Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৫

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৫

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৫
জেরিন আক্তার

সৌরভ প্রাণেশাকে নিয়ে চলে গেলো সুবহার বাড়ির উদ্দেশ্যে। প্রাণেশা যখন বলল সামনের বাড়িটাই ওর বান্ধবীর বাড়ি, ঠিক তখনই সৌরভ গাড়ি থামালো। আর বলল,
“এখানেই নাম আর তোর বান্ধবীকে আসতে বল।”
“আরেকটু সামনে চলো!”
“না, এখানেই আসতে বল।”
প্রাণেশা ওর বান্ধবীকে কল দিয়ে বাইরে বের হতে বলল। প্রাণেশা এসেছে শুনে সুবহা খুশি হয়ে যেভাবে ছিলো সেভাবেই বের হয়ে এলো। প্রাণেশা সুবহাকে দেখে হেসে জড়িয়ে ধরলো। সুবহা বলল,
“এই কিরে বাহিরে কেনো ভিতরে চল! আর তোর সাথে কে এসেছে?”
এই বলে সুবহা গাড়ির ড্রাইভিং সিটে তাকিয়ে সৌরভকে না চিনে প্রাণেশাকে বলল,

“এই ড্রাইভার আংকেলকে নিয়ে ভিতরে আয়।”
এই শুনে সৌরভ নাক-মুখ কুঁচকে নিলো। কি যে রাগ উঠছে বলার বাহিরে। প্রাণেশা ফিক করে হেসে দিলো। সৌরভ বাহিরে বের হয়ে সুবহাকে ধমক দিয়ে বলল,
“এই মেয়ে এই চোখ কি কপালে নিয়ে ঘুরো? আমাকে কোনদিক দিয়ে আংকেল মনে হয় তোমার?”
প্রাণেশা বিড়বিড় করে বলল,
“সুবহা এটা আমার ভাই। তু্ই না দেখে কি বলে ফেললি, দেখিস এখন কি রাগ দেখায়।”
সুবহা জিভে কামড় দিয়ে বলল,
“সরি আসলে বাহিরে থেকে বুঝতে পারিনি।”
সৌরভ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে প্রাণেশাকে বলল,
“এই তোর হলো? চল! এরপরে দেখি আবার কই যাস! পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।”
প্রাণেশা সুবহাকে গিফট বক্সটা দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। সৌরভ গাড়িতে উঠার আগে আশেপাশে আরেকবার তাকিয়ে উঠল। এরপরে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
“এমন দিনকানা বান্ধবীর সাথে থাকিস দেখেই তো এমন হচ্ছিস। ওর সাথে থাকা বন্ধ তোর।”
“কেনো? আর ওকে দিনকানা বলছো কেনো?”
সৌরভ দাঁত চেপে বলল,

“দিনে-দুপুরে তোর ভাইকে আংকেল বলল শুনিসনি?”
“শুনেছি। কিন্তু ও ভুল করে না দেখে বলে ফেলেছে।”
সৌরভ হিতাহিত রেগে গিয়ে বলল,
“এই গাড়ি থেকে নাম তো!”
প্রাণেশা জুতো খুলে সিটে পা তুলে বসে বলল,
“না নামবো না, বাবাকে বলে দিবো।”
“বলে দিবি? এখনই বলে দে? আর গাড়ি ময়লা করবি না পা নামা। নিজের টাকায় কিনেছি। তোর বাপ দেয়নি।”
প্রাণেশার চোখ গেলো বাহিরে ফুচকার স্টোলের দিকে। ভাইয়ের সাথে ঝগড়া বাদ দিয়ে হেসে বলল,
“ভাইয়া, ও ভাইয়া শোনো না ফুচকা খাবো।”
সৌরভ ব্যাঙ্গ করে বলল,
“কেনো এখন গিয়ে বাবাকে বল! খুব তো বাবা বাবা করিস।”
এদিকে সুবহা এসে স্নিগ্ধকে একটু আগের ঘটনাটা বলতেই স্নিগ্ধ না হেসে পারলো না। অতঃপর সুবহার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“একটু দেখেশুনে কথা বলিস নাহলে জনগণের হাতে মার খাবি।”

প্রাণেশা আগে ভার্সিটিতে এসে পৌছালো। ফোনটা বের করে সুবহাকে মেসেজ দিতে দিতে নিজের ক্লাসের দিকে গেলো। সামনে পড়লো হামিম, দেখতে-শুনতে ভালোই। প্রাণেশাকে দেখে হাই তুলে বলল,
“এই প্রাণেশা!”
প্রাণেশা দাড়ালো। হামিম সামনে এসে বলল,
“কেমন আছো?”
“জি ভালো। আপনি কেমন আছেন স্যার?”
হামিমের স্যার শব্দটা মোটেও পছন্দ হলো না। তবুও হজম করে হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ভালো।”
এই সময় স্নিগ্ধ এলো। নিজের কলিগের সাথে প্রাণেশাকে কথা বলতে দেখে বিরক্ত হলো। বলতে গেলে জেলাস। কালকেও কথা বলেছে কিন্তু আমলে নেয়নি। তাই বলে প্রতিদিন?
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে খেয়াল করেনি। স্নিগ্ধ হনহন করে ওদের ছাড়িয়ে যেতেই, প্রাণেশা দেখলো ওকে। স্নিগ্ধ না তাকাতে প্রাণেশার রাগ হলো।

সুবহাও এলো। প্রাণেশা ওর সাথে ক্লাসে এলো। শুরুতেই স্নিগ্ধর ক্লাস ছিলো। ও ক্লাসে এলো। প্রতিদিনের মতো আজও কয়েকটা মেয়ে স্নিগ্ধকে দেখে কানাঘুষা করতে লাগলো। অবশ্য হ্যান্ডসাম কিনা। তার উপরে এতো ফিটফাট হয়ে আসবে। প্রাণেশা মনে মনে বলল, “স্টুডেন্ট পড়াতে আসবে এতো সেজেগুঁজে আসার কি দরকার? ইচ্ছে করছে মেয়ে কয়টার মাথা ফাটাতে।”
প্রাণেশা দাঁত চেপে বসে রইলো। স্নিগ্ধ একবারের জন্য ওর দিকে তাকায়নি। দিব্বি অন্য স্টুডেন্টদের দিকে তাকিয়ে ক্লাস করালো।
স্নিগ্ধ ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে যেতেই প্রাণেশাও সুবহাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। ক্লাস করার কোনো মুডই নেই। ওরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে ক্যান্টিনে এলো। দূর থেকে স্নিগ্ধ ওদের দেখছে।
একটু পরে স্নিগ্ধ নিজে নিজেই ভাবলো, প্রাণেশার সাথে কি বেশি এগো দেখিয়ে ফেললো নাকি? আর দেখাবেই না কেনো, প্রতিদিন তাকিয়ে থাকলে, কোনদিন আবার হেসে ফেলবে তখন! এখানে স্টুডেন্ট হিসেবেই ওর দিকে তাকাতে হবে। এরপরে বাহিরে প্রেমিকা হিসেবে।
স্নিগ্ধ কল দিলো প্রাণেশাকে। সুবহা গিয়েছিলো খাবার আনতে। সেই ফাঁকে প্রাণেশা কলটা রিসিভ করলো। স্নিগ্ধ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“ক্লাস বাদ দিয়ে ঘুরছো কেনো?”
“এমনেই।”
“ক্লাসে এসো।”
“ইচ্ছে করছে না।”
স্নিগ্ধ শ্বাস ছেড়ে শুধালো,
“ধরো, আমাদের জীবনে এমন সময় আসে যখন তোমার একটা কাজ করতে নিজেরই ভালো লাগবে না, কিন্তু সেই কাজটা তুমি করলে অপর একজনের অনেক ভালো লাগবে। ঠিক তেমনই তুমি এলে আমার ভালো লাগবে।”
প্রাণেশা নিরেট হয়ে ভাবলো স্নিগ্ধর কথা। মুচকি হেসে কলটা কেটে দিয়ে উঠে দাড়ালো। সুবহা হাই তুলে প্রাণেশাকে ডাকলো।
“এই প্রাণেশা এদিকে আয়, কি খাবি বলে যা।”
“ফিরে আয় খাবো না।”
“কেনো?”
প্রাণেশা সুবহার হাত ধরে টেনে নিয়ে হাঁটা দিলো নিজেদের ডিপার্টমেন্টে। তিনতলায় এসে দেখলো সামনেই স্নিগ্ধ ফোনটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে দেখে একটু অবাক হলো কি, একটু আগে কোনো কথা না বলে কল কেটে দিয়ে ক্লাসে এসে পড়েছে।
প্রাণেশা স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ক্লাসে ঢুকলো। স্নিগ্ধও হেসে মনে মনে বলল,

“বাহ্, এতো বাধ্য হয়ে গেলে।”
সন্ধ্যার পরপর প্রাণেশা ড্রইং রুমে বসে গুনগুন করে গান গাচ্ছিলো আর ফোন স্ক্রল করছিলো, সাথে স্নিগ্ধর ফেসবুক আইডিটা ঘাটছিলো।
সৌরভ এসে ডাইনিং টেবিলে বসতেই প্রাণেশা ফোন রেখে সৌরভকে খোঁচা মেরে বলল,
“ভাইয়া বিয়ে করবে না? বুড়ো হয়ে যাচ্ছো তো! এখনই লোকে আংকেল বলে।”
সৌরভ রোকেয়া বেগমকে বলল,
“আন্টি আপনাকে যে বিড়াল মারার জন্য একটা লাঠি বানিয়ে আনতে বলেছিলাম সেটা বানিয়েছিলেন?”
রোকেয়া বেগম বললেন,
“হ্যা বাবা বানিয়েছি, একটু পরে এনে দেই।”
“ঠিক আছে।”
সৌরভ প্রাণেশাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,

“লাঠি এনে বিড়ালের বাচ্চার পিঠের ছাল তুলে ফেলবো।”
প্রাণেশা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল,
“হাহ, জীবনে প্রেম করতে পারলে না আর বোনকে মারার হুমকি দিতে ঠিকই পারলে।”
সৌরভ কপাল কুঁচকে নিয়ে বলল,
“এখানে প্রেম টানছিস কেনো ভাই? আর আমি কি বলেছি যে তোকে মারবো? বলেছি যে বিড়ালের বাচ্চাকে মারবো। এখন সেটা যদি তোর গায়ে লাগে আমার তো কিছু করার নেই। আর তোর দেখছি সাহস দিনদিন বাড়ছে। পারলে একটা প্রেম করে দেখা তো! দেখি ভাইয়ের উপর দিয়ে প্রেম করিস কেমনে?”
প্রাণেশা গাল ফুলিয়ে বলল,
“চ্যালেঞ্জ করছো?”
সৌরভ সম্মতি জানিয়ে বলল,
“হ্যা করলাম।”

প্রাণেশা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। এ কি ওর মায়ের পেটের ভাই। এতো ভালো হলো কি করে?
প্রাণেশার ভাবনার মাঝে এক বালতি জল ঢেলে দিতে সৌরভ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“যদি কোনো সময় দেখি কোন ছেলে তোর সাথে কথা বলতে আসে তাহলে তাকে খুন করে ফেলবো। আর তোর কলিজাটা দুভাগ করে ফেলবো।”
প্রাণেশা রাগে গটগট করে সিঁড়ির কাছে গিয়ে থামলো। আবার ভাইয়ের দিকে দাঁড়িয়ে বলল,
“জীবনে বউ পাবে না।”
সৌরভ উঠে দাঁড়িয়ে বাকা হেসে বলল,
“যা মন দিয়ে পড়াশোনা কর! আমি আর বাবা তোর জন্য সুদর্শন ছেলে এনে দিবো। প্রেম-টেম করার ইচ্ছা থাকলে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। ও….আর তোর ওই বান্ধবীর সাথে ঘোরা বন্ধ। খোঁজ নিয়ে দেখেছি ওই দিনকানা মেয়েটার বড় ভাইও আছে। তোদের ভার্সিটির লেকচারার।”
শেষের কথাটা শুনে প্রাণেশা ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো। সৌরভের চিন্তা-ভাবনা স্নিগ্ধ পর্যন্ত চলে গিয়েছে, সত্যিই অভাবনীয়।
প্রাণেশা মনটা খারাপ করে রুমে এলো।
ঘন্টাখানিক বাদে প্রাণেশা সেই মন খারাপ নিয়ে একটা টেক্সট স্টোরি দিলো। সেখানে শয়তানি করে লিখলো,

—মন ভালো নেই। ফুল পেলে ভালো হতো।
মিনিট পাঁচেক পরে সুবহা মেসেজ দিলো,
“কিরে কি হয়েছে? মন ভালো নেই কেন? কি ফুল চাস?”
প্রাণেশার এতো বর্ণনা করে বলারও মুড হচ্ছে না। ছোট্ট করে লিখলো,
“কালকে বলবো দোস্ত।”
সুবহা লিখলো,
“কি ফুল চাস বললি না তো?”
“গোলাপ।”
প্রাণেশা ফোনটা সুইচ অফ করে পাশেই রেখে দিলো। এদিকে এখন সুবহা হয়ে স্নিগ্ধ মেসেজ দিয়েছে প্রাণেশাকে। অতঃপর স্নিগ্ধ সুবহাকে ফোনটা দিয়ে বের হয়ে যেতে নিলে সুবহা জিজ্ঞাসা করলো,
“কোথায় যাচ্ছো ভাইয়া?”
স্নিগ্ধ বলল,
“তোর ভাবির মন ভালো নেই। ফুল দিয়ে মন ভালো করে আসি।”

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৪

রাত ১২ টা,
প্রাণেশা গভীর ঘুমে তলিয়ে। হঠাৎ ব্যালকনিতে কিছু একটার শব্দ হতেই ও ধরফড়িয়ে উঠে বসলো। মনে হচ্ছে কেউ পাথর ছুড়ে মারছে। প্রাণেশা একটু ভয়ে ভয়ে ব্যালকনিটা খুলল। ব্যালকনি থেকে সোজা নিচে তাকিয়ে দেখলো স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here