Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৮ (২)

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৮ (২)

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৮ (২)
সোহানা ইসলাম

সকাল আটটা বাজে। বাড়িটা আজ কেমন যেন নীরব। জোহান ঘুম থেকে উঠেই জারার কাছ থেকে শুনেছে, আরমানরা আজ ময়মনসিংহে চলে যাবে। কথাটা শুনেই ওর মনটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল। চুপিচুপি কারও কিছু না বলে বেরিয়ে গেল বড় মাঠের দিকে।
মাঠে তখন সকালের রোদে ঘাসগুলো ঝলমল করছে। দূরে দেখা যাচ্ছে আরমানকে।হাতে দুটি ছোট ঝুড়ি। আরমান মাএ জারাদের বাড়ির দিকে যাবে বলে বের হয়েছে। জোহান কাছে যেতেই আরমান হেসে বলল,
__“এই নে, এগুলো আমার বউয়ের জন্য।”
জোহান অবাক হয়ে দেখে, দুই ঝুড়িতে মোট দশটা খরগোশ — পাঁচ জোড়া। সাদা, ধূসর আর বাদামি রঙের ছোট ছোট প্রাণীগুলো একে অন্যের গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে।
আরমান জানে, তার “লক্ষী বউ” খরগোশ খুব ভালোবাসে। তাই বিদায়ের আগে শেষ উপহার হিসেবে এগুলো রেখে যেতে চেয়েছে। সে তো আসবেই আবার। কিন্তু এই অল্প সময়টাও দীর্ঘ মনে হচ্ছে তার।

__“ দুলাভাই তুমি চলে যাচ্ছো?” বলল জোহান
আরমান জোহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে
__“ হুমম! কিন্তু আবার আসব।এসে তোর বোনকে আমার সাথে নিয়ে যাব। ”
__“ আমাকে নিবে না? ” জোহানের চোখ ছলছল।
আরমানের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে। এই পটলের সাথে ঝগড়া হলেও আরমান জানে জোহান ওকে অনেক ভালোবাসে।
__“ তোকে ও নিয়ে যাবো আমার। ” জোহানের নাকে টুকা দিয়ে বলে।
জোহান খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়, কিন্তু খরগোশগুলো বহন করা তার জন্য বেশ কষ্টকর। তবুও ছোট্ট শরীরে সবটুকু জোর লাগিয়ে, কষ্ট করে কাঁধে ঝুড়ি তুলে নেয়। রোদে ঘামছে, হাঁপাচ্ছে, তবুও মুখে হাসি লেগে আছে— কারণ সে জানে, এই উপহার তার বোনকে খুব খুশি করবে।
বাড়িতে পৌঁছে দরজার সামনে ডাক দেয়,

__“বোনু, তাড়াতাড়ি এসো, তোমার জন্য কিছু এনেছি!”
জারা তখন চুপচাপ বসে আছে। আরমান আজ চলে যাবে ভেবে মনটা ভার হয়ে আছে তার। কিন্তু বাইরে ভাইয়ের ডাক শুনে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। দরজার সামনে এসে চোখে পড়ে— দশটা ছোট খরগোশ লাফাচ্ছে মাটিতে। মুহূর্তেই তার মুখে হাসি ফোটে। মন খারাপ যেন কোথায় মিলিয়ে যায়।
ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ আসে।
আরমান লিখেছে: “খরগোশগুলো পছন্দ হয়েছে, লক্ষী বউ?”
জারা মৃদু হেসে রিপ্লাই দেয়, “অনেক।” তারপর একটা সাদা খরগোশ কোলে তুলে নেয়।
এই দৃশ্য দেখেই মারজিয়া বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
__“এই এতো গুলো খরগোশ কোথা থেকে এলো?”
জোহান এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, সত্যি বললে আবার বকুনি খেতে হবে। তাই বলে,

__“আমার দশ টাকা ছিলো, আব্বু সকালে দিয়েছে। ওই টাকা দিয়ে কিনেছি।”
মারজিয়া বেগম কপাল কুঁচকে বলেন,
__“দশ টাকায় কেউ খরগোশ দেয় নাকি?”
ঠিক তখনই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আনিছুর রহমান বিষয়টা শুনে ফেলেন। তিনি মৃদু হেসে জোহানের মাথায় হাত রাখলেন।কিন্তু মারজিয়া বেগম জোহানের কানে ধরে বলে
__“তোর মাকে দেখে বোকা মনে হয়, হ্যাঁ?”
জোহান কান পেঁচিয়ে ধরা পড়তেই তাড়াতাড়ি বলে উঠল,
__“আব্বু, আব্বু —বাঁচাও!”
জারার মুখে হাসি ফোটে, তাড়াতাড়ি করে ছোট ভাইকে বাঁচাতে বলে,
__“আম্মু, আসলে আমি টাকা দিয়েছি। জমানো কিছু টাকা ছিলো আমার।”
মারজিয়া বেগম গজগজ করতে করতে চলে যান,__“এরা একদিন আমার মাথা খাবে!”
ঘরের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। আনিছুর রহমান হেসে বলেন,
__“তোমাদের আম্মু যা খুশি বলুক, তোমরা খুশি মানেই আমারও খুশি।”
জোহান তখন মাটিতে বসে খরগোশের লেজ ধরে খেলছে, আর জারা নিঃশব্দে খরগোশগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে— যেন ওই ছোট ছোট প্রাণীগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রিয় মানুষের উপস্থিতি, ভালোবাসা আর যত্নের নিঃশব্দ চিহ্ন।

রাত প্রায় আটটা বাজে। ইসলামপুর গ্রাম থেকে ফেরার পথে আরমানের মাথা এখনো ভার ভার লাগছে। বাইক চালিয়ে পুরো রাস্তায় মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে ছিল। ক্লান্ত শরীর, তবুও যেন ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। রাশেদ আর জাহেদ এসেছিল আরমানের কালো মার্সিডিজে, কিন্তু ওরা দুজনও ক্লান্ত মুখে বাড়িতে ঢুকল। বাড়ির আঙিনায় তখন আলো ঝলমলে, মেহমানদের ভিড়ে টুংটাং শব্দে ভরে গেছে পুরো খান মহল। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ গল্প করছে।বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে।
আরমান ধীরে ধীরে নিজের রুমে ঢুকতেই বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল। রুমটা একেবারে যেমন ছিল, তেমনই — কিন্তু তার মনে হলো কিছু যেন নেই। কিছু একটা কমতি। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে, অস্থির লাগছে।
ও জ্যাকেট খুলে বেডের ওপর ছুড়ে মেরে গলা ছেড়ে ডেকে উঠল,

__“আম্মু! আম্মু কই তুমি?”
ফারিয়া বেগম রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন। চোখ লাল, মুখে অস্থির ভাব।
__“কি হইছে রে আব্বু, এমন দেখাচ্ছে কেন?”
আরমান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
__“আমার রুম খালি খালি লাগছে আম্মু।”
ফারিয়া বেগম একটু অবাক হয়ে চারদিকে চোখ বুলালেন। আলমারি জায়গায় আছে, বিছানার চাদর ঠিকঠাক, ঘড়ি টিকটিক করছে, বাতাসে হালকা সুগন্ধ।
__“সব তো ঠিক আছে । খালি খালি মানে?”
ঠিক তখনই ছোট আম্মু, জেসমিন বেগম, দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
__“কি হয়েছে ভাবি? এমন ডাকাডাকি করছে কেন আরমান?”
ফারিয়া বললেন,

__ “তোদের গুনধর বড় ছেলের রুম নাকি ফাঁকা লাগছে। তুই দেখ তো একটু জেসমিন!”
জেসমিন বেগম ভেতরে ঢুকে তাকালেন।
__“আরমান, সব তো ঠিক আছে বাবা। রুমে কেউ আসে না, জিনিসপত্র আগের জায়গায়। তুই একটু ভালো করে দেখ।”
কিন্তু আরমান মাথা নাড়ল,
__“না ছোট আম্মু, কিছু একটা নাই। আমি জানি আমার রুমে একটা জিনিস নাই।”
এমন গম্ভীরভাবে বলায় দুইজন মহিলাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। ভাবলেন, হয়তো কিছু হারিয়েছে। ফারিয়া বেগম বললেন,
__“আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা দেখচ্ছি।”
দু’জন মিলে আলমারি খুলে দেখা, টেবিলের ড্রয়ার চেক করা, জানালার পাশে তাকানো— একদম তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলেন পুরো রুম। কিন্তু কিছুই মেলে না।
আরমান আবার গলা ছেড়ে চিৎকার দিল,
__“আব্বু! আব্বু! আমার রুমে আসো তাড়াতাড়ি!”
আরিফ খান বিরক্ত মুখে ঘরে ঢুকলেন,

__“কী হইছে আবার? বাড়িতে এতো মেহমান, আর এতো রাতে কিসের হৈচৈ?”
এবার পুরো পরিবার হাজির। রোহান,জিনিয়া, রাশেদ, জাহেদও দাঁড়িয়ে আছে কোণের পাশে।আরমানের ছোট চাচাও চলে আসে। সবাই মিলে রুমের প্রতিটি কোণা চেক করে ফেলল, কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। সবাই হাঁপিয়ে বসে পড়ল সোফা, বেড আর ডিভানে। আটটা থেকে খুঁজা শুরু করেছে। এখন দশটা বাজে।
আরিফ খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
__“এই সময়েও নাটক না করলে তোর হয় না । এখন আবার কী হারিয়েছে বল? একটা জিনিসের জন্য এতো হয়রানি হওয়ার মানে হয়। নতুন করে কিলে নিলেই তো হয়।”
আরমান কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
__“তোমরা কিছুই পাবে না আমার রুমে।”
ফারিয়া বেগম কপাল ঠুকে বললেন,
__“আবার রহস্য শুরু করল দেখছি। না পেলে কী বললো আমরা।কি নাই সেটা বল!”
আরমান মুখ গম্ভীর করে একদম নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
__“ওই জিনিস আমাকে কখনোই তোমরা দাও নাই।”

সবাই চুপ। একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। ফারিয়া বেগম ধৈর্য ধরে জিজ্ঞেস করলেন,
__“কি দেই নাই তোকে? যা চাইবি এনে দিবে এখন তোর আব্বু, এখন নাটক বন্ধ কর বাপ।বাড়িতে অনেক মেহমান।”
আরমান এক লম্বা নিশ্বাস ফেলল, চোখ আধবোজা করে বলল,
__“আমার ঘরে বউ নাই, আম্মু।”
পুরো রুমটা এক মুহূর্তে থমকে গেল। তারপর ফারিয়া বেগম প্রথমে মুখে হাত চাপা দিয়ে চেয়ে থাকলেন ছেলের দিকে,তারপর বললেন,
__“কি বললি তুই? নির্লজ্জের মতো রাত দশটায় বউ চাইছিস তুই?”
জেসমিন বেগম মুখ লুকিয়ে নিজের দুই মেয়ে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। রোহান,রাশেদ আর জাহেদ মুখ নিচু করে হাসি আটকাতে পারছে না। হাসি আটকাতে গিয়ে দুজনের মুখ লাল।
ফারিয়া বেগম ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন,
__“তুই একদম পাগল হয়ে গেছিস আরমান। এই রাতে এইসব কি নাটক শুরু করলি তুই। তোর মাথা ঠিক আছে তো?”
বলেই বেরিয়ে গেলেন। আরিফ খান তখনো বসে ছিলেন সোফায়। তিনি একটুখানি হেসে উঠে বালিশটা তুলে ছেলের দিকে ছুড়ে মারলেন।

__“এই নে, তোর বউ! এখন সুখে ঘুমা!”
আরমান হেসে কেচ ধরে বালিশটা। তারপর বলে ,
__“এইভাবে বউ পাওয়া যায় না, আব্বু। আমি বিয়ে করব।আমার বউ লাগবে এখনই।”
আরিফ খান এবার গলা ভার করে বললেন,
__“বিয়ে? বউ?এখনই? তুই কি পাগল হইছিস? কাল থেকে কতো কাজ আছে,রাশেদের বিয়ের। আর এখন তুই তোর বউয়ের চিন্তা করছিস?”
আরমান নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
__“অন্যনের বিয়েতে কি আমায় বউ দেবে কেউ? আমি বয়সে ছোট না, আমারও মন আছে! বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে মন চায় ।”
আরিফ খান চোখ কুঁচকে বললেন,
__“তোর মন আছে,কিন্তু তোর বুদ্ধি নাই। তুই বউ ঘরে আনার আগে, একটু মানুষ হ।”
রােহান পেছন থেকে বলল,
__“আঙ্কেল, আমরা তো দেখলাম আরমানের রুম খালি খালি লাগছে, হয়তো সত্যিই বউটা দরকার।”
জাহেদ হেসে যোগ করল,

__“হ্যাঁ, বড় আব্বু রুম ফাঁকা লাগছে, ভাইয়াকে বিয়ে করিয়ে দাও ।”
আরিফ খান চোখ গোল করে তাকালেন দুজনের দিকে,
__“তোমরা দুজনও কিছু দিন পর একই কাণ্ড করবে মনে হচ্ছে।”
রোহান মাথা চুলকে লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলে
__“ এমন করব না আঙ্কেল! তার আগে আমার আর চাঁদ সুন্দরী বিয়ে ঠিক করে ফেলুন।”
আসিখ খান রোহানকে ভেঙে করে বলেন
__“ সপ্ন দেখতে থাকো বাছাধন! আমার ফুলের মতো নিস্পাপ মেয়েকে, তোমার মতো ছাগলের কাছে কিছুতেই দিব না। ”
__“ ছাগল কিন্তু ফুল বেশি পছন্দ করে শশুড় আব্বা। আমিও কিন্তু চুরি করে আপনার নিস্পাপ ফুলটা টুপ করে খেয়ে ফেলবো!”
রোহানের দিকে বালিশ ছুড়ে মারেন আসিফ খান।
__“ নির্লজ্জ ছেলে! ”
আরমান এখন বেডে বসে মুচকি হাসছে। তারপর জারা’র একটা মিষ্টি দেখতে ছবি বের করে বলে
__“আব্বু,এই দেখো,তোমার ছেলের বউ।”
__“কি?”— আরিফ খান হাঁ করে তাকালেন।
__“তুই এই পুচকে মেয়েকে বউ বলছিস? দেখে তো মনে হচ্ছে এখনো স্কুলেই ভর্তি হয়নি?”
__“ এই পুচকে মেয়ে স্কুলে নয় কলেজে পরে আব্বু ।”
রোহান,রাশেদ, জাহেদ হেসে লুটোপুটি।
আরিফ খান হাত তুলে বললেন,

__“এই পাগল ছেলেকে কে সামলাবে বলো তো!”
ঠিক তখনই ফারিয়া বেগম ফিরে এসে রুমের দরজায় দাঁড়ালেন।
__“কি হয়েছে আবার?”
আরিফ খান হেসে বললেন,
__“তোমার ছেলে একটা দশ বছরের মেয়ের ছবি দেখিয়ে বলে এটা নাকি আমাদের হবু বউ মা।”
ফারিয়া বেগম ভুরু কুঁচকে বললেন,
__“আপনার এই গাধা ছেলের মুখ বন্ধ করুন । কাজের চাপে মাথার তার সবগুলো ছিড়ে গেছে মনে হচ্ছে।”
আরমান নাটকীয়ভাবে বলল,
__“আম্মু, তুমি দেখো, এই মেয়েকে সামনে থেকে দেখলে তোমাদের হুস উড়ে যাবে!”
ফারিয়া বেগম হেসে ফেললেন এবার,
__“তুই না থাকলে আমাদের বাড়ি বোরিং হয়ে ছিলো আরমান। এখন নাটক বন্ধ কর !”
সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে।
আরমান বলে

__“ আমি ওকে বিয়ে করে নিয়েছি। এখন বলো কবে আমার সাথে ওর বাড়িতে যাবে?”
ফারিয়া বেগম বলেন
__“ যেদিন তোর মাথা ঠিক হবে!”
এই বলে আরিফ খান আর ফারিয়া বেগম রুম থেকে বের হয়ে চলে যান।
আরমান পিছন থেকে চিৎকার করে বলে
__“ আমি কিন্তু সত্যি কথা বলছি! ”
“ ঘুমা পাজি ছেলে। ”এই বলে আর দাঁড়ালো আরমানের আব্বু আম্মু।
রাশেদ বলে,
__“ স্যার আমার মনে হয় ভাবিকে আরও বড় হতে হবে। সবাই ছোট মনে করছে।”
আরমান চোখ টিপে বলল,
__“ বউ বড় লাগবে না। আগে আমার রুমটা সাজা, খালি খালি লাগে।বিয়ের ব্যবস্থা কর আমার।”
আসিফ খান হেসে উঠে। ভাতিজার কাঁধে হাত রাখলেন,
__“যেদিন তুই মানুষ হবি, সেদিন তোর বউ আমি নিজে এনে দিব। আপাতত ঘুমা।”
আরমান মুখ নিচু করে বলল,
__“ঠিক আছে ছোট আব্বু , কিন্তু মনে রেখো, এই রুমে এখনো জায়গা খালি। আর রাশেদের বিয়ের পর আমি বিয়ে করব।”
সবাই আবার হেসে ওঠে। বাইরে রাত নেমেছে অনেক, বাতাসে পাখির ডাকে বাড়িটা যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে— ঠিক যেমনটা হয়, যখন ঘরে একটা পাগলাটে কিন্তু প্রাণবন্ত ছেলে থাকে, নাম তার আরমান খান।

রাত একটা। পুরো খান বাড়িটা নিস্তব্ধ। বাইরের কুকুরের দূর ডাকে কেমন একটা নিরবতা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া, কিন্তু আরমানের চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, কিন্তু মনের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে আছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে একটাই মুখ — মানজারা’র মুখ।
ঠিক তখনই, টিং— একটুখানি মেসেজের শব্দ।
আরমান মুহূর্তেই চোখ খুলে মোবাইল তুলে নেয়। স্ক্রিনে লেখা— “লক্ষ্মী বউ ❤️”।
মেসেজে লেখা,
__“ঘুমিয়ে গেছেন স্বামীজান?”
আরমানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। আঙুল চালিয়ে রিপ্লাই দেয়,
__“না লক্ষী বউ, ঘুম আসছে না। তুমি জেগে আছো কেন?”
দূর ইসলামপুর গ্রামের অন্য প্রান্তে জারা বসে আছে বিছানায়। আলো নিভে গেছে, শুধু মোবাইলের পর্দা তার মুখে আলো ফেলছে। জারা’র পাশে শুয়ে আছে জোহান।
জারা লিখে,

__“আমিও ঘুমাতে পারছি না। আপনায় খুব মিস করছি। সামনে থেকে দেখতে মন চাচ্ছে।”
এই এক লাইন পড়তেই আরমানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে ওঠে। মিস করছে— এই কথাটাই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতি। আরমান লিখে পাঠায়,
__“আমিও তোমায় মিস করছি বউ। কী করব, দূরে আছি বলেই এমন লাগছে।”
কথার পর কথায় চলে তাদের আলাপ। কখন ‘শুভরাত্রি’র জায়গায় ‘মিস ইউ’ এসে গেছে, কেউ জানে না। তারপর হঠাৎ জারা লিখে,
__“আপনি এখন যদি আমার সামনে থাকতেন।”
এই কথাটা যেন আরমানের বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দেয়। সে চুপচাপ উঠে বসে। এক মুহূর্ত ভাবে— সত্যিই যদি ওর সামনে যেতে পারত!
তারপর আর দেরি করে না। ভিডিও কল বাটন টিপে দেয়। স্ক্রিনে জারা’র মুখ ফুটে ওঠে। মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে, চোখে ক্লান্তি, তবুও যেন অদ্ভুত মায়া লেগে আছে। আরমানের গলায় কাঁপুনি এসে যায়,
__“এই কয়েক ঘন্টায় কেমন হয়ে গেছো তুমি…”
জারা হালকা হাসে, তারপর নিচু গলায় বলে,

__“অনেক মিস করছি আপনায়, স্বামীজান। মন চায় এখনই আপনার সামনে গিয়ে বসে থাকি।”
__“দুইদিন পর তো দেখা হবেই বউ।”
__“দুইদিন অনেক সময়। আজই যদি একটু দেখতে পেতাম…”
এই এক বাক্যই যথেষ্ট ছিল। আরমানের চোখে এখন আর ঘুম নেই, শুধু তাড়াহুড়ো। যেন ওর ভেতরের প্রতিটি স্পন্দন বলছে— যেতে হবে। এখনই যেতে হবে।
সে ফোন রেখে উঠে দাঁড়ায়। বেড সাইড টেবিল থেকে বাইকের চাবি তুলে নেয়। ব্যাগে আগে থেকে কেনা কিছু উপহার রাখা।ময়মনসিংহে আসার সময় জারার জন্য কিনেছিলো সে। একটা লাল শাড়ি, আর একটা ছোট গিফট বক্সের ভেতর চার ভরি সোনার ব্রেসলেট। সেদিন জারা ওর হাতে দেখে বলেছিল,“এই ডিজাইনটা আমার খুব ভালো লাগে।” আরমান তখনই মনে মনে ভেবেছিল— একদিন ঠিক ওকেও এমন একটা দেবে।
বাইরে বের হওয়ার আগে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নিচতলায় ফারিয়া বেগমের রুম থেকে হালকা আলো বের হচ্ছে। একটু ইতস্তত করে তারপর নিচে নামে।

__“আম্মু,” ডাকে সে, নিচু গলায়।
ফারিয়া বেগম আধো ঘুমে চোখ খুলে দরজায় এসে বলেন,
__“এই রাতে কোথায় যাচ্ছিস ?”
__“বউয়ের কাছে যাচ্ছি, আম্মু,” বলে হাসে।
ফারিয়া বেগম ভুরু কুঁচকে তাকান।
__“এই রাতে পাগল হইছিস নাকি?যা রুমে গিয়ে ঘুমা বাপ আমার। ”
আরিফ খানও রুম থেকে বেরিয়ে আসেন,
__“আবার কোথায় যাচ্ছিস?”
__“বউকে দেখতে, আব্বু। বউ কাঁদছে।”
দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন— ছেলেটা মজা করছে নাকি সত্যিই বলছে।আরমান হাসতে হাসতে বলে,

__“দোয়া করো, বউকে দেখে সকালে ফিরব।”
ফারিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
__“এই ছেলেকে ডাক্তার দেখান তাড়াতাড়ি! মাথা নষ্ট হয়ে গেছে ওর!”
আরমান গেট খুলে বেরিয়ে আসে। কালো বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়, আর হাওয়ার বেগে ছুটে যায় ইসলামপুর গ্রামের পথে।
রাতের রাস্তাগুলো ফাঁকা। বাতাসে কুয়াশার ছোঁয়া। আসার সময় একটা বড় লাল গোলাপেট তোড়া নেয় জারার জন্য আরমান। রাস্তার লাইট গুলো ঝাপসা লাগছে। কিন্তু আরমানের চোখে একটাই ছবি— জারা’র হাসিমুখ।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর, যখন দিগন্তে ভোরের আভা দেখা দিচ্ছে, তখন বাইকটা ঢোকে ইসলামপুরে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। পাখিরা তখনো জেগে ওঠেনি।
আরমান মোবাইল বের করে জারাকে কল দেয়। প্রথমবার ধরে না। হয়তো ঘুমিয়ে ছিল।দ্বিতীয় বারেই ধরল জারা, ঘুম জড়ানো গলায় বলে,

__“এই ভোরে কল দিলেন যে?”
আরমানের কণ্ঠে হাসি,
___“বের হও একটু।”
__“কী?”
__“বের হও, আমি এসেছি, বউ।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। জারা ঘুমকে বিদায় দিয়ে বিছানা থেকে নামে। তারপর হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ। পরনের হালকা নীল জামা, চুল এলোমেলো, পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে আসে জারা।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে আরমান। ভোরের কুয়াশায় ওর মুখটা আধা ঢাকা, কিন্তু চোখের মায়াটা স্পষ্ট। জারা কিছু না বলে দৌড়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে। দু’জনের বুকের ভেতর একই ছন্দে ধকধক করছে।
দু’জন কিছুক্ষণ একদম চুপ। শুধু বাতাসের মৃদু শব্দ। তারপর আরমান ধীরে জারা’র কাঁধে হাত রেখে বলে,
__“এই জন্যই তো বলেছিলাম— ঘুম আসছিল না।”
জারা নিচু গলায় বলে,

__“আপনি কী পাগল। এত দূরে রাতবিরেতে চলে এলেন?”
__“বউ আমাকে মিস করছে— আর আমি আসব না, তার সাথে দেখা করতে? ”
জারা হেসে ফেলে, চোখে জল চিকচিক করছে।
__“ এখনো বারো ঘন্টা ও হয়নি আপনি ময়মনসিংহে গেছেন, তার মধ্যে আবার চলে এসেছেন। নিশ্চয় খুব কষ্ট হচ্ছে?”
আরমান জারা’র কপালে চুমু দিয়ে বলে
__“ তোমার হাসির কাছে, এই কষ্ট কিছু না বউ!”
আরমান ব্যাগ থেকে লাল শাড়িটা বের করে এগিয়ে দেয়।
__“তোমার জন্য। লাল রং তোমার প্রিয় তাই না বউ?”
জারা শাড়িটা হাতে নিয়ে বলে,
__“এতো সুন্দর! কিন্তু এটা কেন?”
__“কারণ আমি যখন আমার পরিবার নিয়ে তোমার বাড়িতে আসবো তখন তুমি এটা পরবে।” আর এটা,”— বলে ছোট গিফট বক্সটা এগিয়ে দেয়।
জারা খুলে দেখে সোনার ব্রেসলেট। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যায়।
__“স্বামীজান! এগুলো তো অনেক দামি ?”
আরমান হেসে বলে,

___“তুমি যেদিন আমার হাতের টার দিকে তাকিয়ে ছিলে,জেদ করে নিয়ে ছিলে, সেদিনই ঠিক করেছিলাম, একদিন তোমার জন্য আনব।”
জারা কিছু বলতে পারে না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে আরমানের চোখের দিকে।
আকাশে তখন ভোরের লালচে আলো ছড়াতে শুরু করেছে। পাখির ডাক, দূরের নামাজের আজান— সব মিলে পরিবেশটা যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠেছে।
জারা ধীরে বলে,
__“দেখোন,সূর্য উঠছে। আপনার সাথে এমন সকাল যেনো প্রতি ভোরে হয় স্বামীজান।”
আরমান মৃদু হাসে,
__“এই সূর্য ওঠা যতদিন থাকবে, ততদিন তোমায় ভালোবাসব লক্ষী বউ।”
জারা ওর দিকে তাকিয়ে বলে,
__“আপনি এখনই চলে যাবেন?”
আরমান উত্তর দেয় না। শুধু একবার জারা’র চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।তারপর বলে,
__“ এখন ভেতরে যাও। কেউ দেখে ফেললে বিপদ হবে।”
জারা একটু থেমে বলে,

__“আপনি ফিরবেন এখন?”
__“হ্যাঁ, এখনই চলে যাব।সকাল হওয়ার আগেই পৌঁছাতে হবে।”
__“আচ্ছা, কিন্তু বাড়িতে পৌঁছে কল দিবেন আমায়।মনে থাকবে?”
আরমান হেসে বলে,
__“ যথা আগা আমার রানী সাহেবা!”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৮

দু’জনের চোখে তখন শুধু ভালোবাসার নরম আলো। আরমান বাইক স্টার্ট দেয়, পেছনে তাকিয়ে শেষবারের মতো তাকায়— জারা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়, হাতে লাল শাড়ি, চোখে ভালোবাসা।
বাইকটা ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যায়।
পেছনে ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটে ওঠে।
আর এই ভোরের সূর্যের মতোই, ওদের ভালোবাসাও আজ যেন এক নতুন আলোয় জ্বলে ওঠে— নীরব, গভীর, আর চিরন্তন।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here