স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬২
সানজিদা আক্তার মুন্নী
আঠারো মিনিট। দীর্ঘ আঠারোটি মিনিট ধরে নাজহার শরীরে কোনো নড়াচড়া নেই, নেই কোনো প্রতিক্রিয়ার ক্ষীণতম আভাসটুকুও। বিছানার সাদা চাদরের উপর নিথর, নিস্পন্দ তার দেহ পড়ে আছে। অবিকল প্রাণহীন কোনো মোমপ্রতিমার মতো, যার ভেতরের সব আলো নিভে গেছে চিরতরে। তৌসির তো পাগল হয়ে গেছে, উন্মাদের মতো কাঁদছে। প্রেশার লো হয়ে তার অবস্থা খারাপ। ডাক্তার, নার্স থেকে শুরু করে সহকারী, উপস্থিত প্রত্যেকের মুখে এক অসহায় পরাজয়ের ছায়া। তারা প্রায় ধরেই নেন, নাজহা বুঝি আর ফিরবে না। বুঝি জীবনের সমস্ত হিসেব চুকিয়ে চলে গেছে সে অজানা কোনো দূরতর প্রান্তে।
কিন্তু বিধাতার লেখনী বুঝি ভিন্ন কোনো ছন্দে লেখা। ঠিক আঠারো মিনিটের মাথায়, যখন সবার বুকের ভেতর আশার শেষ প্রদীপটুকুও কাঁপতে কাঁপতে নিভে আসছিল, ঠিক তখনই এক অলৌকিক স্পন্দনে নাজহার বুকের খাঁচা মৃদু কেঁপে ওঠে। ফুসফুস দুটি ধীরে ধীরে ভরে নেয় জীবনের প্রথম বাতাস। ঠিক বহুদিনের শুকিয়ে যাওয়া নদীতে প্রথম জোয়ারের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ার মতো। তবু সেই শ্বাস ফেরাটুকুই শেষ কথা নয়। তার চেতনার দরজা তখনো বন্ধ, কোথাও বুঝি গভীর অন্ধকূপে আটকে আছে তার বোধ। পেরিয়ে যায় দীর্ঘ এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট।
লেবার রুম থেকে যখন তাকে সাবধানে রেস্ট রুমে স্থানান্তর করা হয়, তখন থেকে এই পর্যন্ত তৌসির ঠিক তার পাশটিতে তার হাতখানি নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বসে আছে। তার মনে হচ্ছে এই স্পর্শের শক্তিতেই সে তার প্রিয়তমাকে অজানা সেই অন্ধকার থেকে টেনে আনবে। গত দু’টি ঘণ্টায় নিজের সদ্যজাত সন্তানদের মুখখানি পর্যন্ত দেখার সুযোগ হয়নি তার, একটিবারের জন্যও না। পিতৃত্বের সমস্ত আনন্দ, সমস্ত কৌতূহল, সমস্ত প্রথম স্পর্শের লোভ সবকিছুকে সে তুচ্ছ করে দিয়েছে। তার সমস্ত অস্তিত্ব এখন নাজহার পাশে বাঁধা, নাজহার পাশ থেকে এক চুলও সরে না সে।
অবশেষে নাজহার চোখের পাতা মৃদু কেঁপে ওঠে, ঠিক প্রজাপতির ডানার মতো অসহায় কাঁপুনির মতো। তার জ্ঞান ফেরে অতি ধীরে, পরতে পরতে। মনে হয় বহু যুগ পর কোনো নিদ্রিত আত্মা ফিরে আসছে দেহের আঙিনায়। কিন্তু এই ফিরে আসা কোনো স্বাভাবিক জাগরণ নয়। এ অবিকল অর্ধমৃত এক প্রাণীর ক্লান্ত পুনরাগমন, মৃত্যুর দরজা থেকে শেষ মুহূর্তে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এক ক্লিষ্ট আত্মার নিঃশব্দ প্রত্যাবর্তন। তার শরীর অসম্ভব দুর্বল, তার প্রতিটি স্নায়ু পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ওর গলা দিয়ে স্বর ফোটে না, শুধু এক ক্ষীণ শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ গুমরে মরে ঠোঁটের কোণে। অস্পষ্ট চোখ মেলে নাজহা দেখতে পায়, তার শুষ্ক ও শীর্ণ হাতখানি ধরে পাশে নির্বাক হয়ে বসে আছে তৌসির। নিথর গলায়, প্রায় অশ্রুত এক ফিসফিসানিতে নাজহা শুধু উচ্চারণ করতে পারে, “প… পানি।”
এই ক্ষীণ আওয়াজটুকু কানে আসতেই চমকে মুখ তোলে তৌসির। তার প্রিয়তমার চেতনা ফিরেছে, আর এই একটি দৃশ্য মুহূর্তেই তার নিজের শরীরেও প্রাণের সঞ্চার ঘটায়। গত দুই ঘণ্টা ধরে যে নিঃশ্বাসটি সে বুকের ভেতর পাথরের মতো আটকে রেখেছিল, এতক্ষণে তা মুক্তি পায় এক দীর্ঘ, কম্পিত উচ্ছ্বাসে। তৌসিরের সমস্ত শরীর কাঁপতে থাকে অজানা, অব্যক্ত এক আবেগের তীব্র স্রোতে। কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা, ভয় আর স্বস্তি সবকিছুর বাইরে গিয়ে এক বিস্ময়কর মিশ্র অনুভূতি, যা ভাষায় ধরা যায় না। দ্রুত উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি তুলে নেয় সে হাতে। নার্সরা এগিয়ে আসেন, যত্ন করে বেডের মাথার দিকটা আস্তে আস্তে উঁচু করে দেন। তৌসির অত্যন্ত সাবধানে, গ্লাসের কিনারা ছোঁয়ায় নাজহার শুকনো, ফেটে যাওয়া ঠোঁটে। নাজহা ধীরে ধীরে কয়েক ফোঁটা পানি গিলে নেয়। এই প্রতিটি ফোঁটা ঠিক এক একটি জীবন্ত প্রমাণ যে সে সত্যিই বেঁচে আছে।
তারপর তার অস্থির, ঘোরলাগা চোখ চারপাশের দেয়াল, আলো, মুখগুলোর উপর ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়ায়। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে সে বেঁচে আছে, সত্যিই সে বেঁচে আছে। হায়াতের অদেখা সুতোয় বাঁধা পড়ে এই মৃত্যুকূপ থেকে আবার ফিরে এসেছে সে। এই সত্যটি তার কাছে অবিকল কোনো অবিশ্বাস্য রূপকথার শেষ পঙক্তি মনে হচ্ছে। নাজহার ক্লান্ত, ভারী চোখ দুটি অবশেষে স্থির হয় তৌসিরের মুখের উপর। নাজহার ঠোঁট কাঁপে, গলা দিয়ে ভাঙা স্বরে বেরিয়ে আসে একটি প্রশ্ন,
“ত… তৌসির, আমার এই অভিশপ্ত জীবনের ইতি আজও কেন হলো না?”
কথাটা শুনে তৌসির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। হাতের গ্লাসটা পাশের টেবিলে রেখেই উন্মাদের মতো জড়িয়ে ধরে নাজহাকে, নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে মিশিয়ে নেয় ওকে। গত দু’ঘণ্টায় তার ভেতরের পৃথিবীটা যেভাবে তছনছ হয়ে গেছে, সেই কষ্টের বিবরণ কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রক্তচাপ নেমে গিয়ে সে নিজেও প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। নাজহার দুই গাল আঁজলা করে ধরে তৌসির পাগলের মতো তার চোখে, কপালে, গালে চুমু খেতে থাকে আর বলতে থাকে, “এসব বলিস না, আমার কষ্ট হয়। তুই জানিস আমার কতটা কষ্ট হয়েছে? তুই চলে গেলে আমার কী হতো?”
সবার সামনেই নাজহার ফ্যাকাসে ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায় তৌসির। উপস্থিত নার্সরা এই গভীর আবেগঘন দৃশ্য দেখে নিঃশব্দে কক্ষ ত্যাগ করেন। তৌসির নাজহার শুঁকনো ঠোঁট ভিজিয়ে দেয় নিজের ঠোঁটের উষ্ণতায়। বারবার নাজহার ঠোঁটে চুমু খায় সে। তারপর বারবার নাজহার কপালে, চোখের পাতায় চুমু এঁকে দিতে থাকে। নাজহা ক্ষীণ বিরক্তিমাখা গলায় আধো আধো স্বরে বলে ওঠে, “আমাকে ছোঁবেন না, ঘেন্না লাগে আমার।” কথাটা শুনে তৌসির হেসে ফেলে। একটু আগেও তো সে ধরেই নিয়েছিল, এই অভিমানমাখানো কথাগুলো আর কখনো শোনা হবে না তার। অথচ আজ এই মৃদু তিরস্কারই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সংগীত হয়ে বাজে। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে তৌসিরের চোখের দিকে তাকিয়ে নাজহা জিজ্ঞেস করে, “বাচ্চারা কই? তিনজনই কি ছেলে হয়েছে?”
তৌসির নাজহার গালে রাখা হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরে, ওর ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক তৃপ্তির হাসি। সে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলে, “না, দুইজন ছেলে আর একজন মেয়ে।”
নাজহা অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, “ওরা কার মতো হয়েছে?”
শান্ত গলায় তৌসির উত্তর দেয়, “দেখিনি এখনো আমি। তোর সাথেই তো ছিলাম।”
এ কথা শুনে নাজহা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। নিজের সন্তানদের একবারও না দেখে এই তৌসির সারাক্ষণ তার পাশেই বসে আছে। নরম গলায় সে বলে, “আমার নাড়িছেঁড়া ধনগুলোকে আমার সামনে নিয়ে আসুন। আমি ওদের দেখব। ওদের দেখলে আমার সব কষ্ট চলে যাবে।”
নাজহার কপালে আরেকটি চুমু এঁকে দিয়ে তৌসির বলে, “আনছি।”
তৌসির ধীর পায়ে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখে, পরিবারের সবাই বাচ্চাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তৌসিরকে দেখেই বিবিজান এগিয়ে এসে তার হাতে তুলে দেন তাদের প্রথম সন্তানকে। আর মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন, “এই দ্যাখ, তোর প্রথম পোলা।”
মুহূর্তেই তৌসিরের সারা শরীরে আনন্দময় শিহরণ খেলে যায়। বাবা হওয়ার এই প্রথম অনুভূতিতে তৌসিরের হাত কাঁপছে। না শুধু হাত না, তার সারা শরীর জুড়ে এক নামহীন শিহরণ খেলে যায়, মনে হচ্ছে তার রক্তের প্রতিটা কণিকা আজ নতুন করে জেগে উঠেছে। তার গলার কাছে একটা শক্ত দলা আটকে আছে, না গিলতে পারছে, না কাঁদতে পারছে। এ বাবা হওয়ার অনুভূতি এমন এক অনুভূতি যা কোনো শব্দে ধরা যায় না, কোনো ভাষায় বোঝানো যায় না, কোনো কবিতায় লেখা যায় না। তৌসির বুকের ভেতর হাজারটা প্রজাপতি একসাথে ডানা মেলেছে, আর প্রতিটা ডানার ঝাপটায় তার দু’চোখ ভিজে উঠছে। সে কি সত্যিই বাবা হলো? তৌসির শিকদার বাপ হলো? সত্যি হয়ে গেল? কাঁপা কাঁপা হাতে সে তার বুকের ধনকে কাছে টেনে নেয়। আনন্দে তার বুক ফেটে যাচ্ছে, এত আনন্দ, এত প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস, এত পরিপূর্ণতার জোয়ার তৌসির কোথায় রাখবে? কোন পাত্রে ধরে রাখবে এই অসীম সুখ? তার কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ, সব শান্তি, সব আকাঙ্ক্ষা আজ তার দুই হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিয়েছে। ছেলেটা গোল গোল চোখে চারদিকে তাকাচ্ছে, সে এই নতুন পৃথিবীটাকে চিনে নিতে চাইছে, হয়তো বুঝতে চাইছে কে এই মানুষটা যার বুকে সে শুয়ে আছে।
তৌসির অপলক দৃষ্টিতে তার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, নিঃশ্বাস ফেলতেও সে ভুলে যায়। তার মনে হয় চোখ ফেরালেই বুঝি এই অলৌকিক দৃশ্যটা মিলিয়ে যাবে, বুঝি এটা সব মিথ্যা স্বপ্ন। ছেলেটা একদম তার মা আর মামার প্রতিচ্ছবি। নাজহার মতো ধবধবে ফর্সা ত্বক তার, এত ফর্সা যে মনে হচ্ছে কেউ দুধে আলতা মিশিয়েছে। চোখ জোড়া নাজহার ভাই মানে নাজহারের মতো নীলচে। মায়ের মতো হয়েছে, একদম মায়ের মতো, শুধু কালো ঘন চুল আর লম্বাটে হাত-পাগুলো পেয়েছে তৌসিরের কাছ থেকে। আল্লাহ তাদের দু’জনকে একটু একটু করে মিশিয়ে, অতি যত্নে এই ছোট্ট মানুষটাকে গড়েছেন। তৌসিরের মনে হচ্ছে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা তাঁর কারিগরির সেরা নমুনাটা তৌসিরের কোলে তুলে দিয়েছেন। তৌসির অতিশয় আদরে তার সন্তানের ছোট্ট ছোট্ট আঙুলগুলো ছুঁয়ে দেখে। আঙুল দিয়ে গুনে গুনে দেখে এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, আবার অন্য হাতের এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, এভাবে গুনে নেয়, নাহ সবগুলো ঠিক আছে। সব নিখুঁত। আলহামদুলিল্লাহ। প্রতিটা আঙুল এত ছোট, এত কোমল, এত নিখুঁত, এত সুন্দর যা বর্ণনা করার ক্ষমতা তৌসিরের নেই। তৌসির ছেলের হাতের দিকে ভালো করে তাকায়, তার ছেলের নখগুলো শিশিরবিন্দুর মতো স্বচ্ছ, মনে হচ্ছে ফুলের পাপড়ির শেষ প্রান্ত। তৌসির ছেলেকে বুকের সাথে লেপ্টে ধরে। ছেলের শরীরের ঘ্রাণটা নাকে এসে লাগতেই তৌসিরের চোখ ভিজে ওঠে। তার বুকের ভেতর কোথাও হয়তো একটা অদৃশ্য জায়গা ছিল যা এতদিন সে বুঝতেও পারেনি, আজ সেই জায়গাটা হঠাৎ ভরে গেল। সম্পূর্ণ ভরে গেল। বুকের সাথে ছেলেকে আকড়ে ধরে তার গালে গভীর চুমু এঁকে দিয়ে কান্নাভেজা গলায় তৌসির ফিসফিস করে বলে ওঠে,
“একদম মায়ের মতো হইছে, একদম আমার নাজহার মতো। আল্লাহ, আমার এই স্বল্প ভাষায় তোমার শুকরিয়া আদায় করতে পারমু না।”
কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা ভেঙে আসে। চোখ থেকে একফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ে ছেলের কপালে।
এবার ছিদ্দিক সাহেব এগিয়ে আসেন। তাঁর কোলে তাদের দ্বিতীয় ছেলে। তৌসির প্রথম সন্তানকে অতি যত্নে বিবিজানের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দ্বিতীয় ছেলেটিকে গ্রহণ করে। তার দুই গাল বেয়ে এখন অবিরাম আনন্দাশ্রু ঝরছে, সেই অশ্রু সে মোছার চেষ্টাও করছে না, করতেও চাইছে না। কেন-ই বা করবে? এই কান্না তো লজ্জার নয়। এই কান্না তো দুর্বলতার নয়, এই কান্না তো পরম প্রাপ্তির, পরম কৃতজ্ঞতার, পরম ভালোবাসার।
দ্বিতীয় ছেলেটিও ঠিক তাদের মায়ের মতোই ফর্সা হয়েছে। তবে এর চোখগুলো কালচে সবুজ। চুলগুলো লালচে কালো ঠিক নাজহার মতো, প্রথমজনের মধ্যে কিছুটা তফাৎ থাকলেও দ্বিতীয়জন একদম নাজহার মতো হয়েছে। তৌসির অবাক হয়ে দেখে একই গর্ভ থেকে আসা দুই ভাই, একই রক্তে গড়া, অথচ দু’জন কত আলাদা, কত নিজস্ব, কত অনন্য। আল্লাহর সৃষ্টির কী অপার বৈচিত্র্য।
তৌসির অতি মমতায় নিজের এই সন্তানের বুকে-গলায় নাক ঘষে দেয়। ছেলের গরম নিঃশ্বাসটা তার গালে এসে লাগে, একটা ছোট্ট, উষ্ণ, জীবন্ত নিঃশ্বাস এসে লাগে। আর তৌসিরের মনে হয়, এই একটা নিঃশ্বাসই হয়তো তার সারাজীবনের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত যন্ত্রণা, সমস্ত অপূর্ণতা মুছে দিল। তৌসির ছেলের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে, চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সে বলে ওঠে,
“আমার সন্তান। আমার নিজের সন্তান। ইয়া আল্লাহ এ আমার নিজের সন্তান।”
কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা ধরে আসে। ‘আমার সন্তান’ এই দু’টো শব্দের ওজন আজ সে প্রথমবার বুঝতে পারছে। এই দু’টো শব্দের ভেতর কত স্বপ্ন, কত প্রতিশ্রুতি, কত দায়িত্ব, কত ভালোবাসা, সব আজ একসাথে তার বুকে আছড়ে পড়ছে। তৌসির এখন একসাথে কাঁদছে আর হাসছে, কাঁদছে এই অপ্রতিরোধ্য আনন্দে, হাসছে এই অবিশ্বাস্য বাস্তবতায়।
এবার তৌসিরের মা এগিয়ে আসেন। তার মায়ের চোখেও পানি। ছিদ্দিক সাহেবের হাতে দ্বিতীয় ছেলেকে ফিরিয়ে দিয়ে তৌসির অতি যত্নে নিজের কন্যাসন্তানকে বুকে তুলে নেয়। আর তখনই কী আশ্চর্য এক কাণ্ড ঘটে। যে মেয়েটি এতক্ষণ অবিরাম কাঁদছিল, বাবার কোলে আসতেই সে একেবারে শান্ত হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে শান্ত হয়ে যায়। মনে হচ্ছে কেউ তার কান্নার সুইচটা বন্ধ করে দিয়েছে। হয়তো সে এতক্ষণ এই বুকটারই অপেক্ষায় ছিল, এই গন্ধটারই খোঁজে কাঁদছিল। হয়তো সে জানত এই উষ্ণতাটাই তার, তার বাবার বুকটাই তার আসল আশ্রয়, তার বাবার হৃৎস্পন্দনটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে চেনা সুর।
ছোট্ট ঠোঁট দু’টো বন্ধ করে সে বেনামী নিবিড়তায় বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। তৌসিরের বুকটা মুচড়ে ওঠে। তার সারা শরীর জুড়ে এক নাম না জানা কম্পন। সে একদৃষ্টে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, নিঃশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেছে সে, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ তার কানে আসা বন্ধ হয়ে যায়। মেয়েটাও নাজহার মতো সুন্দর, বড় ভাইয়ের মতো নীলচে চোখ আর চুলের রঙটা নাজহার মায়ের মতো একদম অবার্ন। মনে হচ্ছে আল্লাহ তার মাথায় সোনার মুকুট পরিয়ে পাঠিয়েছেন। মেয়েকে দেখে হঠাৎ তৌসিরের মনে পড়ে যায় নাজহা সবসময় ভিডিও কলে নিজের মা আর ভাইকে দেখে বলত, “আমার পেটের সন্তানগুলো যদি জন্ম নেয়, যেন তোমাদের মতো হয়। একদম তোমাদের মতো।” কতবার সে এই কথা বলত, কত আকুতি নিয়ে বলত। ওর সেই প্রার্থনা, ওর সেই মোনাজাত আল্লাহ অক্ষরে অক্ষরে কবুল করেছেন। প্রতিটা সন্তানের চেহারায় তিনি লিখে দিয়েছেন নাজহার দোয়ার অনুবাদ, প্রতিটা শ্বাসে গেঁথে দিয়েছেন একজন মায়ের প্রার্থনার উত্তর রূপে। আল্লাহ, কত মহান। কত দয়ালু। কত করুণাময়।
হাত-পাগুলো তৌসিরের মতো হলেও, মেয়েটার গায়ের রঙ ভাই আর মায়ের চেয়ে মনে হচ্ছে আরও বেশি ফর্সা আর মায়াবী, তাকে দেখে মনে হচ্ছে হয়তো দুধের সরে গোলাপের পাপড়ি ভেজানো। তৌসিরের বুকটা আবার মুচড়ে ওঠে। এতদিন সে শুধু শুনে এসেছে মেয়েরা নাকি বাবার প্রাণ, মেয়েরা নাকি বাবার জান্নাত। আজ সে নিজে অনুভব করছে কথাটার সত্যিকারের মানে হাড়ে হাড়ে, রক্তের প্রতিটা কণায়, হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দনে সে অনুভব করতে পারছে।
মেয়ের ছোট্ট ছোট্ট হাত-পায়ে হাত বুলিয়ে তৌসির তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মেয়ের গালে চুমু খেতে খেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে তার গাল বেয়ে পড়া জলের ধারা নিয়েই, ভাঙা গলায় তৌসির হাসিমুখে বলে ওঠে,
“দ্যাখো আম্মা দ্যাখো, আমার মাইয়া হইছে। এই পুরা শিকদার খান্দানেও এত সুন্দর রমণী নাই, আম্মা। দ্যাখো, আল্লাহ আমারে কত সুন্দর উপহার দান করছে। আমি এই উপহারের যোগ্য আছিলাম, আম্মা? আমি কি এতটার যোগ্য আছিলাম?”
কথাগুলো বলতে গিয়ে তৌসিরের গলা ভেঙে আসছে, কণ্ঠস্বর কাঁপছে। ঠোঁট কাঁপছে, বুক কাঁপছে। তৌসিরের চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে মেয়ের গালে, কপালে, কপালের নরম চুলে। গত কয়েকটা প্রহর সে কী ভীষণ ভয়ের মাঝেই না পার করেছে। লেবার রুমের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে কতবার যে কেঁদেছে তার হিসেব নেই। তার প্রতিটা মুহূর্তে মনে হয়েছে যদি কিছু একটা হয়ে যায়? যদি নাজহার কিছু হয়? যদি বাচ্চাগুলোর… না, না, এই ‘যদি’ শব্দটাকেও সে মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিল না। তার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল, গলা দিয়ে এক ফোঁটা পানিও নামছিল না।
সেই ভয়ের মেঘ এখন কেটে গেছে। বুকের ওপর জমে থাকা পাথরটা, অসহ্য ভারী পাথরটা নেমে গেছে। এখন স্বস্তির বৃষ্টি নেমেছে তার সারা অস্তিত্ব জুড়ে মুষলধারে, অবিরাম। এই তিনটে ছোট্ট প্রাণ, তিনটে নিঃশ্বাস, তিনটে অলৌকিকতা, তিনটে জীবন্ত মুজিজা তার জীবনের সবচেয়ে বড় পূর্ণতা।
বিবিজান এবার এগিয়ে এসে বলেন, “তোর বাপে বড় ছেলের কানে আজান দিছে, আর ছিদ্দিক সাহেব দিয়েছেন দ্বিতীয় ছেলের কানে। এবার তুই তোর মেয়ের কানে আজান দে।”
তৌসির ভেজা চোখে মাথা নাড়ে। কথা বলতে পারে না সে, গলার কাছে দলা পাকানো কান্নাটা শব্দ হতে দিচ্ছে না। মেয়র কানে আজান দেয় সে। আজান শেষে বিবিজান আর ছিদ্দিক সাহেব দুই ছেলেকে কোলে নিয়ে আর তৌসির নিজের মেয়েকে বুকে চেপে ধরে পা বাড়ায় নাজহার ঘরের দিকে। অবশেষে বহু আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত আসে। তৌসির প্রথমে তাদের ছোট্ট মেয়েটিকে এনে তুলে দেয় নাজহার কোলে। কাঁপা কাঁপা হাতে নাজহা মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। নিজের অজান্তেই তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ঝাপসা দৃষ্টিতে সে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, মেয়েটা একদম তারই প্রতিচ্ছবি। চোখ দুটো পেয়েছে তার ভাইয়ের মতো, আর চুল পেয়েছে তার সৎ বোনের মতো মানে মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর মেয়ের মতো। নাজহা সবসময় তাদের দেখে মনে মনে দোয়া করত, তার মেয়েটিও যেন ঠিক এমনই হয়। আল্লাহ তার সমস্ত প্রার্থনা কবুল করে নিয়েছেন। মেয়ের ছোট্ট মাথায় ঠোঁট ছোঁয়ায় নাজহা। গত নয় মাসের সমস্ত যন্ত্রণা, আজকের অসহ্য সব কষ্ট এক নিমেষে উবে যায় তার। তার মনে হয়, ওগুলো তো কিছুই নয়, এই একটুকরো ভালোবাসার সামনে জগতের সব কষ্টই তুচ্ছ।
ধীরে ধীরে নাজহা চোখ তুলে তাকায় তার বাবার দিকে। চোখ মুছে কাঁপা গলায় বলে, “আব্বা, দেখো আমার মেয়ে হয়েছে। আমার দুইটা ছেলেও হয়েছে। দেখেছ আব্বা?”
সিদ্দিক সাহেব মেয়ের কাছে এগিয়ে এসে স্নেহভরে নাজহার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন আর বলেন, “হ্যাঁ দেখেছি আম্মা। এই যে তোমার দ্বিতীয় ছেলে।”
তৌসির ততক্ষণে মেয়েকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছে। নাজহা দ্বিতীয় ছেলেকে কোলে নিয়ে তার ছোট্ট হাত-পা ছুঁয়ে দেখতে থাকে। আহা, মাতৃত্বের কী আশ্চর্য স্বাদ। কী অপূর্ব এক অনুভূতি। নাজহার মনে হয়, এই মুহূর্তে সে বুঝি সমস্ত পৃথিবী জয় করে ফেলেছে।
ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে, তার গালে ও কপালে চুমু খেয়ে নাজহা হেসে ওঠে। বলে, “আমার এই ছেলেটা তো দেখি আমার পুরুষ ভার্সন হয়ে গেছে। একদম আমার মতো। আমার প্রথম ছেলেকে দেখি।”
সিদ্দিক সাহেব দ্বিতীয় ছেলেকে কোল থেকে নিয়ে নেন। বিবিজান এগিয়ে এসে প্রথম ছেলেকে নাজহার কোলে তুলে দিয়ে বলেন, “নে।”
নাজহা তার প্রথম সন্তানকে কোলে নিয়ে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে আবেগরুদ্ধ গলায় বলে ওঠে, “আমার মতো হয়েছে আমার সন্তানরা, আমার নাড়িছেঁড়া ধন।”
বিবিজান কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, “নাম কী রাখবি?”
কথাটা শুনে নাজহা একবার তৌসিরের দিকে তাকায়, তারপর স্থির দৃষ্টিতে তাকায় মেয়ের দিকে আর বলে, “মেয়ের নাম আমি রাখলাম তৌশি বিনতে তৌসির।”
এরপর তার দৃষ্টি ঘুরে যায় প্রথম ও দ্বিতীয় ছেলের দিকে আর সে বলে, “আমার মাস্টার চাচ্চু আর নেই। আমার দ্বিতীয় ছেলে যেহেতু একদম আমার মতো হয়েছে, তাই তার নাম দিলাম নাদের সিদ্দিক নাওয়াব। আপনি নাওয়াব ডাকবেন, আমি নাদের ডাকব। আর প্রথম জনের নাম হবে বাবার সাথে মিলিয়ে তুরাব সিদ্দিক তাজওয়ার।”
এই বলে নাজহা ধীরে ধীরে উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকায়। নামগুলো শুনে তৌসির ভেতরে ভেতরে দারুণ খুশি হয়, তার চোখে-মুখে তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট। বিবিজান এবার এগিয়ে এসে বলেন, “নাম তো রাখা হলো, এখন বাচ্চাদের মুখে দুধ দে।”
এই বলে তিনি ছোট্ট তৌশিকে কোলে নিয়ে নাজহার কাছে এগিয়ে আসেন। সিদ্দিক সাহেব নাওয়াবকে তৌসিরের কোলে তুলে দিয়ে ধীর পায়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। মেয়ের এই পবিত্র মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত থাকাটা শোভনীয় নয় বলেই তিনি সরে যান, পেছনে ফেলে যান এক নতুন পরিবারের নবজন্মের সূচনালগ্ন।
বিবিজান এবার ছোট্ট তৌশিকে নাজহার বাহুতে তুলে দেন। খিদের চোটে মেয়েটা অধীর হয়ে কাঁদছে, তাই সবার আগে ওর ক্ষুধা মেটানো প্রয়োজন। বিবিজান নিজ হাতে নাজহার পরনের মেডিকেল শার্টটা আলগা করে দেন, তারপর অত্যন্ত সাবধানে তৌশির ছোট্ট মুখটা গুঁজে দেন তার মায়ের উষ্ণ বুকে। তৌশির ছোট্ট গোলাপি ঠোঁট দুটো প্রথমে একটু কেঁপে ওঠে। সদ্য পৃথিবীতে আসা একটা প্রাণ, সে তো আর জানে না কোথায় যেতে হবে কিংবা কী খুঁজতে হবে। তার মুখটা এদিক-ওদিক সামান্য নড়ে। মনে হয় ঘ্রাণ ধরে কিছু একটা খুঁজছে সে, অথচ নিজেও বোঝে না সেটা কী। বিবিজান তার অভিজ্ঞ আঙুলে আলতো করে তৌশির মাথাটা একটু ঘুরিয়ে আনেন নাজহার বুকের কাছে।
এরপর নাজহার স্তনবৃন্তটা আলতো করে ছুঁইয়ে দেন তৌশির নিচের ঠোঁটে। বিবিজানের গলায় চাপা স্বর এনে বলেন, “ধৈর্য ধর নাজহা, ও এখনও শিখতেছে। প্রথম দিন এমনই হয়।”
তৌশির ছোট্ট নাকটা ঠেকে যায় নাজহার উষ্ণ ত্বকে। আর ঠিক সেই স্পর্শেই তার ভেতরের আদিম বোধটা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। সে মুখ ফাঁক করে, কিন্তু দুধ ধরতে পারে না। তার ছোট্ট ঠোঁট দুটো শুধু ছুঁয়ে যায় নাজহার ত্বক, তারপর পিছলে যায়। সে আবার চেষ্টা করে, আবার পারে না। তার চোখ এখনো প্রায় বন্ধ। তার কপালটা একটু কুঁচকে যায়, মনে হয় সে সামান্য বিরক্ত আর ভীষণ অসহায়। বিবিজান আবার আলতো হাতে সাহায্য করেন, নাজহার বুকের স্তনবৃন্তটা ঠিকঠাক বসিয়ে দেন তৌশির ছোট্ট মুখের ভেতর।
এবার তৌশির ছোট্ট ঠোঁট দুটো কাঁপতে কাঁপতে আঁকড়ে ধরে নাজহার বুক। তারপর প্রথম টান দেয়। অত্যন্ত দুর্বল, অত্যন্ত ছোট্ট একটা টান তা, জোর নেই বললেই চলে তাতে। তবু এই সামান্য টানটুকুই মনে হয় নাজহার ভেতরের গভীর কোনো তারে আঙুল ছুঁইয়ে দেয়। নাজহার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। তবে কোনো দুধের স্রোত নয়, শুধু কয়েক ফোঁটা ঘন, হলদেটে শালদুধে। বিবিজান শান্তিতে বলেন, “এইটুকুই সোনার চেয়েও দামি। ওর জন্য আজ এইটুকুই যথেষ্ট।”
তৌশি আবার চেষ্টা করে দুধ খাওয়ার। এবারও তার টান দুর্বল এবং অগোছালো। দু-বার টেনেই সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার ছোট্ট গোলাপি ঠোঁট শিথিল হয়ে আসে, মুখ খুলে যায়। ছোট্ট জিভটা একটু বেরিয়ে আসে, তারপর আবার ভেতরে ঢুকে যায়। বিবিজান ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কিছুক্ষণ পর তৌশি নিজেই আবার মনে করে নেয় নিজের কাজ। তার ছোট্ট মুখ আবার নাজহার বুকের দিকে ঘোরে, তার ঠোঁট দুটো হাতড়ে হাতড়ে আবার আঁকড়ে ধরে নাজহার বুক। তার এবারের টানটা হয় একটু গুছানো, যদিও এখনো অনিশ্চিত। তার নাকের ফুটো দুটো একটু একটু কেঁপে ওঠে। ছোট্ট গরম নিঃশ্বাস আঁচড়ে পড়ে নাজহার বুকে। সেই উষ্ণ নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় নাজহার সারা শরীর শিরশির করে ওঠে।
তৌশির খাওয়াটা ছন্দময় কোনো শব্দ তৈরি করে না। সদ্যোজাত শিশুর খাওয়া তো সেভাবে শব্দ করে না, বড় শিশুদের মতো ছন্দে চুক চুক আওয়াজও হয় না। তার ছোট্ট চোয়ালটা শুধু থেমে থেমে নড়ে। একবার নড়ে, একটু থামে, আবার নড়ে। মাঝে মাঝে এক-আধ ফোঁটা শালদুধ সে গিলে ফেলে। তখন তার গলার নিচে অতি সূক্ষ্ম একটা নড়াচড়া দেখা যায়, যা এতই হালকা যে চোখ ভালো করে না তাকালে বোঝাই যায় না। তার চিবুকের কোণে লেগে আছে শালদুধের একটা হলদেটে চিকচিকে বিন্দু, বিবিজান নরম কাপড়ে আলতো করে যা মুছে দেন।
মাঝে মাঝে তৌশি দুধ ছেড়ে দেয়। তার ছোট্ট ঠোঁট দুটো পিছলে সরে যায়। নাজহার বুকটা তখন ধক করে ওঠে, মনে হয় মেয়েটাকে সে ধরে রাখতে পারছে না, পারছে না তাকে যা দরকার তা ঠিকমতো দিতে। বিবিজান নাজহার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে নরম গলায় বলেন, “আজ এমনই হইবো। নতুন তো, ওরা শিখতেছে, তুইও শিখতেছিস। কাল থেকে দুধ নামবে, তখন সব ঠিক হয়ে যাইব।”
নাজহা এ শুনে আর কিছু বলে না। সে চোখ বুজে অনুভব করে মেয়ের প্রতিটা দুর্বল চেষ্টা। প্রতিবার যখন তৌশির ঠোঁট দুটো আবার আঁকড়ে ধরে, তখন মনে হয় নাজহার বুকের গভীর থেকে কিছু একটা উঠে আসে। কোনো ধারালো স্রোত নয়, শুধু একটা মৃদু, ভেজা উষ্ণতা, একটা নামহীন শিরশিরানি। নাজহা টের পায়, তার শরীরের ভেতর থেকে কয়েকটা মাত্র সোনালি ফোঁটা তার মেয়ের ছোট্ট শরীরে চলে যাচ্ছে। সংখ্যায় খুব কম, কিন্তু ওজনে বোধহয় গোটা পৃথিবী। আর সেই অল্প দান করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এমন এক তৃপ্তি যা সে আগে কখনও জানেনি।
তৌশির ছোট্ট মুঠোটা এখন নাজহার বুকের ওপর রাখা। মুঠো বলতে যা বোঝায় তা-ও ঠিক নয়, শুধু কয়েকটা ছোট্ট আঙুল আধবোজা হয়ে আছে নাজহার বুকে। মাঝে মাঝে তার আঙুলগুলো অকারণে কেঁপে ওঠে, সদ্যোজাতের এই অর্থহীন ও অনিচ্ছাকৃত কম্পন। কখনো সে এতই দুর্বলভাবে টানে যে নাজহার মনে হয় ও বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঝুঁকে দেখে, না, ঘুমায়নি। চোখের পাতা একটু কাঁপছে, ঠোঁটও মাঝে মাঝে নড়ছে। টানতে টানতে নাজহার বুকের সাথে তৌশি নাকটা চাপা পড়ে গেলে সে নিজেই একটু সরে আসে, ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস নেয়, তারপর আবার অগোছালোভাবে খুঁজে নেয় মায়ের বুক।
নাজহার দু-চোখ বেয়ে এখন নিঃশব্দে পানি গড়াচ্ছে। সে নিজেও জানে না ঠিক কেন কাঁদছে সে। হয়তো তৌশির এই দুর্বল, এই আনাড়ি প্রথম টানেই তার ভেতরের সমস্ত মেয়েবেলা চিরতরে শেষ হয়ে গেল। হয়তো এই ক-ফোঁটা শালদুধের সঙ্গেই সে চিরকালের জন্য মা হয়ে গেল। তৌশির ঠোঁটের প্রতিটা কম্পিত স্পর্শে, প্রতিটা অসমাপ্ত টানে নাজহার বুকের ভেতর জন্ম নিচ্ছে এক নতুন নাজহা, যাকে সে নিজেও চেনে না, কিন্তু ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে।
কিছুক্ষণ পর তৌশি সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সদ্যোজাতের শক্তি তো অতি ক্ষীণ, দু-তিন মিনিট চেষ্টা করতেই সে হাঁপিয়ে ওঠে। ঠোঁট দুটো ছেড়ে দেয়, মুখটা একটু খুলে যায়। তার ছোট্ট জিভের কোণে লেগে থাকে শালদুধের একটা ফিকে হলদে দাগ। তার নিঃশ্বাস একটু দ্রুত হয়, তারপর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। নাজহা একটু ভয় পেয়ে প্রশ্ন করে, “আর খাবে না?”
বিবিজান হাসেন, “এইটুকুই তো খায় প্রথম দিনে। ওর পেট তো ছোট্ট, একটা মার্বেলের সমান। এতেই ওর হয়ে গেছে।”
নাজহার ঠোঁটে এক টুকরো তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। ভেজা চোখে, ক্লান্ত মুখে এই হাসিটা এক নতুন সূর্যোদয়ের ন্যায়। সে আলতো হাতে মেয়ের পিঠে চাপ দেয়। মনে মনে বলতে চায়, “ভয় পাস না, ধীরে ধীরে শিখে নিবি। এই বুক চিরকাল তোদের। আজ যা পেলি অল্প, কাল আরও পাবি, পরশু আরও। যতদিন টানবি, ততদিন এই দুধ ফুরোবে না। তোদের জন্যই তো এই বুক, তোদের জন্যই তো আমার এই জীবন।”
কিন্তু আফসোস, মুখ ফুটে সে কথাগুলো বলতে পারে না। শুধু আঙুলের ডগা দিয়ে মেয়ের পিঠে অতি একটা চাপ দেয়। হয়তো তৌশি সত্যিই শুনতে পায়। ঘুমঘুম চোখে সে আরেকবার মুখটা ঘোরায় মায়ের বুকের দিকে। ছোট্ট ঠোঁট দুটো একবার চেপে ধরে নাজহার বুকে, তারপর শিথিল হয়ে আসে। তার ছোট্ট বুকটা ওঠে-নামে, ওঠে-নামে।
ক্লান্ত শরীরে নাজহা ধীরে ধীরে অন্যদিকে কাত হয়। তার শরীর চলছে না, পেশিগুলো বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। প্রতিটি নড়াচড়ায় শরীরের কোথাও না কোথাও চিনচিনে ব্যথা জেগে ওঠে। তবুও তাকে নড়তে হবে, কারণ তার বুকের কাছে অপেক্ষায় আছে তিনটে ছোট্ট প্রাণ। তারা ক্ষুধার্ত এবং মায়ের উষ্ণতার জন্য কাঁদছে।
তৌসির সন্তর্পণে নাজহার বাহুতে তুলে দেয় নাওয়াবকে। সদ্য মা হওয়া নাজহার বুকে এখনো সেভাবে দুধ আসেনি, হয়তো তিন দিন পর ঠিকঠাক আসবে। বাচ্চাদের পেট ভরছে না বলে তাদের মনমতো হচ্ছে না। ছোট্ট ঠোঁট দিয়ে তারা চুষে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত তৃপ্তি মিলছে না। বাড়তি দুধের প্রয়োজন তো পড়বেই। তবু তৌসির অতি যত্নে সাহায্য করে। সে নাওয়াবের ছোট্ট মুখে আলতো করে তুলে দেয় তার মায়ের স্তনবৃন্ত। নাজহা চুপচাপ নির্বাক ভঙ্গিতে নাওয়াবকে খাওয়াতে থাকে। তার চোখে কোনো ভাব নেই। সেখানে নেই মায়ের মমতা কিংবা স্ত্রীর কোমলতা, আছে শুধু এক শীতল শূন্যতা।
নাওয়াবের পেট কিছুটা শান্ত হলে নাজহা আবার সাবধানে দিক পরিবর্তন করে তুরাবকে বুকের কাছে টেনে নেয়। তুরাবকে খাওয়ানো শেষ হলে এরপর নাজহার বুকের ঠিক মাঝখানে শান্তিতে শুইয়ে দেওয়া হয় ছোট্ট তৌশিকে এবং তার দুই পাশে শুয়ে থাকে দুই ছেলে তুরাব আর নাওয়াব। তিনটে ছোট্ট দেহ মায়ের শরীরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। এতদিনের জমানো সমস্ত শারীরিক ও মানসিক কষ্ট এই মুহূর্তে গলে জল হয়ে যায় নাজহার। সন্তানের গায়ের দুধের গন্ধ আর ওই উষ্ণ স্পর্শের কাছে পৃথিবীর সব ব্যথা তুচ্ছ মনে হয় তার। সে শান্তিতে চোখ বুজে নেয়। মায়ের উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে তিনটে ছটফটে প্রাণ একদম নীরব হয়ে গেছে। দুজন এরই মাঝে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। আর একজন ছোট্ট তৌশি পিটপিট করে চারদিকে তাকাচ্ছে, সে এই নতুন পৃথিবীটাকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তৌসির একটা চেয়ার টেনে এনে বিছানার পাশে বসে। তার বুকের ভেতরটা আজ তৃপ্তিতে ভরে আছে। জীবনের এত হিসাব নিকাশ, এত রক্তপাত আর এত পাপের পরও এই দৃশ্য সে পেয়েছে। তার স্ত্রী এবং তার সন্তানকে নিয়ে গড়া এই দৃশ্যটুকু তার কাছে পরম পাওয়া। একবুক তৃপ্তি নিয়ে সে তার তিন সন্তান আর নিজের নাজহার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। চোখের পলক ফেলতেও তার আপত্তি, যদি ফেলতে গিয়ে এই দৃশ্যটুকু এক মুহূর্তের জন্যও মিস হয়ে যায় তাহলে? নাজহা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তৌসিরের দিকে তাকায়। ও শান্ত গলায় বলে, “মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে। ওকে আলতো করে কোলে নিন। আমি তুরাবকে আবার একটু খাওয়াই, নয়তো ও ঘুমাবে না।”
কথাটা শুনে তৌসির বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ে। এই মুহূর্তে নাজহার প্রতিটি কথা তার কাছে আদেশের সমান। ছোট্ট তৌশিকে সাবধানে তুলে নিয়ে নিজের চওড়া বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। বাবার বুকের উষ্ণতা পেয়ে মেয়েটা আরও লেপ্টে যায়। নাজহা নাওয়াবের দিক থেকে নিজের বাহু সরিয়ে সাবধানে তুরাবকে বুকে টেনে নেয়। তুরাব তার ছোট্ট ঠোঁট দিয়ে চোখ বুজে মনমতো দুধ টানার চেষ্টা করতে থাকে। ছোট্ট নাকটা ফুলে ফুলে উঠছে শ্বাস নেওয়ার তালে তালে।
তৌসির একদৃষ্টে নাজহার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে এখন ঘোর। নাজহার নজর এখন তুরাবের দিকে নিবদ্ধ। সদ্য মা হওয়া এক নারীর সমস্ত মনোযোগ এখন তার ক্ষুধার্ত সন্তানের দিকে। আচমকাই তৌসির একটু মজা করে বলে ওঠে, “ও ছিনাল। তুই না বললি এরা শুধুই আমার সন্তান, তোর না? তাইলে আমার সন্তান সবকয়টা দেখতে একদম তোর মতো হইলো ক্যান?”
এ শুনে নাজহা মুখ তুলে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি কী জানি? আমি মনে হয় ওদের বলেছিলাম আমার মতো হতে, আর ওরাও আমার কথা শুনেছে। এরা শুধুই আমার সন্তান, আপনার না। জন্ম দিতে যত কষ্ট হয়েছে সব আমার হয়েছে। দশ মাস পেটে আমি রেখেছি, শরীর ফেড়ে ওদের জন্ম দিয়েছি আমি। আপনি কে যে ওদের আপনার সন্তান বলেন?”
এই রূঢ় কথার পরও তৌসিরের চোখে রাগ দেখা যায় না, বরং স্থির দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে নাজহার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। নাজহার মুখ থেকে যত ঝাঁঝালো কথাই বেরোক না কেন, এই মুহূর্তে নাজহা তার পাশে এবং তার সন্তানদের বুকে নিয়ে শুয়ে আছে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি তৌসিরের জীবনে আর কিছু নেই। আজ সে ভীষণ খুশি। এত খুশি যে তার ভেতরের সব হিংস্রতা ও নৃশংসতা সব এই মুহূর্তের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে।
কিন্তু তৌসিরের এই হাসি নাজহার ভেতরের বারুদ জ্বালিয়ে দেয়। কীসের এত তৃপ্তি এই লোকটার? কোন অধিকারে সে হাসে? নাজহার ভেতরে জমে থাকা পাহাড়সম ক্ষোভ এক মুহূর্তে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। বিষাক্ত গলায় সে ফুঁসে ওঠে বলে, “এরা আমার সন্তান বটে, কিন্তু শরীরে রক্ত তো আপনার। তাই এদের যে আমার বুকের দুধ খাওয়াচ্ছি, এগুলো সব বৃথা। নিজের কলিজা গলানো দুধ যে খাওয়াচ্ছি সব বৃথা। কারণ পশুর জন্ম পশুই হয়। শুনুন তৌসির শিকদার, এই যে এরা আমার কলিজা নিংড়ানো দুধ খাচ্ছে তার জন্য আপনাকে অবশ্যই প্রতিদান দিতে হবে। নয়তো আপনার রক্তের এই পাপগুলোর গলা দিয়ে মায়ের বুকের দুধ নামবে না। আমি এদের মুখে দুধ দেব না।”
নাজহার কথাগুলো তৌসিরের বুকের ভেতরটা আছড়ে ভাঙে। মুহূর্ত আগে যে বুকটা তৃপ্তিতে টইটম্বুর ছিল, সেটাই এখন এক অজানা আতঙ্কে কাঁপতে শুরু করেছে। শরীরটা মুহূর্তে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায় তার। কোলে থাকা তৌশির ছোট্ট দেহটা তার বুকের কাছে আরও জড়িয়ে ধরে সে। ধীর ও কাঁপা গলায় সে জিজ্ঞেস করে, “কী… কী প্রতিদান দিতে হবে আমায়?”
নাজহার ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক তিক্ত ও করুন হাসি। এই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে শুধু জমে থাকা যন্ত্রণার বিষ। সে বলে, “যে মানুষ অন্য মায়ের এবং অন্য বাপের বুক খালি করে, তার তো নিশ্চয়ই নিজের সন্তানকে কোলে নেওয়ার ভাগ্য হওয়া উচিত না, তাই না?”
তৌসিরের বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়। তার মনে হতে থাকে, নাজহা ঠিক কী বলতে চাইছে সেটা সে আন্দাজ করতে পারছে, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছে না। সে ঢোক গিলে বলে, “যা বলার স্পষ্ট কইরা ক।”
নাজহা এবার তৌসিরের চোখের দিকে তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাকায়। প্রতিটি শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলে, “প্রতিদান এটাই যে, আপনি ওদের আর কোলে নিতে পারবেন না। আপনি যদি ওদের কোলে নেন, তাহলে আমি ওদের আর আমার বুকের দুধ খাওয়াবো না। আমার কথা খুব স্পষ্ট। আপনি যাকে কোলে নেবেন সে না খেয়ে থাকবে। আমি পাষাণের মতো কথা বলছি আমি জানি, কিন্তু আমাকে পাষাণ হতে আপনি আর আপনার বিবিজান বাধ্য করেছেন। এবার ভাবুন কী করবেন।”
স্তব্ধ হয়ে যায় তৌসির। তার কোলে থাকা তৌশির ছোট্ট শরীরটা মনে হয় হঠাৎ পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। এমনিতেই তার হাতে সময় নেই। সন্তানদের সাথে থাকার জন্য সে হয়তো আর বেশি হলে এক দুই মাস সময় পাবে। এই অল্প কয়েকটা দিনই তো তার সারাজীবনের সম্বল। এর মাঝেই এত নিষ্ঠুর এক শর্ত? নাজহা এত পাষাণী কীভাবে হতে পারে?
খালি গলায় প্রায় আর্তনাদের মতো শোনায় তৌসিরের কণ্ঠ, “সদ্য জন্ম নেওয়া এই ফুলগুলারে ওদের বাপ থেইকা ক্যান আলাদা করার কথা কইতাছোস নাজহা? অন্য কিছু বল, আমি তোর সব শর্ত মানমু। কিন্তু এইটা আমি পারমু না।”
নাজহার চোখের দৃষ্টি ছুরির ফলার মতো ধারালো হয়ে ওঠে। তৌসিরের এই কাতরানি এবং এই অসহায়তা দেখে তার ভেতরের পাথর আরও শক্ত হয়ে যায়। বড়ই নির্দয় গলায় সে বলে, “না পারলে নাই। দুধ দেব না, না খেয়ে থাকবে। তাতে আমার কী? আমি শুধু আমার কথা বলছি। আর আমি আমার এই জেদ থেকে এক পা-ও নড়ব না। যা করার করে নিন।”
নাজহার এই কথা শুনে তৌসির বোবা হয়ে যায়। তার মুখের সমস্ত ভাষা হয়তো কেউ কেড়ে নিয়েছে। সে স্থির অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজহার দিকে। তার চোখে অবিশ্বাস, ব্যথা আর এক অসীম শূন্যতা। তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না।
তৌসিরের এই অসহায় অবস্থা দেখে নাজহা তাচ্ছিল্যভরে হাসে। এ যেনো এক বিজয়ীর হাসি, কিন্তু সেই বিজয়ের ভেতরেও কেমন এক হাহাকার লুকিয়ে আছে। নাজহা বলে, “আমি বলেছিলাম না, সন্তানের দুঃখে আপনাকে কাতরাতে দেখব? কষ্ট হচ্ছে? আমারও ঠিক এমনই কষ্ট হয়। যখন কথায় কথায় আমায় আমার চাচ্চু আর ভাতিজাদের মেরে ফেলার হুমকি দেন। যখন আমার চোখের সামনে আমার মাস্টার চাচ্চুকে নির্মমভাবে মেরে ফেলেছিলেন, তখনও আমার ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু আপনি তখন আমার কষ্ট বোঝেননি। তাই আজ আপনার কষ্ট বুঝেও আমি বুঝলাম না।”
নাজহা একটু থামে। তার চোখে এবার পানি চিকচিক করছে, কিন্তু সেই পানি গাল বেয়ে নামার সাহস পায় না। সে আবার বলতে শুরু করে, এবার তার গলার স্বর আরও নিচু এবং আরও তীব্র গলায় সে বলে, “আজ যদি আমি এই বাড়িতে না থাকতাম, আব্বা-বাবা যদি এখানে না থাকত, তাহলে আপনার রক্তের এই পাপগুলোর মুখে আমি এক ফোঁটা দুধও দিতাম না। আমি কিচ্ছু ভুলিনি তৌসির শিকদার, কিচ্ছু না। আমাকে হুমকির ওপর যেভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন, সেটাও ভুলিনি। আমি সব কড়ায় গণ্ডায় গুনে রেখেছি।”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬১
ঘরের ভেতর এক ভয়ংকর মৌনতা নেমে আসে। তৌসিরের কোলে ঘুমিয়ে থাকা তৌশি, নাজহার বুকে দুধ টানতে টানতে ঘুমিয়ে পড়া তুরাব আর পাশে শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা নাওয়াব। এই তিনটে নিষ্পাপ প্রাণ জানেও না তাদের মা-বাবার মাঝে এই মুহূর্তে কী ভয়ংকর এক ঝড় বয়ে গেল। জানে না, ভালোবাসা আর ঘৃণা একসাথে মিশে কীভাবে এক নারীর বুকে পাথর হয়ে জমে থাকতে পারে।
