Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ১৮

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৮

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৮
সুহাসিনি ফাতেহা

কি! তুই ফারাজ স্যারকে চুুমু দিয়ে লিপিস্টিক লাগিয়ে দিয়েছিস ? আমি তো ভাবছি তুই লিপিস্টিক সব চেটেপুটে খেয়ে ফেলছিস!
লজ্জায় তিতলির মুখখানা লাল নীল হয়ে গেলো। এমন কিছু হয়ে যাবে আসলে সেও ভাবেনি। এখন ওই লোকের সামনে সে কিভাবে যাবে? যেমন ভয় পাচ্ছে তেমন লজ্জা মাখা মুখ নিয়ে বলল,
আমি ইচ্ছে করি দি নাই বিশ্বাস কর! ফাইল নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে যাচ্ছিলাম আর ওই ভাল্লুক কোথায় থেকে সামনে এসে পড়লো
স্মৃতি পাশ থেকে হতাশ ভঙ্গিতে বলল,

তুই সবসময় শুধু ফারাজ স্যারের সাথে ধাক্কা খেয়ে অঘটন করিস! স্যারের থেকে পালিয়ে আসলি কিভাবে তোকে থাপ্পড় দেয় নি কয়টা?
তিতলি হেসে হেসে বলল,
কোন দয়ালু লোকের খুব দয়া হয়েছিলো আমার উপর। তখন ভাল্লুকের কাছে কল দেয়। আর আমি সুযোগ বুঝে পালিয়ে এসেছি!”
নিধি তিতলির পিঠে সামান্য থাপ্পড় দিয়ে বলল,
এবার তো মনে হচ্ছে তোর বুদ্ধিসুদ্ধি হইতেছে বেস্টু! ফারাজ স্যারের চোখ ফাঁকি দিয়ে আসতে পারলি তুইতো স্যারের থেকেও জিনিয়াস বেইবি! ”
জিনিয়াস না হলে কি উনার মন পাবো…”
তিতলির কথার ভেতরেই বাসের ভেতরে ফুল ভলিউমে গান বেজে উঠলো।
❝হুলা হুলা…হুলা হুলা তু হ্যায় মেরি ফ্যান্টাসি❞
গানের আওয়াজে ওদের কথার সেখানেই ইতি ঘটে। বাসের সব মেয়েরা গানের সাথে তাল মিলিয়ে গায়তে থাকে….

দীর্ঘ একঘন্টা পর অবশেষে বাস এসে থামলো নন্দন পার্কের উঁচু রাস্তার সামনে। ডাইভার নেমে দরজা খুলে দিতেই এক এক করে সব স্টুডেন্ট বের হলো। মেয়েদের বাস পেছনে ছিলো। তাই ছেলেরা ও টিচাররা আগে এসে গেছে। তিতলি নেমে সব অবাক চোখে দেখতে থাকে। নন্দন পার্কের বিশাল লোহার গেইটটা চোখের সামনে পড়তেই তিতলির মনে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করলো। গেইটার মাথায় বড় বড় অক্ষরে লেখা, “NANDAN PARK – WWELCOME”
সব স্টুডেন্টদের ভীড়ে হাটার জায়গা টুকু পাওয়া যাচ্ছে না। নিধি তিতলির হাত ধরে রেখেছে। ভীড়ের মাঝে আবার যেন হারিয়ে না যায়। ভাইকে ও দেখছে না। ভাল্লুককে ও দেখছে না।
তিতলি খুশি মনে নিধিকে বলল,
দাড়ুন মজা হবে রে কি সুন্দর।
আমি পিক তোলার জন্য এসেছি!
তিতলি নেচেনেচে বলল,
আগে ভেতরে চল!
ওরা সবাই ভেতরে গেলো।
ভেতরে যেতেই তুষার বোনকে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
বাসে কোনো সমস্যা হয়নি তো তোর?
না ভাইয়া খুব ভালো লেগেছে।
নিধি তুষারের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। কি এটিটিউড বোনকে বলছে তাকে একটু বললে কি হতো? সে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। তুষার এটা দেখে ও না দেখার মতো ভান করে বোনকে বলল,
সাবধানে হাটবি কোথায় ও উঠতে মন চাইলে আমাকে এসে বলবি। আমি এখানে আছি!
ওকে ভাইয়া।
তুষার বোনের হাবভাব জানে। মুখে বললেও পরে ভুলে যায়। তাই নিধির উদ্দেশ্য বললো,
নিধি তিতলিকে একটু দেখে রেখো কেমন?
তিতলি বলল,—– আচ্ছা ভাইয়া
তুষার উত্তর শুনে ওদিকে চলে গেলো।

ওরা বান্ধুবিরা মিলে রাইডস এর দিকে গেলো।
তিতলি দেখলো অয়ন ক্যামেরা দিয়ে সব ভিডিও করছে। মূলত অয়ন একজন ফটোগ্রাফার ও বটে। তিতলির খুব ইচ্ছে হলো এখানে দাড়িয়ে কয়টা পিক নিবে তাই অয়নকে বলল,
অয়ন ভাইয়া আমাদের কয়টা পিক তুলে দাও?
তিতলির কথা শুনে অয়ন হেসে বলল,
অবশ্যই তুলে দিবো তোমরা দাড়াও!”
তিতলি, নিধি দুজনে খুশি হয়ে রাইডস এর পাশে দাড়িয়ে বিভিন্ন স্টাইলে পিক তুলতে থাকলো…
অয়ন পিক তুলতে তুলতে বলল,
অনেক সুন্দর এসেছে পিকগুলো । ওদিকে দাড়াও এবার!”
তিতলি একা গিয়ে নাগরদোলায়ের পাশে দাড়ালো,
অয়ন বিভিন্ন নিয়মে পিক তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলো।
আর এই দৃশ্যটাই দূর থেকে দেখতে পেল একজন যুবক। দেখেই কপাল কুঁচকে আরো সরু চাহনিতে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল,

পিক তোলা বের করবো আগে শুধু হাতের কাছে একবার পায়! তৎক্ষণাৎ মোবাইল বের করে অয়নকে কল দিয়ে অন্যদিকে ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
অয়নের ফোন বেজে উঠলে প্যাকেট থেকে ফোন বের করে “ফারাজ ভাই” নাম দেখে সাথে সাথেই রিসিভ করে বললো,
হ্যালো ভাই! কিছু বলবেন?
তোকে সবখানে খুঁজছি! গেইটের দিকে আয়!
এক্ষুনি আসছি ভাই!
অয়ন তিতলি, নিধিকে বলল,
ফারাজ ভাই কল দিয়ে বলল ওদিকে যেতে পরে বেশি করে তুলে দিবো এখন যায়।
তিতলি মুখ ভেঙচি কাঁটলো। ফারাজ ভাই! ফারাজ ভাই! ঢং!
তখন সিয়াম কোথায় থেকে হাজির হলো! তিতলির সাথে ঝগরা করার উদ্দেশ্য বলল,
কিরে ভুটকি তোরে তো এখন কার্টুনের শাঁকচুন্নিদের মতো লাগতেছে?
তিতলি রেগে গিয়ে সিয়ামের চুল টেনে ধরে বলল,
পেরত! সর এখানে কি তুই? ছেলেদের কাছে যা!
আরে এত চেতি যাস কেন?
তিতলি সিয়ামের চুল আরো জোড়ে টেনে ধরে বলল,
চেতলে এমন ভাবে চেতি যারা ঠান্ডা করতে আসে তারাও চেতে যায় বুঝলি এবার যা!
সিয়াম মুখ ভেঙচি কেটে চলে গেলো।

তিতলি নিধি, প্রিমা, স্মৃতি ওরা হাঁটতে হাঁটতে নিরিবিলি জায়গায় চলে গেলো।
তিতলি সহসা খুশিতে লাফিয়ে বলল,
নিধিরে দেখ না কি সুন্দর লাগছে কৃষ্ণাচূরা গাছ টা! চল ওদিকে যায়।
নিধি প্রিমা ওরা সবাই তাকালো। আসলেই লাল লাল কৃষ্ণাচূরা ফুলের গাছটা যেন পুরো পার্কের সৌন্দর্য দ্বিগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ওটা একটু নিরিবিলি জায়গায়।
নিধি চিন্তার সুরে বলল,
ওদিকে গেলে যদি কোনো সমস্যা হয়?
তিতলি ওখানে যাবে মানে যাবে। তাই ওদের সাহস দিলো। যেন সে কত সাহসী মেয়ে ওমন করে বলল,
চল না কোনো সমস্যা হবে না! আমি আছি তো!
শেষ পর্যন্ত ওরা সবাই তিতলির কথায় সায় জানালো। কৃষ্ণাচূরা গাছের নিচে এসে দাড়ালো। গাছটার উচ্চতা ভীষন লম্বা হওয়ায় একটা ঢাল ও ওদের নাগালে নেই। তিতলি অনেক চেষ্টা করেও নিতে না পেরে সর্বশেষে বলল,

আমি গাছে উঠি!
নিধি চেঁচিয়ে বলল,
কিহহহহ! গাছে উঠবি মানে কি?
আমি তো গাছে উঠতে পারি প্রথম ঢালে উঠে ফুল নিয়ে আসি!
না না বোইন গাছে উঠার দরকার নাই! আর তুষার ভাইয়া জানলে তো তোকে আর জীবনে ও কোথায়ও যেতে দিবে না।
ভাইয়া কি এখানে আছে নাকি!
তোকে আমি শেষবারের মতো বলছি তিতলি এখান থেকে চল!
তিতলি জেদ ধরে বলল,
না আমি গাছে উঠবো।—–
তিতলি শাড়িতে টা বুকের সাথে গুঁজে নিয়ে গাছে উঠার জন্য যায়। গাছ লম্বা হলেও চিকন। তাই তিতলির সমস্যা হয় না। তিতলি অনেক কষ্টে প্রথম ঢালে উঠে প্রথমে ঢালে বসলো পা দুলিয়ে। তিন চারটা ফুলের ঢাল ভেঙে নিচে ফেললো।

ফারাজ খান ইমার্জেন্সি ফোন আসায় কথা বলতে বলতে এদিকে আসতেই চোখ পড়ে কৃষ্ণাচূরা গাছের নিচে কিছু মেয়ে দাড়িয়ে আছে। আর উপরে একজন ঢালে বসে পা দুলিয়ে রেখে ঢাল ভাঙছে। যুবক ভালো করে তাকাতেই চিনতে অসুবিধা হয়না। সহসা ফোন রেখে আকাশসম রাগ নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়।
তৎক্ষণাৎ প্রিমার ভয়ার্ত গলা ভেসে এলো,
তিতলিরে ফারাজ স্যার আসছে এদিকে! আজকে তোর খবর আছে মনে হয়।
তিতলি ভয়ে কেঁপে উঠে গাছের ঢালে বসা অবস্থায়। মনে মনে ভাবে , এই ভাল্লুক কি আমাকে আনন্দ করতে দিবে না। গাছ থেকে দুটো ফুলও নিতে দিবে না। মনে হয় তার আনন্দ দেখে হিংসা হয় নিজে তো গম্ভীর মুখ নিয়ে হাঁটে কোনো আনন্দ করতে জানে না আবার আমাকেও কিছু করতে দেয় না! এখন কি করবো? তিতলির ভাবনার মাঝেই গম্ভীর স্বর ভেসে এলো
আপনারা এখানে কি করছেন?

কণ্ঠসুর টা শুনে তিতলি ঢালে বসে মাথায় ঘোমটা টেনে পেছনের দিকে ফিরে যায়।
নিধি প্রিমা ওরাতো ভয়ে শেষ! কি বলবে স্যারকে? নিধি কোনোরকম বানিয়ে পেছিয়ে বলল,
স্যার আসলে আমরা একটু পিক তুলতে এসেছিলাম।
ফারাজ আবার গাছের ঢালে বসে পেছনে মুখ করে বসে থাকা বেয়াদব মেয়েটার দিকে তাকালো।
যুবক ভ্রুযুগল কুঁচকে রেখেছেন কৌতুকে। এই মেয়েতো কোনো সাধারণ মেয়ে না! বনভোজনে এসে গাছে উঠে? আজকে শুধু নামুক! তারপর বাকি ব্যবস্থা করবে। ফারাজ রেগে গিয়ে বলল,
এই মেয়ে নামো বলছি!
তিতলি ভয়ে ঢাল আঁকড়ে ধরলো।
নিধি, প্রিমা, স্মৃতি ওরা স্যারকে কিছু বলার সাহস পায় না। এখন দাড়িয়ে দাড়িয়ে দুঃখ করছে। আগেই বলছিলো গাছে উঠার দরকার নেই। এখন বুঝুক মজা। নিধি সাহস যুগিয়ে বলল,
স্যার আমরা….”
আপনারা কি? আপনারাও তো এখানে যোগ দিয়েছেন? আপনারা ওদিকে যান আমি ওকে নামাচ্ছি।
নিধিরা স্যারের কথার উপর কথা বলার সাহস করতে পারে না। স্যারকে প্রচন্ড সম্মান করে বিধায় অসহায় চোখে পেছন ফিরে ফিরে তিতলির দিকে চেয়ে যেতে থাকে। মনে মনে চাচ্ছে স্যার যেন তিতলিকে কিছু না করে।

ফারাজ তিতলিকে এখনো নামতে না দেখে ধমক দিয়ে বলল,
বেয়াদব। ওখানে কেন উঠছো?
তিতলির সহজ সরল স্বীকারোক্তি,
ফুুল নিতে!
এক্ষুনি নেমে আসো!
তিতলি নামবে না। আগে এই ভাল্লুককে এখান থেকে যেতে হবে তারপর সে নামবে।
তাই সে বলল,
আগে আপ…আপনি যান!
যুবক কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে মেয়েটার মুখখানার পানে। এই বেয়াদব মেয়ে কোনদিন মানুষ হবে? ভেবে স্রেফ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
তোমার ভাইকে ডাকবো নাকি নিজে নেমে আসবে?
তিতলি ভয় পেয়ে গেলো। ভাইকে যদি ডাকে তাহলে ভাই আর কখনো কোথায়ও নিয়ে যাবে না। তাকে অনেক বকবে। আব্বু আম্মুকেও সব বলে দিবে। সে খুব কষ্ট পাবে। তাই বলল,
না না প্লিজ ভাইয়াকে ডাকবেন না। এইযে দেখুন নামতেছি! আপনি চলে যান এখান থেকে আমি নেমে তারপর ওখানে চলে যাবো।

বেশি কথা না বলে নামো! আমাকে অন্য ব্যবস্থা করতে বাধ্য করো না।
তিতলি গাছ থেকে ভয়ে ভয়ে পাঁচ পা নেমে লাফ দেয়। লাফ দেওয়ায় শাড়ি পেট থেকে অনেকটা সরে যায়। মেয়েটা সেটা বুঝতেই পারে না। ফারাজ এদিকে তাকিয়ে থাকায় চোখদুটো আকস্মিকভাবে সেদিকে পড়ে । পর মুহূর্তেই চোখের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলল যুবক।
তিতলি কিছুতেই বুঝতেই পারে না সেটা। গাছ থেকে নেমে ফারাজের দিকে না তাকিয়েই শাড়িটা এমনিতেই ঠিকঠাক করে পালাতে চাই। ফারাজের সামনে পড়তে মেয়েটার সে কি লজ্জা! আর সে তো ভাল্লুককে ইগনোর করে। যদি আবার আগের মতো হয়ে যায়।

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৭

ফারাজ খান বেয়াদব মেয়েটাকে থামায় না। মনে মন বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“পালিয়ে আর কতদূর যেতে পারবে ! ফারাজ খানকে যেহেত তুমি জ্বালিয়েছো, এবার তুমিও দেখবে ফারাজ খান কিভাবে তোমাকে জ্বালায়! মাইন্ড ইট!”

রাগে অনুরাগে পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here