উন্মাদনা পর্ব ৪২
কায়নাত খান কবিতা
‘খাইতে পারোস?’
‘এ্যা?’
‘বলতাছি, খাইতে পারোস?’
অভীর প্রশ্ন শুনে ঠোঁট বাঁকিয়ে ফেলে আনন্দী। কোনো উত্তর না দিয়ে নিরবে ডাইনিং রুমের দিকে পা বাড়ায় সে। তার মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে, ভেতরে ভেতরে রাগে জ্বলছে সে। তবে এই মুহূর্তে অভীর সঙ্গে আর কোনো বাকবিতণ্ডায় জড়ানোর ইচ্ছে নেই তার। কারণ সে খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছে, এই লোকের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে জেতা অসম্ভব।
অভীও ধীর পায়ে তার পিছু নেয়। কিন্তু ডাইনিং রুমে পৌঁছানোর আগেই সদর দরজার সামনে গিয়ে থেমে যায় সে। তারপর দরজার লোহার আংটায় বিশাল আকৃতির একটি তালা ঝুলিয়ে দেয়। ধাতব চাবিটি তালার ভেতর ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে দেয়। আনন্দী কপাল কুঁচকে তাকায় অভীর দিকে!
‘এটা কী হলো?’
চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে অভী নির্বিকার ভঙ্গিতে তার দিকে তাকায়। তারপর যেন অত্যন্ত স্বাভাবিক কোনো কথা বলছে এমন ভঙ্গিতে বলে,
‘বউ আটকানোর সবচেয়ে সহজ উপায়।’
কথাটা শুনে আনন্দীর ভ্রু আরও গভীরভাবে কুঁচকে ওঠে। চোখেমুখে জমে ওঠে তীব্র অসন্তোষ।
‘আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী আমাদের বিয়ে হয়নি।’
কর্কশ গলায় বলে সে,‘আমি তো কিছুই জানতাম না। আমার কোনো মতামতও নেওয়া হয়নি। আমার ইচ্ছেও ছিলো না। একজন মুসলিম মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে বৈধ হয় না।’
প্রতিটি শব্দের সঙ্গে যেন জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান আর প্রতিবাদ মিশে ছিলো। এতক্ষণ ধরে নিজেকে সংযত রাখলেও এবার আর পারলো না আনন্দী।কিন্তু অভীর মুখের অভিব্যক্তিতে সামান্য পরিবর্তনও দেখা গেল না।
মনে হলো কথাগুলো সে শুনেছে ঠিকই, অথচ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।কোনো উত্তর না দিয়ে গলায় গামছা ঝুলিয়ে সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায় সে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভেতর থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে আসে।
আনন্দী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই দ্রুত পায়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যায়। একবার হাত বাড়িয়ে তালাটি টেনে দেখে। লোহার ভারী তালাটি সামান্যও নড়ে না। বিরক্তিতে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
দুই হাতে দরজার কপাট আঁকড়ে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে টান দেয় সে। পুরোনো কাঠের দরজাটির দিকে তাকিয়ে এতদিন তার ধারণা ছিল, সামান্য একটি ধাক্কাই যথেষ্ট—মুহূর্তেই ভেঙে পড়বে সেটি। কিন্তু আজ সে উপলব্ধি করে, বয়স বাড়লেও কিছু কিছু জিনিসের দৃঢ়তা কখনো ফুরিয়ে যায় না।
বহু বছরের পুরোনো সেই দরজাটি যেন নিজের অস্তিত্ব মাটির গভীরে প্রোথিত করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অটল, অবিচল।
আনন্দী আবারও চেষ্টা করে। একবার নয়, বারবার। কিন্তু প্রতিবারই তাকে ফিরতে হয় ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে। শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে দরজার সামনেই থমকে দাঁড়ায় সে। দ্রুত ওঠানামা করতে থাকে তার বুক। আর ভেতরে ভেতরে বিরক্তি, ক্ষোভ ও অসহায়তার ভার জমতে জমতে যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
ওয়াশরুমের ভেতর থেকে অবিরাম পানির শব্দ ভেসে আসতে থাকে। আর সেই একঘেয়ে শব্দের মাঝেই আনন্দীর মনে হতে থাকে, এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহ্য, সবচেয়ে বিরক্তিকর মানুষটির নাম অভী। লোকটা যেন ইচ্ছে করেই তার ধৈর্যের শেষ সীমাটুকু পরীক্ষা করে যাচ্ছে। যতবার তার কথা মনে হচ্ছে, ততবারই বিরক্তিতে মুখ আরও গোমড়া হয়ে উঠছে আনন্দীর।
গোসল সেরে কিছুক্ষণ পর ডাইনিং রুমে প্রবেশ করে অভী। ভেজা চুলে গামছা ঘষতে ঘষতে হেঁটে আসে সে। শরীরে তড়িঘড়ি করে গলানো একটি পাঞ্জাবি, মুখে অদ্ভুত রকমের স্বাভাবিকতা। যেন কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।
ডাইনিং টেবিলের পাশে বসে থাকা আনন্দীর দিকে চোখ পড়তেই তার ভেতরে হাসির ঢেউ বয়ে যায়। গালে হাত রেখে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে মেয়েটা। এমন গম্ভীর মুখ করে বসে রয়েছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব একাই তার কাঁধে এসে পড়েছে।
তবে নিজের সেই হাসিটা ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয় না অভী। বহু কষ্টে মুখের ভাব স্বাভাবিক রাখে সে। কারণ তার কাজ এখনো শেষ হয়নি। বরং আসল ঝামেলা বোধহয় এখন থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে। তাই হাসির চেয়ে সতর্ক থাকাটাই বেশি প্রয়োজন বলে মনে হয় তার। তাই কোনো ভূমিকা কিংবা পূর্বাভাস ছাড়াই সোজা আনন্দীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায় অভী। তারপর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে তার কবজি চেপে ধরে এক টানে দাঁড় করিয়ে দেয়আচমকা এমন ব্যবহারে ভড়কে ওঠে আনন্দী।
“কী হচ্ছে, অভী এটা?”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট বিস্ময় আর বিরক্তি মিশে ছিলো।কিন্তু অভী কোনো উত্তর দেয় না। বরং তার হাতের মুঠো আরও শক্ত করে ধরে সদর দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে। আনন্দী কয়েকবার হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় না। অভীর আঙুলের বাঁধন যেন লোহার শিকলের মতোই দৃঢ়।
দরজার সামনে এসে কোমরে গোঁজা চাবির গোছা বের করে তালার মুখে লাগায় সে। মুহূর্ত পর ধাতব শব্দ তুলে খুলে যায় ভারী লোহার তালাটি। সেটিকে একপাশে সরিয়ে রেখে ধীরে ধীরে আনন্দীর দিকে ফিরে তাকায় অভী।
সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা আনন্দীর অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই অভী হঠাৎ তার শাড়ির আঁচল তুলে নেয়। তারপর কোনো কথাবার্তা ছাড়াই মাথার উপরে টেনে দেয় সেটি।মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল ঘোমটার আড়ালে ঢেকে যায় আনন্দীর মুখ।
শুধু মাথাই নয়, প্রায় পুরো মুখ আড়াল হয়ে যায় কাপড়ের স্তরে। চারপাশের আলো যেন এক লহমায় মলিন হয়ে আসে। সামনে কী আছে, কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, অভী কী করতে যাচ্ছে?কিছুই আর স্পষ্ট বুঝতে পারে না সে।অপরিচিত এক অস্বস্তি ধীরে ধীরে বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে।
“অভী! আপনি কী করছেন?”
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে ওঠে আনন্দী।ঘোমটার আড়াল থেকে হাত বাড়িয়ে আঁচল সরানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু তার আগেই অভী এক পা এগিয়ে আসে।ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট এক হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলে,
” নিজের চোখে রক্ষা !”
‘ মানে?’
‘ তোমার রূপের আগুনে চোখে কিছু দেখি না তো তাই!’
বিরক্তিতে ঘোমটার আড়াল থেকে আঁচল সরিয়ে ফেলতে যায় আনন্দী। কিন্তু সে কিছু বোঝার আগেই অভী হঠাৎ তাকে দুই হাতে তুলে নেয়।আচমকা এমন ঘটনায় মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় সে। তারপরই বিস্ময় আর ক্ষোভে চিৎকার করে ওঠে,
“এই! নামান আমাকে!”
অভীর মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
কোনো উত্তর আসে না।
“অভী, আমি আপনার সাথেই কথা বলছি!”
তবুও নীরবতা।মনে হয় আজ ইচ্ছে করেই মুখে কুলুপ এঁটেছে সে। আনন্দীর কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেয় না। শুধু শক্ত হাতে তাকে আগলে রেখে ধীর, স্থির পায়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।
বিরক্তি, কৌতূহল আর অজানা এক আশঙ্কা একসঙ্গে জড়িয়ে ধরে আনন্দীকে। বুকের ভেতর অস্বস্তিটা ক্রমশ বেড়েই চলে। লোকটা আসলে কী করতে চাইছে? কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে? আর এত রহস্য করারই বা কী প্রয়োজন?অসংখ্য প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে, অথচ একটিরও উত্তর মেলে না।
কিছুক্ষণ পর ধাতব শব্দ তুলে কোনো একটি দরজা খোলার আওয়াজ কানে আসে তার। ঠিক পরমুহূর্তেই অনুভব করে, অভী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাকে কোথাও বসিয়ে দিয়েছে।নরম সিটের স্পর্শ পেতেই বুঝতে বাকি থাকে না, এটি একটি গাড়ি।এরপর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে আসে।কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।তারপর হঠাৎই ইঞ্জিনের গর্জনে কেঁপে ওঠে চারপাশ।গাড়িটি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে।আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না আনন্দী। বিরক্ত মুখে ঘোমটার আঁচলটা একটু সরিয়ে দেয় সে।
মুহূর্তের মধ্যেই ছুটে আসা বাতাস এসে আছড়ে পড়ে তার মুখে। এলোমেলো হয়ে যায় কপালের কাছে বেরিয়ে থাকা কয়েক গোছা চুল। দীর্ঘক্ষণ কাপড়ের আড়ালে বন্দি থাকার পর খোলা হাওয়ার স্পর্শে যেন একটু স্বস্তি ফিরে আসে তার।চারপাশে তাকাতেই পরিস্থিতিটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
তারা অভীর খোলা জিপে বসে আছে।মাথার ওপর বিস্তীর্ণ নীল আকাশ ছড়িয়ে রয়েছে। দুপুরের উষ্ণ বাতাস চারদিক থেকে এসে গায়ে লাগছে। রাস্তার দু’পাশের গাছপালা, দোকানপাট আর বাড়িঘর দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। চাকার গতির সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যগুলোও একের পর এক মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে।স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে অভী।
তার দৃষ্টি স্থির সামনের রাস্তায়। মুখে সেই চিরচেনা নির্লিপ্ত ভাব, আর চোখেমুখে রহস্যময় এক নীরবতা। যেন সে খুব ভালো করেই জানে কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু সেই তথ্য পৃথিবীর কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করছে না।আনন্দী কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে।তারপর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “এবার তো বলুন, কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
প্রশ্ন শুনে অভী একবার মাত্র তার দিকে তাকায়।সেই দৃষ্টিটা ছিল ক্ষণিকের, কিন্তু অদ্ভুতভাবে স্থির।পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট একটি হাসি ফুটে ওঠে। এমন হাসি, যা দেখে মনে হয় সে কিছু একটা জানে, অথচ ইচ্ছে করেই কাউকে জানতে দিচ্ছে না।তারপর আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় সামনের রাস্তায়।অভীর এই অকারণ নীরবতা ধীরে ধীরে আনন্দীর কৌতূহলকে আরও উসকে দিতে থাকে। বিরক্তির সঙ্গে মিশে যায় অস্থিরতা। মনে হতে থাকে, লোকটা নিশ্চয়ই কোনো না কোনো পরিকল্পনা করে রেখেছে।এমন কিছু, যার কথা এখনই জানাতে চায় না সে।
আর অভীকে যতটুকু চিনেছে আনন্দী, তাতে একটা বিষয় সে বেশ ভালো করেই বুঝে গিয়েছে।এই মানুষটা যখন কোনো কিছু নিয়ে এতটা রহস্য করে, তখন তার পেছনে সাধারণত খুব সাধারণ কোনো কারণ থাকে না। তাই অজানা গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা জিপের সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের ভেতরও ধীরে ধীরে জমতে থাকে এক অদ্ভুত কৌতূহল। ঠিক কী অপেক্ষা করছে সামনে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
গাড়িটি এসে থামে একটি পরিচিত ভবনের সামনে।
প্রথমে জায়গাটা ঠিক বুঝতে পারে না আনন্দী। কিন্তু জিপ থেকে নামার পর ভবনের উপরে ঝুলতে থাকা সাইনবোর্ডে চোখ পড়তেই তার কপাল কুঁচকে যায়।কাজি অফিস।
অভী কোনো কথা না বলেই তার হাত ধরে ভেতরের দিকে এগিয়ে যায়।পুরো পথজুড়ে মানুষটা একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। স্টিয়ারিংয়ে রাখা তার হাত যেমন স্থির ছিলো তেমনি স্থির ছিল তার দৃষ্টি। আর সেই নীরবতা আনন্দীর মনে একের পর এক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে চলেছিল।
কোথায় যাচ্ছে তারা?কেন যাচ্ছে?এত সকালে তাকে এভাবে ঘোমটা টেনে নিয়ে আসার প্রয়োজনই বা কী?কিন্তু কাজি অফিসের দরজা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই তার সমস্ত প্রশ্ন যেন এক মুহূর্তে থমকে যায়।
পা দুটো নিজে থেকেই স্থির হয়ে আসে।দৃষ্টি গিয়ে আটকে পড়ে সামনের সারিতে বসে থাকা কয়েকটি পরিচিত দুটো মুখের উপর।
“বাবা…! মা..!’
আক্রাম সাহেব বসে আছেন সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত অবস্থায়। বয়সের ছাপ পড়া মুখটিতে আজ অদ্ভুত রকমের রাগ। তার পাশেই বসে আছেন স্ত্রী। চোখেমুখে জমে আছে আবেগের কোমল ছায়া।শুধু তারা নন।
ঘরের ভেতরে উপস্থিত রয়েছে আরও কয়েকজন নিকট আত্মীয়স্বজন।ছোট্ট অফিসকক্ষটির চারপাশে এক ধরনের গাম্ভীর্য ছড়িয়ে রয়েছে। অথচ সেই গাম্ভীর্যের মধ্যেও অনুভব করা যাচ্ছে এক পবিত্র উষ্ণতা। যেন সবাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছে।বাবাকে দেখামাত্র আনন্দীর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা অজানা ভয়, দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতার ভার যেন একটু একটু করে হালকা হতে শুরু করে।হঠাৎ করেই তার খুব ইচ্ছে করে বাবার কাছে ছুটে যেতে।ইচ্ছে করে আগের মতো তার বুকে মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকতে।
এক পা এগিয়েও যায় সে।কিন্তু ঠিক তখনই অভী আলতো তার হাত চেপে ধরে।আনন্দী থেমে যায়।ধীরে ধীরে ঘুরে তাকায় তার দিকে।চোখের ইশারাতে বুঝিয়ে দেয় তাকে শান্ত থাকতে।
অন্যদিকে আক্রাম সাহেবও মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু করে মাথা নাড়েন।খুব ছোট্ট একটি ইশারা।কিন্তু সেই ইশারাই যথেষ্ট ছিলো।এক নিমিষেই ঠান্ডা হয়ে যায় আনন্দী।চুপসে যায় সে।চুপচাপ অভীর পাশে গিয়ে বসে পড়ে।
কিছুক্ষণ পর কাজি সাহেব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সামনে সাজিয়ে রাখেন। টেবিলের উপর সুশৃঙ্খলভাবে রাখা কাবিননামা, পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য নথি দেখে আনন্দীর মনে হয়, এই আয়োজন আজকের নয়। এর পেছনে বহুদিনের প্রস্তুতি লুকিয়ে আছে।এক এক করে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হয়।তারপর নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষরের জন্য এগিয়ে দেওয়া হয় কাগজ।কলম হাতে নিতে গিয়ে মুহূর্তের জন্য থেমে যায় আনন্দী।তার মনে হয়, এই ছোট্ট কালির আঁচড়টুকুই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষর।একবার চোখ তুলে অভীর দিকে তাকায় সে।
অভীও তাকিয়ে আছে তার দিকে। তারপর বাবা-মায়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখে। মা ইশারা করে সাইন করতে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের নামটি লিখে দেয় আনন্দী। লোক জানাজানি যেহেতু হয়েছে। সেহেতু সম্মানের সহিত হওয়া উচিত। তাই আনন্দী সাই করে ফেলে।তারপর অভী ও সাইন করে ।
এরপর উপস্থিত সাক্ষীরা একে একে স্বাক্ষর করেন।সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর ঘরজুড়ে এক ধরনের গভীর নীরবতা নেমে আসে।কাজি সাহেব সামনে রাখা কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে আকদের কার্যক্রম শুরু করেন।ছোট্ট ঘরটির বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে পবিত্রতায়।আনন্দীর হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে বেড়ে যায়।কাজি সাহেব শরিয়তের বিধান অনুযায়ী উভয়ের সম্মতি গ্রহণ করেন। উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয় কাবিনের শর্তাবলি ও মোহরের পরিমাণ।
মুহূর্তটি যেন সময়ের ভেতর স্থির হয়ে থাকে।তারপর উচ্চারিত হয় সেই সম্মতির বাক্য।যে বাক্য দুটি অপরিচিত দুই জীবনের মাঝখানে এক নতুন সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে।
সাক্ষীদের উপস্থিতিতে, পরিবারের আশীর্বাদে এবং শরিয়তের নিয়ম অনুসারে সম্পন্ন হয়ে যায় তাদের আকদ।
ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে প্রশান্তির নিঃশ্বাস।
অভীর সাঙ্গোপাঙ্গরা আলহামদুলিল্লাহ বলে ওঠে।
আর আনন্দী বসে থাকে নিস্তব্ধ হয়ে।সকালে যে মেয়েটি অভীর উপর রাগ করে দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করেছিলো, কয়েক ঘণ্টা পর সেই মেয়েটিই শরিয়ত ও আইনের দৃষ্টিতে অভীর বৈধ স্ত্রী হয়ে বসে আছে।অবিশ্বাসে ধীরে ধীরে চোখ তুলে অভীর দিকে তাকায় সে।অভী তখনও আগের মতোই শান্ত।তবে আজ তার চোখের গভীরে এক ধরনের তৃপ্তি স্পষ্ট।যেন বহুদিনের অসম্পূর্ণ একটি অধ্যায় অবশেষে পূর্ণতা পেয়েছে।
ধীরে ধীরে উপস্থিত সবাই একে একে বাইরে বেরিয়ে যেতে থাকে। আর ঠিক তখনই এতক্ষণ ধরে নিজেকে শক্ত করে রাখা আনন্দীর সমস্ত বাঁধ ভেঙে যায়। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তার বাবাকে। মুখ লুকিয়ে দেয় আকরাম শেখের বুকে। পরমুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। তার কাঁধ কাঁপতে থাকে, চোখের জল ভিজিয়ে দেয় বাবার পাঞ্জাবি।
চারপাশের মানুষজন দৃশ্যটা দেখে হয়তো ভাবেছিলো,সদ্য বিয়ে হওয়া কোনো মেয়ের স্বাভাবিক আবেগ এটা। হয়তো তারা মনে করেছিলো, বাবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে কাঁদছে মেয়েটা। কিন্তু আসল সত্যটা কেউ জানত না। কেউ বুঝতে পারেনি এই কান্নার মধ্যে কত রকম অনুভূতি মিশে আছে। গত কয়েকদিনের ভয়, অনিশ্চয়তা, অভিমান, স্বস্তি আর জমে থাকা চাপ যেন একসঙ্গে চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসছিল।
আকরাম শেখ শক্ত করে মেয়েকে বুকে আগলে রাখেন। বড় বড় হাত দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। কিন্তু তার চোখ তখন অন্যদিকে। ধীরে ধীরে দৃষ্টি গিয়ে থামে অভীর উপর। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অভীও তাকিয়ে ছিল তার দিকে। মুহূর্তের জন্য দুই জোড়া চোখ একে অপরের সঙ্গে আটকে যায়।
গত রাতের কথা মনে পড়ে যায় আকরাম শেখের।
গভীর রাতে হঠাৎ তার বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলো অভী। আনন্দী ওভাবে নিয়ে যাওয়ার পর হুট করে তার আসা দেখে তেড়ে আসে আকরাম শেখ। কিন্তু পরিচিত কিছু মুখ দেখে চুপসে যান তিনি। বসার ঘরে বসেই সরাসরি মূল কথায় চলে গিয়েছিলো অভী। তার যুক্তি ছিল পরিষ্কার।
যেহেতু ঘটনাটা অনেক দূর গড়িয়ে গেছে, আর যদি লুকিয়ে হওয়া বিয়ের কথা মানুষ জানতে পারে, তাহলে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে আনন্দীকে। সমাজের কাছে অপমানিত হতে হবে তার পরিবারকে। তাই সবার উপস্থিতিতে, নিয়ম মেনে, শরীয়ত অনুযায়ী আবার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।শুরুতে রাগে প্রায় বিস্ফোরিত হয়ে উঠেছিলেন আকরাম শেখ। কয়েকবার তো মনে হয়েছিলো ছেলেটাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। কিন্তু অভীও কম চতুর ছিল না। একের পর এক যুক্তি, বাস্তবতা আর পরিস্থিতির কথা এমনভাবে তুলে ধরেছিলো যে শেষ পর্যন্ত আক্রাম শেখকে থেমে যেতে হয়। পাশে বসা আয়না বেগমও মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজি হয়ে যান।
তবে সম্মতি দেওয়ার আগে আক্রাম শেখ স্পষ্ট ভাষায় একটি কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন।
“বিয়ে হবে। কিন্তু বিয়ের পর আনন্দী আমার কাছেই থাকবে।’
অভী ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে। বেশ আক্রোশ নিয়ে আকরাম শেখ বলে,
“জান দেবো, কিন্তু মেয়ে দেবো না।”
কথাটা শুনে অভী কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলো।তারপর সোফার পেছনে হেলান দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলেছিলো,
“জান নেবো। কিন্তু বউ ছাড়বো না।”
সেদিন রাতের সেই কথোপকথনের পর প্রায় আধঘণ্টা ধরে দুজনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলেছিলো। একজন মেয়ের বাবা, অন্যজন মেয়েটার স্বামী। দুজনের মাঝেই ছিলো প্রবল জেদ। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষ কাউকে বোঝাতে পারেনি। তবে একটা বিষয়ে দুজনেই একমত হয়েছিলো। এই বিয়েটা প্রকাশ্যেই হবে।
উন্মাদনা পর্ব ৪১
অবশেষে মান-সম্মানের কথা ভেবেই রাজি হয়ে যান আকরাম শেখ। কারণ মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে অনেক সময় আবেগের চেয়ে সম্মানের মূল্য বেশি হয়ে দাঁড়ায়। নিজের কষ্ট, নিজের রাগ, নিজের অপছন্দ সবকিছু চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু সমাজের সামনে মাথা নত হয়ে যাওয়ার ভয়টা সহজে এড়ানো যায় না।
আর আজ, কাজি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েকে বুকে আগলে রেখেও আকরাম শেখ বুঝতে পারছিলেন যে, বিয়ে তিনি মেনে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু অভীর সঙ্গে তার লড়াই এখনও শেষ হয়নি। অন্যদিকে অভীর চোখের ভাষাও যেন একই কথা বলছিলো। এই যু’দ্ধের শুরু হয়েছে মাত্র। শেষ হতে এখনও অনেক বাকি।
চোখে চশমা চোখে দিয়ে আনন্দীর মাথায় রেখে অভী বলে,
‘ বাবার বুক ছাড়ো। স্বামীর বুকে আসো সোনামনি!’
