আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি
দুই ভাইয়ের দেওয়া বিপদ সঙ্কেত আর সতর্ক বার্তা যে তাওসিফের মাথাতেও আসেনি, তা নয়৷ সেও এসব ভেবেছে বলেই নিজের অনুভূতির ব্যাপারে অসন্দিগ্ধ হওয়ার পরও সরাসরি কিরণের কাছে প্রকাশ করার কথা তাকে বহুবার ভাবাচ্ছিল। তাই তো ভাইদের শরণাপন্ন হতে হলো। কিন্তু তাতেই বা কী লাভ পেলো? তারাও তো কোনো সমাধানের রাস্তা বাতলে দিতে পারল না৷ অর্থাৎ সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার, তা শুধু তাকেই চিন্তাভাবনা করে নিতে হবে। এবং পদক্ষেপটাও নিতে হবে ভীষণ সাবধানে। এ চিন্তাতে চিন্তাতে সেদিন রাতে ভাই, বন্ধু, কারও সঙ্গেই আড্ডা জমাতে পারেনি সে।
কেবল দূর থেকে আড্ডায় মশগুল হাসিমুখর কিরণকে দেখে যাচ্ছিল৷
বনেদি গোষ্ঠীর এই শেখ বাড়ি বহু পুরোনো। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেখানে মেরামত করে আধুনিকতার ছোঁয়া দিলেও হলেও বেশ কিছুটা পুরোনোর ছাপ রেখেই দিয়েছেন মাহতাব শেখ। সেটা হলঘর, খাবার ঘর আর বাড়ির সদস্যদের শোবার ঘরের ক্ষেত্রেই বজায় রাখা হয়েছে। হলঘরটা দেখতে যেন কোনো রাজার দরবার সভা৷ আর রাজার সিংহাসনের মতোই একটা রাজকীয় ঢঙের আসনও সেখানে রয়েছে৷ সেই আসন বাড়ির একমাত্র প্রধান কর্তা মাহতাব শেখের জন্য। তেমন বিশাল আয়তকার ডাইনিং টেবিলেও একটি বিশেষ চেয়ার আছে তার জন্য৷ এ দুটো চেয়ারে মাহতাব সাহেব ব্যতিত বাড়ির অন্য কারও বসার অনুমতি নেই, ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। বাড়ির মানুষগুলোই তার সম্মানার্থে ওই আসন ছেড়ে বসে সব সময়৷ তবে সকল নাতিপুতির মাঝে ইয়াসিফ ছোটোবেলা থেকেই দুষ্টু প্রকৃতির ছিল বলে চেয়ারে যখন তখন বসাটা ওর কাছে কোনো ব্যাপারই ছিল না।
সেদিনও ইয়াসিফ হলঘরের ওই আসনে বসে সবার সঙ্গে গল্প করছিল৷ আর তার সোফার হাতল অংশে বসেছিল ফিহা। বড়ো ভাইকে সিঁড়ির ধাপে উদাসভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকে ডাক দিতে যেয়েই খেয়াল করে, সে প্রগাঢ় চোখে কাউকে অপলক দেখে চলেছে৷ সে দৃষ্টি অনুসরণ করেই সে দেখতে পায় কিরণকে। মুহূর্তেই বুকে আগুন জ্বলে ওঠে যেন তার। নাওফিল আর দীধিতি পাশাপাশি বসে তখন ইয়াসিফের বন্ধু ফারহানের সঙ্গে কথা বলছিল৷ এ বাড়িতে নাওফিল এসেছে পর থেকে যখনই বাড়িতে থাকে, তখনই বউয়ের সঙ্গে ঘেঁষে থাকার চেষ্টা করে সে৷ তা যে ফিহাকে কতটা পীড়া দেয়! একমাত্র দীধিতির কারণেই কিরণও তাই চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায় তার৷ বড়ো ভাইয়ের চোখের ভাষা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি সেদিন। নিজের ভাইয়ের পাশে কোনোভাবেই সে কিরণকে সহ্য করবে না। সে বহু কষ্টে নিজেকে সামলে ইতোমধ্যে বড়ো চাচির সঙ্গে সংগোপন দীধিতিকে নাওফিলের জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে ফেলেছে। এবার কিরণের এ বাড়িতে প্রবেশের সম্ভাবনাটুকুও সে রাখবে না৷ নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যেন।
সকাল ছ’টার অ্যালার্মে দীধিতি কোনোরকম অলসতা ছাড়ায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল৷ পায়ের যন্ত্রণায় রাতে পেইন রিলিফ স্প্রে দিয়েছিল বিধায় কোনোরকম অসুবিধা আর লাগছে না৷ দ্রুত বাথরুমের কাজ সেড়েই সে রুফটপে নাওফিলের করা জিমনেসিয়ামের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। এলিভেটরে ঢুকতেই দেখা হলো কেয়ারটেকারের সঙ্গে। বেশ খুশি হলো দীধিতি মনে মনে। লোকটাকে ডেকে এমনিতেই আজ-কালের মাঝে কথা বলত সে। ওকে সালাম জানাতেই তাকে জিজ্ঞেস করল দীধিতি, ‘নতুন ফ্যামিলি ক’জন এসেছে, চাচা?’
-‘গত ছ’মাসের মধ্যে একটাই আসলো, ম্যাডাম।’
-‘আচ্ছা। ফ্যামিলিতে কতজন? কী করে তারা?’
-‘তুষার ইসলাম ফ্ল্যাটের মালিকের নাম৷ ব্যবসা করে। লোকটা বিবাহিত। শুধু এটাই জানি৷ বাচ্চাকাচ্চা আছে কিনা মনে নাই।”
কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়ল দীধিতির। তুষার কী এমন ব্যবসা করছে, যে কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য হয়ে গেল এত শীঘ্রই? গত দু বছর আগেও তো শুনেছিল নাওফিলদের কোনো এক ফ্যাক্টরিতে চাকরি নিয়েছে সে।
নবম তলায় এসে কেয়ারটেকার বিদায় নিলো। আর দীধিতি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই রুফটপে পৌঁছল। ভাবনায় বুঁদ হয়ে জিমনেসিয়ামে ঢুকে ট্রেডমিলে যখন দৌড়ানো আরম্ভ করল, তখন মাথায় এলো– ইয়াসিফের সঙ্গে কথা বললেই তো সবটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আর কথা আজই বলতে হবে ওর। ডিজিটাল দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে ভেবে রাখল, আটটা বাজলেই কল করবে তাকে।
ভাবনা শেষে ইয়ার-ফোনটা মোবাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করে দৌড়ানোতে মনোনিবেশ করল সে। আর থাই গ্লাসের ওপাশে সকালটা দেখতে দেখতে সাথে পছন্দের গান শুনতে শুনতে গত রাতের কথা মন থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করল। কিন্তু আর কিছুক্ষণ বাদেই তো নিজে থেকেই যেতে হবে ওই ব্যক্তির কাছে। কীভাবে সারাটাদিন সহ্য করবে তাকে কে জানে! এজন্য মস্তিষ্ক আর মনকে ঠান্ডা আর শক্ত করতেই আজ ওয়ার্কআউটে আসা। নাওফিলের মুখটা মানসপটে আসতেই গানটা বিরক্ত লাগল ওর। এক টানে ইয়ারফোন কান থেকে খুলে নিতেই অকাস্মাৎ চোখ আটকালো একটু দূরত্বে থাকা ওয়েট প্রেস বেঞ্চটিতে৷ বেঞ্চের পাশেই ফ্লোরে নাওফিলকে ডাস্বেলে চেস্ট পুশ আপ মারতে দেখা গেল বিরতিহীন। পরনে শুধু তার কালো রঙা জগার্স। উন্মুক্ত দেহ। পুশ আপের সময় ঘেমে একাকার হওয়া চমৎকার, সুঠাম শরীরের দুর্দান্ত পেশী ফুলে উঠছে ঘনঘন, লাল ফরসা মুখটা প্রচণ্ড রক্তিম হয়ে শক্ত চোয়ালজোড়া আরও টানটান লাগছে তখন। ছোটো করে কাটা চুলগুলোর গোড়ায় শরীরের নোনা পানি জমে তা কপাল বেঁয়ে গড়িয়ে আসায় মনে হচ্ছে পানিতে ভিজে আছে তার সমস্ত চুল। দীধিতি চোখে অবিশ্বাস আর বিস্ময় নিয়ে চেয়ে আছে সেদিকে। ভুলে গেছে সে ট্রেডমিলে অবস্থান করছে। তাই দুর্ঘটনাটা ঘটে যেতে আর সময় লাগল না। ছিটকে পড়তেই শরীরের সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে পেলো মারাত্মক চোট।
ধপাস করে পড়া আর ওর আর্তনাদের আওয়াজে নাওফিল চমকে ফিরল, শব্দের উৎস যেদিকে হলো। তারপর দীধিতিকে আবিষ্কার করে ডাম্বেল ফেলে তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়ল। এমন সময়ে মোটেও প্রত্যাশা করেনি সে দীধিতিকে। দৌড়ে এলো ওর কাছে৷ মসজিদ থেকে ফিরে সাড়ে পাঁচটায় এসেছিল সে রুফটপে। কতক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে এসে তারপর ঢোকে জিমনেসিয়ামে। অনেক কিছু নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে করতেই পুশ আপ মারছিল সে। তাই টেরও পায়নি দীধিতির উপস্থিতি।
আহত বউকে কোলে তুলে নিয়ে সে চলে এলো ট্যারেসে। কাউচে বসিয়ে দিতে দিতেই জিজ্ঞেস করল, ‘পড়লে কেমন করে? এটাই প্রথমবার না-কি ট্রেডমিলে?’
থুতনিতে খুব বেশিই ব্যথা পেয়েছে দীধিতি৷ সারা মুখ নীল হয়ে গেছে সে ব্যথায়৷ নাওফিলের শেষ প্রশ্নটাতেই জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে ফোঁস করে উঠল ব্যথা নিয়েই, ‘হ্যাঁ, প্রথমবার। অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে এসেছি তো।’
-‘কিন্তু অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ে…’ কথার মাঝপথে দীধিতিকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে নাওফিল রগড় গলায় মৃদুস্বরে বলল, ‘প্রথমবারেই জিমে এমন কস্টিউমে এলো! সেডাক্টিভ ব্যাপার। এমন বেশে রোজ এলে তো আমার সমস্যা।’
-‘শাট আপ’, চেঁচিয়ে উঠল দীধিতি, ‘তুমি কী করছ এখানে?’
-‘তুমি যা করতে এসেছিলে।’
-‘এখানে কেন?’
-‘তাহলে কোথায়?’ সরল চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল সে।
তার নাটক দেখে মেজাজ আরও খারাপ হলো দীধিতির। গোলাপী রঙের স্পোর্টস ওয়ার্ককাউট পোশাক পরনে ওর। প্যান্টের ওপর দিয়ে আঘাত পাওয়া হাঁটুর স্থানে ডলতে ডলতে নাওফিলকে বিচ্ছিরি ভাষায় কথা শোনানোর জন্য মুখ খুলতেই নাওফিল আচমকা রূঢ়ভাবে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘তুমি এভাবেই এসেছ এখানে? বাইরের কেউ দেখেছে?’
চোখ-মুখ কুঁচকাল তখন দীধিতি৷ তার হঠাৎ গম্ভীর গলা আর মুখের অনমনীয়তা দেখে সে বুঝে ফেলল প্রশ্নের কারণটা। জবাবটা দিতে তাই এক মুহূর্তও দেরি করল না, ‘এভাবেই এসেছি’, আরও জেদি গলায় বলল, ‘এভাবেই আসব। বাইরের লোক দেখলে দেখবে। যেমন আজ দেখেছে কেয়ারটেকার। সো হোয়াট? তুমি কে জিজ্ঞেস করার?’
-‘আমি কে? জানতে চেয়ে বোধ হয় ঠিক করলে না।’ গমগমে গলায় বলেই নাওফিল উঠে চলে গেল জিমনেসিয়ামে। তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল দীধিতি তখনো। মুখ ফুটে স্বীকার করতে পারছে না সে, নাওফিলকে আজ দেখে কতটা বিস্মিত হয়েছে, কতটা সম্মোহিত হয়েছে। আগেও নাওফিল ওর চোখে আকর্ষণীয় পুরুষ ছিল। কিন্তু বর্তমান নাওফিলের এমন অ্যাথলেটদের মতো শারীরিক গঠন, ম্লান গায়ের রং, চেহারায় একাধিক কাটা দাগ ওকে ভীষণরকম চমকাচ্ছে আর ভাবাচ্ছে৷ এত পরিবর্তন কেন এই স্বার্থপর মানুষটির? কীভাবে এলো এসব কাটা চিহ্ন? নিশ্চয়ই মারামারি করতে গিয়েই হয়েছে। কিন্তু কবে, কোথায়, কার সঙ্গে মারামারি করেছে সে?
গায়ে ঢিলেঢালা টি-শার্ট ঢুকিয়ে বেরিয়ে এলো নাওফিল। দীধিতির কোথায় কতটুকু লেগেছে, তা জিজ্ঞেস না করে সরাসরি বলল, ‘ন’টার মধ্যে তোমার কাছে কল যাবে আমার। অসুস্থতার কোনো অজুহাত শোনা লাগবে না আশা করছি৷’
-‘আমি আমার প্রশ্নের জবাব পাইনি৷ এখানে কেন আপনি?’
-‘আমি এখানেই থাকছি গতকাল থেকে তোমার নতুন পড়শী হয়ে।’
-‘তার মানে ফ্ল্যাটটা নামে তুষার ভাইয়ের, রাইট?’
প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল নাওফিল, ‘একা যেতে পারবে নিশ্চয়ই?’
বুঝতে পারল দীধিতি, কোনো জবাব পাওয়া যাবে না নাওফিলের থেকে। সেও তাই তার প্রশ্ন এড়িয়ে উঠে দাঁড়াল, একাই নেমে যাবে ভেবে। কোনোভাবেই সাহায্য নেবে না নাওফিলের। তাই হাঁটু আর হাঁটুর নিচের ব্যথাকে গিলে নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটা ধরলেই নাওফিল এগিয়ে এলো, ‘জিম ঘরের দিকে যাচ্ছ কেন আবার? আগামী তিনদিনেও ওয়ার্কাউট করা পসিবল হবে না তোমার পক্ষে।’
কোনো কথায় বলল না দীধিতি। ভেতরে এসে পরনের শার্টটা গায়ে চড়াল। তা দেখে এতক্ষণ মনের ভেতরে রাগে তুফান বয়ে চলা থামল যেন নাওফিলের। তবে পুরোপুরি গায়েব হলো না রাগটা। এমন আঁটোসাঁটো পোশাকে দীধিতির দেহের আকার, আকৃতি সবই তো স্পষ্ট। আর এভাবেই নাকি তার বউ বাইরের পুরুষদের সামনে চলাচল করছে আর করবেও৷ কী ভয়ঙ্কর, দুঃসাহসিক কথা!
ঘর থেকে দীধিতি বেরিয়ে এসেই তাকে হুমকি গলায় বলল, ‘আপনি আমার পড়শী হয়ে থাকলে আমি এই জায়গা ত্যাগ করব।’
-‘তাই?’
-‘হ্যাঁ, তাই।’
-‘ভেবে বলছ তো?’ রাগের মধ্যেও হালকা হেসে ফেলল নাওফিল। আর সে হাসি দেখেই দীধিতির ভ্রু কুটি হলো৷ কোনো ফন্দি এঁটে রেখেছে কি নাওফিল? পাঁচটা মাসের সংসার হলেও নাওফিল যেমন ওকে হাড়েহাড়ে চেনে, সেও কি তাকে ততটাই চেনে না?
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৬
অবশ্যই ভেবেচিন্তে এই শয়তানটা এখানে এসে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ তাছাড়া রাফিয়ান রাফির গানম্যান হওয়ার কথা ছিল ওর যেখানে, সেখানে কী উপায়ে নিজের জন্য তাকে নিযুক্ত করে নিলো ওকে কে জানে! বৃহৎ কোনো কৌশলই অবলম্বন করেছিল। এখন এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও সারাদিনটা তো এমনিতেই কাটাতে হবে তার সঙ্গে। বাকি থাকে যে রাতটুকু৷ সে সময়টুকুও নিজের কাছে আটকে রাখার মতো বহু কূট কৌশল জানা আছে নাওফিলের, তা ওর চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না নিশ্চয়ই!
