Home ডাকপ্রিয়র চিঠি ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪২

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪২

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪২
রিক্তা ইসলাম মায়া

মধ্যরাতে মারিদ নূরজাহানকে নিয়ে বাড়ির ছাদে এসেছে। আকাশে চাঁদ নেই। তারা দেখা যাচ্ছে। নূরজাহান মুগ্ধ চোখে চারপাশটা দেখে বলে…
‘আপনি আমার সাথে এই ছাদে দাঁড়িয়েই কথা বলতেন তাই না?
‘ হুমম।
নূরজাহান ছাদের রেলিং ধরে ঝুঁকে নিচে তাকায়। ঢাকা শহর নাকি কখনো ঘুমায় না। রাতের বেলাও জেগে থাকে। এই মধ্যরাতেও রাস্তায় ব্যস্ত গাড়ির যাতায়াত দেখা যাচ্ছে। দোকানপাট খোলা। মানুষের চলাচল সবকিছু দিনের মতোই চলছে। মারিদ নূরজাহানের পাশে রেলিংয়ে কোমর ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। সে নূরজাহানের উচ্ছ্বাস মুখটা লক্ষ করছে। নূরজাহান মারিদের দিকে ফিরে বলে…
‘এই গভীর রাতে আপনার সাথে এমন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে পারব এটা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। আমার এখনো সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো লাগে। মনে হয় আমি স্বপ্নের ভেতরে আছি, ঘুম ভেঙে গেলে আপনিও হারিয়ে যাবেন।

‘ আপনি তো বসন্তের পাখি হয়ে এসেছিলেন আমার জীবনে। হঠাৎ হারিয়ে যাবেন সেটাও ভেবে রেখেছিলেন। আচ্ছা, আপনি কি ছলনা করতেই আমার জীবনে এসেছিলেন?
নূরজাহান মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকায়। লম্বা টান দিয়ে নিজের মাঝে মুক্ত শীতল হাওয়া অনুভব করে। মারিদকে বলে…
‘আপনাকে পেয়ে আমি যে কতটা কৃতজ্ঞ তা এক আকাশ সমান বর্ণনা লিখলেও শেষ হবে না ব্যবসায়িক সাহেব। আপনি আমার জীবনে সেই রাজকুমার যার বদলতে আমি দুঃখ, কষ্ট-অভিশপ্ত জীবন থেকে রেহাই পেয়ে সুখের দুয়ারে দাঁড়িয়েছি। আপনার সাথে ছলনা করার সাধ্য কি আমার এই জীবনে হবে বলুন?
‘ তাহলে আপনি আমার সাথে কথা বলার সময়টুকুতে কেন কখনো নিজের পরিচয় দেননি? কেন সবসময় এটা প্রিটেন্ড করেছেন যে আপনি আমাকে চিনেন, আমার পরিচিত এবং আমার আশপাশেই কোথাও আপনার অবস্থান? অথচ আমাদের দেখা হওয়ার পরও আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি, এমনটা কেন?
মারিদের এত প্রশ্নে নূরজাহানের মাঝে বিচলিত ভাব দেখা যায়নি। কেমন শান্ত শীতল। চোখে-মুখের আগের উচ্ছ্বাসটা নেই। নূরজাহান মারিদের পাশাপাশি রেলিংয়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। কফির মগে একবার চুমুক দেয়। মারিদ তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়, এটা দেখে নূরজাহান ফিক করে হেসে ফেলে। তারপর মজা করে বলে….

‘বলব না, সিক্রেট।
মারিদও নূরজাহানের মতো করে কফির মগে চুমুক দিয়ে শান্ত স্বরে হুমকি দিয়ে বলে…
‘ আপনি কততম ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছেন জানেন? সাততম ফ্লোরের উপর। এখান থেকে আপনাকে ফেলে দিলে আপনার হাড্ডিও গুঁড়া হয়ে যাবে?
‘বাপরে! হুমকি দিচ্ছেন?
‘উহুম, সতর্ক করছি। বলা তো যায় না কখন মুড খারাপ হলো আর আপনাকে তুলে ছাদ থেকে ফেলে দিলাম।
নূরজাহান হাসে। কি সুন্দর উজ্জীবিত সেই হাসি। মারিদের মন ব্যাকুল হয়ে ছটফট করে উঠে নূরজাহানের হাসিতে। দুপুরে নূরজাহানকে একবার জড়িয়ে ধরার পর থেকে মারিদের মন বারবার উতলা, উন্মাদ হয়ে উঠছে নূরজাহানকে ছুঁতে। মারিদ মনের নিষিদ্ধ চাওয়াগুলো দমন করে রাখছে, কিন্তু এখন নূরজাহানের হাসিতে সেইগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মারিদ বেশ বিরক্ত এবং ক্ষিপ্ত মেজাজে বলে…
‘দাঁত বের করবেন না তো। আমি ডিস্টার্ব হচ্ছি।
নূরজাহানের ঠোঁটের কোণায় মিষ্টি হাসিটা থেকেই যায়। নূরজাহান মারিদের জীবনের অপরিচিতা হয়ে আসার পর কখনো নিজের পরিচয় দেয়নি। সেজন্য আজ কথা শুরু করার আগে নূরজাহান নিজের পরিচয় দিয়ে মারিদের কথার উত্তর দিয়ে বলে…

‘আমি শুরু থেকে শুরু করছি। যে পরিচয় আমি কখনো আপনাকে ফোনে দিইনি, সেই পরিচয় আজ দিচ্ছি। আমি নূরজাহান পরী। বাবা হাসান সিকদার। আমার স্থানীয় ঠিকানা—বান্দরবান জেলা, থানচি উপজেলা, উত্তর থানচি গ্রামের সিকদার বাড়ির ছোট মেয়ে। আমার বাবা হাসান সিকদার উত্তর থানচি গ্রামের পাঁচ নং ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার। আমার মা আয়েশা সিদ্দিকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিভাগে অনার্স-মাস্টার্স কমপ্লিট করেছেন। তিনি একজন ‘পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট’। গর্বিত ঢাবিয়ান। বর্তমানে তিনি মৃত। আমি আমার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের একমাত্র সন্তান। আমার কোনো ভাই-বোন কেউ নেই। আমার মা যখন মারা যান তখন আমার বয়স সাত বছর নয় মাস। আমি তখন ক্লাস টুতে পড়ি। খুব ছোট বয়সেই আমার মাঝে বুঝ চলে আসে। অল্প বয়সেই শিখে গিয়েছিলাম সৎ মায়ের সংসারে কিভাবে মানিয়ে চলতে হয়। আমার মা জীবিত থাকাকালীন আর দশটা বাচ্চার মতোই স্বাভাবিক জীবন ছিল। দুঃখ-কষ্ট কিংবা ভয়, কলঙ্ক কখনো আমায় ছুঁতে পারেনি। আমি ছিলাম উজ্জীবিত, ঝলমলে, পবিত্র তারা। আমার মায়ের মৃত্যুর পর আমার দুনিয়া ঘুরে গেল। পরিচিত মানুষগুলোকে অপরিচিতদের মতো ভয়ংকর রূপ বদলাতে দেখলাম। মায়ের মৃত্যুর পর প্রথমবার বুঝেছিলাম আমি সৎ মায়ের সংসারে আছি। আমার বাবা আর আলেহা ফুফু বাদে আমি সবার তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হেনস্থার শিকার। আমাকে কেউ ভালো চোখে দেখত না। আমাকে গালি দিয়েই সবার প্রথম কথা শুরু হতো।

বেজন্মা, নাজায়েজ, নষ্টা, পাপ, আমার মা আব্বাকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে—সেজন্য শাহানা আম্মা রোজ আমার উপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। যখন তখন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া, গরম তরকারি চুলা থেকে নিয়ে আমার শরীরে ছিটকে ফেলে দিতেন, আম্মার তরকারি কাটার দা-ও আমার দিকে ছুঁড়ে মারতেন যাতে একেবারে মরে যাই। হয়তো আমার ভাগ্য ভালো থাকত, সেজন্য প্রতিবার বেঁচে যেতাম। আম্মার হাতে ঝাড়ুর বাড়ি, লাঠির বাড়ি সবকিছু আমার পিঠে পড়েছে। আমার আম্মার মৃত্যুর পর আব্বা নতুন নতুন জাহাজের ব্যবসা করতেন। মানুষের মালামাল শিপমেন্টে পাঠাতেন। সেজন্য আব্বা সপ্তাহ ধরে জাহাজে থাকতেন। শুক্রবার হলে তিনি কাজ ফেলে হলেও আমার জন্য বাড়িতে আসতেন। আমি আম্মার ভয়ে মোটা কাপড় পরে থাকতাম। আব্বাকে শাহানা আম্মার আঘাতের চিহ্ন দেখতে বা বুঝতে দিতাম না। আব্বা যদি কোনো কারণে বুঝে যেতেন যে শাহানা আম্মা আমাকে মেরেছে, তাহলে এসব নিয়ে ঘরে অশান্তি হতো। আব্বা চলে গেলে আমার জন্য আরও দুর্বিষহ হতো পরবর্তী সময়টা শাহানা আম্মার মুখোমুখি হতে। আমি দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছি, আমার খোঁজ নেয়নি কেউ। দাদীর আমার উপর অনীহা ছিল—আমি নাকি উনার স্বামীকে খেয়ে তারপর জন্মগ্রহণ করেছি।

দ্বিতীয়ত, শাহানা আম্মার মন রক্ষার্থে তিনি কখনো আমার প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন না। যদিও শাহানা আম্মা আমাকে কারও সামনে আঘাত করতেন না, সবার আড়ালে মারতেন। দাদী বুঝতে পারতেন আজ আমি মার খেয়েছি, তারপরও তিনি দেখতে চাইতেন না কতটা মার খেয়েছি। আব্বা বাড়িতে না থাকলে শাহানা আম্মা আমাকে সারারাত আমার আম্মার কবরের সামনের গাছে বেঁধে রাখতেন। আমি সারারাত বৃষ্টিতে ভিজতাম, সকালে বাতাসে শুকাতাম। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো, ভয়ে খুব কাঁদতাম। শাহানা আম্মার কাছে অনেক আকুতি-মিনতি করতাম আমাকে ঘরে নিয়ে যেতে। একে তো রাত, তারপর কবরস্থান, সেজন্য খুব ভয় পেতাম। কিন্তু শব্দ করে কাঁদার সাহস ছিল না। শব্দ করে কাঁদলে যদি বাড়িতে দাদী বুঝে যান আমাকে বাইরে গাছের সঙ্গে আম্মা বেঁধে রেখেছেন, তাহলে শাহানা আম্মা আমাকে আরও মারবেন আর শাস্তি দেবেন। আমার কাছে শাহানা আম্মার শাস্তি ছিল আতঙ্কের মতো। আশনূর, আহাদ তখন ছোট ছিল, কিন্তু আমার তিন বছরের বড় ছিল দুজন। ওরা দেখত আমাকে কিভাবে শাহানা আম্মা শাস্তি দেন, কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারত না। মাজিদ ভাই আব্বার সাথে জাহাজের কাজ করতেন। সাজিদ ভাই পড়াশোনা করতেন। আমাকে শাহানা আম্মা মারুন কিংবা কেটে ফেলে দিন—এতে সাজিদ ভাইয়ের দেখার বিষয় ছিল না। মূলত শাহানা আম্মা আমার আম্মার উপর জেদ করে আমাকে শাস্তি দিতেন।

শাহানা আম্মা মনে করতেন তিনি আমাকে নয়, বরং আমার মৃত আম্মাকে কষ্ট দিচ্ছেন আমাকে শাস্তি দিয়ে। অথচ শাহানা আম্মা আজও বোঝেননি মৃত মানুষ কষ্ট পায় না, কষ্ট পায় জীবিত মানুষ। জীবনটা এইভাবেই চলছিল, সময়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছিলাম। প্রাইমারি স্কুল পাস করে হাইস্কুলে ওঠার পর আমার জীবনে একটু মোড় নেয়। বড় হচ্ছিলাম, সেই সাথে আমি রূপবতী ছিলাম, মানুষ সহজেই আমার রূপের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেত। আশনূর, আহাদ আর আমি তিনজন একই স্কুলে পড়তাম। আশনূর, আহাদ এইটে আর আমি সিক্সে। নাইন-টেনের সিনিয়র ভাইয়ারা আমাকে প্রায় ডিস্টার্ব করত। কখনো ফুল, চিঠি, চকলেট কিংবা বউ বউ ডেকে উত্ত্যক্ত করত রাস্তায়। আহাদ ছেলেমানুষ, সে এসব সহ্য করত না। আমার হয়ে প্রতিবাদ করত। আশনূর রাগী মেয়ে ছিল। সে বোঝাত সে আমাকে পছন্দ করে না আমি ওর সৎ বোন হওয়ায়, কিন্তু কখনো আমাকে বাইরের মানুষ দ্বারা অপদস্ত হতে দিত না। সবসময় একজন বড় বোনের মতো হেফাজত করতে চাইত আমার। আহাদ, আশনূর আমাকে দুজনের মাঝে রাখত রাস্তায় চলাচলের সময়, কখনো আমাকে ছাড়া একা যেত না কেউ বাইরে অপেক্ষা করতে।

আশনূরের ক্লাস শেষ হয়ে গেলে ফ্রি টাইমে আমাকে ওর পাশে বসিয়ে রাখত। কিন্তু যত দিন যাচ্ছিল, ছেলেদের উত্ত্যক্তের সংখ্যা বাড়ছিল। সবাই আমার রূপের পাগল। আহাদ, আশনূর এই নিয়ে রোজ স্কুলের স্যারদের কাছে বিচার দিত। পরিস্থিতি এমন হলো যে ছেলেরা ছেলেরা দলাদলি করে আমার জন্য স্কুলে মারামারি করত। একেক জনের দাবি ছিল আমি তাদের গার্লফ্রেন্ড হব, আমাকে তাঁরা বিয়ে করবে, অন্যজন কেন আমাকে পছন্দ করবে। চার মাসের মাথায় না পেরে আহাদ আব্বার কানে এসব কথা দেয় আম্মার অগোচরে। আম্মা এমনিতেই আমাকে পছন্দ করেন না, এসব কথা শুনলে আমার পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চাইবেন। আব্বা আমাকে নিয়ে খুব সেনসিটিভ ছিলেন। এসব কথা শোনার সাথে সাথে পরদিন স্কুলে যান, ছেলেদের হুমকি-ধামকি দেন, স্যারের কাছে নালিশও দেন। এতে বিষয়টা আরও জটিল হয়ে যায়। টেনে পড়া এক সিনিয়র ভাই ভরা স্কুলে সবার সামনে আব্বার পায়ে ধরে হাউমাউ করে চিৎকার করে বলে সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। আমাকে ছাড়া সে বাঁচবে না মরে যাবে। এই ছেলের চিৎকার দেখে বাকি ছেলেরা যারা আমাকে পছন্দ করত, তাদের দুজনও এসে সেইম অবস্থা করল। দলাদলি করে আব্বার পায়ে এসে লুটিয়ে পরল, সকলের দাবি—ওরা আমাকে পছন্দ করে, আমাকে বিয়ে করতে চায়।

আমাকে না পেলে মরে যাবে তারা। আমার জন্য স্কুলের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, সেজন্য বিনা দোষে সেদিনই আমাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করে দেয় হেডমাস্টার। আশেপাশে আমার বদনাম রটে আমি ছেলেদের সঙ্গে প্রেম করে তাদের মাথা খেয়েছি, সেজন্য ছেলেরা এখন আমার জন্য পাগল হয়ে আমার আব্বার পায়ে পড়ে কাঁদছে আমার জন্য। বাড়িতে এই বিষয়টা জানাজানির পর দাদী, শাহানা আম্মা আমাকে দোষী করেন। যা-তা গালমন্দ ও দেন। কিন্তু আমার আব্বা এক রাতে জাহাজের কারবার ছেড়ে দেন। তিনি বুঝেছিলেন খারাপ লোকের, শকুনের দৃষ্টি আমার উপর পড়েছে। আমাকে দ্রুত হেফাজত না করলে আম্মার মতো করে আমাকেও হারাতে হবে। সেদিন পর থেকে আজ অবধি আমার বাবা আমার অলিখিত একজন বডিগার্ড হয়ে গেলেন। কাজকারবার সবকিছু মাজিদ ভাইকে বুঝিয়ে তিনি বাড়িতে চলে এলেন চিরতরে। আমাকে পরদিন আমাদের পাশের গ্রামের একটা হাইস্কুলে ভর্তি করান।

আশনূর, আহাদকেও আমাদের গ্রামের স্কুল থেকে টিসি নিয়ে আমার সাথে ভর্তি করান। আব্বা আমাদের স্কুলে দিয়ে আমার ক্লাসের বাইরে তিনি সারাদিন বসে থাকতেন। নতুন স্কুলে আমি বোরকা পড়ে যেতাম। আমার মুখ দেখার উপায় ছিল না। সবাই বলাবলি করত আমি সুন্দরী সেজন্য বোরকা পরি, কিন্তু আমি কখনো কাউকে নিজের মুখ দেখাতে চাইতাম না। তারপর দিনগুলো এমনই যাচ্ছিল। আমিও বড় হচ্ছিলাম। সেইবার আমি ক্লাস নাইনে উঠলাম। স্যারদের খুব পছন্দের ছাত্রী ছিলাম আমি। পুরো বান্দরবান জেলা নয়, চট্টগ্রাম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান করি অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায়। আলেহা ফুফু বলতেন আমি নাকি আমার মায়ের মতো মেধাবী হয়েছি। আমার মায়ের যেমন নিজস্ব আলো ছিল আলোকিত হওয়ার, তেমন আমারও নিজস্ব আলো আছে।
নূরজাহান থামে। লম্বা একটা শ্বাস নেয়। চোখে-মুখে গম্ভীর ভাব। মারিদের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়। মারিদ নূরজাহানের দিকে অসহনীয় চোখের তাকিয়ে। হয়তো নূরজাহানের জীবনের গল্প শুনে তার ময়া লাগছে, সেজন্য চোখের দৃষ্টিতে আহত ভাব। নূরজাহান এই মুহূর্তে ইমোশনাল হতে চায় না। একবার ইমোশনাল হয়ে গেলে বাকি কথাগুলো শেষ করতে পারবে না। নূরজাহান মারিদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভারী গলায় বলে….

‘এতটুকু ছিল আমার জীবনে এক্সট্রা কাহিনি, যেটা আপনাকে না বললেও চলত। কিন্তু আমি চাই আপনি শুরু থেকে সবটা জানুন, তাই আপনাকে বলা।
মারিদ নূরজাহানকে থামিয়ে বেশ গম্ভীর ও ভারী আওয়াজে বলে…
‘ আপনি কোনো কিছু বাদ দেবেন না অপরিচিতা। আমি শুরু থেকে সবটাই শুনতে চাই, আপনি বলতে থাকুন।
মারিদের কথায় ভরসা পেয়ে নূরজাহান ভারী শ্বাস ফেলে বলতে লাগল….
‘জীবনটা এমনই দুর্বিষহ ছিল। আরও দুর্বিষহ করে তোলে মানিক সওদাগরের আগমনে। আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। আব্বা নতুন নতুন মেম্বার হয়েছিলেন তখন। আমাদের গ্রামে সওদাগর বংশের অনেক দাপট ছিল। চেয়ারম্যান বাড়ির কেউ যদি বলত আজ সূর্য ওঠেনি, তার মানে ওইটাই গ্রামের মানুষের সত্য বলে ধরে নিতে হতো। কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে সে পরদিন সকালে জেলে থাকবে, আর নয়তো তার বাড়িঘর লুটপাট হয়ে যেত। জানের ভয়ে গ্রামবাসী চুপ থাকত। কারণ হারুন সওদাগর আমাদের জেলার মন্ত্রী ছিলেন। আমাদের জেলার সর্বোচ্চ বড় বড় পদে বসে থাকা সবগুলো মানুষ সওদাগর বংশের ছিল বলে গ্রামের কেউ তাদের বিরোধিতা করত না। কিন্তু আমার আব্বা সেসব বুঝতে চাইতেন না। তিনি গ্রামের মানুষের হয়ে প্রতিবাদ করতেন। মোল্লা চেয়ারম্যান এই নিয়ে বেশ কয়েকবার আব্বাকে তাদের বাড়িতে ডেকে হুমকি-ধামকি দিয়েছে, কিন্তু তারপরও আব্বা পিছুপা হননি। সেইবার আমাদের গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি চাল বিতরণে পাঁচ হাজার কার্ড আসে। কিন্তু সওদাগর পরিবার থেকে গ্রামে জানানো হয় তিনশো কার্ডের চাল এসেছে, গ্রামে পরদিন চাল বিতরণ করবে মোল্লা চেয়ারম্যান। আব্বা মেম্বার হওয়ায় তিনি জানতেন কত হাজার চালের কার্ড এসেছে।

মোল্লা চেয়ারম্যানের সঙ্গে এই নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়, আব্বা হুমকি দেন তিনি গ্রামবাসীদের এসব কথা বলে দেবেন বলে। মানিক সওদাগর তখন গ্রামে ছিল না, ঢাকা ছিল। মোল্লা চেয়ারম্যানের তিন ছেলে—মানিক, রতন, তাপস। তাপস খুব সম্ভব ঢাকা থাকে, আহাদের সমবয়সী। রতন আর মানিককে দেখা যেত গ্রামের সবকিছুতে সরদারি করতে। মানিক ভাই সবকিছুতে লিডার ছিল। তার নেতৃত্ব ছাড়া গ্রামের কিছু হতো না। আব্বা চালের কার্ড নিয়ে মোল্লা চেয়ারম্যানের সাথে ঝামেলা করেছেন—এটা শুনে রাতের মধ্যে তিনি গ্রামে চলে আসেন। সকালে দেখা করতে না পারায় মানিক ভাই ছেলেপেলেদের নিয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়ান। যে রাস্তা দিয়ে সবসময় আমরা স্কুলে যাতায়াত করতাম, ওই রাস্তায় দাঁড়ান। আশনূর, আহাদ আমাদের সাথে যেত না। ওরা দুজন আমার এইটে ওঠার পরই স্কুল পাস করে কলেজে চলে গেছে, সেজন্য আব্বা সবসময় আমাকে নিয়ে একা স্কুলে যাতায়াত করতেন। দুপুরে স্কুল শেষে আব্বা আমাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মানিক সওদাগর ও তার ছেলেপেলের মুখোমুখি হন। তারা বেশ প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল আব্বা কথা না শুনলে মারবে বলে। কথার মাঝে ওরা আমার আব্বাকে ঘিরে ফেলে। মানিক ভাই আব্বার শার্টের কলার ধরে অকারণে আব্বার গালে থাপড়াতে থাকলে আমি ভয়ে চিল্লাচিল্লি করতে থাকি আব্বাকে বাঁচাতে। গায়ের জোরে মানিক সওদাগরকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দেয়।

এতে মানিকের ছেলেপেলেরা ক্ষ্যাপে যায়। খানকি, মাগী, বেশ্যা—যার যেটা মুখে আসে সেই গালি দিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। কিশোর নামের ছেলেটা আমার বোরকা টেনে রাস্তায় ধাক্কা মারে। সেদিন প্রথমবারের মতো মানিক সওদাগর ও তার ছেলেপেলের দৃষ্টিতে আমি পড়ি। আমি খুব কাঁদছিলাম, কিশোরের ধাক্কায় ঠোঁট কেটে যায় আমার। আব্বা আমাকে তাড়াতাড়ি টেনে ধরেন। আমাকে দেখার পর মানিক সওদাগর আর কাউকে দেয়নি আমাদের গায়ে হাত দিতে। সেদিন উনার চোখে-মুখে ছিল আমাকে দেখার মুগ্ধতা, স্তব্ধতা। পরদিন মোল্লা চেয়ারম্যান মানিক সওদাগরের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন আমার জন্য। আব্বা বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। মানিক সওদাগর বিবাহিত ছিলেন, উনার দেড়-দুই বছরের একটা ছেলে সন্তানও ছিল। তাছাড়া মানিক সওদাগর ভালো না। খারাপ গুন্ডা লোক। সেজন্য আব্বা বিয়ে দিবেন না। পরে কিভাবে কি হলো জানি না। কিন্তু একদিন শুনতে পেলাম মানিক সওদাগরের বউ তার ছেলে সন্তানকে নিয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেছে কোনো এক ছেলের হাত ধরে। অথচ সওদাগর বাড়ির এক কাজের মহিলা থেকে গ্রামে জানাজানি হয় মানিক সওদাগর আমাকে বিয়ে করার জন্য তার বউ-বাচ্চাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে জ্যান্ত কবর দিয়েছে।

আমার সাথে মানিক সওদাগরের প্রেম আছে, আমি সওদাগর পরিবারের হবু বউ—এসব খবর গ্রামে মানিক সওদাগর রটায়। গ্রামের মানুষ আমাকে ঘৃণিত দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। আমার চরিত্র খারাপ, নষ্ট নারী—এসব বদনাম হতে থাকে। দিন দিন মানিক সওদাগরের উৎপাত বাড়তে থাকে। রাস্তায় যখন-তখন আমাকে আর আব্বাকে দাঁড় করিয়ে রাখত আমাকে দেখার জন্য। মানিক সওদাগর আমার জন্য দোয়া ও বদদোয়া দুটোর মতোই কাজ করত। দোয়া হচ্ছে—মানিক ভাই আমার জীবনে আসার আগে আমার দিকে অনেক মানুষের কু-নজর ছিল, কিন্তু মানিক সওদাগরের উপস্থিতে আর কারও কুদৃষ্টি আমার উপর পরতে পারি নি। আর বদদোয়া হচ্ছে—মানিক সওদাগর নিজেই। মানিক সওদাগরের উৎপাতে আমার রোজ স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কোনো রকমভাবে আতঙ্কের মাঝে এসএসসি পরীক্ষাটা দিই। সেখানেও আমি চট্টগ্রাম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান লাভ করি। আব্বার আগে মানিক সওদাগর পুরো গ্রামবাসীকে আমার পাস করার মিষ্টি বিতরণ করে। দিন দিন মানিক ভাইয়ের জ্বালাতনগুলো অসহনীয় হয়ে ওঠায় আব্বা ও ফুফু মিলে ঠিক করেন আমাকে রাসেল ভাইয়ের সঙ্গে চুপিসারে বিয়ে দিয়ে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেবেন।

আমার কলেজে ভর্তি হবার কয়েক মাস পরে একদিন মানিক ভাই আমাদের বাড়িতে এসে চিল্লাচিল্লি করে মদপান করে। পরদিন রাতে আব্বা ও ফুফু মিলে কাজি ডেকে রাসেল ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে ফোনে বিয়ে দেন। আমার বিয়ের খবরটা আমাদের বাড়ি থেকে আম্মা মানিক সওদাগরের কানে দেয়। আম্মার সাথে মানিক সওদাগরের যোগাযোগ ছিল সবার অগোচরে। আমার বিয়ের খবর শুনে মানিক ভাই আলেহা ফুফুর শশুর বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। আমার ফুফাকে মেরে আধমরা করে সেই আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। রাসেল ভাইকে হুমকি দেয় যদি এরপরও তিনি আমাকে বউ করার স্বপ্ন দেখেন, তাহলে আলেহা ফুফুকেও মেরে জ্বলন্ত আগুনে জ্বালিয়ে দেবে। আমার রাতে ফোনে বিয়ে হয়, শেষ রাতে তালাক হয়। পরদিন সকাল থেকে পালিয়ে বাঁচতে শুরু করলাম। মানিক ভাই আমার বিয়েতে এতটাই পাগল, উন্মাদ হয়ে যান যে উনাকে সামলানো মুশকিল হয়ে ওঠে। আমাকে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে হলেও তিনি বিয়ে করবেন। পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ, তখন আব্বা আমাকে নিয়ে পালাতে শুরু করেন। এই শহর থেকে ওই শহর, এক জেলা থেকে অন্য জেলায়।

যেই জেলাতেই পালিয়ে বাঁচতে চাইছিলাম না কেন, মানিক সওদাগর ঠিকই কিছুদিনের মধ্যে আমাদের খোঁজ পেয়ে যেত। এটা খুব সম্ভব আম্মা মানিক ভাইকে আমাদের খোঁজ দিতেন। আব্বা প্রথম প্রথম বিষয়টা বুঝতেন না মানিক ভাই কিভাবে আমাদের লোকেশন পেয়ে যেত। আব্বা ধারণা করলেন হয়তো উনার ফোন ট্র্যাক করে মানিক ভাই আমাদের লোকেশন পেয়ে যেত। সেজন্য আব্বা নিজের ফোনের সিম পরিবর্তন করেন। আব্বা আমাকে নিয়ে প্রথমে সিলেট মৌলভীবাজারে উনার ফুফুর বাসায় পনেরো দিন থাকার পর যখন মানিক সওদাগর আমার খোঁজ পেয়ে যায়, তখন তিনি সেই রাতে আমাকে নিয়ে ঢাকাগামী একটা বাসে ওঠেন। সেই বাসের সিটে আমি একটা ছোট বাটন ফোন কুড়িয়ে পাই। ফোনটা কার আমার জানা ছিল না। আব্বাকে দেখালে তিনি বলেন ফেলে দিতে। আমি ফোনটা ফেলে দিইনি। ফোনটা যারই হোক না কেন, বিপদের সময় কাজে লাগবে ভেবে আমি ফোনটা আমার ব্যাগে রাখি। ফোনে একটা সিমও ছিল। আব্বা গ্রামের মেম্বার ছিলেন বলে তিনি আমাকে উনার আত্মীয়দের বাড়িতে রেখে চলে যেতেন। মানিক সওদাগর আব্বার সাথে আমাকে নিয়ে ঝামেলা করলেও আব্বা কখনো আমার খোঁজ দিতেন না। আর আমিও পালিয়ে বাঁচতে বাঁচতে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। কুড়িয়ে পাওয়া ফোনটা তিন মাস পর চার্জে লাগাই। আব্বাকে মনে পড়ছিল, একটু কথা বলতাম।

কিন্তু আব্বা নিষেধ করেছিলেন যেন আমি কখনো উনাকে কল না দিই, যেহেতু আব্বার ফোন সবসময় মানিক ভাইয়ের ট্র্যাকিংয়ে রাখত। সেজন্য আব্বা চুরি করে আমার জন্য আলাদা সিম ব্যবহার করতেন যোগাযোগ করতে। ফোনটা চার্জ করে আবার বন্ধ করে দিই। তারপর দুমাস পর আবার ফোনটা চালু করি। এই দুই মাসে আমার আরও দুই জায়গা পরিবর্তন করতে হয়েছে। আমি সারাক্ষণ একাকীত্ব ফিল করতাম, আমার বন্ধু-বান্ধব, কথা বলার মানুষ কেউ ছিল না। বলতে পারেন এক প্রকার মানসিক চাপে পড়ে যাই তখন। অবসরে ফোনটা চালু করে ফোনে গেম খেলতাম। হঠাৎ একদিন দুপুরবেলা অলসভাবে ফোনের মধ্যে আমার এসএসসি পরীক্ষার ছয় সংখ্যার রোল নাম্বারের সাথে মিলিয়ে একটা নাম্বার তৈরি করে আন্দাজে ডায়াল করি। ভেবেছিলাম ফোন যাবে না। কিন্তু প্রথমবার রিং হতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে তৎক্ষণাৎ কেটে দিই। ভয়ে তখন বুক কাঁপছিল কে না কে হবে ভেবে ব্যাকুল হচ্ছিলাম।

পরদিন সেই নাম্বারটা বারবার দেখছিলাম, ভেতরে একটা কৌতূহল আগ্রহ জাগছিল কল করে দেখতে। অনেক চিন্তাভাবনা করে ঠিক করলাম, একবার এই নাম্বারে কল করে দেখব কে আছে, ছেলে-মেয়ে যেই হোক, রং নাম্বার বলে পরে কেটে দেব। পরদিন বিকেলে কল করতে একটা ছেলে রিসিভ করে, ভয়েসটা সুন্দর, ভারী আওয়াজ ছিল। প্রথম কথাতেই আমার ভিষণ আগ্রহ জাগে কথা বলতে। ছেলেটা কথায় কথায় আমার পরিচয় চাচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম সে অপরিচিত কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। আমি ছেলেটার সাথে কথা বলার জন্য মিথ্যা বলি যে, আমি তাকে চিনে ফোন করেছি কথা বলতে, সেও আমাকে চেনে। আমার এই কথায় ছেলেটার মাঝে কৌতূহল জাগে, সে কথা বলতে আগ্রহ দেখায়। মূলত সেও জানতে চাইছিল আমি তার কেমন পরিচিত মেয়ে যে তার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি। আমি ভেবেছিলাম কয়েকদিন কথা বলার পর এমনিই আমাদের কথা বলা বন্ধ হয়ে যাবে, এখানে আমার পরিচয়টা গুরুত্বপূর্ণ না। ছেলেটা যখন চাচ্ছে না অপরিচিত কারও সাথে কথা বলতে, তখন আমার সামান্য মিথ্যাতে কিছু যায় আসবে না। তার পরদিন সন্ধ্যায় ফোন করলে জানতে পারি ছেলেটি পুরান ঢাকায় আটকা পড়েছে বৃষ্টির মাঝে। সেই সন্ধ্যা থেকে আমাদের কথাবার্তা শুরু হয়। আমরা প্রতিনিয়ত কথা বলতে থাকি।

আমাদের মাঝে একটা অদৃশ্য টান ছিল, যেটা আমরা দুজনই ফিল করতে পারতাম। সে সবসময় আমাকে বলত সে একজন দক্ষ ব্যবসায়িক মানুষ। আমি সেখান থেকে উনাকে ব্যবসায়িক সাহেব বলে ডাকতাম। ছেলেটার নাম-পরিচয় আমার জানা ছিল না, সেজন্য কি নামে ডাকব ভেবে না পেয়ে ব্যবসায়িক সাহেব বলে ডাকতাম। এতে ছেলেটাও আমার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করতে পারতো না। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছিলাম ছেলেটার নাম জানতে, কিন্তু নিজের পরিচয়ের মিথ্যার জন্য কখনো ছেলেটার নাম-পরিচয় জানতে পারতাম না। আমরা দুজনেই কথার মায়ায় জড়িয়ে গেলাম। একদিন এক মুহূর্ত একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারতাম না, ছটফট করতাম। দুজনই ফিল করতে পারতাম দুজনের অনুভূতিগুলো। দুজনেই মনের অনুভূতিগুলো একে অপরকে এঙ্গেলে প্রকাশ করতাম। দুজনই বুঝতাম, আবার ধরা পড়ে গেলে দুজনই চুপ করে যেতাম। আমার রূপের পাগল আমি অনেক পুরুষকে হতে দেখেছি, সেজন্য আমি চাচ্ছিলাম না আর কেউ আমার রূপের বর্ণনা শুনে আমার প্রতি মোহিত হোক কিংবা আগ্রহ দেখাক। আমি চাচ্ছিলাম কেউ একজন আমাকে চিনুক, জানুক, বুঝুক। আমি কে? আমাকে শুধু গুরুত্ব দিক, আমার রূপকে প্রাধান্য না দিয়ে। সেজন্য মূলত ফোনের ছেলেটাকে বলি আমি কালো কুৎসিত একটা মেয়ে। আমার কুৎসিত রূপের জন্য সবাই আমাকে অবজ্ঞা করে। মূলত ছেলেটা আমার কালো কুৎসিত রূপ নিয়ে তার কোনো অবজেকশন ছিল না।

আর তার এই জিনিসটাই আমাকে অনেক প্রভাবিত করে। ছেলেটা তার সবকিছুতে আমাকে প্রাধান্য দিত, আর আমি তাকে অনেক গুরুত্ব দিতাম। একদিন দুপুরবেলায় ফোন করলে জানতে পারি তার বন্ধুর মাধ্যমে ছেলেটির জন্য পাত্রীর খোঁজ করছে তার পরিবার। ছেলেটি তার বন্ধুকে সম্মতি দিচ্ছিল সে বিয়ে করতে চায় বলে। আমার ব্যবসায়ীক সাহেব বিয়ে করবে এই কথাটা আমাকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। আমি তৎক্ষনাৎ কল কেটে দিই। দিশেহারা পাগল হয়ে যাই ছেলেটির বিয়ের কথা শুনে। আমি নামাজের বিছানা বিছিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে হাউমাউ করে কাঁদি। আমার জীবনটা কেন এত দুর্বিষহ, এই নিয়ে আর্জি জানাই। কিন্তু তারপরও মোনাজাতে আল্লাহর কাছে ছেলেটাকে চাওয়ার সাহস করতে পারিনি। কারণ আমার জীবনটা তখন অনিশ্চিত ছিল, যেকোনো সময় মানিক সওদাগরের হাতে পড়লে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে। এই অনিশ্চিত জীবনে ছেলেটাকে ভালোবাসার মতো সাহস করে ফেলেছি, কিন্তু তাকে পাওয়ার মতো দুঃসাহস করতে পারিনি। টানা পাঁচ ঘণ্টা কাঁদার পর ছেলেটাকে রাত বারোটার পর ফোন দিই। বলি সে যেন আর কখনো তার বিয়ের কথা আমার সামনে না বলে। আমার বাচ্চামোতে সে বুঝে গিয়েছিল আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছি।

সে নিজেও আমাকে পছন্দ করত, কিন্তু আমার বলার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু আমি যে কখনোই তাকে ভালোবাসি কথাটা বলতে পারব না, এটার ধারণা হয়তো তার ছিল না। ছেলেটা আমার সাথে দেখা করতে চাইত। আমিও ভেবেছিলাম ঢাকা গেলে তার সাথে দেখা করব। আমি তখন যশোরে তানিয়াদের বাসায় থাকতাম। মোট এগারোটা জায়গা বদল হওয়ার পর অবশেষে যশোরে তানিয়াদের বাসায় উঠি। তানিয়ার বাবা-মা আব্বার দুঃসম্পর্কের বোন ছিল। তানিয়া মেয়েটাকে ওদের বাসায় থাকাকালীন আমি পড়াতাম। তানিয়া আমাকে বড় বোনের মতো ভালোবাসত। সবমিলিয়ে দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিল। ব্যবসায়ীক সাহেবকে পেয়ে আমার অনিশ্চিত জীবনে প্রথমবারের মতো সুখ খোঁজে পেতে লাগলাম। আমি ব্যবসায়ীক সাহেবের সাথে কথা বলি এটা তানিয়া বাদে দ্বিতীয় কেউ জানত না। আমি একদিন ঠিক করি ব্যবসায়িক সাহেবকে চিঠি লিখব। আমার বই, স্টোরি, চিঠি, লেখালেখি, ডায়েরি এসবের প্রতি খুব ঝোঁক আছে। আমার আম্মা এত শিক্ষিত হয়েও তিনি আব্বাকে চিঠি লিখতেন, এই বিষয়টা আমাকে অনেক প্রভাবিত করত। সেজন্য আমিও ভাবতাম যদি ভবিষ্যতে আমার পছন্দের কোনো মানুষ পাই, তাহলে তাকেও আমি চিঠি লিখব। সেই ধারণা থেকে আমি ব্যবসায়িক সাহেবকে বলি আমি তাকে চিঠি লিখব। কিন্তু চিঠির কথা চিঠিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, ফোনে চিঠি নিয়ে কথা বললে আগ্রহ কমে যাবে—সেজন্য তাকেও নিষেধ করি চিঠির প্রসঙ্গে কোনো কথা যেন ফোনে না বলে। আমি ব্যবসায়িক সাহেবের জন্য অসংখ্য বেনামি চিঠি লিখি কিন্তু কখনো তাকে চিঠিগুলো পাঠাতে পারিনি। কারণ আমার জানা ছিল না তার নাম, পরিচয়, ঠিকানা সম্পর্কে।

সঠিক অ্যাড্রেস ছাড়া আমি কার কাছে চিঠি পাঠাব? এর মাঝে ব্যবসায়ীক সাহেব প্রায় আমার সাথে দেখা করতে চাইত, কিন্তু আমার পরিস্থিতি এমন ছিল না যে তার সাথে দেখা করব। তারপরও ভেবেছিলাম ঢাকা আসলে একদিন ব্যবসায়িক সাহেবের সাথে সরাসরি দেখা করে নিজের পরিচয়ও দেব। এবং মিথ্যার জন্য সরিও বলব। কিন্তু এর মাঝে হঠাৎ মানিক সওদাগরের লোকজন তানিয়াদের বাসায় হামলা করে। তানিয়ার মা-বাবাকে ভীষণ মারধর করে। শুনেছিলাম আমি যে দোকান থেকে টাকা ফ্লেক্সিলোড করতাম, সেই দোকানদারকেও মানিক সওদাগরের লোকজন মারধর করে দোকানপাট ভেঙেছে। আব্বা ফোন করে তানিয়ার আম্মাকে বলেন আমাকে পালাতে সাহায্য করতে। তানিয়ার মা মানিক ভাইয়ের লোকজন আসার আগে আমাকে পিছনের দরজা দিয়ে পালাতে সাহায্য করেন। আমার হাতের ফোনটা দিয়ে আব্বার সাথে যোগাযোগে ছিলাম। ওরা আমার কাছেই আসছিল, গাড়িতে ছিল। সকাল থেকে না খেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, অবশেষে গিয়ে ধরা পড়ি যশোরের খানপুর গ্রামে। আব্বা, আলেহা ফুফু, মাজিদ ভাই তারাও ততক্ষণে যশোরে পৌঁছে যান। আমি যখন গুন্ডা ছেলেদের ধাওয়া খেয়ে দৌড়াচ্ছিলাম, তখন আমার মাথায় ব্যবসায়িক সাহেবের কথা আসে। মৃত্যুর আগে একবার, ব্যবসায়ী সাহেবের সাথে কথা বলতে চাইছিলাম। আমার দৌড়ানোর মাঝেও লোকগুলো এলোমেলো গুলি ছোড়ে আমার উপর।

একটা গুলি আমার বাম হাতে লাগে। তখন আমি বুঝতে পারি গুন্ডা লোকগুলো আসলে মানিক সওদাগরের ছিল না। তারা তৃতীয় পক্ষের পাঠানো লোক ছিল। কারণ মানিক ভাই খারাপ হলেও তিনি আমাকে অসম্ভব ভালোবাসেন। আমার জন্য দুনিয়ার মানুষকে মেরে ফেলবেন, তারপরও আমাকে কখনো মারতে চাইবেন না। বড়জোর তিনি আমাকে উনাদের সঙ্গে উঠিয়ে নিয়ে যাবেন, তারপরও আমার গায়ে আঁচড় দেবেন না। তৃতীয় পক্ষের কারা সেদিন আমাকে মারতে চেয়েছিল আমি জানি না, তবে ব্যবসায়িক সাহেবকে পাগলের মতো ফোন করছিলাম। যদি আজ মরে যাই আর উনার সাথে আমার শেষ কথা না হয়—সেই ভয়ে আল্লাহর কাছে আকুতি-মিনতি করছিলাম শেষ একটা বার যেন ব্যবসায়িক সাহেবের সঙ্গে আমার কথা বলিয়ে দেন। হলোও তাই, প্রায় চল্লিশ মিনিট পর ব্যবসায়িক সাহেব আমার কল রিসিভ করেন, ততক্ষণে আমিও লোকগুলোর বন্দুকের সামনে পড়ে যায়। ভেবেছিলাম কখনো ভালোবাসি কথাটা ব্যবসায়িক সাহেবের সামনে প্রকাশ করব না। কিন্তু সেদিন নিশ্চিত মৃত্যু সামনে রেখে উনাকে ভালোবাসি কথাটা প্রকাশ করি। তার পরপরই আমি গুলিবিদ্ধ হই। ফোন ছিটকে পড়ে। জ্ঞান হারানোর আগে আব্বা, আলেহা ফুফুকে দেখি দৌড়ে আসতে। ওদের চিৎকার আমার কাছে পৌঁছাচ্ছিল না।

আমাকে গুলি করা লোকগুলো সেখানেই ছিল, ওরা আব্বা, ফুফু, মাজিদ ভাইকেও গুলি করত যদি না মানিক ভাই সঠিক সময়ে সেখানে না আসত। বলতে পারেন সেদিন আমি মানিক ভাইয়ের জন্যই আমরা বেঁচে যাই। মানিক ভাইয়ের লোকজনের সঙ্গে গুন্ডা লোকগুলোর গোলাগুলির মাঝে আব্বা আমাকে নিয়ে পালিয়ে যান। এই ঘটনার সাক্ষী খানপুরের পুরো গ্রামবাসী ছিল, অথচ পরে কারা যেন এই বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দেয় টাকা দিয়ে। আব্বা কেস করতে চেয়েছিলেন কিন্তু খানপুর গ্রামের মানুষ,এবং ওই গ্রামের চেয়ারম্যান নাকি অস্বীকার করে—তাদের গ্রামে নাকি এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। মানিক ভাই নিজেও আমাকে নিয়ে দিশেহারা ছিল, কারা আমাকে মারতে চেয়েছিল সেই সন্ধান করে, কিন্তু কোথাও কারও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সবকিছু এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন এখানে তৃতীয় পক্ষের কারও উপস্থিতি কখনোই ছিলই না। আব্বা আমাকে নিয়ে এই হসপিটাল থেকে ওই হসপিটাল চিকিৎসার জন্য পালিয়ে বাঁচতে শুরু করেন। গুলিটা আমার কাঁধের নিচে লাগে, একটু জন্য আমার কলিজায় লাগেনি। পরিস্থিতি খুব জটিল, তারপর আমার উপর অচেনা মানুষের বারবার হামলাতে আব্বা দিশেহারা হয়ে উঠেছিলেন। মানিক ভাই আমাকে তার সাথে নিয়ে যেতে চায়। তৃতীয় পক্ষের লোকজন আমাকে মেরে ফেলতে চায়। আব্বা একা মানুষ আমাকে বাঁচাতে চান।

সবমিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যে আমাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। মাজিদ ভাই আব্বার সাথে হাসপাতালে থাকতে পারত না, ভাইয়ের ব্যবসা-কারবার সামলাতে হতো। ফুফু নিজের বাড়িঘর ছেড়ে দিনের পর দিন তিনিও হাসপাতালে থাকা অসম্ভব। সাজিদ ভাইয়ের আমাকে নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল। আহাদকে আম্মা কসম দিয়ে আটকিয়ে রাখতো আসতে দিত না। আবার আমাকে দেখতে হাসপাতালে মাজিদ ভাই কিংবা ফুফির কেউ আসলে সেই খবর মানিক ভাই পেয়ে যেত বলে আব্বা পরিবারের কাউকে জানাতেন না আমাকে তিনি কোন হাসপাতালে চিকিৎসা দিচ্ছেন সেটা। এক মাসে আমাকে তিনটা হাসপাতালে ট্রান্সফার করান শুধুমাত্র ক্ষণচারী হাত থেকে আমাকে বাঁচাতে। আমার অবস্থা ভালো না, চব্বিশ ঘণ্টার চিকিৎসার উপর রাখতে হতো, এই অবস্থায় বারবার হাসপাতাল চেঞ্জ করাতে আমি লাইফ সাপোর্টে চলে যায়। আমার নিঃশ্বাস চলে কিন্তু শরীর রেসপন্স করত না। শেষে আমাকে ঢাকা পপুলার হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। এক সপ্তাহের মাঝে আমাকে গুলি করা লোকজন সেখানেও চলে আসে আমার খোঁজে। আব্বা রিসেপশনে আমার ওষুধ কিনছিলেন, মুখোশধারী লোকজন দেখে তিনি চিনে ফেলেন।

দ্রুত আমাকে আইসিইউ থেকে বের করতে নিলে নার্সেরা ঝামেলা করে হসপিটালের বিল নিয়ে। আব্বা মাজিদ ভাইকে বলেন আধা ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালের বিল ট্রান্সফার করাতে। এর মাঝে লোকগুলোর চোখেও আব্বা ধরা পড়ে যায়ন। তারা ওত পেতে থাকে কখন আব্বা আমাকে নিয়ে বেরোবে আর তারা আক্রমণ করবে। লোকগুলো হাসপাতালে সরাসরি আক্রমণ করতে পারবে না, সাধারণ পাবলিক আছে বলে। যেহেতু আব্বার আমাকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হতো, সেজন্য আব্বা আমাদের গ্রামের রশিদ কাকার গাড়িটা অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করতেন। রশিদ কাকাকে নিয়ে আব্বা আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলেন। গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পরে আক্রমণকারীদের মধ্যে একজনের চোখে আব্বা ধরা পড়ে যাই। তারা আমাদের গাড়িটা ঢাকার বাইরে আটকায়। আব্বা ও কাকা এতগুলো লোকজনের সঙ্গে একা লড়াইয়ে পারছিলেন না। এর মাঝে একটা মেয়ে এসে আব্বাকে সাহায্য করে। তার পরপরই মেয়েটার ভাই ও তার সহচর এসে আব্বার হয়ে লোকজনের সঙ্গে মারামারি করে। সেই যাত্রায় অচেনা দুজন ভাই-বোন আমার জন্য ফেরেশতা হয়ে এসে আমাকে প্রাণে বাঁচিয়ে দেয়।
বলতে বলতে নূরজাহান আবারও থামে। সেদিন নূরজাহানকে বাঁচানো মেয়ে-ছেলেটি যে মারিদ ও সুখ ছিল, সেটা নূরজাহান জানতে পেরেছে মারিদ নূরজাহানদের বাড়িতে যাওয়ার পরে। নূরজাহান দম নিয়ে আবার বলতে লাগে….

‘গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রথম তিন মাস আমার হুঁশ ছিল না। হুঁশে ফেরার পরও এক মাস বেডরেস্টে ছিলাম। এর মাঝে আব্বা ঠিক করলেন যতকিছুই হোক আমাকে নিয়ে তিনি আর পালিয়ে বেড়াবেন না। সবকিছুর মুখোমুখি হবেন। আমি বাড়িতে থাকলে অন্তত প্রাণে বাঁচব, কিন্তু বাইরে আমাকে অচেনা মানুষ মারতে চায়। মানিক ভাই আর যাই হোক আমার ক্ষতি করবেন না। তাছাড়া মানিক ভাইয়ের জন্য যে ওই অচেনা মানুষগুলো গ্রামে ঢুকতে পারবে না, সেটা আব্বাও বুঝেছিলেন। সেজন্য আব্বা আমাকে নিয়ে আমার অসুস্থতার চার মাস পর গ্রামে ফিরে যান। মানিক ভাই আমার গ্রামে ফেরার খুশিতে আমাদের বাড়িতে আসেন, গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করেন। আব্বা আমার হেফাজতের কথা চিন্তা করে বাড়িতে পালোয়ান লোকজন রাখেন, তিনি নিজেও হিংস্র হয়ে ওঠেন। আমাকে আবার কলেজে ভর্তি করান। আমার হেফাজতের জন্য দা হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। আমি আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠি ঠিকই, কিন্তু আমি আমার ব্যবসায়িক সাহেবের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। বারবার আমার এসএসসি পরীক্ষার রোল নাম্বারটা মিলিয়ে ডায়াল করছিলাম, কিন্তু কোনোভাবেই কল যাচ্ছিল না, ভুল নাম্বার দেখাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না এগারো সংখ্যার নাম্বারের মাঝে আমি কোন সংখ্যাটা ভুল করছিলাম, যার জন্য বারবার নাম্বার ভুল বলছিল ফোনের ওপাশের মহিলাটি। আমি অসংখ্যবার অসংখ্য রকমভাবে ডায়াল করেও ব্যবসায়িক সাহেবের নাম্বারটা মেলাতে পারছিলাম না।

উনাকে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় আমি দিশেহারা পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম ক্ষণে ক্ষণে। এমন একটা রাত নেই যে রাতে ব্যবসায়িক সাহেবকে হারিয়ে ফেলার বুকে ব্যথা পীড়িত হয়নি। আমার কান্না, বুকফাটা হাহাকার অশ্রু হয়ে ঝরেছে, আবার নীরবে সেই পানি শুকিয়েও গেছে। আমি ধরে নিয়েছিলাম আমি চিরতরে ব্যবসায়িক সাহেবকে হারিয়ে ফেলেছি। তারপর একদিন শুনতে পাই আমার স্বামীই আমার ব্যবসায়িক সাহেব। এই বাক্যটা আমার ভেতরে উতাল-পাতাল ঝড় সৃষ্টি করে। তাকে পাওয়ার, তাকে ছুঁয়ে দেখার উন্মাদনায় আমি দিশেহারা পাগল হয়ে যাই। অথচ সে আমার প্রতি ভীষণ ক্ষিপ্ত। তাকে পাওয়ার কৃতজ্ঞতায় আমি সয়ে গেলাম তার সকল অভিযোগ। তাকে নিজের করে পাওয়ার তৃপ্তিতে তার সামান্য অভিমান অভিযোগও তুচ্ছ মনে হয়। তারপর বাকিটা আপনার সামনে।
নূরজাহানের কথা শেষ হতেই নিস্তব্ধ নীরবতা চেয়ে গেল চারপাশ জুড়ে। মারিদ ঠায় দাঁড়িয়ে, অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই। সে একদৃষ্টিতে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে। মারিদের গলার স্বর বেশ গম্ভীর। মারিদ বলে….
‘আপনাকে তৃতীয় পক্ষের কারা মারতে চেয়েছিল অপরিচিতা, আপনি কিছু জানেন?

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪১

‘ হুম জানি। হারুন সওদাগর মারতে চেয়েছিল। মানিক ভাই আমার জন্য হারুন সওদাগরকে উপেক্ষা করে চলে, সেটা হারুন সওদাগর পছন্দ করে না। হারুন সওদাগরের ছেলে নেই, বর্তমানে মানিক ভাই-ই উনার ডান হাত-বাম হাত। ভবিষ্যতে সওদাগর পরিবারের হাল মানিক ভাইকে ধরতে হবে, কিন্তু মানিক ভাই একটা মেয়ের জন্য নিজের পরিবারের মান-সম্মান নষ্ট করছে—সেটা তিনি পছন্দ করছেন না। সেজন্য আমাকে মেরে ফেললে মানিক ভাই আবার উনার আওতায় চলে যাবে। আমাকে গুলি করা থেকে শুরু করে বারবার হাসপাতালে আক্রমণকারী লোকগুলো সবই হারুন সওদাগরের লোকজন ছিল। এটা হারুন সওদাগরের লোকজনই স্বীকারোক্তি দেয় আব্বার কাছে ধরা পড়ার পর।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here