Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬১
ইসরাত জাহান দ্যুতি

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে গেছে কখন! সেই দুপুরে ভাতঘুম দিতে বিছানাতে এসেছিল দীধিতি৷ আর রাত আটটার কাছাকাছি সময়ে এসে চোখ মেলল সে। তাও ফোনকলের বিরতিহীন আওয়াজে। স্ক্রিনে গুরুত্বপূর্ণ নামটা না দেখলে এখনো বিছানা ছাড়ার ইচ্ছা ছিল না তার। একই সঙ্গে কলিংবেলও বেজে যাচ্ছে একনাগারে। এত অধৈর্য কেন লোকটা? নিচে এসে ঘরের মূল দরজাটা খুলেই সবটুকু বিরক্তি গলায় ঢেলে বলে উঠল, ‘মানুষ তো রয়েসয়ে কলিংবেল চাপে।’
-‘অফ ডিউটিতে আছ বলে কি লাশের মতো পড়ে পড়ে ঘুমিয়েই যাবে সারাদিন?’ পালটা তেরছা জবাবটা দিয়ে ইয়াসিফ দীধিতিকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে এলো৷ সরাসরি বসার ঘরে এসে সোফাতে বসেই আদেশ গলায় বলল, ‘দুই মগ কফি নিয়ে ফাস্ট এসো বসো। সেদিনের ঘটনাটা আমি আবার শুনতে চাই।’
বিরক্তিটুকু ক্রমশ বাড়তেই থাকল দীধিতির, ‘এক ঘটনা গত চার বছরে কতবার রিপিট করেছি!হিসাব আছে, বস?’

-‘প্রয়োজনে আগামী চার বছরে আরও হাজারবার রিপিট করা লাগলে করবে। আর এখন স্যার, বস, বলে গম্ভীর কোরো না পরিস্থিতিকে। তাড়াতাড়ি যাও। আমার বের হতে হবে আবার।’
কী আশ্চর্য! স্যার, বস বলে ডাকতে না করে অথচ আদেশটা ঠিকই করছে লোকটা অন ডিউটিতে থাকাকালীন সময়ের মতোই। ঘুম ভেঙে চোখে-মুখে পানিও দেওয়ার ফুরসত মেলেনি ওর৷ বেজায় রুক্ষ মেজাজ নিয়ে কফি মেকার থেকে ঝটপট কফি করে নিলো। সঙ্গে আর কিছুর ব্যবস্থা করতে ইচ্ছা না করলেও স্রেফ আতিথেয়তা দেখাতে ফ্রিজ থেকে কিছু ফল বের করে কেটেকুটে নিয়ে তারপর এলো। ‘আপনি কি গাজীপুর ফেরেননি এখন অবধি?’ প্রশ্নটা করতে করতেই কফির মগটা বাড়িয়ে দিলো দীধিতি ইয়াসিফকে।
নাওফিলের সঙ্গে দ্বন্দে জড়ানোর পর নাওফিলও যেমন শেখ বাড়িতে খুব দরকার ছাড়া পা দেয় না, তেমন ইয়াসিফও। অবশ্য আগে থেকেই বাড়িতে যাতায়াত কম ছিল ইয়াসিফের। তবু আগে যতটুকু ছিল, এখন তা আরও কমে এসেছে। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গে এখন কথা বলার ইচ্ছা আর সময় কোনোটাই নেই ওর। তাই বিলম্ব না করে আবারও আদেশ গলায় বলল দীধিতিকে, ‘পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলবে সবটা।’

-‘বলব। কিন্তু তার আগে আমাকে বলুন গত চার বছরে যে পরিমাণ টেরোরিস্ট ঢুকেছে দেশে, তাদের মাঝে মারিহামও একজন। এটা আপনি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করছেন?’
জবাবটা দিতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলো ইয়াসিফ৷ রাশভারী মুখে চিন্তার ছায়া নামিয়ে কফিতে পরপর বেশ ক’বার চুমুক শেষে তারপর বলল, ‘আমি আমার গাট ফিলিংসকে ইগনোর করি না, স্মরণ। ও আমার সঙ্গে যে কোনো এক উদ্দেশ্যে লিভ ইন করেনি। উদ্দেশ্য আরও ছিল৷ এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো। নাওফিলের সঙ্গে আমার সংঘাত সৃষ্টি প্লাস আমার মতো অফিসারের প্রেমিকার পরিচয়টা কাজে লাগিয়ে একদম নির্ঝঞ্ঝাটে যেখানে সেখানে ঘুরে বেরিয়েছে৷ যাতে কোনোভাবেই কোনো গোয়েন্দা এজেন্সির ছদ্মবেশী অফিসারদের চোখেও সন্দেহভাজন না হয় আবার আইনের চোখেও। প্রতিটি টেরোরিস্টই এরকমভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে যাচ্ছে প্রতিদিন। ধারণাও করা যাচ্ছে না, পুরোপুরি চার বছরে সংখ্যায় কততে বেড়েছে এরা।’

-‘আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি, ভাইয়া৷ আপনার মতো প্লেবয় ইন্টেলিজেন্স অফিসারও কি-না সুন্দরী এক টেরোরিস্টের ফাঁদে পা দিলো! আপনাকেই যদি মুরগি বানিয়ে ফেলতে পারে, তাহলে বাকিদের কথা কী বলব?’ বলতে বলতে একটু তিরস্কারের সঙ্গেই হাসল দীধিতি৷
খোঁচাটা মুখ বুজেই হজম করতে হলো ইয়াসিফকে। আয়নার সামনে দাঁড়ায় না সে বহুদিন। যখনই আয়নাতে সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে, তখনই নিজের প্রতি ধিক্কার আসে ওর। মারিহামের প্রতারণার পর নারী সঙ্গী বা নারী সঙ্গ, দুটোই এখন ওর কাছে জঘন্য আর ঘৃণ্য লাগে। প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে দীধিতিকে তাগিদ দিলো সে পুনরায়, ‘শুরু করো।’
কফির মগটা হাতের মাঝে রেখে দীধিতিও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে থাকল চার বছর আগের স্মরণীয় একটা ঘটনা।

তাওসিফের থেকে যে রাতে অপমানিত হলো কিরণ, সে রাতের পর থেকেই কিরণের মাঝে রাতারাতি আমূল-পরিবর্তন ঘটে৷ সুযোগ পেলেই যে বাচ্চা মেয়েটা সৌরভের প্রত্যাখ্যানে হাপুসনয়নে কেঁদে ভাসাত, সে মেয়েটার মাঝে সেই সব আবেগের বদলে জায়গা করে নেয় বিস্ময়কর গম্ভীরতা। মূলত তাওসিফের করা অপমানের নিজের ব্যক্তিত্ব যে ভীষণ ঠুনকো, এমনটাই মনে হচ্ছিল ওর৷ কখনো সৌরভের কাছে অপমান, আবার কখনো তাওসিফের কাছে। এরা যে ওর ঠুনকো ব্যক্তিত্বের জন্যই যখন তখন অপমান করার সাহস আর সুযোগটা পাচ্ছে, সে ভাবনাটাই ওর চিন্তা চেতনা আর নিজের চারিত্রিক বহু বৈশিষ্ট্যের বদল ঘটিয়ে ফেলে৷ রাত-দিন ঘরের মধ্যে পড়াশোনার পেছনে সময় দেওয়ায় ওর প্রতিদিনের রুটিন হয়ে গিয়েছিল৷ ব্যাপারটা নাওফিল আর দীধিতির নজরে ভালোভাবেই পড়ে৷ সামনে মেডিকেল কলেজের পরীক্ষার কথা ভেবে প্রথম প্রথম ওরা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি৷

কিন্তু বাড়িতে তাওসিফ, ইয়াসিফ আর নাওফিলের বন্ধুরা মাঝেমধ্যে এসে আড্ডা জমালে সেখানে কিরণকে জোর করেও আনা যেত না৷ বিশেষ করে তাওসিফ যতক্ষণ থাকত বাসায়, ততক্ষণ কিরণের চোখে-মুখের গম্ভীরতা আরও বেশি বাড়িয়ে ফেলত৷ যা দেখে একটা বাচ্চাও অনুমান করতে পারবে, তাওসিফের উপস্থিতি কী পরিমাণ বিরক্ত করছে ওকে। ব্যাপারটা নাওফিলের কাছে মন খারাপের হলেও সে তাওসিফকেই সরাসরি বলে দেয়, ‘ভাই আমার, কিরণ যতদিন আছে ততদিন তুই এখানে আসাটা আরেকটু কমিয়ে দিস৷’ কিন্তু তা দীধিতি শুনতে পাওয়া মাত্রই উলটে নাওফিলকে প্রচণ্ড বকাঝকা করে তাওসিফের কাছে মাফ চেয়ে নেয় কিরণের হয়ে৷ কিন্তু তাওসিফ শুরু থেকে শেষ অবধিই ছিল পুরোদস্তুর বিকারশূন্য৷ কিরণকে শুনিয়েই সে দীধিতিকে জানায়, ‘জাদ আসতে বারণ করলেই কি আমি শুনব? তুমি খামখা কেন এক নিব্বির জন্য মাফসাফ চেয়ে পরিস্থিতি জটিল করছ, স্মরণ? তার চেয়ে তোমার বোনের কাছেই জিজ্ঞেস করো, আমাকে দেখে তার টয়লেট কষে যায় না-কি? যে চেহারা অমন কুঁচকে ফেলে?’ কিরণকেও তারপর বক্রোক্তি করে ওঠে সে, ‘আমি তো দেখি তোমার লাইফে সৌরভের থেকেও বেশি গুরুত্ব বহন করি, কিরণ৷ আমাকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণ কী, বলো তো? সৌরভকে ভুলে আমাকে পছন্দ টছন্দ করে ফেলেছিলে বোধ হয়, রাইট? নয়ত আমার সেদিনের অতটুকু ত্যারা বাঁকা কথায় তোমাকে এতটা এফেক্ট করবে কেন?’

যদিও কথাগুলো স্রেফ মশকরা করেই বলেছিল তাওসিফ। কিন্তু কিরণকে ওই মশকরাটুকুও ভাবতে বাধ্য করে। সত্যিই তো সে সৌরভের বারবার অপমানেও এতখানি প্রভাবিত হয়নি কখনো৷ অথচ হওয়ার কথা ছিল ওর সৌরভের বেলাতেই। তাওসিফ তো স্বল্প দিনের পরিচিত এক আত্মীয়৷ তার কথাকে কেনই-বা সে অত গুরুত্ব দিতে গেছে! এতে অবশ্য নিজের মাঝে যে পরিবর্তনগুলো হয়েছে ওর, তাও ওর জন্য প্রচণ্ড দরকারও ছিল৷ নয়ত সৌরভের প্রত্যাখ্যান ওকে স্বাভাবিক হতে দিতো না।
ঠিক এর পরদিনই কিরণ তাওসিফকে ঘিরে নিজের বাচ্চামো রাগ ঝেড়ে ফেলে। নাওফিল অফিসের কিছু কাজে সেদিন সিলেট যায়। সারা বাড়িতে দুবোন একা তখন। তাই সিদ্ধান্ত নেয়, দুপুরের পর ওরা শপিংয়ে যাবে৷ কিন্তু গাড়ির বদলে রিকশা করে৷ বহুদিন দুবোনের এক সঙ্গ রিকশাতে ঘোরা হয় না বলেই দীধিতিও কিরণের আবদারে আপত্তি করেনি৷

চারটার সময় যমুনা ফিউচার পার্কে প্রবেশ করে ওরা৷ শুক্রবার না হলেও সেদিনটাতে বেশ ভিড়ই ছিল। কারণ, সামনে ছিল পূজোর সময়। কিরণ ওয়েস্টার্ন পোশাক-আশাক ট্রাই করার জন্য দীধিতিকে রেখে নিজের মতোই দেখছিল ঘুরে-ঘুরে। দীধিতি তখন নাওফিলের ফোন পেয়ে একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে কথা বলায় ব্যস্ত। কিন্তু হঠাৎ করে নেটওয়ার্ক ঠিকমতো না পাওয়ায় কল কেটে কিরণের কাছে যেতেই সে সময় চারতলা ফ্লোরে বিকট আওয়াজে গুলির শব্দে সারা মল কেঁপে ওঠে। সিকিউরিটিকে ফাঁকি দিয়ে কে কীভাবে অস্ত্র সমেত ভেতরে ঢুকে পড়েছে, এসব ভাবার মতো অবস্থায় তখন কেউ নেই। পরপর আরও দু’বার গুলির শব্দ পেয়ে দীধিতি প্রচণ্ড ঘাবড়ে যায়৷ বোনকে নিয়ে জামা-কাপড়ের কোনো এক কোনে লুকিয়ে পড়ে প্রথমে। তখন শুনতে পায় বলিষ্ঠ এক পুরুষ গলা, ‘ডু ইউ ওয়ান্ট টু লিভ? দেন কিপ কোয়াইট অ্যাজ উই সে।’
সারা ফ্লোরে তল্লাশী চলছে আতঙ্কবাদীদের৷ কাউকে কোথাও ঘুপচি মেরে থাকা অবস্থায় পেলেই তার জীবনে শনি ডেকে আনছে। দীধিতি আর কিরণ আশ্রয় নিয়েছে তখন ট্রায়াল রুমে।
যে ঘটনা এতকাল সিনেমার পর্দায় দেখে এসেছে সবাই৷ তা যে এই দরিদ্র দেশের শপিংমলে নিজেদের সাথেও ঘটতে দেখবে, এ কি কোনোদিন স্বপ্নতেও ভেবেছিল কেউ? আজকের দিনটাতে পৌঁছতে এই আতঙ্কবাদীর দলটা বহু পরিকল্পনা আর ছক কষে এসেছে প্রতিদিন৷ কিন্তু এদের চাওয়া কী?

ফোনে নেটওয়ার্ক তখনো ঠিকঠাক পাচ্ছিল না ওরা সেই মুহূর্তে৷ ত্রাস নিয়ে দীধিতি অসংখ্যবার ইয়াসিফ, তাওসিফ আর নাওফিলকে কলে পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল। কিরণও থেমে ছিল না৷ সোহাইল সাহেব আর নাওফিলকে কল করছিল সেও৷ এর মাঝেই আচমকা ওদের ট্রায়াল রুমের দরজায় ধুমধাম আওয়াজ শুরু হয়৷ ধরা পড়ে গেছে ওরা সন্ত্রাসদের হাতে। দীধিতি তখন নিজেকে ধাতস্থ করে । বোনের দেখাদেখি কিরণও ভয়কে সরিয়ে সামলায় নিজেকে৷ হয়ত এমন সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি ওরা হতে পারে বলেই রেজা তার পরিবারটাকে গড়ে তুলেছিল সেভাবেই৷ তাই তো দুজনই মৃত্যু কাছাকাছি জেনেও লড়াইয়ের চিন্তা ভুলল না। কিরণকে আড়াল করে দীধিতি প্রশিক্ষিত তায়কোয়ান্দোবিদের মতো প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়াল৷ দরজাটা ওপাশ থেকে ভাঙার আগে সে নিজেই সর্বোচ্চ গতিতে লাথি বসাল দরজার গায়ে৷ তাতে ওপাশের ব্যক্তিটা কিছুক্ষণের জন্য হলেও হকচকিয়ে যাবে। আর হলোও তাই৷ দরজাটা ভেঙে যখন ওপাশের ব্যক্তির সঙ্গে বাড়ি খেলো, তখনই দীধিতি আর কিরণ রুমের দু কোনায় সরে পড়ে। শত্রুপক্ষ সংখ্যায় অধিক থাকার সম্ভাবনা যেহেতু বেশি৷ তাই তারা আক্রমণ করবেও এক সঙ্গে৷ কিন্তু ওদের দুজনকেই এক সাথে বাগে পেয়ে গেলে বাঁচার আশা পুরোপুরি শূন্য। একজনকে আক্রমণ করলে অন্তত আরেকজন যেন পালটা আঘাত করার সুযোগ পায়। এমনটাই পরিকল্পনা দীধিতি আর কিরণের৷

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬০

ভাঙা দরজা সরিয়ে কালো কাপড়ে মাথা আর মুখ ঢাকা দুজন পুরুষ ট্রায়াল রুমে যখনই পা দিলো, দীধিতি আর কিরণ তাদের সঙ্গে লড়তে উদ্যত হতেই আকস্মিকভাবে সন্ত্রাস দুজন ঘাড়ের পিছে হাত দিয়ে মৃদুস্বরে উহ্ঃ করেই ধপ করে নিচে পড়ে গেল৷ এই চমৎকৃত ঘটনায় দীধিতি আর কিরণ যখন বিস্ময়বিমূঢ়, তখন এগিয়ে এলো ওদের সামনে দীর্ঘ উচ্চতার এক নারী। বুঝতে দেরি হলো না ওদের, এই নারীই তবে কিছু একটা পুশ করেছে সন্ত্রাসদুটোর ঘাড়ে। কেবল ওদের দুজনকে বাঁচানোর জন্যই৷

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here