Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১
নুসাইবা আরা নুরি

সদ্য বিয়ে করা নব বধূকে ঘরের সামনে পর্যন্ত নিয়ে এসেই নিজের মিশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে নেভীর সিনিয়র অফিসার লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা। বউয়ের চেহারাটা পর্যন্ত একবার ও দেখে নি। মেহেরাজকে আটকাতে মেহেরাজের মা নাহিদা খাতুন দৌড়ে গেলেন মেহেরাজের কাছে। কিন্তু মেহেরাজের সোজাসাপ্টা উত্তর,,,

-মা বিয়ে করতে বলেছো বিয়ে করেছি এখন এর থেকে বেশী কিছু তোমরা আমার থেকে আশা করো না। এই বিষয়ে যদি আর কোনো জোরাজোরি করো তাহলে আর কখনো এ বাড়ি মুখো হবো না আমি।
কথাটা বলেই হেড অফিস থেকে আসা গাড়ি করেই ক্যাম্পের উদ্দেশ্য রওনা দেয় মেহেরাজ।
পুরো বাড়িতে কানাঘুষো শুরু হয়ে গেছে বরের চলে যাওয়া নিয়ে। আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশী নানা রকমের কথা বলছেন

-এইভাবে মেয়েটার মুখ না দেখেই বর চলে গেল। নিশ্চয় মেয়েটার মধ্যে কোনো সমস্যা আছে।
-আরে মেয়েটাকে দেখতে অতোটা ভালো না নিশ্চয় মেহেরাজের পছন্দ হয় নি তাই তো ফেলে চলে গেছে।
-কি দেখে যে অমন সুন্দর একটা ছেলের সাথে এরকম একটা মেয়ের বিয়ে দিলো কে জানে?
এরকম আরো নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে সবার মাঝে। আর এই সব কিছুর মূল হর্তা হচ্ছেন আছিয়া রহমান অর্থাৎ মেহেরাজের খালা। তিনিই সবার মাঝে মেহেরাজের চলে যাওয়ার কথাটা ছড়িয়ে দিয়েছেন।
মেহেরাজের চলে যাওয়ার খবরটা শ্রেয়সীর কানেও এসেছে। শ্রেয়সী শেখ যে বর্তমানে লাল বেনারসী সারা গায়ে গয়না মাথায় ঘোমটা হাতে মেহেদী নিয়ে বসে আছে মেহেরাজের ঘরে। কিন্তু আফসোস যার জন্য এতো সাজ সে একবরের জন্য ও দেখলো না। মেহেরাজের ঘরটা খুব সুন্দর করে বিভিন্ন রকমের ফুল ফেইরী লাইট দিয়ে সাজানো। শ্রেয়সী সামনে থাকা ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় একবার তাকালো। মুখে তেমন কোনো কৃত্রিম মেকআপ এর আস্তরণ নেই। শুধু ঠোঁট এ লিপস্টিক আর কপালে একটা কালো টিপ। এই টুকু সাজেই শ্রেয়সীকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। শ্রেয়সীর চোখ বেয়ে এক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ে। এইভাবে লোকটা ওকে অপমান করলো? কেন? শ্রেয়সীর কি দোষ? কথাগুলো ভেবেই পুনরায় ফুপিয়ে উঠলো শ্রেয়সী।

ড্রয়িং রুম এ বসে আছেন নাহিদা খাতুন।নিলয় মির্জা,, আছিয়া রহমান,, মোস্তফা রহমান,, শারমিন খাতুন,, আর হাসান সাহেব।
মেহেরাজের বাবা নিলয় মির্জা চিন্তিত গলায় বলে ওঠলেন,,,,,
-আমি কখনো ভাবতেই পারি নি যে আমার ছেলে মেহেরাজ এমন একটা কাজ করবে। পুরো সমাজ পরিবার সবার সামনে আমার মাথা নিচু করে দিলো। এরকম একটা কাজ করার আগে একবার ও আমাদের কথা টা ভাবলো না ও?‌
নিলয় সাহেবের কথা শুনে মেহেরাজের দাদা হাসান সাহেব বলে ওঠে,,,,,
-ওর কি দোষ ?তোরা সবাই তো জোর করে বিয়ে টা দিলি তাও আবার নাহিদার মিথ্যা অসুস্থতার নাটক করে ও তো বিয়ে করতে চায়নি কিন্তু তোরা কি করলি মিথ্যে রিপোর্ট সাজালি নাহিদা মায়ের অসুস্থতার শেষমেষ নাহিদা মায়ের কসম ও দিলি ওকে। তোরা তো সবাই জানিস নাহিদা মা কতটা দুর্বল জায়গা ওর
আছিয়া রহমান ও হাসান আহমেদের কথায় সায় জানিয়ে বলে ওঠলো,,,,
-আপনি ঠিকই বলেছেন বাবা।তোমরা সবাই তো জানতে না মেহেরাজ আমার মেয়ে নাবিলাকে পছন্দ করে। অনেক বার তো এটা কানেও এসেছে যে ওদের মধ্যে সম্পর্ক ও রয়েছে। তাহলে তোমরা কি করে মেহেরাজের সাথে ঐ মেয়ের বিয়ে দিলে?

ওদের কথোপকথন এর মাঝেই বাইরে থেকে বাড়ির কেয়ারটেকার আব্দুল্লাহ ছুটে এসে বলতে শুরু করে,,,,
-বড় মালিক নতুন ভাবির বাড়ির লোকজন আইতাসে এনে।
আব্দুল্লার কথা শুনেই সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ওরা কেউ শ্রেয়সীর বাড়ির লোকজন কে মেহেরাজের চলে যাওয়া নিয়ে কিছু জানায় নি। ভেবেছিল আরো দু তিন দিন পর ওদের সাথে বসে এই বিষয়ে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করবেন। কিন্তু এখন তো….
ওদের চিন্তার মাঝেই ঘরে ভেতর প্রবেশ করেন শ্রেয়সীর বাবা আলতাফ শেখ ও শ্রেয়সীর ভাই সিয়াম শেখ। দুইজনেই অগ্নিমূর্তি ধারণ করে আছেন। ওদের দুজনকে দেখে হাসান সাহেব কিছু বলবেন তার আগেই আলতাফ শেখ তাকে থামিয়ে নিলয় সাহেবের উদ্দেশ্য বলতে শুরু করেন,,,
-“আপনাদের সাহস কি করে হলো এত বড় কথা আমাদের থেকে লুকানোর? আপনাদের ছেলের বিয়েতে মত না থাকলে আমাদের বলে দিতে পারতেন আমরা কি জোর করেছিলাম আপনাদের ছেলের বিয়ে আমার মেয়ের সাথে দিতে? কেন এভাবে আমার মেয়ের সাথে এমন করলেন আপনারা?
আলতাফ শেখ এর কথা শুনে নিলয় সাহেব উনাকে বুঝানোর উদ্দেশ্য বলে ওঠেন,,,,
-আপনি একটু শান্ত হন ভাই। দেখুন আমরাও বুঝতে পারি নি যে এমন কিছু হবে। আ..
নিলয় সাহেব আর কিছু বলার আগেই সিয়াম বলে ওঠে,,,,,

-কি বুঝতে পারেন নি আপনার ছেলে বিয়ের পরে এভাবে চলে যাবে এটা নাকি আপনার ছেলের এই বিয়েতে মত ছিল না সেটা? আচ্ছা সবকিছু মানলাম কিন্তু আপনার ছেলে যে আজ বিয়ের পর আমার বোনের মুখটা পর্যন্ত না দেখে চলে গেছে সেটা কি একবারো জানিয়েছেন আমাদের আপনারা? একবারো প্রয়োজনবোধ করেননি না? কেন আপনারা খুব পাওয়ারফুল বলে? আপনি আর্মির জেনারেল আপনার ছেলে নেভির কমান্ডার এই কারণেই আমাদের আপনারা মানুষ মনে করেননি না?
-না না এমন কিছু না।
-থাক আর কোনো কিছু বুঝাতে হবে না আমরা আজকেই আমার বোনকে এখান থেকে নিয়ে চলে যাব।
সিয়ামের কথা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়।হাসান সাহেব। মুহুর্তেই এর বিরোধিতা করে বলেন,,,,
-না না এটা কি বলছো তুমি? এইভাবে একটা সম্পর্ক চাইলেই ভাঙা যায় না ?
-কিসের সম্পর্ক ও যার হাত ধরতে এখানে এসেছে সে তো ওর মুখ দেখতেও নারাজ । এমন সম্পর্কে আমার বোনকে রাখবো না আমরা । ওকে নিচে নিয়ে আসুন.
নাহিদা খাতুন শান্ত সুরে বলেন,,,,,,

-বাবা একটু বোঝার চেষ্টা করো এইভাবে বিয়ের দিনেই এমন একটা কাজ করো না।
-আপনার ছেলে যখন চলে যাচ্ছিলো তখন ওকে বোঝাতে পারেননি যাতে বিয়ের দিন এমন কাজ না করে।
মূহূর্তেই চুপসে যায় নাহিদা খাতুন। আর কিছু বলার মতো মুখ নেই উনার। কিই বা বলবে যেখানে নিজের ছেলে এমন একটা কাজ করেছে।
ধীরে ধীরে সিড়ি বেয়ে নিচে নিয়ে আসা হয় শ্রেয়সীকে। চোখমুখ ফুলে আছে মেয়েটার । দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ভীষণ কান্না করেছে। মেয়েকে দেখেই বুক মোচড় দিয়ে ওঠে আলতাফ শেখ এর। একদিনেই মেয়েটার অবস্থা নাজেহাল। মেয়ের হাত ধরেই শ্রেয়সীকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকে আলতাফ শেখ । ঘরের চৌকাঠ পেরোনোর সময় শ্রেয়সীর চোখের সামনে ভাসতে থাকে ঘরে প্রবেশ করার দৃশ্যটি।

কেটে গেছে দুটো দিন। দুদিন পরেও শ্রেয়সীদের বাড়ির পরিস্থিতি থমথমে। এখন সময় সকাল ৯ টা শ্রেয়সী হাতে নিয়ে বসে আছে ডিভোর্স পেপার। যেটা মেহেরাজের বাড়ি থেকে এসেছে। কাগজটাই জলজল করছে টানাটানা লেখা মেহেরাজ মির্জা সাইনটা। সাইনটার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্রেয়সী। এখানে মেহেরাজের সাইন আছে তার মানে মেহেরাজ এখানে এসেছে আর তারপরেই এই সাইন করেছে আর নই তো যেখানে গেছে সেখান থেকেই এই ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে শ্রেয়সীর জন্য। এত তাড়া কিসের বিয়েটা ভেঙে দেওয়ার? শ্রেয়সী তো চলেই এসেছিলো ওখান থেকে শুধু নামটাই জুড়ে ছিল অচেনা মানুষটার সাথে সেটা নিয়েও এতো সমস্যা। শ্রেয়সীর ভাবনার মাঝেই সিয়াম শ্রেয়সীর মাথায় হাত রেখে বলে,,,,

-বোনু সাইনটা করে দে। এই অসুস্থ সম্পর্কটা থেকে মুক্তি পাবি তুই।
সিয়ামের কথাটা শুনে শ্রেয়সীর বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। কাপা কাপা হাতে কলমটা তুলে নেয় শ্রেয়সী। সাইন করতে চাইলেও হাত কেপে ওঠছে শ্রেয়সীর। বুকের ভেতর রক্তকরণ হচ্ছে প্রচুর। তারপরও কাপাকাপা হাতে সই করে দেই শ্রেয়সী। শেষ হয়ে যায় একটি সম্পর্ক। কিন্তু সত্যিই কি শেষ নাকি শুরু হতে চলেছে নতুন গল্পের।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here