Home তুমি এলে অবেলায় তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৩

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৩

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৩
আতিয়া আদিবা

ভোরের আলোটা ভারী পর্দার ফাঁক গলে এসে পড়ল সামাইরার নরম গালে। সে উঠে গেল জানালার কাছে। ভারী পর্দা সরিয়ে দিতেই প্রকৃতির এক বিষণ্ন শান্ত ভাবের দেখা মিলল। মাত্র দুটো দিন আগের চেনা পৃথিবীটা আজ তার কাছে বড্ড অচেনা ঠেকছে! কেমন গোলকধাঁধার মতো মনে হচ্ছে সবকিছু। সময় বোধহয় তার নিজস্ব গতির চেয়েও দ্রুত প্রস্থানে লিপ্ত।
নিজের পেটের ওপর আলতো করে হাত রাখল সামাইরা।
নতুন প্রাণের স্পন্দন অনুভব করতে চাইল। এক চিলতে ফিঁকে হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে। অশ্রুসিক্ত চোখে ফিসফিস করে বলল,
-সরি পুচকু! তোর অস্তিত্ব মিলিয়ে দেবার মত কত জঘন্য
কথা এই ঘৃণ্য মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, আল্লাহ সাক্ষী, আমি নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোকে এই দুনিয়াতে আনব রে! আমার সমস্ত আয়ু তোর হোক এই দোয়াই করি সর্বক্ষণ। আমাকে ভুল বুঝিস না।

এক তরফা কথপোকথনের মাঝখানে ঘরের দরজায় মৃদু নক হলো। সামাইরা নিজের এলোমেলো চুলগুলো একটা ক্লিপ দিয়ে আটকে নিয়ে বলল,
-ভেতরে আসুন।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল গৃহকর্মী। হাতে ব্রেকফাস্টের ট্রলি। তার ঠিক পেছনে ঘরে প্রবেশ করলেন একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। অভিজাত চেহারার অধিকারী।
পরনে তাঁর সুতি জামদানি শাড়ি। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত পেশাদার এক চিলতে হাসি।
সামাইরা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে চোখ দুটো পিটপিট করে ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকাল। চেনা চেনা লাগছে বড্ড! খুব চেনা! মগজের স্মৃতির কোঠায় সামান্য হাতড়াতেই সামাইরা চমকে উঠল। আরে! ইনি তো ডা. ফারহানা চৌধুরী! দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নামী পুষ্টিবিদ। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের মর্নিং শো কিংবা হেলথ টকশোতে এই মুখটা প্রায়ই দেখা যায়। গর্ভবতী মায়েদের ডায়েট আর স্বাস্থ্য নিয়ে ওনার দেওয়া পরামর্শগুলো সামাইরা নিজেও বহুবার টিভিতে শুনেছে। আর আজ পর্দার সেই চেনা মুখটা সরাসরি তার শোবার ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে!
ডা. ফারহানা চৌধুরী এগিয়ে এসে মায়াবী গলায় বললেন,

– গুড মর্নিং মিসেস রহমান। কেমন আছেন?
সামাইরা নিজেকে সামলে নিয়ে বিছানার একপাশে বসল। সে একদম লক্ষ্মী মেয়েদের মতো মাথা নিচু করে বলল,
-জি ম্যাম, আমি ভালো আছি। আপনি বসুন প্লিজ।
ডা. ফারহানা চৌধুরী সোফায় বসে টেবিলের ওপর নিজের প্যাড আর ডায়েট চার্টটা রাখলেন। গৃহকর্মী ব্রেকফাস্টের ট্রেলিটা সামনে এগিয়ে দিল। তাতে রয়েছে ওটস, কিছু তাজা ফলের কুচি, কুসুম গরম দুধ আর ড্রাই ফ্রুটস।
ভদ্রমহিলা বলতে লাগলেন,
-আপনার প্রেগন্যান্সির এই ফার্স্ট ট্রাইমেস্টারটা বড্ড সেনসিটিভ, মিসেস রহমান। এই সময় শরীরটা অল্পতেই খুব রিঅ্যাক্ট করে। যেমনটা গতকাল আপনার হয়েছে। মিস্টার শেহজাদ আমাকে নিজে কল করেছিলেন। তিনি ভীষণ ওরিড আপনার হেলথ নিয়ে। এই ডায়েট চার্টটা আমি স্পেশালি আপনার বডি টাইপ অনুযায়ী বানিয়েছি।প্রতিদিন সকালে ওটস আর ডিমের সাদা অংশটা মাস্ট খাবেন। কোনো রকম তেল-মশলাদার বা বাইরের খাবার একদম ছোঁয়া যাবে না। ছোট মাছ, পর্যাপ্ত প্রোটিন আর এই ফ্রুটসগুলো নিয়ম করে খাবেন।
সামাইরা অত্যন্ত বাধ্য মেয়ের মতো প্রতিটা কথা শুনল। তার চেহারায় এক ফোঁটা বিরক্তি বা জেদ উঁকি দিল না। সে মাথা নেড়ে বলল,

-জি ম্যাম, আপনি যেভাবে বললেন, আমি ঠিক সেভাবেই চলব। চিন্তা করবেন না।
ডা. ফারহানা চৌধুরী সামাইরার এমন লক্ষ্মী আর শান্ত আচরণ দেখে অত্যন্ত প্রীত হলেন। তিনি বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন,
-আপনি আসলেই অনেক ভাগ্যবতী। মিস্টার শেহজাদের মত একজন অতি ব্যস্ত মানুষ নিজের সকল কাজ একপাশে সরিয়ে আপনার কেয়ার করছে। খেয়াল রাখছে। এমনটা সচরাচর দেখা যায় না।
নিজের খেয়াল রাখবেন মিসেস রহমান।
সামাইরা ডক্টরকে বিদায় জানিয়ে হাসিমুখে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। কিন্তু দরজাটা বন্ধ হতেই তার মুখের সেই কৃত্রিম মিষ্টি হাসি এক পলকে মিলিয়ে গেল। সেখানে জায়গা করে নিল এক গম্ভীর জেদ।
সামাইরা ঘরের ব্রেকফাস্টে হাতও ছোঁয়াল না। চোখে-মুখে সামান্য পানির ঝাপটা দিয়ে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফ্যাকাশে মুখটা দেখল। আজ তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই। মনে কোনো ভয় নেই।
সে ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তার শাশুড়ি সুফিয়া রহমানের ঘরের দিকে। সুফিয়া রহমান তখন বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে তসবিহ জপছিলেন।
সকালের নরম রোদটা ওনার ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। সামাইরাকে ঘরে ঢুকতে দেখে ওনার ফ্যাকাশে মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির মায়ার হাসি ফুটে উঠল।

-আয় মা। শরীরটা কেমন আছে আজ তোর? সকালের খাবার ঠিকঠাক খেয়েছিস তো?
সুফিয়া রহমানের গলার স্বর আজ বড্ড দুর্বল শোনাচ্ছে। চেহারাটাও কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে!
সামাইরা বিছানার পাশে এসে বসল। সুফিয়ার সেই সামান্য কাঁপতে থাকা রগ ভেসে ওঠা হাত দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের ভেতরের সবটুকু ঝড় আড়াল করে সে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-মা, আমি কদিনের জন্য বাবার বাড়ি যেতে চাই। সেখানে গিয়ে একটু থাকতে চাই।
সুফিয়া রহমান তসবিহ জপা বন্ধ করলেন। ওনার অভিজ্ঞ চোখ দুটো সামাইরার মুখের ওপর স্থির হলো। ওনার মনের কোণে এক চিলতে শঙ্কা উঁকি দিল। মেয়েটা সবেই জানতে পারল সে মা হতে চলেছে। তাহলে কেন সে হঠাৎ এভাবে বাবার কাছে যেতে চাইছে? ওনার গলার স্বর কিছুটা উদ্বিগ্ন শোনাল,
-হঠাৎ বাবার বাড়ি! কেন, এখানে কি তোর কোনো অসুবিধা হচ্ছে? কষ্ট হচ্ছে? শরীরটা তো এখন বড্ড বায়না করবে রে মা। এই ভালো যাবে তো এই খারাপ! দেখভাল তো করতে হবে। এখন কেন একা একা যেতে চাইছিস?

সামাইরা ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের বুক চিরে আসা দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রাখল। সে সুফিয়ার হাতের ওপর আলতো করে মাথা রেখে সহজ গলায় বলল,
-না মা। এখানে আমার কোনো কষ্ট নেই। তাছাড়া আপনি তো আমাকে নিজের মেয়ের মতোই আগলে রেখেছেন। কষ্ট কেন হবে?
আসলে, বাবাকে অনেক মিস করছি। মনটা খুব ছটফট করছে। অনেকদিন বাবার কাছে থাকা হয় না। এই অবস্থায় বাবার কোলে মাথা রেখে থাকলে হয়তো মনটা একটু ভালো লাগবে।
সুফিয়া রহমান সামাইরার চুলে বিলি কেটে দিলেন। একজন বাবার জন্য মেয়ের এই আকুতিকে তিনি কীভাবে অমত করবেন? তিনি সামাইরার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-ঠিকাছে মা, তা কতদিন থাকবি সেখানে?
সুফিয়া রহমানের এই সহজ প্রশ্নের কোনো উত্তর সামাইরার কাছে ছিল না। কারণ সামাইরা আর একটা দিনও শেহজাদের খাঁচায় বন্দি থাকতে চায় না। সে শাশুড়ীর প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। চোখের পলক নামিয়ে নীরবতার চাদরে জড়িয়ে নিল নিজেকে।
সুফিয়া রহমান সন্দেহকে লুকিয়ে সামাইরার এই নীরবতাকে বাবার বাড়ি যাওয়ার তীব্র আকুতি বলেই ধরে নিলেন। তিনি আর অমত করলেন না। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-আচ্ছা যা মা। তবে নিজের খেয়াল রাখিস। মন ভালো করে আবার এই বুড়ো মায়ের কাছে চলে আসিস। কেমন?

সামাইরা সুফিয়া রহমানকে জড়িয়ে ধরলেন। কি পবিত্র একজন মানুষ! ঠিক শুভ্র মেঘের মত ফুরফুরে!
নিজের ঘরে ফিরে এসে সামাইরা আয়োজন করে ব্যাগ গোছাল না। আলমারি থেকে মাত্র দুটো সাধারণ জামা একটা ছোট হাতব্যাগে পুরে নিল।
ভিলার বিশাল পোর্চে তখন শেহজাদের কোটি টাকার মার্সিডিজগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সামাইরা সেগুলোর দিকে এক পলক তাকালও না।
সে অত্যন্ত দৃঢ় পায়ে স্কাইলাইন ভিলার সেই বিশাল প্রধান ফটক পার হয়ে পীচ ঢালা পথে এসে দাঁড়াল। চারপাশের কোলাহলের মাঝে সে হাত উঁচিয়ে একটি খালি সবুজ সিএনজি অটো-রিকশাকে ডাকল। সিএনজিটা থামতেই সে পেছনের সিটে গিয়ে বসল এবং ড্রাইভারকে তার বাবার বাড়ির ঠিকানা দিল।
ভিলার প্রধান সিকিউরিটি গার্ড ততক্ষণে শেহজাদকে ফোন করে খবর পৌঁছে দিয়েছে।
-স্যার? ম্যাডাম একা একটি সিএনজি নিয়ে ভিলা থেকে বের হয়ে গেছেন। আমরা কি ওনার সিএনজি আটকে ফিরিয়ে আনব, স্যার?
কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওপাশের লাইনে শুধু শেহজাদের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। গতকাল রাত থেকে ওষুধ খেয়ে অফিসের অন্ধকার কেবিনে বসে থাকা শেহজাদের গলার স্বর বেশ স্তিমিত শোনাল।
“আটকানোর প্রয়োজন নেই”
শেহজাদ ঠান্ডা গলায় বলল।
– তবে গোটা রাস্তা আমাদের কোনো লোক যেন ওকে চোখে চোখে রাখে। দূর থেকে ফলো করতে বলো। একটা আঁচড় যেন ওর গায়ে না লাগে।

প্রায় চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে শেহজাদ রহমান চৌধুরী তার অফিসের ব্ল্যাক-আউট গ্লাসে ঘেরা কেবিনটা থেকে এক পা-ও বাইরে বাড়ায়নি। ডা. নাফিসের দেওয়া সেই কড়া ডোজের অ্যান্টি-সাইকোটিক আর সিডেটিভ ওষুধগুলো শুধু নিয়ম করে গিলেছে। এই ওষুধগুলো কেমন অদ্ভুতুড়ে। বোধহয় জাদু জানে। মানুষের মনের ভেতরের ক্ষতগুলোকে কি সুন্দর অবশ করে দেয়!
সামাইরার বলা প্রতিটা বিষাক্ত শব্দ শেহজাদের মগজে এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু মস্তিষ্কে চলা রাসায়নিক তীব্রতায় সে কোনো কষ্ট অনুভব করতে পারছে না। নিজেকে রোবটের ন্যায় ঠেকছে! অনুভূতিহীন।
বিকেলের অন্তিম লগ্নে সে বাড়ি ফিরল।
সুফিয়া রহমান ড্রয়িংরুমের বড় সোফাটায় বসে ছেলের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। শেহজাদের পায়ের শব্দ পেতেই তিনি চোখ তুলে তাকালেন।
সহসা ওনার বুকের ভেতরটা কেমন ওলটপালট হয়ে গেল। নিজের ছেলেকেই চেনা দায়! এ কি অবস্থা হয়েছে তার! এ যেন কোনো মানুষ নয় বরং পাথরের তৈরি ভাঙা মূর্তি। হেলেদুলে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
সকালবেলা সামাইরার ওভাবে বাবার বাড়ি চলে যাওয়া, এখন ছেলের এই চূড়ান্ত বিধ্বস্ত রূপ দেখে সুফিয়া রহমানের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ মন পরিষ্কার বুঝে নিল, এদের মাঝখানের সুতোটা নির্মমভাবে ছিঁড়ে গেছে!

-শেহজাদ… এদিকে আয় তো, বাবা,”
সুফিয়া আদেশসূচক গলায় ছেলেকে ডাকলেন।
শেহজাদ মায়ের ডাক শুনে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সে সোফায় বসল না। তার ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। এক অবর্ণনীয় ক্লান্তিতে মায়ের একদম পায়ের কাছে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল সে। মায়ের হাঁটুতে নিজের মাথাটা রেখে সে শক্ত করে ওনার পা দুটো জড়িয়ে ধরল।
সুফিয়া রহমান ছেলের এই রূপ দেখে শিউরে উঠলেন। তিনি ছেলের চুলে কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে অত্যন্ত আর্দ্র গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
-তোর আর সামাইরার মাঝে সব ঠিক আছে তো, শেহজাদ? সামাইরা হঠাৎ ওভাবে সকালবেলা বাবার বাড়ি চলে গেল? আর তুই কেন নিজের এই অবস্থা করে রেখেছিস বাবা? আমার কাছে কিছু লুকাস নে, শেহজাদ। আমাকে সব সত্যি করে বল।

শেহজাদ ক্ষণিককাল কোনো কথা বলল না। মায়ের হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে সে শুধু চোখ দুটো বন্ধ করে রাখল। ওষুধের তীব্র প্রভাব চলছে তার ভেতরে। সে ঘোরে থেকেই অবশেষে সে তার জীবনের এক বিরাট সত্যকে সম্পূর্ণ আড়াল করে ফেলল। মায়ের পা জড়িয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বলতে লাগল,
-আমাদের মাঝে কোনোদিন কিছু ঠিক ছিল না, মা। সব ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেছে অনেক আগে।
সুফিয়া রহমান চমকে উঠলেন, ওনার হাতটা শেহজাদের মাথায় থমকে গেল।
-কী বলছিস এসব? কেন ঠিক থাকবে না?
-বিয়ের আগে আমার একটা সম্পর্ক ছিল। আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসতাম। কিন্তু তোমার অসুস্থতা আর মন রাখতে আমি আগের সম্পর্কের কথা তোমাকে বলতে পারিনি। তোমার পছন্দের সামাইরাকে আমি বিয়ে করেছি। কিন্তু আমি ওকে কোনো ধোঁকায় রাখতে চাইনি। তাই বিয়ের প্রথম রাতেই, এই ঘরের ভেতরেই আমি সামাইরাকে আমার অতীতের সেই সম্পর্কের কথা সব সত্যি করে জানিয়ে দিয়েছিলাম।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের পা দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
-আর সেই রাত থেকেই ও আমাকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করে, মা। ও মতে আমি ওকে ধোঁকা দিয়েছি। ও প্রতিটা মুহূর্তে আমার ছোঁয়াকে, আমার যত্নকে ভণ্ডামি ভাবে। ও আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি। এই সবকিছুর জন্য দায়ী আমি মা। সব দোষ আমার।

শেহজাদের এই স্বীকারোক্তি শুনে সুফিয়া রহমান কয়েক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। ওনার অভিজ্ঞ মন এতদিনে বুঝতে পারল, কেন সামাইরা এই রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িতে থেকেও নিজেকে সবসময় একাকী করে রাখত।
সুফিয়া রহমান ছেলের মাথায় পুনরায় অত্যন্ত মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার গলার স্বরে গর্ব প্রকাশ পেল।
তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,
-আমি জানতাম, শেহজাদ। আমি জানতাম যে আমার পছন্দ কোনোদিন ভুল হতে পারে না। সামাইরাকে যেদিন আমি প্রথম দেখেছিলাম, সেদিনই ওর ওই শান্ত চোখ দুটো দেখে আমার মনে হয়েছিল ও অত্যন্ত আত্মসম্মান সম্পন্ন একটা মেয়ে। আর আজ ওর এই আচরণই প্রমাণ করছে ও কতটা মর্যাদাবান। তুই ওকে বিয়ের রাতেই অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসার কথা বলে ওর আত্মসম্মানে চরম আঘাত করেছিস। ও তোকে সহজে মেনে নেয়নি, এটাই তো ওর আসল সৌন্দর্য!
মায়ের মুখে সামাইরার এই প্রশংসা শুনে শেহজাদ সুফিয়ার হাঁটুর ওপর থেকে নিজের মাথাটা তুলল। সে মায়ের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত করুণ স্বরে শুধাল,

-আমি কি তবে অবিকল আমার বাবার মতোই হয়ে গেলাম? আমিও কি একটা মেয়ের জীবন বিষাক্ত করে তুললাম? নষ্ট করলাম? আমি কি বাবার মতোই জানোয়ারে পরিণত হয়েছি, মা?
ছেলের এই প্রশ্ন শুনে সুফিয়ার চোখ দুটো সজল হয়ে উঠল। তিনি পরম মমতায় শেহজাদের দুই গাল নিজের দুই হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
-না, শেহজাদ। তুই কোনোদিন তোর বাবার মতো হতে পারিস না। তোর বাবা কোনোদিন নিজের ভুল বুঝতে পারেনি। সে সারাজীবন চরম অহংকার নিয়ে বেঁচে ছিল। নিজের একটা ভুল ঢাকতে গিয়ে সে হাজারটা ভুলের, হাজারটা অন্যায়ের আশ্রয় নিয়েছিল। সে আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছিল। কিন্তু কোনোদিন অনুশোচনা করেনি। তুই তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিস! তুই তোর বাবার মতো নোস।
তিনি শেহজাদকে এবার সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,

-তুই একদম চিন্তা করিস না, সামাইরা ঠিক ফিরে আসবে। মেয়েটার মনটা একটু শান্ত হোক। ওকে দেখে কোনোভাবেই আমার মনে হয়নি যে ও মাঝপথে সম্পর্ক ছেড়ে দেওয়ার মতো কোনো মেয়ে। ও তোকে ভালোবাসে বলেই হয়তো তোর ওপর ওর রাগটা এত বেশি! অভিমান কমে গেলেই ও আবার তোর বুকে ঠিক ফিরে আসবে। তোকে ক্ষমা করে দিবে। তুই দেখিস!
প্রত্যুত্তরে শেহজাদ হাসল। কারণ তার সরল মা তো জানেনই না যে তাদের তথাকথিত এই বৈবাহিক সম্পর্কটা সম্পূর্ণ আইনিভাবে এক চরম সীমান্তের ওপারে এসে দাঁড়িয়েছে। সামাইরা মুক্ত। স্বাধীন।
শেহজাদ মায়ের পা থেকে নিজের মাথাটা সরিয়ে নিয়ে মেঝেতে সোজা। ঘরের শূন্য দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ফিসফিস করে বলল,

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২২

ও আর ফিরে আসবে না, মা। ও কোনোদিন আমার বুকে আসবে না। আমাকে মাফ করবে না। ও আমাকে ঘৃণা করে। আমিও ঘৃণারই যোগ্য। কিন্তু ও আমাকে ঘৃণা করেই ভালো থাকুক! আমি না হয় এই অনন্ত অন্ধকারের নরকেই জ্বলে পুড়ে মরি! অভিশপ্ত হয়ে বেঁচে থাকি।

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here