তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৪
জেরিন আক্তার
সৌরভ প্রাণেশাকে সামনে বসিয়ে একে একে লাগেজ দুটো খুলল। নিজের জিনিসগুলো সাইডে রেখে সব জিনিস বোনকে দিয়ে দিলো। প্রাণেশা জিজ্ঞাসু সুরে বলল,
“ভাইয়া তখন যে বললে আমার জন্য কিচ্ছু আনবে না। তাহলে এগুলো কি! মিথ্যে বললে কেনো তখন?”
সৌরভ হেসে বলল,
“এগুলো কি তোর জন্য এনেছি? এগুলো এনেছি প্রাণেশার জন্য।”
প্রাণেশা আপাতত জিনিসগুলো রেখে বলল,
“ভাইয়া এসব জিনিস পরে আগে খাবে চলো আমি রান্না করেছি।”
সৌরভ নাক ছিটকে বলল,
“ছ্যাহ! তু্ই রান্না করেছিস? লবণ দিয়েছিস ঠিকমতো? নাকি ঝাল বেশি দিয়েছিস? নাকি…”
প্রাণেশা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে রইলো। সৌরভ ফিচেল হেসে প্রাণেশার মাথায় হাত রেখে বলল,
“চল চল খিদে পেয়েছে। দেখি আমাদের বাড়ির রাঁধুনি কেমন রেধেছে।”
প্রাণেশা সৌরভের মনগড়া প্রশংসা মেনে নিয়ে ওকে নিয়ে নিচে এসে ডাইনিং টেবিলে বসালো। একই সাথে প্রাণেশা আরশাদ খানকেও ডেকে খাবার টেবিলে বসালো।
সৌরভ সোজা খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। রান্না তো ভালোই হয়েছে। ও খেতে খেতে প্রাণেশাকে বলল,
“কালকে থেকে অফিসে যাওয়ার পথে তোকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে যাবো।”
প্রাণেশা থমথমে মুখে বলল,
“তুমি শুধু শুধু যাবে, ড্রাইভার তো আছে ভাইয়া।”
“তা থাকুক আমি নিয়ে যাবো মানে নিয়ে যাবোই। আর এর বাহিরে কোনো কথা শুনতে চাই না।”
“ভাইয়া, তুমি সাথে গেলে তোমার অফিসে দেরি হবে না?”
“আমার অফিস, তোর ভার্সিটি ক্লাসের আরও আধঘন্টা পরে।”
প্রাণেশা আর কিছু বলল না। বলেও লাভ হবে না। যাও প্রতিদিন সুবহার সাথে দাঁড়িয়ে থেকে স্নিগ্ধকে দেখতো, তা আর হচ্ছে না।।
প্রাণেশা রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে শুলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো স্নিগ্ধ হোয়াটস্যাপে মেসেজ দিয়ে রেখেছে,
“প্রাণেশা ফ্রি হলে একটু কল দিও।”
প্রাণেশা সাথে সাথে কল দিলো। স্নিগ্ধ কিছু বই নিয়ে বসে ছিলো। প্রাণেশার কল পেয়ে স্নিগ্ধ রিসিভ করলো। প্রাণেশা বলল,
“আপনি তখন কি জন্য কল দিয়েছিলেন বললেন না তো!”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“কিভাবে বলবো বলুন আপনি তো শোনার আগেই কল কেটে দিলেন। আর এখন কল দিলেন।”
“আসলে আমার ভাইয়া এসেছে অনেকদিন পরে। ওর সাথেই ছিলাম।”
“আজকে কি এর জন্যই ভার্সিটিতে আসোনি?”
“হুমম। ভাইয়াকে আনতে গিয়েছিলাম। কালকে যাবো ইনশাআল্লাহ।”
“ওহহ।”
“আপনি আসবেন কালকে?”
“হুমম।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর সাথে কথা বলে বেশ আনন্দিত হয়ে বিছানায় এসে বসলো। স্নিগ্ধর একখানা ছবি দেখে মুচকি মুচকি হেসে মনে মনে বলল,
“আপনাকে এতো ভালো লাগে কেনো?”
এই বলে প্রাণেশা মুখ ঢাকলো। নিজেই লজ্জা পেয়ে শুয়ে পড়লো। অবশেষে স্নিগ্ধকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে প্রেমেই পড়ে গেলো। তবে এও ভেবে রেখেছে আগেই বলবে না ভালোবাসে। দেখবে তার মনেও কোনো ফিলিংস আছে কিনা।
এর থেকেও বড় বিষয় সেই ওয়ালেটের ছবিটা। এর রহস্য বের করার মিশনটা কালকে থেকেই শুরু করবে প্রাণেশা।
সকাল হতেই প্রাণেশা একাই খান বাড়ি মাতিয়ে রেখেছে। কেননা ওর ঘুম থেকে উঠতে অনেক লেট্ হয়েছে। অন্যদিকে সৌরভ রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট করতে বসে পড়েছে। কোনো কাজের ক্ষেত্রে সে আবার টাইম মেইনটেইন করে চলে। আর প্রাণেশা তাড়াতাড়ি রেডি হচ্ছে, দেরি হলে আবার সমস্যা। সৌরভ কোনো কিছুতে দেরি হওয়া পছন্দ করে না।
প্রাণেশার একটু দেরি হলো। সৌরভ আজকে কিছু বলল না। চুপচাপ খেয়ে প্রাণেশাকে নিয়ে রওনা হলো। ভার্সিটির সামনে এসে প্রাণেশাকে বলল,
“ফোন সাথে আছে তোর?”
“হুমম।”
“ঠিক আছে যা, ছুটি হওয়ার আধঘন্টা আগে মেসেজ দিবি।”
প্রাণেশা তড়িৎ হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“কেনো ভাইয়া?”
“নিতে আসবো তোকে।”
প্রাণেশা মনটা খারাপ করে বলল,
“তুমি কাজ রেখে আসবে, এর থেকে ড্রাইভারকে বলো নিয়ে যেতে।”
সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“না আমিই নিতে আসবো। আর আমার, তোর থেকে কোনো বড় কাজ চোখে পড়ে না। এখন যা!”
প্রাণেশা চলে গেলো। ভেবেছিলো তো সৌরভ শুধু দিতেই যাবে, কিন্তু এই ছেলের মাথায় এ চিন্তা কোথায় থেকে এলো আল্লাহ ভালো জানে।
প্রাণেশা যেতে যেতে সামনে পড়লো সুবহা। বুকে হাত গুজে ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। খুব রেগে আছে প্রাণেশার উপরে। কালকে সারাদিন কথা বলেনি আবার সকালে ছোট্ট করে মেসেজ দিয়েছিলো। আজ সব রাগ ঝাড়বে তারপর কথা বলবে।
প্রাণেশা সুবহার আরও সামনে গিয়ে হেসে দিলো। বলল,
“সরি, সরি এত্তগুলো সরি। আসলে ভাইয়া এসেছে কালকে, সারাদিন সেই বাস্তেই ছিলাম। জানিসই তো একটা মাত্র ভাই আমার।”
সুবহাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে প্রাণেশা ব্যাগ থেকে দুটো চকলেট বের করলো। সুবহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আবারও সরি। নে মিষ্টি মুখ কর।”
সুবহা আর রাগ করে থাকতে পারলো না। সেও হাসলো। প্রাণেশা বলল,
“আর তোর জন্য একটা গিফট আছে।”
সুবহা কপালে ভাজ ফেলে বলল,
“কিসের গিফট রে?”
“বিকেলেই দেখতে পারবি গিফটটা। ড্রাইভার আংকেল দিয়ে আসবে।”
“ওহ ঠিক আছে।”
প্রাণেশাদের ভার্সিটি ছুটি হলো। স্নিগ্ধ আগেই গেটের বাহিরে এসে দাঁড়িয়ে আছে। কেননা প্রাণেশার থেকে সকালে শুনেছিল ওকে নাকি এখন থেকে ওর ভাইই নিতে আসবে। স্নিগ্ধর চিন্তার শেষ নেই। সবে মাত্র এই মেয়ে একটু একটু কথা বলছে, ভালোবাছে। ও এই মেয়েকে কবে ভালোবাসার কথা বলবে, আর কবেই বা প্রাণেশা নিজে বলবে…আবার রিলেশনের কথা প্রাণেশার বাসায় বলা। এরপরে প্রাণেশার বাবা, ভাইকে মানিয়ে নেওয়া আরও কতকিছু।
ইচ্ছে করলে স্নিগ্ধ এখনই প্রাণেশার বাবা, ভাইকে বলতে পারে কিন্তু প্রাণেশাকেও তো সময় দিতে হবে। ও স্নিগ্ধর ভালোবাসা বুঝতে পেরে নিজেও ভালোবাসবে। তারপরই কিনা সম্পর্ক ভালো থাকবে।
স্নিগ্ধ শ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বলল, “ইনশাআল্লাহ সব হবে।”
দেখতে দেখতে সব স্টুডেন্টের মাঝে প্রাণেশা এলো সুবহার সাথে। স্নিগ্ধ মনভরে দেখলো। ওর মুখে মিষ্টি মিষ্টি হাসিও ছিলো। এদিকে সৌরভ ওর বন্ধু হামিমের সাথে দেখা করতে ভিতরে ঢুকেছিলো। এখন প্রাণেশা ওর ভাইয়ের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। স্নিগ্ধ আর সুবহা ওদের গাড়িতে বসে আছে। প্রাণেশাদের যাওয়ার পরেই ওরা যাবে।
সৌরভ ভার্সিটির ভিতরে থেকে বের হলো। সাথে হামিম ছিলো। সৌরভ হামিমকে সাথে নিয়ে এসে প্রাণেশার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। হামিম সৌরভকে বলল,
“এটা তোর বোন আগে বলবি না। ওকে ক্লাসেই দেখেছি কিন্তু জানতাম না এটা তোর বোন। তু্ই কোনো চিন্তা করিস না ভাই, তোর বোনের এখানে কোনো অসুবিধা হবে না। আর প্রাণেশা তোমার কোনো প্রবলেম হলে আমাকে জানিও।”
প্রাণেশা হালকা হেসে মাথা নাড়ালো।
কথা বলা শেষে সৌরভ হামিমের সাথে হাত মিলিয়ে গাড়িতে উঠল। প্রাণেশা স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে গাড়িতে উঠল।
প্রাণেশার মন বলছে, ইশ একটু যদি সামনে থেকে তাকে দেখতে পেতাম।
বিকেলে প্রাণেশাই স্নিগ্ধকে কল দিলো। স্নিগ্ধ ওর বাবার সাথে কথা বলায় ব্যাস্ত। কলটা কেটে দিলো। প্রাণেশা আর কল দিলো না। সাঈদ রেজা চৌধুরী বললেন,
“কল এলো ধরলে না কেনো?”
স্নিগ্ধ হেয়ালি কণ্ঠে বলল,
“ইম্পরট্যান্ট না, পরে কথা বলবো।”
কথা বলতে বলতে সাঈদ রেজা চৌধুরী বললেন,
“তোমার না প্রাণেশাকে পছন্দ, আমরা কি কথা বলবো?”
“না। আমি আগে ওর সাথে সব ঠিকঠাক করে নেই। এরপরে আমিই ওর ফ্যামিলির সাথে কথা বলতে যেতে বলবো।”
“ঠিক আছে তখনই যাবো।”
ঘন্টা খানিক পরে প্রাণেশা সুবহার জন্য রেডি করা গিফট বক্স বলতে ( সৌরভ কালকে যে জিনিসগুলো এনেছে প্রাণেশার জন্য সেগুলোই কিছু কিছু সুবহার জন্য আলাদা করে) রেডি করছিলো ড্রইং রুমে বসে। পাশে সৌরভ বসে ফোন স্ক্রল করছিলো। এর আগে আবার কোথায় যেনো গিয়েছিলো।
প্রাণেশা সাহস নিয়ে ভাইয়ের কাছে বসে বলল,
“ভাইয়া! একটা কথা বলবো?”
“হুমম।”
“ভাইয়া দেখছোই তো এই জিনিসগুলো একটা বান্ধবীকে দিবো। তাই বলছিলাম এগুলো আমি নিয়ে দিয়ে আসি?”
সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ড্রাইভারকে বল সে দিয়ে আসবে।”
প্রাণেশা নাছোড়বান্দা, বলল,
“না ভাইয়া আমি যাই? বান্ধবীর সাথে দেখা করেও আসবো।”
সৌরভ ফেরার পর থেকেই দেখছে প্রাণেশার আচরণ পাল্টে গিয়েছে। এর মূলই ওর বান্ধবী। এতো বান্ধবী, বান্ধবী করার কারণ কি থাকতে পারে?
সৌরভ সন্ধিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কথাগুলো ভেবে বলল,
“তোর বান্ধবীরা কয় ভাইবোনরে?”
প্রাণেশা সাথে সাথে বলে দিলো,
“এক ভাই এক বোন।”
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৩
সৌরভ আর কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করলো না। উঠে দাঁড়িয়ে সামনে থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে বলল,
“বক্সটা নিয়ে আয়। আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
প্রাণেশা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,
“মানে, তু তুমি যাবে কেনো? ড্রাইভার নিয়ে যাক।”
সৌরভ পেছনে না ফিরে এগিয়ে যেতে যেতে কড়া গলায় বলল,
“চুপচাপ আয়। যদি একমিনিটও দেরি হয় রে তাহলে তোর খবর আছে।”
প্রাণেশা ঠোঁট উল্টিয়ে বক্সটা হাতে নিয়ে ভাইয়ের পেছন পেছন গেলো। বিড়বিড় করে বলল, “জীবনেও বউ পাবে না।”
