আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি
ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতেই সাতটা বেজে গেছে দীধিতির। নাওফিল তাদের বাসার একটি গাড়িতে করেই ওকে ড্রাইভারের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল। একটা চুমুর বিপরীতে তার পায়ের বৃদ্ধা আঙুলটা ভালোভাবেই জখম হয়েছে তখন৷ সেখানে রক্ত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে তারপর গোছগাছ করে রওনা হয় তাওসিফকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে। রাত আটটায় এসে পৌঁছে যায় তারা। অনুপমার বাসার গলিতে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নাওফিল তাওসিফকে বলে, ‘তুই তোর বউকে নিয়ে আয়। আমি গাড়িতেই বসি।’
সম্মতি জানিয়ে গাড়ি থেকে তাওসিফ নামতে গিয়েও হঠাৎ কী মনে করে থেমে যায়, নাওফিলের কাছে এগিয়ে আসে। তা দেখে নাওফিল ভ্রু নাচিয়ে ব্যাপার কী বোঝাতেই তাওসিফ ভাবনাতীত ওর শার্টের দুটো টপ বোতাম খুলে দেয়। অদ্ভুত চাউনিতে তাওসিফের এ কার্যকলাপ দেখে নাওফিল ধমকায়, ‘এসব কী? বোতাম খুলে দিলি কেন?
হালকা লোমে আবৃত প্রায় অর্ধ বুক উন্মুক্ত দেখা যায় নাওফিলের৷ সেদিকে একবার তাকিয়ে তাওসিফ হেসে বলল, ‘কেন দিলাম বুঝতে পারবি একটু পরেই। লাগাবি না কিন্তু বোতাম, আমি না আসা অবধি।’
ও চলে যেতেই নাওফিলের ফোন বেজে উঠল। শিহাব কল করেছে। কথা বলতে বলতে গাড়ি থেকে নেমে এসে বাইরে দাঁড়ালে শিহাব ফোনের ওপাশ থেকে জানায়, ‘তন্বী কী বলছে জানিস? দীধিতি যদি তাওসিফকে সত্যিই বিয়ে করতে পারে, তাহলে ও বিশ্বাস করবে দীধিতিকে ও চিনতেই পারেনি কোনোদিন।’
নাওফিল কথাটা শুনে ইষৎ হাসে। গাড়ির খোলা দরজাটার ওপর এক হাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ‘তন্বীকে জানা, দীধিতিকে সে কোনোদিনই চেনেনি। এ ব্যাপারে কোনো ডাউট না রাখতে।’
-‘দীধিতি নিজেই জানাক। আমাদের মধ্যে এসব নিয়ে কথা উঠলেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। না না, ঝগড়া আন্দোলন।’
দুজনের মধ্যে কথার মাঝেই তাওসিফকে ফিরে আসতে দেখা গেল। ওর পেছনে সালোয়ার-কামিজ পরিহিত দুজন নারী অবয়বও দেখা যায়।
গাঢ় নীল টি শার্ট আর কালো ডেনিম জিন্স প্যান্ট পরনে তাওসিফকে দেখে আজ দীধিতি একটু চমকেছিলই। পরিচয়ের পর থেকে এই ছেলেটিকে ফর্মাল শার্ট, প্যান্টে ছাড়া কখনও দেখা হয়নি বলেই আরকী! বেশ অন্যরকম সুন্দর লাগছে ওকে। তামান্না তো ইতোমধ্যে কতবার দীধিতিকে খোঁচা মেরে ইশারায় তাওসিফকে দেখিয়ে ফিসফিস করে বলেছে, ‘নাওফিলকে ভুলতে বেশি সময় লাগবে না রে বোন! বিয়ের পর তাওসিফের প্রেমেই হাবুডুবু খাবি দেখিস।’
জেল দিয়ে আজ একটু ভিন্নভাবে চুলগুলো এক পাশে সিঁথি করেছে বলে পুরো চেহারাটাই যেন বদলে গেছে তাওসিফের। মেয়েদের চোখে ভালো লাগার মতোই অবশ্য চেহারা ওর। এতদিন অত গাঢ়ভাবে খেয়াল না করলেও আজ করতেই হচ্ছে দীধিতিকে। যদি তামান্নার কথা মতো সত্যিই নাওফিলকে ভুলে যেতে পারে সে তাওসিফের সৌন্দর্যে আর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে, তাহলে ওর চেয়ে খুশি আর কে হতে পারে? নাওফিলকে অদূরেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল তখন। আর সে মুহূর্তেই দীধিতির বিবেক প্রশ্ন রাখল চুপিচুপি, ‘এ জীবনেও কি তা সম্ভব?’
ফোনটা কান থেকে নামিয়ে নাওফিল তামান্নাকেই আগে দেখতে পেল, মুচকি হেসে সৌজন্যতা রক্ষা করল দুজন দুজনের সাথে একটু কথা বিনিময় করে। দীধিতি তখন তাওসিফের পেছন থেকে পাশে এসে দাঁড়াতেই তাওসিফ ঝটপট গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে দিলো ওর জন্য। এতে দীধিতি সামান্য ভড়কাল বোধ হয়। নাওফিল উপস্থিত থাকতেই তাওসিফের পাশে বসে যেতে হবে ওকে কাপলদের মতো করে, এটা তো আসার সময় ভাবেনি!
নাওফিল কপট মৃদু হাসি ঠোঁটে রেখে বলল, ‘তাহলে তোদের স্পেসের জন্য ছেড়ে দিই আমরা। তামান্না আর আমি কাবাব মে হাড্ডি হয়ে কী করব? কী বলো তামান্না?’
তামন্না তৎক্ষনাৎই উত্তর দিতে পারল না। কারণ, সেও ভাবেনি জোড়া হয়ে যাবে দীধিতি তাওসিফের সঙ্গে। কয়েক পল দীধিতির দিকে চেয়ে থেকে তারপর নাওফিলের প্রশ্নে মুচকি হেসে সম্মতি জানাল, ‘হ্যাঁ, একদম ঠিক। তোরা রওনা হ, দীধিতি। আমি আর নাওফিল ভাই না হয় উবার করে আসছি।’
-‘আরে না না, আমরা এক সঙ্গেই যাব৷ নাওফিল, আর কথা বাড়াস না, উঠে পড় সবাই।’ বলতে বলতে তাওসিফ ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল।
নাওফিলও আর দাঁড়াল না। তামান্নার জন্য পেছনের দরজা খুলে দিয়ে সে একটু খুঁড়িয়ে হেঁটে গাড়ির ভেতরে এলো। কেউ লক্ষ করল না তখন, নাওফিল দীধিতির সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মুহূর্তে সেকেন্ডের জন্য স্পর্শ পেল দু’জন দু’জনের বাহুতে। সেই সাথে নাওফিলের শরীরে মাখানো বেলী ফুলের আতরের সুবাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করল দীধিতির ঘ্রাণেন্দ্রিয়তে। ঝিমঝিম করে উঠল মাথা তক্ষুনি। চোখের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তার ইদানীং। যার জন্য আজ-কাল কোনো সুঘ্রাণই নিতে পারে না সে। অস্বস্তি হয়।
ওদের গাড়ি চলতে আরম্ভ করল ব্যস্ত হাইওয়ে ধরে। চারজন মানুষের ভেতরে থেকে থেকে নানারকম গল্পই চলছে টুকটাক। কিন্তু দীধিতিকে মৌন থাকতে দেখা যাচ্ছে বেশি। কারণ, পেছনে বসা ঝকঝকে সাদা শার্ট আর ধূসর রঙা ডেনিমের প্যান্ট পরিহিত ঝলমলে, চমৎকার চেহারার ছেলেটা অত্যধিক মনোযোগ কাড়ছে ওর। এ পর্যন্ত অগণিতবার ফ্রন্ট মিররের ভেতর থেকে ওর দেখা হয়ে গেছে নাওফিলকে। তবুও মন ভরছে না৷ উপরন্তু শার্টের বোতাম খুলে রাখার দরুন মনটা আকৃষ্ট বেশিই হচ্ছে ওই খোলা বুকের জন্য। তাওসিফ পাশে থাকা সত্ত্বেও সে মানুষটা দীধিতির দৃষ্টিসীমার আড়ালে যেন চলে গেছে। চোখে-মুখে তার মিটিমিটির হাসির আভাসও তাই দেখতে পেল না দীধিতি।
তামান্না হঠাৎ গল্পের মাঝে নাওফিলকে বলে বসল, ‘তাওসিফ ভাইয়ার নতুন লুক না হয় দীধিতিকে চমকানোর জন্য বুঝলাম৷ কিন্তু ভাইয়া আপনার এত্ত মাঞ্জা মারার ঘটনা কী? পার্টিতে কি আমরা ভাবির খোঁজ পাবো না কি আজ? হুঁ?’
নাওফিলের তখনই খেয়াল হলো ওর শার্টের বোতামগুলো অর্ধেকই খুলে রাখা। একটু মেজাজ খারাপ নিয়ে সে সময় সামনে বসা তাওসিফের দিকে তাকাতে গেলেই ফ্রন্ট মিররে অলক্ষিত সুন্দর নারী দৃষ্টিজোড়াতে চোখ পড়ল ওর, চেয়ে দেখছে যে ওকেই। না কি কখন থেকে চেয়েই ছিল খেয়াল করেনি সে! সিটে মাথাটা এলিয়ে দিলো নাওফিল দীধিতির চোখে চোখ রেখেই। দীধিতি তখনও অনড়। তা দেখে নাওফিল একটু পরই ভ্রুজোড়া নাচিয়ে ইশারায় প্রশ্ন ছুঁড়ল ওকে, ‘কী হচ্ছে?’
অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল দীধিতি। চকিতেই বিমুগ্ধ দৃষ্টি হটিয়ে চোখ বুজে মুখটা ফিরিয়ে নিলো জানালার দিকে। কী এক দম বন্ধ হয়ে আসা অনুভূতি অনুভব হচ্ছে ওর! শার্টের ফাঁক গলে উঁকি দেয় খোলা বুক, গুটিয়ে রাখা হাতার জন্য চোখে প্রচণ্ড বিঁধে বলিষ্ঠ পুরুষালি হাতদু’টোও। আবার জেল মাখিয়ে ঢেউ খেলানো বড়ো বড়ো চুলগুলোর অমন ছড়ানো ছিটানো, এলোমেলো ঢং! কাকে দেখানোর জন্য আজ এত ঠমকী নাওফিলের? ভোরের শিশিরে ভেজা সবুজ ঘাসের মতোই খুব প্রাণবন্ত আর স্নিগ্ধ লাগছে তাকে দেখতে।
মনে হচ্ছে যেন সবে গোসল করে আর্দ্র চুল নিয়েই এসে বসেছে সে গাড়িতে। পুরুষ মানুষের সৌন্দর্য এত লালিত্যপূর্ণ হয়? এত বেশি পৌরুষপূর্ণ লাগলে যে তার মতো দুর্বল চিত্তের নারীর জন্য কঠিন বিপদ! তাকালেই যে মোহে আচ্ছন্ন হয়ে আসতে চাইছে চোখদুটো। তাই তো মিনিট দুয়েক না গড়াতেই জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার তাকাল দীধিতি। নাওফিল তখন মাথা একটু দুলিয়ে কী কথার উত্তর দিচ্ছে যেন তামান্নাকে। দীধিতি তাকানো মাত্রই সেও কথার ফাঁকেই তাকাল, আবার মিলন ঘটল আয়নার মাঝে দুজনের দৃষ্টিজোড়ার।
তাওসিফের যে উদ্দেশ্য ছিল আর তা যে পূরণও হয়েছে, সেটা নাওফিল কিছুক্ষণ আগেই টের পেল।
বুকের ঠিক মাঝখানে নাওফিলের সেই সাদা চেইনের সাথে ঝুলে থাকা গোল রিংটা নজরে আটকাল দীধিতির। এটার মাধ্যমেই তো খুব দ্রুত নাওফিল সামনের মানুষটিকে নিজের বশে আনতে পারে। অফিসার বাঁধনকেও সেদিন এভাবেই সম্মোহন করেছিল নাওফিল। এই রিংটার কী এমন ক্ষমতা আছে? না কি ক্ষমতাটা নাওফিলের? কেমন করে সে একজন মানুষকে সম্মোহন করে নিতে পারে? কথাটা জানতে ইচ্ছা করছে খুব দীধিতির। আর এর থেকে নিজেকে খুব সাবধানেও রাখতে হবে।
নাওফিল হাত রাখল বুকের কাছটায়, দীধিতিকে ওরকম নিষ্পলক বুকের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে। বোতামগুলো লাগাতে চেয়েও তখন লাগায়নি দুষ্টুমির বাহানায়। আয়নার মাঝে ওকে দেখতে দেখতে আবারও হঠাৎ ভ্রু নাচিয়ে খুব সাবধানে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে তারপর বুকের দিকে ইশারা করল সে। আর এবার ইশারাতে প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘কী? এখানে চুমু দিতে চাও?’
সে মুহূর্তেই দীধিতি চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার তাকাল ওর দিকে গরম চাউনিতে৷ নাওফিল তখনই অশালীন ইঙ্গিতে চোখ মেরে বসল। শুধু তাতেই ক্ষান্ত রইল না৷ মুচকি হাসতে হাসতে নিম্ন ঠোঁটে আঙুল বুলাল, ভ্রুজোড়া একটু উঁচিয়ে আবার দীধিতির ঠোঁটকেও ইশারা করল, চেহারায় অনুরোধের অভিব্যক্তি ধরে। তার ইশারাতে এবারের দুষ্টু কথাটা ছিল, ‘চুমু সুন্দর, আবারও একটা দিয়ো, হুঁ?’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৭ (২)
তখনের কথা পুনরায় মনে পড়তেই ঠোঁট চেপে ধরল দীধিতি। রাগের থেকেও অসম্ভব লজ্জায় মরিমরি লাগছে এবার ওর। সেই লজ্জা নিয়েই চেষ্টা করল নাওফিলকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়তে। তাতে নাওফিল পাত্তা দিলে তো! পরিবর্তে বুকের কাছ থেকে রিংটা আঙুলের ডগায় তুলে নিয়ে সে ঘুরানো আরম্ভ করল। বিদ্যুৎ গতিতে দীধিতি চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল ফের৷ নাওফিল হাসে তখন। তবে সে হাসি ঠোঁটে দেখা না গেলেও তার চোখে দেখা যায়।
