Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪২ (২)

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪২ (২)

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪২ (২)
সোহানা ইসলাম

_” রাশেদ ”
ডাক শুনেই রাশেদের বুক ধক করে ওঠে। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে তার— স্যার কেন ডাকছেন হঠাৎ?ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে।
হঠাৎ করেই আরমান তার গালে এক ঝটকা ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়।
জিনিয়া, মিম আর ফিহা হকচকিয়ে উঠে চমকে যায়।মিমের বুক কেঁপে ওঠে—রাশেদকে এভাবে মারতে দেখে ভীষণ খারাপ লাগে তার।
রাশেদ হতভম্ব হয়ে গালে হাত দিয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে আরমানের দিকে।
আরমান গর্জে উঠে বলে

___“তুই বাইক নিয়ে আসছিস কেন? গ্যারেজে কি গাড়ির অভাব ছিল? রাস্তায় যদি কোনো দুর্ঘটনা হয়ে যেতো, তখন আমি কী জবাব দিতাম তোর মা-বাবাকে?”
রাশেদের চোখ ছলছল করে ওঠে। তার বুকটা হাহাকার করে ওঠে—কারণ তার তো আর মা-বাবা কেউ নেই। কয়েক বছর আগে দুর্ঘটনায় তারা মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে রাশেদের বাবা, যিনি আরমানদের কোম্পানিতে কাজ করতেন, আরমানের বাবার হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন— “আমার ছেলেটাকে দেখে রাখবেন।”
সেই থেকে আরিফ খান রাশেদকে নিজের সন্তানের মতোই লালনপালন করেন। পড়াশোনা শেষ হলে আরমান নিজেই রাশেদকে তার পার্সোনাল সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেন।
রাশেদ মাথা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলে—

__“আর এমন হবে না স্যার।”
কথা বলে চুপচাপ সরে দাঁড়ায়।
__” মনে থাকে যেনো। এই গাড়িতে যদি না হয় তাহলে আরও গাড়ি কিনে দিব। তারপরও তুই বাইকের আশেপাশে যাবি না। ”
রাশেদ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়।
আরমান তখন রোহান আর জাহেদকে ইশারায় বলে— “যা, খাবারের ব্যবস্থা কর। আর জারার জন্য একটা পার্সেল আনবি। ”
কারণ জিনিয়ারা ওদের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর আরমান জারাকে একা কিছুতেই ছাড়বে না।
রোহান, জাহেদ কোনো কথা না বলে জিনিয়া আর ফিহা কে সাথে নিয়ে চলে যায়। মিমকে যেতে বললে সে মানা করে দেয়।
আরমান গিয়ে গাড়িতে বসে পড়ে।
দূরে রাশেদ শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখে ভেতরের কষ্ট কেউ টের পায় না।
মিম গুটিসুটি পায়ে রাশেদের পাশে এসে দাঁড়ায়। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে

— “আরমান ভাইয়া আপনাকে কেন মারলেন?”
রাশেদ মৃদু হেসে উত্তর দেয়—
__“ যারা শাসন করে , তারাই আসলে সত্যি কারের ভালোবাসে।”
রাশেদের চোখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু ঠোঁটে এক চাপা হাসি। মিম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। মনে হয়, যেন কথা আটকে গেছে গলায়।দৃঢ়তর সঙ্গে রাশেদ বলে
__” আমি অনাথ। আমার বাবা আরমান স্যারদের কোম্পানিতে কাজ করতে। একটা ভয়ংকর দূর্ঘটনায় আমার বাবা মা দুইজনই মারা যান। তারপর থেকে আমার সব কিছুর দায়িত্ব আরমান স্যার এর বাবা নেয়। আরমান স্যার আমাকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখেন। এই যে বাইক নিয়ে এসেছি যদি রাস্তায় কিছু হয়ে যেত এই ভয়ে শাসন করছে। এটা ভালোবাসা। আমার জীবনে বাবা মা না থাকলেও ভালোবাসার অভাব নেই। কেউ আমাকে অনাথ বলার সাহস পায় আরমান স্যার জন্য। ”

__” তাই বলে এই ভাবে মারবে? ” বলল মিম।
কথাটা বলে মাথা নিচু করে ফেলে সে।
রাশেদ প্রথমে চুপ করে থাকে, তারপর নরম গলায় বলে
— “স্যার আমার ওপর যতই রাগ দেখাক, জানি সেটা আমার ভালো চাওয়ার জন্যই।”
মিমের বুকটা হঠাৎ টনটন করে ওঠে। রাশেদের কথা শুনে তার চোখে জল চলে আসে।সে আস্তে করে বলে
___ “তবুও… কাউকে চড় খেতে দেখলে ভালো লাগে না।”
রাশেদ হেসে মিমের দিকে তাকায়। চোখের ভেতর সেই শিশুসুলভ নিষ্পাপ মায়া তার।
__” মেরেছে আমায় আর কষ্ট পাচ্ছো তুমি? কী ব্যাপার? ”
মিম আর কিছু বলতে পারে না। শুধু চুপচাপ মাথা নাড়ে।
___ “কি কিছু না। ”
রাশেদ মিমের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে এই মেয়ে টা তার কতোদিনের চেনা। তার মাথায় একটা মানুষের নাম বার বার ঘুরছে। না দেখা ভালোবাসার মানুষেমানুষের নাম। তার নাম তো আফছানা মিম ছিলো। ওর কেন যেন মনে হয় এই মেয়েটাই সেই মেয়ে যাকে সে ভালোবাসে।কিন্তু ওর নাম তো শুধু মিম।
__” আচ্ছা তোমার নাম কী আহলেই মিম? নাকি অন্য কিছু? ”
রাশের এমন উদভ্রান্ত কথা শুনে মিমের হাসি পাচ্ছে। ওর নাম মিম না হলে কী। ওকে কী অন্য কারো নাম ধরে ডাকবে সবাই?

__” না আমার নাম না! অন্য কারো নাম আমি চুরি করে এনেছি। ”
মিমের কথায় রাশেদ হেসে ফেলে। মাথা চুলকে বলে __” আরে তা না। আমি বলতে চাচ্ছি তোমার নামের আগে পরে আর কোনো নাম নেই? ”
রাশেদের কথা শুনে বুক ধক করে উঠে মিম এর।
__” হ্যাঁ আছে। আফছানা মিম। ”
নাম টা শুনার সাথে সাথে চমকে উঠে রাশেদ। নামের এতো মিল? রাশেদ মিমের দিকে তাকিয়ে থাকে। মিম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

গাড়ি রাস্তার এক কোণে স্থির হয়ে দাঁড়াল। বাইরে চারপাশ শান্ত, রাতের নিস্তব্ধতা যেন গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে। হেডলাইট নিভিয়ে দিয়েছে আরমান, কেবল ভিতরের হালকা আলো জ্বলছে। কিন্তু সেই আলোও যেন অকারণ অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলছে।
গাড়ির ভেতরে দু’জন মানুষ—আরমান আর মানজারা। অথচ কেউ কথা বলছে না। বিয়ের মতো এত বড় একটা ঘটনাই ঘটল আজ, কিন্তু সেই বিয়ের পর প্রথম মুহূর্তগুলো কাটছে অস্বস্তি আর নীরবতায়।
আরমান কেবল জারার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু জারা মুখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে চেয়ে আছে। যেন তাকে স্পর্শ করছে না কোনো অনুভূতি, কোনো সম্পর্কের টান।
অসহ্য হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আরমান। ধীরে হাত বাড়িয়ে জারার হাত ধরল। সে চাইল, আজ প্রথমবারের মতো বউয়ের হাতটা নিজের হাতে আঁকড়ে ধরতে।সব মানঅভিমান ভেঙে ফেলতে। হয়তো এই মুহূর্তেই ভাঙবে দূরত্ব, হয়তো একটা হাসি ফিরবে জারার ঠোঁটে।
কিন্তু ঠিক তার উল্টো হলো।
আরমানের হাত ছুঁতেই জারা হাত সরিয়ে নিল। এক ঝটকায় নিজেকে গুটিয়ে নিল সিটের কোণায়। যেন শরীরের প্রতিটি অংশ দিয়ে জানিয়ে দিল—সে চাইছে না এই স্পর্শ, চাইছে না এই সম্পর্কের বাঁধন।
মুহূর্তেই আরমানের বুক ফেটে গেল। মনে হলো ভেতরটা কেউ চেপে ধরেছে। একরাশ হতাশা জমে উঠল তার চোখে। গলায় কষ্ট জমে গর্জে উঠল কণ্ঠস্বর,

—“আমি তো এখন তোমার স্বামী, মানজারা। আমার ছোঁয়া এখনও তোমার খারাপ গালে।”
কথাগুলো শোনামাত্রই জারার বুক ভেঙে কান্না বেরিয়ে এলো। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। গাড়ির ভেতরের নীরবতা হঠাৎ কান্নার স্রোতে ভেঙে গেল।
জারাকে কাঁদতে দেখে আরমানের ভেতরেও অশ্রু জমে উঠল। মনে হলো—এই বিয়ে হয়তো জারা একেবারেই চায়নি। হয়তো সে সত্যিই ভুল করেছে জোর করে বিয়ে করে। চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল তারও।
বুক চেপে কষ্ট নিয়ে আরমান বলল,

—“আচ্ছা, আমি তোমায় আর ছোব না। যদি এই বিয়ে তুমি মন থেকে না মানো, তবে স্বামীর অধিকার ফলাতে আসব না কোনোদিন। আমি তোমার পাশে থেকেও দূরেই থাকব।”
এই বলে সে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে নামতে উদ্যত হলো আরমান।
কিন্তু তখনই ঘটল অপ্রত্যাশিত কিছু।
কান্নার ফাঁকেই জারা হঠাৎ তার হাত চেপে ধরল। আঁকড়ে ধরল এমনভাবে, যেন ছাড়লেই সবকিছু ভেঙে যাবে। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই টেনে আরমানকে আবার গাড়ির ভেতর বসিয়ে দিল।
মুহূর্তেই আরমানের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে দিল জারা । কান্নার ঝাঁকুনিতে কাঁপছে পুরো শরীর।
আরমান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। এ যেন একেবারেই ভিন্ন এক জারা।
জারা আরমানের বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে অভিমান জানাচ্ছে নীরব ভাষায়। তার হাতের কিল, বুকের ওপর ছোট ছোট ঘুষি যেন অভিযোগের স্রোত—“আপনি আমাকে বোঝেননি, আমাকে কষ্ট দিয়েছেন। না বলে চলে গিয়েছিলেন। আজ যদি ওই লোকটার সাথে বিয়ে হয়ে যেতো আমার?”
কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু কান্নার দমকে ভেসে যাচ্ছে গাড়ির ভেতর।
আরমান বুঝতে পারল,এটা ঘৃণা নয়। এটা ভালোবাসার অভিমান।
আরমান দু’হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জারাকে। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে সে। গলার ভেতর নরম স্বরে ফিসফিস করে বলল,

—“আমার ছোঁয়া কি তোমার কাছে খারাপ লাগে?”
জারা কোনো শব্দ করল না। শুধু মাথা এপাশ-ওপাশ করে না বোঝাল।
আরমানের বুক ভরে গেল শান্তিতে। যেন ঝড় থেমে গিয়ে হাওয়া ছুঁয়ে দিল কোমল ভোরের মতো।
আরমান আবার সে জিজ্ঞেস করে,
—“এই বিয়ে মানতে অসুবিধা নেই তো তোমার?”
জারা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
আরমান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্বস্তির। ফিসফিস করে বলল,
—“খুব ভালোবাসি লক্ষী বউ আমার। তুমি আমার পৃথিবী হয়ে থেকে যাও সারাজীবন।”
গাড়ি তখনও এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে। বাইরে রাতের নীরবতা, ভেতরে দু’জনের কান্না আর মিলনের স্রোত। অভিমান ভেঙে ভালোবাসা নতুন করে জন্ম নিল।

চারপাশের অন্ধকারে কেবল গাড়ির ভেতরের আলোটা মৃদু নরম আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। গাড়িটা রাস্তার এক কোণে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে আছে আরমান আর জারা—দু’জন মানুষ, দু’টি হৃদয়, কিন্তু একটাই সম্পর্কের বাঁধন।
কিছুক্ষণ আগেই কান্না আর অভিমান ভেঙে তারা একে অপরের কাছে এসেছে। জারা তখনও আরমানের বুকে মাথা গুঁজে আছে। বুকের ভেতরের দমক থামলেও চোখের কোণে ভেজা অশ্রু রয়ে গেছে। আরমান জারার কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই দূরে থেকে আরেকটা গাড়ি এসে থামল।
ওটা রোহানের। রোহান কিছুক্ষণ আগেই রাশেদকে কল করে বলেছিল মিমকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যেতে। তারা সবাই মিলে এক সাথে খেয়ে, আরমান আর জারার জন্য খাবার প্যাক করে নিয়ে এসেছে। গাড়ি থেকে নেমে রোহান হেঁটে এগিয়ে এল আরমানের গাড়ির দিকে।
কাছে আসতেই ওর চোখে পড়ল ভেতরের দৃশ্য।
জারা মুখ গুঁজে আছে আরমানের বুকে। আরমানের হাত আলতো করে রাখা তার মাথার ওপর। বাইরে রাতের অন্ধকার, ভেতরে যেন এক টুকরো আলো। এই দৃশ্যটা দেখে রোহানের বুক ভরে গেল অদ্ভুত এক অনুভূতিতে।

—“কী সুন্দর,” মনে মনে বলল রোহান।
পৃথিবীতে ভালোবাসা আসলে এভাবেই প্রকাশ পায়—একজন প্রিয় মানুষ অন্যজনের বুকে আশ্রয় নেয়।
একচিলতে হাসি দিয়ে রোহান চুপচাপ ফিরে এল খাবার টা দিয়ে । আরেকবার চোখ তুলে তাকাল জিনিয়ার দিকে। মনে মনে বলল—“যদি জিনিয়া আমার ভালোবাসা একবার গ্রহণ করত, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনেও এমন একটা মুহূর্ত আসত।”
গাড়ি যখন আবার যাত্রা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আরমান নরম হাতে জারার মাথা বুক থেকে সরিয়ে দিল। আলতো করে তার চোখের পানি মুছে দিল নিজের হাতের আঙুল দিয়ে। তারপর ভালোবাসার ছোঁয়ায় কপালে একটি চুমু এঁকে দিল।
আরমান নরম গলায় বলে,
—“খেয়ে নাও সোনা। সারাদিন অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছো। নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।”
জারা তার চোখের জলভেজা দৃষ্টি তুলে তাকাল আরমানের দিকে। সেই টলমল চোখ যেন কিছু বলতে চাইছে—“ খুব ভালোবাসি আপনাকে ।”
আরমান আবার তাকে বুকে জড়িয়ে নিল।
—“কান্না করো না, জান। তুমি কান্না করলে আমার বুকটা পুরে যায়। কেমন কষ্ট হয় জানো?এই পৃথিবীতে নিশ্বাস নেওয়াও কঠিন মনে হয়। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে, মানজারা।”
জারা কৌতূহলী চোখে তাকাল।

—“কি সারপ্রাইজ?”
আরমান মুচকি হেসে বলল,
—“আগে খাবারটা খাও। তারপর বলব।”
জারা কিছু না বলে শান্তভাবে মাথা নেড়ে রাজি হলো।
আরমান খাবারের প্যাকেট খুলে সুন্দর করে সাজাল। তারপর নিজ হাতে ভাত, মাংস, সবজি মিশিয়ে ছোট ছোট লোকমা বানিয়ে জারার মুখে তুলে দিতে লাগল।
জারা হেসে বলল,
—“আমি নিজেই খেতে পারি।”
আরমান চোখ টিপে বলল,
—“না, আজ তুমি আমার ছোট্ট লক্ষি বউ এর মতো থাকবে। আমিই খাইয়ে দিব তোমায় ।”
জারাও আর বাধা দিল না। মাথা নিচু করে লজ্জায় খেতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর জারা খেয়াল করল—আরমান নিজে কিছুই খাচ্ছে না। শুধু তাকেই খাইয়ে দিচ্ছে।
জারা কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
—“আ… আপনি খাবেন না?”
আরমান মুচকি হেসে তার দিকে তাকাল।
—“আজ সারাদিন কিছু খাইনি। যদি তুমি খাইয়ে দাও, তবে খেতে পারি।”
জারার বুক হু হু করে উঠল। কেমন যেন খারাপ লাগল ভেতরে। কিছু বলতে পারল না। মাথা নিচু করে বসে রইল।
আরমান মজা করে বলল,

—“আচ্ছা, খাইয়ে দিতে হবে না। তুমি খাচ্ছো এটাই আমার কাছে যথেষ্ট।”
এই কথা শুনে জারা হঠাৎ বিরক্ত মুখ করে ফট করে প্যাকেটটা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। তারপর ভাতের লোকমা বানিয়ে আরমানের মুখের সামনে ধরে বলল,
—“খেয়ে নিন।”
আরমান কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল জারার চোখের দিকে। সেই চোখে অভিমান, ভালোবাসা, মায়া—সব একসাথে মিশে আছে।
—“তুমি খাওয়াচ্ছো? তবে তো আমার ভাগ্য খুলে গেল বউ।কিন্তু বউ তোমার এই ছোট হাতে খাবার খেতে খেতে রাত পার হয়ে যাবে। ,” মুচকি হেসে বলল আরমান।
মুখে খাবার নিল, কিন্তু চোখ সরাল না জারার দিক থেকে।
জারা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে তাকে খাওয়াতে লাগল। দু’জনের মধ্যে যেন এক নীরব খুনসুটি শুরু হলো।
কখনো আরমান দুষ্টুমি করে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, আবার জারা রাগ করে মুখে গুঁজে দেয় খাবার। কখনো জারা কপট রাগ দেখায়, আবার আরমান হাসিমুখে তার হাত ধরে রাখে।
খাওয়া শেষ হলে দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। যেন সমস্ত অভিমান, কান্না, দুঃখ মুছে গিয়ে জায়গা করে নিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
গাড়ির ভেতরটা এবার ভরে গেল এক ধরনের শান্ত আলোয়।
আরমান গাড়ি স্টার্ট দিল। ধীরে ধীরে গাড়ি গড়িয়ে রওনা হলো ইসলামপুর গ্রামের পথে।আরমানের গাড়ির পিছন পিছন রোহান রাও রওনা হয়। বাইরে রাতের আকাশ, অসংখ্য তারা। ভেতরে দু’জন মানুষ, যারা বুঝে গেছে—ভালোবাসা মানে অভিমান ভাঙা, একে অপরকে আগলে রাখা।
আরমানের হাতে তখনও জারার হাত ধরা। আর জারার ঠোঁটে ছোট্ট একরাশ হাসি, যা বলে দিচ্ছে—তার সারপ্রাইজ আসলে এই সম্পর্কই, এই ভালোবাসাই।

আরমান গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা ঢুকে গেল তার নতুন ফ্যাক্টরির ভিতরে। মাত্র ২১ দিনের মধ্যে জায়গাটা চেনার উপায় নেই—চারদিকে উঁচু প্রাচীর, বিশাল গেট, আর নিরাপত্তার কড়া বেষ্টনী। বাইরে থেকে কেউ আন্দাজই করতে পারবে না ভিতরে কি ঘটছে।
গাড়ি থামতেই জারাকে সঙ্গে নিয়ে আরমান ভেতরে পা রাখে। কিছুটা দূরেই গাড়ি থামিয়ে রোহান আর বাকিরাও আসে পিছু পিছু।
ভিতরে ঢুকেই সবাই যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখগুলো বিস্ফারিত—
রহিম আর তার লোকজন শক্ত করে দড়ি দিয়ে চেয়ারে বাঁধা, মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। আর তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে আরমানের গার্ডরা—মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাকে ঢাকা, চোখে ঠাণ্ডা দৃষ্টি। বাতাসে যেন একটা অদৃশ্য চাপা উত্তেজনা ঘনীভূত হয়ে আছে।
আরমান গার্ডদের ইশারা করতেই তারা এগিয়ে এসে সবাইকে ভদ্রভাবে চেয়ার টেনে বসায়। বিশাল হলঘরে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে পড়ে আরমান, পাশে জারা। রোহান, জাহেদ, রাশেদ, মিম, জিনিয়া, ফিহা—সবাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। রহিম এখানে কীভাবে, কেনইবা বাঁধা অবস্থায়—কারও বোধগম্য হচ্ছে না।
জারা চোখ ফেরায় আরমানের দিকে। আরমান মুচকি হেসে বলে,

— “একটু ধৈর্য ধরো, লক্ষী বউ। সামনে যা দেখবে, সেটা হবে লাইভ সিনেমা।”
তারপরই গার্ডরা অন্ধকার ঘরের একপাশে কাজ শুরু করে। নিবু নিবু আলো হঠাৎ মিলিয়ে যায়, মুহূর্তেই চারদিক ঝলমল করে ওঠে তীব্র ফ্লাডলাইটে। সারি সারি ক্যামেরা, বড় বড় সাউন্ড বক্স, রেকর্ডিং সেট—মনে হচ্ছে যেন কোনো বিশাল শুটিং চলছে।
আরমান তুড়ি বাজিয়ে বলে ওঠে—
— “স্টার্ট!”
এক মুহূর্তেই কড়া স্পটলাইট গিয়ে পড়ে রহিম আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের মুখে। ভয় আর ঘাম মিশে গেছে তাদের চোখেমুখে। সাউন্ড সিস্টেমে গম্ভীর সংগীত বেজে ওঠে, যেন আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
ঘরে নিস্তব্ধতা। শুধু ক্যামেরার লাল লাইট ঝিকিমিকি করছে।সাউন্ড বক্সে হঠাৎ করে গর্জে ওঠে হিন্দি গান “নাচ মেরি রানি…”। পুরো ফ্যাক্টরি যেন কেঁপে ওঠে সুরে। আরমান হাত তুলে ইশারা করতেই গার্ডরা রহিম আর তার লোকজনকে দাঁড় করিয়ে দেয়।
বাঁধা অবস্থা থেকে তাদের ছাড়িয়ে গা থেকে সব কাপড় খুলে ফেলে গার্ডরা।তাদের পরনে শুধু সর্ট পেন্ট ছাড়া আর কিছু নেই। গার্ডরা তাদের জোর করে নাচানো শুরু করে— আর গার্ডরাও হাত-পা টেনে টেনে তালে তালে নাড়ায়। ভয় আর অপমান মিশে যায় রহিমের চোখে, তবুও গান থামা পর্যন্ত তাদেরকে নাচতে হবে।এটা আরমানের হুকুম।

জারা এই দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। সে মুখ ফিরিয়ে আরমানের বুকে মাথা গুঁজে ফেলে। মিম, জিনিয়া, ফিহা—তিনজনই নিজেদের ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে লজ্জায় ও অস্বস্তিতে।
আরমান পেছনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করছে। তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি—যেন প্রতিশোধের আগুনে সে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে।রোহান, রাশেদ, জাহেদ হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু রহিমের এই অবস্থা দেখে তাদের মনে শান্তি লাগছে। তারাও একটু পর পর শীশ বাজাচ্ছে আর এনজয় করছে বিষয় টা।
আরমান চেয়ার থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সংগীত এখনও গর্জে চলেছে। সে রহিমের সামনে গিয়ে থেমে দাঁড়ায়। চোখ রক্তবর্ণ, কণ্ঠে গর্জন—
— “তুই ভেবেছিলি জোর করে আমার মানজারাকে বিয়ে করবি? আমার স্ত্রীকে?”
রহিম কাঁপতে থাকে। তার শরীর থেকে ঘাম ঝরছে, মুখে অসহায় ভয়ের ছাপ।কিন্তু কিছু বলতে পারলো না সে।
আরমান আরও এক কদম এগিয়ে এসে বলে—

— “আজ তুই নাচবি,সারা রাত নাচবি। আর এই পনেরো টা ক্যামেরায় তা রেকর্ড করা হবে।মুখ থেকে একটা কথা বের হবে আর ভিডিও বাইলা।অপরাধ তুই যাই করিস না কেন, ভিডিওর কেপশনে থাকবে ধর্ষণ করে গিয়ে হাতে নাতে ধরা খায় চেয়ারম্যান এর ছেলে। ”
আরমান এটুকু বলে থামে। পিছন ঘুরে জারার দিকে একবার তাকায়।
___” এটা তোর লালসার জন্য শাস্তি। তুই ভেবেছিলি আমার জারাকে, ভয় দেখিয়ে কবুল বলাবি! এখন দেখ, কীভাবে তুই সবার সামনে অপদস্থ হচ্ছিস।এই ফুটেজ গুলো সোশাল মিডিয়াতে ছাড়া হবে ।”
ক্যামেরাগুলো লাল আলোয় ঝিকিমিকি করছে, প্রতিটা মুহূর্ত রেকর্ড হচ্ছে। আর রিহম ও তার লোকেরা গানের তালে নাচ করছে। থামার জন্য কোনো সুযোগ দিচ্ছে না।
জারা চোখ তুলে কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে
— “শু … শুনুন “”
আরমান জারার দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে আশ্বস্ত করে বলে
— “ভয় পেয়ো না, লক্ষ্মী বউ। তোমার চোখের জল, তোমার লজ্জার আর আমার একমাএ শালাবাবুর গায়ে হাত তুলার শাস্তি আজ পাচ্ছে ওরা।”

___”আমার যাওয়ার পর ওদের গায়ে যা কাপড় আছে তাও খুলে ফেলবে। নাচা বন্ধ করলে পাছা লাল করে দিবে সব কয়টার। ” বলল আরমান
আরমান জারাকে নিয়ে ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে আসে। রোহানরাও সাথে সাথেই চলে আসে। রাত তখন এগারোটা, চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু হালকা বাতাসে গাছের পাতা দুলছে।
আরমান আর জারার পিছন পিছন দৌড়াতে দৌড়াতে তাদের জীবন যেন শেষ সীমানায় এসে ঠেকেছে। অবশেষে মাঠের বাড়িটায় পৌঁছে যায় সবাই। আরমান সরাসরি জারাকে নিজের রুমে নিয়ে বসায়। সারাদিন এক টুকরো তোয়ালে জড়িয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে সে, এখন তারও ফ্রেশ হওয়া দরকার। তাই আরমান বাথরুমে চলে যায় শাওয়ার নেওয়ার জন্য।
কিছুক্ষণ পর ভিজে চুলে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে জিনিয়ার রুমে যায় সে। জিনিয়ার রুমে তখন জিনিয়া, মিম আর ফিহা তিনজনেই বিশ্রাম করছিল। অন্যদিকে রোহান, রাশেদ আর জাহেদ ছিল পাশের রুমে।
আরমান হালকা গলায় জিনিয়াকে বলে,

— “এক সেট জামা দে, মানজারার দরকার।”
জিনিয়া কোনো প্রশ্ন না করে চুপচাপ জামা এগিয়ে দেয়।
আরমান জামা নিয়ে এসে জারাকে দিয়ে বলে,
— “ফ্রেশ হয়ে আসো।”
জারার মনে ভয় ঢুকে যায়—এই রাতে আরমান তার সাথে কিছু করবে না তো? কিন্তু মুখে কিছু বলে না। নিঃশব্দে জামা নিয়ে বাথরুমে চলে যায়। আরমান তখন একবার ডাক দিয়ে বলে,
— “ওযু করে বের হবে।”
বাদ্য মেয়ের মতো জারাও তাই করে। ওযু শেষে ফিরে এসে দেখে আরমান জায়নামাজ বিছিয়ে বসে আছে। চোখ তুলে জারার দিকে তাকিয়ে আলতো একটা হাসি দিলো, তারপর ইশারায় কাছে ডাকলো।
গুটিসুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে জারা বসে পড়ে।আরমান ওর দুই হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে
__” ভয় পেয় না লক্ষি বউ। আজ আমাদের বিয়ে হয়েছে—একটা নতুন, পবিত্র বন্ধন। তাই আমরা একসাথে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করো লক্ষি বউ। ”
নামাজ শেষে আরমান বাইরে থাকা রোহানদের ডেকে বলে,

— “অনেক রাত হয়েছে, জারাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয় রোহান। । সাথে জিনিয়াকেও নিয়ে যা ।”
জারা যাওয়ার আগে আরমান আলতো করে ওর কপালে চুমু খায়।
___” যানো আমাদের দেখা সাক্ষাত উনিশ দিনের, প্রেমের সম্পর্ক পাচঁ দিনের, আল্লহার রহমতে আমাদের আজ পূর্ণতা। আলহামদুল্লিলাহ।”
জারা গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে। এক অদ্ভুত নিশ্চয়তা মিশে যায় সেই ছোঁয়ায়।
___” সাবধানে যাবে লক্ষি বউ। ”
জারা আরমানকে জড়িয়ে ধরে বলে
__” কোনো দিন ছেড়ে যাবেন না তো আমায়? ”
__” মৃত্যুর আগপর্যন্ত না। ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪২

বিদায় নিয়ে সবাই মিলে জারাদের বাড়ি পৌঁছে দেয় রোহান । জাহেদ ফিহার দিকে তাকিয়ে আছে। আজ সারাদিন একসাথে থাকলেওভালো করে একটু কথা হয় নি তাদের। আর রাশেদ মিমের দিকে সন্দেহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। ওকে তার বড্ড চেনা লাগছে তার কাছে। রোহান স্বাভাবিক ভাবে দাড়িয়ে আছে। জিনিয়া একবার রোহানের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।
দরজা খুলে জারাকে সুস্থ দেখে মারজিয়া বেগমের বুকের ভেতর জমে থাকা সব ভয় আর উৎকণ্ঠা যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়—প্রাণ ফিরে আসে তার।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here