আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৯
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
বইয়ের পাতা উল্টানোর মতো করে চোখের পলকে সময় এগিয়ে গিয়েছে। পেরিয়ে গিয়েছে আরও কিছু শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম। ছয় ছয়টা মাস পিছনে ফেলে আসা হয়েছে। ষড়ঋতুর মাসের হিসেব বলছে বর্ষা চলছে এখন। বর্ষার মাঝামাঝি। রোজই নিয়ম করে ঝড়ো বাতাস বয়, ঝুম বৃষ্টি নামে। প্রকৃতিতে সে-রকম গরমের উত্তাপ নেই বললেই চলে, বৃষ্টির তীব্রতায় প্রকৃতি শীতল থাকে সর্বক্ষন। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই দিকে এমনিতেই পাহাড়, আর সবুজের মেলা। তার ওপর ঝুম বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে চকচক করে সবকিছু। কালো মেঘের ঘনঘটা দিনের অধিকাংশ সময়, মেঘের গুড়গুড় আওয়াজ জানান দেয়, যেকোনো সময় বারিধারা আসমান ছেড়ে ধরনী তে নামলো বলে!
আকাশদের কটেজে সবার আজকাল প্রায় নির্ঘুম রাতই কাটছে। শিয়ার ডেলিভারির ডেট সামনে সপ্তাহে। সবাই অত্যন্ত সজাগ থাকে বেশিরভাগ সময়ই। এতদিন মেয়েটাকে দেখে রাখার জন্য নিয়ম করে এসে থাকতো রাকা আর তুশি। তাছাড়া প্রিয়া তো ছিলোই। শিয়া, প্রিয়ার বাবা মায়ের ফিরে আসার কথা ছিলো আরও মাস চারেক আগেই। তবে মুখে বললেই তো আর সব ছেড়ে ফেরা যায় না! ভিসা জটিলতা, কর্মব্যাস্ততা সব মিলিয়েই ফেরার উপায় ছিলো না। তবে সময় লাগলেও, ফিরেছেন পৌঢ় দম্পতি। গত সপ্তাহে ফিরে এসেছেন আনিসুল রহমান আর তার স্ত্রী রেণুকা রহমান। আকাশের মা, চাচি, বোনেরাও এসেছে পাঁচদিন হলো। তাদের চিরাচরিত ফাঁকা কটেজটা আর ফাঁকা নেই। লোকে লোকারন্যই বলা চলে। হৈ হুল্লোড় অবস্থা একপ্রকারে।
আকাশদের কনস্ট্রাকশন সাইটের কাজও চলছে মহা সমারোহে। আরও মাস তিনেক লাগবে হয়তো। তারপরেই এমন প্রকৃতির মাঝে মাথা তুলে দাড়ানো চৌধুরীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, পরিশ্রম –এই পাঁচ তারকা হোটেলের উদ্বোধন হবে। শুরু হবে নবযাত্রা।
আকাশ, রাতুল সহ বাকিরা মহা ব্যাস্ত সময় পার করছে। খাওয়া নাওয়ার ফুসরতও নেই বুঝি। অয়নের ব্যাস্ততা তারও একধাপ ওপরে। স্ত্রীর এই সময় পাশে থাকাটা আরেক মহা কর্তব্যের মধ্যে পরে। ছেলেটা একদন্ড শান্তিতে অফিসে থাকতে পারে না। ছটফট করে বাড়িতে ফেরার জন্য। শিয়া কে যত ভাবে সামলে রাখা যায়, অয়ন সে-সব করতে মরিয়া একপ্রকার।
প্রিয়ার ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ার চলছে। সবে সবে শুরু হয়েছে ক্লাস। যদিও বাবা মা ফেরার খুশীতে আজকাল নিয়ম করে ভার্সিটি মিস করছে সে। শিয়ার ডেলিভারি নিয়েও আরেক চিন্তা। সবার ভীষন ইচ্ছে ছিলো ঢাকা নিয়ে যাবে মেয়েটাকে। কিন্তু ডাক্তারের কড়া নিষেধ। এই অবস্থায় এতো লম্বা জার্নি সহ্য হবে না ওর। তাছাড়া শিয়া নিজেও যেতে রাজি হয়নি। অয়নের জন্য অবশ্য। এখন কাজের এতো প্রেশার, সবারই এখানে থাকা বাধ্যতামূলক। তাকে ঢাকা নিয়ে গেলে আকাশ’রা পরে যাবে উভসংকটে। দৌড়াদৌড়ির ওপর থাকতে হবে। সবারই কষ্ট তখন দ্বিগুণ। কি দরকার এতো ঝক্কির! এখানেই বেশ ভালো হসপিটাল আছে। অগত্যা, শিয়ার কথামতোই চলেছে সকলে।
রাতুল, রিমির বিয়ের কথা চলছে বেশ সিরিয়াস ভাবেই। এরই মধ্যে দূর্ভাগ্যবশতঃ রিমির বাবার স্ট্রোক হয়ে গিয়েছে একবার। শর্ত মোতাবেক এখনই মেয়ের বিয়ের কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও, পরিস্থিতির চাপে আলোচনা উঠেছে বইকি। জীবন জীবনের মতো এগিয়েছে। পরিবর্তন এসেছে সবারই ব্যাক্তিগত জীবনে।সৌমি একটা পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে মাস তিনেক আগে। রিয়ান জেল থেকে ছাড়া পায়নি এখনো। মেয়েটা একা হাতে সামলাচ্ছিলো ছেলেকে। যদিও সে-সময় আকাশ রা পুরো পাশে থেকেছে মেয়েটার। সৌমির বাবা সব ভুলে কাছে টেনে নিয়েছে মেয়েকে। যদিও একবিন্দুও টলেনি রিয়ানের মন। ছেলেকে একবারও দেখতে অবধি চায়নি। মাঝ খান থেকে যতবার সৌমি জামিনের ব্যাবস্থা করতে চেয়েছে, ততবারই কড়া ভাষায় সৌমিকে অপমান করতেও ছাড়ে নি…
ভার্সিটি থেকে প্রিয়া ফিরেছে বেশ খানিকক্ষণ আগেই। দুপুরের খাবার খেতে খেতে দুপুর গড়িয়ে বিকেলে পরেছে দিন। বাইরে যথারীতি বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টির জন্য আকাশদের কাজ দেরি হচ্ছে বলা চলে। না হলে সম্ভবত আরও মাস চারেক আগেই কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যেতো। প্রিয়া খাবার নিয়ে ঘরে এসেছে। শিয়ার রুমে তার মা, শাশুড়ী রা সকলে। শিয়ার জিনিসপত্র টুকটাক গুছিয়ে রাখছে। যেকোনো দিন হুট করেই ছুটতে হতে পারে। অবশ্য বাড়ির সকলেই ঘুরেফিরে শিয়ার রুমের আশেপাশেই থাকে আজকাল। প্রিয়া খাবার থালা নিচে রেখে নিজের ঘরে এলো। শাওয়ার নিয়েছে এসেই। জবজবে ভেজা চুল, শুকায়নি। বারান্দায় একগাদা শুকনো কাপড় ছিলো। সকালে তুলে রেখে যাওয়ার কথা একবিন্দুও মনে ছিলো। ভিজে একসাথ হয়েছে সে-সব। আবার না ধুয়ে দিলে পরাই য়াবে না।
প্রিয়া বারংবার উঁকি দিচ্ছে পথের দিকে, আকাশ ফিরলো কি-না। অবশ্য এতো চটজলদি কখনোই ফেরে না ওরা কেউ। শুধুমাত্র অয়ন ভাইয়া বাদে। সবে সন্ধ্যা এখন। মাগরিবের সাথে সাথে দেখা যাবে অয়ন ফিরে এসেছে। আকাশদের ফিরতে ফিরতে সেই মাঝরাতের কাছাকাছি।
আকাশ প্রিয়ার ছোটখাটো বিচ্ছেদ পর্ব চলছে। যবে থেকে বাবা মায়ে’রা সকলে এসেছে কটেজে, সেদিন থেকে আলাদা রুমেই ঠাঁই নিয়েছে দুজন। আকাশের পরিবার মোটামুটি সবই জানলেও এখনো জানে না প্রিয়ার পরিবার। জানানও হয়নি ইচ্ছে করেই। আদরের মেয়েটা তাদের অনুপস্থিতিতে এভাবে বিয়ে করে নিয়েছে, সেটা মোটেই সুখকর হবে না আনিসুল সাহেবের জন্য।
পড়ার টেবিলটা গুছিয়ে সবেই বসতো যাচ্ছিলো প্রিয়া। তক্ষুনি দরজায় কড়া নেড়ে ভিতরে ঢুকলেন আকাশের মা। ছেলের বউকে অস্বাভাবিক ভালোবাসেন তিনি। অসময়ে ভেজা চুল দেখে ব্যাস্ত হলেন বড্ড।
—’ঠান্ডা না লাগিয়ে থামবে না তুমি? একে তো বৃষ্টিতে ভিজেছো। তার ওপর গোসল দিয়ে চুল এখনো শুকায় নি।’
প্রিয়া একগাল হাসলো। মহিলা তাদের দু’বোন কেই অত্যাধিক স্নেহ করেন। বিয়ের পুরো একটা বছর কেটে গিয়েছে। আকাশের পরিবার তাদের বিয়ের কথা জেনেছে আরও ছয় সাত মাস আগে। তারপর থেকেই আরও দ্বিগুণ আগলে রাখে ও বাড়ির সবাই।। বিশেষ করে প্রিয়া কে। মেয়েটা বয়সে বেশ ছোট কি-না। আমেনা তোয়ালে এনে ভালো করে মুছে দিলো প্রিয়ার চুলগুলো। নরম কন্ঠে বললো,
—’ গোসল করে আগে চুলগুলো ভালো করে মুছে ফেলবে। বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়েছো কেনো? সিজন ভালো না। জ্বর বাঁধাবে তো।’
প্রিয়া আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
—’লাগবে না। একটু ভিজেছি, বেশি না তো।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আমেনা চৌধুরী। মেয়েটাকে বকাঝকা করা যায়না। করতে পারেন না। শুধু সে নয়। সবারই একই অবস্থা। এতো আদুরে একটা মেয়ে। মুখের দিকে তাকালেই মায়া কাজ করে। কি আর বলবেন। হাতের তোয়ালে টা মেলে দিতে দিতে বললেন,
—’তোমার শশুর চাচ্ছিলেন তোমার আর আকাশের বিয়ের কথা টা তোমার বাবা মা কে জানাতে।’
আতকে উঠলো প্রিয়া। দু হাত সামনে দিয়ে ব্যাস্ত, আতঙ্কিত কন্ঠে বললো,
—’না না, আগেই না। সবে এলো কয়েকদিন হলো। এখনি যদি…’
আমেনার ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো। গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
—’সেটা বললে কি করে চলবে, মা। বিয়ের এক বছর হয়ে গেলো প্রায়। কতদিন এতো বড় সত্যি টা লুকিয়ে রাখবে? যতদিন এগোবে তত পরে বললে ওনাদের খারাপ লাগাটা আরও বাড়বে বই কমবে না। তাছাড়া… তাছাড়া বিবাহিত দম্পতি হয়েও বিগত ছয়মাস যাবৎ আলাদা থাকছো তোমরা। এটাও ভালো দেখায় না। আকাশের দিকটাও বোঝা উচিত। তুমিও নিশ্চয়ই ভালো নেই।‘
প্রিয়া মাথা ঝুকিয়ে ফেলে। লজ্জারা ভির জমায় শাশুড়ির মুখে কথাগুলো শোনা মাত্রই। যদিও আর দশটা শাশুড়ির মতো নন ইনি। ছেলে বা ছেলের বউ, সবার সাথেই বন্ধুর মতো একেবারে। তবুও লজ্জায় আড়ষ্ট হয় প্রিয়া। আলাদা থাকে সে আর আকাশ বিগত ছয় মাস হলো প্রায়৷ কারণও আছে। গুরুতর কারনই। এর আগে আরও দু-দুবার তারা সন্দেহ করেছিলো, প্রিয়া প্রেগন্যান্ট কি-না। প্রিয়ার শারীরিক কিছু অসুস্থতায় আকাশ নিজের মতো করে কাছে আসতে পারছিলো না। গর্ভ নিরোধক সকল জিনিসই প্রিয়ার খাওয়া নিষেধ ছিলো। তাছাড়া সে-সময় অন্তঃসত্ত্বা হওয়াও নিরাপদ ছিলো না প্রিয়ার। ডাক্তার কঠিন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো প্রিয়ার অন্তঃসত্ত্বা হওয়া নিয়ে।
সুতরাং আকাশ নিজ থেকেই দুরত্ব বারিয়েছিলো তখন। প্রিয়ার শরীর স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে। প্রিয়া কে শিফট করিয়েছে আগের রুমে। তবে এমন নয় যে প্রিয়া আকাশের থেকে একেবারেই দূরে থেকেছে। গভীর রাতে ঠিকই বিড়ালছানার মতো ঘুমন্ত আকাশের বুকে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে। আর কঠিন সংযমি পুরুষ দিনের পর দিন ঠোঁট কামড়ে ঘুমন্ত প্রেয়সী কে জড়িয়ে রাত পারি দিয়েছে।
প্রিয়ার লাজুক মুখ দেখে মৃদু হাসলেন আমেনা। শান্ত সুরে বললেন,
—’এখন তুমি সুস্থ পুরোপুরি। ডাক্তার বলেছে কনসিভ করলেও সমস্যা নেই। সুতরাং তোমাদের দাম্পত্য জীবনেও আর দুরত্বের প্রয়োজন নেই। শিয়ার ডেলিভারির ডেট সামনে সপ্তাহে। তবে আমার, তোমার মায়ের দৃঢ় ধারনা অত দেরি করতে হবে না আমাদের। সম্ভবত দু এক এর মধ্যেই শিয়াকে নিয়ে হসপিটালের ছুটতে হবে। ‘
প্রিয়া খানিকটা আড়ষ্ট কন্ঠে বললো,
—’কিন্তু বাবা মা বিষয়টা কিভাবে নেবে। আমি তো বুঝেই পাচ্ছি না।’
—’কোনো অন্যায় করো নি তোমরা। আমাদেরই ভুল। এক বাড়িতে থাকবে। দু’জন দু’জনকে ভালোবাসে। হারামে স্থায়ী কেনো রাখলাম! যদিও তোমার বাবা মায়ের চিন্তাধারাও ঠিক ছিলো। তুমি ছোট ছিলে, এখনও বয়স কম। বিয়ের ঝক্কি সামলানো মুখের কথা নয়। আর তাছাড়া তুমি অতো কিছু না বুঝলেও তোমার শারীরিক সমস্যা গুলো তোমার মা জানতেন। সে কারণেই বিয়ের কথায় তখন রাজি হয়নি। তখন বিয়ে তোমার জন্য সঠিক ছিলো না। সে যাই হোক, খোদা যা করেন ভালোর জন্য করেন। তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা তুমি সুস্থ হয়েছো। ‘
মহিলা দম নিলেন কিছুক্ষন। তারপর প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে ভীষন নরম সুরে বললেন,
—’যেভাবে বললে সব দিক ঠিক থাকবে, আমি সেটাই করবো। ভয়ের দরকার নেই। আমরা আছি। এ নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না একদম। ‘
সন্তুষ্ট হয় প্রিয়া। শুধু আকায় নয়, ওদের গোটা পরিবারই ভীষন দায়িত্বশীল।
—’ঘুমিয়ে পরেছেন?’
মেয়েলি সুঘ্রাণ টা আকাশ পেয়েছে আরও কিছুক্ষণ আগেই। প্রিয়া যখন দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে। কম করে হলেও মিনিট দশেক যাবৎ মেয়েটা দাড়িয়ে ছিলো ওখানটায়। দ্বিধাবোধ করছিলো সম্ভবত। রোজকার কারবার এটা। আকাশ চোখজোড়া বুজেও টের পাচ্ছে কেউ একজন আগ্রহ ভরা দৃষ্টিতে অবলোকন করে যাচ্ছে তাকে। রাত কত বাজে এখন? বোধহয় একটার কাছাকাছি।
প্রিয়া প্রশ্ন টা দ্বিতীয় বার করলো,
—’ঘুমিয়েছেন?’
চট করে তাকালো আকাশ। ঘুমায়নি সে। জেগেই ছিলো। শুয়েছেই সবে আধঘন্টা হলো। প্রিয়া চমকে সোজা হয়ে বসে পরলো বিছানায়। আতঙ্কিত কন্ঠে বললো,
—’ইশশশ, ভয় পেয়েছি তো। জেগে আছেন বলবেন না?’
শোয়া থেকে উঠে বসলো আকাশ। বিছানার হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে মেয়েটার চুপসে যাওয়া মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
—’না ঘুমালে কি করবে?’
—’কি করবো? এমনিতেই জিজ্ঞেস করছিলাম ঘুমিয়েছেন নাকি!’
—’তুমি তো শুনলাম ঘুমিয়ে পরেছো। জেগে ছিলে বুঝি?’
—’না তো। ঘুমাচ্ছিলামই।’
প্রিয়া বই পড়ছিলো বালিশে মাথা ঠেকিয়ে। রাতে এক ওই খাওয়ার টেবিলে মুখোমুখি হয় আকাশের সাথে। সেই অপেক্ষাই করছিলো। তবে আকাশ আজকে ডিনারেও আসেনি। অগত্যা দেখাও হয়নি। শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছিলো আকাশ কখন আসবে। কখন চোখ লেগে গিয়েছিলো টেরই পায়নি সে। ঘুম ভাঙতেই হুড়মুড়িয়ে উঠে চলে এসেছে আকাশের রুমে। আকাশ গম্ভীর মুখে বললো,
—’ক্লাস কেমন চলছে?’
—’ভালোই।’
—’ইনকোর্স এক্সাম কেমন দিলে, জিজ্ঞেস করা হয়নি।’
—’ওটাও ভালো। রিমির বাবা বিয়ের কথা বলছে এ মাসের শেষেই।’
‘হ্যা’ সূচক মাথা নাড়লো আকাশ। প্রিয়া আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—’এ মাস টা ভীষন মজায় কাটবে তাইনা? রিমি আর রাতুল ভাইয়ের বিয়ে, আমাদের বাড়িতে একটা পুচকু আসবে। সব মিলিয়েই। ‘
মেয়েটার মুখজুড়ে সত্যিই খুশিরা এসে ভির জমালো জেনো। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। আকাশ ভ্রু কুচকে রাখলো। গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
—’আর কিছু নেই?’
—’আর কি!’
দীর্ঘশ্বাস ফেললো আকাশ। হাত বাড়িয়ে এসিটা বন্ধ করে দিয়ে বললো,
—’কিছুনা। ঘরে যাও, ঘুমাও। এতো রাতে আমার রুমে কেউ দেখে ফেললে দুর্নাম রটে যাবে।’
খিলখিল করে হেসে উঠলো প্রিয়া। পরক্ষণেই শব্দ থামাতে মুখ চেপে ধরলো নিজের। এটা তার বলা কথা। এর আগে বলেছিলো। গত সপ্তাহেই, প্রিয়ার বাবা মা ফেরার পরের দিন সম্ভবত — আকাশ খুব উতলা হয়ে গিয়েছিলো তার ঘরে। দিনের পর দিন বিবাহিত বউ দূরে রাখতে রাখতে হাপিয়ে গিয়েছিলো সে! সংযম ভেঙে কাছে চেয়েছিলো প্রিয়া কে। কিন্তু সেদিন কাছে আসতে দেয়নি প্রিয়া। কমবেশি সবাই আজকাল রাত জাগে শিয়ার জন্য।
এমন অবস্থায় সে আকাশের ঘরে, এটা বাবা, মা কারোর চোখে পরলে বিচ্ছিরি কান্ড ঘটে যাবে। একপ্রকার অভিমান করেই চলে এসেছিলো আকাশ। এ দশদিনে আর ভুলেও প্রিয়ার ঘরে পা রাখেনি। প্রিয়াও আসেনি ভয়ে। প্রিয়ার হাসিতে বিরক্তির রেখা ফুটলো আকাশের চোখেমুখে। বিরক্ত মাখা কন্ঠে বললো,
—’হাসির কি বললাম?’
—’বলেননি?’
—’মনে তো হয় না।’
—’না মনে হলো, ঘরে যাও এখন। ‘
প্রিয়া গেলো না। নড়লোও না। উল্টো ঘনিষ্ঠ হয়ে এলো বেশ খানিকটা। শান্ত সুরে বললো,
—’গতকাল আমি, মা আর আপু ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। আমার রিপোর্ট গুলো এসেছে কালকেই।’
চট করে প্রিয়ার মুখের দিকে তাকালো আকাশ। মুখে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না। উত্তরও প্রিয়াই দিলো।
—’আর কোনো সমস্যা নেই। পজিটিভ রিপোর্ট সব। আমি পুরোপুরি সুস্থ। ‘
আকাশের মুখেট ভাবান্তর দেখতে পাওয়া গেলো না। এটা সে আরও আগে থেকেই জানে। পরীক্ষা গুলো করা হয়েছিলো প্রায় দশদিন আগে। ডাক্তার সাহেব, আকাশের বন্ধু। আকাশ তার থেকেই জেনে নিয়েছিলো সবটা। কাগজপত্র হাতে আসলো হয়তো সবে কালকে। সে না জেনে হটকারিতায় নিশ্চয় সেদিন প্রিয়ার ঘরে যায়নি! এতোটাও উন্মাদ সে নয়। যে নারীর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে বিবাহিত জীবনের স্যাক্রিফাইজ করে দিনের পর দিন দূরে থাকছে। মেয়েটার কি ভাবা উচিত ছিলো না –কেনো সেদিন আকাশ সে সংযম ভাঙতে মরিয়া ছিলো! মেয়েটা বলার সুযোগ তো দিলোই না। উল্টো বাচ্চামি শুরু করে দিলো আতঙ্কে।
আকাশও আর জোর করেনি সে কারনে। এতদিন দুরত্ব করে থাকতে পারলে, আর কয়টাদিনও পারবে। তাছাড়া মা বাবার সাথে কথা হয়েছে তারও। রাতুল, রিমির বিয়ের আগে প্রিয়া আর তার বিয়েটা আয়োজন করে দেওয়া হবে। এই কয়টা দিনেরই তো ব্যাপার। এ মাসেই আকাশ গম্ভীর মুখে বললো,
—’শিয়ার কথা কি বলেছে? এ সপ্তাহেই ডেলিভারি?’
প্রিয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে এলো। সে কি বললো, আর লোকটা কি জবাব দিলো! গম্ভীর মুখ বানিয়ে অস্ফুটে বললো,
—’হু।’
—’ওকে।’
—’আমি কি বললাম?’
—’হু, শুনলাম তো। সুস্থ এখন তুমি।’
প্রিয়া অবাক হয়। মেয়েটার উত্তপ্ত শরীর একদম লেপটে আছে আকাশের সাথে। আকাশের বাঁ হাত টা জড়িয়ে আছে মেয়েটা। প্রিয়া ব্যাস্ত হয়ে শুধালো,
—’মা আপনাকে কিছু বললেন নি?’
ভ্রু কুঁচকায় আকাশ। না জানার ভান করে প্রশ্ন করে,
—’কি বলবে?’
—’আমাদের বিষয়ে।’
—’কই, কি বিষয়ে?’
প্রিয়া থমকে যায় কিয়ৎক্ষন। পরক্ষণেই উচ্ছাস আর লজ্জামাখা কন্ঠে বলে ওঠে,
—’আমাদের…আমাদের বিয়ে।’
—’ওহ্।’
আকাশ আধসোয়া হলো খানিকটা। মাথার নিচে হাত গুঁজে বললো,
—’এখন ভীষন ব্যাস্ততা। এতো সবের সময় নেই আমার।’
প্রিয়া হতভম্ব হয়। বলে কি এ লোক! কাছে পেতে পাগলামির শেষ নেই। এতোগুলো দিন বউকে কাছে পায়না৷ তাও নাকি সবাইকে জানিয়ে বিয়ের কোনো প্ল্যান নেই! প্রিয়া অবাক কন্ঠে বললো,
—’আপুর ডেলিভারির পর আমরা বাসায় চলে যাবো। বাবা মার সাথে। তাহলে? তখন? ‘
—’তখন কি?’
বিরক্ত হয় প্রিয়া। তখন কি মানে! তার বাবা মা কি আর জানে তাদের মেয়ে বিয়ে,বাসর সব সেরে বসে আছে। অবিবাহিত মেয়ে হিসেবে বগলদাবা করে নিয়ে বিদেয় হবে। তারপর! দেখা হবে না,কাছে আসা হবে না। এমনিতেই ছয়টা মাস আদর পায়না লোকটার। এখন বাবা মায়ের সাথে ফিরে গেলে, আরও কয় বছর অপেক্ষা করতে হবে। এটায় আকাশ রাজি! প্রিয়া হতভম্ব কন্ঠেই বললো,
—’আমাকে কাছে পাবেন না। বুঝছেন না সেটা?’
আকাশ নির্বিকার কন্ঠে বললো,
—’এখনো পাচ্ছি কোথায়!’
প্রিয়া থমকায়। লোকটা এতো বোকা কবে থেকে হয়ে গেলো! নাকি রাগটাগ করেছে! সে কি বুঝতে পারছে না, আজ প্রিয়া কেনো এসেছে! প্রিয়া মাথা ঝুকিয়ে মিহি কন্ঠে বললো,
—’আমি সুস্থ তো এখন।’
আকাশের কন্ঠস্বর এখনো গম্ভীর।
—’তোমার বাবা মা পাশের রুমে, প্রিয়া। ঘরে যাও। একটু আগেও টের পেয়েছি জেগে আছেন সবাই। শিয়ার হাত পায়ে তেল মালিশ করছিলো। তুমি এতো রাতে এখানে, সেটা টের পেলে বাজে বিষয় হবে।’
—সেদিন যখন পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিলেন তখন সে খেয়াল ছিলো না?’
এবার সম্ভবত একটু বেশিই বিরক্ত হলো আকায়। গম্ভীর গলায় বললো,
—’ছিলো না। মনে করিয়ে দিয়েছিলে তুমি। তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করেছি তো। এখন আর ভুলতে পারছি না তোমার সেই কথা। আর যাইও তো না। ঘরে যাও।’
প্রিয়া স্পষ্ট টের পেলো আকাশের অভিমান। কয়েকদিন পর তাদের বিবাহবার্ষিকী। আকাশের কি মনে আছে সেটা! আচ্ছা সেদিন লোকটাকে একটা সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়! প্রিয়া ঠোঁট কিছু একটার পরিকল্পনা আটলো সম্ভবত। মুচকি হাসলো। প্রিয়া সরে বসলো আকাশের থেকে। গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে বিছানা থেকে নামতে নামতে বললো,
আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৮
—’বেশ৷ মনেই রাখুন সে-সব। ঘুমান। গুড নাইট।’
প্রিয়া দাঁড়ালো না,আর না তো আকাশ তাকে আটকালো! প্রিয়া চলে যেতেই মুখের হাসি প্রস্যস্ত হলো আকাশের। ম্যাডামের রাগ ঘটা করেই ভাঙাবে সে। অ্যানিভারসারি আসছে।তাছাড়া শিয়ার বেবিটা হওয়া মাত্র তাদের বিয়ের আয়োজন শুরু হবে। এই সপ্তাহটাই দুরত্ব আর!
