তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা স্নিগ্ধর সাথে কথা বলতে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। দেখলো স্নিগ্ধ বন্ধুদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। প্রাণেশা এগিয়ে এসে স্নিগ্ধর সামনে দাড়ালো। দৃষ্টি স্নিগ্ধর দিকেই। স্নিগ্ধ এক কদম এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসু সুরে বলল,
“প্রাণেশা তুমি….কিছু বলবে?”
প্রাণেশা কিছু একটা ভেবে মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বোঝালো। এরপরে চলে গেলো। যেতে যেতে আবারও স্নিগ্ধর দিকে তাকালো। স্নিগ্ধ বুঝলো হয়তো প্রাণেশা কিছু বলতে চেয়েছিলো।
রাত সাড়ে ১১ টার দিকে প্রাণেশা বাড়িতে ফিরে এলো। প্রাণেশার বাবা আরশাদ খান ড্রইং রুমে বসে আছেন। বেশ গম্ভীর হয়ে আছেন।
প্রাণেশার পরিবার বলতে ওর বাবা আরশাদ খান আর ওর বড় ভাই আরিয়ান খান সৌরভ।
প্রাণেশা এগিয়ে এলো। আরমান খানের পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলো,
“তুমি এখনও জেগে আছো কেনো বাবা?”
তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“এমনেই ঘুম আসছিলো না।”
“তুমি রাগ করে আছো?”
“কে বলেছে আমি রাগ করেছি।”
“বাবাদের বলতে হয়না। সন্তানরা তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারে।”
আরশাদ খান শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“এতো দেরি হলো কেনো?”
“ওই একটু হয়ে গিয়েছে বেস্ট ফ্রেন্ডের বার্থডে না। আরও ফ্রেন্ড ছিলো। তাই ওদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে দেরি হয়েছে।”
তিনি প্রাণেশার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“ঠিক আছে তাহলে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমিও শুয়ে পড়বো।”
“হুমম চলো।”
আরশাদ খান এমনই। সবার সাথে তিনি কঠোর হলেও মেয়ের সামনে একজন শিশুর ন্যায় ব্যবহার করেন। যেনো এটাই তার মা।
প্রাণেশা রুমে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। চোখে ঘুম নেই। সুবহার ভাইয়ের ওয়ালেটে নিজের ছবি দেখার পর থেকে ওর মাথায় শুধু এই একটা চিন্তাই।
তবে কি ভালোবাসে ওর ভাই?
কিন্তু ভালোবাসলে প্রকাশ করে না কেনো?
নাকি অন্য কোনো কারণে ছবিটা ওয়ালেটে রেখেছে?
কিন্তু কি কারণে? কোনো কারণ তো প্রাণেশার মাথায়ই আসছে না।
প্রাণেশা উঠে বসলো। সাইড টেবিলে থেকে ওর ডায়েরিটা বের করে লিখতে শুরু করলো,
—সোহরাব চৌধুরী স্নিগ্ধ,
আমি আপনাকে কোনোদিন দেখিনি। প্রথম দেখেছি আজকেই। কোনোদিন কথাও হয়নি আপনার সাথে। আজকে আপনার ওয়ালেটে নিজের ছবি দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। এও জানিনা কেনো ছবিটা রেখেছেন। মনের মাঝে অনেক প্রশ্ন, এর উত্তর শুধু আপনার কাছেই মিলবে।
ইতি,
সাইয়ারা খান প্রাণেশা
কথাগুলো লিখে ডায়েরিটা বন্ধ করে শ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষন ভাবতে লাগলো স্নিগ্ধর কথা। কোনোদিক দিয়েই সেই ছবির রহস্যটা বের করতে পারছে না। ওর বাবাকে যদি বলে তাহলে সে রেগে ওই স্নিগ্ধকেই ধরে মারবে। আর ওর ভাইকে বলার চেয়ে না বলাই ভালো। এরা দুজনই প্রেম-ভালোবাসা পছন্দ করে না। এই নিয়েই মুল সমস্যা।
পরদিন সকালটা প্রাণেশার জন্য একটু অন্যরকম। আজ ওদের অনার্স ১ম বর্ষের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস। তাই একটু আগেই রেডি-সেডি হয়ে বের হলো। আরশাদ খান প্রাণেশাকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে গিয়েছেন। ওদিক থেকে সুবহাও এসেছে। দুজনে একসাথে ক্লাসে এসে বসলো। এর পরপর ওদের আরও ফ্রেন্ড এলো। আবার কিছু কিছু ফ্রেন্ডদের চিনলো। আবার কেউ অচেনা।
এরপরে ক্লাসে একজন স্যার এলো। সে এসে টুকটাক কথা বলছিলো। এরপরে ঢুকলো ওদের ডিপার্টমেন্টের একজন লেকচারার। যাকে দেখে প্রাণেশা অবাক হয়ে ধপ করে উঠে দাড়ালো। সে আর কেউ না, সুবহার ভাই সোহরাব চৌধুরী স্নিগ্ধ।
সুবহা সাথে সাথে প্রাণেশার হাত ধরে বসিয়ে বলল,
“কিরে তু্ই দাঁড়াচ্ছিস কেনো?”
প্রাণেশা অবাক কণ্ঠে বলল,
“আরে ওই তোর ভাই এখানে কেনো?”
“ভাইয়া এই ভার্সিটির লেকচারার।”
প্রাণেশা অবাক কণ্ঠে বলল,
“আগে বলিসনি তো।”
“মনে ছিলো না দোস্ত।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে আছে। স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে শুরুতে একপলক দেখে এরপরে আরেকজন স্যারের সাথে কথা বলছিলো। এরপরে পুরো সময়টায় স্নিগ্ধ প্রাণেশার দিকে তেমন তাকায়নি। প্রাণেশা গুমোট বেধে স্নিগ্ধর কথাই ভাবছে।
প্রাণেশারা ভার্সিটি থেকে বের হওয়ার আগে পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখছিলো। সুবহা প্রাণেশাকে চিন্তিত দেখে বলে উঠল,
“এই কি নিয়ে চিন্তা করছিস বলতো? কেমন গড়গড় করে কথা বলিস আর আজকে তেমন কথাই বলছিস না কেনো?”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“ওই কালকে তোদের বাড়িতে গিয়েছিলাম না আন্টির কাছে একটু সময় থেকে ভালোই লাগছিলো। এরপরে চলে আসার পর থেকে মনটা ভালো নেই।”
সুবহা হাসলো। এরপরে বলল,
“আচ্ছা চলনা আমার সাথে কয়েকটা দিন থাকবি।”
প্রাণেশা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“তা আর হচ্ছে না দোস্ত। আমার ভাই আসছে, ও এলে আমাকে ছাড়ছে না কোথাও। ও বিদেশে ছিলো বলে এতো ঘুরতে পারলাম। এমনে ভাইয়াকে যদি বলি এটা দাও, ঘুরতে যাবো, কোনোটাই না করবে না কিন্তু সে সাথে যাবে। আর যে রাগী। একদিন নিয়ে আসবোনি দেখিস।”
সুবহা বলল,
“তোর কপালে একটা ভাই, আর আমার কপালে একটা ভাই।”
প্রাণেশা বলল,
“তোদের বাড়িতে তাও মিলেমিশে থাকিস সবাই। আর আমার বাবা আর ভাইয়ার মাঝে তো ৫ মিনিটের বেশি কথাই হয় না। আর না ভাইয়া-বাবাকে একসাথে দেখি।”
সুবহা কপালে ভাজ ফেলে বলল,
“কি বলিস এগুলো? বাবা-ছেলে সবসময় এমন করে?”
প্রাণেশা একটা জায়গায় বসে বলল,
“ভাইয়া আর বাবা অফিসে যতক্ষণ থাকে তখন অফিস নিয়ে কথা বলবে। আর বাড়িতে এলে তেমন কোনো কথা বলতে দেখি না। তাও যতক্ষণ কথা হয় সব আমাকে নিয়েই এর বাহিরে কোনো কথা নেই।”
সুবহা জিজ্ঞাসা করলো,
“কেনো?”
প্রাণেশা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“অন্য একদিন বলবো। তবে ভাইয়ার বাবার উপরে রাগ আছে বোধহয়। ভাইয়া আমার সাথে ফ্রি, কিন্তু এই বিষয়ে না কোনো কথা বলে না। আর বাবা আমাকে যা করতে বলবে ভাইয়া বলবে তার উল্টো করতে।”
সুবহা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো ওর কথায়। এরপরে বলল,
“তোর ভাইকে তো তাহলে দেখতে হচ্ছে!”
প্রাণেশা রসিকতা করে বলল,
“না দেখিস না, প্রেমে পড়ে যাবি।”
“মোটেও না। শুধু তোর ভাইকে একনজর দেখবো। দেখবো সে কেমন রাগী।”
প্রাণেশা এবার একটা প্রশ্ন করে বসলো।
“সুবহা তোর বড় ভাই প্রেম করে না?”
সুবহা মনে মনে বলল, “তু্ই রাজি থাকলে প্রেম কেনো বিয়েও করতে পারে। শুধু তোকে বলা। কিন্তু তোর রাগী ভাই, রাগী বাপের সামনে এসব বলবে কি করে?”
প্রাণেশা সুবহার মনের কথা ধরতে পারলো না। সুবহা বলল,
“স্নিগ্ধ ভাইয়া প্রেম করে না।”
প্রাণেশা সিরিয়াস হয়ে বলল,
“তু্ই শিওর জানিস?”
সুবহা প্রাণেশার হাত ধরে বলল,
“হুমম শিওর। ভাইয়া আমার সাথে ফ্রি। আমি অনেক জিজ্ঞাসা করেছি কিন্তু বলেছে প্রেম করে না।”
প্রাণেশা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে মনে মনে বলল, -“প্রেম করে না তাহলে আমার ছবি কেনো রেখেছে? নাহ এভাবে বসে থাকলে হবে না। আমার উনাকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে। উনি আমার ছবি এমনে এমনে তো আর ওই ওয়ালেটে রেখে দেয়নি। উনার সাথে আমারই কথা বলতে হবে।”
সুবহার ফোনে স্নিগ্ধর মেসেজ। সুবহা বুঝতে পেরে গেলো প্রাণেশাকে নিয়ে যেতে বলেছে।
“এই প্রাণেশা চল বাহিরে যাই। আমার ভাইয়া মেসেজ দিয়েছে।”
“ঠিক আছে চল।”
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে বাহিরে এলো। স্নিগ্ধ গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও সুবহার সাথে প্রাণেশাকে দেখে অনেক খুশি হয়েছে। প্রাণেশা মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো। স্নিগ্ধ কিছুটা নরম গলায় বলল,
“প্রাণেশা চলো তোমাকে নামিয়ে দেই!”
প্রাণেশা হেসে বলল,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১
“থ্যাংকস। তবে দুঃখিত ভাইয়া, ওই যে আমাকে নিতে এসেছে।”
“ওকে।”
প্রাণেশা নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে পেছন ফিরে স্নিগ্ধর দিকে তাকালো। ঠিক তখনই স্নিগ্ধ হেসে চোখ মারলো। প্রাণেশা চোখ পিটপিট করে তাকাতেই স্নিগ্ধ হেসে গাড়িতে উঠল।
