রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৮
সোহানা ইসলাম
সকাল আটটা। হালকা কুয়াশা ভোরের আলোকে আরও নরম করে তুলেছে। জারা ঘুম থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখছে। চুলগুলো ঠিকমত বাঁধা হয়নি, চোখে অল্প ঘুমের ছাপ, আর মুখের রঙ ফ্যাকাশে। কিন্তু মনে হলো সবই তুচ্ছ—আজ তার শুধু একটাই চিন্তা আরমান।
মায়ের ডাক বারবার ঘরের ভেতর বাজছে, কিন্তু জারা যেন শুনতে চায় না।
—জারা! না খেয়ে কোথাও যাবি না। অন্তত দুধটা খেয়ে যা।
জারার গলার ভেতর কান্না চেপে আছে, চোখের কোণে পানি জমছে। সে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, যেন নিজের ভেতর জমে থাকা অনুভূতি একটু শান্ত করা যায়। আরমান কে একপলক দেখের জন্য তাড়াতাড়ি করে কলেজের জন্য রেডি হচ্ছে। তার মন বলছে রাগ করে থাকলেও তাকে দেখার জন্য ঘাটে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে আরমান। এই ভাবনাটাই যেন মনের সব কষ্ট দূর করে দিচ্ছে। কোনো রকম হিজাব টা বেদে কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পরে রুম থেকে। জারাকে ড্রইং রুমে আসতে দেখে মারজিয়া বেগম আবার বলেন
__” জারা দুধটা খেয়ে যাহ ”
জারা মায়ের কথা শুনেও না শুনার মতো করে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। তাকে দাড়াতে দেখলে আবার খাওয়ার জন্য জোর করবে।
বোন এতো তাড়াহুড়ো করতে দেখে জোহান দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
—” বনু,তুমি আজ এতো তাড়াহুড়ো করছো কেন? আর তোমার হিজাব তো আজ সুন্দর করে বাদা হয় নি। কেমন এলোমেলো হয়ে আছে ?
জারা কপালে ভাঁজ ফেলে উত্তর দিল,
—তুই চুপ করে থাক মীরজাফর । আমাকে নিয়ে তোর এতো ভাবে হবে না?
জোহান ভোঁতা মুখে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে তো ভালোর জন্যই বলেছে? এখানে এমন করার কি আছে?
__” এই জন্যই বলে, কারো ভালো করতে নেই! ”
জারা জোহানের কথা শুনে ও কোনো উত্তর করল না। তার মন এখন পরে আছে আরমানের কাছে। তাকে একটা বার দেখার জন্য। সরি বলে ক্ষমা চাইতে হবে তার। লোক টাকে সে বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছে মনে হচ্ছে। তাই তো এখনো একটা কল বা মেসেজ করে নি।
জারা রাস্তার মোড়ে এসে ফোন বের করে ফিহাকে ডেকল,
—” কোথায় তুই?”
ফিহার ভেসে আসা কণ্ঠ উত্তর দিল,
— “আমি বের হয়েছি। তুই অপেক্ষা কর, আসছি।”
নদীর ঘাটে এসে দাঁড়াল জারা। অন্যদিন এখানে দাঁড়িয়ে দূর থেকে আরমানকে দেখতে পেত। আজ চারপাশ খালি, বাতাসও যেন তার মনকে বুঝতে চায় না। বুকের ভেতর ভারী চাপ, চোখে অশ্রু। সে বিড়বিড় করে বলল,__ “আজকে কেন এলো না ? কি হয়েছে ওনার ? আমার উপরে উনি অনেক রাগ করেছে? আমি কি বেশি বলে ফেলেছি?”
মনের ভেতর অপরাধবোধ, ভালোবাসার মিশ্র অনুভূতি, সব একসাথে ধাক্কা খাচ্ছে।
ঠিক তখনই ফিহা এসে পাশে দাঁড়াল। এসে হাঁপাতে লাগে মনে হচ্ছে দৌড়ে এসেছে।
—”কিরে, মুখটা এমন শুকনো কেন?”
জারা চোখ নামিয়ে উত্তর দিল,
— ” কিছু না…”
ফিহা সন্দেহ করে বলল,
——” তুই কিছু না বললেই কি আমি বুঝব না? চোখের অবস্থা তো দেখছি আমি? কানা নই।”
জারা কথা ঘুরাতে ফিহার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বলে,
___” শুন, মিম আজ আসবে না কলেজে। ওর মা অসুস্থ, ডাক্তার দেখাতে যাবে।”
___” ভালো করেছে। তবে আমি তো আছি, তাই না?”
জারা ধীরস্বরে বলল,
___”হ্যাঁ, তুই আছিস, তাই মনটা একটু হালকা।”
ফিহা মাথা নেড়ে বলল,
__” ঠিক আছে, এখন বল মন খারাপ কেন?”
জারা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
__”এমনি মনটা খারাপ। ”
আরমানের কথা ভাবতেই চোখে পানি চলে আসে।
জারার চোখে পানি দেখে ফিহা ধীরে গলায় বলে__” কী হয়েছে জানু? কান্না করছি কেন? বল আমাকে। ”
জারার মনে হলো ফিহার কথা এক মিষ্টি ছায়ার মতো। গলা ভিজে গেল, কিন্তু সে দৃঢ় হয়ে বলে
__” কি কিছু হয় নি। চল কলেজের জন্য লেট হয়ে যাচ্ছে। ”
নদীর ঢেউয়ের শব্দ শুনে মনে হলো সময় একটু থেমে গেছে। ঘাটের ওপাশে ছোট নৌকা দুলছে, কিন্তু জারার মন শান্ত হচ্ছে না। বুকের ভিতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা, আরমানকে না দেখার অনুভূতি আরও গভীর হচ্ছে।__” আমি আপনাকে মিস করছি__জারা নিজেই ফিসফিস করল।
__” আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাই নি?প্লিজ ক্ষমা করে দিন। কান্না চেপে ধরে সে আরও মনে মনে কথা গুলো বলে।
ফিহা সামান্য পাশে হেসে বলল,
__” ভাইয়ার সাথে ঝগড়া হয়েছে? ”
জারা মাথা নেড়ে বলল,
__” হুম ”
বলেই চেপে রাখা কান্না টা বের হয়ে আসে। কান্না করতে করতে বলে
__” আ আমি ওনাকে কষ্ট দিতে চাই নি। ”
ফিহা জারা’কে শান্ত করার জন্য বলে__” কান্না করে না জানু। এটা রাস্তা সবাই খারাপ মনে করবে। চল কলেজে গিয়ে সব কথা শুনব তোর।
জারাও হাতে উল্টো পিঠ দিয়ে নিজের চোখ মুছে নেয়। ফিহার হাত শক্ত করে ধরে কলেজের দিকে চলে যায়।
মিম আজ কলেজে যায়নি। মা, রুবিনা বেগম, সঙ্গে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে বের হয়েছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে মোবাইলে ব্যস্ত—বার্তা খোলা, নোটিফিকেশন স্ক্রল করা, যেন নিজের মনকে অন্য কোথাও সরিয়ে রাখতে চাচ্ছে। বড় রাস্তায় দাড়িয়ে আছে তারা। রুবিনা বেগম একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েকে রোদে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বলেন
__” মিম আমার কাছে এসে দাঁড়া। এই কাঠফাটা রোদের দাঁড়িয়ে আছি কেন? ”
__” আম্মু তুমি ওখানেই দাঁড়াও। আমি দেখছি গাড়ি আসে কি না? ”
__” গাড়ি আসবে নে? তুই আমার কাছে আমায়। ”
মায়ের কথায় হার মেনে চলে আসে মিম। এসেই মায়ের পাশে দাঁড়ায়।মায়ের পাশে দাড়িয়ে আবার মোবাইলে কি যেন করছিল। তার সব দেন মোবাইলের উপর। হঠাৎ, তাদের সামনে এসে একটা বাইক থামে। রুবিনা বেগম চমকে উঠে।কারণ তার হার্টের সমস্যা। বাইকে বসা ছেলেটা মাথার হেলমেট খুলে তাকায় তাদের দিকে। ছেলেটা রুবিনা বেগম এর দিকে তাকিয়ে এক নরম স্বরের উষ্ণতা, প্রশ্ন করে
__” আন্টি এখানে এ.কে.খান কোম্পানির কাজ চলছে কোথায়? ”
মিম frozen হয়ে গেল।এই কন্ঠ টা তার চিনা। খুব কাছের একজন মানুষের গলার স্বর। মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকাল। সামনে দাড়িয়ে থাকা মানুষ টাকে দেখে দুনিয়ার সব শব্দ যেন থেমে গেছে। সেই স্বর, সেই গলা—কেউ যেন তার ভেতরের সব আবেগকে ছুঁয়ে দিল। মনের ভিতরে অজানা উত্তেজনা আর আতঙ্ক একসাথে ধাক্কা দিল। তার হৃদয় দ্রুত ধুকধুক করছে। মনে হলো, এতকাল ধরে যে মানুষটিকে সে শুধু ফেসবুকের স্ক্রিনে দেখেছে, আজ সে তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে কখনো কল্পনা ও করতে পারেনি মানুষ টা কে সে কখনো সামনাসামনি দেকতে পারবে? সামনে থেকে দেখতে মানুষ টা এতো সুন্দর। মিম রাশেদ কে প্রথম দেখায় চিনতে পারলে ও রাশেদ মিমকে চিনতে পারল না। কারণ সে কখনো মিমকে দেখেনি। তার কাছে ওর পিক চায়নি। না দেখেই তাদের মাঝে ভালোবাসার সম্পর্কটা হয়ে যায়। কিন্তু একটা ছোট ঘটনা তাদের মধ্যে সব নষ্ট হয়ে গেছে। সব শেষ তাদের মাঝে। বিচ্ছেদ ঘটে যায়।
__” ও…ও এখানে কী করছে?” মিম ফিসফিস করে বলে। রাশেদের দিকে মিম পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার এই বেহায়া চোখ যেন সরাতেই পারছে না।
রাশেদের চোখ যায় মিমের দিকে। তার দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে। রাশেদ মিমকে ভালো করে দেখে, গায়ের রঙ একটু চাপা। কিন্তু চোখ মুখে আলাদা একটা মায়া আছে। পরনে সাদা একটা গোল জামা। মাথায় সুন্দর করে হিজাব বাঁধা। রাশেদ যে তাকে এই ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সে দিকে মিমের কোন হুস নেই। সে মনে করে ভদ্রমহিলার সাথে যখন দাড়িয়ে আছে তাহলে নিশ্চয় মেয়েই হবে। তাই রাশেদ এবার মিমের চোখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে
__” এই ভাবে তাকিয়ে আছো কেন আন্টির মেয়ে? ”
রুবিনা বেগম চোখ পাকিয়ে তাকালেন মিমের দিকে। মিমের হাতে একটু ঝাঁকি দিয়ে বলেন
— ” মিম! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবছিস?”
মিম লজ্জা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, শুধু মাথা নিচু করে বলল,—” কিছু না মা…”
মেয়ের কাজে রুবিনা বেগম লজ্জা পেলেন কিছুটা। রাশেদের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন
__” বাবা তুমি সোজা চলে যাও। ঘাটের কাছে বড় যে মাঠ টা আছে ওখানেই এ. কে.খান কোম্পানির কাজ চলছে। ”
___” Thank you আন্টি। বলে রাশেদ সামান্য ভ্রু উঁচু করে আবার তাকায় মিমের দিকে। মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আর কিছু না বলে রাশেদ বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে যায় সেখান থেকে।
__” লজ্জার মাথা খেয়েছিস নাকি? ওই ছেলেটার দিকে ও ভাবে তাকিয়ে ছিলি কেন?”
মিম কিছু বলে না। মোবাইলে টুকতে থাকে, ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা, ভয় আর লজ্জার মিম। শুধু মাথা নেড়ে মায়ের কথায় সম্মতি জানাল। ভেতরে মনে হলো—পুরনো ভালোবাসা, পরিচিত স্বর, অচেনা উত্তেজনা, সব মিলিয়ে আজকের সকাল তার জন্য এক আবেগের ঝড়।অনাঙ্ক্ষিত ভাবে মানুষ টার সাথে দেখা। কি অদ্ভুত একটা বিষয়। নিজের ভালোবাসার মানুষ টা তাকে চিনেতে পারল না আর সে চিনতে পেরেও কিছু বলতে পারল না।
মনের ভিতরে একরাশ অদ্ভুত উত্তেজনা—ভয়, লজ্জা,কষ্ট,মনের ভিতরের লুকিয়ে রাখা চাপা কষ্ট, উত্তেজনা—সব মিলেমিশে তাকে কিছুটা স্থবির করে দিয়েছে। সে বুঝতে পারছে, আজকের মুহূর্তটি তার জন্য কখনও ভুলবে না।
সকালের নাস্তা শেষ করে রোহান আর জাহেদ দুইজন মিলে বারান্দায় বসে আছে। রোহান ৪ তারিখে আমেরিকায় চলে যাবে এটা জাহেদকে জানায়।এটা শুনার পর থেকে জাহেদের মন টা ভার হয়ে গেছে। সে রোহানকে বোঝাচ্ছে যাতে আমেরিকায় না যায়। কিন্তু রোহানের মন যেন পাথর হয়ে গেছে, সে কোনো কথা কানে নিচ্ছে না। সে যাবে মানে যাবে।
তারা কথা বলছে নিজেরা নিজেরা। হঠাৎ বাইক আসার শব্দ শুনে দুইজন সমানের দিকে তাকায়। দেখে আরমানের পার্সোনাল সেক্রেটারি রাশেদ আসছে। কিন্তু রাশেদ যে আসবে এটা তারা যানে না। আবার আরমানের বাইক চালিয়ে আচ্ছে বিষয়টা তে আরও চমকে উঠে। আরমান সচারাচর কাউকে বাইক ধরতে দেয় না।এবং নিজেও চালায় না নষ্ট হয়ে যাবে বলে। কারণ টা তার নিজে ইনকাম করে কিনেছে। বাপ চাচার কারো কাছ থেকে কোনো সাহায্য ছাড়া। নিজেদের কোনো কিছুর অভাব নেই। কিন্তু ওইযে শখ। এটা তার নিজের।
রাশেদ আরমানের বাইক চালিয়ে বড় মাঠের একতলা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালো।মাথা থেকে হেলমেট খুলে ভদ্রতা বজায় রেখে সালাম দেয়।
__” ভালো আছেন স্যার। ”
রোহান ভ্রু কুঁচকে বলে
___” আরমানের বাইক তুমি কোথায় পেলে? ”
রাশেদ মুখে হাসির রেখা টেনে বলে
__” কাল রাতে স্যার এর সাথে কথা হয় আমার। তখন স্যার নিজেই অনুমতি দেন। আমি বড় ম্যাডামের কাছে চাবি চাই তিনি দিয়ে দেন। ”
রোহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” তুমি আজকে আসবে, আগে তো বলোনি?”
রাশেদ একটু কাঁচুমাচু হয়ে উত্তর দিল,
— “স্যার নিজেই বলেছেন আসতে।”
তারপর কিছুক্ষণ সাধারণ খোঁজখবর চলল। হঠাৎ রাশেদ বারান্দার চারপাশে তাকাতে লাগল, যেন কিছু খুঁজছে। না পেয়ে কপালে হাত দিয়ে বলল,
— “স্যার কোথায়? দেখছি তো না!”
জাহেদ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাই দিতে দিতে বলল,
— “ভাইয়া ময়মনসিংহে গেছে আজ ভোরে।”
রাশেদের মুখ হঠাৎ শুকিয়ে গেল। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
— “কী বলছেন! স্যার আমাকে আসতে বলে নিজেই চলে গেলেন? এ তো একেবারে ছলনা!”
রোহান হেসে গড়াগড়ি খেতে খেতে বলল,
__” মানে, তুমি আসবে বলেই আরমান পালিয়ে গেছে!
জাহেদ যোগ দিল,
__” তুমি যে পরিমাণ ভাইয়াকে বিরক্ত করো, তাই হয়তো তোমার স্যার বুঝি ভয় পেয়ে গেছে। ”
রাশেদ নাক টানতে টানতে বলল,
— ” স্যার আমাকে এভাবে ধোঁকা দিলেন। আমার কপালে শুধু বাইকের ধুলোই জুটল।”
__” প্রেমিকা ছেড়ে চলে গেলেও এমন করে না। তোমার স্যার ময়মনসিংহে যাওয়ায় তুমি যেমন করছো?” বলল জাহেদ।
__” ভালোবাসার নাম সেক্রেটারি লাভ। এমন ভাবে কয়জনেই বা স্যারের মাথা খেতে পারে বিরক্ত হয়ে করে? ” বলে রোহান।
__” স্যার আপনারা মজা করবেন না? আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি স্যার চলে যাওয়ায়? বলে রাশেদ
__” ওরে সোনা কুষ্টু পেয়েছো তুমি? ”
রোহানের কথায় বারান্দায় হাসির রোল পরে যায়। রাশেদ ও না চাইতে হেসে ফেলে। লজ্জায় মাথা নিচু করে মাথার পিছনে চুলকাতে থাকে।
বারান্দায় এতো হাসাহাসির শব্দ শুনে জিনিয়া রুম থেকে বের হয়ে আসে। এসে দেখে রাশেদ দাড়িয়ে আছে। তাদের কোম্পানিতে কাজ করে এবং বড় ভাইয়ার সেক্রেটারি বলে ভালো করেই চিনে তাকে।
রাশেদ জিনিয়াকে দেখে ভদ্রতা বজায় রেখে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে। জিনিয়াও হেঁসে হেঁসে উত্তর দেয়।
কিন্তু এই বিষয় টা রোহানের সহ্য হয় না। রাশেদের দিকে খেয়ে ফেলেরা দৃষ্টিতে তাকায় সে। রাশেদ রোহানের দৃষ্টি দেখে ভয়ে আর কিছু বলে না। চুপ করে দারিয়ে থাকে। রোহান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জিনিয়ার দিকে তাকায়। তার পর গটগট পায়ে রুমের দিকে চলে যায়।
রোহানের দৃষ্টি দেখে জিনিয়ার গলায় শুকিয়ে যায়।
কলেজ ছুটি হতেই জারা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে এল ক্লাস থেকে । পাশে ফিহা হাঁটছিল, কিন্তু জারার তাড়া যেন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। চারপাশের বন্ধুদের সবার সঙ্গে বিদায় না জানিয়েই সে গেটের দিকে পা চালাল। ফিহা অবাক হয়ে তাকাল—
—“এই জানু, এতো তাড়াহুড়ো করছিস কেন? ”
জারা একটু চমকে উঠল, তবুও ঠোঁটের কোণে একরকম অস্থির হাসি টেনে বলল—
—“না… মানে… হ্যাঁ, একটা কাজ আছে।”
__” হ্যা..হ্যা বোঝি তোর কি কাজ আছে? আরমান ভাইয়াকে দেখার জন্য এমন ছটফট করছি তাই না? ”
__” ধূর! কি যে বলিস তুই? ”
কথাটা বললেও আসলে তার মন কেবল এক জায়গায় গিয়েই বারবার আটকে যাচ্ছিল। হয়তো আরমান এখন ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো এই অপেক্ষাতেই দিন কাটাচ্ছে। দুপুরের সেই রাগ, অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি সবকিছুই আজ জারা ঝেড়ে ফেলতে চায়। যদি আরমানের সঙ্গে দেখা হয়, সে ক্ষমা চাইবে। কাঁপা কণ্ঠে হলেও বলবে— “আপনি রাগ করবেন না, আমি ইচ্ছা করে খারাপ কিছু বলতে চাইনি।”
দুজনে নদী পার হয়ে ঘাটে এসে দাঁড়াল। বাতাসে নদীর কূলঘেঁষা কাশফুল দুলছে, নৌকাগুলো একে একে ভিড়ছে। জারার চোখ শুধু একজনকে খুঁজছে। ঘাটের প্রতিটি কোণা, নৌকাঘাট, গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের দিকে একনজর ঘুরিয়ে দিল সে। কিন্তু—না। আরমান নেই।
জারার বুকটা হঠাৎ করে খালি হয়ে গেল। যেন কেউ সমস্ত আশা এক মুহূর্তে কেড়ে নিল। সে আবার চারপাশে তাকাল, হয়তো কোথাও দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো চোখে পড়ছে না। কিন্তু না, কোথাও আরমানের দেখা নেই।
ফিহা তখনো জারার পাশে দাঁড়িয়ে। ও বুঝতে পারছে, জারা কাউকে খুঁজছে। সেও একবার আশেপাশে তাকায়। দেখতে পেল না সে কাঙ্খিত মানুষটাকে। জারার দিকে একবার তাকায় সে মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে একমুহূর্তে। কিন্তু কিছু বলল না। ঠিক তখনই সামনে থেকে জাহেদ এসে পড়ল। মুখে একরকম হাসি, চোখে ভদ্রতার ঝিলিক।
—“আরে ভাবি! কেমন আছেন? কলেজ থেকে ফিরছেন?”
এই হঠাৎ ‘ভাবি’ ডাক শুনে জারা থমকে গেল।
ফিহা মৃদু হেসে মুখ নিচু করল। গাল দুটো যেন অকারণেই লাল হয়ে উঠল ওর। জাহেদ ফিহার দিকে তাকিয়ে মজা করে বলল—ভাবি আপনার বন্ধাবী কিন্তু একদম কটকটির মতো লাগে।”
ফিহার মুখটা যেনো কুঁচকে যায়। রাগী দৃষ্টিতে তাকায় সে জাহেদের দিকে। জাদেহ ফিহার তাকানো দেখে নিজের ঠোঁট গোল করে চুমু দেখায়।
বিষয়টা জারার চোখে পরে। আর জারা ভেতরে ভেতরে লজ্জায় সঙ্কুচিত হয়ে গেল। কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারল না। তবুও ভদ্রতার খাতিরে বলল—
__“ভালো আছি। আপনি?”
—“আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই আছি। আচ্ছা, আরমান ভাইয়ার সাথে সব ঠিকঠাক ?”
প্রশ্নটা শুনেই জারার বুকটা ধক করে উঠল। কিন্তু ঠোঁট সিল করে রাখল সে। সাহস হলো না জাহেদকে উওর দেওয়ার।আর আরমানের কথা জাহেদকে জিজ্ঞেস করার। কেমন জানি লজ্জা, আবার দিধা। হয়তো জাহেদ উত্তর দিতে পারবে, হয়তো আবার তাকে নিয়ে মজা করবে। কিন্তু জারার মন আটকে গেল।
কয়েকটা সাধারণ কথা বলে বিদায় নিল তাদের কাছ থেকে জারা। জাহেদ তখনো ফিহার দিকে তাকিয়ে হালকা দুষ্টুমি করছে। হাঁটতে হাঁটতে জারা একবার পিছনে ফিরে তাকাল। দেখল, ফিহা আর জাহেদ খুনসুটি করছে। সেই দৃশ্যটা যেন অদ্ভুত সুন্দর লাগল তার কাছে। দুজনকে একসাথে খুব মানাচ্ছে। অকারণেই বুকটা একটু হালকা হলো, আবার ভারীও হলো।
পথে হাঁটতে হাঁটতে জারার চোখ ভিজে উঠল। মনে হলো, সারা পৃথিবীটাই খালি হয়ে গেছে। তার সমস্ত ভাবনা জুড়ে কেবল আরমান।
“আপনি কেন এলেন না আজ? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি অপেক্ষা করছেন। যদি রাগ করে থাকেন, তবে মাফ করে দিন। আমি চাইনি আপনাকে কষ্ট দিতে। সারাদিন শুধু আপনার কথাই মনে পড়েছে।আপনার ওই ছোঁয়া আর নেশালো দৃষ্টির চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। কলেজে বই খুলে তাকাই, বইয়ের অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে যায়। মনে চায় আপনার কণ্ঠ শুনছি। রাতে ঘুমও আসে নি কাল ঠিক মতো। এই ভেবে কাটাই, আপনি হয়তো একটা কল দিবেন। আপনাট কি একবারও আমার কথা মনে পরে না?”
জারা হাঁটতে হাঁটতে এসব কথাই মনে মনে আওড়াল। কখনো মনে হলো যদি এখনই ফোনটা বেজে ওঠে, আরমান কল করেছে। কিন্তু না, নীরব ফোন যেন তার কষ্টকেই আরও গভীর করে তুলল।
আকাশের দিকে তাকাল সে। রোদের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে, সন্ধ্যার ছোঁয়া পড়ছে নদীর জলে। সেই আলো-অন্ধকারের মাঝে জারা শুধু আরমানকে খুঁজে ফিরল।
একসময় সে বাড়ির পথে চলে গেল। কিন্তু মনটা পড়ে রইল ঘাটেই। মনে মনে আবারও প্রতিজ্ঞা করল—“যদি আগামীকাল আবার কাল না আসেন আমার সাথে কথা না বলেন , আমিও আর আপনার সাথে কথা বলব না। খুব রাগ করব আপনার উপর এই বলে দিলাম । ”
এই কথা গুলো বললেও বেহায়া মন আবারও বলে উঠে___” খুব মিস করছি আপনাকে।আপনাকে খুব ভালোবাসি আমি। কাল দেখা হলে
সরাসরি বলব, আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারি না।মরে যাব একবেলা কথা বলতে না পারলে।”
আজকের আরমানের অনুপস্থিতি জারা কে হাড়েহাড়ে বোঝিয়েছে সে কতো টা ভালোবাসা তাকে। এক বেলা না দেখলে কেমন পাগলের মতো লাগে সব কিছু। কান্না চলে আসে।
দুপুরের ক্লান্ত আলোটা তখনো আকাশে রয়ে গেছে ঝলমলে । ঘাট থেকে ফিরে জারা যখন বাড়ির কাছে পৌঁছাল, তার পা যেন হঠাৎ থেমে গেল দরজার সামনে। দরজার সামনে রক্তে মাখা নিথর দেহে পরে চলে ছোট ছোট খরগোশ। এটা দেখে কলিজায় টান লাগে জারা’র। দৌড়ে চলে আসে তাদের সদর দরজার সামনে। খরগোশ গুলো কোলে তুলে নেয়। আশেপাশে আবার তাকায় সে। এদিকে সেদিকে ছোট ছোট প্রাণ গুলো মাটি পরে আছে। এমন মান মানতিক ঘটনা দেখে কান্না করে দেয়। তার শখের খরগোশ। এই ভাবে মৃত্যু অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে? জারা এবার দূর থেকেই বাড়ির ভিতরে তাকায় বুঝতে পারছিল, ঘরের ভেতরে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটেছে । পাখির ডাকের সঙ্গে মিশে আসছিল টিনের বেড়ার ভাঙা আওয়াজ। বুকের ভেতরটা কেমন জানি মুচড়ে উঠল।
ভেতরে ঢুকেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রতিটি জিনিসপত্র এলোমেলো পড়ে আছে। রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিল মেঝেতে ছড়িয়ে আছে, চৌকির গদি মাটিতে উল্টে পড়েছে, ড্রাই নিং টেবিলের সব কিছু ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে দরজার কোণায়। যেন ঘরে দস্যুর দল ঢুকে সব কিছু উল্টে দিয়েছে।
জারার চোখে পানি চলে এলো। বুক ধকধক করতে লাগল।
“আমার মা… আমার ভাই… তারা কোথায়?”
পাগলের মতো দৌড়ে সে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে খুঁজতে লাগল। গলা শুকিয়ে গেলেও সে ডাক দিল জোরে—
—“আম্মু… আম্মু তুমি কোথায়?”
ঠিক তখনই টিনের ঘর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল তার মা, মারজিয়া বেগম। মুখের চেহারা মলিন, চোখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। মেয়েকে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন।
জারা ব্যাগটা মাটিতে ফেলে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। চোখ ভিজে গেল কান্নায়। কাঁপা কণ্ঠে বলল—
—“আম্মু, কি হয়েছে? এই অবস্থা কেন ঘরের? তুমি ঠিক আছো তো? আমার বুকটা থেমে যাচ্ছে।”
মেয়ের কান্না দেখে মারজিয়া বেগমও আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। কণ্ঠ কেঁপে গেল—
—“কি আর বলবো মা… চেয়ারম্যানের ছেলে রহিম এসেছে কিছু লোকে নিয়ে। বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। আমি রাজি না হওয়ায় এই ভাঙচুর করেছে। বলে গেছে, পরের বার এলে সরাসরি তোকে নিয়ে যাবে। কিছুতেই মানবে না।”
জারার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। হাত-পা কাঁপতে লাগল। মনে হলো মাথার ওপর থেকে আকাশ সরে গেল।
—“কি বলছো তুমি, আম্মু? ওরা এমন কথা বলেছে?”
—“হ্যাঁ মা… ও ছেলে ভালো না। নেশা করে, মেয়েদের বাজি ধরে, জেলেও গেছে দুইবার। আমি কেমন করে তোর মতো মেয়েকে ওর হাতে তুলে দিই? আমি কিছুতেই রাজি হইনি। তাই এই সর্বনাশ করল।”
জারার বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে এল।ওইদিনের দুপুরে বড় মাঠে যেই ঘটনা ঘটেছিল, মনে হলো তারই প্রতিশোধ নিচ্ছে রহিম। চোখ ভিজে এলো। হঠাৎ তার মনে পড়ল ছোট ভাই জোহানের কথা।
—“আম্মু… জোহান কোথায়? আমার ভাই কই? সে তো চঞ্চল, দুষ্টুমি করে বেড়ায়। এই সব দেখে যদি কিছু করতে যেত?”
প্রশ্নটা শুনে মারজিয়া বেগম আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে বললেন—
—“চল মা, আমি তোকে দেখাই।”
মারজিয়া বেগম মেয়েকে নিয়ে গেলেন টিনের ঘরে। ভেতরে ঢুকেই জারার চোখ ছলছল করে উঠল। ছোট্ট ভাই জোহান বিছানায় শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ। মাথায় সাদা কাপড়ের বেন্ডেজ। পাশে এক বাটি পানি আর একটা ভিজা গামছা রাখা।
—“আমার আল্লাহ…” জারার ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে দৌড়ে গিয়ে ভাইয়ের মাথার কাছে বসে পড়ল। কাঁপা হাতে বেন্ডেজটা স্পর্শ করল। বুকের ভেতর যেন সবকিছু ভেঙে পড়ল। চোখ ভরে কান্না এলো।
—“আম্মু, ওর এই অবস্থা হলো কিভাবে?”
মারজিয়া বেগম চেয়ারে বসে পড়লেন। চোখ মুছতে মুছতে বললেন—
—“ওরা যখন ঘরে ঢোকে, ভাঙচুর শুরু করে,খরগোশ গুলোতে হাত দিলে, তখন জোহান বাধা দিয়ে বলে —” এগুলোতে হাত দেবেন না,আর আমার বোনকে নিয়ে কিছু বলবেন না।’ কিন্তু ওই নরপশুরা কি শোনে? রহিম নিজে লাঠি দিয়ে ওকে মাথায় আঘাত করে। আমি দৌড়ে গিয়ে জোহানকে আঁকড়ে ধরি। তারা সবাই মিলে ওই ছোট ছোট প্রান গুলোকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলে’ এরপর চলে গেল।”
কথা বলতে বলতে মারজিয়া বেগম হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
জারা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলাতে লাগল। গলার ভেতর থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। অশ্রু ভিজিয়ে দিল বেন্ডেজটা। ছোট ভাইটার নিরীহ মুখ দেখে তার বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল।
—“আমার ভাই… এতটুকু বাচ্চাকে এভাবে মারে কিভাবে? আম্মু, আমি আর পারছি না ওকে এমন ভাবে দেখতে ।”
মারজিয়া বেগম মেয়ের মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলেন—
—“ধৈর্য ধর মা। আল্লাহ সব দেখছে। অন্যায় কেউ করলে সে একদিন শাস্তি পাবে। কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি, যদি আবার আসে? আমি তোকে কেমন করে রক্ষা করব?”
জারা চোখ মুছল, কিন্তু তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। চোখে যেন নতুন আগুন জ্বলে উঠল।
—“না আম্মু, এবার আমি আর চুপ করে থাকব না। যদি ওরা ভাবে ভয় দেখিয়ে আমাদের ভাঙতে পারবে, তবে ভুল করছে। আমি জোহানের শপথ করছি— আমি কিছু একটা করব।”
মারজিয়া বেগম মেয়ের কণ্ঠে অদ্ভুত দৃঢ়তা টের পেলেন। তবুও তিনি ভয় নিয়ে বললেন—
—“না মা, তুই কোনো ঝুঁকি নে না। মেয়েদের জন্য এই সমাজে অনেক বাঁধা। কিন্তু আমি তোকে বুঝাই কেমন করে…”
জারা কিছু বলল না। শুধু ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে যেতে লাগল। বুকের ভেতরে কষ্ট জমে জমে পাহাড় হয়ে গেলেও চোখে তখন ভেসে উঠল একটাই মুখ— আরমান।
“আজ আরমান কে যদি আমি সব বলতে পারতাম…”
কিন্তু জারা জানে, আপাতত তাকে মায়ের পাশে থাকতে হবে, ভাইকে আগলে রাখতে হবে। সেই ছোট্ট ঘরে রাত নামল অন্ধকার হয়ে।
ময়মনসিংহে পৌছে জেরিনকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে সোজা চলে যায় অফিসে। বাড়ির কারোর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় নি। সারাদিন দৌড়ঝাঁপ, মিটিং আর ফাইলের চাপ সামলে অবশেষ সন্ধ্যার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরে আরমান। বাড়ির ফিরার পথে মনে হয়, কতদিন হলো ঠিক করে বাড়ির কারো সঙ্গে বসে গল্প করা হয়নি। সবসময় ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর দায়িত্বে ডুবে থাকা তার জীবনের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে কোনো কথা না বলেই চুপচাপ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে, যেন বাড়ির পরিবেশ নষ্ট করতে চায় না।ঠিক তখন দেখে ড্রইংরুমে বসে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ফারিয়া বেগম। ছেলেকে অনেকদিন পর এতটা ক্লান্ত, নির্ভরতার মতো দেখতে পেয়ে মায়ের বুক হঠাৎই ভরে ওঠে।
আরমান চোখে মাকে দেখে থেমে যায়। গলা ভিজে আসে আবেগে—
—“আম্মু …”
শব্দটুকুই যেন ফারিয়া বেগমের সমস্ত অপেক্ষা আর স্নেহকে জাগিয়ে তোলে।
চোখ মুছে নেন তিনি, কিন্তু অশ্রু লুকানো যায় না। ছেলের মুখে ক্লান্তির রেখা দেখে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নিজেকে সামলে কেবল ছেলেকে বুকে টেনে নেন।
—“যা, আগে ফ্রেশ হয়ে আয়। তারপর খাবি। এত ক্লান্ত লাগছে, খালি পেট দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”
আরমান মাথা নেড়ে মায়ের কথা মেনে নেয়। নিজের ঘরে ঢুকে হালকা গায়ে পানি ছিটিয়ে আসে। আয়নায় চোখে পড়ে নিজের ক্লান্ত মুখটা—নিঃশব্দ এক যুদ্ধের সৈনিকের মতো লাগে। তারপর ডাইনিং টেবিলে বসে মায়ের হাতে রান্না করা খাবার খেতে শুরু করে। প্রতিটি গ্রাসে যেন দিনের ক্লান্তি একটু একটু করে গলে যায়।
খাবার শেষে হাতে ধরা মোবাইলটা টেবিলেই ফেলে রাখে আরমান। পর্দায় ঝলসে ওঠা কয়েকটা নোটিফিকেশনের দিকে আর চোখও যায় না তার। এতসব দায়িত্ব, কল বা মেসেজ এই মুহূর্তে তুচ্ছ মনে হয়। মন চায় শুধু একটু বিশ্রাম, একটু নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা।
খাওয়া শেষ করে আবার নিজের ঘরে ফিরে যায় সে। বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে, সত্যিই কতটা ভেঙে পড়েছে সে। মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাওয়া চিন্তাগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে। শরীরের প্রতিটি কোষ যেন ঘুমকে ডেকে আনে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম তাকে গ্রাস করে নেয়। বাড়ির ড্রইংরুমে তখনো আলো জ্বলছে, মায়ের মনে ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা রয়ে গেছে। আর আরমানের বিছানায় শুয়ে থাকা দেহটা নিস্তব্ধতার কাছে আত্মসমর্পণ করে।
ডাইনিং টেবিলে অবহেলায় পড়ে থাকে মোবাইলটা—নিঃশব্দ এক সাক্ষী হয়ে। অজস্র কল, মেসেজ হয়তো আসবে, আবার মিস হয়ে যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব কিছুর চেয়ে আরমানের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে শুধু শান্তির ঘুম।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৭
রাত প্রায় অনেক। মাকে আর ছোট ভাই খাইয়ে দিয়ে, জোহান কে ঔষধ দিয়ে দেয়। জারা টিনের ঘরটার দরজা ভালো করে লাগিয়ে আসে। মাকে আর ভাইকে ঘুমাতে দেখো জারা বিছানা থেকে উঠে বসে। ঘরের এককোণে গিয়ে জারা এবার নিজেই আরমানকে কল করে। কিন্তু মোবাইল বন্ধ বলছে।
একবার, দুইবার এমন করে প্রাশ হাজারের উপরে কল আর মেসেজ করে জারা আরমানকে। কিন্তু ফলাফল শূণ্য।আরমানের মোবাইল বন্ধ। ধৈর্যের বাঁধ সব ভেঙ্গে যায় জারার। রাগে, ভয়ে, অভিমানে কান্না করে দেয়। চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তুু পারছে। দুই হাতে মুখটা চেপে ধরে রাখে যে কান্নার শব্দ না বের হয়।
__” প্লিজ আরমান কলটা রিসিভ করুন। ”
