে এই বাড়ি থেকে বিয়ে বাড়ি যাবে তারা, আর রায়েদা শেখও আজ সকালেই এখানে এসেছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রিভানের প্রাণবন্ত ও ছটপটে স্বভাবের কারণে রিদি আর পৃথার সাথে তার বেশ ভালো জমে উঠল।

​পৃথা বসে আছে রিদির ঘরে, সে এখন বাড়ির পরিবেশের সাথে মোটামুটি মানিয়ে নিলেও রিমা চৌধুরীর তিক্ত ব্যবহার তাকে বড্ড পোড়াচ্ছে। সুযোগ পেলেই তিনি যা-তা কথা শুনিয়ে যান, আর পৃথা শুধু কষ্টগুলোকে বুকের ভেতর চেপে রেখে এক চিলতে হাসি দিয়ে তা মেনে নিচ্ছে।
​রিভানের সাথে আড্ডা শেষ করে কিছুক্ষন আগেই এসেছে সে একটা বই নিয়ে একা বসে আছে। চোখের সামনে বইয়ের অক্ষরগুলো থাকলেও মন পড়ে আছে বিষণ্ণতায়। পড়াগুলো যেন মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। মনের কোণে বারংবার একটিই প্রশ্ন—আরবান কি সত্যিই তাকে কোনোদিন স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে? এত বড় ধনাঢ্য পরিবারের সাথে কি সে মানানসই?

​এমনই হাজারো দোলাচলের মাঝে হঠাৎ দরজায় কার উপস্থিতি টের পেল সে। আরবান গলা খাঁকারি দিয়ে তার মনোযোগ আকর্ষণ করল। আরবানকে দেখেই পৃথা বইটা রেখে উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু আরবান শান্ত গলায় বলল, ” প্রায়েজন নেই বস তুমি,তোমার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে?”
​পৃথা কথা খুঁজে না পেয়ে নিস্তব্ধ রইল, শুধু মাথা নাড়িয়ে না-সূচক উত্তর দিল। আরবান হাতের কিছু কাপড়ের প্যাকেট টেবিলের ওপর রেখে সহজ স্বরে বলল, “আজ রাতটা এখানেই থাকো। আমার নাইট ডিউটি আছে, হয়তো একা ভয় পেতে পারো। তবে কাল থেকে আমার রুমেই শিফট হয়ে যেও। আর কিছু প্রয়োজন হলে নির্দ্বিধায় আমাকে জানিও, ঠিক আছে?”
​আরবানের এমন সহজ-সরল ব্যবহারে পৃথা বিস্ময়ে স্থবির হয়ে রইল। যে মানুষটাকে নিয়ে সে এত ভয় পাচ্ছিল, সেই মানুষটাই কত সহজে সবকিছু স্বাভাবিক করে দিচ্ছে! কোনো উত্তর না দিয়ে পৃথা কেবল সম্মতির মাথা নাড়ল।
​আরবান রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে একবার ফিরে তাকাল। মৃদু স্বরে বলল, “এত নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই। বিয়েটা যে পরিস্থিতিতেই হোক, তুমি আমার স্ত্রী—এই সত্যটা মেনে নেওয়াটাই এখন শ্রেয়।”

​কথাটুকু বলেই সে বেরিয়ে গেল। আরবান চলে যেতেই পৃথার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক চিলতে মিষ্টি হাসি। সে কল্পনাও করেনি আরবান এত তাড়াতাড়ি বিষয়টি সহজভাবে গ্রহণ করবে। নিস্তব্ধ ঘরে এক অদ্ভুত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে পৃথা অনুভব করল, জীবনের নতুন সমীকরণগুলো হয়তো ধীরে ধীরে গুছিয়ে আসছে।
রাত তখন প্রায় বারোটা। ড্রয়িংরুমের নীলচে আলোয় রিভা, পৃথা, রিদি আর রিভান টিভিতে খেলা দেখছে। ঘরজুড়ে আড্ডা আর হাসির রোল। রিদি সোফায় বসে, তার পাশেই রিভান। কোনো এক মজার কথায় রিভান হেসে রিদির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলছে, আর রিদিও খিলখিল করে হেসে তার সাথে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে।

​ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল সৌহার্দ্য। নিজের স্ত্রীর প্রাণখোলা হাসির শব্দটা তার কানে যেতেই সে থমকে দাঁড়ালো। দৃষ্টি ঘুরিয়ে রিদি আর রিভানের দিকে তাকাতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল; চোখেমুখে এক হিমশীতল কঠিন চাহনি।
হঠাৎ ​সৌহার্দ্যর দিকে চোখ পড়তে রিভান হালকা হেসে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ভাইকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল, “ব্রো! কেমন আছো? তোমাকে খুব মিস করছিলাম!”
​সৌহার্দ্য তাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে শান্ত, অথচ গম্ভীর গলায় বলল, “চল, তোর সাথে কথা আছে।” বলেই সে সোজা সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
​রিভান ভাবল, হয়তো লন্ডনের বিজনেস নিয়ে কোনো জরুরি কথা হবে, যেটা এখন রিভানের ওপর ন্যস্ত। সে কোনো প্রশ্ন না করেই ভাইয়ের পিছু নিল। কিন্তু সৌহার্দ্য যখন রুমের দিকে না গিয়ে ছাদের দিকে এগোতে দেখে, রিভানের কপালে ভাঁজ পড়ল।
বিজনেস নিয়ে আলোচনা কি ছাদে করার মতো বিষয়? তবুও বড় ভাইকে ভয় পাওয়া রিভান কোনো দ্বিরুক্তি না করে তার পিছু পিছু ছাদে উঠে গেল।

​ছাদে পৌঁছাতেই সৌহার্দ্য ঘুরে দাঁড়িয়ে গমগমে কণ্ঠে বলল, “শুরু কর।”
​বেচারা রিভান কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কী শুরু করবে?
ভাইয়ের স্বভাব সে জানে, সবসময় অর্ধেক কথা বলে। সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, “মানে? কোন ব্যাপারে ব্রো?”
​সৌহার্দ্যের গলার স্বর এবার রাগে কাঁপছে, “এতক্ষণ আমার বউয়ের সাথে যেভাবে হেসে-খেলে কথা বলছিলি, এখন আমার সাথে সেই একই উৎসাহে কথা বল। গো অ্যাহেড!”
​রিভান যেন আকাশ থেকে পড়ল। কী অদ্ভুত বিপদে যে সে পড়েছে! ফারিস তাকে আগে থেকেই সাবধান করেছিল, কিন্তু পরিস্থিতি যে এত ভয়াবহ হবে, তা সে বুঝতে পারলে কখনোই এই বাড়িতে পা রাখত না। সৌহার্দ্যের রাগী চোখের দিকে তাকিয়ে সে হাসার আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু এমন গম্ভীর পরিস্থিতিতে কি জোর করে হাসি আসে? সে শুকনো ঢোক গিলে মিনতিভরা গলায় বলল, “সরি ব্রো, সত্যি বলছি! এরপর থেকে আর রি… মানে ভাবির সাথে ওইভাবে কথা বলব না। প্লিজ, এবারকার মতো মাফ করে দাও!”
​রিভানের সেই করুণ আর্তনাদ দেখে সৌহার্দ্যের মনে কোনো দয়া হলো কি না, তা বোঝার উপায় নেই। সে কোনো কথা না বলেই ছাদের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। রিভান হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, ভাবল হয়তো ভাই দয়া করে তাকে মুক্তি দিল। কিন্তু পরক্ষণেই এক বিকট শব্দে ছাদের ভারী দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল!

​রিভান হতভম্ব হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই বুঝল, সৌহার্দ্য বাইরে থেকে ছাদের দরজা আটকে দিয়ে চলে গেছে!সে হতাশ হয়ে ছাদের ফ্লোরেই দপ করে শুয়ে পড়ল। দরজার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলল, “খালামণি, এই অদ্ভুত টাইপ প্রোডাক্ট তুমি কীভাবে ডাউনলোড করলে? এমন অদ্ভুত ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে আজ তো আমার এখানেই রাত কাটাতে হবে!”​দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিভান চোখ বুজল!
রিদি গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে করিডোর দিয়ে নিজের রুমের দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়ল সৌহার্দ্য। এমন হুট করে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিদি কোমরে দুহাত রেখে, বিরক্তি ভরা চোখে তাকাল। কিছুটা ঝংকার দিয়ে বলল, “কি চাই আপনার? যখন তখন এমন ইভটিজারদের মত পথ আগলে দাঁড়ান কেন অসভ্য ডাক্তার?”
​বউয়ের মুখ থেকে ‘ইভটিজার’ তকমাটা শুনে সৌহার্দ্য যেন আকাশ থেকে পড়ল। ৩১+ বছরে এসে কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে না তাকানো মানুষটা আজ নিজের বউয়ের কাছে ইভটিজার এর তকমা পেতে হলো কি কপাল! হতভম্ব সৌহার্দ্য খুক খুক করে কেশে উঠল। পরিস্থিতি সামলে নিয়ে সে একটু সরে দাঁড়িয়ে বলল, “আজ ক্লাসের যেগুলো বুঝিয়েছি সব টপিক বুঝছো?”

​রিদি কোনো কূটকৌশল না ভেবেই সরল মনে উত্তর দিল, “বুঝছি কিন্তু একটাতে একটু সমস্যা হচ্ছে!”
​সৌহার্দ্য এবার অতি ভদ্রতার সাথে শান্ত গলায় বলল, “ওকে কাল তো বিয়েতে চলে যাবে, পড়া হবেনা বই নিয়ে রুমে এসো বুঝিয়ে দিচ্ছি?” বলেই সে রুমের দিকে সে গেল!
রিদি বইটা বুকে আগলে সৌহার্দ্যের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছে। ভেতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না—এই নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। লোকটার মাথা যে কোনো সময় বিগড়ে যেতে পারে, কখন যে আবার খেঁকিয়ে উঠবে, তার ঠিক নেই। তার এই উঁকিঝুঁকির মাঝেই হুট করে সৌহার্দ্য দরজা খুলে রিদির মাথাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে দরজাটা লক করে ফেলল।
রিদি হকচকিয়ে গিয়ে বুকের ওপর হাত চেপে ধরল। জোরে শ্বাস ফেলে বিরক্তির সুরে বলল, “উফ ভয় পাইয়ে দেন কেন অসভ্য ডাক্তার!”

সৌহার্দ্য কোনো উত্তর দিল না। গম্ভীর মুখে বিছানায় শুয়ে পড়ে রিদির দিকে তাকিয়ে গমগমে স্বরে বলল, “সেন্টার টেবিলের উপরে উঠে কান দরে দাড়িয়ে থাকো দুই ঘন্টা কাম ডাউন স্টার্ট নাউ!”
​রিদি যেন পাথর হয়ে গেল। এই লোক তাকে পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে ডেকে এনেছে, আর এখন কিনা বলছে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে! এমন হঠকারী নির্দেশের কারণ না বুঝে রিদি রাগে নাক ফুলতে শুরু করল। সে তেজী গলায় বলল, “কি জন্য আমি কান ধরবো? মিথ্যেবাদী লোক! পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার নাম করে…”
​কথাটা শেষ করতে পারল না। সৌহার্দ্য দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “আমার সাথে তর্ক ছাড়া কি কথা বের হয় না? অন্য কারো সাথে কথা বলার সময় তো ঘর কাঁপিয়ে হাসো?”
রিদি এবার স্তব্ধ হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল—এই লোকটা কি পাগল? সে এখন প্রাণখুলে হাসতেও পারবে না? রিদির চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে সৌহার্দ্য ধমক দিয়ে উঠল, “কি হলো, কথা কানে যাচ্ছে না? স্টুপিড!”
​রিদি এক পলক দরজার দিকে তাকাল। ভাবল, এক দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু সৌহার্দ্য যেন তার মনের গলি-ঘুঁজি আগে থেকেই চিনে ফেলেছে। চোখ বন্ধ রেখেই সে শান্ত গলায় বলল, “ওদিকে তাকিয়ে লাভ নেই। ডোর লক করা।”

​রিদি বুঝল, আজ সে পুরোপুরি ফাঁদে পড়েছে। রাগ, অভিমান আর চরম অস্বস্তি নিয়ে সে টেবিলের ওপর গিয়ে উঠল। বাধ্য হয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে রইল ঠিকই, কিন্তু মুখটা ঘুরিয়ে নিল উল্টো দিকে। তার সর্বাঙ্গে তখন রাগ আর লজ্জার এক মিশ্র অনুভূতি।
​সৌহার্দ্য আড়চোখে একবার তাকাল। বুঝতে পারল, তার বউ এখন রাগে দাউদাউ করে জ্বলছে। তবুও ভ্রূক্ষেপ না করে সে নিজের মোবাইলটা বের করল। রিদিকে আরও একটু জ্বালানোর উদ্দেশ্যেই ‘আশিক বানায়া আপনে’ গানটা ছেড়ে দিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে পায়ের ওপর পা তুলে চোখ বুজে শুয়ে রইল।
রিদির রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে লোকটার মাথায় টেবিলের ওপর রাখা বইটা দিয়ে একটা বাড়ি দেয়! কত বড় অসভ্য, এই অবস্থায় ফেলে রেখে কিনা আবার এমন বিচ্ছিরি একটা গান বাজাচ্ছে? টানা এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে রিদির পা ব্যথায় টনটন করে উঠছে, মনে হচ্ছে এখনই ভেঙে পড়ে যাবে। আর সহ্য করতে না পেরে, চোখে জল নিয়ে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে কাতর কণ্ঠে অনুরোধ করল, “এই বারের মত ছেড়ে দিন প্লিজ, জীবন থাকতে আপনাকে আর বিশ্বাস— না মানে হেসে কেঁদে কোনো রকমে কারো সাথে কথা বলব না, ডাক্তার সাহেব!”

​’ডাক্তার সাহেব’ ডাকটা কানে যেতেই সৌহার্দ্যের দৃষ্টিতে এক মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে চমকে তাকালো ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই মুখটাকে পাথরের মতো ভাবলেশহীন করে ফেলল। খানিকটা সময় নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ওকে, ছেড়ে দেবো। আরও এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিট বাকি আছে। ওই হিসেবে তুমি আমাকে ৬৫ বার “আই লাভ ইউর” অর্থ বলবে, ? পারবে?”
​রিদি কথাটার গূঢ় অর্থটা না বুঝে ব্যাথার ছোটে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে বলে উঠল, “আশ্চর্য! এত বড় ডাক্তার হয়ে এই কথার অর্থ জানেন না? আমাকে কেন বলতে হবে?”
​সৌহার্দ্য বিরক্তির একটা ভঙ্গি করে বালিশে মাথা রাখল। উদাসীন স্বরে বলল, “ওকে, তুমি ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইলে থাকো, আই হ্যাভ নো প্রবলেম। শাস্তিটা কমিয়ে দিতে চেয়েছিলাম বলেই সহজ একটা টাস্ক দিয়েছিলাম। যেহেতু তোমার পছন্দ হলো না, থাক। আমি ঘুমালাম, তুমি ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকো।”
​সৌহার্দ্য পাশ ফিরে শুয়ে পড়ার উপক্রম করতেই রিদি বুঝল, পায়ের ব্যথায় আর এক মিনিটও টেকা অসম্ভব। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত বলে উঠল, “বলছি! বলছি! আপনি গণনা শুরু করুন!”

​সৌহার্দ্য ধীর স্থির ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকাল। গলার স্বরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি রেখে বলল, “ওকে, স্টার্ট নাও।”
​রিদি রাগ আর অভিমানে ঠোঁট উল্টে, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়া অবস্থায় গুনে গুনে পুরো ৬৫ বার বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
​ওর বলা শেষ হতেই সৌহার্দ্য স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিস্পৃহ স্বরে, বলল, “আই ডোন্ট লাভ ইউ। নাও ফিনিশ, গেট আউট!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৪

​কথাটা কানে যাওয়ার সাথে সাথে রিদি ঝটকা খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাগে তখন তার শরীর কাঁপছে। সে চিৎকার করে বলতে গেল, “অসভ্য লোক! আমি কখন আপনাকে ভা…”
​কথাটা শেষ করার আগেই রিদি মাঝপথে থেমে গেল। তার মনের কোণে একটা বিদ্যুচ্চমকের মতো উপলব্ধি হলো— তার মানে এই লোক তাকে এতক্ষন বোকা বানিয়ে, ভাবতে রিদি হতভম্ব হয়ে সৌহার্দ্যর দিকে তাকিয়ে রইল…..

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here