রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪২
সোহানা ইসলাম
কোলে তার অচেতন মতো ভীতসন্ত্রস্ত জারা। জারার চোখে মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট, সে হাত-পা ছুঁড়ে মুক্তি পেতে চাইছে, কিন্তু আরমানের শক্ত বাহুর বাঁধন থেকে সে বেরোতে পারছে না।
আরমানকে দেখে যে কেউ চোখ কপালে তুলবে—গায়ের গড়ন পেশিবহুল, চোখে-মুখে অদ্ভুত এক রাগের ঝলক, আর তার চেয়েও বিস্ময়কর হলো—পরনে শুধু একটা সাদা তোয়ালে! যেন ঘর থেকে হুট করে বেরিয়ে এসেছে, পোশাক পরার সময়ও হয়নি।
তার পেছনে আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী হুড়মুড় করে ঢুকে আসে অফিসের ভিতরে। সবাই আতঙ্কে, বিভ্রান্তিতে ঘোরাফেরা করছে।
কাজি তখন অফিসের টেবিলের পেছনে বসে ছিলেন। এমন দৃশ্য জীবনে তিনি কল্পনাও করেননি। তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল, দাড়ি কেঁপে উঠল হালকা শ্বাসের সঙ্গে। হঠাৎ এতগুলো অচেনা লোক ঢুকে পড়ল, আবার তাদের একজন তো কোলে ছোট মেয়ে নিয়ে তোয়ালে পরে হাজির!
কাজি কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
—” এই এই, আপনারা এইভাবে ভিতরে ঢুকছেন কেন? কী করতে এসেছেন এখানে?”
আরমান তার আগুন ঝরা চোখ কাজির দিকে তাক করে উত্তর দিল,
——” বাসর করতে এসেছি এখানে। সামনে থেকে সরে দাঁড়ান। জায়গা লাগবে অনেক।”
আরমানের কণ্ঠে এতটা তেজ ছিল যে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কাজি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মাথায় হাত চাপড়াতে ইচ্ছে করছিল তার—আজকালকার ছেলেমেয়েদের কী হাল!
কাজি আঁতকে উঠে বললেন,
—” তাহলে বাড়িতে যান। এখানে এসব করা যাবে না।”
আরমান গর্জে উঠে বলে
—”বাড়িতে বউ নাই।”
এই কথায় কাজির বুক ধড়ফড় করে উঠল। তিনি কোনোরকমে সাহস সঞ্চয় করে বললেন,
—”তাহলে বিয়ে করে নিলেই তো হয়।”
কথাটা শেষ হতেই যেন মেঘগর্জনের মতো আওয়াজে টেবিলে আঘাত করল আরমান। ধপ করে গ্লাস-কলম সব কেঁপে উঠল।
—”তাহলে কী কাজি অফিসে বা*ল ফালানোর জন্য এসেছি , কাজির বাচ্চা?
কাজি পুরোপুরি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এই রকম উদ্ধত ভাষা তিনি কোনোদিন শোনেননি। তবু ভয়ে গলা শুকিয়ে আসলেও ধীরে ধীরে ইশারা করলেন বসতে।
—”বসুন… বসুন।”
কাজির অবস্থা দেখে রোহান, রাশেদ, জিনিয়া,জোহান,মিম,ফিহা মিটমিট করে হাসছে। কাজি অনেক ভয় পেয়েছে।
আরমান জোর করে জারাকে একটা কাঠের চেয়ারে বসিয়ে নিজেও পাশের চেয়ারটা টেনে নিল। তার চারপাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে বাকিরা—রোহান, জাহেদ, আর সবাই । কারও চোখে ভয়, কারও চোখে বিস্ময়। তারা জানে আরমান যা চায়, সেটা না হওয়া পর্যন্ত এই অফিসে শান্তি নামবে না।
আরমান কঠোর কণ্ঠে বলল,
—”বিয়ে তাড়াতাড়ি শুরু করুন। সময় নেই আমার।”
কাজির হাত কাঁপছে। ঘামে ভিজে যাচ্ছে কপাল। মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা বের হয়ে আসবে। এই ছেলেটা বিয়ে করতে এসেছে, আবার এভাবে! আর তার কোলে যে মেয়েটি, সে যে মোটেই রাজি নয়।আবার বয়স কম মনে হচ্ছে। এটা কাজির চোখ এড়ালো না।
জারা বারবার উঠে দাঁড়াতে চাইছে। তার চোখ কান্নায় ভরা, ঠোঁট কাঁপছে।
—” আমি… আমি বিয়ে করব না। আমাকে ছেড়ে দিন।”
সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আরমান শক্ত করে হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল।
—” চুপ করে বসো মানজারা! রাগিও না আমায়।”
জারা আবারও প্রতিরোধ করল। এবার আরমানের ধৈর্যের সীমা পেরিয়ে গেল। তার চোখ রক্ত লাল হয়ে উঠল। এক ঝটকায় হাত তুলেই জারার গালে ঠাস করে একটা চড় মারল। শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
চেয়ারে ধপ করে বসে গেল জারা। গাল লাল হয়ে উঠেছে, চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।গাড়িতে কী সুন্দর করে বলছে আর মারবে না। প্রমিজ করছে, এখন সব ভুলে গেছে। করব না আমি বিয়ে। মনে মনে কথা গুলো বলে জারা।
আরমান দাঁত চেপে বলল,
—” চুপ করে বসে থাক। কবুল বলে, তারপর যেখানে ইচ্ছে চলে যা। আটকাব না।”
ঘর নিস্তব্ধ। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ সাহস করে আর কিছু বলছে না। শুধু কাজি টলমল চোখে একবার জারার দিকে, একবার আরমানের দিকে তাকাচ্ছেন।
তার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশ্ন—এই বিয়ে কি তিনি করাবেন? না করলে কী হবে? করলে কী পাপ হবে?
জারা হঠাৎ কাঁপা গলায় বলল,
—”আমি কবুল বলব না। কিছুতেই না।”
জিনিয়া,মিম আর ফিহা জারা’র কাঁধের কাছে এসে দাঁড়ায়। জারাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। এটা জেদ করার সময় না।
কাজির বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। তিনি আস্তে আস্তে ঠোঁট নড়ালেন,
—”বাবা, জোর করে বিয়ে হয় না। মেয়ের সম্মতি লাগবে।আর মেয়ের বয়স কম। এটা বাল্যবিবাহ। ”
আরমান টেবিলে আবার জোরে আঘাত করল।
—”আপনার নিয়ম আমি জানি না। শুধু জানি আজকে বিয়ে হবে। আর কথা না, শুরু করেন।”
ঘরের বাতাসে যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।রাশেদ, রোহান আর জাহেদ পিছনে দাঁড়িয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল—এখন কি কিছু করা উচিত? কিন্তু কেউই সাহস পেল না সামনে আসতে।
কাজির হাত কাঁপতে কাঁপতে কলমটা খাতার ওপর ছুঁয়ে গেল। কাজি অফিসে তখনো থমথমে পরিবেশ। আরমান যেন আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছে চারপাশে। এক হাতে জারার কব্জি শক্ত করে ধরা, অন্য হাতে টেবিলে বারবার চাপড় মারছে। কাজির বুকের ভেতর ঢিমে তালে ধপধপ করছে। এত বছরের চাকরিজীবনে নানান কাণ্ড দেখেছেন তিনি, কিন্তু আজকের মতো অবস্থা আর কোনোদিন হয়নি।
তিনি কাঁপা কণ্ঠে গলা পরিষ্কার করে বললেন—
—” আচ্ছা… বিয়ে শুরু করি। দেনমোহর কতো লিখব?”
ঘরে এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সবাই তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে। সে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে চুপ করে থাকল। তারপর হঠাৎই ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলল—
—” আমার গুণধর বেস্ট ফ্রেন্ড, গাধার মতো একটা ভাই আর ছাগলের মতো এক এসিস্ট্যান্ট… এই তিনজনের তিন জোড়া কিডনি দেনমোহর হিসেবে দিচ্ছি।”
কথাটা শুনেই সবার চোখ কপালে উঠল।
রোহান চমকে উঠে বলল—
—”কি! আমাদের কিডনি? আরে পাগল নাকি তুই?”
রাশেদ ভয়ে হেসে ফেলল—
—” স্যার, মজা করছেন তাই না ? দেনমোহর আর কিডনি এক জিনিস নাকি?”
জাহেদ তো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল—
—” হায় আল্লাহ, আমার কপালই খারাপ। আমার কিডনি দিয়ে যদি তুমি বিয়ে করো। তাহলে আমি কবে বিয়ে করব?”
তাদের রিয়েকশনে ঘর জুড়ে অস্বস্তির হাসাহাসি শুরু হলো। এই তিন ছেলের অবস্থা দেখে জিনিয়ারা মুখ টিপে হাসছে।কিন্তু আরমানের মুখে কোনো হাসি নেই। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে রাগে আর একগুঁয়েমিতে। সে সোজা দাঁড়িয়ে গর্জে উঠল—
—” চুপ! তোদের মুখে কোনো কথা শুনব না। আমি যা বলেছি, তাই হবে। বউও ছাড়ব না, তোদের কিডনিও দেব না।”
রোহান, রাশেদ আর জাহেদ হতবাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। মনে হচ্ছিল, যেন কেউ তাদের বুকে পাথর চাপিয়ে দিয়েছে।
এবার কাজির মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে তিনি আরমানের দিকে তাকালেন।
—”এইভাবে হয় না বাবা। দেনমোহর নগত দিতে হয়। সম্পদ, টাকা—এসব লিখতে হয়। মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লিখে বিয়ে হয় না।”
আরমান টেবিলে আবার ঠাস করে আঘাত করল।
—”তাহলে নগত দেনমোহর হিসেবে আমার নাম লিখুন। যখন যেমনভাবে ব্যবহার করবেন, আমার কোনো আপত্তি নেই।”
কথাটা শুনে সবার চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। যেন কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। রোহান কপাল চাপড়াল, রাশেদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, আর জাহেদ বিড়বিড় করে বলল—
—”এ কেমন পাগলু ছেলের কাছে আমরা দাঁড়িয়ে আছি! এটা কি সত্যি আমার ভাই? ”
কাজি চেয়ারে হেলান দিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লেন। মনে হলো বুকের ভেতরটা ভারে ভরে গেছে।
—”বাবা, এমন কথা বলেন না। দেনমোহর একটা পবিত্র ব্যাপার। মজা করার বিষয় নয়।”
কিন্তু আরমান তার কথার ধার ধারল না। গম্ভীর গলায় বলল—
—”যা বলেছি তাই লিখুন। সময় নষ্ট করবেন না।”
বাইরে থেকে হালকা বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সেই শব্দের মাঝেই কাজি থমথমে পরিবেশে খাতার পাতা উল্টাচ্ছিলেন।
শেষমেশ বিয়ের আসল মুহূর্ত এসে গেল—কবুল বলার সময়। কাজি সবার সামনে বসে বিরক্তি নিয়ে গম্ভীরও ধমক দেওয়া কণ্ঠে জারাকে উদ্দেশ করে বললেন
—”বেটি, তুমি কি কবুল করছো?”
কাজি জারাকে এই ভাবে এই ভাবে বলায় যেনো আরমানের রাগ সাত আসমান ছুঁয়েছে।
__” এই কাজির বাচ্চা ধমকাচ্ছিস কাকে?আমার বউয়ের সাথে এই ভাবে কথা বললে গলা ফেলে দেব.!”
কাজি ভয়ে পেয়ে যায়। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কি একটা মুসিবতে পরলে।
__” আচ্ছা.. আচ্ছা সুন্দর করে বলছি!”
কাজি জারা’র দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে নরম সুরে বলেন
__” মা তুমি কী এই বিয়ে কবুল করছো?”
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। জারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর দাড়িয়েবএক ঝটকায় মাথা তুলে বলল—
—” না। আমি কবুল বলব না। আমি লাল বেনারসি শাড়ি না পরে বিয়ে করব না।”
ঘরের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
রোহান চোখ বড় বড় করে বলল—
—”এই মেয়ে তো আসলেই শেষ। এই অবস্থায়ও শাড়ির কথা ভাবছে!এক থাপ্পড় খেয়েও শিক্ষা হয়নি নাকি? ”
রাশেদ ফিসফিস করে বলল—
—” স্যার, নাটক আসলে এখানেই জমেছে।
জাহেদ মাথা দোলাতে দোলাতে বিড়বিড় করল—
—”এটা সিনেমার দৃশ্য না বাস্তব, বুঝতে পারছি না।”
কাজি তো পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর হাতে ধরা কলমটা কাঁপতে কাঁপতে টেবিলের ওপর ঠক ঠক শব্দ করছে।
আরমানের চোখে রাগের আগুন আরও বেড়ে গেল। সে এক ঝটকায় জারার হাত ধরে বসিয়ে দিল চেয়ারে। দাঁত চেপে গর্জে উঠল—
—”কবুল বল,হাফ ইঞ্চির বাচ্চা? নইলে এখানেই অগ্নিকাণ্ড ঘটবে।”
কাজি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর মনে হচ্ছিল—আজকের এই রাতটা যেন শতাব্দীর দীর্ঘতম রাত।
জারা আবারও দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
—”আমি লাল বেনারসি শাড়ি না পরে বিয়ে করব না।এটা আমার শখ!”
ঘরে যেন মুহূর্তের জন্য আবারও ঝড় বয়ে গেল। সবাই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে।
রোহানদের সবার এখন গলায় দরি দিতে ইচ্ছে করছে। এখানে বিয়ে করতে এসেছে নাকি যুদ্ধ করতে আল্লাহ মালুম?
আরমানের চোখে রাগের আগুন দিগুণ হয়ে জ্বলতে শুরু করল। দাঁত চেপে হঠাৎই সে গর্জে উঠল—
—”লাল শাড়ি লাগবে? আমি তো তোয়ালের নিচে লাল জাইঙ্গা পরে আছি! এটা খুলে দেই, মাথায় দিয়ে কবুল বলে দাও।”
কথাটা শুনে জারা হকচকিয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল আরমানের দিকে। মনে মনে সে ভাবল—”এটার থেকে তো ভালো কবুল বলে দেওয়া।”
ঘরের ভেতর সবাই যেন অবিশ্বাসে জমে গেল।
রোহান দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে বলল—
—”হায় খোদা, এই পাগলটা তো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে!”
রাশেদ থতমত খেয়ে বিড়বিড় করল—
—”এটা যদি বিয়ের শর্ত হয় তাহলে আমি জন্মেও বিয়ে করব না।”
জাহেদ তো সরাসরি চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল।
—”ভাই, আমি শিউর এখনই পাবনায় ফোন করা উচিত। কিন্তু কে করবে?”
কাজি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এত বছরের অভিজ্ঞতায় এমন অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য কথা তিনি কখনও শোনেননি। কপাল বেয়ে ঘাম নেমে এলো, ঠোঁট কাঁপতে লাগল। মনে হচ্ছিল—তার বুকের ভেতর থেকে শব্দ বের হবে না আর।
তবুও পরিস্থিতি বাঁচানোর জন্য তিনি কাঁপা কণ্ঠে বললেন—
—”আ… আচ্ছা বাবা তুমি থামো। তোমায় জাইঙ্গা খুলতে হবে না। মা আপনি কবুল বলুন।”
জারা কাঁপা ঠোঁটে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখে জল ভরে উঠেছে। অবশেষে সে আস্তে করে বলল—
—” ক..কবুল।
কবুল তিনবার বলতে হয় মা।
__” কবুল. কবুল..কবুল।
কাজি দ্রুত আরমানের দিকে ফিরলেন।
—” আপনি?”
আরমান বুক ফুলিয়ে গর্জে উঠল—
—” আমার জীবনের প্রতিটা সেকেন্ডে ওকে কবুল করলাম। ”
ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সবাই হতভম্ব। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই বিয়ে হয়ে গেল।
সবাই একসাথে আলহামদুলিল্লাহ বলে।
কাজি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত উঠিয়ে দোয়া শুরু করলেন। তার কণ্ঠে ভর করেছে অবসন্নতা আর অসহায়ত্ব। দোয়া শেষ হতেই আরমান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
সে কাজির সামনে দাঁড়িয়ে গভীর ভঙ্গিতে একটা লম্বা সালাম দিল।
—”ধন্যবাদ কাজি সাহেব।”
কাজি মনে মনে দোয়া করলেন ” আল্লাহ দ্বিতীয় বার যেন আর না আসে?আমিন!”
তারপর কোনো ভূমিকা ছাড়াই জারাকে আবার কোলে তুলে নিল। জারা ভয়ে-লজ্জায় কুঁকড়ে আরমানের বুকে মিশে আছে। লজ্জা লাগলেও কোনো কথা বলল না।
আরমান সবার সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল দরজার দিকে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রোহান, রাশেদ, জাহেদ আর বাকি সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। তাদের চোখে একই প্রশ্ন—এখন সামনে কী হতে যাচ্ছে?
কাজি চেয়ারে বসে নিঃশ্বাস ফেললেন। মনে হলো তার বয়স যেন এক রাতেই দশ বছর বেড়ে গেল।
রাত আটটা বেজে গেছে। রহিমরা এখনো আসছে না দেখে মারজিয়া বেগম এর বুক থেকে পাথর নেমে গেছে। তারপর ও ভয় মন থেকে পুরপুরি যায় নি। রাত পার না হওয়া অব্দি কিছু বলা যাবে না।
মারজিয়া বেগম জোহানের মাথায় হাত ভুলিয়ে দিচ্ছে আর মনে মনে একটা কথা ভাবছে ” আজ যদি স্বামী, বড় ছেলে টা দেশে থাকতো তাহলে এতো বিপদ হতো না। দিন ফুরায় না প্রিয় স্বামী আর নাড়ি ছেড়া দন দেশেও আসে না। নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে মারজিয়া বেগম এর।
আরমান জারাকে নিয়ে কাজি অফিস থেকে বের হয়ে সোজা গাড়ির কাছে আসে। জারাকে খুব যত্ন করে গাড়িতে বসিয়ে দেয় সে।
তাদের পেছন পেছন রোহানরা চলে আসে। আরমান তখন শান্ত স্বরে বলে
___“আশেপাশে যদি ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট থাকে, সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা কর রোহান। রাত আটটা বাজে, এতো দৌড়াদৌড়ির পর নিশ্চয়ই সবার খিদে পেয়েছে।”
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪১
আরমানের কথামতো রোহান, জাহেদ আর রাশেদ তিনজন রেস্টুরেন্ট খুঁজতে বের হয়। কিন্তু জায়গাটা তাদের অচেনা, তাই কোথায় কী আছে বুঝতে পারছিল না। ঠিক সেই সময় হঠাৎ আরমান পেছন থেকে রাশেদকে ডাক দেয়।
__” রাশেদ ”
