Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৭ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৭ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৭ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

নাওফিলের চোখে চোখ রাখাটা দীধিতির জন্য যে এত বেশি সঙ্কোচজনক আর লজ্জাজনক মনে হবে, সেটা তো আগে উপলব্ধি হয়নি! পুরো শেখ পরিবারের সামনে একা একদিকে বসে থাকাটা যতখানি নার্ভাস করছে দীধিতিকে, তার চেয়ে বেশি অস্থিরবোধ করছে নাওফিলের শান্ত, গাঢ় চাউনিতে আটকে। অপলক দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ রেখে দাদা মাহতাব শেখের পাশে সিনা টানটান করে বসে খুব ধীরে ধীরে কথা বলে চলেছে দাদার সঙ্গে৷ কী অনায়াসেই বারবার ওকে ভাবিজান বলে সম্বোধন করে যাচ্ছে! দীধিতির কাছে খুবই বিচ্ছিরি লাগছে সে ডাক।

-‘ভাইয়া খুবই চাপা স্বভাবের তা তো জানেনই সবাই। তাও সে যে সেদিন আব্বুর সামনে বিয়ে করার কথা, ভালোবাসার কথা বলেছিল সেটাই তো অবিশ্বাস্য লাগছে আমার কাছে৷ বাড়িতে জানায়নি কারণ, আপনাদের সামনে এভাবে বিয়ের কথাটা বলার মতো যতটা না ভীত ছিল, তার চেয়ে বেশি লজ্জা ছিল ওর। তাই সরাসরি ভাবিজানকে চলে আসতে বলে এখানে৷’
-‘ওসব ভালোবাসা বলে কিচ্ছু নেই, জাদ। দায়ে পড়ে বিয়ে করেছে আমার ছেলে। বেশি ভালো মানুষ হলেও যে বিপদ তা আমার উজবুক ছেলেটাই প্রমাণ করল! আমি মানি না ওই কোর্ট ম্যারেজ। ক্যানসেল করে দে ওই কাগজপত্র৷ মিহাদের বিয়ে মিলির সঙ্গেই হবে। আমি কথা দিয়ে ফেলেছি। এই বিয়ে না হলে শুধু আমার সাথে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া না, এই বাড়ির সম্মানও জড়িয়ে আছে। সকলে মিলে সেদিন মিলিকে দেখে এসেছি, জানিয়ে এসেছি তাওসিফের পূর্ণ সম্মতি আছে বিয়েতে। আমার পক্ষে এই বিয়ে ভাঙা অসম্ভব।’ রত্না জানালেন নিজের মতামত।

তখনই ইয়াসিফ বলে উঠল, ‘আমার সঙ্গে বিয়ে করিয়ে দাও, আম্মু। মিটে যাবে ঝামেলা। কী আশ্চর্য! তোমার এত টেনশনে পড়ার কী আছে আমি থাকতে?’
সকলের চোখে আড়ালে তাওসিফ তখন পা থেকে জুতো খোলার ইশারা করে দেখাল ইয়াসিফকে৷ তাতে ইয়াসিফ আরও সাগ্রহে জানাল, ‘আরে আমি ওর চেয়ে হ্যান্ডসাম আছি বেশি। মিলি চিলি আমাকে দেখলে আর দিন দুনিয়া মনে করতে পারবে না।’
ঠোঁট কামড়ে ধরে তাওসিফ রক্তচক্ষু নিয়ে চেয়ে থাকলেও ইয়াসিফ আর তাকালই না ওর দিকে। নাওফিলের হাসি পেলেও এমন মুহূর্তে হাসা ভালো দেখাবে না বলে চুপ করেই রইল। আর দীধিতি তখন ইয়াসিফের দিকে অদ্ভুত কিছু দেখার মতো হতবাক অভিব্যক্তি নিয়ে চেয়ে আছে।
জাকির বললেন, ‘কথাগুলো তুই মজা করে বললেও এমনটা আমাদের মাথাতে আরও আগেই এসেছিল। কিন্তু তোর মতো জামাই মিলি চায় না। ও ধার্মিক, পর্দানশীল মেয়ে। তাওসিফকে পছন্দ করেছিল কারণ তাওসিফ কিছুটা ওর মানসিকতার মতোই। আবার ব্যাঙ্কের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছে শুনে আরও বেশি আগ্রহী হয়েছে ওর প্রতি। তাই তোর সঙ্গে একেবারেই এই মেয়ে যায় না।’

-‘ও, তাহলে আর কী? আমার বেচারার মন্দ ভাগ্য৷ জাদের সঙ্গেই তাহলে ফিক্স করে দাও। মিলি তালি জাদকে না করতে পারবে না নিশ্চয়ই?’ মন খারাপের গলায় বলল ইয়াসিফ।
মাহতাব শেখ হঠাৎ ধমকে উঠলেন ওকে, ‘আহ্! বারবার নাম বিকৃতি কেন করছিস? জানিস না নাম বিকৃতি করা উচিত না?’
-‘এই তুই ঘরে যা তো! তোর এই আলোচনায় থেকে টেনশন নিতে হবে না। যা সর এখান থেকে।’ তাওসিফও বড়ো এক ধমক দিয়ে বলল ইয়াসিফকে।
ইয়াসিফ নাওফিলের পাশেই বসে ছিল। নাওফিল নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘তোর এই পাছায় আঙুল দেওয়া স্বভাব যাবে না?’
-‘কার পাছায় আঙুল দিলাম কখন?’ নাওফিলের মতো করেই জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ।
-‘বাদ দিলি কাকে দিতে? একবার মিহাদ ভাই’র পিছে লাগছিস আরেকবার আমার। ঘরে গিয়ে তোর নিজের পাছায় নিজে দিয়ে বসে থাক, যাহ।’

জাহিদকে মাহতাব শেখ বলছেন তখন, ‘এ বাড়িতে বিয়ের ব্যাপার কোনোদিনই স্বাভাবিকভাবে ঘটেনি৷ শুধু তোর বিয়েটা ছাড়াই। এখন ওরা দুজন নিজেদের সম্মতিতে এক সঙ্গে থাকতে চাইলে আমাদের বাধা দিয়ে লাভ কী? কোর্ট ম্যারেজ কোনো বিয়ের মধ্যেই পড়ে না। তাই ওদের কাবিন, কবুল করে বিয়ে করানোর ব্যবস্থা যত দ্রুত করে ফেলা যায় ততই ভালো। আর মিলির বাড়িতে তোরা গিয়ে দাওয়াত খেয়ে তখন কথা দিয়ে এলেও বিয়েটা তো আর হয়ে যায়নি? বিয়ের আসর থেকে কত বিয়ে ভেঙে যায়! তাই ওদিকের চিন্তা করে দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের মতের বিরুদ্ধে যাওয়া সুবিবেচকের মতো কাজও হবে না। তাওসিফ নিজে গিয়ে সরাসরি মাফ চেয়ে আসবে মিলির বাড়ি থেকে। এই দায়টা ওরই।’
দীধিতিকে বলল তারপর, ‘তোমার পরিবারকে আসতে বলো কালই। কথাবার্তা বলে বিয়ের দিন ঠিক করতে হবে।’

কথা শেষ করে মাহতাব শেখ উঠে পড়লেন। ব্যক্তিগত সহকারীকে সাথে নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন বাইরে। রত্না তখন কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন সিঁড়ি বেঁয়ে উপরে। কেউ একবার তার আর তার বান্ধবীর সম্পর্কের কথাটা ভাবল না বলে খুবই কষ্ট পেয়েছেন তিনি। জাহিদ তখনও বসে ভাবনায় মশগুল। জান্নাতি বেগম খুশিকে বললেন তার সঙ্গে ঘরে যেতে। হাদিস কিতাব পড়ে শোনাতে বলবেন বড়ো বউকে। ফিহাও আর দাঁড়িয়ে থাকল না। সে চলে গেলে জাকির বললেন তাওসিফকে, ‘ওকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আয়, মিহাদ।’
দীধিতি উঠে জাহিদকে আর তাকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে এলো বাসা থেকে। ইয়াসিফ তখন এসে তাওসিফকে বলল, ‘তোর কাছে মিলির নাম্বার আছে? থাকলে দে তো। দেখি পটানো যায় না কি শালিকে! ওও… স্যরি মিলিকে… টেলিং বায় মিসটেক। হা হা!’
জাহিদ আর জাকির দুজনই চলে গেছেন উপরে। তাই এবার আর বাধা নেই। এক মুহূর্ত দেরি না করে তাওসিফ পা থেকে জুতোটা খুলে নিয়ে তেড়ে গেল ইয়াসিফের দিকে। ইয়াসিফও দাঁড়িয়ে রইল না। লম্বা পা জোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল। তবুও থামল না তাওসিফ… ওর পিছু পিছুই দৌঁড়ল।

নাওফিল সোফায় হেলে বসে চেয়ে ছিল দীধিতির যাত্রাপথেই। সবাই চলে গেলে ও বেরিয়ে পড়ল বাসা থেকে। এসে দেখল বাগানের কাছটায় দাঁড়িয়ে আছে দীধিতি কানে ফোন নিয়ে। কথা বলছে কারও সাথে। পেছন থেকে কারও হেঁটে আসার আওয়াজ পেয়ে ঘুরে দাঁড়াবার আগেই ওর কব্জি চেপে ধরে বাগানের ভেতরের দিকে নিয়ে এলো ব্যক্তিটি। কামিনী গাছের পেছনে এসে ছেড়ে দিলো ওর হাত নাওফিল। দীধিতি দুরুদুরু বুকে নিজের সে হাতটা চেপে ধরে অনিমেষ দেখতে থাকল নির্মল সাদায় আচ্ছাদিত রূপবান ছেলেটিকে।
গোধূলি লগ্ন। বিশাল বাগানের ভেতরে পাখির জোরাল কলতান। ওরা দুজন বাগানের অতটা গভীরেও যায়নি। বাড়ির জানালাগুলো বাগানের এদিকটাতেই বেশি। সে জানালাগুলো থেকে ওদের দুজনকে যাতে চোখে না পড়ে, এমন অবস্থানেই দাঁড়িয়ে ওরা।

-‘ভাবিজান! চলেন আমি আপনাকে পৌঁছে দিই। আমার আর আপনার মধ্যে খুব মিষ্টি একটা সম্পর্ক হতে চলেছে অতি শীঘ্রই। তার সেলেব্রেশনটাও করব আমার সেই ফ্ল্যাটে। সবাই থাকবে৷ আপনি আমার বড়ো ভাই, আপনার বান্ধবী, আমার বন্ধু, সবাই। এই তো সন্ধ্যা সাতটায় আরম্ভ হবে৷ যাবেন তো আমার সঙ্গে? ভাইয়া বোধ হয় আর বের হবে না এখন। একদম পার্টি টাইমে উপস্থিত হবে। এখন সে চাচিকে সামাল দেবে একটু।’ প্রাণবন্ত হাসি নাওফিলের সুন্দর চেহারা জুড়ে।
দীধিতি এদিকে কথা হারিয়ে ফেলেছে, কী অভিব্যক্তি প্রকাশ করা উচিত তাও বুঝে পাচ্ছে না। এলোমেলো লাগছে নিজেকে, নিজের দেহের ভেতরের অশান্ত মনটাকেও। কথারা সেখানে সাজানো গোছানো হবে কী করে তাহলে?
নাওফিল তা হয়ত চট করেই বুঝে ফেলল। আর তাই এবার সরাসরি মূল প্রসঙ্গে এগোলো, ‘থ্যাঙ্কস জানান আমাকে, স্মরণ ভাবি। কত কথা খরচ করে অবশেষে আপনাকে আমার ভাবি করতে পেরেছি! কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করেই চলে যাচ্ছিলেন?’

-‘থ্যাঙ্কস নেওয়ার জন্য এভাবে ঘুপচি ঘাপচির মধ্যে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য কী?’
-‘উদ্দেশ্য? ওটা তো আমি জিজ্ঞেস করব। কী উদ্দেশ্য ভাবিজান?’
-‘স্কিপ করুন। ভাবিজান শব্দটা একদম স্কিপ করবেন। যেটা মন থেকে নিতে পারবেন না সেটা নিয়ে ঠাট্টা করাও নিতে পারব না আমি।’ রেগে গিয়ে বলল দীধিতি।
নাওফিল হাসিটা মুখে ঝুলিয়েই শুধাল, ‘আপনি মেনেছেন তো আমাকে? দেবরজান হিসেবে?’
কোনো জবাব না দিয়ে দীধিতি মুখ ঘুরিয়ে রইল। নাওফিল আচমকা অবাক কণ্ঠে বলল, ‘তাহলে আপনার উদ্দেশ্য ছিল মূলত আমার ভাই? আমাকে দেবর বানানোই তাহলে আপনার উদ্দেশ্য ছিল?’ তারপর বিষণ্ন সুরে বলতে থাকল, ‘ইসরে! কী বোকা আমি! মাঝখান থেকে আমি আরও ভেবেছিলাম আপনি আমার প্রেমে পিছলে গেছেন৷ যখন তখন আমার সামনে এসে দাঁড়াতেন, আমার অসুস্থতাতেও ছুটে চলে আসতেন, রান্নাবান্না করে দিয়ে যেতেন, ফোনে খোঁজ খবর নিতেন। যত্ন করার চেষ্টা করতে আমাকে অনেক। এসব যে দেবর ভেবে করতেন সেটা আমাকে বললে ভালো হত না? তাহলে আমার এইটুকু মনটা ভেঙে যেত না!’
-‘ফাজলামো করার মুডে নেই। ফিরব আমি। তাওসিফ কি আসবেন না কি আমি একাই যাব?’
-‘আপনার বর আপনি কল করে জেনে নিন।’ বলেই নাওফিল বাগান থেকে বেরিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। কয়েক পা এগিয়েও গেল। কিন্তু পিছু ডাক আসতে পারে তা আশাতীত ছিল।
-‘নাওফিল? আপনি যতটা সাহায্য আজ করলেন, আগামীতে ততটাই কঠিন কিছু ভেবে রেখেছেন আমার জন্য। তাই না?’

পিছু ফিরে কথাগুলো শুনে নীরবে এগিয়ে এসে দাঁড়াল নাওফিল ওর কাছে, ‘কেন কঠিন হব? আপনার আর ভাইয়ার বিয়েটা তো অ্যাক্সিডেন্ট, তাই না? তাহলে কঠিন কেন হব আমি? আপনি কি আমার প্রাক্তন? আমাকে ধোঁকা দিয়ে আমার ভাইকে বিয়ে করেছেন, এমন কিছু? তাহলে কঠিন হব কেন?’
-‘আমি সত্যিই দু’টো উদ্দেশ্যে এ বাড়িতে এসেছি।’
-‘বাবা! সরাসরি স্বীকার করে নিলেন, ভাবিজান? তা কী উদ্দেশ্য দুটো? বাবার হত্যাকারী কে বা কারা, তা জানতে? আর তারপর জেনে তাদেরকে হত্যা করবেন? তাহলে আমাকেই খুন করতে এসেছেন আপনি!’
দীধিতি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ল, রেগে গিয়ে বলল, ‘ভাবি ডেকে পিঞ্চ করা বন্ধ করবেন? আপনাকে কেন খুন করতে আসব?’
-‘কারণ, তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী তো আমিই।’
-‘আপনি আমার বাবার মৃত্যুর সময় পাঁচ বছরেরও ছিলেন না। আপনি কেন দায়ী হবেন?’
নাওফিল এ প্রশ্নে একটু হাসে। সে হাসিই বুঝিয়ে দেয়, অনর্থক কথা বলেনি সে। তার মানে সত্যিই নাওফিল দায়ী? দীধিতি জিজ্ঞেস করে উত্তেজিত গলায়, ‘আপনি জানেন তাহলে বাবাকে কে মেরেছে? আপনার নিজের বাবা, তাই না? জায়িন মাহতাব?’
-‘কিন্তু আমার আব্বু তো নিখোঁজ৷ তাকে সারা দুনিয়ার পুলিশ খুঁজেই পেল না। তুমি কী করে পাবে? তাহলে কি তুমি তার বদলে আমায় মেরে যাবে? যেহেতু আমিই দায়ী তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য?’
-‘চুপ করুন! আমি কাউকেই খুন করতে আসিনি।’ নজর লুকিয়ে চেঁচিয়ে উঠে বলল দীধিতি।
নাওফিল তখন ওকে কাছে টেনে মৃদু হেসে বলল, ‘আমার চোখে চোখ রেখে গলাবাজি করার সাহস নেই? আমার দিকে তাকাও, স্মরণ। আমার চোখে চেয়ে বলো আমাকে খুন করতেই তুমি শেখ ভিলায় প্রবেশ করেছ।’
-‘না, জীবনেও তাকাব না তোমার চোখে আমি। বোকা পেয়েছ আমাকে? আমি তাকাব আর অমনি তুমি হিপনোসিস করে নেবে আমাকে? আমার পেট থেকে কথা বের করার উদ্দেশ্যে!’ মুখ ফিরিয়ে জিদ্দি কণ্ঠে বলল দীধিতি।

নাওফিল ঠোঁট চেপে হাসে, চোখের কোন কুঁচকে আসে সে সময়। ছোটো ছোটো চোখদুটো আরও ছোটো হয়ে আসে তখন। তাতেও কী ভীষণ রূপবান আর কমনীয় লাগে মুখখানি। কোনাচে চোখে তা দেখে স্মরণ, লুকিয়ে লুকিয়ে। আর তার চুরি ধরে ফেলতেই নাওফিল আরও হাসে, ঠোঁট ছড়িয়ে নিঃশব্দে হাসতেই থাকে। ধরা পড়ে যেতেই বিব্রত হয় স্মরণ সাংঘাতিক। ওর পেছন থেকে সামনে এসে দাঁড়াল নাওফিল খুব কাছাকাছি, ‘আমি তো শুধু দেখতে চাই নির্ভীক, বেপরোয়া আর সৈনিক রূপের স্মরণ কঠিন চোখে আমার দিকে চেয়ে দৃঢ় সুরে বলছে, ইয়েস, আই ওয়ান্ট টু ডেসট্রয় য়্যু, নাওফিল।’
চোখ বুজে দীর্ঘ এক শ্বাস টানল দীধিতি। মুখ তুলে নাওফিলের কথা মতোই ওর চোখে চোখ রাখল অবশেষে। সঙ্কোচে ওর বিহ্বলতা। মনের ভুলে কখন যে নাওফিলকে তুমি সম্বোধন করে ফেলেছে সে খেয়ালও নেই। মৃদু তৈলাক্ত লালচে ফরসা মুখটাই নাওফিলের ওই ঘোরাল চাহনির চোখজোড়ার ভাষা বোঝার এই এক জীবনেরই সাধ ভীষণ দীধিতির। সে সাধ বুঝি আর এ জীবনে পূরণ হবে না। আরও ভীষণ সাধ ঢেউ খেলানো চুলে অর্ধ কপাল ঢেকে থাকা নাওফিলের ওই ছোট্ট কপালের মাঝে ঠোঁটদুটি ছুঁইয়ে রাখার, ভ্রু জোড়ার মাঝে আর নাকের ডগার বিন্দু বিন্দু ঘাম সোহাগের আঁচলে মুছে দেওয়ার, বুকের গহনে সেধিয়ে থাকা নিজের ভীত, বন্দি অনুভূতিকে প্রশ্রয়ে উড়িয়ে দিয়ে তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠযুগলে একটিবার নাওফিলের অধর মাঝের উষ্ণ, ভেজা আদর পাওয়ার। হবে না, এ জীবনে আর হবে না সে সাধ পূরণ!

-‘তুমি আমাকে মারতেই তো শেখ ভিলায় এসেছ, স্মরণ ভাবি। নইলে কি আর আমার ভাইয়ের বউ হতে চাইতে?’
-‘প্লিজ নাওফিল, ভাবি ডাকা বন্ধ করো। বিয়েটা হওয়ার পরই না হয় ডেকো। আর আমি জানি সেদিন কোর্ট ম্যারেজটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল৷’
নাওফিল হাসতে হাসতে গলায় পরে থাকা সাদাটে লম্বা চেইনটাই লাগানো গোল রিংটা আঙুলের মাঝে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল, ‘কিন্তু কাবিন কবুল আর মিথ্যা হবে না। ভয় নেই, এবার বিয়েটা হবেই। শেখ পরিবারের বধূ তোমাকে বানিয়ে দেব, তুমি নিশ্চিন্তে থাকো স্মরণ…ওহ না, দীধি। স্মরণ তুমি আমার ভাইয়ের জন্য৷ আমার জন্য না হয় দীধিই হও। তবে চাইলে যখন তখন আমাকেও তুমি পেতে পারো। যেমন এই মুহূর্তেই চাইলে আমার ঠোঁট ছুঁতে আসতে পারো, কাউকেই বলব না। কিস মি, দীধি।’ শেষোক্ত কথা নাওফিল ওর মুখের খুব কাছে এসে মন্থর গলায় বলল, খুবই কোমল করে।

দীধিতি হয়ত বাস্তবেই নেই। ও কোথাও একটা হারিয়ে গেছে হঠাৎ করেই। একটু আগেও যা ওর কাছে অধরা মনে হচ্ছিল, পাওয়া হবে না বলে আফসোস হচ্ছিল। খানিক আশকারাতেই সব আফসোস উবে গেল কি? তৃষ্ণার্ত কাক পানির সন্ধান পেলে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারায়, দীধিতিরও কি তাই হলো? চোখের পলকেই অধৈর্য দীধিতি জলে ঝাঁপ দেবার মতোই অকস্মাৎ নাওফিলের ঠোঁটদুটোই পতন ঘটাল নিজের। তারপর? হঠাৎই প্রবল ধাক্কায় দূরে সরে এলো সে।
-‘কী করলে তুমি? তুমি না আমার ভাবি হতে যাচ্ছ, দীধি?’ প্রচণ্ড অসন্তোষ গলায় আর্তনাদ করে উঠল নাওফিল।
দীধিতি অবুঝ চোখে চেয়ে থাকে৷ একটু আগের কোনো কিছুই যেন খেয়ালে নেই ওর, ‘কী হয়েছে? কী করেছি আমি?’

-‘য়্যু কিসড মাই লিপস।’ মৃদু চিৎকারে বলল ও।
দীধিতি বিস্ফুরিত চোখে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে আকস্মিক ধেয়ে এসে নাওফিলের বুকে ধাক্কা মারল, চিৎকার করে উঠল, ‘তুমি আমাকে হিপনোসিস করে নিয়েছিলে, ব্লাডি রাসকেল! নোংরা ছেলে! শয়তান, বেয়াদব!’
তবে শেষের গালিদুটো দেওয়ার সময় নাওফিল ওকে জাপটে ধরে মুখ চেপে ধরল, ‘তুমি ছোঁচার মতো আমার ঠোঁট দেখছিলে কেন? য়্যু গ্রিডি, ক্যাডিশ গার্ল! শেইম অন য়্যু!’
দীধিতি ওর বাহুবন্ধনীতে ছটফট করতে করতে বলল, ‘একদম মেরে মুখ লাল করে দেব, বেয়াদব পুরুষ! তাকিয়েছি বলে কি খেতে চেয়েছি?’

শেষ কথাটায় নাওফিল একটু থমকানো ভঙ্গিতে চেয়ে থেকেই তারপর ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল। দীধিতি সে হাসি দেখে নিজের ঠোঁটকাটা কথাটা মনেমনে পুনরাবৃত্তি করে বেশ লজ্জা পেল। হ্যাঁ, ও তো এমন কিছুই জীবনে না পাওয়ার আফসোসে একটু আগেও কষ্ট পাচ্ছিল৷ ঝোঁকের বশে সেটাই প্রকাশ করে ফেলল। তাই বলে ওকে এভাবে বেইজ্জতি করল শয়তানটা!

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৭

নাওফিলের হাস্যরত মুখটা কটমট চাউনি দেখতে দেখতে সজোরে ওর পায়ে পাড়া দিয়ে ধাক্কা মেরে বসল। তবে নাওফিল বিকারহীন। আর একটি মুহূর্তও ওখানে দাঁড়াল না দীধিতি। সে যেতেই নাওফিল এক হাতে পা আর আরেক হাতে মুখ চেপে ধরে ব্যথায় চিৎকার করে উঠল।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here