Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি

কলিংবেল বাজানোর পূর্বেই দরজাটা হঠাৎ খুলে যেতে দেখে সৌরভ কিঞ্চিত ভড়কাল৷ চোখের সামনে কঠিন মুখ করে থাকা ইয়াসিফকে দেখে নিজের চশমাটার ফাঁক দিয়ে তাকাল সরু দৃষ্টিতে। ‘আরে অ্যাকশন হিরো না-কি! ভুল দেখেনি তাহলে চোখদুটো। কী খবর, ভাইয়ো?’ রগুড়ে গলায় সৌরভ বাচালের মতো বলেই গেল, ‘এরকম হিরো মানুষকে যেখানে সেখানে আমাদের মতো ম্যাঙ্গো পাবলিক দেখলে মার্কেট কমে যাবে তো, ভাই।’

-‘ঘা খেয়েছ কোনোদিন? পুলিশের ঘা?’ কড়া কণ্ঠ ইয়াসিফের।
-‘খাইনি, ভাই। লাগলে স্মরণের থেকে খেয়ে নেব। চিন্তা নিয়েন না। আসসালামু আলাইকুম।’ সালামটা তাকে বিদায় জানানোর উদ্দেশ্যে বলে সৌরভ ঘরে ঢুকে পড়ল নির্বিকার ঢঙে। ঘাড় ঘুরিয়ে ইয়াসিফ তখন শাণিত চোখে দেখতে থাকল ওকে। গত বছর থেকে এই ছেলের সঙ্গে দীধিতির মেলামেশা বা সম্পর্ক বেশ চোখে পড়ার মতোই৷ ওকে যতটা স্মার্ট ভেবেছিল সে, আদতে তার ভাবনার চেয়েও চটপটে ছেলেটা। একেবারেই ভয়ডরহীন যেন৷ দেখা হলেই কেমন মশকরার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে শুরু করে তার আর তাওসিফের সঙ্গে। এমনকি নাওফিলকে নিয়েও তাদের সামনেই উলটা পালটা মন্তব্য করতে ভয় করে না।
-‘কীরে তুই রেডি হোসনি এখনো?’ দীধিতিকে ঘরের পোশাকে দেখে সৌরভ তাড়া দিলো, ‘ন’টার আগে পৌঁছব কিন্তু৷ এক্ষুনি গিয়ে রেডি হ।’

-‘আমার শরীর, মন, কোনোটাই টানছে না আজকে৷ কাল যেতাম?’
-‘কই যাচ্ছ তোমরা?’ দরজার কাছ থেকে ফিরে এসেছে ইয়াসিফ। তার প্রশ্নে ওরা দুজনই এক সঙ্গে তাকাল। ‘সেকি, বস দেখি যাননি।’ কপট বিস্ময় ভাব দেখিয়ে সৌরভ বলে উঠতেই ইয়াসিফ ধমকে বসল, ‘কে বস তোমার? ফাজলামো বেশি করলে সদ্য পাওয়া ডাক্তারি লাইসেন্স বাতিল করার ব্যবস্থা করব।’
-‘ভাইয়া, আপনি কি এখন আর বাড়তি ইনকামের সুযোগ পান না? এজন্যই কি আজ-কাল এরকম চাঁড়ালের মতো হয়ে গেছেন?’ ভার মুখ করে বলল সৌরভ।
ইয়াসিফের মেজাজ আবারও চড়ে ওঠার আগেই দীধিতি হাসি চেপে উত্তর দিলো তাকে, ‘ও আজকে ডিনার করাতে নিয়ে যেতে চাইছে, ভাইয়া।’

-‘ডিনার ডেট।’ শুধরে দিয়ে সৌরভ তিরস্কার করে বলল, ‘আমাদের মতো দুজন অ্যাডাল্ট ছেলে-মেয়ে ডেটে ছাড়া আর কোথায় যেতে পারে? সেনটেন্সটাও কমপ্লিটলি বলতে পারিস না।’
ছোটো করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে ইয়াসিফ বেরিয়ে যেতে যেতে সাবধান করে গেল, ‘ঢাকায় ঢোকার পর থেকে তোমার চারপাশে ওর অসংখ্য চোখ থাকছে, স্মরণ। বি কেয়ারফুল।’
-‘আই ডোন্ট কেয়ার।’ মুহূর্তেই গলা উঁচিয়ে শুনিয়ে দিলো দীধিতি।
কপট চিন্তিত মুখ করে সৌরভ বলল তখন, ‘এতগুলো চোখের সামনে কি শান্তিতে খেতে পারব রে? ব্যাটাদের নজর লেগে আমাদের বাম লুজ হয়ে যাবে না তো?’
কথাটার পরই সে পিঠের মাঝে একটা শক্ত থাপ্পড় খেলো দীধিতির হাতে। জ্বলে উঠল জায়গাটা৷ কিন্তু বেচারার হাত পৌঁছল না সেই অবধি৷ চোখ মুখ কুঁচকে শুধু চেঁচিয়ে বলল, ‘তোর বাতিল বরের কোনো চোখ যদি আমার উপরে আসে। আমি কিন্তু তোকে কাজী অফিস নিয়ে যেতে দ্বিধা করব না।’ তা শুনে দীধিতি হাসতে হাসতে সিঁড়িতে উঠে গেল।

মাত্রই পড়ার টেবিলে বসেছিল কিরণ। কিন্তু তাওসিফের বিরতিহীন ফোনকলে বইতে আর মনোযোগ ধরে রাখতে পারল না। সেদিনের পর লোকটা আবার সেই আগের মতো জ্বালাতন শুরু করেছে ওকে। এত বড়ো মানুষটাকে ধমকি-ধামকি দিয়ে দু,চার কথা শোনাতেও ভয় করে ওর। কারণ, সেসব কথা এই বদমাশ লোক ঝুমুর বা সোহাইল সাহেবের কানে তুলে দিতে দেরি করে না৷ বাধ্য হয়ে কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই তাওসিফ বজ্র গলায় বলে উঠল, ‘আমার মরার খবরও তো বলার জন্য কেউ ফোন দিতে পারে, তাই না?’
-‘আশ্চর্য! আপনি জানেন না আমার প্রপার স্টাডির টাইম কখন? অসময়ে ফোন দিতে থাকেন বলেই তো ধরি না।’
-‘গভীর রাতে দিলেও তো কথা বলা সম্ভব হয় না তোমার৷ তাহলে দেবোটা কখন?’
-‘যখন তখন কথা বলতেই বা হবে কেন? আমরা কি আর পাঁচটা নরমাল হ্যাপি কাপল? আমাদের মধ্যে জরুরি বিষয় ছাড়া কথা বলাটাই তো অস্বাভাবিক।’
-‘পাকনা পাকনা কথা বোলো না৷ হলে থাকার ভাগ্যই নয়ত ঘুচিয়ে দেবো। পা ভেঙে তুলে এনে বাসায় ফেলে রাখব।’

-‘কীজন্য ফোন দিয়েছেন বলুন তো।’ বিরক্ত স্বরে বলল কিরণ, ‘ফাউ প্যাঁচালের সময় নেই।’
-‘কসম, কিরণ। আমার কাছে তোমাকে নিয়ে আসি শুধু। কীভাবে তখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলতে পারো, দেখব।’
-‘আচ্ছা ঠিক আছে, দেখবেন৷ এখন বলুন কী দরকার?’
-‘আমাদের বিয়ের প্রোগ্রাম হবে। এ বিষয়ে আজকে আব্বু আর আম্মু তোমার মা আর সোহাইল কাকুর সঙ্গে আলাপ করেছে৷ এ খবর পেয়েছ?’
হাত থেকে কলমটা পড়ে গেল কিরণের। প্রচণ্ড বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল সে, ‘এত বছরে তাহলে শেষমেশ আপনার বাপ রাজি হলো কাকুর প্রস্তাবে?’
-‘হতে হলো৷ তাদের বড়ো ছেলের বয়স থেমে থাকছে না৷ নাতি-নাতনি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তো আছে না-কি!’
ওদের দুজনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের ঘটনাটা জানাজানির পর ঝুমুরের সঙ্গে বহু গোলমাল করেছিলেন তাওসিফের বাবা-মা। আর ঝুমুরের হয়ে সেদিন তাদের সমস্ত কথার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সোহাইল। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি জাহিদ শেখকে বলে এসেছিলেন, ‘যেদিন তুমি নিজে আমার কিরণকে অনুষ্ঠান করে ঘরে তুলবে, সেদিনই কিরণ এই বাড়িতে আসবে। আর যদি পারো তাহলে তোমার ছেলের থেসে ডিভোর্স করিয়ে নিয়ো।’

অবশ্য ঝুমুর মেয়ের কলঙ্কিত হওয়া নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন৷ তাই মোটেও চাননি, কখনো তাওসিফ তার মেয়েটাকে কোনোভাবেই তালাক না দিক৷ তাই তো তাওসিফ যতবার নিজে থেকে যোগাযোগ করেছে তার সঙ্গে, কিরণকে নিয়ে একা কোথাও থাকার প্রস্তাব রেখেছে তার কাছে, সব কিছুই তিনি নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন। মেয়ের জেদকেও পাত্তা দিতেন না সেখানে।
-‘আর স্মরণও এখন ঢাকাতেই থাকছে। প্রোগ্রামটা এখন হয়েই ভালো হয়েছে৷ অ্যাটেন্ড করতে পারবে ও।’ বলল তাওসিফ।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬২

-‘কিন্তু আপনি ওর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন।’ কিরণ মনে করিয়ে দিলো, ‘কিন্তু বলেননি সেদিন। আমি আবারও বলছি, আমার বোন যদি অখুশি হয় এ সংবাদে। আমি যাব না আপনার ঘরে।’
-‘অখুশি হবে না স্মরণ৷ ও বিবেকহীন নয়, স্বার্থপর নয়৷ কাল বা পরশু তোমাকে নিয়ে আবার মিট করব ওর সঙ্গে।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here