রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৬
সোহানা ইসলাম
গ্রামের দুপুরের শান্তি যেন অন্যরকম। নীল আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। হালকা বাতাসে ধানের শিষ দুলছে, গাছের ছায়া রাস্তার ওপর ছায়াছবি ফেলে রেখেছে। কোথাও গরুর ঘণ্টার টুংটাং শব্দ, দূরে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
মিম আর ফিহা ধুলো উড়িয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটছে। ফিহার কাঁধে ছোট্ট একটা কলেজ ব্যাগ, মুখে তৃপ্তির হাসি। মিমের চোখে কিন্তু অন্যরকম ক্লান্তি। তার হাসিটা জোর করে টেনে আনতে হয়েছে।
___“ ওদের দুইজন কে একসাথে কেমন লাগে ?” ফিহা হালকা গলায় বলল।
__“ভালো।” মিমের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
___“ভালো মানে? “তুই এখনো মন খারাপ করে আছিস কেন?”
___“কিছু না।” মিম মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো গভীর, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর—
“কী কটকটি! আমার সাথে দেখা না করেই চলে যাচ্ছো?”
ফিহা থেমে গেল। বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল। গলার স্বরটা চেনার জন্য এক মুহূর্তই যথেষ্ট ছিল।পেছনে তাকাতেই দেখল, জাহেদ গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটছে। সাদা শার্টের হাতা গুটানো, চুলে হালকা ঘামের ছোঁয়া, চোখে সেই চেনা দুষ্টু ঝিলিক।
ফিহার গলায় চাপা বিস্ময়।
__”আপনি? ”
__“হ্যাঁ, আমি।দেখা না করে চলে যাচ্ছো কেন?”
জাহেদের ঠোঁটে হাসি খেলা করছে।
__“ আপনার জন্য সময় নেই।” ফিহা ভান করে রাগী গলায় বলল।
___“আমার জন্য সময় বের করতে হবে।” জাহেদের গলায় আত্মবিশ্বাস।
মিম পাশ থেকে চুপচাপ সব দেখছে। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, কিন্তু চোখে যেন ছায়া।
ফিহা মুখ ঘুরিয়ে নিল, গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।___“ আপনি না…” ফিহা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
___“কি আমি?”
জাহেদ হাসল, এক পা এগিয়ে এল।__“আমার সাথে হাত ধরে হাঁটবে একটু ?”
___“কেন?”
___“কারণ আমি চাই।”
ফিহা কিছু বলার আগেই জাহেদ হাত বাড়িয়ে দিল। তার আঙুলে লেগে থাকা ধুলোর গন্ধও যেন অন্যরকম মনে হলো। ফিহা এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল সেই হাতে। তারপর অজান্তেই নিজের হাতটা দিয়ে ফেলল।
রাস্তার ধুলা উড়ছে হালকা বাতাসে। গাছের ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে রোদ ঝিলমিল করছে। দূরে শিমুল গাছের লাল ফুল মাটিতে ঝরছে। দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে, মাঝে মাঝে চোখাচোখি হচ্ছে।
___“আপনি না… বদলে গেছেন।” ফিহা হঠাৎ বলল।
___“যেমন?” জাহেদের গলায় মজা।
__“আগের মতো আর ঝগড়া করেন না ।”
__“ ঝগড়া করার সুযোগ পাচ্ছি না। কারণ তুমি সামলাচ্ছো নিচ্ছো বলে।”
ফিহা হেসে ফেলল। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি কাঁপন।
___“ আপনি না… একদম পাগল।”
__“তোমার জন্যই।”
জাহেদ হঠাৎ ফিহার হাতটা শক্ত করে ধরে কাছে টেনে নিল। এত কাছে যে ফিহার নিশ্বাস তার গলায় লেগে গেল। দু’জনের চোখ আটকে গেল একে অপরের চোখে। ফিহার গাল লাল হয়ে উঠল।
___“ আ আপনি.. অনেক বদমাশ।”
___“শুধু তোমার জন্য।”
হাওয়ার ঝাপটায় ফিহার চুল উড়ে গিয়ে জাহেদের মুখে লাগল। সে নরম হাতে চুল সরিয়ে দিল।
___“এভাবে তাকাবেন না।” ফিহা ফিসফিস করে বলল।
___“না তাকালে বাঁচব কিভাবে?”
ফিহার ঠোঁটে হাসি। দু’জনের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল গ্রামের দুপুরের নীরবতায়।
কিছু দূরে দাঁড়িয়ে মিম সবকিছু দেখছিল। তার চোখের সামনে ফিহা আর জাহেদ, তাদের হাসি, খুনসুটি, হাতের উষ্ণতা—সবকিছু তার ভেতরের কষ্টকে জাগিয়ে তুলল।
মনে পড়ল সেই মানুষটার কথা, যে একসময় তাকে কথা দিয়ে বলেছিল—“তুমি ছাড়া আমি কিছু না।”
একটা ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝি সব শেষ করে দিল।
তখন ভেবেছিল কল আসবে… মেসেজ আসবে… কিন্তু কিছুই এল না। দিনগুলো একে একে কেটে গেল, আর মিম একা হয়ে গেল।
তার চোখ ভিজে উঠল অজান্তেই। সে তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল। চারপাশের রোদ হঠাৎ কেমন তীব্র মনে হলো। রাস্তার ধুলা, গাছের ছায়া, বাতাস—সবকিছু যেন ভারী লাগছে।
সে মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার শেষ প্রান্তে তাকাল। নীল আকাশের নিচে সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। ধানের ক্ষেতে হাওয়া দুলছে। তার মনে হলো, পৃথিবীটা কত সুন্দর, অথচ সে কত একা।
দুপুরের রোদ যেন সোনালি পর্দার মতো বড় মাঠের ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে।
চারদিকে শুধু নরম সবুজ আর শান্তির গন্ধ। বাতাসে হালকা উষ্ণতা, মাঝে মাঝে হাওয়া এসে চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। দূরে একটা পুকুরের জল ঝলমল করছে, মাঝে মাঝে বক পাখি উড়ে যাচ্ছে। মাঠের এক কোণে শুকোতে রাখা লাল শাড়ি বাতাসে দোল খাচ্ছে।
এই নির্জন মাঠে আজ শুধু দুটো ছায়া—আরমান আর জারা।
দুজন পাশাপাশি হাঁটছে। আরমানের ডান হাতে গুটিসুটি মেরে রাখা জারার ছোট্ট হাত। আঙুলগুলো এত নরম যে মনে হয় ভেঙে যাবে যদি বেশি শক্ত করে ধরা হয়। তবুও, আরমান ছাড়ছে না। তার বুকের ভেতর যেন সমুদ্রের ঢেউ।
আরমানের চোখে অদ্ভুত এক আলো।এই মেয়ে ছাড়া তার পৃথিবী শূন্য। সে চায় সময় থেমে যাক, এই মুহূর্তটা চিরকাল বেঁচে থাকুক। আরমান জারার পাশে হাঁটছে। হাতের মধ্যে হাত। চোখে আগুন, কণ্ঠে ঘোর লাগানো কম্পন। দুইদিনের পরিচয়, কিন্তু আবেগ এত তীব্র, যেন অনেক দিনের।
হঠাৎ আরমান ধীরে ধীরে জারার দিকে এগিয়ে এল। কণ্ঠে ঘোর লাগানো কম্পন নিয়ে আস্তে করে বলে
__“I want to kiss you, Jara… just for a moment… please.”
জারা চোখ বড় করে তাকাল। বুক কেঁপছে, লজ্জা, ভয় আর কান্না—কিছুই বলতে পারছে না। হাত শক্ত করে ধরল আরমানের।
আরমান ধীরে ধীরে তার ঠোঁট জারার ঠোঁটের কাছে নিয়ে এল।
__“Just one kiss… I need you, Manjara…”
জারা কেঁপে উঠল। কিছু বলতে পারছে না, শুধু চোখ ভিজে গেছে।
হঠাৎ আরমান জারাকে চুম্বন করে ফেলল। জীবনের প্রথম একজন পুরুষ মানুষের এতো কাছে, এতো ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে জারার হৃদয় দ্রুত ধক্ধক্ করতে লাগল। লজ্জা, অবাক হওয়া, উত্তেজনা সব একসাথে।
চোম্বন করার সময় আরমান এর হঠাৎ কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে । চোখ লাল হয়ে গেল, রাগ আর আবেগ একসাথে ঝলমল করছে। সে ধীরে ধীরে জারার সাদা হিজাব খুলে দিল, হাওয়ায় চুল মুক্ত হয়ে উড়ে যেতে লাগল।
তারপর হঠাৎ জারার মুখটা নিজের দিকে টেনে নেয়। তার কণ্ঠে আগুন,
— “ আ আর একটা দেই… প্লিজ?”
জারা শ্বাস আটকে ফেলে। গাল লাল হয়ে গেছে। চোখে ভয়, কিন্তু বুকের ভেতর ঝড়।
— “..না… না…”
আরমান ধীরে ফিসফিস করে,
— “না বলিস না… পাগল হয়ে যাব আমি।”
জারা চোখ বন্ধ করে ফেলে। নিঃশ্বাস দ্রুত।
আরমান আর দেরি করে না। তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় জারার গলায়। প্রথমে নরম স্পর্শ, তারপর আরও গভীর, আরও ধীরে… যেন সময় থেমে গেছে। বাতাসে শুধু তাদের শ্বাসের শব্দ।
জারা আর সহ্য করতে না পরে আরমানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। তার বুক উঠানামা করছে। ভয়ে লজ্জায় চোখে অশ্রু এসে মজা হয়। মাথা নিচু করে গুটিসুটি মেরে দাড়িয়ে আছে সে।
জারা আরমান হটাৎ ধাক্কায় দেওয়ার ফলে তার হুঁস ফিরে আসে। আরমান জারাকে ছেড়ে কয়েক পা পেছনে সরে আসে। চোখ লাল হয়ে গেছে আবেগে। আচমকা আরমান জারাকে টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে। নিজের কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে আরমান জারার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে
—“ কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে,ওনা’ইরে…
সিনার লগে বাঁধি রাইক্কুম তোঁয়ারে, ও ন’নাইরে
কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে.. ”
গানের প্রতিটি লাইনে জারার চোখ ভিজে যায়। বুকের ভেতর গুমোট হয়ে ওঠে। হঠাৎ সে কেঁদে ফেলে।আরমান চমকে যায়।
— “কান্না করছো কেন মানজারা?”
জারা কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলতে পারছে না।
__” চলো বিয়ে করে ফেলি হাফ ইঞ্চি মেয়ে । তোমায় হালাল ভাবে ছুঁতে চাই আমি। আমি আর পারছি না । ”
জারা কান্না করতে করতে বলে
__” এ.. এ ভাবে হয় না! আপনি দূরে থাকোন আমার কাছ থেকে শয়তান লোক ! ”
__” দূরে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছো তুমি? এখন সম্ভব না এটা? ”
__” আপনি আ আমায় খারাপ ভাবে ছুঁয়েছেন! ”
শব্দগুলো যেন আরমানের বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধল। সে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। নিজের ভেতরের ঝড়টা সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। চোখ খুলে তাকাতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কপালে রাগের ভাঁজ।
— “কি বললে তুমি?” তার কণ্ঠে ভয়ানক গর্জন।
জারা ভয়ে পিছু হটল এক পা। বুক কাঁপছে, কিন্তু সাহস করে আবার বলল — “আপনি অনুমতি ছাড়া… আমাকে ছুঁয়েছেন। আমি এটা এক্সপেক্ট করিনি।”
আরমানের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ল। নিজের উপর রাগ হচ্ছে তার। সে কি এতোটা খারাপ? তার কি খারাপ কোনো ইচ্ছা ছিল জারাকে কষ্ট দেওয়া? না! সে তো চেয়েছে জারাকে নিজের নামে করতে, হালালভাবে বুকে জড়িয়ে নিতে। কিন্তু হটাৎ তার কি হলো সে নিজেই যানে না। একটু ছুঁয়ে দিয়েছে সে তার হাফ ইঞ্চি মেয়ে কে । অথচ আজ জারা তার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, যেন সে কোনো অপরাধী।
আরমান দাঁত চেপে বলল,
— “তুই ভাবছিস আমি তোর শরীরের জন্য তোর কাছে এসেছি? তুই ভাবছিস আমি খারাপ কিছু করব তোর সাথে?”
জারা মুখ নিচু করে কাঁদছে। শব্দ করে কিছু বলতে পারছে না।
আরমানের শরীর কাঁপছে রাগে। তার গলা ভারী হয়ে উঠল।
— “ আমি তোমার হাতের এক ইঞ্চি না ছুঁয়েও সারাজীবন কাটাতে পারি, যদি তুমি আমার হয়ে যাও। কিন্তু তুমি… তুমি আমাকে এই কথা বললে!”
সে এক ধাপ এগিয়ে এল। জারার চিবুক ধরে মুখটা তুলে দিল জোরে। চোখে চোখ রেখে বলল,
— “তুমি বলছো আমি খারাপ ভাবে ছুঁয়েছি? চলো বাড়ি ফিরতে হবে না। আজই তোমায় বিয়ে করব আমি। তাহলে আমার ছোঁয়া আর তোমার কাছে কাছে খারাপ মনে হবে না! ”
জারা ভয়ে চোখ বন্ধ করল। কান্না থামছে না। ঠোঁট কাঁপছে।
— “ আমি মানে… আমি শুধু ভয় পেয়ে ছিলাম ।”
আরমানের রাগে চোখ লাল। সে চিৎকার করে উঠল,— “চুপ! একদম চুপ! তোমায় ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করব। যেভাবেই হোক করব। বুঝছো?”
তার গলার স্বর এতটা শক্ত যে জারা কেঁপে উঠল। গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে একটার পর একটা। আরমান আরও কাছে ঝুঁকল। তার নিশ্বাস জারার মুখে লাগছে।
— “ তুমি আমার পৃথিবী। আমার নিশ্বাস। আমার ভালোবাসা। তুমি আমার পার্সোনাল হাফ ইঞ্চি মেয়ে। তোমাকে নিজের করে নেওয়ার আগে তোমার থেকে দূরে থাকতে পারছি না, পাখি । আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি তোমাকে ছাড়া।”
জারা হাউমাউ করে কাঁদছে। মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না। শুধু হেঁচকি।
আরমানের শরীরের ভেতরের আগুন আরও জ্বলছে। হঠাৎ রাগে সে নিজের চুল ধরে চান মারল।যেন চুলগুলো ছিড়ে ফেললে তার একটু শান্তি লাগবে। তারপর আবার জারার দিকে ফিরল আরমান।
— “তুমি চাও না আমি তোমার কাছে আসি? ঠিক আছে! কিন্তু মনে রেখো, আমি তোমাকে ছাড়ব না। আমি তোমায় বিয়ে করব। হালাল করব তোমায়। তুমি শুধু আমার হবেই।”
জারা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— ” প্লিজ… আমাকে একটু টা টাইম দিন ।”
আরমান থেমে গেল। চোখে রক্তিম আগুনের বদলে এবার জল ভরে উঠছে। সে ধীরে ধীরে জারার হাত ধরল, এবার জোরে নয়, নরমভাবে।জারা’র চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে
— “জারা, আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। আমি তোমাকে অসম্মান করতে চাইনি। আমার কোনো খারাপ ইচ্ছা ছিল না। আমি যানি না তখন আমার কি হয়ে গিয়ে ছিলো? নিজের কন্টোল হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি তোমায় ভালোবাসি…শুধু ভালোবাসি না, পাগলের মতো চাই।”
জারা তার দিকে তাকাল ভেজা চোখে। চুপ করে রইল। আরমান এক নিঃশ্বাসে বলল,
— “আচ্ছা ঠিক আছে , আমি তোমার কোনো চাওয়া অমান্য করব না। তুমি না চাইলে আমি তোমাকে আর ছুঁব না। কিন্তু তুমি যদি আমাকে ছেড়ে যাও, আমি মরে যাব। তু তুমি আমার ছায়া হয়ে থেকে যাও সারাজীবনের জন্য। ”
আরমান ধীরে ধীরে জারার চোখের জল মুছে দিল। হালকা হেসে বলল,
— “ প্রমিজ করছি এই খারাপ মানুষ টা আর কখনো তোমায় ছুঁবে না।যেদিন হালাল ভাবে নিজের ঘরে তুলব তোমায় সেদিন মন বরে ছুয়ে দিব।”
জারা কিছু বলল না। শুধু চোখ বন্ধ করে হাতটা শক্ত করে কাঁধের ব্যাগ রা ধরল ।
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার রাগ এখন শান্তির সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে। বুকের ভেতর শুধু একটা কথা—”এই মেয়ে আমার। হালালভাবে আমার হবে একদিন ।”
আরমান জারাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে আসে। জারা সামনে হাঁটছে আর আরমান তার পিছনে। সারা রাস্তায় কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলেনি। মাঠের শেষ প্রান্তে জারাদের ছোট বাড়ির সাদ দেখা যাচ্ছে । গেটে ফুলের ঝোপ আর ছোট বারান্দা। আরমান জারাদের বাড়ি থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে পরে। আরমান কে দাড়িয়ে পরতে দেখে জারাও থেমে যায়। কিন্তু কিছু বলে না।
জারাকে থেমে যেতে দেখে আরমান বলে
___“ বাড়ি যাও। আমি কিছুদিন ব্যস্ত থাকব, তাই ঠিক করে সময় দিতে পারব না। ভালো থাকবে আর নিজের ঠিক মতো যত্ন নিবে! ”
বলেই পিছন ঘুরে চলে আসে আরমান। একবারও পিছন ঘুরে দেখল না জারা’কে।
আরমান চলে যাওয়ার আগে যখন ঠান্ডা গলায় বলল “ভালো থাকবে ”, তখন বুকের ভেতরটা যেন ধপ করে নেমে গেল। কেমন একটা শূন্যতা গ্রাস করল পুরো শরীর। পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যাচ্ছে। “সে কি সত্যি আমার উপর রাগ করেছে? আমি কি বেশি বলে ফেলেছি?” জারার চোখ ভিজে উঠল।
মাঠের শেষ প্রান্তে জারাদের ছোট বাড়ির কাছ থেকে বিদায় জানিয়ে আরমান ধীরে ধীরে নিজের বড় মাঠের একতলা বাড়িতে ফিরে আসে। বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে তার জিনিয়ার দিকে । আরমান হালকা হাসি দিয়ে ছোট বোনের দিকে তাকাল।
আরমান চুপচাপ রুমের দিকে চলে গেল,সেও বসা থেকে উঠে যায় আরমানের রুমের দিকে। আজ তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে হবে।
রুমে এসে আরমানের দিকে তাকিয়ে জিনিয়া বলল,
___“ভাইয়া…।”
আরমান হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে জিনিয়ার দিকে তাকায়। জিনিয়ার চোখ ছলছল করছে। আরমান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
____“কি হয়েছে, জিনিয়া? তুই কাঁদছিস কেন?”
জিনিয়া কেঁদে ফেলল। চোখের জল থামছে না। আরমান তার হাত ধরে বলল,
___“শান্ত হয়, তুই কাঁদছিস কেন? বল আমাকে কি হয়েছে? ”
জিনিয়া ধীরে ধীরে সব খুলে বলল, কাল রাতের ঘটনার সব কথা। কিভাবে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, তার মনে ভয়, দুশ্চিন্তা আর কষ্টের কথা।
আরমান শান্ত কণ্ঠে বলল,
___“তুই এসব নিয়ে বেশি চিন্তা করিস না। ভুল বোঝাবুঝি সবসময় হতে পারে। তুই ভয় পাস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি।”
জিনিয়া আবারও কান্না করতে করতে বলে
___” রোহান ভাই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে বলেছে? ”
__” কোথাও যাবে না সে। তোকে ছেড়ে সে কিছুতেই যাবে না, শুধু অভিমান করছে। ”
জিনিয়া হালকা নিশ্বাস ফেলল। আরমান তাকে কাঁধে হাত দিয়ে সামলাল।
___“ তুই এখন শান্ত। বোঝলি?”
জিনিয়া ধীরে ধীরে হেসে উঠল। আরমান তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
___“ঠিক আছে। আমি সব ঠিক করে দেব। তুই শুধু নিজের উপর ভরসা রাখ।”
কয়েক দিন পর, রোহানের জন্মদিনের দিন, জিনিয়া ঠিক করল তার মনে থাকা কিছু কথা প্রকাশ করবে। সে ভেতরে ভেতরে চিন্তা করল, কখন ওর অনুভূতি রোহানের কাছে বলবে।
জিনিয়া কথা গুলো ভাবে মনে মনে লজ্জা পায়। লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলে
___” ভাইয়া কিছু দিন পর রোহান ভাইয়ার জন্মদিন। আমি সেদিন ওনাকে আমার মনের কথা বলতে চাই। ওনাকে আর কয়েক দিন আটকে রাখবে প্লিজ? ”
__” আচ্ছা! আমিও দেখি ওই গাদা আমার বোনকে ছেড়ে কোথায় যায়? ”
ভাইয়ের কথা জিনিয়া ফিক করে হেসে উঠে।
আরমান জিনিয়ার মাথায় আদুরে হাত ভুলিয়ে দিয়ে বলে __” চিন্তা করিস না! আমি আছি সব ঠিক করে দিব ইনশাআল্লাহ। ”
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৫
বড় মাঠের বাড়িতে সব শান্ত। জিনিয়া আরমানের উপস্থিতিতে তার মন শান্ত, কিন্তু হৃদয়ে কিছুটা উদ্বেগ এখনও আছে। আরমান শান্ত কণ্ঠে জিনিয়াকে বোঝাচ্ছে, সময় সব ঠিক করে দেবে, এবং জিনিয়া ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, ভয় এবং দুশ্চিন্তা সবই কমে আসছে।
রোহানের জন্মদিনের দিন, জিনিয়া প্রস্তুত হবে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে। আরমানও সেই মুহূর্তকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখবে, যাতে সব কিছু সুন্দরভাবে ঘটতে পারে।
