লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২
নুসাইবা আরা নুরি
কেটে গেছে কয়েক মাস। এই কয়েক মাসে বদলে গেছে অনেক কিছু। বদলেছে শ্রেয়সীর জীবন এর সমীকরণও। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে উঠেছে শ্রেয়সী।যখন ওর বিয়ে হয়েছিল তখন ছিল দশম শ্রেণিতে। দেখতে দেখতে স্কুল জীবন শেষ। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই হয়েছে শ্রেয়সীর।
শ্রেয়সী জীবনের পুরোনো ঘটনা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে যদিও জিনিসটা ওর জন্য অতটা সহজ ছিল না। কিন্তু জীবন তো আর কারো জন্য থেমে থাকে না, ঠিক তেমনি শ্রেয়সীর জীবনও থেমে নেই। হ্যাঁ এটা সত্যি, শ্রেয়সী এখনো ওই মানুষটাকে পুরোপুরি ভুলতে পারেনি। কিন্তু ও বিশ্বাস করে, যখন এতটা নিজেকে সামলাতে পেরেছে তাহলে একদিন নিশ্চয়ই ওই মানুষটাকেও ঠিক ভুলে যাবে শ্রেয়সী। যার শ্রেয়সীকে দরকার নেই, শ্রেয়সীর ও তার দরকার নেই হু।
শ্রেয়সীর পরিবারে বিয়েটা নিয়ে এখন আর কোনো রকম কথাবার্তা হয় না। এখন এই বাড়িতে ওই বিয়ের কথা তোলা ও নিষেধ। যে সমস্ত বিয়ের চিহ্ন ছিল—বিয়ের কার্ড, ওই বাড়ি থেকে দেওয়া শ্রেয়সীকে সোনার বালা, নাকফুল, চেইন—সব ডিভোর্স পেপারের সাথেই আলতাফ শেখ ওই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে।
শ্রেয়সীকে এখন তার পরিবার একটা সুন্দর জীবন দিতে চায়। আর তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে শ্রেয়সীকে নাম করা কলেজে ভর্তি করাবে।যদিও শ্রেয়সী রাজি ছিলো না।তবে যখন শ্রেয়সীর প্রিয় বান্ধবী ইরু ভর্তি হয় তখন শ্রেয়সীও ভর্তি হয় চট্রগ্রাম “নৌবাহিনী স্কুল এন্ড কলেজে”।
সকাল থেকেই শ্রেয়সীর ব্যস্ততা আকাশ ছোঁয়া। আজকে কলেজে অ্যানুয়াল ফাংশন। ডিসপ্লে তে নাম দিয়েছে শ্রেয়সী। তাই তার সকাল থেকে এত তোড়জোড়।যদিও ইরুও দিয়েছে।তবে ইরুর এসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই।যত চিন্তা সব শ্রেয়সীর।
শ্রেয়সীর এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি দেখে শ্রেয়সীর মা খাদিজা খাতুন শ্রেয়সীকে পার্লারে যেতে বলে তবে শ্রেয়সী যাই না।পরে বাধ্য হয়ে সিয়ামের নতুন বিয়ে করা বউ তোহা শ্রেয়সীকে সাজিয়ে দেয়।সিয়াম আর তোহার বিয়ে হয়েছে আজ এক মাস।
শ্রেয়সীর পরনে রানী গোলাপী রঙের একটি শাড়ি। ফরসা শরীরে মানিয়েছে দারুণ। আর ইরু পরেছে লাল রঙের একটি শাড়ি। ইরুকেও দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে।ভিডিও কলে দেখছে দুজন দুজনকে।
শ্রেয়সী নিজের খোঁপা ঠিক করে আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখে নিল। হ্যাঁ, ঠিক লাগছে। ওকে একদম পারফেক্ট। তোহা শ্রেয়সীর গাল দুটো টেনে বলে,,,,
-আমার ননদিনীর উপর কারোর নজর না লাগুক মাশাল্লাহ।
তোহার কথায় শ্রেয়সীর লজ্জা পায়।কিন্তু ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই শ্রেয়সীর চক্ষু চড়কগাছ। ঘড়িতে সকাল ৯টা বাজে। ওদের প্রোগ্রাম শুরু হবে ৯টা ৩০ এ। মিহি তাড়াহুড়া করে ইরুকে বাড়ি থেকে বের হতে বলে কল কেটে দেয়।তারপর নিজেও সম্পূর্ণ রেডি হয়ে যেতেই কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে।
রিকশা করে কলেজ গেইটের সামনে নামতেই চোখে পড়ে কলেজের গেইটের সাজসজ্জা। গেইট যেহেতু এত সুন্দর করে সাজিয়েছে, ক্যাম্পাস নিশ্চয় আরও সুন্দর করে সাজানো—কথাটা ভেবেই কলেজে ঢুকে পড়ে শ্রেয়সী আর ইরু।
কলেজের ভিতরে ঢুকতেই দেখতে পেল কিছু নীল সমুদ্র রঙের পোশাক পরিহিত লোক হাতে ইয়া বড় বড় বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হ্যাঁ, এরা নেভির লোক। কলেজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাংশনে এনাদের আগমন হয়।
এত পাহারার কি আছে কলেজে? কি কেউ পারমাণবিক বোমা মারবে নাকি! যতসব—কথাটা ভেবেই ভেংচি কাটল শ্রেয়সী।
শ্রেয়সী আর ইরু কোনোদিকে আর না তাকিয়ে ডিসপ্লে গার্লদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে চলে যায়।
রুমে বসে আলতা পরছে শ্রেয়সী পাশে ইরু নাচের প্র্যাকটিস করছে। পুরো রুমে আরও অনেক মেয়েরা রয়েছে—কেউ ডান্স প্র্যাকটিস করছে, কেউ কথা বলছে, কেউ ছবি তুলছে।আবার কেও নিজেদের পোষাক ঠিক করছে।
এত শোরগোলের মধ্যেই ড্রাম আর বাশির শব্দ বেজে উঠল। পরপর বাজতেই থাকল। শ্রেয়সী পাশে থাকা জানালা দিয়ে একবার উঁকি দিয়ে তাকাল।
ওই তো নেভি রঙের ড্রেস পরিহিত দুই সারি স্কাউট প্যারেড করছে। নিশ্চয় প্রধান অতিথি আসছে। শ্রেয়সী চট্রগ্রাম থাক্লেও এই প্রথম এইসব দেখছে, তাই উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল সেদিকে।
স্কাউটদের মাঝখান দিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলো সাদা পোশাকধারী এক দীর্ঘদেহী অবয়ব। মাথায় টুপি, কাঁধে হরেক রকমের ব্যাচ, চোখে রোদচশমা, হাতে রোলেক্সের ঘড়ি, পায়ে কালো পালিশ করা বুট জুতা। নিঃসন্দেহে বলা যাবে, এই লোক মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন। তার আগমনে স্বাগত জানাতে উপস্থিত আছে কলেজের প্রিন্সিপাল থেকে শুরু করে ভাইস প্রিন্সিপাল শিক্ষক শিক্ষিকা।শ্রেয়সীর কপালে জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুহূর্তেই বুকে হাত চলে যায় শ্রেয়সীর। শ্রেয়সী হতভম্বের মতো চেয়ে থাকতে থাকতে আওড়ায়—
— কে এই লোক?
তখনই বাইরে থেকে আসা শীতল বাতাস ছুঁয়ে যায় শ্রেয়সীকে।জানালায় লাগানো একটা গাধা ফুল ছিড়ে পড়ে হাতে। এক টুকরো প্রশান্তি যেন ছড়িয়ে পড়ে শ্রেয়সীর অন্তরে।
খুব ভালোভাবেই কিছুকক্ষন আগে শেষ হয়েছে শ্রেয়সী দের ডিসপ্লে। স্যার ম্যামরাও অনেক প্রশংসা করেছে। বর্তমানের শ্রেয়সী বসে রয়েছে ডিসপ্লে গার্লদের রুমে। শ্রেয়সীর কেনো জানিনা কিছুই ভালো লাগছে না। কেমন এমন অনুভূতি হচ্ছে ওর। তখনি হঠাৎ শ্রেয়সীর ক্লাসমেট মাইমুনা এসে বলল,,,
এই শ্রেয়সী চল। শারমিন ম্যাম আমাদের সব ডিসপ্লে গার্লদের নিয়ে একটা গ্রুপ ফটো তুলবে। ইরু ওখানেই আছে তোকে খুজছে।
মাইমুনার কথায় শ্রেয়সীও মাইমুনার সাথে রওনা হয়। বাইরে এসে দেখতে পায় ম্যাম সব মেয়েদের স্টেজে তুলছে যেখানে আগে থেকেই বসে আছেন তখনকার সেই সুদর্শন নেভিয়ান। শ্রেয়সীর পা থমকে যায়।বুকের ভিতর কেমন দ্রিম দ্রিম শব্দ বেজে উঠে।
-কিরে শ্রেয়সী দাড়িয়ে পড়লি কেন চল?
কথাটা বলেই শ্রেয়সীকে আর কোনো কিছু বলতে না দিয়েই টানতে টানতে স্টেজের কাছে নিয়ে এলো মাইমুনা।
স্টেজের কাছাকাছি আসতেই পুনরায় শুরু হলো সেই ধুকপুকানি। শ্রেয়সী শুনতে পাচ্ছে লোকটা কারো সাথে কথা বলছে কাটকাট গলায়।শ্রেয়সী টের পাচ্ছে শরীরের কম্পন। মনে হচ্ছে এক্ষুনি এখানে গগান হারাবে সে।শ্রেয়সী দেখে লোকটা কেও একজনের সাথে বেশ স্মীত ভাবে হেসে কথা বলছে শ্রেয়সী যেনো মুগ্ধ হয়ে যায় সেই হাসিতে।
গ্রুপ ফটো তোলার পর সবাই যখন মে আসে তখন শ্রেয়সী ও নেমে আসে স্টেজ থেকে।তবে হটাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই স্টেজে উঠে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুজতে শুরু করে।
-এই শ্রেয়সী কি খুজছিস?
ইরুর কথায় শ্রেয়সী চিন্তিত কন্ঠে বলে,,,
-আমার একটা নুপুর কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। তুই একটু দেখ না ইরু।গত সপ্তাহেই আব্বু কিনে দিয়েছিলো ওটা।
ইরু শ্রেয়সীর কথা শুনে শ্রেয়সীর পায়ের দিকে লক্ষ্য করতেই দেখে শ্রেয়সীর এক পা খালি।
-আচ্ছা দাড়া দেখছি।
কথাটা বলে ইরু ও খুজতে শুরু করে। শ্রেয়সী নুপুর খুজছিল তখনি কানে আসে এক গম্ভীর ভরাট পুরুষালী কন্ঠ।
-এই মেয়ে..?
শ্রেয়সী কন্ঠ অনুসরণ করে পাশে তাকাতেই দেখতে পাই সেই নেভিয়ানকে। যে দাম্ভিকতার সাথে পকেটে হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে। লোকটা কে দেখতে পেতেই পুনরায় শুরু হয় বুকের ধুকপুকানি শুরু হয় শরীরের কম্পন। শ্রেয়সীকে তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেহেরাজ এক পা এগিয়ে শ্রেয়সীর সামনে এসে বলে,,
-কোন ক্লাস?
শ্রেয়সী কাপা কাপা কন্ঠে বলে,,,
-আমা কে বল ছেন?
-তোমার কি মনে হয়?
শ্রেয়সী আর কিছু বলবে তখনি কোথা থেকে ইরু এগিয়ে আসতে আসতে বলল,,,,
-এই শ্রেয়সী কার সাথে কথা বলছিস?
শ্রেয়সীর কাছাকাছি আসতেই সামনের লোকটাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল ইরু। এতো আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। এনার সাথে শ্রেয়সী কি কথা বলছিল?
ইরু মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে শ্রেয়সীর হাত ধরে বলল,,,
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১
-শ্রেয়সী চল পরে খুজে নিবো।
কথা টা বলেই শ্রেয়সীর হাত ধরে নিয়ে চলে গেল ইরু।
ওরা চলে যেতেই পকেট থেকে একটা পায়েল বের করে সেটা উপরে তুলে আবারো হাতের মুঠোই এনে মেহেরাজ বিড়বিড় করল,,,,
-শ্রেয়সী??কোথায় যেনো নামটা শুনেছি আমি আগেও একবার।
