Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯১

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯১

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯১
রানী আমিনা

আনাবিয়া ওঠেনি বারান্দা থেকে, সোফায় শরীর এলিয়ে বসে আছে এখনো। লিও দাঁড়িয়ে ওর পেছনে। মহসিন রয়্যাল কুককে দিয়ে তৈরি করা একটা কুইক রেসিপি কিচেন থেকে এনে রাখলো টি-টেবিলের ওপর। আনুগত্যের সুরে বলল,
“শেহজাদী, খাবার তৈরি হচ্ছে। আপনি এখন দয়া করে এখন এটুকু খেয়ে নিন, ক্ষিধে কমে যাবে।”
আনাবিয়া হাতে টেনে নিল পাত্রটিকে৷ মহসিন খাবার রেখে এগিয়ে গেলো লিওর দিকে, চাপা স্বরে বলল,
“হিজ ম্যাজেস্টি বলেছিলেন শেহজাদী জাগলে তাঁকে জানাতে, এখন কি করব? হিজ ম্যাজেস্টি তো ছোট্ট শেহজাদার কামরায়।”
“আপাতত অপেক্ষা করো মহসিন।”
“আমরা তাঁকে না জানিয়ে অপেক্ষা করেছি শুনলে যদি তিনি রেগে যান?”
“শেহজাদীর চোখের সামনে দিয়ে যদি ও কামরায় যেতে পার তবে যাও৷”
মহসিন চুপ হয়ে গেল, ভাবলো কোনো এক ফাঁকে শেহজাদীর চোখে ফাঁকি দিয়ে হিজ ম্যাজেস্টিকে একটা সংকেত দিয়েই চলে আসবে৷ লিওর পেছন থেকে চুপিচুপি সরে গিয়ে সে দেয়ালের গা ঘেঁষে এগোলো ছোট্ট শেহজাদার কামরার দিকে, যেন খেতে ব্যাস্ত শেহজাদীর দৃষ্টিতে ধরা না পড়ে যায়৷
কিছুদূর এগোনোর পরেই আচমকা পেছন থেকে ভেসে এলো আনাবিয়ার ভারী কন্ঠস্বর,

“কোথায় যাচ্ছ মহসিন?”
“ক্‌-কোথাও না তো শেহজাদী, এ-এমনিতেই হাটছি একটু।”
অপ্রস্তুত হেসে আমতাআমতা করে বলল মহসিন। আনাবিয়া ওকে ইশারায় ডেকে নিল কাছে। একটা শুকনো ঢোক গিলে মহসিন এগিয়ে এসে দাঁড়ালো আনাবিয়ার পাশে। আনাবিয়া কয়েক গ্রাস খাবার মুখে তুলে বলল,
“মীরকে এখন বিরক্ত করার প্রয়োজন নেই, সে তার শেহজাদাকে সময় দিক। তুমি এখানেই থাকো।”
মহসিন, লিও দুজনেই চমকে উঠে চোখাচোখি করলো তৎক্ষনাৎ। আসন্ন ঝড়ের অশনি সংকেতে শঙ্কিত হল দুজন। নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো তারা, যেন তাদের মুখনিঃসৃত একটি শব্দও উত্তপ্ত বাষ্পের ভেতর ছুড়ে দেওয়া এক ক্ষুদ্র কাঠির মস্তকে জ্বলতে থাকা স্বল্প অগ্নির মতন ছড়িয়ে দিতে পারে স্ফুলিঙ্গ!
এমন সময় শেহজাদার কামরার দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো মীর৷ দরজা ভেজিয়ে সম্মুখে তাকাতেই চোখে পড়লো বারান্দা চত্ত্বরে বসে আনাবিয়া, কাঁপা হাতে চামচে গরম স্যুপ তুলে মৃদু ফু দিয়ে মুখে তুলছে ক্ষণিক পর পর৷ পাশেই পাংশু চেহারায় দাঁড়িয়ে লিও আর মহসিন৷ আচমকা মীরকে দেখে তটস্থ হয়ে উঠলো দুজনেই, একে অপরের দিকে চেয়ে নিঃশব্দ মত বিনিময় করে নিল।

এত রাতে অপ্রত্যাশিতভাবে আনাবিয়াকে জাগ্রত দেখে ভড়কাল মীর, এক অদ্ভুত ভীতির শীতল শিহরণ বয়ে গেলো তার মেরুদণ্ড জুড়ে। হেকিম বলেছিল আরও দুদিন না পেরোলে জ্ঞানে ফিরবেনা আনাবিয়া।
নির্ধারিত দিনের পূর্বেই আনাবিয়াকে সজ্ঞানে দেখে মীর প্রফুল্ল হল, একই সাথে উদ্বিগ্ন হল কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটির কারণে সময়ের আগেই আনাবিয়া জেগে উঠলো কিনা ভেবে। যে কারণে তার এত সতর্কতা সেটাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল কিনা ভেবে শঙ্কিত হলো আরও।
দ্রুত পায়ে বারান্দা চত্ত্বরে এসে আনাবিয়ার পাশে বসে উৎকন্ঠিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কতক্ষণ জেগেছো? শরীর কেমন লাগছে এখন? কোনো অসুবিধা মনে হচ্ছে?”
পরক্ষণেই আনাবিয়ার উত্তরের অপেক্ষা না করে মহসিনের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,
“হেকিমকে ইনফর্ম করেছো?”
“ক্ষমা করবেন ইয়োর ম্যাজেস্টি, হেকিমকে এখনো জানানো হয়নি, আমি এখনি সংবাদ পাঠাচ্ছি।”
“হেকিমকে এখনো জানানো হয়নি মানে টা কি? এতদিন ধরে ঘুমে থাকা একজন জাগলো আর তোমরা হেকিমকে সংবাদ না দিয়ে এখানো কিসের অপেক্ষা করছো? জ্ঞান বোধ সব লোপ পেয়েছে তোমার, মহসিন?”

বাঁজখাই গলায় ধমকে বলে উঠলো মীর। মহসিন চুপসে গিয়ে মীরকে আনুগত্য জানিয়ে তৎক্ষনাৎ ছুটলো মেডিক্যাল জোনে সংবাদ পাঠাতে।
আনাবিয়ার হাত কাঁপছে, শরীরের অত্যাধিক দুর্বলতায় ব্যর্থ হচ্ছে সে খাবার মুখে তুলতে। তবুও ক্ষুধার তাড়নায় শরীরের বেঁচে থাকা শক্রিটুকু দিয়ে চামচে চুমুক দিয়ে চলেছে সে৷
মীর ওর দিকে ক্ষণিক চেয়ে থেকে অকস্মাৎ ছিনিয়ে নিলো স্যুপের পাত্র, চামচটা হাতে নিয়ে স্যুপ তুলে ধরলো আনাবিয়ার ঠোঁটের সম্মুখে।
আনাবিয়া থমকালো! মন জোর দিয়ে বলে উঠলো এখনি এ স্থান থেকে উঠে চলে যেতে, কিন্তু মস্তিষ্ক সায় দিলনা তাতে। এই দুর্বল শরীর নিয়ে বিদ্রোহ করে সে পেরে দিবেনা।
ওকে চামচের দিকে স্থীর তাকিয়ে থাকতে দেখে মীর নিজে নিজেই সেটা পুরে দিল ওর মুখগহ্বরে। পরক্ষণেই ওর ফুলে ওঠা মোলায়েম পা জোড়া এক হাতে তুলে নিলো কোলের ওপর, ঘুরিয়ে বসিয়ে দিল সোফার কিনারে, পিঠের নিচে একটা কুশন বালিশ দিয়ে বলে উঠলো,
“এখানে হেলান দিয়ে আরাম করে বসো।”
আনাবিয়া প্রতিবাদ করলোনা, কিন্তু দৃষ্টি মেলালোনা মীরের সাথে। মীর ওকে খাওয়াতে খাওয়াতে লিওকে প্রশ্ন করলো,

“খাবার তৈরি হচ্ছে?”
“জ্বি, ইয়োর ম্যাজেস্টি। এতক্ষণে হয়েও এসেছে বোধ হয়, আমি এখনি খোঁজ নিচ্ছি।”
লিও প্রস্থান করলো তৎক্ষনাৎ। আনাবিয়া সোফায় গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। প্রচন্ড ক্লান্তিতে, ক্ষুধায় শরীর যেন আর চলতে চাইছেনা তার, গর্ভে থাকা প্রাণ গুলো যেন শুষে নিতে চাইছে তার সমস্ত শক্তি! মীর স্যুপের বাটিটা রেখে গা ঘেঁষে বসলো আনাবিয়ার, টেনে নিল নিজের বুকের ওপর। আনাবিয়া বলহীনা তরলের মতন এসে পড়লো ওর বক্ষপরে। মীর ওকে নিজের সাথে আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো,
“শরীর খুব খারাপ লাগছে, শিনজো?”
আনাবিয়া উত্তর করলোনা। ক্ষণিক পরেই মহসিন ফিরলো হেকিমদের নিয়ে। তারা মীরকে আনুগত্য জানিয়ে তৎক্ষনাৎ লেগে পড়লো কাজে। কিছুক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানোর পর উঠে পড়লো সকলে। প্রধান হেকিম বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমাদেরকে কিছুটা সময় দেওয়ার অনুরোধ করছি।”
মীর আনবিয়াকে বুক থেকে নামিয়ে আবারও এলিয়ে দিল সোফায়। লিও আর মহসিন ততক্ষণে হাজির হয়েছে ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে। লিওর ওপর আনাবিয়াকে খাওয়ানোর দায়িত্ব দিয়ে হেকিমদের সাথে আড়ালে চলে গেলো মীর৷
প্রধান হেকিম উৎকন্ঠা নিয়ে বলল,

“ইয়োর ম্যাজেস্টি। আমাদের হিসাব অনুযায়ী শেহজাদীর আরও কিছুদিন স্লিপিং মোডে থাকার কথা ছিল, নইলে অ্যান্টিবায়োটিক তার কাজ সম্পুর্ন করতে পারবেনা। রেডিয়েশন এখনো বেশ অনেক খানিই জমে আছে তার শরীরে। সেটুকু দূর করতে না পারলে অনাগত শেহজাদাদের ওপর তার প্রভাব পড়বে শতভাগ নিশ্চিত। কিন্তু ঠিক কেমন প্রভাব পড়বে আমরা কেউ অনুমান করতে পারিনা, ইয়োর ম্যাজেস্টি। এত কড়া স্লিপিং পিলের পরেও উনি কিভাবে জেগে উঠলেন আমি এখনো বুঝতে পারছিনা।”
প্রধান হেকিম উদ্বিগ্ন, নত চোখে চেয়ে রইলো মেঝের দিকে ক্ষণিক নিরবতা চলল সেখানে। অকস্মাৎ মীর বলে উঠল,

“আমার হিসাবে ভুল হয়েছে হেকিম সাহেব, বিরাট ভুল। ছোট্ট শেহজাদাকে রয়্যাল ফ্লোরে রাখার সিদ্ধান্ত আমার ভুল ছিল। তার কান্না শিনজোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে আমি সেটা অনুধাবন করে ছিলাম, কিন্তু শিনজো সেন্সলেস থাকায় আমি ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি ভাবিনি।
তবুও আমি ওকে শিনজোর কামরা থেকে অনেক দূরে রেখেছি, যেন কোনোভাবেই শেহজাদার কোনো আওয়াজ ওর কান অব্দি না পৌঁছে, বিশেষত কান্নার আওয়াজ।
শিরো মিদোরিতে অবস্থিত যেকোনো মাতৃহারা নবজাতক বা শিশুর উপস্থিতি শিনজো অনুভব করে, এটা সে এখনো আবিষ্কার না করলেও আমি জানি। তার জীবনের শুরু থেকেই তার প্রতিটা মুভমেন্ট আমি পর্যবেক্ষণ করে আসছি। মানব সন্তান নিয়ে আমি কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম, তবুও যথেষ্ট সতর্ক থেকেছি যেন শেহজাদা উচ্চস্বরে কান্নার সুযোগ না পায়, কিন্তু আমার সতর্কতা বিফলে।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, এখন কি করবেন তবে? শেহজাদীর আশেপাশে কোনো কমোনার বা রেড জোনের অ্যানিমালের থাকা নিরাপদ হবেনা, ইয়োর ম্যাজেস্টি। রেডিয়েশনের কারণে তাদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে৷ রয়্যাল ফ্লোরে জনসংখ্যা যত কম থাকবে ততই সবাই সুস্থ থাকবে, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”

“আমি দেখছি ব্যাপারটা।”
মীর ফিরে এলো বারান্দা চত্ত্বরে। হেকিমেরা আনুগত্য জানিয়ে প্রস্থান করলো তৎক্ষণাৎ।
লিও তুলে খাওয়াতে সংকোচ বোধ করছে, কোনো ভাবেই শেহজাদী যেন বিরক্ত বা অপ্রস্তুত বোধ না করেন তার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে৷ জীবনে প্রথম বোধ হয় শেহজাদীর খাবারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে৷
কোকো উপস্থিত থাকলে সবকিছু সহজ হত। শেহজাদী কারো সাথে সহজ না হলেও কোকোর সাথে তার অনেক অনেক সুন্দর সম্পর্ক, হিজ ম্যাজেস্টি ব্যাতিত অন্য কারো সাথে সে এতটা সহজ হয়েছে কিনা জানা নেই লিওর৷
মীরের ইশারা পেয়ে লিও খাবার রেখে উঠে পড়ল তৎক্ষণাৎ, আনুগত্য জানিয়ে প্রস্থান করলো বারান্দা চত্ত্বর থেকে, মহসিনও এগোলো তার পেছন পেছন। রয়ে গেলো শুধু ওরা দুজনেই।
রাতের এখনো অনেক বাকি, সবে তৃতীয় প্রহরে পড়লো। চারদিকে ঝুম অন্ধকার, আমাবস্যা। কয়েকটি জোনাকি পিট পিট করে আলো দিয়ে চলেছে। মীর টেবিলের ওপর থাকা আধা খাওয়া কিং ক্র‍্যাব টাকে একবার দেখে বসলো আনাবিয়ার পাশে৷ সে বসতেই আনাবিয়া সরে বসলো সামান্য।
ওকে সরে যেতে দেখেও মীর বললনা কিছু, টেবিলের ওপর থেকে কিং ক্র‍্যাব রাখা পাত্রটা হাতে তুলে কাটা চামচে টুকরো মাংস বিদ্ধ করে পুরে দিল আনাবিয়ার মুখের ভেতর। শুধোলো,

“কাটাচামচে খেয়ে পোষাবে নাকি আস্ত আস্ত দিব?”
আনাবিয়া উত্তর করলনা কোনো, চেয়ে দেখলোনা মীরের দিকে। হাত বাড়িয়ে অন্য খাবারের পাত্র তুলে নিল সে। মীর তা দেখে ঠোঁটের কোণ বাকিয়ে হাসলো। আচমকা দুহাতে টেনে তুলে আনাবিয়াকে নিজের কোলের ভেতর বসিয়ে দিল সে।
ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে মীরের কোলে আবিষ্কার করলো আনাবিয়া। ঘাড় ঘোরাতেই মীরের স্বর্ণাভ, কর্তৃত্ব পূর্ণ চোখে চোখ পড়লো তার, সাথে সাথেই চোখ ফিরিয়ে নিল সে।
কিন্তু তৎক্ষণাৎ ওর মুখখানা নিজের দিকে সবেগে ফিরিয়ে নিয়ে এলো মীর, ভারিক্কি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আমার দিকে দেখছ না কেন?”
“বাহারকে বিয়ে করেছ তুমি?”
মীরের প্রশ্ন শেষ হওয়ার সাথেই দৃঢ় স্বরে পালটা প্রশ্ন করল আনাবিয়া৷ মীর সুস্থির চোখে ক্ষণিক দেখলো আনাবিয়ার চোখ জোড়া, সেখানে নিজের জন্য এক রাশ অবিশ্বাস, বিদ্বেষ, বিতৃষ্ণা, ক্ষোভ দেখতে পেলো মীর। মুখে নিজের চিরাচরিত মোলায়েম অথচ দুর্বোধ্য হাসি টেনে মীর জবাব দিল,

“না।”
“তবে বাচ্চাটা কিভাবে এলো?”
“টেস্টটিউবে। তার সাথে আমার ফ্যিজিক্যাল কোনো কনটাক্ট হয়নি, শিনজো।”
আনাবিয়া তাচ্ছিল্য ভরা চোখে চেয়ে রইলো মীরের দিকে, উপহাসের স্বরে বলল,
“জানো, লাইফট্রি আমাকে দুইটা অপশন দিয়েছিল। আমি চাইলে তার মাধ্যমে শিরো মিদোরির এ মাটিতে মিশে যেতে পারতাম, কিন্তু আমি তা করিনি। নিজের সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আমি ফিরে এসেছিলাম তোমার সন্তানকে গর্ভে ধারণের ক্ষমতা নিয়ে৷ হয়ত তখন আমার বেঁচে থাকার লোভ জেগেছিল আবার, তোমার সাথে৷ অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ মা’ বিগেস্ট মিস্টেক! আমার কখনোই ফিরতে হতনা মীর!”
“বুঝলাম, এখন খেয়ে নাও। এসব নিয়ে পরে কথা বলব, তোমার শরীর ভালো নয়, ভুলে যেওনা।”
“তুমি কি জানো তুমি একটা চরম মাত্রার ধোঁকাবাজ?”

“আমি ধোঁকাবাজি করিনি শিনজো, আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম আমি কখনো কোনো দাসী… কোনো নারী সঙ্গে যাবনা। আমি যাইনি, আমি অন্য উপায় অবলম্বন করেছি। তুমি বলতে পারো, তোমাকে না জানিয়ে আমি ভুল করেছি, কিন্তু তুমি আমাকে ধোঁকাবাজ বলতে পারো না। এখন খেয়ে নাও, এসব নিয়ে চিন্তা করে নিজের ওপর প্রেশার ক্রিয়েট কোরো না৷”
শান্, মোলায়েম স্বরে বলল মীর। আনাবিয়া যেন অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল তাতে, দুহাতে আচমকা মীরের গলা সজোরে চেপে ধরে ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলো,

“এই প্রেশারে কে ফেলেছে আমাকে? কে বার বার এত যন্ত্রণায় পিষেছে আমাকে? তুমি করেছো! কেন করেছো জানো? কারণ আমি এ জীবনে তোমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছি! তুমি আমার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, তুমি ভালোভাবেই জানো আমি কখনো কোনোদিন তোমাকে ছেড়ে যেতে পারবনা, সেই সাহস আমার হবেনা! আর এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছো তুমি বার বার!
তুমি কোনো মানুষের ভেতর পড়োনা মীর! তুমি একটা পশু, একটা নিকৃষ্ট পশু!”
শেষোক্ত কথা গুলো ভীষণ ক্রোধে দাঁতে দাঁত পিষে বলল আনাবিয়া, ক্ষোভে চোখ থেকে বেরিয়ে এলো নোনা জল! মীর নিজের গলা থেকে আনাবিয়ার হাত জোড়া আলতো স্পর্শে ছাড়িয়ে নিয়ে এলো, ওকে দ্বিতীয়বার নিজের কোলের ভেতর ভালোভাবে বসিয়ে নরম স্বরে বলল,
“হাইপার হয়োনা, তুমি এখন একা নও। নিজের পেশি শিথিল করো শিনজো, এভাবে প্রেশার দিওনা। শান্ত হয়ে বসো, আমি যা বলি শুনো।”
আনাবিয়ার বাহু জোড়ায় হাত বুলিয়ে ওর পেশি শিথিল করার চেষ্টায় নিমগ্ন হল মীর। আনাবিয়া ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠলো,

“তোমার কোনো কথা আমি আজ শুনবনা, আজ আমি বলব তুমি শুনবে!”
“শান্ত হয়ে বললে সব শুনবো।”
“আমাকে নামিয়ে দাও তোমার কোল থেকে, এখনি!”
“দুঃখিত, এটা শুনতে পারবনা।”
“তুমি কি আমার সাথে মশকরা করছো মীর?”
“না, যেটা পারবনা সেটা স্বীকার করেছি মাত্র।”
আনাবিয়া ক্রোধের তোপে দম ফেললো ঘন ঘন, অতঃপর নিজ চেষ্টায় উঠে যেতে নিল মীরের কোল ছেড়ে। কিন্তু নিজের সাথে ওর কোমর সজোরে আকড়ে ধরে মীর বলে উঠল,
“উঠোনা, ব্যাথা পাবে৷”
“বাহারকে কোথায় রেখেছ?”
“কিমালেবের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে।”
“ওহ্‌, ওকে মেরেও ফেলেছো? কেন? প্রমাণ লুট করতে?”
“কিসের প্রমাণ?”
“বিয়ে করেছিলে যে তার প্রমাণ।”
“আমি ওকে বিয়ে করিনি শিনজো। আমি তোমার থেকে সত্য লুকোতে পারি কিন্তু মিথ্যা বলবনা এটা তুমিও জানো।”

“তুমি যে ওকে বিয়ে করোনি তার কি প্রমাণ?”
“তুমি যে কাউকে জিজ্ঞেস করতে পার।”
বলল মীর। আনাবিয়া তাছিল্য হেসে বলল,
“কাকে জিজ্ঞেস করবো? এই সম্পুর্ন পঞ্চদ্বীপে কে আছে আমার? কে সত্য বলবে আমাকে? সবাই তো তোমার মীর, সবাই তো তোমার পায়ে পড়ে থাকে! কার সাধ্য আছে আমার সামনে এসে সত্যটা বলবে? তোমার জীবনে যে আমার সম্পুর্ন এগজিস্টেন্স ই হাস্যকর, মীর!
তোমার আধিপত্যের নিচে চাপা পড়ে গেছি আমি অনেক আগেই! আমার কাছে আসতে হলে, আমাকে চিনতে হলে সবাইকে প্রথমে তোমাকে পেরোতে হয়! তোমার ক্ষমতা সর্বদা আড়াল করে রাখে আমাকে, আঁটকে রাখে আমাকে! কোথাও-কারো কাছে যেতে দেয়না, আর না দেয় কাউকে আমার কাছে আসতে!”
“অর্থহীন কথা বোলো না শিনজো, শান্ত হও৷ আমি কাউকে বিয়ে করিনি, কারো সাথে আমার কোনো ধরণের ইন্টিমেসি হয়নি৷ আমি তোমার সাথে মিথ্যা বলিনি কখনো, বা তোমাকে মিথ্যা বলে আমার বিশেষ কোনো ফায়দা নেই।”

“তবে বাহারকে মেরে ফেলেছো কেন?”
“তার সাথে আমার বিশেষ কোনো শত্রুতা নেই যে মেরে ফেলবো। সে মারা গেছে।
“ও মারা যায়নি, ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। তোমার কাছে তো মানুষের জীবন কচুপাতার পানির মত অর্থহীন, তাইনা? প্রয়োজন শেষে কাউকে ছুড়ে ফেলে দিতে দ্বিতীয় বার ভাবনা তুমি! আমি তোমার কমফোর্ট জোন, তাই আমাকে এখনো আঁটকে রেখেছ তোমার কাছে। যেদিন আমার প্রয়োজন ফুরোবে সেদিন বাহারের স্থানে আমি থাকব এবং তাতে আমি বিশেষ অবাক হবনা।”

“যার তার সাথে নিজেকে তুলনা দিবে না, শিনজো। তুমি দেমিয়ান পরিবারের মেয়ে, এটা মনে রেখো।”
“এই দেমিয়ান পরিবারের মেয়ে না হয়ে কোনো নোংরা নর্দমার কীট হলেও আমি অনেক সুখে থাকতাম মীর! নিজের স্বামীকে তবে অন্য নারীর বিছানায়, অন্য নারীর সন্তানের পিতা হিসেবে দেখতে হতনা!
লজ্জা করেনা তোমার? এত কিছুর পরেও তুমি কিভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়াও! কিভাবে আমাকে কাছে টানার মত স্পর্ধা হয় তোমার? তোমার কি কখনো এতটুকু বুক কাঁপেনি? সত্যি করে বলোতো? তুমি কখনো আমাকে ভালোবেসেছো, কখনো কোনোদিন আমার জন্য এতটুকু মায়া হয়েছে তোমার?”
ক্রোধে, ক্ষোভে হাঁফাতে রইলো আনাবিয়া। যন্ত্রণায়, অসহায়ত্বে ভ্রু জোড়া কুচকে রইলো তার৷ মীর তাকিয়ে রইল আনাবিয়ার মুখপানে, এখনো আনাবিয়াকে নিজের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে সে৷ ক্ষণিক নিরব থেকে আনাবিয়া আবারও ক্ষুব্ধ, বিপর্যস্ত স্বরে বলে উঠলো,

“কি করিনি আমি তোমার জন্য! যখন তোমার মায়ের পেটের আপন ভাই তোমাকে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে জানোয়ারের মত বেঁধে ফেলে রেখেছিল, যখন তুমি সমস্ত পঞ্চদ্বীপ বাসির কাছে মৃত হয়ে ছিলে, যখন তোমার পায়ে পড়ে থাকা লোকগুলো তোমাকে বছরেও একবার স্মরণ করতনা তখন এই আমি তোমাকে জীবিত ভেবে রাতদিন এক করে সমস্ত রেড জোন খুঁজে বেড়িয়েছি! তোমার অমানুষিক অবস্থা থেকে এত আদরে এত যত্নে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি! তোমার কাছে নিজেকে সঁপে না দেওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেও সেই তোমাকেই আমি আবার বুকে টেনে নিয়েছি! আর তার প্রতিদান তুমি এভাবে দিলে? ওই কামরা থেকে তোমার সন্তানের কান্নার শব্দ এখনো ভেসে আসছে মীর, যার মা আমি নই! এগুলো তুমি কিভাবে এক্সপ্লেইন করবে? বলো, আমি শুনতে চাই।”
ভ্রুতে ক্রোধের ভাজ ফেলে আনাবিয়া চেয়ে রইলো মীরের দিকে৷ মীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“পেশি শিথিল করে বসো, পেটে চাপ দিওনা।”
আনাবিয়া নিজের গর্ভে এক সুক্ষ্ম যন্ত্রণা টের পেলো। মীরের কথা মান্য না করলেও নিজের শরীর ছেড়ে দিয়ে শান্ত হয়ে বসলো সে। ভ্রুজোড়া টানটান করে শকুনি চোখে চেয়ে রইলো মীরের দিকে। মীর গলা খাকারি দিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

“অনেক বছর আগে, যখন তুমি প্রথমবার সন্তানসম্ভবা হয়েছিলে, তখন আমি তোমাকে না জানিয়েই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”
“কিসের সিদ্ধান্ত?”
“তোমার অ্যাবর্শনের সময়ে হেকিমকে দিয়ে কপার-টি সেট করিয়েছিলাম।”
আনাবিয়া ক্ষণিক স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো মীরের দিকে। প্রথমটায় যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হল তার, হতভম্বতা এসে ভর করলো তার মুখপরে। নিজের অজান্তেই মীরের কোল ছেড়ে দূরে যেতে উদ্যত হল তার শরীর, যেন প্রাণপণে চাইল মীরের সমস্ত স্পর্শ, সমস্ত উপস্থিতি থেকে নিজেকে শত কোটি আলোকবর্ষ দূরে নিয়ে যেতে!
মীর তৎক্ষনাৎ দুহাতে আরও জোরে নিজের কাছে টেনে নিল ওকে, শান্ত স্বরে বলল,
“আমার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠতে পারবেনা, শান্ত হয়ে বসো।”
আনাবিয়ার হাত জোড়া ক্ষণিক পর পর তীব্র ক্রোধে, ক্ষোভে মুঠি হয়ে এলো! মীর ওর হাতজোড়া নিজের এক হাতের মুঠিতে ধরে শাসনের স্বরে বলল,
“একবার বলেছি পেশির ওপর জোর দিও না, কথা শুনোনা কেন?”
আনাবিয়া দাঁতে দাঁত চেপে চেয়ে রইলো ওর দিকে। মীর এবার সরাসরি তাকালো ওর চোখে, মৃদু কোমল স্বরে বলল,

“সিদ্ধান্তটা আমি একাই নিয়েছি কারণ তখন তোমার সাথে পরামর্শের কোনো উপায় আমার ছিলনা। তাছাড়া তখন আমি চাইনি তুমি ওই অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বা গর্ভপাতের বিষয়টি জানো। এবং আমি তোমার স্বামী, তাই তোমার সম্পর্কে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার আছে।”
“না নেই! আমাকে না জানিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তোমাকে কেউ দেয়নি!”
বিক্ষুব্ধ স্বরে চেচিয়ে বলল আনাবিয়া। মীর পূর্বের মতোই শান্ত স্বরে বলল,
“অবশ্যই আছে, এ ব্যাপারে আমরা পরে কথা বলবো। এখন যা বলছিলাম, পরবর্তী দুইটি বছর তুমি বলা যায় স্লিপিং মোডে ছিলে। সুতরাং তোমার সাথে ওই ব্যাপারে কোনো আলোচনা করার সুযোগও আমার ছিলনা। দু’বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ব্যাপারটা অনেক খানিই চাপা পড়ে গেছিলো, এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই মুহুর্তে তোমাকে ও ব্যাপারে না জানানোই ঠিক হবে। সঠিক সময়ে তোমাকে আমি ব্যাপারটা জানাবো।”
“সঠিক সময়টা ঠিক কখন আসতো?”

“সেটা আমি তখনও ডিসাইড করিনি।
তুমি তখনও পুরোপুরি সুস্থ হওনি, কিন্তু আমি যেকোনো কারণেই হোক অপেক্ষা করতে পারছিলামনা৷ আমার হঠকারিতা আমার ডাউনফলের জন্য দ্বায়ী, আমি জানি। কিন্তু আমি তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার একটা সন্তান চাই, কিন্তু এই মুহুর্তে তোমাকে আমি ব্যাপারটা জানাবনা। জানালে তুমি হাইপার হতে পার, এবং নানা প্রশ্ন করতে পার যাতে তোমার প্রেগন্যান্সি এবং অ্যাবর্শন দুইটি ব্যাপারই সামনে চলে আসতে পারে। একবার একজন শেহজাদা চলে এলে তখন তোমার ব্যাপারটা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবেনা৷ কিন্তু আমি তখনও জানতাম না তুমি আমার সাথে ওভাবে কানেক্টেড, কারণ তোমার জন্মের পর থেকে আমি কোনো দাসীকে স্পর্শ করিনি। আমি ব্যাপারটা তখনই বুঝেছি যখন আমি ঘনিষ্ঠ—”
“চুপ করো মীর! লজ্জা করছেনা তোমার নিজের স্ত্রীর সামনে অন্য নারীর সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার কথা স্বীকার করতে? সেটাও এত অবলীলায়!”

“যা তুমি ইতোমধ্যেই জানো সেটা আবার বলতে কেন লজ্জাবোধ হবে? তাছাড়া তুমি আমার স্ত্রী, তোমাকে আমি তোমার জন্মমুহূর্ত থেকে দেখে আসছি, তোমার মায়ের পেটে চিরে আমিই তোমাকে টেনে বের করেছি। তুমি শিশু বয়সে শত কোটিবার আমার গায়ে হিসু করেছো, আমি তোমার পটি সাফ করেছি, তুমি আমাকে হাজার বার পোশাক ছাড়া দেখেছ, তোমাকে কেন লজ্জা পেতে যাব? আর এখন আমি এক্সপ্লেইন করছি, সুতরাং লজ্জার কোনো অবকাশ এখানে নেই। অযথা হাইপার হয়োনা।”
আনাবিয়া বিতৃষ্ণা নিয়ে চেয়ে রইলো মীরের মুখপানে। মীর আবার বলতে শুরু করল,
“যতক্ষণে বুঝেছি ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, এবং তুমিও সব জেনে গেছো। তুমি মেয়েটিকে খুন করলে, অকারণে৷ যদি তার মাধ্যমে আমি একটা সন্তান পেয়ে যেতাম তবে আমি যে আর কখনো কোনো নারীসঙ্গে যেতামনা এটা তুমিও বেশ ভালো ভাবেই জানো।
তুমি বার বার বলতে, কেন আমি তোমার মাধ্যমে একবার চেষ্টা করে দেখছিনা৷ কিন্তু সত্যটা তুমি জানতেনা, আমিও তোমাকে জানাতে চাইনি কারণ তুমি ব্যাপারটা মেনে নিতে পারতেনা৷ এখানে দুজনেরই দোষ ছিল, হয়তো আমার অপরাধ তুলনামূলক অনেক বেশিই। তোমাকে আমার তখনি জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল, তবে এত সমস্যার সম্মুখীন হতে হত না।

কিন্তু আমি তখন ভেবেছি তুমি কখনো প্রেশার নিতে পারবেনা, নিজের এমন জটিল সমস্যার ব্যাপারে জানলে তুমি ভেঙে পড়বে। যদি তুমি আমার সাথে কানেক্টেড না থাকতে তবে নারীঘটিত ব্যাপার গুলোও তুমি জানতে পারতেনা, সবকিছু খুবই স্মুদলি সমাধান হয়ে যেত, কিন্তু হয়নি।”
ক্ষণিক বিরতি দিয়ে মীর বলল,
“তবে এতে একটা সুবিধা হয়েছে, তুমি জানতে পেরেছো আমি ঠিক কবে কখন কি করেছি। আমি যদি নিজ শরীরের তাড়নায় কারো সাথে জড়িয়ে পড়তাম তবে তুমি সেটাও জানতে পারতে শিনজো। কিন্তু হিসাব কষে দেখো নিজ চাহিদা মেটাতে আমি ও পথে যাইনি। যাই হোক, অতীত নিয়ে মাথা খারাপ করার প্রয়োজন নেই৷”
“হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। অতীত নিয়ে মাথা ঘামালে তো তোমার অপকর্ম গুলো একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করবে, সাবধান হতে হবে তো, তাইনা?”
মীর হাসলো সশব্দে৷ আনাবিয়ার দিকে ফিরে বলল,

“আমার সম্পর্কে সবই তুমি জানো শিনজো, তোমার অজানা কিছু আছে বলে আমি মনে করিনা৷ তাই নতুন করে কোনো অপকর্ম আবিষ্কার করার অবকাশ নেই। এখন মেইন পয়েন্টে আসা যাক—
আমি জানতাম তোমার শরীরে কপার-টি সেট করা, সুতরাং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার আর কোনোই আশঙ্কা নেই৷ তুমি লাইফট্রির ভেতর চলে যাবার পর আমার জীবনে কি কি গেছে সেগুলো এখন না বলাই বেটার। তোমার অনুপস্থিতি আমাকে কতটা পীড়া দেয় সেটা তোমার অজানা নয়৷ তবে তুমি আমার জীবন থেকে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার পর আমি তোমার অভাবটা বেশ ভালোভাবেই টের পেয়েছি৷ যদি তুমি ফিরে না আসতে তবে আমি হয়তো আজও বন্দি রয়ে যেতাম ডার্ক ফরেস্টের গহীনে, হয়তো সেখানেই ধুঁকে ধুঁকে মরতাম কোনো এক দিন৷ তুমি যে আমার উদ্ধারকর্ত্রী হয়ে আমাকে ওই অমানুষিক জীবন থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছো তার জন্য আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।”

“তোমার কৃতজ্ঞতার নমুনা দেখতে আর বাকি নেই আমার। দেখছি এত যাবৎকাল, কতটা কৃতজ্ঞ তুমি!”
মীর পাত্তা দিলনা আনাবিয়ার কথা, ওর ক্রুদ্ধ চেহারায় মোলায়েম দৃষ্টি বুলিয়ে সে আবার বলতে শুরু করল,
“তুমি আমাকে ডার্ক ফরেস্ট থেকে নিয়ে আসার পর আমি আর কখনো কোনো নারীকে স্পর্শ করিনি শিনজো, সন্তানের জন্যও নয়৷ জানিনা কেন, তবে তুমি আমাকে যখন ভুলিয়ে দিয়েছিলে তোমার সব স্মৃতি তখনও আমি কোনো নারীসঙ্গে যাইনি৷ তোমাকে যেদিন আমি মনে করতে পেরেছি, যেদিন আমি আমার সব স্মৃতি ফিরে পেয়েছি সেদিন থেকেই আমি হেকিমদের কাজে লাগিয়ে দিয়েছি বহুবছর পূর্বে ব্যর্থ হওয়া রিসার্চে, যেন আমার প্রত্যক্ষ ইনভলভমেন্ট ছাড়াই আমি দেমিয়ান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরীকে পেয়ে যাই৷ যদিও সেজন্য আমাকে বহু মেয়েকে বলি দিতে হয়েছে, অনেকেই সহ্য করতে পারেনি এত যন্ত্রণা, এত চাপ! প্রথমবার যখন ওরা সফল হলো এমব্রায়ো ট্রান্সপ্লান্ট করতে সেদিনই তোমাকে আমি জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি তখন আমার ঘোর বিরোধী।”

এটুকু বলে থামলো মীর। আনাবিয়া স্থীর হয়ে চেয়ে ওর দিকে। তলপেটের যন্ত্রণাটি বেড়ে চলেছে উত্তরোত্তর, কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সেটুকু হজম করে চলেছে সে। মীর আবার বলতে আরম্ভ করল,
“তবে ট্রান্সপ্লান্টটি সফল হয়নি, মেয়েটি তিন মাসের মাথায় ধকল সইতে না পেরে দেহত্যাগ করে৷ কিন্তু এরপর শেষ অপশন হিসেবে রয়ে যায় মাত্র দুজন, একটি নাম না জানা মেয়ে এবং গুলবাহার; যাকে আমি নিয়ে এসেছি ইলহানের থেকে, এবং তোমাকে ব্যাপারটা না জানানোর বিনিময়ে তাকে দিয়েছি পঞ্চদ্বীপে স্বাধীন ভাবে বসবাসের সুযোগ।”
মীর সামান্য হেসে বলল,
“সে কোনো বাক্যব্যয় ছাড়াই আমার অফার লুফে নিয়েছিলো, শিনজো। সে হয়তো তোমাকে ভালোবাসে ঠিকই, তবে ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ কথাটি জানো নিশ্চয়! আমার কথা মেনে নিয়ে, তোমার থেকে সত্য গোপন করে সে প্রমাণ করে দিল তোমার প্রতি তার ভালোবাসার বহর কতখানি। যাই হোক, অন্যের ভালোবাসা মাপার বাটখারা নিয়ে আমি বসে নেই।”

বিরতি দিল মীর, আনাবিয়ার মুখভঙ্গি লক্ষ্য করে আবার বলতে শুরু করল,
“অন্য মেয়েটি যেদিন সন্তানসম্ভবা হল সেদিন আমি তোমাকে আবারও জানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। তুমি তখন কুরো আহমারে ছিলে, তোমার আবার নতুন করে স্টুডেন্ট হওয়ার শখ জেগেছিলো। অর্কিড বাগানে গিয়ে আমাদের বাচ্চার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে সেখান থেকে এক তোড়া ফুল তুলে নিয়ে তোমার সাথে দেখা করতে গেলাম। কিন্তু তুমি তো বাঘিনী, আমার কথা তুমি শুনবে কেন? ভেবে দেখলাম এই উত্তপ্ত আবহাওয়ার ভেতর তোমাকে কিছু জানালে হিতে বিপরীত হতে পারে, কিছুদিন অপেক্ষা করি পরিবেশ ঠান্ডা হওয়ার জন্য৷ কিন্তু তুমি শান্ত হলেনা, দিনে দিনে হয়ে উঠলে আরও অশান্ত, মন খারাপ করে বসে থাকতে সবসময়। আমাকে তোমার ধারে কাছেও ঘেঁষতে দিতেনা৷”

কথাগুলো বলে মীর আরেকটু জোর দিয়ে জড়িয়ে নিল আনাবিয়াকে৷ কন্ঠে কোমলতা এনে বলল,
“গুলবাহার সন্তানসম্ভবা হয়েছিলো আরও কিছু মাস পরেই। এর মাঝে অন্য মেয়েটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লো, কিন্তু সেগুলো দেখার সময় আমার ছিলনা। তখন তোমার সাথে হঠাৎ করেই আমার সম্পর্কটা সুন্দর হয়ে গেলো। মনে হতে লাগলো সব আগের মত হয়ে যাবে আবার, আবার সুখি হবো আমরা দুজন৷ তোমার সাথে সুন্দর সময় কাটানোর লোভ সামলাতে পারিনি, যতটুকু সময় পেয়েছি শুধু তোমাকেই দিয়েছি। দিন গুলো তখন স্বপ্নের মত কাটতে শুরু করেছিলো আমার।”
থামলো মীর। আনাবিয়া চেয়ে আছে ওর দিকে, চোখের ভাষা বোঝা দায়। মীর শ্বাস ছাড়লো সশব্দে, তারপর বলতে শুরু করল,

“গুলবাহারের ব্যাপারটি আমি গোপন রাখলাম, কারণ ভয় হয়েছিল এই সুন্দর সময়গুলো আবার না নষ্ট হয়। বাচ্চাটি পৃথিবীতে চলে এলে তখন দেখা যাবে কি করা যায়। আর গুলবাহারের শরীরের অবস্থাও তেমন ভালো ছিলনা, সে যে টিকে থাকতে পারবেনা আমি জানতাম। তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো প্রচেষ্টাও করিনি। বলতে পারো আমি অনেক স্বার্থপর, কারো জানের পরোয়া করিনা। কিন্তু তোমার সাথে ভালো থাকার জন্য আমি যা কিছু করতে পারি৷”
মীর দম নিল, আনাবিয়ার চোখ জোড়া চিকচিক করছে। এখনো যে ধৈর্য ধরে সে মীরের কথা শুনে চলেছে এতেই খুশি হল মীর। গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“কিন্তু এর মাঝে কিমালেবের কিনারে মালবাহী জাহাজটা এসে সব এলোমেলো করে দিল! আমি তোমার দিকে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হলাম, দুটো মাস আমাকে তোমার থেকে দূরে থাকতে হল, তোমার অমতে৷ আর তাতে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হঠাৎ করেই খারাপ হতে শুরু করলো, তুমি আমার সাথে যোগাযোগের সমস্ত মাধ্যম বন্ধ করে দিলে৷

কিন্তু আমি ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবিনি তুমি সন্তানসম্ভবা! তুমি জেদ দেখাতে, পাগলামি করতে, অকারণ মন খারাপ করে কেঁদে ভাসাতে, বেশি বেশি খেতে চাইতে; কিন্তু সেটাকে আমি গুরুত্ব দেইনি অতটা, নিছক তোমার আদুরে স্বভাব ভেবেই এড়িয়ে গেছি। তাছাড়া পারিপার্শ্বিক চাপে সেগুলো নিয়ে ভাবিনি, কারণ তোমাকে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কোনো সুযোগ আমি রাখিনি। কিন্তু সেদিন কন্টেইনার দুর্ঘটনায় তোমাকে দেখার পর থেকে আমার সব পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে, সমস্ত বিফলে গিয়েছে৷ আমি যদি একটাবার জানতাম তুমি আমার সন্তানধারণে সক্ষম, আমি কখনো এত ঝামেলাতে জড়াতাম না শিনজো।
এতসবের মাঝেই আমার এক সন্তান পৃথিবীতে এসেছে, যাকে পাওয়ার জন্য আমি এতবছর ধরে হাজার সাধনা করেছি৷ আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছো, তোমার এমন নাজুক অবস্থাতে আমার জন্য কষ্ট পেতে হচ্ছে জন্য আমি ভীষণরকম অপরাধবোধে ভুগছি, শিনজো। কিন্তু… আমার ঔরসজাত সন্তানকে আমি ফেলে দিতে পারিনা! তার শরীরে দেমিয়ান রক্ত বইছে, আমার রক্ত বইছে। সে তো কোনো দোষ করেনি, সে তো নিরপরাধ! তাকে আমি নিজের বলে স্বীকৃতি না দিলে সেটা বিরাট অন্যায় হবে, শিনজো!”
থামলো মীর। আনাবিয়ার দিকে চেয়ে রইলো কোনো উত্তর পাওয়ার আশায়। আনাবিয়া একটা ঢোক গিলে ধরা গলায় বলে উঠল,

“ঠিক আছে তবে৷ তোমার তো একজন উত্তরসূরীরই প্রয়োজন ছিলো এবং তাকে তুমি পেয়েও গেছো। তবে এখন আমাকে বা আমার বাচ্চাদেরও তোমার কোনো প্রয়োজন—”
“ভুল বললে। বাচ্চারা শুধু তোমার একার নয়, আমারও। বাবা আমি ওদের৷ আর যদি তোমাকে আমার প্রয়োজন না-ই হত তবে তোমাকে নিজের কাছে, নিজের সাথে রাখার কোনো দরকার অনুভব করতাম না৷ অ্যাজ অ্যান এক্সট্রিম সেলফিস পা’সন আমি তোমাকে অনেক আগেই জীবন থেকে সরিয়ে দিতাম, তাই নয় কি?”
“ওহ আচ্ছা? তবে কী এই পৃথিবীতে শুধু তোমার প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ চলবে? অন্য মানুষের কি কোনো অনুভূতি নেই? কোনো আশা আকাঙ্খা নেই? আমাকে কি তোমার হাতের পুতুল মনে হয়? যেভাবে যখন ইচ্ছে চালাবে, ইচ্ছে হলে আদর করবে ইচ্ছে না হলে ছুড়ে ফেলে দিবে!
তাই যদি হয় তবে আমাকে আগেই বলে দাওনি কেন যে তোমার সাথে থাকতে হলে আমাকে নিজের সব আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিয়ে থাকতে হবে? নিজেকে রোবট করে ফেলতে হবে? তুমি যাচ্ছেতাই করবে, যার সাথে ইচ্ছে শুয়ে পড়বে, যেখানে যত ইচ্ছে বাচ্চা পয়দা করে আসবে আর আমি এখানে সতী সাধ্বী স্ত্রীর মত তোমার পায়ে পড়ে থেকে দয়া ভিক্ষা করবো! আগে বলোনি কেন?”
শেষোক্ত কথা গুলো বলতে গিয়ে ক্রোধের তোপে কেঁদে ফেললো আনাবিয়া। মীর ব্যতিব্যস্ত হলো হঠাৎ, দ্রুত হাতে আনাবিয়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,

“শান্ত হও শিনজো, এসব কথা বলার অনেক সময় আছে, পরেও ঝগড়া করতে পারবে৷ আমি অনেক খারাপ, অনেক অন্যায় করেছি, অনেক অনেক অপরাধ করেছি, তোমার সাথে অনেক অবিচার করেছি, অনেক অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তোমাকে৷ এর জন্য আমি অনুতপ্ত, ক্ষমা করো আমায়! ক্ষমা না করলেও এখন শান্ত হও!”
“কিভাবে শান্ত হবো আমি? কিভাবে আশা করো আমি এখনো শান্ত থাকবো? ওপাশের কামরায় তোমার বাচ্চা কাঁদছে মীর! ওর মা কে তুমি মেরে ফেলেছো! কি জবাব দেবে তুমি ওকে? ও যখন জিজ্ঞেস করবে ওর মা কোথায় তুমি কি জবাব দেবে? সেও যে বড় হয়ে তোমার তো ফ্রাস্ট্রেটেড স্যাডিস্ট, নার্সিসিস্টে পরিণত হবেনা তার কি গ্যারান্টি দাও তুমি?”
“থামো শিনজো, এসব ভেবে নিজের ওপর প্রেশার দিওনা। শরীর এখনো ঠিক হয়নি তোমার, তুমি এখনো অসুস্থ। তোমার পেটে আমাদের বাচ্চারা আছে ভুলে যেওনা, তোমার স্ট্রেস ওদের ওপরও প্রভাব ফেলবে, শান্ত হও৷ ভবিষ্যতের ব্যাপারে ভবিষ্যতে দেখা যাবে।”
“ওহ্‌! আমার পেটে বাচ্চারা আছে বলেই এত চিন্তা তোমার, তাইনা? আমার চিন্তা নেই তোমার! এত দরদ দেখাচ্ছো শুধু বাচ্চার খাতিরে, আমার খাতিরে নয়!”

উপহাসের স্বরে বলে উঠল আনাবিয়া৷ মীর ফোস করে শ্বাস ছাড়লো তাতে৷ টেবিলের ওপর থেকে খাবারের একটা পাত্র তুলে নিয়ে আনাবিয়ার মুখে কিছুটা খাবার জোর করে ভরে দিয়ে বলল,
“ঝগড়া করে হাঁফিয়ে গেছো, এখন খাবার খাও৷ তরতাজা হয়ে আবার সেকেন্ড ইনিংসে ঝগড়া করা যাবে৷ তুমি চাইলে থার্ড ফোর্থও শুরু করবো, এখন শান্ত হও।”
আনাবিয়া চোখের পানি মুছে খাবার চিবোতে চিবোতে বিক্ষুব্ধ, ধরা গলায় বলে উঠলো,
“তুমি যদি ভেবে থাকো এসব করে তুমি পার পেয়ে যাবে তবে তুমি ভুল ভাবছো! আমার বাচ্চাদেরকে তোমার কোনো প্রয়োজন নেই, আর তাদেরও তোমার মত বাবার প্রয়োজন হবেনা, ওদেরকে পুরো পৃথিবী দেওয়ার জন্য ওদের মা-ই যথেষ্ট!”
“বাচ্চাদের বাবার কোলে বসে, বাচ্চাদের বাবার হাতে খেয়ে সেই বাচ্চাদের বাবাকেই দূরে সরিয়ে দিতে চাও! এটা কেমন হয়ে গেলোনা?”

“নেহাত নড়তে পারছিনা তাই! নইলে তোমার ছায়াও আমি মাড়াতে যেতাম না!”
“ঠিক আছে ঠিক আছে, মহারানী৷ এখন আপনি একটু বেশি করে খেয়ে ঘুমোতে যান। ঘুম ভেঙে উঠলে আবার ঝগড়া করা যাবে৷ তখন ভাগাভাগি করে নেবো৷”
“কিসের ভাগাভাগি?”
“যেহেতু বাচ্চা হওয়াতে আমারও অবদান আছে সেহেতু বাচ্চার ভাগ আমিও পাই৷ আমাদের পাঁচজন শেহজাদা আসছে, সুতরাং এদেরকে আমরা ভাগাভাগি করে নিব।”
“তোমাকে ভাগ দিব কে বলল?”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯০ (২)

“কে বলবে? আমি ওদের বাবা না! ভাগ তো আমি অবশ্যই পাই।”
“ভাগ তোমার পেছন দিয়ে ভরে দিব!”
প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে দুহাতে মীরের গলা টিপে ধরে উগ্র স্বরে বলল আনাবিয়া। মীর সশব্দে হেসে উঠলো তাতে, পরক্ষণেই আবার এক বড় লোকমা খাবার পুরে বন্ধ করে দিল আনাবিয়ার মুখ৷

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here