রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৮
সোহানা ইসলাম
নদীর পাড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। বাতাসে কেমন একটা অচেনা ভার। কিছুক্ষণ আগেও হাসির শব্দে মুখরিত ছিল চারপাশ, এখন যেন সব থেমে গেছে।আরমানের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন কেঁপে ওঠ—যেন বজ্রপাত।
জারার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো কয়েকটা সাধারণ কথা—
“আমি যদি কখনো আপনাকে ছেড়ে চলে যাই…”
এই একটা বাক্য যেন সোজা আরমানের বুকের ভেতর ঢুকে গেল ছুরির মতো। চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো, বুকের ধুকধুকানি বেড়ে গেল। মাথার ভেতর রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। যাকে সে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে, সেই মেয়েটা কীভাবে এমন কথা বলতে পারে!
তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। নিঃশ্বাস ভারি হয়ে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে গেছে। কোনো কিছু বোঝার আগেই, আচমকা সে জারাকে বুক থেকে সরিয়ে এক চড় বসিয়ে দিল।“ঠাসসস…”
নদীর ধারে সেই শব্দটা কেমন প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো।
জারা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। মুহূর্তেই মুখটা নিস্তব্ধ, তারপর চোখ ভরে গেল পানিতে। ঠোঁট কাঁপছে। সে তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে—যে মানুষটা তাকে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই আজ তার গায়ে হাত তুলেছে।
আরমান দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
_“কী বললি তুই? আমাকে ছেড়ে যাবি? এই জানোয়ারের বাচ্চা,কী বললি তুই? আবার বল!”
জারার পুরো শরীর কাঁপছে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। কণ্ঠ কাঁপা স্বরে বলে,
_“আ… আমি তো শুধু এমনি বলছিলাম। তাই বলে আপনি আমাকে মারবেন?”
এই একটা বাক্যে যেন আরমানের বুক ভেঙে গেল। হঠাৎ যেন সময় থেমে গেল চারপাশে। বাতাসও থেমে আছে। এখন তার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বুক কেঁপে উঠল—এই হাতেই সে ভালোবেসেছে, আদর করেছে, এখন সেই হাতেই সে আঘাত করেছে।
মাথার ভেতর হঠাৎ এক অজানা শূন্যতা তৈরি হলো।‘আমি কী করে ফেললাম?’চোখের সামনে জারা কাঁদছে, আর সে বসে আছে পাথরের মতো। বুকের ভেতর একটা জ্বলন্ত আগুন। অনুতাপ, লজ্জা, আর নিজের ওপর ঘৃণা।
জারা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে হাঁটা শুরু করল সাদা বালির মাঠের উপর দিয়ে । কাঁধ কাঁপছে, পায়ের শব্দ পর্যন্ত কেমন ভারী।
আরমান স্থির হয়ে বসে রইল বালির ওপর। তাকিয়ে আছে তার প্রিয় মানুষটার পেছনের দিকে। ভাবছে—‘ও হয়তো একটু দূরে গিয়ে বসবে, হয়তো রাগ দেখাবে…’কিন্তু না, জারা তো থামল না। সে সোজা হেঁটে চলে যাচ্ছে, কোনো দিকে না তাকিয়ে।
আরমানের বুক ধক করে উঠল। এবার সে উঠে দাঁড়াল। মুখে একটাই শব্দ—
“বউ…”
কোনো সাড়া নেই।
__“লক্ষ্মী বউ…”
এবারও কোনো সাড়া নেই। জারা সে তার নিজের মতো হেঁটেই চলেছে।
আরমানের কণ্ঠ কাঁপছে, যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। পায়ে কাঁটা বিঁধছে, তবুও সে দৌড়াচ্ছে জারার দিকে।মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব রঙ হারিয়ে গেছে। কেবল অপরাধবোধের এক ঘন অন্ধকার তাকে ঘিরে ধরছে। ‘কীভাবে পারলাম আমি? ভালোবাসা মানে তো স্পর্শে শান্তি দেওয়া, ব্যথা নয়।’
__“ আমার সোনা বউ,দাঁড়া বলছি!”
__”না! দাঁড়াবো না আমি। আপনি আমাকে চড় মেরেছেন!” জারা থামে না। হাঁটার মাঝেই কেঁদে কেঁদে আরমানের কথার জবাব দেয় সে।
আরমানের মাথা নিচু হয়ে আসে। মনে হয়, নিজের গালেই চড় মারতে ইচ্ছে করছে। বুকের ভেতর যন্ত্রণা জমে জমে ফেটে পড়ছে। নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে আবার এই হাফ ইঞ্চির উপর ও।একটা চড় মেরেছে বলে এমন ভাবে সাড়া মাঠ হেঁটে হেঁটে কান্না করতে হবে। এক জায়গায় বসে ও তো কান্না করা যায়। আজব?
__“ হাফ ইঞ্চির বাচ্চা! দাঁড়া বলছি কিন্তু! ”
__“ দাঁড়াবো না আমি! আর আপনার কোনো কথা ও শুনবো না আমি! ”
জারা হাঁটছে আর আরমান জারা’র পিছনে পিছনে দৌড়ে আসছে। বউয়ের রাগ ভাঙ্গানোর জন্য। বউ ক্ষেপে গেলে মুশকিল হয়ে যাবে।তার কপালে বউয়ের আদর তো দূরের কথা একটা চুমুও জুটবে না।
__“ তুই সহ তোর চৌদ্দ গুষ্টি শুদ্ধো আমার কথা শুনবে! ” সাথে সাথে জিবে কামড় দেয় আরমান। মিষ্টি কথা বলে বউয়ের রাগ ভাঙ্গানোর বদলে তিতা কড়লার মতো কথা বের হচ্ছে কেন তার মুখ দিয়ে ?এখন তো বউ আরও বেঁকে বসবে?
জারা’র ও রাগ উঠে যায়। তাকে চড় মেরেছে। গালি দিয়েছে। এখন রাগ না ভাঙ্গিয়ে তার চৌদ্দ গুষ্টি নিয়ে কথা বলছে?
__“ তাহলে আমার চৌদ্দ গুষ্টিকে গিয়ে শুনান আপনার কথা। ”
যা ভেবেছে তাই হলো।বউ তার আরও রাগ করেছে এখন। তাই একটা মিষ্টি কথা বলে বউয়ের রাগ ভাঙ্গানোর টেকনিক এপ্লাই করে আরমান।
__“ স্বামীর কথা শুনতে হয় বউ..!”
জারাও আরমানের নাকে মুখে উওর দিয়ে দেয়
__“ আমার কোনো স্বামী নাই! ”
“ কিছু হলেই হাত পা ধুয়ে আমার মতো ভালো মানুষ কে স্বামী হিসেবে অস্বীকার করে এই হাফ ইঞ্চি মেয়ে।” মনে মনে কথা গুলো বলে আরমান। এখন সরাসরি বললে বউ তার আরও রেগে যাবে। তাই রিস্ক নেওয়া যাবে না। আরমান জোরে দৌড় দেয় জারার দিকে। হাঁপাতে হাঁপাতে জারার কাছে এসে বলে,
__“লক্ষী বউ… আমার সোনা বউ থামো না, প্লিজ। আমি ভুল করেছি। রাগের মাথায় বুঝিনি আমি কী করছি।”
জারা পেছনে তাকায় না। শুধু বলে,
__“ আপনার এমন ভালোবাসা আমার লাগবে না…!”
এই একটুকু বাক্যে আরমান নিঃশেষ হয়ে যায়। সে কিছু বলতে পারে না। চোখের কোণে পানি চলে আসে। মাথা নিচু করে বলে,
__“আমি আর কখনো এমন করব না। রাগ যদি আসে, আমি নিজেকে আঘাত করবো, কিন্তু তোমায় কাঁদাব না।”
জারা এবার থেমে যায়। বাতাসে চুপচাপ এক মুহূর্ত। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে তাকায়। চোখ লাল, মুখে কষ্টের ছাপ।
আরমান এগিয়ে এসে বলে,
__“আমার হাতটা অপরাধী, কিন্তু মনটা তোরই। আমায় একবার ক্ষমা কর না বউ জান।”
নদীর ঢেউ হালকা শব্দে বালু ছুঁয়ে যাচ্ছে। জারা দেখে আরমানের চোখের কোনে জল জমে আছে। জারা’র এখন যানি কেমন অপরাধবোদ হচ্ছে। জারা আর রাগ করে না থেকে এক লাফে আরমানের গলা জরিয়ে ধরে। আরমানের কাঁধে মুখ দিয়ে ফিসফিস করে বলে
__“ আপনাকে আমি ওই #রৌদ্রময়_বালুচর এর মতো ভালোবাসি।রোদের লালচে আভা বালির কনার উপর পরলে যেমন চকচক করে। আপনি ও ঠিক সেই রোদের আভা যা আমার জীবনকে চকচক করে তুলেছে স্বামীজান।”
আরমান খুব মনোযোগ সহকারে তার লক্ষী বউয়ের কথা শুনে। আরমান জারা’র কোমড় আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। যেমন ছেড়ে দিলে পালিয়ে যাবে। আরমানের চোখের পানি জারা’র কাঁধে পরে। জারা তড়িৎ গতিতে মাথা তুলে আরমানের দিকে তাকায়। দেখে আরমানের চোখ ছলছল হয়ে আছে।
জারা আলতু হাতে আরমানের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে
__“ বেডি মানুষের মতো শুধু ফেচফেচ করে কান্না করেন কেনো?”
__“ ভালোবাসি, তাই হারানোর ভয় পাই জান।”
আরমান দেখে জারা শান্ত হয়ে ওর কাঁধে মাথা দিয়ে চুপ করে শুয়ে আছে। জারাকে রাগানোর জন্য খুঁচা দিয়ে বলে
__“ আমি না কি এখানে কোম্পানির কাজে এসেছি? কিন্তু কাজের কাজ না করে হাফ ইঞ্চি সাইজের বউয়ের পিছনে ঘুরছি। ছিঃ কী কপাল আমার? ”
আরমানের কথা শুনে জারা ধাপ করে একটা কিল বসিয়ে দেয় আরমানের পিঠে। নাক ফুলিয়ে বলে
__“ বউয়ের আগে পিছে ঘুরা ইমানদার স্বামীর কাজ!”
__“ আর স্বামী গায়ে হাত তুলা ও কি ইমানদার স্ত্রীদের কাজ বউ? ”
আরমানের কথা জারা খিলখিল করে হেসে উঠে। আরমানের কাঁধে চুমু দিয়ে বলে
__“ আমার এখন আর পাপ হবে না স্বামীজান!”
__“ ঘুষখোর বউ আমার! ”
সময় কেমন নিঃশব্দে গড়িয়ে যায়। চোখের পলকে দুইদিন কেটে গেছে। জারা, মিম আর ফিহাদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ — আইসিটি পরীক্ষা।
রাতের নিস্তব্ধতায় মিমের ঘরে হালকা বাতি জ্বলছে। টেবিলে ছড়ানো খাতা, বই, পেনসিল। মিম মনোযোগ দিয়ে অঙ্ক করছে। পাশে বসে আছে রাশেদ। একহাত গালে দিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে, মনে মনে ভাবছে — এই অজুহাতে অন্তত কিছুটা সময় কাছে পাওয়া যায়।
রাশেদ বললো,
_“এইটা ভুল করছো তুমি।”
মিম বিরক্ত মুখে তাকিয়ে বললো,
_“চুপ করুন আপনি! আমার সব কিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে ।”
রাশেদ হেসে বললো,
__“দাড়াঁও আমি শিখিয়ে দিচ্ছি তাহলে পারবে?”
মিম এবার ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
_“আপনার শেখানো মানেই তো ধমক আর ধমক!”
রাশেদ হেসে ওর খাতার দিকে ঝুঁকে অঙ্কটা বুঝিয়ে দিতে লাগলো। মিমের মুখে একরাশ মনোযোগ। কখন যে রাত কেটে গেছে, দুজনেরই টের নেই।
পরের সকালটা শুরু হয় অন্যরকম ব্যস্ততায়।
সূর্যের আলো গাছের পাতায় ঝিকিমিকি করছে। ঘড়িতে সকাল আটটা বাজে।
ফিহার ঘর এখনো এলোমেলো। বই খোলা, কিন্তু পড়া হয়নি একটুও। কারণ গতরাতেই সে অনেক রাত পর্যন্ত জাহেদের সাথে কথা বলেছে। পরীক্ষার কথা মাথা থেকে একেবারে উধাও। জাহেদ আবার সকালে কল দিয়ে বলেছে,
__“আজকে আমি তোমাকে সাথে করে নিয়ে যাবো।”
ফিহা কল কেটে উঠে দাঁড়ালো। চোখে হাসি, মুখে উচ্ছ্বাস। আজ আমাকে কেউ থামাতে পারবে না।
ফিহা নাস্তা শেষ করছে।আর রেডি হওয়া শুরু করে।
আর এদিকে জারা ইতিমধ্যেই ড্রইং রুমে এসেছে। গায়ে হালকা গোলাপি সালোয়ার কামিজ, চুল গুছানো খোঁপা।খাওয়া দাওয়া করে তারপর কলেজের জন্য রেডি হবে সে। ডাইনিং টেবিলে বসে আছে আনিছুর রহমান, হাতে পত্রিকা।
জারা এসে বাবার পাশে বসে, মৃদু স্বরে বলে,
___“বাবা, আজ আমার শেষ পরীক্ষা।”
আনিছুর রহমান পত্রিকা নামিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,
__“তুমি আমার গর্ব। মন দিয়ে দিও,আম্মু।”
জোহানকে তখন মারজিয়া বেগম ডেকে তুলছে,
___“তাড়াতাড়ি ওঠো বাবা, স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।”
খাওয়া শেষে করে জারা রেডি হয়ে রুম থেকে বের হয়।পরম শ্রদ্ধায় বাবার পায়ের কাছে গিয়ে সালাম করে। মা’কে জড়িয়ে ধরে বিদায় নেয়।
রাস্তায় বের হতেই দেখা হয় মিম আর ফিহার সঙ্গে। তিনজনের হাসি মুখে ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই।জারা বলে,
__“ এই পরীক্ষার পর একটু শান্তি। আমার মিম জানুর বিয়ে।”
মিম লজ্জায় লাল হয়ে যায় জারা’র কথায়।
ওরা নদীর ঘাটে পৌঁছায়। সেখানে দেখা যায়, আরমান, রাশেদ আর জাহেদ দাঁড়িয়ে আছে। তিনজনের মুখে হালকা হাসি, চোখে একরাশ ভালোবাসা ও গর্ব।আরমান এগিয়ে এসে বলে,
__“বউ, পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন?”
জারা মিষ্টি হেসে বলে,
__“ভালো, স্বামীজান। আপনি যেমন চান ঠিক তেমনই।”
রাশেদ পাশে দাঁড়িয়ে হাসে,
__“দেখছেন জাহেদ স্যার, এখনকার মেয়েরা স্বামীর সাথে কেমন মিষ্টি করে উত্তর দেয়।আর আমার বউ!”
জাহেদ তাচ্ছিল্যভরে বলে,
__“তুমি আগে নিজের বউকে সামলাে, আমি আমারটা দেখি।”
সবাই হেসে ওঠে। তারপর ছয়জন মিলে নৌকায় চড়ে নদী পার হয়। সকালের বাতাসে নদীর জল দুলছে। দূরে সূর্যের আলো পড়েছে নদীর বুকে, যেনো হাজারটা হীরের টুকরো ভাসছে।
জারা চুপ করে বসে থাকে। পাশে আরমান, মাঝেমাঝে চোখে চোখ পড়ে যায়। কোনো কথা নেই, কিন্তু একটা নীরব মায়া আছে।
অন্যপাশে পৌঁছে তারা একটা অটোরিকশা নেয়। পথে ফিহা বলে,
__“ আমি তো আজ কিছুই পড়ি না? কি লিখব খাতায়?”
মিম বলে,
__“তাহলে এই কয়দিন কি করেছিস বাড়িতে বসে? ”
ফিহা জাহেদের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকায়।
__“ এই জাহেদ খানের পাল্লায় পড়ে আমার পড়াই হয় নি!”
__“ এই কটকটি আমাকে একদম দোষ দিবে না, এই বলে দিলাম। বলল জাহেদ।
সবাই আবার হাসে। কলেজে পৌঁছাতে তখনও আধা ঘণ্টা বাকি। মাঠে দাঁড়িয়ে সবাই গল্প করছে। হালকা রোদে ছেলেমেয়েদের ভিড়, কেউ বই খুলে শেষবারের মতো পড়ছে, কেউ বন্ধুদের সাথে হাসছে।
জারা, মিম আর ফিহা কলেজের মূল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে। পাশে দাঁড়িয়ে আরমান, রাশেদ আর জাহেদ। আরমান জারার দিকে তাকিয়ে বলে,
__“পরীক্ষা ভালো করে দিও, আমি বাইরে মাঠে থাকব।”
জারা মৃদু হাসে, চোখ নামিয়ে বলে,
__“ঠিক আছে।”
এই দৃশ্যটাই দূর থেকে দেখছিলেন একজন প্রফেসর। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। হালকা চশমা পরে মাঠের পাশের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছেন।তার সাথে দাঁড়িয়ে আছে নতুন গেস্ট টিচার।বয়স বেশি না। এিশ এর মতো হবে। এক মাস হবে জয়েন করেছে কলেজে। শিক্ষার্থীদের এসব হাসাহাসি দেখে তিনি মৃদু মাথা নাড়লেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ে জারা, ফিহা আর মিমের দিকে। তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর উপস্থিতি তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না।
মাথা নেড়ে তিনি বলেন,
__“এরা কি কলেজে প্রেম করতে এসেছে?”
তৎক্ষণাৎ ওই গেস্ট টিচার বলে
— “এই তিনজন মেয়ে ছেলেদের সঙ্গে বেশি দেখা যাচ্ছে স্যার।এদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে ।”
ঘণ্টা পড়ে যায়। চারদিক যেন হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা হলের দিকে ছুটে যায়।জারা, মিম, ফিহা তাদের ফাইল গুছিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়ে।
হলের ভেতর হালকা সোঁদা গন্ধ। জানালার পাশে বসেছে জারা। কলম হাতে ধরে আছে, কিন্তু মনে হালকা একটা দোলা — বাইরে আরমান অপেক্ষা করছে।
জারা জানালার ফাঁক দিয়ে একবার তাকায়, দেখে মাঠে ছায়ার ভেতর তিনজন দাঁড়িয়ে আছে—আরমান, রাশেদ আর জাহেদ। সূর্যের আলো তাদের কাঁধে পড়েছে। চোখে একরাশ আশা, মুখে হালকা হাসি।
জারার ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে যায়। কলমটা নামিয়ে নেয় কাঠের ব্যান্ঞ্চে। কলম ঘসে প্রথম লাইনটা লেখে—“In the name of Almighty Allah…”
বাইরে হাওয়া বয়ে যায়।সবকিছুই যেন শান্ত, সুন্দর, নতুন এক শুরুর মতো। ইতি মধ্যে কক্ষে স্যার ঢুকে খাতা দিয়ে ফেলে।
সূর্যের তাপ তখন একটু নরম হয়েছে।সময় গড়িয়ে এখন মাএ এগারোটা বাজে। হতে আরও কতো সময়। পরীক্ষার হলে জারা, মিম আর ফিহা প্রশ্নপত্র নিয়ে ব্যস্ত। আর বাইরে তিনজন অপেক্ষামাণ মানুষ—আরমান, রাশেদ আর জাহেদ।
আজও তিন ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। সেদিন তারা কুত-কুত খেলে সময় পার করেছিল, কিন্তু আজকে যেন কিছুই মাথায় আসছে না।
আরমান একবার হাঁটে, আবার থামে। রাশেদও ওর পিছু পিছু ঘোরে। জাহেদ একটু দূরে মাঠের ঘাসে বসে পা ছড়িয়ে দিয়েছে। মাথার উপরে রোদ, গায়ে হালকা গরম ভাব। সময় যেন থেমে আছে।
আরমান হঠাৎ রাশেদকে বলে,
__“কিছু ভাব, এইভাবে বসে থাকলে সময় যাবে না।”
রাশেদ হেসে বলে,
_“ভাবলেও কী হবে স্যার,সময়ই দাঁড়িয়ে আছে। ”
তারপরই জাহেদের চোখ যায় পুকুরের ধারে লাল জামরুল গাছের দিকে। সূর্যের আলোয় ফলগুলো ঝকঝক করছে। হঠাৎ ওর মুখে উচ্ছ্বাস ভেসে ওঠে—
__“ভাইয়া, ওই দেখো! কী সুন্দর লাল জামরুল গাছে ঝুলে আছে!”
আরমান থেমে তাকায়। ঠোঁটে হালকা হাসি এনে বলে,
__“জামরুল গাছে না ঝুলে কী তোর মাথায় ঝুলবে, গাধা?”
রাশেদ হেসে ফেলে। কিন্তু জাহেদ ওর কথায় মন দেয় না। উঠে দাঁড়ায়, প্যান্ট ঝাড়তে ঝাড়তে বলে,
_“চলো না ভাই, জামরুল পেরে আনি। দেখেই জিভে জল আসছে।”
আরমান প্রথমে রাজি হয় না। বলে,
__“ওটা তো কলেজের পুকুরপাড়ের গাছ। কেউ দেখে ফেললে বিপদ হবে। চুরি করে লজ্জায় পরতে পারি ।”
কিন্তু রাশেদ বলে,
__“তিন ঘন্টা বসে থাকা যাবে, আর দুই মিনিটে জামরুল পাড়া যাবে না?চলুন স্যার?”
জাহেদ আবার জোর করে বলে,
__“চলো না ভাইয়া, একটু মজা হবে।”
শেষমেশ আরমানও হাল ছেড়ে দেয়।
__“ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি করবি, কেউ যেনো না দেখে।”
তিনজন ধীরে ধীরে পুকুরের দিকে এগিয়ে যায়। বাতাসে জামরুলের মিষ্টি গন্ধ। কাছেই কয়েকটা ছোট ছেলে ফুটবল খেলছে, কিন্তু তারা অন্যদিকে মনোযোগী। গাছের নিচে পৌঁছে তিনজন আশেপাশে তাকায়—নির্জন।
জাহেদ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বলে,
__“আমি উঠতেছি, তোমরা নিচে ধরো।”
আরমান কপাল চাপড়ে বলে,
__“বেশি না বকে তাড়াতাড়ি কর।”
তারপরও জাহেদ মুহূর্তের মধ্যে ডাল বেয়ে উপরে উঠে যায়। লালচে ফলগুলো একে একে নিচে ফেলতে থাকে। রাশেদ জামরুল কুড়িয়ে একপাশে রাখে। হঠাৎ একটা ডাল ভেঙে যায় কট করে।
আরমান রেগে বলে,
__“ গাধা ডাল ভাঙিস না। ধরা পরে যাবো বলেছি তো! শুধু ফল পার।”
জাহেদ নিচে তাকিয়ে হেসে বলে,
__“ডাল না ভাঙলে ফল আসবে কীভাবে ভাইয়া?”
আরমান কিছু বলে না, শুধু চারপাশে তাকায় — কেউ দেখছে কিনা। দূর থেকে একটা মহিলা হেঁটে আসছে,দেখে মনে হচ্ছে এই কলেজের টিচার।
তারা লুকিয়ে যায় গাছের আড়ালে।
আরমান এক দৌড়ে চলে আসে ঝোপের আড়ালে। রাশেদ ওর পিছনে। রাশেদ দৌড় দিতে গিয়ে ঘাসে পা পিছলে পড়ে যায়।
__“ স্যার আমাকে নিয়ে যান! ”
__“ তুই মরে যা গাধা! ” আরমান কে আর পায় কে। রাশেদও উঠে দৌড়ে গিয়ে লুকিয়ে পরে।
আর জাহেদ নিজেকে গাছের ডালের আড়ালে লুকিয়ে রাখে।
শেষমেশ তারা যতটা পারা যায় জামরুল পেরে মাঠের ছায়ার নিচে এসে বসে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হাওয়া আসছে, একটু ঠাণ্ডা লাগছে। তিনজনের সামনে ছড়ানো লাল লাল জামরুল — যেনো ছোট্ট রত্নের মতো ঝলমল করছে।
রাশেদ একটা জামরুল তুলে মুখে দেয়। চিবিয়ে বলে,
__“জামরুল গুলো খুব মিষ্টি ।”
জাহেদ হেসে বলে,
__“চুরি করে পাড়লে নাকি সবকিছুই মিষ্টি লাগে। এই কথাটাই বোঝলাম না আমি ।”
আরমান চুপ করে বসে থাকে। ওর চোখে হালকা তৃপ্তি, কিন্তু মনটা যেনো অজান্তে ভয়েও ধকধক করছে। আরমান বলে,
___“ টাকা দিয়ে কিনে খেলে কোনো কষ্ট করতে হয় না কিন্তু চুরি করে খাওয়া মানে মেহনত, কষ্ট করে জোগার করে খাতে হয়। তাই তো কষ্টের ফল সবসময় মিষ্টি হয়।”
জাহেদ বলে
__“ ধরা খেলে সোজা গার্ডরুমে নিয়ে যাবে।
রাশেদ হেসে বলে,
__“দেখলেই কী হবে স্যার, বলবো আমরা গবেষণা করছি—চুরি করা জামরুলে মিষ্টতা বেশি না কম।”
তিনজন একসাথে হেসে ওঠে। হাসির শব্দ গাছের ডালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। বাতাসে ভেসে যায় জামরুলের গন্ধ আর তিন বন্ধুর কিশোরসুলভ আনন্দ।
অল্প সময়েই জামরুলের পাহাড় ছোট হয়ে যায়। রাশেদ শেষ জামরুলটা হাতে নিয়ে বলে,
__“এখন থেকে কিছু টা ওদের জন্য ও রেখে দেই। চুরির ভাগিদার ওরা হবে তাহলে আমাদের সাথে ।”
আরমান একটু হেসে। রাশেদের মাথা গাট্টা মেরে বলে,
_“চুরি করা ফল খাওয়াবি তুই আমার বউকে। গাধা।”
__“ স্যার এখানে তো আমার বউও আছে।”
__ আজ একটা বউ নেই বলে? ” বলল জাহেদ।
আমি আর খেতে পারছি না। বলল রাশেদ।
জাহেদ মজা করে আরমানকে বলে,
__“তাহলে তুমিই খাও, আমি আর পারছি না ।”
তিনজনের হাসি আবার মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দূরে ঘণ্টা বাজে — হয়তো পরীক্ষা শেষের সংকেত।আর মাএ এক ঘন্টা আছে। আরমানের মুখে সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন আলো জ্বলে ওঠে। চোখে উচ্ছ্বাস, মুখে মৃদু হাসি।
তিনজন ধীরে ধীরে কলেজের দিকে ফিরে যায়। পুকুরপাড়ের গাছটা নরম বাতাসে দুলছে। মনে হয়, গাছটাও যেনো জানে—এই তিনজন আজও শিশুসুলভ আনন্দে সময়কে হারিয়ে দিয়েছে।
পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বাজতেই কলেজ প্রাঙ্গণ ভরে যায় ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে। কেউ হাসছে, কেউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, আবার কেউ চুপচাপ নিজের খাতা নিয়ে ভাবনায় ডুবে আছে।
বাইরের মাঠে আরমান, রাশেদ আর জাহেদ হাঁটাহাঁটি করছে। তাদের চোখ বারবার কলেজ ভবনের দরজার দিকে। তিন ঘণ্টা ধরে তারা অপেক্ষা করছে জারাদের জন্য। পরীক্ষার সময়টুকু যেন একেকটা বছর মনে হচ্ছিল।
হঠাৎ দূরে দেখা যায় ফিহা আর মিম বের হচ্ছে। দুজনের মুখে কোনো হাসি নেই। ফিহার মুখে যেন রাগ আর হতাশার ছায়া। মিমের চোখ নিচু। ওদের হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যায় কিছু একটা ঘটেছে।
ফিহা কাছে আসতেই জাহেদের দিকে ফাইল ছুড়ে মারে। ফাইলটা সরাসরি জাহেদের বুকে এসে লাগে। হতভম্ব জাহেদ অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে — “এই মেয়ের আবার কি হলো?” তার মুখে কথা নেই, শুধু প্রশ্ন। ফিহা রাগে গজগজ করতে করতে বলে
__“ এমনিতেই পরীক্ষা নিয়ে ধর্ম বিরোধী কাজ করছে। আবার বিনা অপরাধে খাতা নিয়ে যায়? ”
ফিহা দুই পা আরমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে
__“ ভাইয়া আপনিই বলুন, আল্লাহ ছাড়া মানুষের পরীক্ষা কি অন্য কেউ নিতে পারে? ”
আরমান দুই পাশে মাথা ঝাঁকিয়ে না বলে।
ফিহা আবার বলে
__“ তাহলে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের পরীক্ষা নিয়ে আল্লাহ বিরোধী কাজ করছে না, বলুন আপনি? ”
আরমান উপর নিচে মাথা ঝাকিয়ে বলে,
“ হ্যাঁ করছে। কিন্তু হয়েছে টা কি? ”
মিমের মুখটাও গম্ভীর। রাশেদ মিমের কাছে গিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলে,
— “কি হলো? পরীক্ষা খারাপ হলো নাকি?”
মিম মাথা নাড়িয়ে বলে, “না।”
রাশেদ আবার জিজ্ঞেস করে,
“তাহলে মুখ কালো কেন?”
মিম এবারও চুপ। চোখে জল চিকচিক করে ওঠে।
আরমান চারদিকে তাকিয়ে খুঁজে বেড়ায় জারাকে। তার চোখে একরকম অস্থিরতা।
— “মানজারা কোথায়?” সে প্রশ্ন করে।
ফিহা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
_ “হলে বসে আছে।”
— “কেন?”
মিম এবার বলে,
_ “স্যার ওর খাতা বাতিল করেছে।”
আরমান থমকে যায়। মুখে একটা চাপা রাগ ফুটে ওঠে।
— “কেন?”
— “বলেছে ও কপি করছে। অথচ ও শুধু গার একটু বাঁকা করেছিল। স্যার নাকি বলেছে, প্রেম করে বেড়ায়, পড়াশোনায় মন নেই।”
এই কথা শুনেই আরমানের চোখ লাল হয়ে ওঠে। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু বুকের ভেতর আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। সে দ্রুত হলে ঢোকে। ওর পেছনে দৌড়ে আসে বাকিরা।
হলের ভেতরে নীরবতা। শেষ সারির এক কোণে বসে আছে জারা। মাথা নিচু, মুখে হাত। চোখের কোণে লোনা অশ্রু জমে আছে। খাতাটা পাশে পড়ে আছে টেবিলের ওপর।আরমান কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে ওর কাঁধে হাত রাখে।
— “বউ…”
এই একটি শব্দেই জারা ভেঙে পড়ে। আরমানের বুকে মুখ লুকিয়ে হুহু করে কাঁদতে শুরু করে।
আরমান ওর মাথায় হাত রেখে বলে,
— “কি হয়েছে বউ? কাঁদছো কেন?”
জারা কিছুক্ষণ নীরব থাকে। তারপর কাঁপা গলায় বলে,
— “স্যার বলেছে আমি কপি করছি… আমি নাকি প্রেম করি, কলেজে প্রেমিক নিয়ে আসি। সবাই নাকি জানে… আমি নাকি লজ্জাহীন মেয়ে।”
এই কথাগুলো যেন আরমানের হৃদয়ে বিষ ঢেলে দেয়। ওর চোখের রাগ তখন আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছে। ঠোঁট কামড়ে ধরে ধীরে ধীরে বলে,
— “চলো, আমাকে ওই স্যারের কাছে নিয়ে যাও।”
জারা যেতে চায় না। তার ভয় হয়, আরও বড় কিছু ঘটবে। কিন্তু আরমানের মুখের ভাব দেখে আর কিছু বলার সাহস পায় না। বাধ্য হয়ে সে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় প্রফেসরের কেবিনে।
কেবিনের দরজা আধখোলা। ভিতরে বসে আছেন সেই প্রফেসর।তার সাথে ওই পঞ্চাশ বছরের স্যারটা। মাথায় টাক, নাকে চশমা, চোখে অহংকার। তাদের সামনে কয়েকটা খাতা ছড়ানো। আরমান ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়। কণ্ঠে কোনো উচ্চ স্বর নেই, কিন্তু গলায় চাপা ঝড়—
— “আপনি মানজারা’কে কপি করার অভিযোগ দিলেন কোনো কারণে? সে যে কপি করেছে তার কোনো প্রমাণ আছে আপনার কাছে ?”
প্রফেসর চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে আছে। আর গেস্ট টিচার বলেন,
— “হ্যাঁ, দিয়েছি। এই মেয়েরা আজকাল পড়াশোনায় নয়, অন্যদিকে বেশি মন দেয়। ক্লাসে প্রেম, মাঠে ঘোরাঘুরি— এমন ছাত্রীদের আমি সহ্য করি না।”
আরমানের বুকের ভেতর যেন কেউ আগুন জ্বেলে দিল। তার চোখে আর কোনো সংযম নেই। মুহূর্তের মধ্যেই হাত উঁচিয়ে এক ঘুষি গিয়ে বসে প্রফেসরের মুখে। চেয়ারে বসা লোকটা ছিটকে পড়ে যায় মেঝেতে। মুখ আর নাক দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছে। কাগজ, খাতা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।
রাশেদ আর জাহেদ দৌড়ে এসে আরমানকে থামাতে চায়।
— “ভাই থামো, থামো…”
কিন্তু আরমান তখন যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। তার চোখে শুধু অপমানের আগুন। যে মেয়ে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয়, তাকে আজ কেউ নির্দ্বিধায় অপমান করেছে, চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে — এই অপমান সে মেনে নিতে পারছে না।
জারা চিৎকার করে ওঠে,
__“ এসব করবেন না!”তার কণ্ঠে ভয়, কষ্ট আর ভালোবাসা সব মিলেমিশে একাকার।
আরমান থেমে যায়। চারদিকে নিস্তব্ধতা। প্রফেসর মাটিতে পড়ে গোঙাচ্ছে, আরমানের বুকের ভেতর ভারী শ্বাসের শব্দ। চোখে রাগের জায়গায় এখন অনুশোচনা।
বৃদ্ধ প্রফেসর এবার উঠে দাঁড়ায়।আরমানের দিকে আঙ্গুল তাক করে বলে
__“ এটা সরকারি কলেজ। এখানে এমন উৎশৃঙ্খল আচরণ আমি মেনে নিবো না।
আরমান ও ভেঙ্গ করে বলে
__“ এটা সরকারি কলেজ। তাই এখানে আমি হাগবো, মুতবো, গায়বো ফিরবো আপনার কী?”
প্রফেসর তব্দা খেয়ে যায় আরমানের কথা শুনে।
রাশেদ আর জাহেদ না চাইতেও হেসেই ফেলে। রাশেদ হাসি থামিয়ে বলে
__“ স্যার হাগবো মুতবো না, হাসবো খেলবো হবে! ”
__“ হাগা আর হাসা দুইটা একই কথা। ”
প্রফেসর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।যাকে আরমান ঘুসি মেরেছে। মুখে হাত দিয়ে দেখে। দাঁত খুলে চলে এসেছে। এসব মিম ফিহা সহ সবাই হেসে উঠে শুধু জারা ছাড়া।
আরমান বলে
__“ আমি আমার বউয়ের খাতা দেখতে চাই। এট এনি কোস্ট। ”
বৃদ্ধ প্রফেসর বলে
__“ আপনি যানেন, আপনার এই আচরণের জন্য ওদের কলেজে থেকে বের করে দিতে পারে? ”
আরমান কিছু বলতে নিবে তখনই এই রুমে প্রিন্সিপাল প্রবেশ করে। এই রুমে হাঙ্গামার শব্দ শুনে আসেন তিনি। রুমে এসে এই অবস্থা দেখে বকড়ে যান প্রিন্সিপাল।
__“ কী হচ্ছে এখানে? ”
সবাই এক এক করে পিছনে ঘুরে তাকায়। জারা, ফিহা আর মিম এর তো কলিজা শুকিয়ে যায় প্রিন্সিপাল কে দেখে। এখান কি হবে তাদের। যদি কলেজ থেকে বের করে দেয়?
কিন্তু এর মাঝে যা ঘটলো তা দেখে সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। আরমান প্রিন্সিপাল কে জড়িয়ে ধরে কোসল বিনিম করছে। প্রিন্সিপাল দেখে জাহেদ আর রাশেদ ও চিনে যায়।
__“ আরে ফুপা কেমন আছো তুমি? ” জড়িয়ে ধরে বলে আরমান।
জাহেদ ও এগিয়ে গিয়ে প্রিন্সিপাল কে জড়িয়ে ধরে। রাশেদ সালাম দেয়। কিন্তু এসবের কিছুই তিন বান্ধবী বোঝতে পারলো না।
__“ তোমরা এখানে হঠাৎ? কী হয়েছে? ” বলল প্রিন্সিপাল।
__“ হয়েছে তো অনেক কিছু ফুপা। ওই দুজন মিলে আমার বউয়ের খাতা বাতিল করে দিয়েছে!”
এই কথা শুনে যেনো আরমানের ফুপা আকাশ থেকে পরলেন। আরমান বিয়ে করে নিয়েছে আর ওরা কিছুই যানে না।
__“ বিয়ে? বউ? কবে? কখন করলে? ”
আরমান লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলে
__“ অনেক কথা ফুপা সময় করে এসে বলবো তোমায়! ”
__“ ফুপা তুমি এখানে কবে টান্সফার হলে? ” বললো জাহেদ।
এখন সব ক্লিয়ার হলো জারাদের। প্রিন্সিপাল আরমানের ফুপা হয়।
__“ এখানে এসেছি এক মাস হলো! ”
তারপর প্রিন্সিপাল ওই দুই প্রফেসর আর আরমান এক সাথে বসে কথা বলে সব মিট মটা করে। জারাদের খাতা চেক করে দেখে ইতি মধ্যে তাদের পাশ নাম্বার উঠে গেছে। তাি আর দ্বিতীয় বার পরীক্ষা নিতে হবে না।
প্রিন্সিপাল এসে জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।জারা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে দাঁড়ায় আরমানের পাশে । জারা কাঁপা হাতে তার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে আসে।
বাইরে রোদ পড়েছে মাঠের ওপর। বাতাসে ধুলোর ঝাপটা। সবাই নীরব।জারা কিছু বলে না। শুধু চুপচাপ হাঁটছে। পাশে হাঁটছে আরমান — নিঃশব্দ, ক্লান্ত, ভারী নিঃশ্বাসে ভরা। ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে এসে সবাই থেমে যায়। জারা নিচু স্বরে বলে,
— “আপনি ওনাকে মেরেছেন কেনো, স্যারের দাঁত ভেঙ্গে গেছে আপনার ঘুসি খেয়ে।”
আরমান মৃদু হেসে বলে,
— “আমি তোমার চোখে চোখ রেখে মিথ্যা অপমান সহ্য করতে পারতাম না বউ।”
জারার চোখে আবার জল আসে। কিন্তু এবার সেই জলে রাগ নেই, শুধু গভীর মমতা।দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে কলেজের শব্দ, ছাত্রদের কোলাহল, গাড়ির হর্ন — কিন্তু তাদের চারপাশে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে।
দূর থেকে মিম, ফিহা, রাশেদ, জাহেদ দৌড়ে আসে। কেউ কিছু বলে না। সবাই জানে, আজ যা হয়েছে, তার পেছনে ভালোবাসার গভীরতা আছে — অথচ ভালোবাসাই আজ ঝড় ডেকে এনেছে।
আকাশে সূর্য একটু একটু করে ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। মাঠে ছায়া লম্বা হচ্ছে।
আরমান শেষবারের মতো কলেজ ভবনের দিকে তাকায়। তারপর জারার হাত ধরে ধীরে বলে,
— “চলো, এবার বাসায় যাই। অনেক ক্লান্ত।”
জারা কিছু বলে না, শুধু মাথা নেড়ে হাঁটতে শুরু করে। তাদের পিছনে পড়ে থাকে এক অস্থির দল।
সময় যেন খুব দ্রুত কেটে যাচ্ছে। চোখের পলকে আরও দুইদিন পার হয়ে গেছে। মিম আর রাশেদের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে— সামনের শুক্রবার। বাড়ির সবাই ব্যস্ত, চারদিকে এক ধরনের আনন্দঘন পরিবেশ। তবুও কোথাও একটা চাপা চিন্তা রয়ে গেছে, বিশেষ করে মিমের বাবার মুখে। মেয়ের বিয়ে মানে তো শুধু আনন্দ নয়, দায়িত্বও বটে।
এই ভারটা একরকম নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে আরমান। সেক্রেটারি হিসেবে নয়, যেন নিজের ভাই,তার পরিবারেরই কেউ। সে ঠিক করে ফেলেছে— বিয়ের সব খরচ সে দেবে। মিমের বাবা অনেক বুঝিয়েও তাকে থামাতে পারেননি। আরমান শুধু বলেছিল, “মিম আমার ছোট বোনের মতো, ওর বিয়ে হবে রাজকন্যার মতো।”
তার পর থেকেই বাড়িতে প্রস্তুতি শুরু। মানুষ দাওয়াতের দায়িত্ব শুধু মিমের বাবার। ওনার যতো জনকে মন চায় দাওয়াত করতে পারেন ।আর অন্যসব গহনা, কাপড়, রান্নার আয়োজন— সব কিছুর ভার আরমানে।আরমানের বাবাও পই পই করে বলেছে মেয়ের বাবার উপর যেনো কিছু চাপ না পরে। আরমান সারাদিন বাইরে, দোকান থেকে অর্ডার দিচ্ছে, ফোনে কথা বলছে, আবার বিকেলবেলায় রাশেদকে নিয়ে মিমের বাড়ি যাচ্ছে।
বিয়ের আর মাত্র চার দিন বাকি। সন্ধ্যার দিকটা আজ কেমন যেন নিস্তব্ধ। বাতাসে একধরনের স্নিগ্ধতা, কিন্তু তার মধ্যেও বিদায়ের গন্ধ লেগে আছে। কারণ সকালে বিকেলেই আরমান ময়মনসিংহে যাবে— তাদের বাড়ির প্রস্তুতি দেখতে।
জারা জানে, আরমান আজ আসবে দেখা করতে। তাই বিকেল গড়াতেই সাদে এসে বসে আছে সে। হালকা গোলাপি পোশাকে, চুলগুলো খোলা, মুখে মিষ্টি প্রশান্তি। বাইকের শব্দ শুনে বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে। গেটের পাশে এসে থামে বাইকটা। জারা দৌড়ে সাদ থেকে নামে।
আরমান নামল ধীর ভঙ্গিতে। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে সেই পরিচিত মমতা। দুজনের চোখাচোখি হতেই সময় যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়। তারা একসাথে গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। বাতাসে শুকনো পাতার ঝিরঝির শব্দ, দূরে পাখির ডাকে বিকেলটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে।
আরমান নিচু স্বরে বলে,
“ সে কাল বিকেলে ময়মনসিংহে যাবে। বিয়ের সব কিছু ঠিকঠাক দেখতে হবে। জারা কিছু বলে না, শুধু মাথা নিচু করে থাকে। তার চোখে অদ্ভুত এক কষ্ট জমে আছে।
বাতাসে নরম গন্ধ, গাছের পাতা দুলছে আস্তে আস্তে। দূরে কোথাও বাচ্চারা খেলছে, কিন্তু এখানে সময় যেন অন্য ছন্দে চলছে। দুজনেই চুপ। কিছু কথা মুখে না বললেও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
জারা অবশেষে বলে,
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৭
__“আপনি চলে গেলে এখানে খুব ফাঁকা লাগবে।” কথাটা খুব নরম, কিন্তু ভারি হয়ে ঝুলে থাকে।
আরমান চুপ করে থাকে। তার চোখে চিন্তা, দায়িত্ব, ভালোবাসা— সব একসাথে। মনের ভেতরে কিছু কথা ঘুরছে, কিন্তু উচ্চারণ হয় না। সে শুধু জারার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়।
আকাশের রঙ ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। রোদের কমলা আভা জারার মুখে পড়ে যেন আরও কোমল করে তুলেছে তাকে। এই দৃশ্যটা আরমান মনে রাখতে চায়— ঠিক যেমন থাকে প্রিয় কোনো বিকেলের শেষ আলো।
