Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৪

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৪

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি

তাওসিফ গাজীপুর যাবার পরদিনই বিয়ের কাগজটা হাতে পাওয়ার কথা থাকলেও দীধিতির হাতে তা আসেনি। এ কারণে মনের মধ্যে নতুন করে যে সন্দেহটা তৈরি হয়েছে ও তা হলো, নাওফিল নিশ্চয়ই জড়িত তাওসিফের সঙ্গে৷ হয়ত তাওসিফ বিয়েটা করার সিদ্ধান্ত নেবার পরই নাওফিলকে জানিয়েছিল৷ তখন নাওফিল কোনো পরিকল্পনা করে তাওসিফকে মিথ্যে মিথ্যে বিয়েটা করতে বলে৷ কেবল ওই দিনের প্রতিশোধ নেবার জন্যই৷ এমনটা তো হতেই পারে! তবে নিশ্চিত হতে পারছে না দীধিতি এ ব্যাপারে।

এরপর তিনদিন কেটে গেলে হঠাৎ খুব সকালে কল আসে কিরণের থেকে। যত দ্রুত সম্ভব যশোর চলে আসতে বলে ওকে। কী হয়েছে প্রশ্নটা অনেকবার করেও কোনো উত্তর পায়নি দীধিতি কিরণের থেকে৷ কিন্তু বুকটা কেঁপে ওঠে ওর বড়ো কোনো বিপদের আশঙ্কায়। বিপদটা কার হতে পারে? ওর মায়ের? তামান্নার সঙ্গে কথাবার্তা বলে দীধিতি এগারোটার বাসে উঠে পড়ে সেদিনই। তারপর রাত আটটায় গিয়ে পৌঁছয় যশোর। বাসার সামনে আসার পরই দেখা হয়ে যায় সৌরভের সঙ্গে। তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি থেকে নামছিল সে হাতে খাবারের টিফিনবাক্স নিয়ে। দীধিতিকে দেখা মাত্রই ওর কাছে ছুটে এসে হাত থেকে ব্যাগপ্যাকটা নিয়ে বলে, ‘আপাতত এটা আমাদের বাসায় থাক। তুমি চলো আমার সাথে।’

-‘কী হয়েছে, সৌরভ? কোথায় যাব? কিরণ বা আম্মুর সাথে কিছু হয়েছে? তাড়াতাড়ি বল না!’ বলতে বলতেই কেঁদে ফেলল ও।
অল্পতেই খুব ঘাবড়ে যাওয়া বা চিন্তায় পড়ে যাওয়া দীধিতির খুব বাজে স্বভাব মনে করে সৌরভ। এখন অবশ্য ধমক দেওয়াটা উচিত হবে না আবার কিছু বলাও যাবে না। নয়ত সারা পথ কাঁদতে কাঁদতে যাবে কোমল হৃদয়ের মেয়েটা। তাই সৌরভ কোনো জবাব না দিয়ে ব্যাগটা পৌঁছে দিয়ে আসলো ওদের ঘরে। তারপর রিকশা ডেকে দীধিতিকে নিয়ে রওনা হলো যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে৷ হাসপালের সামনে পৌঁছনো মাত্রই সৌরভের বাহু খামচে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে দীধিতি, ‘কার কী হয়েছে, সৌরভ? কিছু বলছিস না কেন?’
-‘তেমন কিছু না। আন্টি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল সিঁড়ি থেকে সকালবেলায়। কপাল কেটে গেছে একটুখানি। সেলাই পড়েছে দুইটা। ভেতরে চলো।’

-‘একটুখানি কাটলে দুইটা সেলাই লাগে?’ উত্তেজিত গলায় চেঁচিয়ে উঠেই দীধিতি সামনে এগোয়।
ঝুমুরকে কেবিনে রেখেছেন সুহাইল। তিনি থাকতে আর কাউকেই কোনো সাহায্য করতে হয়নি। এমনকি কিরণকেও সামলে ধরে রেখেছেন বুকের মাঝে নিয়ে। দূর থেকে তা দেখে দীধিতি ওদের কাছে ছুটে এল। জিজ্ঞেস করল কান্না গলায়, ‘কাকু, আম্মুর কাছে নিয়ে চলুন আমাকে।’
কিরণ বোনের কণ্ঠ পেয়েই সুহাইলের বুক থেকে মাথা তুলে বোনকে একদম এলোমেলো বেশে দেখে, ওর কাছে এসে বলে, ‘তুই সরাসরি এখানে এসেছিস কেন আপু? বাসা থেকে রেস্ট নিয়ে আসতি। আর এত কান্নাকাটি করছিস কেন? বিপদ কেটে গেছে।’
সুহাইলও বলল তাই, ‘তাই তো স্মরণ। বাসায় কেন গেলি না আগে? আমরা তো আছি এখানে। তোর বেশি বোঝা আম্মু এখনও ঘুমাচ্ছে। তুই বাসায় যা, মা। গিয়ে আগে একটু রেস্ট নে।’
-‘জীবনেও নিত না। সেই আমাকেই আবার পাঠাতেন বাড়ি গিয়ে ওকে নিয়ে আসার জন্য। আমার অত কুলিগিরি করার সাধ নেই এদের দু বোনের নিয়ে। তাই বাসার সামনে নামতেই ধরে নিয়ে এসেছি। এখন দেখে দুই বোনই এক সঙ্গে চলে যাক।’

কিরণ নাক ফুলিয়ে তাকাল ওর দিকে সে সময়, ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘দুই বোনই চলে যাক বললেই হলো! বেশি বোঝা পাবলিক কোথাকার! আপুকে এখানে আগে কে নিয়ে আসতে বলেছে তোমাকে?’
চোখ গরম করে চেয়ে সৌরভ তেড়ে যায় কিরণের দিকে। উদ্দেশ্য চুলের গোছা টেনে ধরে মাথায় জোরে একটা গাট্টা মারা৷ কিন্তু তখনই দীধিতি ওদের ধমকে ওঠে, ‘সব সময়ের মতো এখন দুটোই লাগলে আমি কিন্তু এখানেই চর থাপ্পর মেরে বসব তোদের!’
সৌরভ থেমে যায়। কিরণকে তখন বলে দীধিতি, ‘আম্মুর কাছে চল, দেখব আম্মুকে।’
-‘হুঁ, চলো।’
কেবিনে মোট তিনটা বেড৷ আরও দুজন রোগী রয়েছে। ঝুমুরের মাথার কাছেই একজন নার্স দাঁড়িয়ে অন্য একজন নার্সের সাথে কথা বলছে৷ সুহাইল নার্সটিকে নিযুক্ত রেখেছেন। ঝুমুরের ডান ভ্রুয়ের ওপরে ব্যান্ডেজ করা। ভ্রুসহ চোখের পাতাও ফুলে আছে তার। মুখটা ভীষণ শুকনো লাগছে। নার্সকে জিজ্ঞেস করে দীধিতি, ‘ঘুম ভাঙবে কখন?’

নার্সের গল্প থামে তখন৷ দীধিতির প্রশ্ন শুনে রোগীর আত্মীয় বুঝতে পেরে জবাব দেয়, ‘আধা ঘণ্টের মধ্যেই।’
আরও কিছুক্ষণ মা’কে দেখে বেরিয়ে আসে ওরা। সুহাইল সৌরভের সাথে কথা বলছিলেন কী কী খাবার নিয়ে এসেছে সে তা সম্পর্কে। দীধিতি আর কিরণ তাদের কাছে এসে দাঁড়াতেই সুহাইল বলেন, ‘স্মরণ, যা বাসায় যা। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সৌরভদের বাসা থেকে খেয়েদেয়ে নিস। আজকে রাতে কিরণ থাকবে ওর কাছে।’
ঘামে চটচট করছে শরীর৷ গোসল না করলে চলবে না। বাসায় যেতেই হবে ওকে৷ জিজ্ঞেস করল কিরণকে, ‘আম্মুর প্রেশার লো ছিল? খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করে না কি তা খেয়াল করিসনি?’
স্বাভাবিক প্রশ্নদুটোই সুহাইল হঠাৎ বিব্রত হয়ে পড়লেন। আড়ষ্টতা নিয়ে তিনি একটু সরে এলেন সেখান থেকে। কিরণ সুহাইলের সামনে গতরাতের ব্যাপারটা বলতে অপ্রস্তুতবোধ করছে৷

সুহাইলের বোন গতরাতে আই সি ইউতে ছিল। যার জন্য কর্তব্য পালনে আর সুহাইলের নানা রকম সহযোগিতার কথা ভেবে কৃতজ্ঞতায় ঝুমুরও থেকে গেছিলেন সাথে। রাত বাড়লে সুহাইল ঝুমুরের কাছে এসে বলেছিলেন তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসার কথা। কিন্তু ঝুমুর যেতে রাজি হননি। এদিকে মাথা ব্যথা আর ক্লান্তিতে চোখে ঘুমও নেমে আসছিল তার। চেম্বারে তখন সুহাইলও বসে থাকা। না পারছিলেন তিনি একটু টেবিলে মাথা রেখে চোখদুটো বুজতে, না পারছিলেন সুহাইলকে চলে যেতে বলতে। কিন্তু সুহাইল ঠিক বুঝতে পারছিলেন ঝুমুর অসুস্থবোধ করছেন৷ একটু ঘুমোনো জরুরি তার৷ তাই চেয়ার টেনে তার পাশে এসে বসে জোর করেই নিজের কাঁধে ঝুমুরের মাথাটা টেনে নেন৷ কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই সেই দৃশ্যটা চোখে পড়ে রাতে ডিউটি পালন করা দুজন নার্স আর একজন পুরুষ ডাক্তারের৷ বলা জরুরি, সেই নিম্ন মানসিকতার ডাক্তারটিও বহু আগে থেকেই ঝুমুরকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। তার স্ত্রী আরও বছর তিনেক আগে তালাক নিয়ে চলে গেছে। কারণ, তার চারিত্রিক দোষ রয়েছে সাংঘাতিক। সুহাইলের কাঁধে অমন আরাম করে ঝুমুরকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার রাগে লোক জড়ো করে খুব আক্রমণাত্মকভাবে অপদস্থ করে ঝুমুরকে। সুহাইল মেয়র বিধায় তাকে তোষামোদ করে চললেও চরিত্রহীন তকমা দেয় সে ঝুমুরকে৷ সে রাতে সুহাইলের অমানবিক আচরণের সাথে পরিচিত হন ঝুমুর৷ ডাক্তারটিকে কুকুরের মতো টেনে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে গিয়ে ভয়ানকভাবে মারধোর করে তাকে রক্তাক্ত করে ফেলেন, জানে মেরে দেওয়ারই মনোবাঞ্ছা ছিল সুহাইলের। রাতটা কোনোরকমে পার হলে ঝুমুর বাসায় ফিরে আসেন ভোরবেলায়। কিন্তু ওই দিনের ঘটনা আর মস্তিষ্ক থেকে সরেনি তার। অতিরিক্ত মানসিক চাপে বিপি লো হয়ে যায় আর হঠাৎ করেই মাথা ঘুরে পড়ে যান।

ঝুমুরের ওপর দিয়ে ঝড় যাওয়ার শুরুটা ছিল সে রাত থেকেই৷ হাসপাতাল থেকে ফেরার পর ঝুমুর সুহাইলকে একদম নিজের বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া বন্ধ করে দেন। সৌরভের বাবা-মায়ের সাথে আলোচনা করে দীধিতির জন্য পাত্র খুঁজতে শুরু করেন। কিরণকে নিয়ে ক’মাস আগে একটা বিপদ গেছে৷ তা নিয়ে আজও চর্চা হয় পাড়ায়। দীধিতিকে নিয়েও কম হয় না৷ এখন আবার নিজের চরিত্রেও দাগ লেগে যাচ্ছে৷ মেয়ে দুটোর ভবিষ্যত নিয়েই তিনি মূলত শুরু থেকে চিন্তিত ছিলেন। দীধিতি মায়ের ইচ্ছা সম্পর্কে জানার পর তাওসিফকে জানায় তা। তাওসিফ খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করবে বলে জানিয়ে ঠিক দুদিনের মাঝে একদম আকস্মিক বিয়ের কাগজ পার্সেল করে পাঠিয়ে দেয় সে দীধিতির বাড়ির ঠিকানায়৷ সন্ধ্যার সময় পার্সেলটা রিসিভ করেন স্বয়ং ঝুমুর। এনভেলপটির ওপর কারও নামই লেখা ছিল না। শুধু প্রেরকের নাম ঠিকানা আর প্রাপকের ঠিকানার সঙ্গে ফোন নাম্বার লেখা৷ ঝুমুর ভাবনায় পড়েন কিছুক্ষণের জন্য। ভাবেন, হয়ত তার ভাইয়েরা জরুরি কোনো কাগজ পাঠিয়েছে। যেহেতু যোগাযোগ রাখেনি সে ঠিকমতো তাদের সাথে। তাই পাঠানোর আগে ফোন করেও কিছু জানায়নি।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৩

দীধিতি আর কিরণ তখন সৌরভের বাসায়। দীধিতির জন্য সৌরভের মা চালের রুটি করছেন, পায়েস আর কষা গোরুর মাংস রাঁধছেন৷ তবে নৈশভোজের নিমন্ত্রণ সকলের। ঝুমুরও যাবেন রাত আটটা বাজলেই।
খামের ভেতর থেকে কাগজটা বের করে দেখেন বিয়ের কাগজটার ফটোকপি। কিন্তু কাগজের ওপর দীধিতি আর তাওসিফের ছবিটা উধাও। সেটা ফটোকপিতে ওঠেনি। পুরো কাগজটা পড়ার আগেই নিচে সইয়ের জায়গায় দেখেন রেজাউল হক স্মরণ। আর তার পাশের সইটি নাওফিল শেখ জাদ।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here