Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ৩১

দুইজনাতেই পর্ব ৩১

দুইজনাতেই পর্ব ৩১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

“ মিসেস সাক্ষ্য এহসান, আমার পিছনে এত গোয়েন্দাগিরি কেন বলুন তো? ভালো টালো বাসেন নাকি? ”
দ্বিতী মুহূর্তেই ঘাড় বাঁকাল। একটু পরই সাজাতে আসবে তাকে। তার আগেই কথাকে কল করে জিজ্ঞেস করছিল কণার লেহেঙ্গা এই সেই নিয়ে। তার মিনিট কয়েক পরই সাক্ষ্যর এমন স্বর শুনে হকচকাল সে। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আপনাকে ভালো টালো বাসার মতো আছেটা কি? আশ্চর্য!”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল কেমন করে। দ্বিতীর দিকে চেয়ে চোখ নাচিয়ে বলল,
“ ভালো টালো বাসার জন্য কি থাকতে হয় ম্যাম? ”
“ অনেককিছু। আপনার মাঝে তার কিছুই নেই স্যার। ”
“ শিওর? ”
দ্বিতী চাইল। সাক্ষ্য ততক্ষনে একটু একটু করে এগিয়ে দ্বিতীর একদম সামনেই দাঁড়াল। একটুখানিক দূরত্ব রেখে দুই হাত রাখল দ্বিতীর দুইপাশ দিয়ে দেওয়ালে। অতঃপর দ্বিতীর চোখে চোখ রেখেই ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ শিওর কিছু নেই? ”
দ্বিতীর চোখের ভাষা এবার নড়বড়ে ঠেকল। সাক্ষর হাসিটা বরাবরই দুর্বোধ্য। এই ঠোঁটে এলিয়ে হাসাটা দ্বিতীর সহ্য হয় না৷ অথচ এই লোক সারাক্ষনই এমনই হাসে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে সে উত্তরে বলল,
“ শিওর নেই। ”
“তাকান। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন মিসেস এহসান।”
দ্বিতী তাকিয়ে দেখল। একমুঠো মুগ্ধতা আর আনন্দময় চাহনিটা পরখ করে সে বলে উঠল,
“ তাকালাম। বাট নাথিং ইজ ভিজিবল মিস্টার সাক্ষ্য এহসান। ”
সাক্ষ্য বাঁকা হাসল এবারে। আচমকায় একদম কাছাকাছি এসে টেনে ধরল দ্বিতীর কোমড়। অতঃপর একটু খানি ঝুঁকে দ্বিতীর কানের সামনে মুখ রেখেই ফিসফিস করে বলল,
“ ইউ আর রং মিসেস সাক্ষ্য এহসান। দেয়ার ওয়াজ এ্যা স্মল ফলিং সিচ্যুয়েশন। এ্যা লিটল ইমোশন, এ লিটল ফেশিনেশন এন্ড রেপিড হার্টবিট অলসো…অল সিম্পটমস অফ….”
দ্বিতী সাক্ষ্যর চোখেই তাকাতে চাইল বোধহয় এবারে। অল সিম্পটমস অফ? বলল না কেন? অথচ না বললেও দ্বিতীর আনন্দ হলো। খুশিতে হৃদস্পন্দন বাড়ল। মনে হলো যেন কতগুলো প্রজাপতি তার মনের ভেতর উড়োউড়ি করছে দ্বিতী ওভাবেই দাঁড়াল। নিজের খুচ কাছাকাছি সাক্ষ্যর উপস্থিতি টের পেয়েও স্বাভাবিক থেকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ অল সিম্পটমস অফ? ”
“ বুঝে নিন। ”
“ বুঝব না। বাক্য শেষ করুন। ”
“ বাক্য সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব আমার। তবে মুখে বলা পসিবল নয় মিসেস। ফিল করাব আপনাকে। একটু একটু করে ফিল করবেন আপনি। দেন ইউ ক্যান রিয়েলাইজ দ্যাট সাক্ষ্য এহসান ইজ এ্যা গুড হাজব্যান্ড। ”
“ ওভারকনফিডেন্স ভালো না মিস্টার।”
“ ওকে, দেন প্রুভ মি রং। ”
“ আপনি সমস্তইটাই রং। এটা প্রুভ করার কিছু নাই বুঝেছেন? এই দেখি সাঁপ, এই দেখি প্রজাপতি। পুরোই গিরগিটি আপনি৷ ”
“ উফপ। সাঁপই আমি। শুধু আপনার গায়ের সুভাসটা পেলে একটু প্রজাপতির মতো উড়ে এসে কাছাকাছি আসতে ইচ্ছে করে। সুভাসটা আজকাল মাথা বড্ড এলোমেলো করে দিচ্ছে বুঝলেন?ওয়ার্ন করুন তাকে। নয়তো এত অল্প বয়সে আমি পাগল টাগল হলে বউ পালাবে৷”
কথাগুলো বলতে বলতেই সাক্ষ্য নিজের ঠোঁটজোড়া আলতো করে ছোঁয়াল দ্বিতীর ঘাড়ে। সফেদ, মসৃন ত্বকটায় বারকয়েক ঠোঁট ছুঁইয়ে ফের শুধাল,

“ অবশ্য আপনি না পালালে আমার পাগল টাগল হতেও সমস্যা নেই ম্যাম। দুই পাগলে নাহয় সংসার করব। কি বলুন? ”
দ্বিতী বোধহয় উষ্ণ নিঃশ্বাস এবং কোমল স্পর্শে নাজেহাল হচ্ছিল। এই সাক্ষ্যর হুটহাট চেঞ্জ হওয়ার লক্ষণই টের পায় না সে। এমন কেন এ লোক? এমন কেন? এসব ভাবতেই ভাবতেই গুঁটিয়ে যাওয়া মেয়েটা হুট করে দুই পাগল শব্দটা নিতে পারল না। বলল,
“ দুই পাগল? দুই পাগল বলতে? আপনি নিজেই পাগল। আমি নই৷ ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলে নিঃশব্দে। শেষমুহূর্তে গাঢ় একটা চুমু এঁকে সরে গেল আচমকাই। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতেই বলে গেল,

“ আপনি ম্যাম পাগলই। সাক্ষ্য এহসানের জন্য হওয়া সত্যিকারের পাগল। অস্বীকার করবেন না প্লিজ।”
দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। শুধু সে পাগল? সাক্ষ্য বুঝি পাগল নয়? এ লোক তো গুপ্ত পাগল। হুটহাট করে ভদ্র সাজে, হুটহাটরকরে পাগল সাজে। ভাবে যে, মানুষ কিছুই বুঝে না। দ্বিতী এত পাগল নাকি হুহ? এই যে আজ স্বীকার করতে করতেও করল না এটাও তো চালাকি করল। দ্বিতী কি বুঝে না?
দ্বিতী সাজানোর লোক আসার পূর্বে সাক্ষ্যর আলমারিতে নিজের সব কাপড় তুলে রাখছিল। একে একে সমস্ত কাপড় তুলে রেখে আলমারির অর্ধেকটা দখল নেওয়ার পর সে ড্রয়ারের দিকে চাইল। দু দুটো ড্রয়ার। কোনটা সে নিবে বুঝে না উঠে একটা চাবি দিয়ে খুলেই টেনে ধরল। মুহূর্তেই ড্রয়ারটায় সাক্ষ্যর গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, জিনিস সহ দেখা মিলল নিজের একটা নুপূরেরও। একদম উপরে থাকাতে প্রথমে ওটাই চোখে পড়ল। প্রায় ছয় বছর আগের হারানোর নুপূর! ছয় বছর। কম সময়? যখন সে মাধ্যমিক দিচ্ছিল তখনকার। তার আব্বুর গিফ্ট করা নুপূর ছিল। একটা হারিয়ে যাওয়াতে কত মন খারাপ করেছিল সেবার দ্বিতী। অথচ নুপূরটা সাক্ষ্যর ড্রয়ারে। নাকি ওটা দ্বিতীর নয়? হুবুহু দেখতে শুধু? এইটুকু ভেবেই নুপূরটা নিতেই দেখা মিলল ভাঙ্গা দুয়েকটা কাঁচের চুড়িরও। আশ্চর্য! কাঁচের চুড়িও কেউ ড্রয়ারে রাখে? কিন্তু এগুলো কারই বা?

দ্বিতী জানে না। কাঁচের চুড়ি হুবুহু একই রকম কতজনেন কাছেই থাকে। নতুন কি? কিন্তু শেষ অব্দি যা দেখল তা কানের দুল। সাধারণ দুলই। তবে এই একইরকম দুলটাও দ্বিতীর কাছে ছিল। দুটো জিনিস কাকতলীয় হবে না নিশ্চয়? দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। এই লোক দেখি প্রচুর ধূর্ত মানুষ। তার জিনিসপত্র চুরি করে ড্রয়ারে রেখে দিয়েছে অথজ এতগুলো দিন তাকে পাত্তাই দিত না? তাকে এমনভাবে গন্য করত যেন সে কিছুই না। কেউই না। দ্বিতী মুখচোখ থমথমে করেই বসল। সাক্ষ্য আসা অব্দি অপেক্ষা করল। অতঃপর যখন আসাল ঠিক তখনই চুড়ি, নুপূর্ আর একটা খুচরো কানের দুল হাতে নিয়ে দেখাল সাক্ষ্যকে। ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ পাগল কে এক্চুয়েলি? আমি না আপনি? কোনভাবে দ্বিতীকা তাসনিমের জন্য আপনি আগে থেকেই পাগল টাগল হয়ে আছেন কি? থাকলে জলদি বলেন। চিকিৎসা করাতে হবে তো। ”
“ চিকিৎসা? আমার চিকিৎসা আমি নিজে নিয়ে নিতে পারব দ্বিতী। ”
“ কিভাবে? ”
“ সিক্রেট। ”
দ্বিতী এবারে ভ্রু বাঁকিয়েই তাকাল সাক্ষ্যর দিকে। বলল,

“ তারমানে এগুলো আমারই? আপনি তো দেখি চোর। কোনকালে আমার হারানো নুপূর, চুড়ি, কানের
দুল সব আপনার ড্রয়ারেই পেলাম।
এত গুপ্তস্থানে রাখার কারণটা কি? ”
সাক্ষ্য মনে মনে হাসল। আওড়াল,
“ দ্বিতীকা তাসনিমকেই তো এতকাল গুপ্তস্থানে রেখেছি। তো তার জিনিস পত্র গুপ্তস্থানে রাখব না? ”
কিন্তু মুখে বলল,
“যাকে এমনিতেই তিন কবুলে চুরি
করে নিয়েছি তার সমস্তকিছুই চুরি
করা জায়েজ ম্যাডাম। চুড়ি, নুপূর,
কানের দুল আর কি এমন চুরি হলো।”
এইটুকু বলতে বলতেই সাক্ষ্য নিজের পোশাক নিল৷ বেরিয়ে যেতে যেতেই ফের ঘাড় বাঁকিয়ে আরেক নজর চাইল। ফের মুখে হাসি ঝুলিয়ে চলে গেল নিজের মতো করেই।

দ্বিতীর সাজসজ্জাটা আজ শুভ্রময়। শুভ্র রঙা সাঁজে তার থেকে চোখ সরানো যাচ্ছিল না যেন। দ্বিতী কনে হিসেবে খুব এতোটা ভারী সাঁজ নেয়নি তবুও হোয়াইট কালারের মধ্যে স্টোনের সূক্ষ্ম কাজ করা শাড়িটায় দ্বিতীকে দেখাচ্ছিল মুগ্ধময়৷ সাক্ষ্য আড়াল হতেই দেখছিল। ঘুরেফিরে বারকয়েক নিজের বউকে দেখে পরমুহূর্তেই ঈর্ষান্বিত হলো। সবাই ড্যাবড্যাব করে দেখছে দ্বিতীকে, ছবি তুলছে, কখনো বা বিস্তর আলাপও জুড়ে দিয়েছে। অথচ সাক্ষ্যর সাথে দ্বিতীর এরমধ্যে কথাই হলো না। সাক্ষ্য গম্ভীর থমথমে মুখ করেই নিজের কালো রাঙা ব্লেইজারটা ঠিক করে অতিথিদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে সৌজন্যতাময় সাক্ষাৎ এ ব্যস্ত হলো। ঠিক তার পরমুহূর্তে চোখ ঘুরিয়ে ফিরে আসতে নিতেই দেখা গেল দ্বিতী হেসে হেসেই কথা বলছে একটা ছেলের সাথে। ছেলেটা জিহাদ। দ্বিতী এবং সাক্ষ্যর মায়ের কাছের এক বান্ধবীর ছেলে। সে হিসেবে দ্বিতী এবং সাক্ষ্য দুইজনই চেনে জিহাদকে। সাক্ষ্য যখন পা এগিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল তখনও দ্বিতী একইভাবেই কথা বলল। হাসিটা সাক্ষ্যর কাছে এমন ঠেকছিল যেন দ্বিতীর মুখ থেকে হাসি সরছেই না। প্রায় কয়েক মিনিট এইসব সহ্য সাক্ষ্য গলা ঝাড়ল। এক চাপা ঈর্ষা নিজের মাঝে চেপে রেখে হেসে হাত মিলাল জিহাদের সাথে। অতঃপর সৌজন্যতার খাতিরেই হাসি মুখে ঝুলিয়ে বলে উঠল,

“ এক্সিউজ মি? আমার ওয়াইফকে এখন নিয়ে যেতে পারি? যদি কথা বলা শেষ হয়ে থাকে। ”
জিহাদ বোধহয় প্রথমেই চাপা গম্ভীর সাক্ষ্যর এমন বাক্য শুনে বিস্মিত হলো। চোখজোড়া গোলগোল করে সে সাক্ষ্যর দিকে চাইল। সত্যিই? সাক্ষ্য এটা? বাহ বাহ! বউকে নিয়ে তার মুখে কথা শুনে প্রথম দফায় বিস্মিত হলেও পরের দফায় হাসল জিহাদ। বলল,
“ অফকোর্স অফকোর্স। নিয়ে যাও। ”
সাক্ষ্যও মাথা নাড়াল। দ্বিতীর হাতটা ধরে পিছ পিছু আসতে বলল ফঠোগ্রাফির জন্য। কন্ঠটা যেন শোনাল গম্ভীল, টানটান। দ্বিতী চাইল। সাক্ষ্যর পিছু পিছু যেতে যেতে হেসে বলল,
“ আর ইয়্যু জ্বেলাস সাক্ষ্য এহসান?”
সাক্ষ্য উত্তর করল না। তবে ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ হোয়াইট কালারের শাড়ি কি জেনেশুনেই চ্যুজ করেছিলেন? ”
দ্বিতী এবার ভ্রু বাঁকাল। যেতে যেতে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ কি জেনেশুনে চ্যুজ করেছি? ”
“ এই যে হোয়াইট কালারটায় অদিতি আন্টির মেয়েকে দেখলে আর চোখ ফেরানো যায় না। মানুষজন তাকিয়ে থাকে। শোধবোধ করে নিতে চাইছেন নাকি? ”
দ্বিতী বোধহয় বুঝল কিসের শোধবোধ। এই যে সাক্ষ্যর দিকে রোজ রোজ কত মেয়ে চেয়ে থাকে, কানের কাছে ঘুরেফিরে প্রশংসা করে দ্বিতীরও এমনই জ্বলে। এইক্ষেত্রে দ্বিতীর ভালোই লাগল। ফুরফুরে এক অনুভূতি নিয়ে অবুঝের মতো প্রশ্ন করল,

দুইজনাতেই পর্ব ৩০ (২)

“কিসের শোধবোধ? ”
“ নিজের জিনিস অন্য কেউ মুগ্ধ হয়ে দেখার যে যন্ত্রণা তার শোধবোধ।”
দ্বিতী এবারে ভ্রু নাচল। জিজ্ঞেস করল,
“ ধুরর! কিসের যন্ত্রণা। অনুভূতিটা সুন্দর না বলুন? সেই চমৎকার। এখন বলুন, কেমন লাগছে আপনার এই অনুভূতি? ”

দুইজনাতেই পর্ব ৩২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here