রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৯
সোহানা ইসলাম
সময় কত দ্রুত চলে যায়, কেউই টের পায় না। আজ মিমের গায়ের হলুদ। সকাল থেকেই মিমদের বাড়িতে উৎসবের আমেজ। উঠোনে লাইট ঝুলছে, বাতাসে মিশে আছে হলুদের গন্ধ আর হাসির শব্দ।
মিমের বাবা সকাল থেকে একের পর এক আত্মীয়কে ফোন করে দাওয়াত দিচ্ছেন। কিন্তু সবার আগে যাদের কথা বললেন, তারা হল জারা আর ফিহা — মিমের দুই প্রিয় বান্ধবী। ওনার মেয়ের বিয়েতে তাদের উপস্থিতি না থাকলে যেন পুরো অনুষ্ঠানটাই অসম্পূর্ণ। তাি সবার আগে ওই দুই পরিবার আগে দাওয়াত করেন।
আরমান বিয়ের পুরো আয়োজন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। ডেকোরেশন, ক্যাটারিং, পার্লারের লোক, এমনকি ক্যামেরাম্যান পর্যন্ত—সব কিছু দুদিন আগেই ঠিক করে দিয়েছে সে। মিমের বাবার মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি। আরমান ছেলের বড় এবং মিমের বর ভাই হিসেবে যেমন দায়িত্ব নিচ্ছে , তাতে তাঁর আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
ওদিকে জারা সকাল থেকেই ব্যস্ত নিজের জিনিসপত্র গোছাতে। সে জানে, আজ থেকেই তাকে মিমদের বাড়িতে থাকতে হবে,প্রিয় বান্ধবীর বিয়ের সব কাজ সামলাতে হবে। তাই নিজের পোশাক, গয়না, প্রসাধনী—সব এক এক করে ব্যাগে ভরছে। তার রুমের দরজার কাছে তখন হাজির ছোট ভাই জোহান, হাতে বিশাল এক ব্যাগ।
জারা অবাক হয়ে বলে,
— “এই জোহান, এতো বড় ব্যাগ কেনো?”
জোহান গর্বের ভঙ্গিতে বলে,
— “বিয়ে বাড়ি মানে মানুষে ভরা থাকবে। আমি কি এক জামা পরে ঘুরব? তাই সব জামা নিয়ে যাচ্ছি। একটু পর পর চেঞ্জ করব, সবাই তাকিয়ে থাকবে!”
জারা চুপ করে তাকিয়ে থাকে ওর ভাইয়ের মুখের দিকে। তারপর হঠাৎ হেসে ফেলে।
__“তুই কি ওখানে ফ্যাশন শো করতে যাচ্ছিস নাকি !” বলে ওর মাথায় আলতো চাপ দেয়।
এই সময়ে মারজিয়া বেগম রুমে ঢোকেন। মেয়ের হাসির শব্দে ভেতরে এসেই বলেন,
— “কি হচ্ছে রে আবার? সকালের ভেতর এত হইচই?”
জারা মায়ের দিকে ইশারা করে বলে,
__“এই দেখো আম্মু, জোহান পুরো আলমারি খালি করে ফেলেছে!”
মারজিয়া বেগম ছেলের ব্যাগ খুলে দেখেন—জামা, প্যান্ট, টিশার্ট, এমনকি ঘুমানোর পাজামা পর্যন্ত ভরা। মাথা নাড়িয়ে হেসে ফেলেন
___ “তুই বুঝি বিয়ের বর!”
জোহান গম্ভীর গলায় বলে,
__“আমি বরের ভাই!”
সবাই হেসে ফেলে। হাসির শব্দে বাড়িটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
সব গুছগাছ শেষ হলে জারা আয়নার সামনে বসে হিজাব ঠিক করে, হালকা সাজে মুখে একরাশ শান্তি। আজ ওর মনে অদ্ভুত এক আনন্দ—বন্ধুর বিয়ে, হাসি-খুশির সময়, আর সবকিছুর মাঝেই একটুখানি আবেগ।
বাইরে ফিহা এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়, মুখে হাসি।মিমের বাড়ি ওর বাড়ির কাছে হলেও একা যাবে না, জারা কে ছাড়া।
— “চল, মিম আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে!”
জারা ব্যাগ কাঁধে তুলে নেয়। জোহান তার পেছন পেছন ব্যাগ টেনে নিয়ে যায়। মারজিয়া বেগম দরজার কাছে এসে বলেন,
— “সাবধানে যাবে আম্মু। আর জোহানের দিকে খেয়াল রেখো, না হলে আবার সব জামা পাল্টাতে বসবে।”
জারা হেসে মাথা নাড়ে।রাস্তায় উঠার আগে একবার পিছনে তাকায়—বাড়িটার উঠোনে সকালবেলার আলো, মায়ের মুখের হাসি, আর জোহানের মুখে দুষ্টু উচ্ছ্বাস।
গ্রামের বাজারে এসে একটা গাড়ি নেয় ওরা। গাড়ি যখন মিমদের বাড়ির পথে এগোয়, জানালা দিয়ে আসা বাতাসে জারার হিজাবের কোনা উড়ছে। তার মনে হয়, জীবনটা আজ সত্যিই সুন্দর। সামনে বন্ধুদের হাসি, গানের আওয়াজ, আর সেই চেনা মানুষদের ভিড়ে এক অনির্বচনীয় শান্তি।
আজ মিমের গায়ের হলুদ, কিন্তু আনন্দটা যেন ছড়িয়ে পড়েছে সবার মধ্যে। এ যেন শুধু এক বিয়ের প্রস্তুতি নয়, বন্ধুত্বের এক রঙিন গল্প—হাসির, ভালোবাসার, আর একসাথে থাকার।
বিকেলটা যেনো রঙের উৎসব। বাড়ির চারপাশে আলো ঝলমলে সাজ, বাতাসে ভেসে আসছে হলুদের গন্ধ আর হাসির শব্দ। আজ মিমের গায়ের হলুদ। সকালের পর থেকেই মিমদের বাড়িতে যেন আনন্দের বন্যা। উঠোনের একপাশে গানের রিহার্সাল, অন্যপাশে সাজগোজ আর ফটো তোলা।
সব আয়োজন নিখুঁতভাবে এগোচ্ছে, কারণ আরমান আগেই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে—ডেকোরেশন, পার্লার লোক, ক্যামেরা ম্যান থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব কিছু। এমনকি কনের সাজের জন্য যা যা দরকার, তা সকালেই পৌঁছে গেছে। যেন কোনো কিছুতেই যেন একটু ঘাটতি না থাকে।
মিমের মামাতো ভাইবোনেরা এসেছে সকালেই। মেয়েরা সবাই একরকম শাড়ি পরেছে—হলুদের সঙ্গে টিয়া সবুজের মিশ্রণ, যেন প্রকৃতিরই রঙ। চুলে গাঁদা ফুলের মালা, কানে হালকা দুল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি রঙ। ঘরের ভেতর হাসি-ঠাট্টার ঝড়, আর কনের রুমে চলছে সাজগোজের চূড়ান্ত ধুম। পার্লারের লোক সবার আগে মিমকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়। মিম হলুদ রঙের লেহেঙ্গা পরেছে। একে একে
সবাই তৈরি, শুধু জারা বাকি।
ফিহা তখন আয়নার পাশে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে, কিন্তু বারবার জারার দিকে তাকাচ্ছে।
__“এই, তুই এতো দেরি করছিস কেনো?”
জারা হেসে বলে,
__ “এই তো শেষ করছি।”
জারা সাজগোজে কখনোই বাড়াবাড়ি করে না। আজও তাই—মুখে হালকা ফাউন্ডেশন, চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপগ্লস। কিন্তু সেই সাদামাটা সাজেই যেন তাকে পুতুল পুতুল লাগছে। সোনালি আলোয় যখন সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, মনে হয় যেন আয়নার ভেতর থেকেও আলো ঝলমল করে উঠছে।
ফিহা হা করে তাকিয়ে থাকে, তারপর হেসে বলে,
— “ও মা! কনে তো মনে হচ্ছে তুই জানু!”
মিম পাশ থেকে বলে ওঠে,
— “আমার হলুদে তুইই হাইলাইট হয়ে যাবি মনে হচ্ছে!”
__“ আরমান ভাইয়া তোকে দেখে জ্ঞান হারাবে! ”
জারা ফিহার বাহুতে চড় বসিয়ে দেয়।
__“ ফাজিল মেয়ে! ”
তিন বান্ধবী একসাথে হেসে ওঠে। ঘরটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাদের হাসিতে।
একটু পর সবাই সাজগোজ শেষ করে উঠানে যায়। উঠোনে ফুল দিয়ে তৈরি দোলনা, দেয়ালে ঝুলানো আর্টিফিশিয়াল ফুল, লাইটের মালা, আর মাঝে মঞ্চ—সব কিছুতেই ঝলমল করছে আয়োজনের ছোঁয়া। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে মিমকে বসানো হবে স্টেজে।
অনুষ্ঠানের মানুষ কনে কে না দেখে জারা’র দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। যেনো এই হলুদের কনে জারা।
আর একজন তো জারা’র দিক থেকে চোখই সরাতে পারছে না। সে হলো মিমের মামাতো ভাই রবি। জারা’কে প্রথম দেখাই ভালো লেগে যায়।
আসার পর থেকে জারা’র সাথে কথা বলতে চাইছিলো। কিন্তু জারা পাত্তা দেয় না।
ফিহা মিমের ঘোমটা ঠিক করছে, আর জারা পাশেই বসে আছে। এমন সময় হঠাৎ খবর আসে—ছেলের বাড়ির লোক এসেছে “হলুদের তথ্য নিয়ে” নিয়ে। অবশ্য হলুদের তথ্য আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন বিয়ের তথ্য নিয়ে এসেছে। এটা শুধু কথার কথা ছেলের বাড়ির লোক হলুদের তথ্য নিয়ে এসেছে।এই খবর শুনেই মেয়েদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
জারার বুক ধকধক করতে থাকে। আরমান আসবে! তার মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এক অদ্ভুত লজ্জা, excitement আর ভয় মিশ্রিত অনুভূতি। সে ভাবে, “ইসস! যদি সামনে এসে দাঁড়ায়?” মুখে তখন কি বলবে?
ফিহা হাসতে হাসতে বলে,
— “চল, গেটে যাই! সবাই ছেলে পক্ষকে বরণ করবে!”
জারা মাথা নাড়িয়ে বলে,
__“না না, আমি যাব না। অনেক লোক…”
কিন্তু ফিহা জোর করে বলে,
— “চল না, আমার সঙ্গে থাকবি।”
সায় সায় করে দশটার মতো গাড়ি এসে থামে মিমের বাড়ির সামনে। গাড়ির ভিতর থেকে নেমে আসে ছেলে পক্ষের সবাই। বেশির ভাগ ছেলে। আর হাতে গুনা চার পাঁচ জন মেয়ে।
গেটের পাশে মেয়েরা ফুলের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে। গোলাপের পাপড়ি আর নানা ফুলের পাপড়িতে ভর্তি ঝুড়ি। সবার হাতে এক একটা গোলাপ। হাসির রোলের মাঝে গানের তালে পাপড়ি ছিটিয়ে তারা বরণ করছে আগত অতিথিদের।
এক এক করে ছেলে পক্ষের সবাই আসে তথ্য হাতে নিয়ে।
একটা গাড়ি থেকে মেনে আসে তিনজন মেয়ে। জিনিয়া, জেরিন আর আরমানের ছোট ফুপ্পির মেয়ে ছায়মা। ছায়মা জিনিয়ার বয়সের। ছায়মার চোখে মুখে লেগে আছে অহংকারে চিহ্ন।
জিনিয়া আর জেরিন জারাকে দেখা মাএ ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। ফিহাকেও জড়িয়ে ধরে।
__“ সাদা পরি কেমন আছো তুমি? ”বলল জেরিন
__“ ভালো আছি বুলবুল পাখি। ” হাসি মুখে বলে জারা।
জিনিয়া, জারা আর ফিহা অনেক ক্ষন কথা বলে। তারপর জিনিয়া আর জেরিন’ চলে যায় মিমকে দেখতে।
সবার শেষে দেখা যায় তিনজনকে রোহান,জোহান আর আরমান।
তিনজনেই পাঞ্জাবি পরেছে—আরমানেরটা কালো, জোহানেরটা সাদা-হলুদ মিশ্র রঙের।রোহান ও কালো পাঞ্জাবি পরেছে। আলোয় ঝলমল করছে তিন জনকে। তারা এগিয়ে আসতেই মেয়েদের মধ্যে কেমন এক গুঞ্জন। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
মিমের এক মামাতো বোন রিম তো আরমানকে দেখে স্থির থাকতে পারছে না—চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, যেন এক মুহূর্তও হারাতে চায় না দৃশ্যটা।
জারার ভেতরটা হঠাৎ রাগে ফেটে যায়।
“এই মেয়েটা এমন করে তাকাচ্ছে কেনো? আমার মানুষটার দিকে!”তার ইচ্ছে করে, ছুটে গিয়ে মেয়েটার চুলের গোছা টেনে খুলে দেয়।
ততক্ষণে আরমান এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে জারার সামনে। এক মুহূর্তে যেন সময় থেমে যায়।জারাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্কেন করে ভালো করে। জারাকে এমন সাজে দেখে আরমান মনে মনে “ মাশাআল্লাহ.. মাশাআল্লাহ.. মাশাআল্লাহ” কতো বার যে বলেছে তা সে নিজেই যানে না।
জারা নিচের দিকে তাকিয়ে, হাতে গোলাপ।
সবাই তাদের উপর ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেয়। তাদের তিনজনকে মেয়েরা দেখে টাস্কি খেয়ে যায়।
মেয়েরা তাদের দিকে গোলাপ ফুল এগিয়ে দেয়। আরমান নেয় না। কিন্তু রোহান আর জাহেদ এক এক করে সব ফুল নিয়ে নেয় হাসি মুখে।
আরমান এসে জারা’র ঠিক নাক সমান হয়ে দাঁড়ায়। জারা’র নাকে আরমানের পারফিউমের গন্ধ আসছে। কিন্তু লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছে।
ফিহা জারা’র বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলে
__“ ভাইয়াকে ফুলটা দে জানু!”
কাঁপতে থাকা হাতে ফুলটা এগিয়ে দেয় আরমানের দিকে । আরমান একচোখে তাকায়, তারপর ধীরে ফুলটা নেয়, হাতে নিয়ে ফুলটা এদিক সেদিক ঘুরিয়ে দেখে। তারপর হেসে বলে,
— “আমার বউ আছে বেয়াইন। আমি পর নারীর কাছ থেকে ফুল নেই না। বউ দেখলে মারবে।”
এ কথার শেষে এক চোখ টিপ দিয়ে ভিতরে চলে যায়।
জারা এক মুহূর্তের জন্য তব্দা খেয়ে যায়। তারপর মুখ শক্ত হয়ে যায়।
__“কি? আমি পর নারী?”
রাগে ফুঁসে ওঠে। হাতে থাকা গোলাপটা মুঠো করে পিষে ফেলে। ফুলের পাপড়ি গড়িয়ে পড়ে মাটিতে।
ফিহা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই জারা হাঁটতে শুরু করে ভিতরের দিকে। তার চোখে লজ্জা, রাগ আর কেমন যেন অচেনা কষ্ট মিশে আছে।
এদিকে জাহেদ একেবারে হাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছে। ফিহার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না।
ফিহা গম্ভীর গলায় বলে,
— “কী দেখছেন এভাবে?”
জাহেদ হেসে বলে,
— “দেখছি, আজ তোমাকে এতো সুন্দর লাগছে কেনো। টকটকি তুমি এমন জ্বলজ্বল করছে কেন।”
ফিহা মুখ ঘুরিয়ে বলে,
— “হাবলা কোথাকার!” বলে ফুলের ঝুড়ি থেকে একটা ফুল তুলে জাহেদের গায়ে ছুড়ে মারে।
জাহেদ হেসে বলে,
— “এই ফুলের চেয়ে তুমি বেশি সুন্দর কটকটি।”
ফিহা লজ্জা লুকাতে গাল ফুলিয়ে বলে,
— “প্রশংসা করতে শিখুন আগে!”
তাদের কথোপকথনে আশেপাশের মেয়েরা হাসিতে মেতে ওঠে। জাহেদের মুখ লাল হয়ে যায়, কিন্তু হাসিটা থামাতে পারে না।
রোহান দেখে তার চাঁদ সুন্দরী স্টেজে মিমের পাশে বসে আছে। রোহান জিনিয়াকে চোখে ইশারা করে নেমে আসতে। জিনিয়াও রোহানের ইশারা বোঝতে পারে। আর স্টেজ থেকে নেমে রোহানের কাছে যায়।
রোহানের হাতে সুন্দর তাজা লাল গোলাপ ফুল গুলো জিনিয়াকে দেয়। জিনিয়া লজ্জায় লাল হয়ে যায়। এতো মানুষের সামনে তাকে ফুল দিচ্ছে।
__“ এগুলো আমার চাঁদ সুন্দরীর জন্য! ”
জোহান পেন্ডেলে ছোটাছুটি করে খেলছিল। হঠাৎ ওর চোখ চায় জিনিয়ার দিকে।
__“ কিউটি গার্ল! ” বলেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে জিনিয়া’কে।
রোহানের চোখ কোঠা থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম। আজ পর্যন্ত সে তার চাঁদ সুন্দরী কে জড়িয়ে ধরতে পারলো না। আর এই পটল যখন তখন তার চাঁদ সুন্দরী কে জড়িয়ে ধরে।
__“ এই মীরজাফর! ছাড় আমার চাঁদ
সুন্দরী কে! ”
__“ ছাড়বো না আমি! কি করবে তুমি? ”
রোহান জোহানের কান ধরে বলে
__“ পাকা ছেলে! আমার বউকে তুই কেন জড়িয়ে ধরেছিস?”
রোহানের মুখে বউ ডাক শুনে জিনিয়া খুব লজ্জা পায়। এদিকে জোহানও ছাড়ার পাএ না।
__“ চেহারার নাই ডক, নাম রাখছে আবদুল হক।আমার কিউটি গার্লকে বিয়ে করবে তার কতো শখ।”
জিনিয়া এবার আর সহ্য করতে পারে না। হু হা করে হেসেই ফেলে।
রোহান জোহানের কথা শুনে তব্দা খেয়ে যায়। তাকে এই পুচকে ছেলে অপমান করছে?
রোহান এবার জোহানের প্যান্ট ধরে বলে
__“ দেখি ! তুই কতো টুকু পেকেছিস
মীরজাফর? ”
জোহান নিজের ইজ্জত বাঁচাতে একটা ভু দৌড় দেয়। জিনিয়া ফুল গুলো নিয়ে আর সেখানে এক মুহূর্ত ও দাঁড়ায় না। চলে আসে স্টেজের দিকে।
এদিকে স্টেজে মিম বসেছে—কনে সাজে, চারপাশে আলো, গান বাজছে, আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মুহূর্তগুলো বন্দী হয়ে যাচ্ছে।
রবি জারা’র পিছু করে সব সময়। জারা যেদিকে যায় রবিও সেদিকে যায়। অবশ্য জারা তাকে পাওা দেয় না বরং এড়িয়ে যায়। আরমানের এই বিষয় টা চোখ এড়ায় না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রবি দিকে আরমান। এতো মানুষ না থাকলে এতো ক্ষনে মাটির নিচে পৌঁছে দিতো!
জারা ভেতরে এসে মিমের পাশে বসে। কিন্তু মন তার বাইরে কোথাও—আরমানের দিকে, যে এখন হয়তো অন্য পাশে দাঁড়িয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে। আর ওর পাশে দাড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। দেখেই মনে হচ্ছে অনেক স্টাইলিশ। মেয়েটা হলো ছায়মা।
তার মনে হয়, ভালোবাসা মানে কি এমনই? একবারে রাগ, একবারে হাসি, একবারে এমন মিষ্টি কষ্ট?
স্টেজের আলোয়, গানের তালে, ক্যামেরার ক্লিকে—সবাই যেন উৎসবের ভেতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু এই রাতের হাসির মাঝেই জারা’রা তিন বান্ধবী, তাদের বন্ধন, ভালোবাসা আর গোপন অনুভব—সব মিলিয়ে এই সন্ধ্যা হয়ে ওঠে অবিস্মরণীয়। কারণ এই গানের তালে তালে, ফুলের গন্ধে ভরা রাতে, কিছু ভালোবাসা হয় প্রকাশ্যে, কিছু চুপিচুপি চোখে চোখে।
জাহেদ ফিহার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কটকটি কে সুন্দর লাগছে। প্রিয় মানুষ টা কে সে সুন্দর করে মন বরে ফিল করছে। এমন সময় ওর কাঁধে কারোর হাত পরে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখে ওর ফুপ্পির ছেলে রিমন।
__“ ভাইয়া ওই মেয়েটা কি কিউট তাই না?” রিমন ফিহার কথা বলছে।
রিমনের কথা শুনে জাহেদ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। রিমনের হাত টা কাঁধ থেকে ঝারা দিয়ে ফেলে দেয়।
__“ অসভ্য ছেলে দৃষ্টি ঠিক কর!সে তোর হবে হবে ভাবি হয়। ”
তার দাঁড়ালো না জাহেদ। চলে আসে রোহানের কাছে।
আর রেখে যায় একজন কে বোকা বানিয়ে। রিমন এখনো জাহেদের বলা কথা বোঝার চেষ্টা করছে।
হলুদের আসর জমে উঠেছে। চারপাশে আলো, গান আর হাসির শব্দে ভরে গেছে বাতাস। মেয়েরা স্টেজে একের পর এক নাচছে। মিমের হলুদের রঙে মিশে গেছে হাসির উচ্ছ্বাস। সেই ভিড়ের মাঝেই জারা—হলুদের পুতুলের মতো সেজে বসেছিলো। হালকা মেকআপ, টিয়া রঙের শাড়ি, খোঁপায় গাঁদা ফুল। ওর সাজে কোনো জাঁকজমক নেই, তবুও ওর দিকে তাকালে চোখ সরানো যায় না।
মেয়েরা যখন নাচ শুরু করে, জারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্টেজে উঠলো। জিনিয়া ওকে নিয়ে যায়। ছায়মাও জারা দের সাথে মিশে গেছে। দেখতে অহংকারি হলেও মন অনেক সুন্দর।জারাও ছায়মার সম্পর্কে সব ধারণা মিথ্যে হয়ে যায়। ছায়মা আর ফিহার খুব ভাব জমে গেছে। তার থেকে বেশি জারা র সাথে।
জারার মুখে হালকা হাসি, চোখে হালকা অভিমান। সুরের তালে তালে নাচতে শুরু করলো মেয়েরা, জারাও নাচছে,আর ফিহা। কিন্তু তার চোখ এক মুহূর্তের জন্যও অন্য কোথাও নেই—শুধু এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আরমানের দিকে।
আরমানের চোখ শুধু তার বউয়ের দিকে। যে এখন স্টেজে নাচ করছে। ওর মন চাচ্ছে সব বাদ দিয়ে এখন জারা’কে নিজের সাথে করে সাথে নিয়ে যেতে।
আরমানকে আজ অন্যরকম লাগছে । কালো পাঞ্জাবি, হালকা দাড়ি, মুখে শান্ত অথচ গভীর চাহনি। সবার ভিড়ে থেকেও তার চোখ কেবল একজনের ওপর—তার রাগে লাল হয়ে থাকা বউ, মানজারা। ওকে এমন সাজে দেখে আরমানের বুক কেমন হু হু করে উঠলো। ওর মনে হচ্ছিলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা এখন তার সামনে।
কিন্তু জারা সেই দৃষ্টি টের পেলেও নিজেকে সামলে রাখলো। মনে মনে ভাবলো—যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও তাকে পর নারী বললো, সে এখন এমন করে তাকিয়ে আছে কেন? ওর বুকের ভেতর জ্বালা ধরে যাচ্ছে। চোখ ফিরিয়ে নিলেও মন ফিরিয়ে নিতে পারছে না।
ঠিক তখনই আরমানের পাশে এসে দাঁড়ায় মিমের এক মামাতো বোন রিম । টিয়া রঙের রঙিন জামদানি, মাথায় ফুল, ঠোঁটে হাসি—সে যেনো ইচ্ছাকৃতভাবে খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কথা বলতে বলতে গা ঘেঁষে আসে। আরমান ভদ্রতার হাসি দেয়।ইচ্ছে না থাকা শর্তেও কথা বলতে হয় তাকে।
কিন্তু সেই দৃশ্য জারার বুকে ছুরির মতো লাগে।
জারা নাচ থামিয়ে নিচে নামে। ওর বুকটা মুচড়ে ওঠে। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও তাকে ঠাট্টা করে অপমান করেছিলো, সে এখন অন্য মেয়ের সাথে হাসি-ঠাট্টায় ব্যস্ত! চোখের ভেতর পানি জমে আসে, কিন্তু কারও সামনে ভেঙে পড়তে চায় না।
ও চুপচাপ এসে বসে মিমের পাশে। ফিহা ঠিক তখনই এসে বলে,
—“এই জারা, কী হলো? এমন মুখ কেন?”
জারা ঠোঁট কামড়ে বলে,
—“একটু ভিতরে যাচ্ছি শাড়ি ঠিক করতে।”
ফিহা উঠতে যায় জারা’র সঙ্গে যেতে, কিন্তু জারা বাধা দেয়,
—“তুই থাক, আমি আসছি।”
মুখে স্বাভাবিক ভঙ্গি রাখলেও চোখে কান্না লুকানো যায় না। ওর বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান যেনো সব শব্দকে আটকে দিয়েছে। তারপর দ্রুত পা ফেলে ভিতরের দিকে চলে যায়।
আরমান তখনও সেই মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিলো ইচ্ছে না থাকা শর্তে ও, কিন্তু হঠাৎ লক্ষ করে—জারা আর স্টেজে নেই। চারদিকে তাকিয়ে ওর বুকের মধ্যে হালকা ধাক্কা লাগে। নাচের ভিড়ে ওকে খুঁজে পাচ্ছে না। মনটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। মেয়েরাট উপর খুব রাগ হয় আরমানের।কেমন গায়ে পরা মেয়ে। অসহ্য লাগছে এই মেয়েটা কে।
“এক্সকিউজ মি,” বলে আরমান দ্রুত সরে আসে ভিড়ের মাঝ থেকে। চারপাশে তাকিয়ে খোঁজে—জারা কোথায় গেলো? মেয়েটা রাগ করলে কিছুই বলে না, শুধু হারিয়ে যায়।
তখনই পেছন থেকে এক চেনা কণ্ঠ—
__“দুলাভাই!”
আরমান ঘুরে দেখে জোহান, হাসতে হাসতে দৌড়ে এসে ওর কোলে উঠে পড়ে। আরমান একটু হেসে বলে,
__“এই বেয়াদব, কই ছিলি?”
__“ আমি খেলছিলাম! ”
__“ ওহ আচ্ছা। তারপর ওর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে জোহানকে দেয়। জোহান তো চকলেট পেয়ে মহা খুশি।
__“ আমার বউ কই রে পটল?”
জোহান হেসে বলে,
__ “বোনুকে দেখলাম পেন্ডেলের পিছনের দিকে যেতে।”
আরমানের বুকের ভেতর কেমন একটা টান পড়ে। শব্দ না করেই বলে ওঠে,
__“ওহ, ঠিক আছে।”
জোহানকে নামিয়ে দিয়ে আরমান পেন্ডেলের পিছনের দিকে এগিয়ে যায়। আলো-আঁধারের ফাঁকে বাতাসে ফুলের গন্ধ মিশে আছে। দূরে সবার হাসির শব্দ এখন অনেক ম্লান।
আরমানের মনে এখন একটাই চিন্তা—ও কি কাঁদছে? রাগে না কষ্টে? ওর নিজেরই মনে হয়, হয়তো আজ একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। কথাটা মজা করে বললেও ওর চোখে যে কষ্টের ছায়া দেখেছিলো, সেটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না।
জারা তখন পেন্ডেলের পিছনে এক কোণে দাঁড়িয়ে। মুখটা নিচু, চোখে জল। ওর হাতের কাচের চুড়ি গুলো মাটিতে ছুড়ে ফেলছে —যেনো রাগ আর অভিমানের চিহ্ন।
হালকা বাতাসে ওর খুলা চুল গুলো নড়ে যায়, কপালে পড়ে একগোচ্ছ চুল। জারা সেটা ঠিক করতে যায়, কিন্তু হাত থেমে যায় মাঝপথে। মনে হয়, কেউ ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে পায়ের শব্দ। ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়ায় আরমান।
__“ লক্ষী বউ! ”
চোখে অনুশোচনা, ঠোঁটে একটুখানি হাসি। কিছু না বলেই এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।
জারা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিছু বলে না, শুধু নীরব থাকে।
আরমান ধীরে বলে,
__“ আমার ফুলটা কষ্ট পেয়েছে মনে হয়।”
জারা চুপ করে। উত্তর দেয় না।
আরমান আরও বলে,
__“তুমি রাগ করেছো বউ ?”
জারা এবার তাকায়। চোখে অজস্র অভিমান জমে আছে। মুখে কোনো কথা নেই, তবুও সেই নীরবতা হাজার কথার সমান।
আরমান এগিয়ে এসে একটু নিচু স্বরে বলে,
__“সবাই সামনে ছিলো, তাই মজা করেছিলাম। মন থেকে কিছু বলিনি।”
জারা কিছু না বলে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
ওরা দুজনই কিছুক্ষণ চুপ থাকে। দূর থেকে ভেসে আসে গানের আওয়াজ, হাসির শব্দ, আর নাচের তাল। কিন্তু এই নির্জন কোণায় সময় যেনো থেমে গেছে।
শেষে জারা শুধু বলে,
__“ আমি পরপুরুষের সাথে কথা বলি না! “এই বলে চলে যেতে চায় জারা।
কিন্তু আরমান ওর হাত ধরে ফেলে।
আরমান হাসে বউয়ের কথা শুনে। তার কথাই এখন আবার তার বউ তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
__“ কিন্তু আমার যে আপনার মতো সুন্দরীর সাথে কথা বলতে ভালো লাগে বেয়াইন।”
আরমান ওর দিকে ধীরে ধীরে এগোয়, চোখে লালচে রোদমাখা উচ্ছ্বাস, হাসি আর কৌতূহল। তার চোখে মিশে আছে সেই ভালোবাসা, সেই প্রেম যা দেখার সাথে সাথে জারার হৃদয়কে থামিয়ে দেয়। জারা পিছাতে থাকে, কিন্তু আরমান থেমে নেই। হঠাৎ সে জারার কড়ম ধরে, নিজের কাছের টানে, যেনো জানায় সে এখানেই, ঠিক এখানে, জারার জন্য অপেক্ষা করছে।
জারা চেঁচাতে চায়,
__ “ছাড়ুন আমাকে!”
কিন্তু আরমান কেবল হাসে, ধীরে ধীরে জারার দিকে তাকিয়ে বলে,
__ “ বেয়াইন, আজকে আপনাকে মাশাআল্লাহ পুতুলের মতো লাগছে।মাই পার্সোনাল ডল।”
জারা তার হাত দিয়ে আরমানকে ঠেলে দেয়, কপালে ভর দিয়ে,
__“ আমি তো পর নারী তাহলে আমার কাছে কেন এসেছেন? ”
__“ আমার আপনার মতো পর নারীর প্রতি বেশি আকর্ষণ বেয়াইন। ”ওর কন্ঠে এক তিব্র নেশা লেগে আছে।
আরমানের কথায় ঘাবড়ে যায় জারা।
__ “বউ রেখে এখানে এসে লুচ্চামি করছেন, লুচ্চা বেডা।”
আরমান ধীরে হাসে, জারার কথার মধ্যে মজা খুঁজে বের করে। সে ফিসফিস করে বলে,
__ “বউ, আমাকে আদর করতে দেয় না! তাই আপনার কাছে এসেছি।”
জারা আরমানকে ঠেলে দেয়, আবার বলে, __“আমার স্বামী দেখে ফেলবে।
__“ দেখুক! তাতে আমার কী?”
__“ ঘরে বউ রেখে এখানে আসচ্ছে পরকীয়া করতে, লুচ্চা কোথাকার।”
__“ ঘরে বউ নাই বেয়াইন! বউ আমার সাথে থাকে না। ”
__“ তাই বলে আমার সাথে লুচ্চামি করবেন?”
__“ লুচ্চামি না বেয়াইন! আপনার সাথে হালাল ভাবে পরকীয়া করছি? ”
আরমানের চোখে হালকা রঙিন হাসি। সে জারার ঠোঁটের কোণে হালকা স্পর্শ করে, শুধু প্রেমের খেলা, কোনো অশ্লীলতা নয়। সে জারার হাতে হাত দিয়ে কোমড়ে দড়িয়ে রাখে, আর জারার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হতে থাকে। জারা কেঁপে ওঠে, না জানে এই উত্তেজনা আনন্দের নাকি লজ্জার।আরমান জারা’র ঠোঁটের মিষ্টি সুধা পান করে মন ভরে।জারা চোখ বন্ধ করে আরমানের দেওয়া ভালোবাসা গ্রহণ করছে।
__“ তোমার এই ঠোঁটের কোনের তিল টা আমার খুব পছন্দের বউ।তুমি পুরোটাই একটা রসুগোল্লা।মন চায় টুপ করে খেয়ে ফেলি। ”
বলে আবার জারা’র ঠোঁটে গভীর চুম্বন করতে থাকে সে।জারার ঠোঁটে ঝালা পোরা শুরু হয়ে যায়। হাত পা ছুড়ে নিজেকে ছাড়াতে চায় আরমানের কাছ থেকে। আরমান প্রায় মিনিট দশেকের পর ধীরে ধীরে দূরে সরে আসে, কিন্তু চোখে সেই ভালোবাসা, সেই উচ্ছ্বাস বজায় থাকে।
জারা এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না, দৌড়ে চলে আসে আরমানের থেকে দূরে, আরমানও তার পিছু পিছু আসে।
জারা বুকে ধুকপুকানি নিয়ে থেমে দাঁড়ায়, আরমান নীরবে তার পাশে দাঁড়িয়ে চোখে অজানা আবেগ প্রকাশ করছে। জারা বুঝতে পারে আরমানের উপস্থিতি কতো প্রগাঢ় প্রভাব ফেলছে তার মনকে। সে চোখ বন্ধ করে, এক মুহূর্তের জন্য সমস্ত হ্যাজার্ড, লজ্জা, উত্তেজনা একসাথে অনুভব করে।
__“ কেমন লাগলো আমার আদর বেয়াইন? আপনার স্বামীর থেকে বেশি আদর দিয়েছি তো আমি?”
জারা ছোট ছোট হাসি দিয়ে মাথা নাড়া দেয়।
__“ আমরা তাহলে পরকীয়া করতে পারি? ”
জারা এবার উচ্চ সুরে হেসেই ফেলে আরমানের কথা শুনে। মাথা ঝাকিয়ে বলে,“পারেন।”
আরমান ধীরে ধীরে তার হাত ধরে , কিন্তু চোখে সেই প্রেমময় দৃষ্টি, যা জারাকে এখনও ঘিরে রাখে। জারা কিছুক্ষণ জন্য দাঁড়ায়, আরমানকে দেখে, বুঝতে পারে যে তার হৃদয় শুধু আরমানের জন্যই ধুকছে।
আরমানের জারার পাশে দাঁড়িয়ে হাসি ঠাট্টা করলেও সে জানে, এই মুহূর্তটা জারার জন্য কতটা মূল্যবান। আরমান জারার হাত ধরে বলে, __“বেয়াইন, আমি কী আরও একটু আদর করার অনুমতি পাবো? ”
জারা হালকা হেসে আরমানের দিকে তাকায়, আর তাদের মধ্যে সেই নিখুঁত সংযোগ তৈরি হয়, যা শুধু ভালোবাসা আর আস্থা দিয়ে পরিপূর্ণ।
জারা আর এক মুহূর্ত আরমানের সামনে দাড়িয়ে থাকতে পারে না। দৌড়ে পেন্ডেলের ভিতরে চলে যায়।
আরমান জারা’র চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাসে। সেও পেন্ডেলে যেতে নিবে এমন সময় তার সামনে এসে দাঁড়ায় রোহান আর জাহেদ।দুইজনের চোখে সরাসরি দুষ্টুমি আর ঠেসের ছাপ।
রোহান বলল,
__ “দোস্ত! কি করলি তুই এটা? ”
জাহেদ সঙ্গে বলে,
__“হ্যাঁ ভাইয়া! তুমি কিন্তু কাজটা ঠিক করোনি?”
আরমান চোখে আগুন জ্বালিয়ে সরাসরি বলল, __“কিসের কথা বলছিস তোরা?”
রোহান একটানা ঠেস দিতে থাকে,
__“কী আর বলবো !আমরা কিন্তু সব দেখে ফেলেছি!”
জাহেদ যোগ করল,
__“এমন কাজ করলে,একটু আড়ালে যেতে হয় ভাইয়া। এমন খোলা মাঠে করে না।”
আরমানের রাগ সীমা ছাড়িয়ে যায়। সে তেড়ে যায়,
__ “শালা ইতর!দাঁড়া আজকে তোদের খবর খারাপ করে ছাড়বো আমি !”
রোহান আর জাহেদ মুহূর্তেই বুঝতে পারে বিপদ। তারা হুট করে পেছনে দৌড়ে পেন্ডেলের দিকে চলে যায়, আরমানের দিকে বারবার ফিরে তাকিয়ে বলে,
__ “ভাই! আমরা পালাচ্ছি! রাগ করিস না, আর বলবো না!”
আরমান দ্রুত তাদের পিছু নেয়।
__ “কোথায় যাচ্ছিস গরুর দল ! এবার তোদের হাতের কাছে পাই, তখন মজা বোঝাব।” সে চিৎকার করে বলে।
রোহান আর জাহেদ পেন্ডেলের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে হেসে ফেলে। তারা জানে আরমান রেগে আছে, কিন্তু এখনও পুরোপুরি ধরতে পড়বে না।
আরমান তাদের দিকে গম্ভীর চোখে তাকিয়ে দাঁড়ায়, রেগ আর মজা মিশ্রিত অবস্থায়। তিনি মনে মনে ভাবছেন, “এই দুইজন কে একটা কঠিন শান্ত দিতে হবে ! শালা বদমাশের দল।”
রাগে গজগজ করতে থাকে। আরমান আর পেন্ডেলে যায় না। চলে আসে রাস্তার দিকে।যেখানে ওদের গাড়ি গুলো রাখা।
হলুদের মঞ্চের চারপাশে রঙিন আলো আর ফুলের সাজে পুরো পরিবেশ যেনো অন্য এক জগতে পরিণত হয়েছে। হঠাৎই পেন্ডেলের লাইট এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকারে সাউন্ড বক্সের মধ্যে বাজতে শুরু করে হিন্দি গান—“মেহেন্দী লাগাকে রাখনা, ঢরি সাজাকে রাখনা”—মিষ্টি সুরে হলুদের আনন্দকে আরও উজ্জ্বল করছে। সবাই হঠাৎ অন্ধকারে থমকে যায়, কিন্তু মুহূর্তের পরই লাইট আবার জ্বলে ওঠে।
আলোর ভিড়ে দাড়িয়ে আছে রাশেদ, পুরো হলুদ পাঞ্জাবি পরে। তার উপস্থিতি মঞ্চের চারপাশে এক অনন্য আনন্দের স্ফুরণ তৈরি করে। মঞ্চে উপস্থিত সবাই—মিম, ফিহা, জারা, জিনিয়া৷, ছায়মা এবং অতিথিরা—চিৎকার করে উঠছে আনন্দে।
রাশেদ এসেছিলো আরমানদের সাথে। এতোক্ষণ গাড়িতে বসে ছিলো। বসেছি বললে ভুল হবে। তাকে বসিয়ে রেখেছিলো আরমান। গাড়ি পাহাড়া দেওয়ার জন্য। কারণ গাড়ি তার বউয়ের জন্য মূল্যবান সম্পদ রেখেছে।
রাশেদ, রোহান আর জাহেদ তিনজন মিলে নাচ করছে গানের তালে। রাশেদ গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে মিমকে ধীরে ধীরে স্টেজ থেকে নামায়। মিমও প্রথমে চমকে যায়, কিন্তু তাত্ক্ষণিকভাবে হাসি ধরে রাখতে পারে না। তারা দুজনে একসঙ্গে নাচে, পুরো হলুদের আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে।
ক্যামেরাম্যান সব মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দী করছে। অতিথিরা, বিশেষ করে বান্ধবীরা, একে অপরের সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করছে। জাহেদ ক্লান্ত ফিহার পাশে এসে বসে। জাহেদ দেখে রিমন এখনো ফিহার দিকে তাকিয়ে আছে। জাহেদ কটমট দৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে। রিমন সুরসুর করে চলে যায় সেখান থেকে।
আরমান একটু দূরে দাঁড়িয়ে আনন্দের সঙ্গে সব পর্যবেক্ষণ করছে। মঞ্চের আলো, গান, এবং নাচের মধ্যে পুরো হলুদের মেজাজ যেনো এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তে পরিণত হয়েছে।
হঠাৎ জারার হাতে আরমানের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি চমকপর্ণ মুহূর্ত ঘটে। জারা বুঝতে পারে যে এটি আরমান। আরমান শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে জারার দিকে এগিয়ে আসে। জারা কিছুটা হকচকিয়ে দাঁড়ায়। আরমানের চোখে মৃদু হাসি আর গভীর ভালোবাসার ছাপ। সে জারাকে কোমলভাবে ধরে পেন্ডেল থেকে বের হয়ে ওর মার্সিডিজের দিকে নিয়ে যায়।
__“ এখানে আনলেন কেনো?” বললো জারা।
আরমান দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে
__“ আপনার সাথে পরকীয়া করতে ম্যাডাম। ”
জারা আরমানের বুকে কিল মেরে বলে
__“ ফাজিল লোক একটা।” বলেই হেসে ফেলে।
__“গাড়ির দরজা খুলো,” আরমান কানে কানে বলে।
জারা দ্বিধায়,
__ “আমি এখন যাই? কেউ দেখে ফেলবে।”
আরমান কেবল হেসে বলে,
__“দেখলে দেখুক। তুমি আগে দরজা খুলো।”
জারা বাধ্য হয়ে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। মুহূর্তের জন্য সে বিস্ময়ে হা হয়ে দাঁড়ায়। গাড়ির ভিতর মস্ত বড় লাল গোলাপের তোড়া, আর চারপাশে ভরে রাখা চকলেট। পুরো গাড়ির ভেতর যেনো এক স্বপ্নের জগৎ।
আরমান ধীরে জারার কানে কানে বলে,
__ “হ্যাপি বার্থডে, লক্ষী বউ। আপনার আঠারো তম জন্মদিনের জন্য১৮ হাজার চকলেট এবং আঠারোশ লাল গোলাপের শুভেচ্ছা। আমার রানী সাহেবা। ”
এতটুকু বলে থামে আরমান। নিশ্বাস নিয়ে আবার বলতে থাকে
__“ এখানে অবশ্য ২০০ লাল গোলাপ আছে বউ। একটু পর একটা গাড়ি আসবে সেখানে পুরো ১৮০০ লাল গোলাপ আছে তোমার জন্য। ”
এতো কিছু শুনে জারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আরমানের দিকে। , চোখ বড় বড় করে বলে,
__ “আপনি কি ভাবে জানলেন আমার জন্মদিনের কথা? আর এতো কিছু! কেন করলেন?”
আরমান কেবল হালকা হেসে বলে,
__“তোমার সব কিছু আমি জানি, বউ। এটা তোমার স্বামীর কাছ থেকে ছুট্টো উপহার মাএ।”
জারার চোখে জল ওঠে। আনন্দে কান্না ভেসে আসে। আরমান জারাকে জড়িয়ে ধরে, তার হাতে ধরে রাখে। জারার কানে কানে বলে,
__ “আমি তোমার সব জানি বউ, আর তোমার জন্মদিনের কথা জানবো না?”
আরমানের নিঃশ্বাস শ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে কেবল হেসে ওঠে।
জারা ফুপিয়ে কেঁদে উঠে আরমানকে জড়িয়ে ধরে।
__“ আপনি আমাকে এতো ভালোবাসেন কেনো?”
আরমান ও জারাকে ভালোবাসার পরশে আগলে নেয়।
__“কারণ জানি না! কিন্তু ভালোবাসি খুব। ”
গাড়ির ভিতর থেকে আরমান একটি ছোট কেক বের করে।সেখানে হঠাৎ রোহান, জিনিয়া, ফিহা, জাহেদ, জেরিন,জোহান,ছায়মা—all উপস্থিত হয়ে আনন্দময় পরিবেশে ঢুকছে।ছায়মা আরমান আর জারা’র সম্পর্কে সব যেনে গেছে। আর জারা যে ওর ভাবি হয় এটাও যানে।সে তো মহা খুশি। রোহান তার সাথে করে একজন ক্যামেরাম্যান নিয়ে আসে।তারা সবাই মিলে আনন্দে গান গাইছে, কেক কাটছে, হাসি ঠাট্টা করছে।
মিমও রাশেদ পেন্ডেলে আছে। তারা বর ও কনে তাই আসতে পারে নি। সবাই তাদের দুজনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
রোহান ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে আরমান আর জারার এই মুহূর্ত সুন্দর ভাবে ধারণ করছে।
সবাই জারাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। জারা চোখে আনন্দের জল ধরে রাখতে পারছে না। আরমান তার পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে সে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছে। ছোট ছোট হাসি, চোখের মিষ্টি কথা, এবং একে অপরকে দেখার উত্তেজনা পুরো পরিবেশকে আরও রোমান্টিক করে তুলেছে।
জোহান এখন সারা টা সময় আরমানের সাথে আছে। আরমান ওকে কি বলছে, কি বোঝাচ্ছে,সেই কিছুই বোঝতে পারছে না। শুধু এতো টুকু বোঝেছে, আরমান ওকে বলেছে জারা’র সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টা আটার মতো লেগে থাকতে। জারা’র আসে পায়েও যেনো কেউ আসতে পারে না।
রাত এগারোটা বাজে, সবাই খাওয়া দাওয়া শেঅ করে বাড়ি ফিরে যাবে। আরমান জারার পাশে দাঁড়ায়, জারার কাছে বলে যায়।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৮ (২)
__“ কাল আবার দেখা হবে বউ!”
গাড়ি চালু করে ধীরে ধীরে রাস্তায় বের হয়। জারার চোখে এখনও আনন্দের ঝিলিক। আরমান বুঝে, আজকের জন্মদিন, এই ছোট্ট বিস্ময়, সব মিলিয়ে তার বউকে খুশি করার এক সেরা মুহূর্ত।
