Home আকাশপ্রিয়া আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬০

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬০

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬০
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ বাচ্চাকে প্রথম কে কোলে নেবে? বাচ্চার বাবা কোথায়?’
অপারেশন থিয়েটারের আলো নিভেছে মিনিট দশেক আগে। সেদিকেই অধির আগ্রহে তাকিয়ে ছিলো সকলে। নার্সের কন্ঠস্বর শুনে তারপর এগোতে হলো না কাউকে, দরজা খোলা মাত্র উঠে দাড়িয়েছে সবাই।
নার্সের কোলে সফেদ তোয়ালেতে মোড়ানো একটা ছোট্ট প্রান। একদম নিশ্চুপ হয়ে আছে। খানিক আগেও তীক্ষ্ণ কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিলো বাইরে থেকেও। চৌধুরী বাড়ির সকলে সহ, প্রিয়ার বাবা মা সকলেই অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে ছিলো ওটির বাইরে। নার্স কথাটা বলা মাত্র হুড়মুড়িয়ে সবার আগে এগিয়ে গেলো অয়ন। মহিলার কোলে থাকা নিজের অংশের দিকে তাকিয়ে ব্যাস্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

—’আমি…আ..আমি বাবা। বাচ্চার বাবা। আমি বাচ্চার বাবা।’
অয়ন একই কথার পুনরাবৃত্তি করছে বারংবার। কতটা নার্ভাস হয়ে আছে কথার সুরে স্পষ্ট বুঝতে পারা যাচ্ছে। অয়নকে ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়েছে প্রিয়া। বাকিরাও তাই। রাতুল, রাকিব, রেদোয়ানসহ আকাশ খানিক দূরেই হাস্যজ্জল মুখে দাঁড়িয়ে। অয়নের ছটফট অবস্থা সামলাচ্ছিলো তারাই। ওদিকে
নার্সকে প্রায় ঘিরে ধরেছে সকলে। আনিসুল সাহেব, রেণুকা রহমান সমানে কেঁদে যাচ্ছেন। বাকিদের চোখেও চিকচিক করছে নোনাজল। নার্সটি মিষ্টি হেসে কোলের বাচ্চাটিকে এগিয়ে দিলো অয়নের দিকে। নরম কন্ঠে বললো,
—’মিস্টার চৌধুরি, আপনার ছেলে। নিন, কোলে নিন।’
অয়ন খেয়াল করলো শ্বাস নিতে পারছে না সে। পুরুষালি শক্তপোক্ত শরীরটা কাঁপছে তার। প্রিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকাতে মরিয়া। হাতটা একপ্রকার নিষপিষ করছে যেনো। তার আপুর অংশ এটা! আপুর বাচ্চা! সে খালামুনি এখন! অয়ন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে সকলের দিকে তাকালো একটাবার। আমেনা ছেলের কাঁধে হাত রেখে ইশারা করলেন বাচ্চাটাকে কোলে নিতে। অয়ন এ যাত্রায় খুব আলতো হাতো, যত্ন সহকারে কোলে তুলে নিলো বাচ্চাটাকে। চোখের পানি বাঁধ মানতে চাচ্ছে না। বাচ্চাটাও বোধহয় কোনো এক অলৌকিক শক্তিতে টের পেয়ে গেলো পিতার সান্নিধ্য। অয়নের কোলে আসা মাত্র শব্দ করে কেঁদে উঠলো। অয়ন বাচ্চাটাকে উঁচিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো ছোট্ট ললাটে। ফিসফিস করে বললো,

—’বাবা…’
হাসপাতালের ভেতরের অর্ধেক মানুষই বোধহয় আজকে শিয়ার জন্য এসেছে। চৌধুরীদের যৌথ পরিবারের মানুষজন, সাথে আকাশের বন্ধুদের হট্টগোল তো আছেই। দুই পরিবারের মানুষজন সহ বাইরের আরও অনেকেই এসেছে। সব মিলিয়ে এলাহি কান্ড একপ্রকারে। শিয়ার ডেলিভারির ডেট আরও তিনদিন পরে থাকলেও মেয়েটার ব্যাথা শুরু হয় ভোর থেকে। বাধ্য হয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিয়ে আসা হয়েছে হসপিটালে। সকাল থেকে টানা কয়েকঘন্টার ব্যাথা সহ্য করে দুপুরের দিকে নরমাল ডেলিভারিতেই সুস্থ ভাবে জন্ম হয়েছে একটা ফুটফুটে ছেলে সন্তানের। আকাশদের বাড়ির সকলেই চট্টগ্রাম এসে পৌছেছে দু’দিন হলো। আমিনা চৌধুরী অবশ্য নিজের জা দের নিয়ে এসেছেন আরও আগে। ডেলিভারির ডেট যত ঘনিয়ে আসছিলো, এক এক করে জমায়েত হয়েছে সকলে।
রাতুল, রাকিব, রেদোয়ান ব্যাস্ত সময় পার করছে সেই দুপুরের পর থেকে। সুসংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি বিতরণের দায়িত্ব তো তাদের ওপরই পরেছে। শিয়াকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে আধঘন্টা হলো। সব মহিলারা আছেন মেয়েটার কাছে। অয়ন একনজর দেখা করে এসেছে। এতো এতো মানুষজনের ভিরে স্ত্রীর কপালে একটা চুমু খাওয়ার সময় অবধি দেওয়া হচ্ছে না তাকে।

—’ বাচ্চার বাপ, কি অবস্থা। ফিলিংস কেমন?’
বাঁকা একটা কন্ঠস্বরে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো অয়ন। পাশে আকাশ এসে বসেছে কখন টেরই পায়নি। ছেলেটার দৃষ্টি ফোনের দিকে। শিয়ার কেবিনের বাইরের করিডরে বসে আছে অয়ন। ওদিকটায় বসা আকাশের বাবা, চাচা রা সকলেই। আরশি রা সকলে হৈ চৈ করছে একপ্রকারে। এটা যে হসপিটাল, কোনো মাছের বাজার বা মেলা নয় সেটা বোধহয় এদের কারোর মনেই নেই।
অয়ন গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো,
—’বললেই বুঝবি? ফিলিংস তারাই বোঝো যারা বাপ হতে পেরেছে। তুই বিবাহিত সিংগল মানুষ। তুই কি করে বুঝবি বাপ হওয়ার ফিল!’
অয়নের সুক্ষ্ম খোটা গায়ে মাখলো না আকাশ। ভাইটা যে তার ছটফট করছে একদন্ড বউয়ের কাছে যাওয়ার জন্য, তা তো অনেকক্ষণই টের পাচ্ছে সে! আকাশ নিজের হাতের ফোনটা, পকেটে গুঁজে কেবিনের দরজার দিকে তাকিয়ে বললো,

—’তোমার শশুর কে বলো তাহলে। ছোট মেয়েরও এখন একটা গতি করুক। বিয়ে করেছি, বাসরও করেছি। নতুন করে অবিবাহিত ভাবা যায় না-কি নিজেকে! কতটা কষ্টে আছি তোমার অন্তত বোঝা উচিত। ‘
ভ্রু কুঁচকে তাকায় অয়ন।
—’ নাটক করবি না একদম। বিয়ের বছর পার হচ্ছে। এখনও ব্যাচেলর আছিস! এই নাটক করবি না।’
—’ব্যাচেলর না? তোমার শশুর, শাশুড়ী এসেছে আজ পনেরো ষোল দিন। এমন ঢং করতে হচ্ছে তাদের সামনে–আমি প্রিয়াকে চিনিই না। এটা কি মানা যায়?’
ঠোঁট উল্টায় অয়ন। আকাশ গম্ভীর মুখে যে, তাকে এতো বাঁকা কথা কিভাবে বলতে পারছে জানা নেই তার।
—’আমার শশুড় শাশুড়ির দোষ! আলাদা থাকিস আজ ছয় মাস যাবৎ। আমরা অন্ধ!’
—’সে তো তোমার শালিকা ছোট মানুষ বলে।’
—’তার আগের ছয় মাস ছোট মনে হয়নি?’
শব্দ করে হেসে ফেললো আকাশ। অয়ন এখন কোনো কিছুর পরিপ্রেক্ষিতেই মজা করার মতো মুডে নেই।

—’ক্ষেপে যাচ্ছো কেনো? দাড়াও দাড়াও, ব্যাবস্থা করি একটা।’
কথাটা বলেই আকাশ উঠে এগিয়ে গেলো কেবিনের দিকে। দুই বাড়ির সব মা, চাঁচি, কাজিনরা ঘিরে ধরে আছে শিয়াকে। দরজায় কড়া নেড়ে ভিতরে ঢুকলো আকাশ। সবাইকে লক্ষ করে বের হওয়ার জন্য বললো। দাঁতে জিব কাটলো সকলে। বোঝা উচিত। যার বউ, বাচ্চা তাকেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি এতক্ষণ। রীতিমতো ভুলে বসে আছে সবাই বাচ্চার বাপের কথা!
পুরো কেবিন ফাঁকা বর্তমানে। বেডে আধশোয়া হয়ে আছে শিয়া। পাশেই ছোট্ট একটা বেডে বাচ্চাটাকে শুয়িয়ে রাখা। অয়ন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই থমকালো কিয়ৎক্ষন। মেয়েটা আগ্রহী চোখে তার অপেক্ষাতেই ছিলো। অয়ন ভিতরো ঢুকতেই মিষ্টি হাসলো। মৃদু কন্ঠে ডাকলো,

—’এসো এদিকে। ‘
কম্পিত পা জোড়া টেনেহিঁচড়ে সামনে এগোলো ছেলেটা। চোখে ঝাপ্সা দেখছে। নোনাজল বারংবার আড়াল করছে দৃষ্টিশক্তি। বেডের কিনরায় বসে পুনরায় নজর বুলালো নিজের অংশের দিকে। কি শান্ত! ঘুমাচ্ছে বুঝি! মৃদু হাসলো অয়ন, হাত বাড়িয়ে শিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
—’ধন্যবাদ জান। কৃতজ্ঞ আমি তোমার প্রতি। এতো সুন্দর অনূভুতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। ‘
শিয়া নাক টানলো। কান্না থামছেই না দুজনের কারোর।
—’বাবা হয়ে গেলে তো। খুশি?’
—’খুউব।’
—’ছেলের বাপ।’
কান্না চোখেই শব্দ করে হেসে উঠলো অয়ন। ঝুঁকে গিয়ে কপাল ঠেকালো শিয়ার কপালে। কাট কাট কন্ঠে বললো,

—’আমার ছেলের মা!’
দু’জনেই তাকায় নিজেদের অংশের দিকে। তাদের পূর্ণতা। তাদের ভালোবাসার পূর্ণতা! ছোট্ট একটা বাচ্চা, তোয়ালে তে মুড়িয়ে রাখা। চোখদুটো ফুলোফুলো। বুঁজে আছে। শিয়া মিহি কন্ঠে শুধালো,
—’সবাই খুশি?’
—’খুব খুশি।’
—’প্রিয়া কে দেখলাম না। সবাই এসেছিলো ভিতরে,ও আসেনি।’
হাসলো অয়ন। সে বেচারি খুশির চোটে নাকের পানি, চোখের পানি এক করে ফেলেছে। নিভৃতে ঠিক আসবে। অয়ন বললো প্রিয়ার সে-সব কীর্তি। তারপর মৃদু হেসে বললো,
—’তাকে এখন চৌধুরী বাড়ির বউয়ের মর্যাদা দিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তোমার ভাইটা বড্ড যন্ত্রনায় আছে।’
মাথা ঝাকালো শিয়া। প্রিয়ার অসুস্থতার জন্য বিগত কয়েকটা মাস যাবৎ স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারছে না দুজন। অবশ্য কয়েকদিন আগে সে নিজে নিয়ে এসেছিলো প্রিয়াকে,পুনরায় চেকআপ গুলো করাতে। আর কোনো বিপদ নেই। প্রিয়ার শারীরিক কোনো অসুবিধা নেই। আর না তো ওদের স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রী হিসেবে জীবনযাপন এ কোনো বাধা আছে।

—’আমাদের বাবা টাকে নিয়ে কটেজে ফিরি। ফিরেই ওদের বিষয়টা নিয়ে এগোবো। ‘
অয়ন সম্মতি দিলো স্ত্রীর কথায়। হাত বাড়িয়ে আলতো হাতে ছুঁয়ে দিলো সন্তানের গাল টা। লাল টকটকে মুখখানা। শিয়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে বাপ, ছেলের দিকে। ছেলেটা কার মতো হয়েছে? অয়নের মতো কি? মনে মনে একচোট হাসলো নিজেই। সদ্যজাত সন্তান তার। কিছুক্ষণ আগেই দুনিয়ার আলো দেখলো। এখনই মুখাবয়ব এ বুঝতে পারা যায় নাকি!

—’ কষ্ট করলো শিয়া। কান্নার কথা তো ওর। তুমি তখন থেকে কাঁদছো কেনো?’
এইতো শুরু হয়ে গেলো আরেক আবেগ অনূভুতিহীন লোকের জ্ঞান দেওয়া। এই লোকের কি কোনো অনূভুতিই নেই! কান্না পাবে না! তার বড় আপুর কোল আলো করে একটা প্রান এসেছে। খুশিতে কান্না করার জন্য এতটুকুই কি যথেষ্ট নয়!
রাত কত আর হবে! আনুমানিক দশটার ঘরে ঘড়ির কাটা। বর্ষাকাল এখন। শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি চলছে। বাইরে ঝমঝম শব্দ বলে দিচ্ছে কতটা উথালপাতাল অবস্থা বাইরের। শিয়াকে রিলিজ দেওয়া হবে কবে, সেটা জানায়নি এখনো। তবে রিপোর্ট সব নরমাল। মা আর বাচ্চা নিয়ে দু একদিনেই সকলে ফিরে যেতে পারবে। যথারিতি সকলে বাচ্চা আর মা কে নিয়ে ব্যাস্ত। প্রিয়া দু-দুবার গিয়েছিলো বোনের সাথে দেখা করতে। একবার অয়ন ছিলো ভিতরে, আরেকবার শিয়া সম্ভবত ঘুমাচ্ছিলো। এখনো মন খুলে বোনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেই পারেনি। প্রিয়ার মুখে কোনো রা নেই। মেয়েটাকে খুঁজছিলো আকাশ, অনেকক্ষণ যাবৎ। তাদের বাবারা কটেজে ফিরে গিয়েছে। রাকিব নিয়ে গিয়েছে তাদের। সবার অযথা হসপিটালে রাত জাগার মানেই হয় না। তবে আকাশের বিচ্ছু ভাইবোন গুলোকে কিছুতেই পাঠানো যায়নি। শিয়ার কেবিনটায় সম্ভবত পা ফেলারও জায়গা অবশিষ্ট নেই। অবশ্য আলাদা করে বেডের ব্যাবস্থাও করা আছে। আকাশ কড়া নিদের্শ দিয়ে এসেছে, রুগীর কাছে রাত জেগে হট্টগোল না করে দ্রুত ঘুমিয়ে যেতে।
প্রিয়ার ক্রমাগত নাক টানার শব্দে একপেশে হাসলো আকাশ। এ আরেক বাচ্চাকে বিয়ে করেছে সে। বয়সে বা হাতেপায়ে দুটোতেই বড় হয়েছে। অথছ কিছু কিছু আহ্লাদী ছেলেমানুষী এখনো যায়নি! আকাশের অবশ্য সে-সব মন্দ লাগে না। বরং একটু বেশিই ভালো লাগে। আকাশ কন্ঠস্বর নিচু করে ডেকে বললো,

—’কান্না কি থামবে না?’
—’কাঁদছি না আমি।’
কথাটা বলেই পুনরায় নাক টানলো প্রিয়া। অদেখা হাসলো আকাশ। সারাদিন কেঁদেছে মেয়েটা। ডেলিভারির আগে কেঁদেছে শিয়ার ব্যাথায় চিৎকার করা দেখে, এখন কাঁদছে বাচ্চাটাকে দেখে! আকাশ ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো খানিকটা। আঙুল ছুঁইয়ে রক্তিম গালের ওপর থেকে গড়িয়ে পরা তপ্ত নোনাজলে স্পর্শ করলো।
—’এটা কি?’
—’কিছু না।’
—’বেবিকে দেখেছো?’
ওপর নিচ মাথা নাড়লো প্রিয়া। দেখেছে বোঝালো।
মুখেও অস্ফুটে উচ্চারণ করলো,
—’হু। টাইনি একদম।’
—’ কোলে নিয়েছিলে?’
—’সুযোগ পাচ্ছি কই?’
চোখেমুখে রাজ্যের কপটতা খেলা করে গেলো আকাশের। অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বললো,
—’বেবির খালামনি, চাচি দু’টোই তুমি। একমাত্র, তার ওপর! আর তুমি কোলে নেওয়ার সুযোগ পাওনি, দেয়নি কেউ! এটা মানার মতো?’
বিরক্ত মুখে আকাশের উরুর ওপর আলতো চড় বসালো প্রিয়া। নাক টেনে বললো,

—’ঢং করবেন না। আপনি দেখেছেন বাবুকে?’
—’হু।’
—’আপনি নিয়েছেন কোলে?’
—’সাহস হয়নি। যদি পরে যায়।’
—’আপনি ভয়ও পান!’
—’পাবো না! বিড়াল ছানার মতো ছোট্ট। ধরতে গেলেই হাত কাঁপবে। ‘
ফিক করে হেসে ফেললো প্রিয়া। আকাশের বলার ভঙ্গিতে। হঠাৎ কিছু একটা খেয়াল হলো মেয়েটার। ঝট করে তাকালো আকাশের দিকে। অবাক হয়ে শুধালো,
—’সূর্য় আজ কোনদিক দিয়ে উঠেছে! আকাশ এহনাজ চৌধুরী বউয়ের সাথে এতো সুইটলি কথা বলছে! তাও আবার এতো জনম পরে?’
মুখের হাসিটা মিয়িয়ে গেলো নিমিষে। মেয়েটা ঠিক জায়গামতো খোঁচা টা দিয়ে বসলো। কোনো ধরনের ঝগড়া ঝামেলা না হয়েও, অদেখা মান-অভিমান চলছিলো এই দম্পতির। আকাশ দু হাতে মাথার চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে বললো,

—’নিজের স্বার্থেই।’
প্রিয়া কপাল কুচকালো। সরু চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—’যেমন?’
আকাশ প্রিয়ার দিকে স্থির চোখে তাকালো এ যাত্রায়। নজরে নজর মিললো। সামান্য ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললো,
—’ আমাদেরও তো এবারে প্ল্যান পরিকল্পনা করতে হবে৷ তাই আরকি।’
—’কিসের পরিকল্পনা? ‘
—’ছোট্ট আকাশ প্রিয়ার।’
এতক্ষণ যাবৎ কান্নার ফলে এমনিতেই টকটক করছিলো মুখটা। আকাশের একটা কথায় গাঢ় হলো সে রঙ। তিরতির করে কেঁপে উঠলো ঠোঁটজোড়া। অপ্রস্তুত হয়ে নজর সরিয়ে নিলো। বিরবির করে বললো,
—’আগে বাবা মা কে জানিয়ে বিয়ে টা তো করুন।’
—’সে আর কত দেরি! আজ বললে কাল বিয়ে দিয়ে দেবে।’
—’অতোই সোজা!’
—’নয়? তোমার বাবা আমার থেকে পারফেক্ট জামাই দুনিয়া ঘুরে পাবে? মনে হয় এটা তোমার?’
প্রিয়া ঠোঁট উল্টায়। গায়ের এলোমেলো ওড়নাটা ভালোমতো জড়িয়ে নেয় শরীরে। দমকা বাতাসে শীত শীত করছে। নির্বিকার কন্ঠে বলে ওঠে,

—’না পাওয়ার কি আছে! দুনিয়াতে কোটি কোটি পুরুষমানুষ। খুঁজলে পারফেক্ট পাবে না?’
আকাশ ভ্রু নাচালো প্রিয়ার কথা শুনে।
—’তাই? ‘
ওপর নিচ মাথা ঝাকালো প্রিয়া। বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে গম্ভীর মুখে বললো,
—’নেহাৎ ফেঁসে গিয়েছি । দু একরাত আপনার সাথে ভুলে ঘুমিয়ে ফেলেছি। তখন বয়স অল্প ছিলো। যাাকে বলে আবেগের বয়স। একটু সুন্দর আর টাকাপয়সা ওয়ালা ছেলে দেখেছি। ওমনি আবেগ কাজ করে বসেছে। কি আর করার।
তাছাড়া আপনাকেও এখন কেই বা বিয়ে করবে, তাইনা। ভার্জিনি’টি তো নিয়ে নিয়েছি। আপনাকে ছেড়ে গেলে যাবেনই বা কোথায়! যে গম্ভীর মানুষ, আর একটা প্রেম তো করাও সম্ভব না। কপাল! সবই কপাল। সারাটা জীবন আপনার সাথেই কাটিয়ে দিতে হবে! অন্যের কথা ভেবেই আমার এ জীবন বলি দিয়ে দিলাম।’
বে আক্কেল হয়ে প্রিয়ার কথাগুলো শুনে গেলো আকাশ। প্রতিত্তোরে কি বলা উচিত তাও বোধহয় ভেবে পাচ্ছে না ছেলেটা! এ মেয়ে এতোদিনে বলে কি! হাসবে নাকি কাঁদবে! আকাশ ভ্রু নাচিয়ে ফিচেল কন্ঠে শুধালো,

—’কে আর মেয়ে পাবে না? ‘
—’কে মানে? আকাশ এহনাজ চৌধুরী। আমি জন্য, আপনার সংসার করতে রাজি হয়েছি। আর কেউ হলে করতো? আপনিই বলুন! আপনার চরিত্র আমি হরণ করিনি? আর কোনো মেয়ে পটাতে পারবেন আপনি?’
অজান্তেই শব্দ করে হেসে ফেললো আকাশ। দু-হাত বাড়িয়ে প্রিয়াকে চেপে ধরলো নিজের বুকের বাঁ পাশটায়। এলোমেলো চুলের সিঁথিতে শুকনো চুমু একে আদুরে গলায় বললো,
—’উহু, একদম পাবো না। সম্ভব নাকি! এই দুনিয়ায় প্রিয়া তো একটাই। এই প্রিয়া ছেড়ে আকাশের ঠাঁই কোথায়! কে দেবে এতো ভালোবাসা? কোথায় পাবো এমন আকাশপ্রিয় জীবনসঙ্গীনি! এক জীবনে এতো প্রেম আর কে দেবে আমায়। ‘
হাতের বাধন দৃঢ় করলো আকাশ। পুনরায় বলে উঠলো,
—’ একটু ঠকে যাওয়া নেহাৎ মন্দ নয় কিন্তু, পাখিই। একটু নিজের দিকটা স্যাক্রিফইজ করাও দোষের নয়। তুমি এইটুকু মানিয়ে না নিলে আমার কি হতো! সত্যিই তো। কে করতো আমার সংসার।
আমার মতো পুরুষকে বিয়ে করে একটু না হয় ঠকলেই এ জীবনে, ক্ষতিপূরণ হিসেবে তার বদলে এক আকাশ সম ভালোবাসা দিলাম। চলবে না?’
খিলখিল করে হেসে ফেললো প্রিয়া। আকাশের বুকে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
—’চলবে! খুব চলবে।’

বাড়িতে নতুন সদস্য আসার সাত দিন আজকে। শিয়া কে কেটেজে নিয়ে আসা হয়েছে বিকেলের দিকে। মা, বাচ্চা দু’জনেই একদম সুস্থ, স্বাভাবিক আছে। উৎসব লেগেছে যেনো। আকাশদের কাজের চাপ এ সপ্তাহে কমা মাত্র শিয়াদের নিয়ে ঢাকা রওনা দেওয়া হবে। আকাশের দাদা দাদি অপেক্ষা করছে ওদের জন্য। চৌধুরী বাড়িতে বিশাল আয়োজন চলছে এ নিয়ে। বাড়ির বয়যেষ্ঠরা সকলেই নিচে, রান্নাবান্নার কাজে ব্যাস্ত। আকাশের চাচি, কাজিন রা কালকেই ঢাকা ফিরবে। বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ আছে। কর্তাদেরও ফিরতে হবে বইকি। ওদিককার অফিসের কাজগুলোও তো সামলাতে হবে। তাছাড়া শিয়া আর বাচ্চাকে সামলাতে এখানে শিয়ার মা, অয়নের মা, রাকা, তুশি, প্রিয়া এরা তো আছেই। আর ক’দিন পর ওরাও ফিরবে বাড়িতে। বাড়িঘর সে অনুযায়ী সাজাতেও হবে তো নাকি!
রাতের ডিনার করা হয়নি এখনো কারোরই। রাতুলরা ফিরলে তারপর একসাথে খেতে বসা হবে। যদিও আকাশ, অয়ন দু ভাই ফিরেছে সেই আগ-বেলাতেই। ফেরার কারণ অবশ্য আমেনা চৌধুরী। আকাশের বাবা, চাচারা ফিরে যাবেন কালকে। আকাশ আর প্রিয়ার বিয়ের বিষয়টা নিয়ে আলোচনার সময় আজ রাতই। এখন বিষয়টা উত্থাপন না করলে আরও দেরি হয়ে যাবে।

হাতে একগাদা শুকনো কাপড় নিয়ে প্রিয়া ঢুকলো তাদের বেডরুমে। আকাশ সবেই শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়েছে। আলমারি ফাঁকা দেখে বুঝতে পারছিলো না,আচমকা জামাকাপড় গুলো গেলো কোথায়!এই মেয়ে ধুতে দিয়েছিলো নাকি এগুলো! সবই তো ধোঁয়া কাপড়চোপড়। তার মায়ের বাতাস লেগেছে, প্রিয়ার গায়েও। শতভাগ নিশ্চিত সে। তার মায়ের এই স্বভাব। ধোঁয়া জামাকাপড় টেনেহিঁচড়ে বের করে আবার ধুতে দেবে।
প্রিয়া বিছানার ওপর কাপড়গুলে রেখে, একটা একটা করে ভাজ করে যাচ্ছে। আড়চোখে তাকাচ্চে বারবার আকাশের দিকে। আকাশের পরনে শুধুমাত্র একটি ট্রাউজার। উদাম শরীর নিয়ে বিছানায় বসতেই প্রিয়া মৃদু কন্ঠে বললো,
—’ বেবি টা খুব চঞ্চল হবে জানেনা!’
—’কেনো? দুদিনের বাচ্চা ও। এখনই কি করে বুঝলে চঞ্চল হবে কি-না …!’
প্রিয়া মিষ্টি হাসলো। বিছানার ওপর ছড়িয়ে রাখা জামাকাপড় গুলো ঠেলে সরালো একদিকে। নিজে সেখানটা আধশোয়া হতে হতে বললো,

—’ ঘুমায় না। সারারাত টুলটুল চোখে তাকিয়ে থাকে। খানিক পরপর কাঁদে। আপনার মা বলছিলো। ভাইয়াও নাকি ছোটবেলায় এমন ছিলো। পরে নাকি চঞ্চল হয়েছিলো। আর আপনি! আপনি ছিলেন পুরো উল্টো। সারাক্ষণ ঘুমাতেন। একফোঁটাও কান্নাকাটি করতেন না। এই দেখুন না বড় হয়েও গোমরামুখো।’
আকাশ ঠোঁট টিপে হেসে হাতে ভর দিয়ে প্রিয়ার দিকে মুখ করে আধশোয়া হয়। শিয়ার বেবিটা হওয়ার পর থেকে প্রিয়ার মুডই চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে। কি যে খুশি থাকে মেয়েটা! সারাক্ষণ বাচ্চাটার আশেপাশে ঘুরঘুর করে যায়। কাল তো দেখছিলো শিয়ার পাশে বসে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আছে। রাজ্যের গল্প জুড়েছে দু বোন এই অবুঝ শিশুটার সাথে। আকাশ স্বাভাবিক গলায় বললো,
—’ হতে পারে! বড় হতে থাক। বোঝা যাবে তারপর। ‘
প্রিয়ার মুখ জ্বলজ্বল করছে। একগাল হেসে বললো,
—’আপনি এখনো কোলে নেননি ওকে। আপনি না চাচ্চু! চলুন! বাবুকে কোলে নেবেন চলুন।’
কি এক খেয়ালে আকাশ আজকে মানা করতে পারলে না। শুরুর দিন থেকেই মেয়েটা বলে যাচ্ছে। সে নিজেও আগ্রহী অবশ্য।

অয়ন শিয়ার ঘরে বাচ্চাদের সরঞ্জামের ছড়াছড়ি। আকাশ,অয়ন রাতুলরা যে বাইরে যাচ্ছে–যার যার মতো করে কেনাকাটা করে নিয়ে আসছে। শিয়া হসপিটাল থেকে ফিরে নিজেদের ঘরের অবস্থা থেকে একপ্রকার বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছে!
নিচতলা থেকেও শোনা যাচ্ছে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ। শিয়া ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শান্ত করতে ঘরময় পায়চারি করে যাচ্ছে। পিছন পিছন খেলনা হাতে ঘুরঘুর করছে অয়ন। না তো সে কোনো কিছুতে নজর দিচ্ছে! আর না তো তার কান্না থামছে।
—’ও কি চাচ্ছে বলোতো, জান? সেই জন্মের পরদিন থেকে ওর এই বাঁশি বন্ধ হচ্ছে না!’
শিয়াা বিরক্ত, মহা বিরক্ত। প্রায় সাতদিন যাবৎ ঘুম নেই বলা চলে। যদিও বাড়ির সকলেরই একই অবস্থা। পালা করে করে রাত জেগে বাবুকে নিয়ে রাত জাগে সকলে। শিয়া ছেলেকে আরেকটু বুকে চেপে আদুরে কন্ঠে বললো,
—’কি বাবা, কাঁদছো কেনো? তোমার বাবা কে দেখলেই কাঁদো এভাবে! বাবা পছন্দ হচ্ছে না? হুম? ‘
শিয়ার কথাটা বলা মাত্র ক্ষনিকের জন্য কান্না থেমে গেলো শিশুটার। অয়ন আশ্চর্যমুখে সামনে এসে দাড়াতেই আবার গগনবিদারী চিৎকারে মত্ত হলো বাচ্চাটা। অয়ন হতভম্ব। এতক্ষণে এ আবার কি খেলা শুরু হলো! শিয়া ঘাড় বাঁকিয়ে বিরক্ত মুখে বললো,

—’আমার ছেলেটা তোমাকে দেখে কাঁদে। সামনে এসো না তো।’
মাথায় হাত অয়নের! এমন দিনও দেখতে হচ্ছে তাকে! নিজের ছেলে তার এটা। অথচ তাকে দেখা মাত্র কেঁদে ওঠে এমন ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে! মানে কি। অয়ন প্রতিবাদ করে উঠলো একপ্রকারে।
—’আমার ছেলে ও। কোনো সন্দেহ নেই তাতে। সলিড প্রডাক্ট সাপ্লাই করেছি। আমাকে দেখে কাঁদে মানে কি! বলার মতো আর কথা পেলে না! ‘
—’ উল্টাপাল্টা কথা বলবে না। তোমাকে দেখে যে ও কাঁদে এটা তুমি এখনো খেয়াল করোনি? আমি শুনেছি প্রিয়ার থেকে। নার্স যখন বাবুকে কোলে নিয়ে বাপের কোলে দিতে যায়, আগে অবধি নিশ্চুপ ছিলো। তোমার কোলে দেওয়া মাত্র ও কাঁদতে শুরু করেছ। সেই যে শুরু। তারপর আর থামার নাম নেই। মা বলছিলে ছোট বেলায় তুমি এমন ছিলে। হাড়মাস জ্বালিয়ে খেয়েছো সবার।’
অয়ন বিধ্বস্ত হলো যেনো। বউয়ের কথা পিষ্ট হয়ে শোকে দুঃখে আরও কিছু বলবে তার আগেই খিলখিল হাসির শব্দ পাওয়া গেলো দরজার ওপাশ থেকে। অতি পরিচিত হাসি এটা। শিয়া ঠোঁট উল্টে বাবুকে দোলাতে দোলাতে বিছানায় বসলো। গলা উচিয়ে ডাকলো প্রিয়াকে ভিতরে আসতে।
শুধু প্রিয়া না, আকাশও আছে সাথে। প্রিয়ার অট্টহাসির পাশাপাশি, আকাশের মুখের ক্ষিন হাসিও চোখে পরার মতো। অয়ন ভাইয়ের দিকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলো। গোমরা মুখে বললো,

—’ছেলেটা কে কি করা যায় বলতো? ‘
আকাশ নির্বাকার মুখে বললো,
—’ঝাড়ফুঁক। ‘
—’উফফফ্ ইয়ারকি না ভাই। ঘটনা সত্য। ছেলেটা আমাকে দেখলেই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। ‘
প্রিয়া কয়েকপা এগিয়ে এলো। দুলাভাইয়ের মুখাবয়ব ভালো মতো সরু চোখে পরখ করে বললো,
—’ কাল আপনাকে নিয়ে মেনস্ পার্লারে যাবো। ভালো করে ফেসিয়াল করাবো। ‘
আকাশের দিকে আড়চোখে তাকালো একবার। মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
—’আপনাকেও। ছোট বাচ্চারা মানুষ দেখে ভয় পায়না। তারপরও যখন আপনাদের দেখে পাচ্ছে, কমনসেন্সের বিষয় এটা! বোঝা উচিত, আপনাদের মানুষের মতো লাগছে না সম্ভবত। ‘
ফিক করে হেসে ফেললো শিয়া। আকাশের হাসি হাসি মুখটা সামান্য রঙহীন হলেও, মহা উৎসাহে সায় দিলো অয়ন। সে যেতে একপায়ে খাড়া। বাপ হয়েছে এখন। এখন ফিটফাট না হলে হয়! বউয়ের জন্য একরকম বেশভুষা, অন্যদিকে বাচ্চার জন্য অন্যরকম। দুটোই মেইনটেইন করে চলতে হবে কি-না!
বাচ্চাটা ক্রমাগত কেঁদে যাচ্ছে। এ যাত্রায় প্রিয়ার ধ্যান গেলো ওদিকটায়। আকাশ, অয়নদের এদিকে রেখে ব্যাস্ত হয়ে এগিয়ে গেলো বোনের দিকে। আদুরে কন্ঠে দু-হাত বাড়িয়ে ডাকলো,

—’আব্বা! আহিন ? কি হয়েছে আমার আব্বাটার? হুম? দেখি দেখি!’
শিয়া দু’হাতে ছেলেকে এগিয়ে দিতেই ফুলো ফুলো চোখদুটো খুলে গেলো। ঠোঁট উল্টে কেঁদে কেঁদে ভাসিয়ে ফেলেছে একদম। রক্তিম ঠোঁটের আশপাশ লালায় মেখে গিয়েছে। প্রিয়ার কোলে দিয়ে সে-সব মুছে দিলো শিয়া।
—’কি আব্বা? তুমি নাকি নিজের বাবা কে দেখে ভয় পাচ্ছো? কাঁদছো? হু?’
আহিনের কন্ঠস্বর আরও দ্বিগুণ হলো যেনো। আকাশের হাসি পাচ্ছে ভাইয়ের মুখের অবস্থা দেখে। বেচারা ভীষন কষ্ট পেয়েছে।
প্রিয়ার কোলে মিনিটখানেকের মধ্যেই কান্না থামলো সদ্যজাত শিশুটির। প্রিয়া যে এতো সুন্দর করে আহ্লাদ করতে পারে বাচ্চাদের সাথে, সম্ভবত কারোরই জানা ছিলো না। কান্না মিলিয়ে, এক নিমিষে বোধহয় হাসির রেখার টের পাওয়া গেলো! পুনরায় হতভম্ব হওয়ার পালা অয়নের! ছেলেটা মানুষজন বুঝে ব্যবহার করা শিখছে নাকি!
শিয়া স্বস্তির হাসি হাসে। বাড়ির সকলেই খেয়াল করছে। যদি কান্না থামে হয় শিয়া নয়তো প্রিয়ার কোলেই। আর কারোর সাধ্যি নেই। শিয়া হাফ ছাড়লো। বোনকে থাকতে বলে নিজে গেলো বাচ্চার কিছু জামাকাপড় রোদে মেলে দিতে। অয়ন কি এক বলার বাহানায় ছুটলো বউয়ের পিছু পিছু।
গোটা ঘরজুড়ে বাচ্চাদের জিনিসপত্রে ঠাসা। বেবি পাওডার,লোশন এসবের মিষ্টি গন্ধ। প্রিয়া খেয়াল করলো ধুকপুক করছে তার বুকটা। আকাশের দিকে তাকাতেই আকাশ এগিয়ে এসে বসলো তার পাশে। বাচ্চার পায়ের আঙুল স্পর্শ করে মিহি কন্ঠে বললো,

—’ও এ বাড়িতে আসার পর, এই ঘরে আমি প্রথম এলাম। কি যে শান্তি লাগছে!’
সজোরে মাথা ঝাঁকালো প্রিয়াও। সে-ও তো এই মূহুর্তে এই কথাটাই বলতে চাচ্ছিলো। আকাশ ওর মনের কথা বুঝে যাওয়ায় একপ্রকার পুলকিত হলো সে! নারী জীবনের অন্য এক চাওয়া পাওয়া এসে হানা দিলো যেনো। যদিও সে নিজেও জানে সে-সব চাইলেই এখন সম্ভব নয়। বাবা মাকে জানিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক বিয়েটা বাকি,। আকাশের ব্যাস্ততা। তার পড়াশোনা, বয়স, ক্যারিয়ার। সবকিছুর দোহাই দেবে আকাশ। তবুও! সে আহ্লাদ করে চাইলে আকাশ কি ফিরিয়ে দেবে তাকে! প্রিয়া ঠোঁট টিপে ভাবলো কিয়ৎক্ষন। বাচ্চাটা শান্ত হয়েছে এতক্ষণে। আকায় প্রিয়া দুজনার দৃষ্টিই এই ছোট্ট অংশটার দিকে আঁটকে আছে। প্রিয়া আচমকা আহ্লাদী কন্ঠে বলে উঠলো,

—’ সব ঠিকঠাক থাকলে, এবার বিয়েটা হয়ে গেলে। আমরাও খুব একটা দেরি করবো না। কেমন?’
আকাশ মাথা ঝুকিয়ে চুমু খেলো ছোট্ট আহিনের পায়ে। বাধ্য স্বামীর মতো মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিলো,
—’উমম, আচ্ছা।’
—’আজ রাতে আমাদের বিয়ের কথা বলবে?’
—’হুম।’
—’আপনি নার্ভাস? ‘
—’কোন দুঃখে!’
—’যদি বাবা মা এখনও দিতে রাজি না হয়।’
—’ কি আর! তাদেরও একটু দুঃখ দিয়ে ফেলবো। তোমার আমার বিয়ের কাগজপত্র দেখিয়ে দেবো। আর বলবো তাদের মেয়ের তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা। বেশ, ঝামেলা শেষ।’
—’ কি সব বলছেন!’
আকাশ একপেশে হাসলো। প্রিয়া গাল টেনে বললো,

—’সেরকম কিচ্ছু হবে না,পাখি। বাবা মা সব সামলে নেবে। বিয়েটা এ মাসেই হবে। ‘
প্রিয়া কপালে কপাল ছোঁয়ালো আহিনের। তাকে আহ্লাদ করতে করতে আকাশকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’নিজের কাছে গিলটি ফিল হচ্ছে। বাবা মা ক্ষুনাক্ষরেও আন্দাজ করেনি। কি করে ফেলেছি আমরা।’
আকাশ নিজেও ভাবেনি এ বিষয়ে এমনটা নয়। কিন্তু কি করার ছিলো আর। সে-সময় পরিস্থিতি যা ছিলো! তাছাড়া দোষের কিছু তো নয়। সবার সম্মতি যখন আছে, অযথা হারাম ঝুলিয়ে না রেখে হালাল করে নিয়েছে। অন্যায় তো কিছু করেনি। তবুও মুখে বললো,
—’কখনো, কোনো একদিন ঠিক জানিয়ে দেবো। তাদের কষ্ট দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো কি? কি অবস্থায় বিয়েটা হয়েছে ভুলে গেছো?’
প্রিয়া জবাব দেয় না। তা কি করে ভুলতে পারে। সে-সব দিন কি আদৌ ভোলা সম্ভব! ভাবলেই গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে এখনো। আচমকা রিয়ানের কথা মাথায় এসে হানা দিলো প্রিয়ার। সৌমির বাচ্চা হওয়ার সময় সকলে গিয়েছিলো তারা। কি সুন্দর একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে! অথচ রিয়ান নাকি একটাবারের জন্যও দেখতে চায়নি সে ছেলেকে। প্রিয়া মুখ তুলে জিজ্ঞাসু কন্ঠে বললো,

—’সৌমি আপু যে বাইরে চলে যাওয়ার কথা বলছিলো। যাবে?’
—’বললো তো যাবে। ভিসা জটিলতা চলছে সম্ভবত। তবে আমার মনে হয় অন্য কারণও আছে এতো লেট হওয়ার…’
—’কি?’
—’ও সম্ভবত রিয়ানের মন পাল্টানোর অপেক্ষায় আছে। এই কারণে এতো গড়িমসি। ‘
কথাটা প্রিয়াও আন্দাজ করেছে। উহু, শুধু আন্দাজ নয়। সবাই ভেবেছেও এ নিয়ে। সেদিন তো শিয়া,রাকা,তুশিদের সাথে গল্পে গল্পেও ুঠছিলো সে-সব কথা! প্রিয়া নরম কন্ঠে বললো,
—’আপনি একবার গিয়েছিলেন কথা বলতে?’
আকাশের চোয়াল শক্ত হলো যেনো। তবে উচ্চবাচ্য করলো না কোনো ধরনের। ডানে বায়ে নাথা নেড়ে নাকচ করলো শুধু। বলেনি, বলার রুচিই হয়নি আদতে। আচমকাই আকাশের হাস্যজ্বল মুখটা কঠিন হওয়াতে কথার টপিক পরিবর্তন করতে চাইলো প্রিয়া। আহিন কে আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

—’নেবেন কোলে?’
—’নাহ। এতো ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে অভ্যাস নেই।’
প্রিয়া ঠোঁট টিপে হাসে। ফিচেল কন্ঠে বলে বসে,
—’অভ্যাস করতে হবে না? হুম?’
—’তা হবে।’
—’তাহলে?’
—’বউই এখনো ছোট! আর একটা বাচ্চা আসলে দু’জন কে একসাথে সামলাতে পারবো আমি?’
প্রিয়া প্রতিবাদ করে উঠলো তৎক্ষনাৎ। আহিনের গালে ঠোঁট ছুঁয়িয়ে পুনরায় ওর সাথে আহ্লাদ করতে করতে আকাশ কে বললো,
—’মোটেই না। আহিন কে দেখুন না। আমার কাছে এলে কি সুন্দর শান্ত হয়ে যায়। তাছাড়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আপনার সন্তান, আপনার মতোই শান্ত হবে। আমার কষ্টই হবে না।’
আকাশ ভ্রু জোড়া উচিয়ে কপট চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,

—’কিন্তু যদি মায়ের মতো গুন পায়?’
—’তাহলে আর কি! কাজকর্ম বাদ দিয়ে কান্না থামাবেন নিজের সন্তানের। পারবেন না?’
হেসে ফেললো আকাশ। পারবে না আবার! খুব পারবে। বেলকনিতে বাবুর ভেজা কাপড়গুলো মেলে দিচ্ছে শিয়া। পাশেই কি সব বকবক করে যাচ্ছে অয়ন। সম্ভবত সন্তানের, তার প্রতি অনিহার এই বিষয়টা পছন্দ হচ্ছে না তার।মহা চিন্তিত সে এই নিয়ে। প্রিয়া আর আকাশ ওদিকটায় তাকিয়ে একচোট হাসলো। পরিবেশটাই কত আদুরে! ওরকম হম্বিতম্বি করে চলাফেরা করা মানুষ সামান্য একটা বিষয় নিয়ে –কিভাবে ছেলেমানুষী প্রশ্ন করে যাচ্ছে! প্রিয়ার কোলজুড়ে ছোট্ট আহিন একদম নিশ্চুপ হয়ে আছে। গোল গোল চোখজোড়া বড় বড় করে খুলে রাখা। সাতদিনের বাচ্চা বলে মনেই হয় না। ফর্শা, গালদুটো থেকে এখনো রক্তিম ভাব যায়নি। যতবার এইমুখটায় গভীর মনোযোগ দেয়,ততবারই কান্না পায় প্রিয়ার। আকাশকে উদ্দেশ্যে করে আচমকা প্রিয়া বলে উঠলো,
—’বাচ্চাটা কত্তো আদুরে দেখেছেন? চোখজোড়া ভাইয়ার মতো হয়েছে। নাকটা আপুর মতো। ইশশ কি যে গোলুমুলু বাচ্চাটা! আচ্ছা, আমাদের বেবি হলেও কি এতো আদুরে হবে!’
আকাশ একপলক তাকালো প্রিয়ার হাস্যজ্জল মুখের দিকে। শান্ত,শীতল সুরে বললো,
—’বেবির মা যেহেতু তুমি হবে, সেক্ষেত্রে আদুরে তো হতেই হবে। বাধ্যতামূলক।’
প্রিয়া ঠোঁট কামড়ে ভাবলো কিছু একটা। আকাশকে কথাটা কিভাবে বলা উচিত সাতপাঁচ ভেবে পেলো না যেনো। সিরিয়াস মুখে বলবে! নাকি একটু আধটু আহ্লাদ করবে। চৌধুরী সাহেব আবার তার আহ্লাদে গলে জল হয় যায় কি-না! প্রিয়া নিজের কন্ঠস্বর একদম খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
—’ আমার একটা বেবি লাগবে। ‘
—’আছেই তো। এইতো…আহিন। ওকে মানুষ করো কোলেপিঠে।’
—’ও তো আছেই। ওর জন্য একটা ভাইবোন আনতে হবে না? আপনাদের বাড়িতে তো ছোট বাচ্চা আর কেউ নেই। আহিন বড় হবে একাকি! এটা ভালো দেখায়?’
আকাশ বোঝে এই মেয়ের আচমকা আহ্লাদের কারণ। প্রশ্রয়ও দিলো সে-ও। নরম কন্ঠেই বললো,

—’দেবো।’
—’আজই দেবেন?’
কথাটা বলা মাত্র নিজেই থমকালো প্রিয়ার। কথার পিঠে আহ্লাদ করতে গিয়ে একটু বেশি হয়ে গিয়েছে। আজই বেবি দেবে মানে কি! সে তো ইনডিরেক্টলি আকাশকে আজ রাতে কাছে ডাকছে। ইশশশ্ কি লজ্জার। দাঁতে জিব কাটলো প্রিয়ার। কথা ঘুরিয়ে বললো,
—’ আমাদের যখন বাচ্চা হবে, আপু আর অয়ন ভাইয়ার মতো—আমাদেরও কি ছেলে বাবু হবে? আপনার কি মনে হয়? কি চাই আপনার? কি পছন্দ? ‘
আকাশ খানিক থমকায়। সত্যিই তো। কি বাচ্চা পছন্দ তার! মেয়ে! খারাপ হয় না। খোদা যা দিয়ে সন্তুষ্ট। বাবা মায়ের কাছে ছেলে মেয়ে সব সমান। আকাশ খসখসে হাতের শীতল আঙুল ছুঁয়িয়ে দিলো প্রিয়ার নরম কোমল গালেে। আদুরে কন্ঠে জবাব দিলো,

—’ কি বাচ্চা আল্লাহ দেবেন সেটা আমি আগেই কি করে বলি! ‘
প্রিয়া হেসে ফেলে। সত্যিই তো তাই। আগে থেকে জানবে কি করে তারা! তবুও এই মূহুর্তে এই আলাপআলোচনা সিরিয়াস করতে মন চাইলো না তার। আদুরে বিষয়গুলো নিয়ে রাতভর গল্পের আসর জমানো যায়। আহিন কে বুকে জড়িয়ে প্রিয়া বাঁকা হেসে বললো,
—’কি আশ্চর্য! বাচ্চার বাবা হবেন আপনি! আপনি যা দেবেন তাই তো হবে। তাহলে জানবেন না কেনো? এ আবার কি কথা? ‘
আকাশ নিজেও হাসলো। প্রিয়ার মুখপানে দৃষ্টি বুলিয়ে নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
—’ তোমার কি পছন্দ? হু? হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? বেবি বয় অর বেবি গার্ল?’
প্রিয়া ঠোঁট কামড়ায়। মলিন মুখে জবাব দেয়,
—’সেটা তো ভাবিনি এখনো। ‘
আকাশ কেমন একটা হাসলো। প্রিয়ার গা শিউরে উঠলো সে হাসিতে।

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৯

—’আজ সারাদিন, রাত ভাবো। কি চাই! ছেলে নাকি মেয়ে। কাল না হয় বেবি দেবো। বউকে আদর করা হয়না বহুযুগ। মরে মরে বেঁচে আছি। বাচ্চা দুনিয়াতে আনার আগে, বাচ্চার বাবার খেদমত করো একটু। ‘
শিয়া হাত মুছতে মুছতে ঘরের ভিতর এসেছে। পিছন পিছন অয়নও। শিয়ার মুখ দেখেই স্পষ্ট বেঝা গেলো সন্তানের বাপের ঘ্যানঘ্যানে রীতিমতো মাথা ধরেছে তার। অয়ন কিছু বলবে তার আগেই আকাশ উঠে দাড়ালে। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ফিচেল হাসি দিয়ে প্রিয়াকে তাড়া দিলো।
—’ ঘরে চলো। বাচ্চার বাপ এখন একটু সামলাক। জীবন যুদ্ধে আমার থেকে এগিয়ে আছে কি-না! দাও দাও। ওর মায়ের কাছে দাও। ফেলে দেবে, যেভাবে ধরে আছো!’

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here