তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৮
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা রাতে স্নিগ্ধকে কল দিলো। স্নিগ্ধ খেতে বসেছিলো। পাশে সুবহা খাবার বেড়ে দিচ্ছিলো। স্নিগ্ধ কল রিসিভ করে লাউডে দিলো। প্রাণেশা বলল,
“আমার স্পেশাল স্যারটা কি করছে?”
সুবহা হেসে বলল,
“ভাবি আপনার স্পেশাল স্যার রাতের খাবার খাচ্ছে।”
এই শুনে প্রাণেশা লজ্জা পেয়ে জিভে কামড় দিয়ে ফেলল। স্নিগ্ধ হাসছে। সুবহা বলল,
“ভাবি আমি আগে থেকে জানি আপনারা প্রেম করছেন। থাক আর লজ্জা পেতে হবে না।”
প্রাণেশা আমতা আমতা করে বলল,
“তা তাহলে পরে ফোন করবো হ্যা। রাখছি।”
কল কেটে দিলো প্রাণেশা। স্নিগ্ধ আর সুবহা হেসে উঠল। বেচারি লজ্জা পেয়েছে খুব।
পরেরদিন———
হামিম স্নিগ্ধর বাড়ির সামনে গাড়ি নিয়ে দাড়ালো। স্নিগ্ধ রেডি হয়ে বের হলো। এরপরে গাড়িতে উঠে বসলো। কিছু টুকটাক কথা বলল। স্নিগ্ধ যাচ্ছে তো কিন্তু মেয়ের বাড়ি কোথায়, কি করে, কিচ্ছু তো শোনেনি। শুধু যাচ্ছেই। স্নিগ্ধ জিজ্ঞাসা করলো,
“হামিম আগে বল মেয়েটা কে? কি করে পড়াশোনা করে নাকি জব করে?”
হামিম হেসে বলল,
“আরে আমাদের ডিপার্টমেন্টে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ে সেই মেয়ে। ঐযে সেদিন ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বললাম। প্রাণেশা নাম ওর। ওকেই পছন্দ করি। ওর ভাই আমার বন্ধু। ওর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। সেখানে প্রাণেশার বাবা আমাকে দেখা করতে বলেছে। ২-১ দিনের মধ্যে আমার ফ্যামিলিও আসবে ওকে দেখতে।”
এই শুনে স্নিগ্ধ পুরো থম মেরে তাকিয়ে রইলো। এখন কি বলবে তা ওর জানা নেই। শুধু বুকের ভিতরে হার্টবিট বেড়ে চলছে,, হাঁসফাঁসও শুরু করে দিলো। হামিমের ফোনে কল এলো। সৌরভ কল দিয়েছে। হামিম কথা বলছে। স্নিগ্ধ নিজের ওয়ালেটটা বের করলো। একটু করে প্রাণেশার ছবিটা দেখে শ্বাস ছেড়ে তৎক্ষণাৎ বলল,
“গাড়ি থামা হামিম!”
হামিম ফোন সরিয়ে গাড়ি থামিয়ে বলল,
“কি হয়েছে?”
স্নিগ্ধ বলল,
“ওই আসলে বাবা মেসেজ দিয়েছে। তার অফিসে নাকি একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ পড়ে গিয়েছে যেতে বলছে আমাকে।”
“তাহলে যাবি না আমার সাথে?”
“সরি রে বন্ধু। ইম্পরট্যান্ট কাজ যে। এখন বাবা এদিকেই আসছে। যাওয়ার সময় নিয়ে যাবে।”
“ঠিক আছে তাহলে আর কি করার।”
স্নিগ্ধ গাড়ি থেকে নামলো। এরপরে একটা রিক্সা নিলো। ও ভেবেই পাচ্ছে না প্রাণেশা এগুলো এখনও ওকে জানায়নি কেনো? বিয়ে পর্যন্ত যে কথাবার্তা চলছে নিশ্চই প্রাণেশার অজানা নয়। তাহলে না বলার কারণ কি?
স্নিগ্ধ বাড়িতে ঢুকেই হাতের সামনে যা পেলো সব ফ্লোরে ছুড়ে মারছে। ড্রইং রুমের সবফুলদানি ভেঙে ফেলল। কাঁচের টি-টেবিলটাও। রাগে চোখে দেখছে না কি করবে। সুবহা এসে স্নিগ্ধকে ধরে উদাসীন কণ্ঠে বলল,
“ভাইয়া তুমি এমন করছো কেনো? কি হয়েছে?”
স্নিগ্ধ কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
“প্রাণেশার বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে আর আমাকে এই নিয়ে কিচ্ছু বলেনি। হামিমের সাথে না গেলে জানতেই পারতাম না। হামিমই ওকে বিয়ে করতে চায়।”
স্নিগ্ধ দাড়ালো না হনহন করে চলে গেলো উপরে। রাজিয়া বেগম রুম থেকে বেরিয়ে সুবহাকে জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে? সুবহা এড়িয়ে গেলো, প্রাণেশার কথাটা বলল না। স্নিগ্ধই না করেছে বলতে।
স্নিগ্ধ রুমে এসে এসি টা অন করে বিছানায় বসলো। কি করবে ওর মাথা কাজ করছে না। হামিম তো আর মিথ্যে বলেনি।
এদিকে হামিম এলো খান বাড়িতে। সৌরভ হামিমকে সোফায় বসতে বলল। রোকেয়া বেগম নাস্তা-পানি নিয়ে গেলেন। আরশাদ খান বাড়িতে নেই। অফিসে থেকেই ফিরেননি। সৌরভ কল দিলো, আরশাদ খান বললেন ফিরতে লেইট হবে। হামিম আরও ঘন্টাখানিক বসে রইলো। এরপরে আরশাদ খান এলেন। তিনি ফ্রেশ হয়ে এসে হামিমের সামনে বসলেন। বলতে গেলে আরশাদ খান ইচ্ছে করেই দেরিতে বাড়িতে ফিরলেন। হামিমের ধৈর্য কতখানি দেখতে হবে তো।
আরশাদ খান হামিমের সাথে কথা বললেন। মোটামুটি কথাবার্তা, আচার-আচরণ দেখে উনার পছন্দ হলো। হামিম চলে যেতেই রোকেয়া বেগম উপরে এসে প্রাণেশাকে সব বললেন। হামিম এসেছে বলে প্রাণেশা ইচ্ছে করেই এতক্ষন রুম থেকে বের হয়নি।
প্রাণেশা যখন থেকে শুনেছে হামিমের সাথে ওরা বিয়ের কথা বলছে তখন থেকেই মন খারাপ, চোখ দিয়ে পানিও পড়ছে। রোকেয়া বেগম প্রাণেশার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,
“কাঁদছো কেনো মা? বিয়ের কথা বলছে বলেই কি বিয়ে হয়ে যাবে।”
“ভাইয়া আর বাবা যা বলবে তাই হবে। যদি ওরা বিয়ে দিয়ে দেয় তখন কি করবো?”
আরশাদ খান আর সৌরভ রুমে এলো। সৌরভ প্রাণেশার দেখে তড়িৎ পায়ে কাছে এসে বলল,
“কিরে কাঁদছিস কেনো? কি হয়েছে? কেউ বকেছে?”
রোকেয়া বেগম চলে গেলেন। প্রাণেশা ভাঙা গলায় বলল,
“কিছু হয়নি। সরো তোমাদের আমার সাথে কথা বলতে হবে না। আমাকে না জানিয়ে বিয়ে পর্যন্ত চলে গেলে আর এখন বলছো কি হয়েছে?”
আরশাদ খান প্রাণেশার পাশে বসে বললেন,
“তুমি কি চাও মা বলো? তুমি কি আরেকটু সময় চাও?”
প্রাণেশা সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যা আমার একটু সময় লাগবে। দরকার হলে তোমার ছেলেকে বিয়ে করাও আমার পেছনে লেগেছো কেনো?”
সৌরভ রাগে শুধু দাঁত চেপে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। এরপরে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেলো। নিচে এসে রোকেয়া বেগমকে জিজ্ঞাসা করলো,
-“আন্টি কি হয়েছে প্রাণেশার? কাঁদছিলো কেনো? বিয়ে করবে না নাকি?”
রোকেয়া বেগম বললেন,
“আজকে যে ছেলেটা এসেছিলো, বিয়ে নিয়ে কথা বলল। সেটা প্রাণেশাকে বলার পরেই ও কাঁদছে।”
সৌরভ গুমোট গলায় বলল,
“ও কি কাউকে ভালোবাসে?”
রোকেয়া বেগম নিচু গলায় আমতা আমতা করে বললেন,
“না। আসলে আমি বলতে পারলাম না।”
সৌরভ যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। আর কথা শোনার প্রয়োজন মনে না করে প্রাণেশার কাছে চলে গেলো।
সন্ধ্যার পরপর স্নিগ্ধ কল দিলো প্রাণেশাকে। প্রাণেশা কল রিসিভ করলো। দুজনেই চুপচাপ। কেউ কথা বলছে না। স্নিগ্ধ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“কি করছো?”
“কিছুনা আপনি?”
“বসে আছি।”
স্নিগ্ধ হামিমের কথাটা বলল। এরপরে প্রাণেশাও বলল ওর বাবার সাথে কথা বলতে এসেছিলো। পরপর প্রাণেশাই বলল,
“কেঁদে কেঁদে বাবাকে বলেছি আমার সময় চাই। বাবা তাতেই সম্মতি জানিয়েছে। ভাইয়া তো এই নিয়ে রাগারাগি। পরে বলেছে তোর ভাবার জন্য ৭ দিন সময়। এরপরেই হামিমের বাড়ির লোক আসবে বিয়ের পাকা কথা বলতে। এখন আপনি কিছু একটা করুন।”
স্নিগ্ধ গভীর গলায় বলল,
“তুমি চিন্তা করো না। এর আগেই তুমি আমার বাড়িতে আসবে। তোমাকে আমি হারাতে পারবো না। তোমাকে আমার লাগবে মানে লাগবে। আপাতত নিশ্চিন্ত থাকো। কোনো টেনশন করো না জান।”
প্রাণেশা মুচকি হেসে বলল,
“শেষে কি বললেন?”
স্নিগ্ধ অবলীলায় বলে দিলো,
“আমার জান, আমার প্রাণ। আমার ভালোবাসা।”
প্রাণেশা কিছু বলার আগেই, স্নিগ্ধ মুখের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তোমার মায়ায় এমনভাবে ডুবেছি যে, রাতের ঘুমের আগের শেষ চিন্তা তুমি, আর সকালের প্রথম ভাবনা তুমি।”
…..
রাত তখন ১০টা,
সৌরভের ফোনে একটা ছবি এলো। ছবিটা সিন্ করার সাথে সাথে সৌরভ চোয়ালে শক্ত করে বিছানায় থেকে উঠে দাড়ালো। ছবিটায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে প্রাণেশাকে একটা ছেলে ফুল দিয়ে প্রপোজ করছে। আবার সৌরভের ফোনে কলও এলো। সৌরভ কিছু বলার আগেই ওরই মামাতো ভাই সাব্বির বলল,
“এই ভাই খবর কি কিছু রাখিস? ছবিটা দিয়েছি, দেখেছিস?”
সৌরভ শক্ত কণ্ঠে বলল,
“ছবিটা কই পেলি?”
সাব্বির বলল,
“সেদিন বাড়িতে ফেরার পথে দেখি তোর বোনকে একটা ছেলে প্রপোজ করছিলো। ভেবেছিলাম প্রাণেশাকে ওরা ডিসটার্ব করছে ওকে বাড়িতে নিয়ে যাই। কিন্তু আমি যাওয়ার আগেই দেখি প্রাণেশা ওই ছেলের প্রপোজাল একসেপ্ট করলো। তাই আর কিছু বললাম না। আবার আজকে হামিম বলল ও নাকি তোদের বাড়িতে কথা বলতে এসেছে। তাই হামিমকে এসব বিষয়ে না জানিয়ে সোজা তোর কাছে বললাম।”
সৌরভ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
“ঠিক আছে দেখছি।”
সৌরভ কল কেটে দিয়ে হুড়মুড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে প্রাণেশার রুমের দিকে এলো। রাগে ওর চোখ-মুখ লাল হয়ে গিয়েছে।
প্রাণেশার রুমটা ভিতরে থেকে লক দেখে জোরে জোরে ধাক্কাতে লাগলো আর বলল,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৭
“দরজা খোল তো! প্রাণেশা! এই দরজা খোল! কথা আছে।”
প্রাণেশা দরজা খুলে বলল,
“কি হয়েছে ভাইয়া?”
সৌরভ ফোনটা বের করে সেই ছবিটা দেখালো। প্রাণেশা শুকনো ঢোক গিললো। সৌরভ শক্ত গলায় বলল,
“এক কথায় উত্তর দিবি, এইটা কি তু্ই?”
প্রাণেশা দমে গেলো না। স্বাভাবিকভাবেই বলল,
“হ্যা আমিই।”
