ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৯
মেহজাবিন নাদিয়া
“বস কি আসলেই দেশের শিক্ষামন্ত্রী, নাকি প্রেমের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া কোনো মেন্টাল পেশেন্ট? এক বোতল সাধারণ টিউবওয়েলের পানির মধ্যে দুই ফু দেওয়াতে দুই লাখ টাকা দিয়ে দিল! এই টাকাটা যদি ওনি আমারে দিত, আমি নিজেই কামরূপ কামাখ্যার ড্রেস পইরা ওনারে দশ বালতি পানি ফুঁ দিয়া দিতাম!”
সারিম তখনো বোতলটার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন ওটার ভেতরে আলাদিনের জাদুকরী চেরাগ লুকানো। ও আলভির বিড়বিড়ানি শুনে চোখ দুটো সরু করে তাকাল।
“কী বলছো আলভি? কোনো সমস্যা?”
আলভি এক সেকেন্ডে বত্রিশটা পাটি দাঁত বের করে এক গাল হেসে দিল।
“না না, স্যার! আমি বলতেছিলাম আপনার এই বিশাল দিল দেখে কবিরাজ বাবা নিশ্চয়ই মনে মনে আপনার জন্য স্পেশাল কোনো দোয়া করতেছে, যেন আপনার বউ তাড়াতাড়ি আপনার প্রেমে পড়ে যায়।
সারিম গাড়ির পেছনের সিটে আরাম করে বসে বোতলটা সাবধানে পাশের সিটে রাখল। ও একটু বাঁকা হেসে বলল,
“কান খুলে শুনে রাখো, আলভি। প্রেম মরা জলে ডোবে না, আর সারিম মৃধা কখনো লসে ব্যবসা করে না। এই বোতলের পানি যদি কাজ করে, তবে তো ভালো আমার চন্দ্রিমা আমার বুকে আসবে। কিন্তু যদি এই ইশকের জল খেয়ে চন্দ্রিমার মন না গলে, যদি ও আগের মতোই আমাকে দেখে ব্যাকটেরিয়ার লেকচার দেয়, তবে মনে রেখো-এই টাকা আমি তোমার বেতন থেকে প্রতি মাসে কেটে কেটে উসুল করব! এক আনা পয়সাও ছাড়ব না। এবার গাড়ি স্টার্ট দাও!
“আমার বেতন থেকে টাকা কাটবেন?!”
আলভির কলিজা যেন এক মুহূর্তে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।মনে মনে কাঁদতে কাঁদতে ড্রাইভিং সিটে বসে স্টিয়ারিং ধরল বেচারা।আর দোয়া পড়তে লাগলো,অরি যেন সারিমের প্রেমে এবার সত্যিই সত্যিই পড়ে যায়। নয়তো দেখা যাবে এই শিক্ষামন্ত্রী ওর ঘাড় ধরে সকল টাকা,বেতনের থেকে
কেটে উসুল করেই ছাড়বে।
শেখ ভিলা দুপুরের তপ্ত রোদের তীব্রতা তখন ঘরের জানালার কাচ ভেদ করে ভেতরের দেয়ালে এসে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু বিশাল এই শেখ ভিলার দুতলার ওই নির্দিষ্ট ঘরটিতে যেন এক আদিম, নিথর নীরবতা থমকে আছে। পুরো ঘর অন্ধকার। ভারী খয়েরি রঙের পর্দাগুলো টেনে দেওয়া হয়েছে এমনভাবে, যাতে বাইরের এক চিলতে আলোও ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা এসিটা একটানা গোঁ গোঁ শব্দ করে ঠান্ডা বাতাস বিলিয়ে যাচ্ছে, যা ঘরের ভেতরের গুমোট ও থমথমে পরিবেশকে আরও বেশি তীব্র করে তুলছে।
বিছানার ঠিক মাঝখানটায় হাঁটু দুটো বুকের সাথে লেপ্টে ধরে, দুহাতে পা জড়িয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে জেবা। ওর পরনের হালকা গোলাপি রঙের টিশার্ট যেটা কুঁচকে একাকার হয়ে গেছে। চুলগুলো অবিন্যস্ত, জট পাকিয়ে পিঠের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মৃধা নিবাস থেকে ফিরে আসার পর আজ তিনটে দিন কেটে গেছে। এই তিনটে দিন জেবার কাছে মনে হয়েছে তিনটে দীর্ঘ যুগ, কিংবা তার চেয়েও বেশি কিছু।মেয়েটা খায়নি ঠিকমতো, ঘুমায়নি এক ফোঁটা। ওর চোখের নিচে স্পষ্ট কালচে ছোপ পড়ে গেছে, যা ওর চিরচেনা ফর্সা, উজ্জ্বল মুখটাকে এক অদ্ভুত মলিন আর ফ্যাকাসে রূপ দিয়েছে।
জেবা চোখ বন্ধ করলেই একটা চওড়া পিঠ, ধবধবে সাদা কটন শার্টের ওপর কালো কোট আর বাঘের মতো তীক্ষ্ণ, গম্ভীর চাউনি ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আরিশান মৃধা! নামটা মনে আসতেই ওর বুকের ভেতরটা এক অজানা, তীব্র ব্যথায় মোচড় দিয়ে ওঠে।সে নিজের নখ দিয়ে নিজের হাতের চামড়া শক্ত করে খামচে ধরল।জেবা কেন পারছে না ওই মানুষটাকে নিজের মগজ থেকে বের করতে? কেন পারছে না ওই গম্ভীর কণ্ঠস্বরের মায়া থেকে নিজেকে মুক্ত করতে? ও তো জানে, এই অনুভূতিটা স্রেফ একটা মরীচিকা, একটা ধ্বংসাত্মক আগুন যা ওকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে!
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় মৃদু নক করার শব্দ হলো। জেবা নড়ল না, কোনো উত্তরও দিল না। ও যেমন ছিল, তেমনই পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজার লকটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন সোলেমান শেখ। ওনার পরনে একটা সাধারণ অফিশিয়াল প্যান্ট আর শার্ট। মুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। সোলেমান শেখ মানুষটা অত্যন্ত সাধারণ, অমায়িক আর শান্ত প্রকৃতির। জেবা যখন খুব ছোট, তখন এক ভয়াবহ রোড অ্যাকসিডেন্টে ওর মা ওনাকে আর এই পৃথিবীকে ছেড়ে চিরতরে চলে যান। সেই থেকে সোলেমান শেখ আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। একমাত্র মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে, ওকেই নিজের জীবনের সবটুকু ভেবে কাটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, বিজনেস-এর জগৎটা এতটাই নিষ্ঠুর আর ব্যস্ততাপূর্ণ যে, ওনার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এই একমাত্র মেয়েকে কখনো পর্যাপ্ত সময় বা গুরুত্ব-কোনোটাই ওনি দিতে পারেননি। টাকার পাহাড় হয়তো গড়েছেন, কিন্তু মেয়ের মনের ভেতরের শূন্যতাটা কখনো পরিমাপ করতে পারেননি।
সোলেমান শেখ ধীর পায়ে মেয়ের বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন। ঘরের ভেতরের এই ভুতুড়ে অন্ধকার আর জেবার এই উষ্কখুষ্ক দশা দেখে ওনার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। ওনি খাটের এক কোণে বসলেন এবং অত্যন্ত মায়াভরা হাতটা জেবার পিঠের ওপর রাখলেন। ওনার গলার স্বর কিছুটা কাঁপছিল,
”মা… জেবা? কী হয়েছে রে তোর? মৃধা নিবাস থেকে আসার পর থেকেই দেখছি তুই কেমন যেন মন মরা হয়ে আছিস। রুমে নিজেকে বন্দি করে রেখেছিস। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছিস না। সোনা মা আমার, তোর কি শরীর খারাপ? কোনো কষ্ট হচ্ছে তোর?”
বাবার সেই অতি পরিচিত, স্নেহের কণ্ঠস্বর শুনে জেবার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু ও চট করে নিজের মাথাটা আরও নিচু করে নিল, যাতে বাবা ওর চোখের জল দেখতে না পান। ও নিজের গলার ভেতর দলা পাকিয়ে আসা কান্নাটাকে জোর করে গিলে ফেলল। সে কীভাবে বলবে ওর বাবাকে যে,জেবা ওনারই সমবয়সী, ওনারই পরম বন্ধু আরিশান মৃধার প্রেমে পড়েছে? ও কীভাবে বলবে যে, ও এমন এক পাপের সাগরে ডুব দিয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই? এই সমাজ, এই সম্পর্ক, এই দুনিয়া-কেউ একে মেনে নেবে না। ওর বাবার সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে এক মুহূর্তে।
জেবা কোনোমতে নিজের কণ্ঠস্বরকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে, মাথা না তুলেই অত্যন্ত ধীর আর ভাঙা গলায় বলল,
”না বাবা, কিছু হয়নি আমার। আসলে… আসলে পরীক্ষা শেষ হলো তো, তাই হয়তো একটু ক্লান্ত লাগছে। আর অরিকে ছেড়ে চলে এসেছি, ওখানে তো সারাদিন গল্প করতাম, একসাথে পড়তাম। এখানে এসে একটু একা একা লাগছে, এই যা। তুমি চিন্তা করো না, আমি ঠিক আছি।”
সোলেমান শেখ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনি মেয়ের এই অজুহাত পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারলেন না, কারণ জেবার মুখের সেই ফ্যাকাসে ভাব আর চোখের নিচের কালি কোনো সাধারণ ক্লান্তির কথা বলে না। ওনার মনে হলো, মেয়ে হয়তো ওনার ওপর অভিমান করে আছে, ওনাকে পাশে না পেয়ে ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছে। ওনি জেবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অপরাধবোধে ভরা গলায় বললেন,
”আমি জানি রে মা, তোর এই একাকীত্বের জন্য আমিই দায়ী। তোর মা চলে যাওয়ার পর আমি তোকে একটা সুন্দর পরিবার দিতে পারিনি। সারাদিন শুধু বিজনেস, মিটিং আর টাকার পেছনে ছুটেছি। তোকে একটু সময় দেব, তোর মনের কথা শুনব-সেই সুযোগটাই আমি কখনো তৈরি করতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দিস, মা। তবে তুই এভাবে নিজেকে শেষ করে দিস না। একটু খাওয়া-দাওয়া কর, ফ্রেশ হ।”
জেবা কোনো উত্তর দিল না। ও শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। সোলেমান শেখ কিছুক্ষণ ওনার মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
”আচ্ছা, আমি এখন একটু ফ্যাক্টরির দিকে যাচ্ছি, একটা জরুরি কাজ আছে। যাওয়ার আগে তোকে একটা কথা বলে যাই-বিকেলে তোর ফুফুরা বাড়িতে বেড়াতে আসবে। অনেকদিন পর সবাই একসাথে হবে। তুই একটু নিজের ঘর থেকে বের হবি, ওদের সাথে বসবি। দেখবি মনটা ভালো হয়ে যাবে। আমি আসি রে মা।”
সোলেমান শেখ ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজার কপাটটা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই জেবা এতক্ষণে ওর বুকের ভেতর চেপে রাখা দমবন্ধ করা শ্বাসটা ছাড়ল। ও দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
বাবার চলে যাওয়ার পর জেবা বিছানা থেকে নেমে অবশ পায়ে হেঁটে গিয়ে জানালার ভারী পর্দাটা এক টানে সরিয়ে দিল। দুপুরের কড়া রোদ এক নিমেষে ওর পুরো ঘরে এসে আছড়ে পড়ল। জেবা চোখ দুটো কুঁচকে সেই আলোর দিকে তাকাল। ওর মনে হলো, এই আলো যেন ওকে বিদ্রূপ করছে।জেবা ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে ঘরের বড় ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
আয়নার দিকে তাকিয়ে জেবা নিজেকে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। না, ওর মধ্যে তো কোনো কমতি নেই! আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া আঠারো বছর বয়সী মেয়েটি অত্যন্ত রূপসী। ওর গায়ের রঙ দুধ-আলতা ফর্সা, টানা টানা দুটো চোখ, ঠোঁট দুটো প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা গোলাপি। এই বয়সের একটা মেয়ের দিকে যেকোনো তরুণ এক পলক তাকালে ওখানেই কুপোকাত হয়ে যাবে। কিন্তু জেবার তো কোনো তরুণের দিকে মন নেই! ওর মন তো আটকে আছে এমন এক প্রবীণ, গম্ভীর পুরুষের কাছে, যাঁর বয়সের ভার আর ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য এই তরুণ রূপকে স্রেফ একটা বাচ্চার চপলতা ছাড়া আর কিছুই মনে করবে না।
জেবা নিজের দুই হাত দিয়ে আয়নার কাচটা স্পর্শ করল। ওর মগজের ভেতর তখন হাজারটা চিন্তা, হাজারটা দর্শন আর বাস্তবের নিষ্ঠুর চাবুক অনবরত আঘাত করে যাচ্ছিল।
”মানুষ জীবনে বাঁচে কদিন? বড় জোর ষাট কিংবা সত্তর বছর! এই সংক্ষিপ্ত জীবনে মানুষ কত কী আশা করে, কত কী ভালোবাসে। তবে আমার তো এত বেশি বাঁচার বা চাওয়ার ইচ্ছে নেই! আমি তো আর বাকি আট-দশটা মেয়ের মতো পুরো জীবনটা ধরে তথাকথিত ছকবাঁধা সংসার করতে চাই না। আমি তো চাইনি যে বছরের পর বছর ধরে ওনার সাথে বুড়ো হতে। আমি তো শুধু চেয়েছিলাম,ওনি ওনার জীবনের শেষ যে কয়টা বছর এই পৃথিবীতে থাকবেন-ঐ কয়টা বছর আমি ওনার চাদবদনখানি চোখের সামনে রেখে, ওনার ছায়ায় থেকে, ওনার সাথে হাসিখুশিভাবে সুন্দর করে কাটাতে। একটা নিবিড়, পবিত্র ভালোবাসার আশ্রয় চেয়েছিলাম মাত্র। তাহলে এসবের বাধাটা কোথায়? সমাজের?”
জেবা নিজের মনেই এক করুণ, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
”সমাজ! ধুর, আমি তো এই সমাজ মানব না! যদি আমার প্রিয়তম আমাকে একবার ওনার বুকে টেনে নিতেন, তবে আমি এই পুরো দুনিয়ার মুখে চুনকালি মেখে ওনার হাত ধরে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে পারতাম। আমি সমাজের কোনো রক্তচক্ষুকে পরোয়া করতাম না। কিন্তু… কিন্তু সমাজ না মানলেও, সেই মানুষটা কি আমাকে আদতেও মেনে নিবেন? না! ওনি কখনো নিবেন না। ওনি আরিশান মৃধা। ওনি নীতি, আদর্শ আর গাম্ভীর্যের এক জীবন্ত প্রতীক। ওনি আমাকে স্রেফ ওনার নিজের মেয়ের মতো, মনে করেন। ওনার সেই পবিত্র, পিতৃত্বের চোখে আমি কীভাবে নিজের জন্য এই নিষিদ্ধ, কামনাময় অনুভূতি ফুটিয়ে তুলব?”
জেবার ভেতরের ছটফটানিটা এবার আরও তীব্র হলো। ও আয়না থেকে নিজের চোখ সরিয়ে ঘরের ভেতর পাগলের মতো পায়চারি করতে লাগল। ওর মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে ব্যথায়।
”আমি যদি ওনাকে একবার… স্রেফ একবার বুক ফুলিয়ে বলে দেখতাম? যদি ওনাকে গিয়ে বলতাম-আরিশান আঙ্কেল, আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি! আমি আপনার ওই গম্ভীর রূপের দাসী হয়ে থাকতে চাই!’ তাহলে কী হতো?”
ভাবতেই জেবার পুরো শরীর ভয়ে শিউরে উঠল। ওর ফর্সা মুখটা অপমানে আর আতঙ্কে নীল হয়ে গেল।
”না! এই ভুল কখনো করা যাবে না। যদি ওনাকে বলে দেওয়ার পর, ওনি আমার ওপর চরম বিরক্ত হন? যদি ওনি রেগে গিয়ে আমাকে ঐ বাড়ি থেকে, ওনার জীবন থেকে চিরতরে দূর করে দেন? যদি ওনি আর কোনোদিন আমাকে ওনার ওই চাদবদন খানি দেখার সুযোগটুকুও না দেন? তাহলে আমি কীভাবে বাঁচব? আমি তো ওনার ওই গম্ভীর মুখটা না দেখে একটা দিনও কাটাতে পারব না! আমি তো ওনার দূর থেকে পাওয়া ওই সামান্য দৃষ্টিটুকুর লোভেই বেঁচে আছি!”
এসব ভাবতে ভাবতে জেবা যেন পুরোপুরি নিজের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিল। ওর ভেতরের আবেগ, তীব্র মোহ আর বাস্তবের নিষ্ঠুর দেয়াল-এই দুইয়ের সংঘর্ষে ওর আঠারো বছরের কচি মনটা এক্কেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। ও নিজের এই অবাধ্য, জেদি আর নিষিদ্ধ মনকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারছিল না।জেবা কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না এই দমবন্ধ করা নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার।
শেষমেষ, নিজের ভেতরের সেই উপচে পড়া কষ্ট আর তীব্র ক্ষোভকে সামলাতে না পেরে, জেবা এক চরম আত্মঘাতী কাণ্ড ঘটিয়ে বসল।
জেবা নিজের ওপরই চরম বিরক্ত হয়ে উঠল। কেন ও এই পাপের অনুভূতি নিজের ভেতর লালন করছে? কেন ও নিজের বাবাকে, নিজের বান্ধবীকে ঠকাচ্ছে?
ও ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে নিজের দুই হাত মুঠো করে শক্ত করল। এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ও নিজের ডান হাতটা উঁচিয়ে নিজের ফর্সা গালে পাইলের মতো একাধারে থাপ্পড় মারতে শুরু করল!
’ঠাস! ঠাস! ঠাস!’
ঘরের নীরবতা ভেঙে সেই চড়ের শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। জেবা থামল না। ও যেন এক উন্মাদিনী!সে নিজের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে।জেবা নিজের বাম হাত দিয়েও অন্য গালে সজোরে আঘাত করতে লাগল। ও নিজের পুরো শক্তি দিয়ে নিজের মুখে চড় মারছিল, যেন এই চড়ের আঘাতে ওর মগজের ভেতর থেকে আরিশান মৃধার ওই ছবিটা চিরতরে মুছে যায়!
”কেন এই অনুভূতি হলো তোর? কেন? কেন তুই ওনাকে চাইলি? তুই একটা পাপী! তুই একটা নোংরা মেয়ে!”
জেবা নিজের মনেই চিৎকার করে উঠল, যদিও মুখ থেকে কোনো স্পষ্ট শব্দ বেরোচ্ছিল না, শুধু এক অবরুদ্ধ হাহাকার বেরোচ্ছিল।
অনবরত এবং সজোরে নিজের গালে নিজে থাপ্পড় মারতে মারতে একপর্যায়ে ওর ঠোঁটের কোণটা ফেটে গেল। সেখান থেকে টকটকে লাল রক্ত গড়িয়ে চিবুক বেয়ে ওর টিশার্টের ওপর পড়ল। চড়ের তীব্রতায় ওর নাকের ভেতরের নরম চামড়া ফেটে গিয়ে নাক দিয়েও ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল। ওর সেই সুন্দর, ফর্সা গাল দুটো চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার মতো রক্তিম লাল বর্ণ ধারণ করল। সারা মুখে রক্তের দাগ আর চোখের জলের নোনা জল মিশে এক বীভৎস, অথচ চরম কষ্টকর এক দৃশ্যের অবতারণা হলো।
জেবা আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ও মার্বেল মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ওর শরীরটা তীব্র ব্যথায় আর অপমানে কাঁপছিল।
জেবা দুই হাত তুলে ওপরের দিকে তাকাল, যেন ও শূন্য আকাশে আল্লাহর আরশকে দেখতে পাচ্ছে। ও নিজের রক্তাক্ত মুখটা ওপরে তুলে, দুই চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরিয়ে আল্লাহর কাছে অত্যন্ত আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে এই নির্মম অপূর্ণতার বিচার চাইতে লাগল। ওর গলার স্বর রাগে, ক্ষোভে আর তীব্র যন্ত্রণায় চিরে যাচ্ছিল,
”আল্লাহ! ওগো আমার মাবুদ! তুমি আমার সাথে এমন কেন করলে? এই বিচার আমি কার কাছে দেব? তুমি কেন আমাকে এমন একটা অনুভূতি দিলে, যেই অনুভূতি কখনো পূর্ণ করা সম্ভব না? কেন আমার এই অবুঝ মনে এমন একজনের মায়া ঢুকিয়ে দিলে, যাকে এই দুনিয়ার কেউ কখনো আমার সাথে মেনে নেবে না? কেউ না!”
জেবা মেঝের ওপর নিজের দুই হাত দিয়ে সজোরে আঘাত করতে করতে বলতে লাগল,
”যে সম্পর্কটা এই সমাজের চোখে সম্পূর্ণ পাপ, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সেই সম্পর্কের আগুনে তুমি কেন আমাকে এভাবে পুড়িয়ে মারছ, আল্লাহ? আমি তো কোনো অপরাধ করিনি! আমি তো ইচ্ছে করে ওনার প্রেমে পড়িনি! ওনার ওই সুরক্ষাকারী পিতার রূপ, ওনার ওই গম্ভীর ব্যক্তিত্ব কেন আমার এই ছোট্ট মনটাকে এভাবে চুরমার করে দিল? তুমি কি আমার কান্না শুনতে পাচ্ছ না, আল্লাহ? তুমি কেন আমার দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছ না?”
জেবার গলার আওয়াজ আস্তে আস্তে বুজে আসছিল। ও নিজের রক্তাক্ত ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে মেঝের ওপর কপাল ঠেকিয়ে সিজদার ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ল।জেবা ওখানেই পড়ে রইল এক নিথর দেহের মতো। ওর চোখের জল মার্বেলের ঠান্ডা মেঝেকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। শুধু মনে মনে ভাবছিল-যে অনুভূতি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, সেই একই অনুভূতি কেন আজ ওকে জ্যান্ত কবরে পুতে ফেলছে? আল্লাহর এই দুনিয়ায় কি ওর এই পবিত্র, অথচ নিষিদ্ধ ভালোবাসার কোনো জায়গা সত্যিই নেই?
মেঝের ওপর নিথর পাথরের মতো কতক্ষণ পড়ে ছিল জেবা, তার কোনো হিসাব নেই।দুতলার ওই অন্ধকার ঘরটায় বিকেলের ম্লান আলো মরে এসে এক ভৌতিক ধূসরতা ভর করেছে। গাল দুটো দপদপ করছে, ঠোঁটের কোণের রক্তটা শুকিয়ে চড়চড় করছে চামড়া। ঠিক তখনই, খাটের ওপর ফেলে রাখা জেবার মোবাইল ফোনটা কর্কশ শব্দে কেঁপে উঠল।
একটানা তিনবার রিং হওয়ার পর, জেবা অত্যন্ত অবশ পায়ে উঠে দাঁড়াল। ওর শরীরটা কাঁপছিল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের রক্তাক্ত, বিধ্বস্ত রূপটার দিকে আর একবারও না তাকিয়ে ও ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে একটা অপরিচিত ল্যান্ডলাইন নম্বর ভাসছে। ও শুকনো গলায় রিসিভ করে কানের কাছে ধরল।ওপার থেকে অত্যন্ত পেশাদার এবং মার্জিত এক নারীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
”হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।মিস জেবা সুলতানা শেখ বলছেন?”
”জি, বলছি।”
জেবা নিজের গলার ভেতরের কান্নাটা চেপে কোনোমতে বলল।
”মিস জেবা, আমি ‘লাইফ স্প্রিং সাইকিয়াট্রি কেয়ার’ হসপিটালের মেইন রিসেপশন থেকে বলছি। আপনার যে অ্যাপয়েন্টমেন্টটা হোল্ডে ছিল, ডক্টর আজ ফ্রি আছেন। ডক্টর আয়ুশ খান আপনাকে এখনই আসতে বলেছেন। ওনার শিডিউল আজকে একটু ফাঁকা হয়েছে। আপনি কি এক ঘণ্টার মধ্যে আসতে পারবেন?”
জেবা দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাল। বিকেল চারটে বাজে। সোলেমান শেখ ফ্যাক্টরিতে, ফুফুরা আসতে আসতে সন্ধ্যা হবে। এটাই সুযোগ। ও একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“জি, আমি আসছি। আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছাব।”
ফোনটা রেখেই জেবা চটজলদি বাথরুমে ঢুকে গেল। বেসিনের ট্যাপটা পুরো ছেড়ে দিয়ে বরফশীতল পানি দিয়ে নিজের মুখটা ধুতে লাগল। নাকের আর ঠোঁটের কোণের জমাট বাঁধা রক্তগুলো ধুয়ে যাওয়ার সময় পানির রঙ হালকা লালচে হয়ে গেল। আয়নায় নিজের ফোলা, লাল হয়ে যাওয়া গাল দুটো দেখে ও দ্রুত ড্রয়ার থেকে কিছুটা কনসিলার আর ফেসপাউডার বের করল। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ও নিজের হাতের আঙুল দিয়ে গালের সেই কালশিটে আর চড়ের দাগগুলো মেকআপের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল।
অবিন্যস্ত চুলগুলো টেনে একটা শক্ত খোঁপা করল, তারপর আলমারি থেকে একটা গাঢ় নীল রঙের সুতি টু-পিস পরে নিল।গাঢ় রঙে ওর মুখের ফ্যাকাসে ভাবটা কিছুটা হলেও ঢাকা পড়বে। ওড়নাটা দিয়ে ভালো করে মুখ আর গলা পেঁচিয়ে জেবা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
বাড়ির কাজের লোক আরিফকে ড্রয়িংরুমে দেখে জেবা অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আরিফ ভাই, আমি একটু অরিদের ওদিকে যাচ্ছি। কিছু দরকারি নোটস বাকি আছে। বাবা ফিরলে বা ফুফুরা এলে বোলো আমি সন্ধ্যার মধ্যে চলে আসবো।”
আরিফ কোনো সন্দেহ না করে মাথা নাড়ল। জেবা দ্রুত পায়ে শেখ ভিলা থেকে বের হয়ে একটা লোকাল রিকশা নিয়ে নিল। জেবা বাড়ি থেকে গাড়ি নিলোনা, কারণ ও চায় না ওর গন্তব্যের কথা এই দুনিয়ার কোনো দ্বিতীয় মানুষ জানুক।
লাইফ স্প্রিং সাইকিয়াট্রি কেয়ার,শহরের এক কোণে অবস্থিত অত্যন্ত শান্ত, পরিপাটি আর আধুনিক এই হসপিটালটি। চারপাশটা অন্যান্য হসপিটালের মতো অতটা কোলাহলপূর্ণ নয়। জেবা তিনতলার করিডোর পেরিয়ে ৪১২ নম্বর কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার নেমপ্লেটে রুপোলি অক্ষরে লেখা-ডক্টর আয়ুশ খান, এমবিবিএস, এমডি সাইকিয়াট্রি,চিফ কনসালট্যান্ট সাইকোলজিস্ট।জেবা দরজায় আলতো করে নক করল। ভেতর থেকে একটা গম্ভীর অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
“কাম ইন।”
জেবা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। এসি-র হালকা সুবাসিত বাতাস ওর নাসিকাপথে প্রবেশ করতেই ওর ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা কমল। ঘরের মাঝখানে একটা মস্ত বড় ওক কাঠের টেবিল। তার একপাশে ল্যাপটপ আর কিছু ফাইল নিয়ে বসে আছেন পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়সী ডক্টর আয়ুশ খান। ওনার চোখে চশমা, পরনে ফর্মাল শার্ট-টাই এবং ওপরে সাদা অ্যাপ্রন। ওনার বসার ভঙ্গি এবং চোখের চাউনিতে এক ধরনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক তীক্ষ্ণতা রয়েছে, যা একজন রোগীকে দেখামাত্রই তার মনের ভেতরটা পড়ে ফেলতে পারে।
”আসুন জেবা। বসুন।”
আয়ুশ ওনার কলমটা টেবিলের ওপর রেখে সামনের আরামদায়ক কুশন দেওয়া চেয়ারটা ইশারা করলেন।জেবা ধীর পায়ে গিয়ে চেয়ারটায় বসল। ও নিজের ওড়নাটা কিছুটা আলগা করতেই আয়ুশের তীক্ষ্ণ চোখ এড়ালো না যে, কনসিলার দিয়ে ঢাকা থাকার পরেও জেবার গাল দুটো অস্বাভাবিক রকমের ফোলা এবং ঠোঁটের কোণে একটা হালকা কাটার দাগ রয়েছে। তবে সে একজন পেশাদার ডাক্তার হিসেবে প্রথমেই সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলল না। ফাইলে চোখ বুলিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় বলল,
”গত তিন সপ্তাহ ধরে আপনি কোনো সেশন নেননি, জেবা। এমনকি আপনার ফোনও বন্ধ ছিল মাঝখানে। আমি আপনার বাবাকে ইনফর্ম করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনার আগের কড়া রিকোয়েস্টের কথা মনে করে করিনি। হোয়াটস রং? আপনি আপনার থেরাপি আর মেডিসিনগুলো ঠিকমতো কন্টিনিউ করছিলেন?”
জেবা নিজের দুই হাতের আঙুল একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর গলাটা আবার শুকিয়ে আসছিল। অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
“না ডক্টর। আমি… আমি ওষুধগুলো খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম।”
ডক্টর আয়ুশ নিজের চশমাটা নাক থেকে কিছুটা নামিয়ে জেবার দিকে তাকালেন। ওনার মুখে এক চিলতে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। ওনি বললেন,
“কেন জেবা? আপনি খুব ভালো করেই জানেন, আপনার যে অবসেসিভ ইমোশনাল ক্রাইসিস, সেটার জন্য এই এক বছর ধরে আমরা যে ট্রিটমেন্টটা করছি, সেখানে মেডিসিন ড্রপ করা কতটা ডেঞ্জারাস। কেন বন্ধ করলেন?”
”কারণ ওই ওষুধগুলো কোনো কাজ করে না, ডক্টর!” জেবা হঠাৎ করেই মাথা তুলে চেঁচিয়ে ওঠার মতো করে বলল, যদিও ও গলার আওয়াজ নিয়ন্ত্রণে রাখল। ওর চোখে তখন একরাশ ক্ষোভ আর হতাশা।
“আপনার দেওয়া অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট কিংবা স্লিপিং পিলগুলো শুধু আমার শরীরটাকে অবশ করে রাখে, আমার মগজটাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। কিন্তু আমি যখনই চোখ খুলি, যখনই আমার চেতনা ফিরে আসে, সেই মানুষটার মুখ… ওনার চাউনি আমার বুকের ভেতর আরও তীব্রভাবে কামড় দেয়! এক বছর! একটা পুরো বছর ধরে আমি আপনার এই কেবিনে আসছি। আপনি প্রতি সপ্তাহে আমাকে বলেন-জেবা, এটা স্রেফ একটা ইনফ্যাচুয়েশন, একটা সাময়িক মোহ। তুমি নিজেকে ব্যস্ত রাখো, ওনাকে ভোলার চেষ্টা করো।’ কিন্তু আমি তো পারছি না! আমি দিন দিন আরও বেশি ওনার ওই জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছি।”
ডক্টর আয়ুশ খান জেবার এই আকস্মিক আউটবার্স্ট দেখেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। ওনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে দুই হাত জোড় করে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন,
“জেবা, আপনি শান্ত হোন। আপনি রেগে যাচ্ছেন। সাইকোলজিক্যাল হিলিং কোনো ম্যাজিক নয় যে আমি একটা ফুঁ দেব আর এক বছরের মধ্যে আপনার মন থেকে একটা ৫৫ বছর বয়সী মানুষের ইমেজ ডিলিট হয়ে যাবে। আপনি আমাকে খুলে বলুন, এই গত তিন সপ্তাহে নতুন কী হয়েছে? আপনি তো এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন, রাইট?”
”হ্যাঁ।” জেবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার চোখ নিচু করল।
“পরীক্ষার সময় আমি… আমি ওনার বাড়িতেই ছিলাম। মৃধা নিবাসে।”
আয়ুশের চোখ দুটো সামান্য সংকুচিত হলো। ওনি বললেন,
“আরিশান মৃধার বাড়িতে? ওনার চোখের সামনে ছিলেন আপনি?”
”জি।” জেবা বলল,ওর গলার স্বর এবার একদম হালকা আর কাঁপানো।
“আমি ভেবেছিলাম, ওনার কাছাকাছি গেলে হয়তো ওনার ওই কঠোর, গম্ভীর রূপ দেখে আমার ভেতরের এই অবাস্তব মোহটা ভেঙে যাবে। আমি ভেবেছিলাম ওনাকে সামনাসামনি দেখলে আমার মনে হবে ওনি আমার বাবার মতো। কিন্তু… কিন্তু ডক্টর, উল্টোটা হয়েছে।”
”কী উল্টো হয়েছে? ওনি কি আপনার সাথে কোনো খারাপ আচরণ করেছেন?” আয়ুশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রশ্ন করলেন।
”না! ওনি কেন খারাপ আচরণ করবেন? ওনি একজন ফেরেশতার মতো মানুষ!”
জেবা প্রায় কান্নার সুরে বলল।
“ওনি বাইরে যত কঠোর, ওনার ভেতরের মনটা ততটাই সুরক্ষাকারী। ওনি যখন রাতে কাজ শেষ করে এসে,ওনার চওড়া কাঁধে কালো কোটটা চাপিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াতেন, আমার মনে হতো পুরো পৃথিবীর সব ঝড়-তুফান থেকে ওনি আমাকে এক নিমেষে আড়াল করে নিতে পারবেন। ওনি যখন আমার দিকে তাকিয়ে ওনার ওই গম্ভীর, বজ্রকণ্ঠে জিজ্ঞেস করতেন-জেবা, পরীক্ষা কেমন হলো? কোনো সমস্যা হয়নি তো?’-ডক্টর, আপনি বিশ্বাস করবেন না, আমার বুকের বাম পাশে একটা সুনামি হয়ে যেত। ওনার ওই ৫৫ বছর বয়সের রুপোলি আভাযুক্ত দাড়ি, ওনার ওই গাম্ভীর্য, ওনার ওই বাঘের মতো তীক্ষ্ণ চাউনি… ওগুলো কোনো তরুণের চপলতার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সম্মোহনী। আমি ওনার ব্যক্তিত্বের ওই অতল গহ্বরে পুরোপুরি ডুবে গেছি।”
ডক্টর আয়ুশ খান কিছু সময় নীরব রইলেন। ওনি টেবিলের ওপর রাখা জেবার ফাইলটা ধীরে ধীরে পাতা ওল্টালেন। এই এক বছরে জেবা ওনাকে ওর ডায়েরির মতো করে সব বলেছে। আরিশান মৃধার প্রতি ওর এই অসম বয়সের অনুভূতির প্রতিটি পর্যায় আয়ুশ খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
আয়ুশ বললেন,
“জেবা, একটা কথা আমাকে খুব সততার সাথে বলুন। আপনি কি আরিশান মৃধার সাথে আপনার এই অনুভূতির কোনো ফিজিক্যাল এক্সপেক্টেশন রাখেন? আই মিন, আপনার কি ওনাকে জড়িয়ে ধরা বা ওনার সাথে কোনো শারীরিক সম্পর্কের ইচ্ছা জাগে?”
জেবা ডক্টর আয়ুশের এই সরাসরি প্রশ্নে বিন্দুমাত্র লজ্জা পেল না। ও অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কাঁপাহীন গলায় বলল,
“না ডক্টর, খোদার কসম না! আমি ওনাকে কোনো নোংরা বা শারীরিক কামনার চোখে কখনো দেখিনি। আমার এই অনুভূতিটা অত্যন্ত পবিত্র এবং নিষ্কলুষ। আমি তো ওনাকে স্রেফ নিজের চোখের সামনে দেখতে চেয়েছিলাম। আমি ওনার সাথে কোনো দীর্ঘ সংসার, বা ওনার সাথে বুড়ো হওয়ার স্বপ্নও দেখি না। আমি জানি মানুষের জীবন খুব ছোট-ষাট বা সত্তর বছর। আরিশান আঙ্কেল ওনার জীবনের একটা বড় অংশ পার করে এসেছেন। আমি শুধু চেয়েছিলাম, ওনার জীবনের বাকি যে কয়টা বছর আছে, আর আমার জীবনের যে সময়টুকু আছে-আমি ওনার হাতটা ধরে, ওনার ছায়ায় থেকে, ওনার ওই মুখটা প্রতিদিন সকালে এক পলক দেখে কাটাতে। আমি চেয়েছিলাম ওনার সেবার অধিকার পেতে। ওনার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেওয়া, ওনার চশমাটা এগিয়ে দেওয়া-এই সামান্য টুকরো টুকরো সুখের চেয়ে বেশি কিছু তো আমি কখনো আল্লাহর কাছেও চাইনি!”
আয়ুশ খান এবার একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে বললেন,
“কিন্তু জেবা, আপনি কি বুঝতে পারছেন না যে এই ‘সামান্য চাওয়াটাই’ এই সমাজের বুকে সবচেয়ে বড় অসামান্য আর অসম্ভব একটা অপরাধ? আপনি আঠারো বছরের একটা তরুণী, আর ওনার বয়স পঞ্চান্ন। ওনি দেশের একজন ক্ষমতাধর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ওনার একটা প্রতিষ্ঠিত পরিবার আছে, ওনি আপনার বাবার বন্ধু। এই সম্পর্কের কথা যদি সমাজ বা আপনার পরিবার একবারের জন্যও জানতে পারে, তবে কী মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে আপনার?”
জেবা নিজের দুই হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলল। ওর আঙুলের ফাঁক দিয়ে ফেসপাউডার ধুয়ে আবার অশ্রু বেরিয়ে এলো। ও ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি জানি ডক্টর। আমি সব জানি। সেজন্যই তো আমি কাউর জীবনে কোনো অশান্তি বা সমস্যা আনতে চাই না। আমি আমার বাবার সম্মান ধুলোয় মেশাতে চাই না। আমি অরির চোখের দিকে তাকিয়ে অপরাধী হতে চাই না। আমি তো এই অনুভূতি থেকে মুক্তি চাই! আমি প্রতিদিন রাতে আল্লাহর কাছে কাঁদি, বলি-‘আল্লাহ, আমার এই মনটা কেটে ওখান থেকে আরিশান মৃধার নামটা বের করে দাও! আমাকে এই পাপের অনুভূতি থেকে মুক্তি দাও!’ কিন্তু আমি তো ব্যর্থ হচ্ছি, ডক্টর। আমি যত বেশি ওনাকে ভুলতে চাই, আমার মগজের প্রতিটি নিউরন তত বেশি ওনার নাম জপ করতে থাকে। আমি এখন কী করব? আপনিই বলুন, আমি কীভাবে এই নরক থেকে বের হব?”
ডক্টর আয়ুশ খান এবার নিজের হাতের কলমটা ডেস্কে রাখলেন। ওনার মুখের সেই পেশাদারী কঠিন ভাবটা কিছুটা নরম হলো। ওনি একদৃষ্টিতে জেবার সেই রক্তাক্ত, ফোলা গাল আর চোখের ভেতরের তীব্র হাহাকারটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওনি বুঝলেন, এই মেয়েকে আর কোনো থিওরিটিক্যাল বা বৈজ্ঞানিক মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া স্রেফ সময়ের অপচয়। ওনি একটা দীর্ঘ, ভারী শ্বাস নিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কিন্তু সহানুভূতিশীল গলায় বললেন।
”জেবা, গত এক বছর ধরে আমি আপনাকে একজন সাইকোলজিস্ট হিসেবে অনেক থেরাপি দিয়েছি। আপনাকে বলেছি মন ডাইভার্ট করতে, আপনাকে অবসেসিভ ডিসঅর্ডারের ওষুধ দিয়েছি। কিন্তু আজ আমি আপনাকে কোনো মিথ্যা আশ্বাস দেব না। আজ আমি আপনাকে একজন বড় ভাইয়ের মতো, অত্যন্ত বাস্তববাদী একটা সত্য কথা বলে দিতে চাই।”
জেবা চোখ মুছে ডক্টরের দিকে তাকাল। ওনার গলার স্বর শুনে ওর বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল।
আয়ুশ খান বললেন,
“জেবা, আপনি সত্যিই আরিশান মৃধাকে কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। এটা স্রেফ কোনো ইনফ্যাচুয়েশন বা মোহ নয়। ইউ আর ইন লাভ উইথ দ্যাট ম্যান। আপনি ওনাকে ওনার সমস্ত গাম্ভীর্য, ওনার বয়স আর ওনার কঠোরতা সুদ্ধ ভালোবাসেন। এবং এই ভালোবাসাটা আপনার মগজের এত গভীরে শিকড় গেড়েছে যে, এটাকে উপড়ে ফেলার কোনো মেডিসিন আজ পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে তৈরি হয়নি।”
জেবার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। ও অবশ গলায় বলল,
“তার মানে… তার মানে আমি কখনো এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাব না?”
”পাবেন না, জেবা।” আয়ুশ অত্যন্ত সরাসরি বললেন, গলায় কোনো কুণ্ঠা ছিল না।
“কারণ আপনার এই ভালোবাসার পথে মূল বাধা শুধু আপনার সমাজ বা পরিবার নয়। মূল বাধা খোদ সেই মানুষটা-আরিশান মৃধা নিজে। ওনি আপনাকে স্রেফ নিজের মেয়ের মতো মনে করেন।ওনার ওই কঠোর, নীতিবান চোখে আপনার জন্য কোনোদিনও কোনো প্রেমিক পুরুষ বা স্বামীর অনুভূতি আসবে না। ওনি যদি কোনোদিন জানতেও পারেন যে আপনি ওনাকে এই চোখে দেখে, ওনি হয়তো লজ্জায় আপনার দিকে আর কোনোদিন তাকাবেনই না। সো, এই অনুভূতির শেষ পরিণতি শুধুই ধ্বংস, শুধুই একাকীত্ব আর এক বুক কষ্ট। আপনাকে এই কষ্টটাকে নিজের জীবনের একটা অংশ হিসেবে মেনে নিতে হবে, জেবা। একে ভোলার চেষ্টা করে নিজের ওপর এই অত্যাচার করা বন্ধ করুন।”
আয়ুশ খানের এই শেষ কথাগুলো জেবার বুকে তিরের মতো গিয়ে বিঁধল। ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গালে মারা সেই থাপ্পড়গুলোর কথা মনে করল। হ্যাঁ, ও তো নিজের ওপর অত্যাচার করছিল ওনাকে ভুলতে গিয়ে।জেবা ওনার দেওয়া নতুন কিছু ওষুধ আর প্রেসক্রিপশনটা টেবিল থেকে তুলে নিল।
আয়ুশ খান ফাইলে সই করতে করতে বললেন,
“আমি আপনাকে ডিপ্রেশনের আর একটা হাই ডোজের ওষুধ লিখে দিচ্ছি। যখনই মনে হবে মাথাটা পাগল হয়ে যাচ্ছে, বা নিজের ওপর কন্ট্রোল হারাচ্ছেন, একটা করে পিল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন। কিন্তু মনে রাখবেন জেবা, জীবনটা আপনার। সমাজ বা পরিবারকে না মেনে আপনি হয়তো কিছু করতে পারবেন না, কিন্তু নিজের মনকে পিটিয়ে মারার অধিকারও আপনার নেই। টেক কেয়ার।”
জেবা কোনো উত্তর দিল না। ও অত্যন্ত ধীর পায়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো তখন একদম শূন্য, যেন ওর ভেতরের সব আশা আজ ডক্টর আয়ুশের এই কেবিনে চিরতরে দাফন হয়ে গেছে।জেবা ওড়নাটা দিয়ে মুখটা আর একবার ভালো করে ঢেকে দরজা খুলে কেবিন থেকে বের হয়ে এলো।
হসপিটালের করিডোর
ডক্টর আয়ুশ খান জেবাকে বিদায় দিয়ে, সে নিজেও একটা ফাইল হাতে নিয়ে কেবিন থেকে বের হচ্ছিলেন, ওনার রাউন্ডে যাওয়ার সময় হয়েছিল। ওনি জেবার পিছু পিছু করিডোরে এসে দাঁড়ালেন এবং জেবাকে লিফটের দিকে এগিয়ে যেতে দেখলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে, করিডোরের অন্য পাশ থেকে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছিলেন ডক্টর সাদমান শাহরিয়ার চৌধুরী। সাদমান এই হসপিটালের একজন অত্যন্ত নামকরা এবং তরুণ হার্ট সার্জন।
সবচেয়ে বড় কথা, সাদমান আর কেউ নন-সে জেবার আপন ফুফাতো ভাই! সোলেমান শেখের একমাত্র বোনের ছেলে। সাদমান জেবাকে নিজের ছোট বোনের মতো যেমন স্নেহ করে, তেমনই ওর মনে জেবাকে নিয়ে একটা অলিখিত ভালো লাগাও কাজ করে,
সাদমান করিডোরে আসতেই ওর চোখ পড়ল গাঢ় নীল রঙের জামা পরা ওই মেয়েটির ওপর, যে মাথা নিচু করে লিফটের দিকে যাচ্ছে। ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকা থাকলেও সাদমানের জেবাকে চিনতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না।
”জেবা?” সাদমান মনে মনে বলে উঠল।সে ডাক দিতে চাইলো-কিন্তু ডাক দেওয়ার আগেই দেখলো, জেবা ডক্টর আয়ুশ খানের রুম থেকে বের হয়ে এসেছে। এবং ওর পিছু পিছু স্বয়ং ডক্টর আয়ুশও বের হয়েছেন। জেবা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে লিফটে ঢুকে নিচে নেমে গেল।
সাদমান ওখানেই অবাক পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।জেবা এখানে কী করছে? ও কেন একজন সাইকোলজিস্টের রুমে এসেছিল? ওর কি কোনো মানসিক সমস্যা হয়েছে? অথচ মামা তো ওকে কখনো কিছু বলেননি!
সাদমান নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলাতে না পেরে দ্রুত পায়ে ডক্টর আয়ুশ খানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর মুখটা চিন্তায় শুকিয়ে চুন হয়ে গেছে।
”আয়ুশ!” সাদমান কিছুটা উত্তেজিত গলায় বললো। ওরা একই হসপিটালের কলিগ হওয়ায় একে অপরকে নাম ধরেই ডাকে।
আয়ুশ খান সাদমানকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন। ওনি ফাইলটা বগলে চেপে বললেন,
“আরে সাদমান! কী খবর? তুমি এই ফ্লোরে? তোমার তো এখন ওটিতে থাকার কথা।”
সাদমান ওসব কথার ধার ধারলেন না।সে সরাসরি কেবিনের দরজার দিকে ইশারা করে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আয়ুশ, এইমাত্র তোমার কেবিন থেকে যে মেয়েটা নীল রঙের ড্রেস পরা অবস্থায় বের হয়ে গেল… ও কে ছিল? ও তোমার কাছে কী করছিল?”
আয়ুশ খান কিছুটা থমকে গেলেন। ওনি একজন সাইকোলজিস্ট হিসেবে ওনার পেশাদারী গোপনীয়তার কথা খুব ভালো করেই জানেন। ওনি হালকা হেসে বললেন,
“সাদমান, তুমি তো জানো আমি পেশেন্টের আইডেন্টিটি বা ডিটেইলস অন্য কারো সাথে শেয়ার করতে পারি না। ও জাস্ট আমার একজন রেগুলার পেশেন্ট ছিল।”
”রেগুলার পেশেন্ট মানে কী, ড্যাম ইট!” সাদমান এবার আয়ুশের শার্টের হাতাটা শক্ত করে চেপে ধরলো। ওর গলার আওয়াজ করিডোরের অন্যান্য নার্সদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
“আয়ুশ, ও কোনো সাধারণ পেশেন্ট নয়। ও আমার মামাতো বোন, জেবা সুলতানা! ও এই হসপিটালে, বিশেষ করে তোমার মতো একজন সাইকোলজিস্টের কাছে কেন এসেছে, তা জানার পুরো রাইট আমার আছে। প্লিজ আয়ুশ, ওয়ান ডক্টর টু অ্যানাদার… টেল মি, হোয়াটস রং উইথ মাই সিস্টার?”
সাদমানের মুখে ‘জেবা সুলতানা’ এবং ওর ফুফাতো বোন হওয়ার পরিচয়টা শোনামাত্রই ডক্টর আয়ুশ খানের পায়ের তলা থেকে যেন মেঝেটা সরে গেল! ওনি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সাদমানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওনি ভাবতেও পারেননি যে, মেয়েটির এক বছরের তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, নিষিদ্ধ ভালোবাসার ডায়েরি ওনি প্রতিদিন ওনার ফাইলে লিখছেন, ও খোদ ওনাদেরই হসপিটালের টপ হার্ট সার্জন সাদমানের বোন!
আয়ুশ খান চারপাশটা একবার দেখে নিলেন। করিডোরে নার্স আর ওয়ার্ড বয়রা যাতায়াত করছে। ওনি সাদমানের হাতটা ধরে টেনে ওনার কেবিনের ভেতরে নিয়ে আসলেন এবং দরজাটা শক্ত করে লক করে দিলেন।
”সাদমান, সিট ডাউন। শান্ত হও।”
আয়ুশ ওনার টেবিলের ওপাশে গিয়ে বসলেন এবং ওনার কপালে জমা ঘামটা মুছলেন।সাদমান চেয়ারে না বসে টেবিলের ওপর দুই হাত ঠুকে দিয়ে বললেন,
“আমি শান্ত হতে পারছি না, আয়ুশ! জেবা আঠারো বছরের একটা মেয়ে।মাএ এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে ওর। ও কেন এক বছর ধরে তোমার কাছে আসছে? ওর ফাইলে কী লেখা আছে? ও কি কোনো ডিপ্রেশনে ভুগছে? নাকি কোনো মেন্টাল ট্রমা?”
আয়ুশ খান একটা গভীর, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনি জানতেন, এখন আর লুকানো মানে সাদমানকে অন্ধকারে রাখা, যা জেবার জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। ওনি ফাইলের লকটা খুলে সাদমানের দিকে তাকালেন। ওনার চোখ দুটো অত্যন্ত গম্ভীর শোনাল।
”সাদমান, তুমি যা ভাবছ, ব্যাপারটা তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি জটিল এবং ভয়ানক।”
আয়ুশ অত্যন্ত ধীর গলায় বলতে শুরু করলেন।
“জেবা কোনো সাধারণ ডিপ্রেশনের পেশেন্ট নয়। ও বিগত একটা বছর ধরে আমার কাছে ট্রিটমেন্ট করাচ্ছে।সে আমার এক বছরের পুরনো ওয়ান অফ দ্য মোস্ট ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট।”
”ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট মানে? ওর রোগটা কী?” সাদমান প্রায় হাহাকার করে উঠলো।
আয়ুশ খান সাদমানের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন,
“ওর রোগটার নাম-প্যাশনেট অবসেসিভ লাভ ডিসঅর্ডার। ও এমন একজনের প্রেমে পড়েছে, যাকে ও নিজের মগজ থেকে কোনোভাবেই ডিলিট করতে পারছে না। আর সেই মানুষটার জন্য ও নিজেকে প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে। আজকেও ও আমার কেবিনে বসে নিজের ওপর তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে। তুমি কি জানো ও কার প্রেমে পড়েছে, সাদমান?”
সাদমানের বুকের ভেতরটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর পায়ের নিচের মাটিটা সত্যি সত্যিই সরে যাচ্ছিল। সে কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারের হাতলটা ধরলেন। ওর মনে হলো ওর হার্ট সায়েন্সের সমস্ত বিদ্যা যেন এই মুহূর্তে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।সে শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিল।
”কার… কার প্রেমে পড়েছে ও? কলেজের কোনো ছেলে? কোনো ক্লাসমেট?” সাদমান অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।
”না, সাদমান।ও কোনো সমবয়সী ছেলের প্রেমে পড়েনি। জেবা ভালোবেসে ফেলেছে ওনার বাবার বয়সী, ওর বাবা ফ্রেন্ড… দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধাকে!
’আরিশান মৃধা!’
নামটা শোনামাত্রই সাদমানের পুরো পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য ওলটপালট হয়ে গেল। ওর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল, চোখ দুটোর সামনে ঘন অন্ধকার নেমে এলো।সে অবিশ্বাস্য, স্তম্ভিত আর তীব্র ধাক্কা খাওয়া মানুষের মতো ওখানেই চেয়ারের ওপর ধপ করে বসে পড়লো। ওর মুখ থেকে আর কোনো শব্দ বের হলো না, শুধু ওর সদ্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া মনটা এক অজানা, গভীর গহ্বরে তলিয়ে যেতে লাগল।সারিমের বাবাকে।সাদমানের এসব বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো ভেতরটা একদম ফেটে যাচ্ছিলো। তবে মেডিকেল ফাইলকে বিশ্বাস না করার কোনো উপায় নেই।
সন্ধ্যার গোধূলি বেলায় এক মায়াবী আলোয় ডুবে আছে। সারিমের ভারী বুট জুতোয় মার্বেল মেঝের ওপর খটখট শব্দ তুলে সে বাড়ির ভেতর ঢুকল, তার কপালে চিন্তার ভাঁজ আর চোখে রাজ্যের ক্লান্তি। সারাদিন মন্ত্রণালয়ের মিটিং, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন আমলাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক-সব মিলিয়ে ওর মস্তিষ্ক যেন আজ জ্যামিতিক হারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কবিরাজের দেওয়া পানির বোতলটা ওর রুমের যত্ন করে রাখা, কিন্তু সেটার প্রয়োগের চেয়েও বেশি প্রয়োজন এখন ওর মনের প্রশান্তি-ওর চন্দ্রিমাকে।
অরির পড়ার ঘরের দরজাটা ভেজানো ছিল। সারিম নিঃশব্দে ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, অরি টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ঝুঁকে পড়ে মোটা বইয়ে ডুব দিয়ে আছে। চশমার ফাঁক দিয়ে তার গভীর মনোযোগ, কপালে ছোট ছোট বিন্দু ঘাম। অরিকে এত স্থির আর শান্ত দেখে সারিমের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত আবেগে কেঁপে উঠল। ও ধীরে ধীরে অরির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। অরি টের পায়নি সারিমের উপস্থিতি। সারিম নিচু হয়ে অরির কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
”এত পড়ালেখার কি দরকার, চন্দ্রিমা? বইয়ের অক্ষরে কি আমার চেয়ে বেশি সুখ পাও?”
অরি চমকে উঠল। চশমার কাঁচের ওপর সারিমের উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়ে ঝাপসা হয়ে গেছে। সে চশমাটা খুলতে নিতেই সারিম ওর হাতটা আটকে দিল। নিজে থেকেই অরির চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর অরির দুই কাঁধ ধরে টেনে সোজা করে নিজের দিকে ঘোরাল। অরি রাগি চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“আপনি এখানে কী করছেন? আমার পড়ার সময় হয়েছে, আমি বিরক্ত হতে চাই”
অরিকে পুরো বাক্য শেষ করতে দিল না সারিম।সে অরিকে এক ঝটকায় চেয়ার থেকে তুলে সরাসরি নিজের কোলে বসিয়ে নিল।সারিমের চওড়া বুকের শক্ত আলিঙ্গনে অরি যেন একেবারে বন্দি হয়ে গেল। অরি ছটফট করে উঠতে চাইলে সারিম ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর চিবুকটা অরির কাঁধে রেখে ক্লান্ত গলায় বলল,
”শশশ… নড়বি না একদম। আজকে বড্ড ক্লান্ত আমি, চন্দ্রিমা।আমার একটু শান্তি চাই,তোর বুকে।”
অরি সারিমের এই আকস্মিক নরম সুরে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল, কিন্তু তার রাগ তখনও কমেনি। সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“শান্তি চাইলে নিজের রুমে গিয়ে ঘুমান। আমি পড়ছি। ছাড়ুন আমাকে!”
সারিম চোখ বুজে রইল। ওর গলার স্বরে এখন এক গভীর আর্তি,
“তুই কি বুঝিস না, সারাদিন তোকে ছাড়া থাকাটা আমার জন্য কত কঠিন? তুই কেন এভাবে বইয়ের পাতায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখিস? একটু আমার দিকে তাকা, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দে না। খুব ব্যথা করছে মাথাটা।”
অরি তবুও বিরক্ত হলো। সারিমের এই পুরুষালি গায়ের সুবাস আর ওর এই আচরণের তীব্রতা অরির ভেতরে এক ধরনের বিদ্রোহ তৈরি করছিল। সে নিচু স্বরে বলল,
“আপনি নিজের মাথা ব্যথা নিয়ে আমার বইয়ের পাতা নষ্ট করবেন না। পড়ার সময় ডিস্টার্ব করা আপনার অভ্যাস হয়ে গেছে!”
সারিম সাথে সাথে চোখ খুলে অরির দিকে তাকাল। ওর চোখে এবার ক্লান্তি ছাপিয়ে এক অদ্ভুত জ্বালা ফুটে উঠল। সে অরিকে কোলে নিয়েই উঠে দাঁড়াল। অরি বুঝে উঠতে পারল না সারিম কী করতে যাচ্ছে। হঠাৎ সারিম অরির বই, কেমিস্ট্রির নোটবুক সব টেবিল থেকে হাতের সাহায্যে মেঝেতে ফেলে দিল। অরি চিৎকার করে উঠল,
“কী করছেন আপনি?! আমার নোটগুলো!”
সারিম পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে মেঝেতে পড়ে থাকা নোটবুকের পাতায় আগুন ধরিয়ে দিল। আগুনের শিখা দপ করে জ্বলে উঠে ওর চোখের সামনেই অরির কষ্টের লেখাগুলো পুড়তে শুরু করল। অরি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“আপনি… আপনি পাগল! আপনি এত নিচ হতে পারেন সারিম? ওগুলো আমার কষ্টের ফসল!”
সারিম অরির সেই কান্নার দিকে না তাকিয়ে ওকে সজোরে নিজের সাথে অরিকে বিছানায় চেপে ধরল। ওর বুকে অরির মুখটা গুঁজে দিয়ে সে ফিসফিসিয়ে বলল,
”হ্যাঁ, আমি পাগল। তোর এই পড়ার নেশার জন্যই আমাকে পাগল হতে হয়েছে। আমি সহ্য করতে পারি না তুই পড়ার জন্য আমাকে এড়িয়ে যাবি। আর একটা শব্দ করবি না, চুপচাপ এখানে শুয়ে থাক।”
অরি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু সারিমের বাঁধন যেন ইস্পাতের মতো। সারিম ওর হাতটা টেনে নিজের মাথায় রেখে দিল। গম্ভীর গলায় বলল,
”হয় মাথায় হাত বোলাবি, না হয় আমার এই পশুটা তোকে আজ ছিঁড়ে খাবে। তুই যদি এখন নিজেকে শান্ত না করিস, তবে আমি ভুলে যাব তুই আমার বউ, নাকি অন্য কেউ। আমি আজ ভীষণ ক্ষুধার্ত, চন্দ্রিমা… তোর এই অবাধ্যতার ফল আমি তোকে এখনই ভোগাব!”
অরি ভয় পেয়ে গেল। সারিমের চোখের সেই আদিম আর পশুর মতো তীব্রতা ওকে পাথরের মতো জমিয়ে দিল। বাধ্য হয়ে, বুকভরা কষ্ট আর অপমানে সে সারিমের মাথায় নিজের হাতটা রাখল। সারিম যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। ওর বুকের ওপর অরির নিঃশ্বাস পড়ার ছন্দটা সারিমের কানে কোনো লোরির চেয়ে কম ছিল না। অরির নীল রঙের শার্টের ওপর দিয়ে সারিম নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
”সরি, চন্দ্রিমা… আমি জানি আমি অনেক বড় অন্যায় করেছি তোর বইগুলো পুড়িয়ে। কিন্তু বিশ্বাস কর, তোর এই বইগুলো যখন আমার আর তোর মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমার নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তুই শুধু আমার… এই মৃধা আবরার সারিম রানি হয় বুকে থাকবি। বইয়ের দরকার নেই।”
অরি কিছু বলল না। ওর হাতটা সারিমের চুলে আটকে আছে। সে কাঁদছে নিঃশব্দে। ওর নিজের স্বপ্নগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, আর সারিম ওর চন্দ্রিমার বুকে মাথা রেখে গভীর এক শান্তির সাগরে ভাসছে। সারিমের শ্বাস-প্রশ্বাস আস্তে আস্তে ভারী হতে লাগল। ক্লান্তির ভারে সে চোখ বুজে ফেলল। অরি নিচে তাকিয়ে দেখল, সারিম একদম ছোট বাচ্চার মতো ওর বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। এই সেই মানুষ, যে কিছুক্ষণ আগে দানবের মতো ওর বই খাতা পুড়িয়ে দিল, আর এখন সে ওর বুকের ওপর মাথা রেখে তৃপ্তির ঘুম দিচ্ছে। অরি নিজেও আর নড়তে পারল না। ওর হাতটা সারিমের চুলে বিলি কেটে যাচ্ছিল, যদিও মনে মনে সে সারিমকে হাজারবার অভিশাপ দিচ্ছিল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামবে, অরির বুকের ওপর সারিমের এই নিবিড় ঘুম যেন আরো বেশি গাড় হলো।
হসপিটাল থেকে ফেরার পথে জেবার চারপাশটা কুয়াশার মতো ঝাপসা মনে হচ্ছিল। আরিশান মৃধার নামটা তার মগজের প্রতিটি কোষে যেন কাঁটার মতো বিঁধছে। ডক্টর আয়ুশের কথাগুলো
“ওনি কোনোদিনও আপনাকে প্রেমিক বা স্ত্রীর চোখে দেখবেন না”এই বাক্যটি বারবার তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে। জেবা অটোরিকশার জানালার কাচে মাথা ঠেকিয়ে রাখল। ওর ঠোঁটের কোণের রক্ত শুকিয়ে কালো দাগ হয়ে আছে, কনসিলারের আড়ালে ঢাকা পড়া গাল দুটো এখনও দপদপ করছে।
শেখ ভিলার গেট দিয়ে ঢুকে। সদর দরজায় সে পা দিতেই দেখতে পেল। ড্রয়িংরুমের ভেতর থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। ও বুঝতে পারল ফুফুরা এসে পড়েছে। জেবা নিজের ওড়নাটা দিয়ে মুখ আর গলাটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল, যাতে কেউ ওর বিধ্বস্ত চেহারাটা না দেখে ফেলে।
ঘরে ঢুকতেই ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে থাকা আনজুমান শেখ জেবাকে দেখে হাত নাড়লেন। ওনার পাশে বসে আছেন ওনার স্বামী আরাফাত চৌধুরী আর জেবার কাজিন আরা।
সোলেমান শেখ মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন,
“এই যে জেবা ফিরেছে। কই ছিলি এতক্ষণ?”
জেবা কোনোমতে একটা কৃত্রিম হাসি টেনে বলল,
“বাবা, ওই তো… অরিদের বাড়ি গিয়েছিলাম, নোটস আনতে।”
ফুফু আনজুমান বেগম জেবাকে কাছে টেনে নিলেন। ওনার পরনে সিল্কের শাড়ি, গলায় ভারী সোনার চেইন। তিনি জেবার চিবুক ধরে আদর করে বললেন,
“আমার জেবা মা দেখি আগের চেয়ে অনেক শুকিয়ে গেছে রে! অরিদের ওখানে কি কিছুই খাসনি নাকি? চেহারাটা এমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে কেন?”
জেবা মাথা নিচু করে রইল। ফুফুর স্পর্শে ওর গা শিউরে উঠল। তার এখন খুব ইচ্ছে করছে এই ঘর থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে।ঠিক তখনই আনজুমান বেগম সোলেমান শেখের দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বললেন,
“সোলেমান, তাহলে যা কথা হয়েছে, সব পাকাপাকি রইল তো? আমি কাল সকালেই লোক পাঠাব। জেবাকে আমি একদম আমার বাড়িতেই নিয়ে যাব। আমার ঘরে নতুন বউ আসার জায়গা তৈরি হয়ে গেছে।”
জেবা চমকে উঠে ফুফুর দিকে তাকাল।
“ফুফু, আপনি কী বলছেন? আমি বুঝলাম না।”
ফুফু কোনো উত্তর না দিয়ে হাতব্যাগ থেকে একটা ছোট মখমলের বক্স বের করলেন। বক্স খুলতেই একটা উজ্জ্বল হীরের আংটি ঝিলিক দিয়ে উঠল। আনজুমান বেগম জেবার হাত টেনে আংটিটা ওর আঙুলে পরিয়ে দিলেন। তারপর আরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আরা, তুই জেবাকে নিয়ে যা। ওর সাথে একটু গল্প কর, আমি তোর মামার সাথে বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করি।”
আরাফাত চৌধুরী জেবার মাথায় হাত রেখে স্নেহভরে বললেন,
“মা, তুই আমার বড় আদরের। তোর জন্য এর চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত আর হতে পারত না।”
জেবা পুরো বিষয়টাতে প্রচণ্ড অবাক, স্তম্ভিত। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরা তাকে হাত ধরে দোতলার দিকে নিয়ে গেল। নিজের রুমে বসিয়ে আরা জেবার কাঁধে হাত রেখে উত্তেজিত গলায় বলল,
“কী খবর বল তো? কেমন লাগছে হবু কনের? ভাইয়া তো কালই বাড়ি এসে মাকে বলেছে, সে আর দেরি করতে চায় না।”
জেবা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“আরা, কার কথা বলছিস? ভাইয়া মানে সাদমান ভাইয়া?”
আরা খিলখিল করে হেসে দিয়ে জেবার হাতটা নিজের হাতে নিল।
“হ্যাঁ, সাদমান ভাইয়া! আর কে? তুই জানিস না, ভাইয়া আমেরিকা যাচ্ছে? সেখানে ওর হার্ট সার্জারির ওপর বড় একটা হসপিটালে জব অফার এসেছে। পরশু রাতে এসে মাকে সব বলেছে।ভাইয়া চায় তুই ওর সাথে যাবি। মাকে বলেছিল, জেবাকে বিয়ে করে নিয়ে যেতে চায়, কারণ ভাইয়া একা ওখানে থাকতে পারব না, আর তুই ওখানে ভালো কোনো মেডিকেল কলেজে পড়াশোনাও করতে পারবে।’ মা তো শুনেই খুশিতে আটখানা! সাদমান ভাইয়া তো কোনোদিন কারো অবাধ্য হয়নি, আর তোর কথা শুনে তো সে বিয়ের জন্য সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেল।”
জেবার মনে হলো ওর পায়ের তলার মেঝেটা যেন ধসে যাচ্ছে। সাদমান ভাইয়া? যে সাদমান ভাইয়াকে সে এতদিন কেবল শ্রদ্ধার চোখে দেখেছে, সে তাকে বিয়ে করতে চায়? আর এই খবরটা সবাই জানে, শুধু সে-ই জানে না?
জেবা কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“কিন্তু ভাইয়া তো আমার সাথে একবারও কিছু বলেনি!”
আরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ভাইয়া তো কাল রাত থেকেই ওটিতে ব্যস্ত। জরুরি কিছু কেস ছিল। ওর কাজ এতটাই জরুরি যে আজকে সে বাড়িতে আসতেও পারেনি, সরাসরি ওটিতে গিয়েছে। তবে মা আর বাবা যা ঠিক করে ফেলেছেন, তা তো আর নড়চড় হবে না। জেবা, তুই কি খুশি না? সাদমান ভাইয়া তোকে কত ভালোবাসে, এটা কি তুই জানতি না?”
জেবা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ওর মনে হাহাকার করে উঠল। ও যার জন্য নিজের মনটাকে প্রতিদিন খুন করছে, যার জন্য নিজেকে রক্তাক্ত করেছে, সেই আরিশান মৃধা ওর কাছে এক অধরা স্বপ্ন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সমাজ আর পরিবার তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে অন্য এক বাস্তবতায়। সাদমান ভাইয়াকে সে অসম্মান করতে পারবে না, আবার আরিশান মৃধার কথা সে কোনোদিন মাথা থেকে বেরও করতে পারবে না।
আরা আবার বলল,
“চল, নিচে চল। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে। আজ রাতে একটা ছোটখাটো এনগেজমেন্টের অনুষ্ঠান হবে। তোকে সাজতে হবে না, যেমন আছিস, তেমনই মিষ্টি লাগছে।”
জেবা জানালা দিয়ে বাইরের তপ্ত রোদের দিকে তাকাল। ওর মনে হলো, জীবনের চাকাটা বড় অদ্ভুত। সে চেয়েছিল এক পবিত্র আশ্রয়, অথচ জীবন তাকে এমন এক গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে যেখানে মুক্তির কোনো পথ নেই। সাদমান ভাইয়াকে সে না করতে পারবে না, কারণ তার বাবা এই সম্পর্কে অত্যন্ত সুখী। আর আরিশান মৃধা? তিনি চিরকাল এক মরীচিকার মতো তার মনের অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকবেন।জেবা আয়নার দিকে তাকাল। মেকআপের আড়ালে ঢাকা পড়া সেই ক্ষতগুলো যেন আজ আরও বেশি করে জ্বলছে। ও মনে মনে বিড়বিড় করল, “হে আল্লাহ, আমি কি তাহলে কোনোদিনই শান্তি পাব না? আমার ভালোবাসা নিষিদ্ধ, আর আমার জীবনটা এখন অন্যের সিদ্ধান্তের দাস!”
নিচ থেকে ফুফুর ডাক শোনা গেল,
“জেবা? মা, নিচে আয়!”
জেবা উঠে দাঁড়াল। ও জানে না, এই আংটিটা তার হাতে একটি শিকল হয়ে দাঁড়িয়েছে।অথচ তার হৃদয়ে পড়ে থাকবে অন্য এক মানুষের নাম, যে তাকে কখনো জানতেই পারবে না যে, তার জন্য এই মেয়েটা কতবার নিজের আত্মাকে চুরমার করে ফেলেছে।
আরা জেবার হাত ধরে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল। জেবার মনে হলো, প্রতিটি সিঁড়ি যেন তাকে অন্ধকার এক গহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে হাঁটছে, কিন্তু ওর ভেতরটা যেন পাথরের মতো ভারী। নিচে সোলেমান শেখ তার একমাত্র মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছেন, অথচ তিনি জানেন না, তার এই মেয়ের জীবনটা আর কোনোদিন স্বাভাবিক হবে না। আরিশান মৃধার ছায়া তাকে আজীবন তাড়া করে ফিরবে।
জেবা নিচে নেমে আসতেই সবাই তাকে ঘিরে ধরল। আনজুমান বেগম আবার বললেন,
“কী মিষ্টি লাগছে আমার বউমাকে! সোলেমান, তুই নিশ্চিন্ত থাক, আমি জেবাকে আমার মেয়ের মতোই রাখব।”
জেবা হাসল। সেই হাসিটা ছিল এক অদ্ভুত বিষণ্নতায় মোড়া।
কিছুক্ষন পরের দৃশ্য……
মেহমানরা একে একে বিদায় নিতেই পুরো শেখ ভিলায় একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল। ড্রয়িংরুমের ঝলমলে আলোটা এখন জেবার চোখে তীব্র সূঁচের মতো বিঁধছে। সোফায় বসে থাকা সোলেমান শেখের মুখে তখনো এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। নিজের একমাত্র মেয়ের এমন সুপ্রতিষ্ঠিত এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ দেখে একজন বাবার বুকে যে স্বস্তি, তা ওনার চোখে-মুখে স্পষ্ট।
সবাই চলে যেতেই সোলেমান শেখ জেবাকে ইশারায় ওনার পাশে এসে বসতে বললেন। জেবা যান্ত্রিক পুতুলের মতো গিয়ে বাবার পাশে বসল।
সোলেমান শেখ জেবার মাথায় হাত রেখে পরম স্নেহে বললেন,
“মা জেবা, আমি জানি সবটা খুব হুট করে হয়ে গেল। তুই হয়তো মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলি না। কিন্তু বিশ্বাস কর মা, আনজুমান যখন সাদমানের এই প্রস্তাবটা নিয়ে এল, আমি না করতে পারিনি। সাদমানের মতো ছেলে আজকালকার দিনে মেলা ভার।”
জেবা কিছু বলল না, শুধু নিচু করে রাখা চোখ দুটো দিয়ে মেঝেটা দেখছিল। ওর ভেতরের ঝড়টা তখনো বইছে।
সোলেমান শেখ মেয়ের নীরবতাকে অন্য কিছু ভেবে আবার বলতে লাগলেন,
“সাদমান শুধু আমার ভাগ্নেই নয়, ও একজন অসাধারণ ডাক্তার, তার চেয়েও বড় কথা ও খুব ভালো একটা মানুষ। তোকে ও কতটা সম্মান করে, তা আজ ওর মায়ের কথা শুনেই বুঝলাম। আমেরিকায় এত বড় একটা সুযোগ পেয়েছে, অথচ ও সেখানেও তোকে সাথে নিয়ে যেতে চায়। তোর পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে চায়। একজন বাবার এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে বল? আমি তো চিরকাল তোর পাশে থাকব না মা। আমি চাই আমার যাওয়ার আগে তোকে এমন একজনের হাতে সঁপে দিয়ে যেতে, যে তোকে আগলে রাখবে।”
বাবার প্রতিটি কথা জেবার বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসছিল।বাবার এই আকুলতা, দুটো দুই দিক থেকে তাকে পিষে ফেলছে। একদিকে আরিশান মৃধার প্রতি তার সেই তীব্র, অবিনাশী কিন্তু নিষিদ্ধ ভালোবাসা, যা কেবলই এক মরীচিকা; অন্যদিকে সাদমানের দেওয়া এক সুনিশ্চিত, নিরাপদ কিন্তু প্রেমহীন ভবিষ্যৎ।
সোলেমান শেখ জেবার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বললেন,
“কী রে মা? কিছু তো বল? তুই কি এই বিয়েতে সুখী নোস? তোর কি অন্য কোনো পছন্দ আছে?”
বাবার এই একটি প্রশ্নে জেবার ভেতরটা কেঁপে উঠল। ও কীভাবে বলবে যে ওর মনের সবটুকু জুড়ে এমন একজন মানুষ বসে আছে, যার কাছে জেবার কোনো অস্তিত্বই নেই?বাবার এই সরল, আশাবাদী মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের কলঙ্কিত ভালোবাসার কথা প্রকাশ করার সাহস জেবার হলো না। বাবার সম্মান আর মুখের হাসির চেয়ে বড় কিছু এই মুহূর্তে ওর কাছে মনে হলো না।
জেবা নিজের ভেতরে চলা তীব্র এক মানসিক লড়াইয়ের অবসান ঘটাল। ও বুঝতে পারল, আরিশান মৃধাকে পাওয়ার আশা করা আর জলহীন মরুভূমিতে বৃষ্টির অপেক্ষা করা একই কথা। যে মানুষটা তাকে কখনো আপন করে নেবে না, তার জন্য নিজের বাবার স্বপ্নকে এভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিজেকে এই বলির পাঁঠা বানানোর সিদ্ধান্ত ও একপ্রকার মেনেই নিল।
জেবা চোখের কোণের জলটুকু ভেতরেই চেপে রেখে একটা ম্লান, মলিন হাসি হাসল। বাবার হাতের ওপর নিজের কাঁপতে থাকা হাতটা রেখে বলল,
“না বাবা… তেমন কিছু না। তুমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছ, তাতেই আমার সম্মতি। সাদমান ভাইয়া সত্যিই খুব ভালো। আমি… আমি এই বিয়েতে রাজী।”
মেয়ের মুখে ‘রাজী’ শব্দটা শুনে সোলেমান শেখের চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। তিনি জেবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৮
“আমি জানতাম আমার মা আমার কথা ফেলবে না। তুই দেখিস মা, তোর জীবনটা অনেক সুন্দর হবে।”
বাবার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে জেবা চোখ বন্ধ করল। অন্ধকার নেমে এল ওর চোখের সামনে। ও বুঝতে পারল, আজ থেকে সে আরিশান মৃধার নামটা তার হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর এবং গোপন কোনো কফিনে চিরকালের জন্য কবর দিয়ে দিল। বাইরে সে সাদমানের স্ত্রী হবে ঠিকই, কিন্তু ওর ভেতরের জেবাটা আজ রাতেই নিঃশব্দে মরে গেল।
