আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি
প্রচণ্ড রাগে তখন বউকে একা ফেলে চলে যেতে ইচ্ছা করলেও মোটেও একা ছাড়ল না নাওফিল দীধিতিকে। তাকে নীরব এক শাণিত চাউনি দিয়ে দীধিতি যখন এলিভেটরে প্রবেশ করল, নাওফিলও ওর পিছু পিছু এসেই ঢুকল। সেও একই ফ্লোরের বাটন চাপলে দীধিতি তৎক্ষনাৎ তীক্ষ্ণ বাণ ছুঁড়ল তাকে, ভীষণ রসিয়ে রসিয়ে বলল, ‘আপনি সত্যিই এক তুখোড় পলিটিশিয়ান। আপনার আদর্শ স্বামী হওয়ার ভানটাও এক্সিলেন্ট। সবাই জানছে আপনি আপনার প্রাক্তন স্ত্রীকে খোরপোষ হিসেবে নিজের সম্পদ থেকে বিরাট একটা অংশ লিখে দিয়েছেন। ইলেকশনের আগে এই তথ্যটা এত বেশি প্রচার করেছেন, যে আপনার বাবার অখ্যাতি থাকলেও জনসাধারণ তা ভুলে আপনার খ্যাতি বাড়িয়ে দিলো। স্বতন্ত্রভাবে ভোটে দাঁড়িয়েও বিপুল ভোটে জয়ী করে দিলো তারা আপনাকে। কিন্তু তারা এ তথ্য কোনোদিন জানবে না, নামে এই উত্তরার সম্পদ রেজাউল হক স্মরণের থাকলেও আদতে দখল তো ছাড়েননি বিশিষ্ট শিল্পপতি আর রাজনীতিবিদ নাওফিল শেখ।’
কথাগুলো শেষ হতেই নিজেদের ফ্লোরে পৌঁছে গেল ওরা। দীধিতি জবাবের আশায় আর থাকল না, ফিরেও দেখল না নাওফিলের অভিব্যক্তি। বাসার ভেতর এসেই চোখের পানি ছেড়ে দিলো। এই পানি আর কোনোদিনও সে নাওফিলের সামনে ফেলবে না বলেই এতটা সময় আটকে রেখেছিল। যত কষ্টই হোক তার সামনে, নিজের এক বিন্দু অনুভূতি সে প্রকাশ করবে না ওই স্বার্থপর পুরুষের কাছে। চারটা বছর তার থেকে কত দূরে পড়ে রইল সে একা একা। ভুল করেও নাওফিল কখনো ওকে একটাবার ফোন করেনি। অথচ শত অপমান আর আঘাতের পরও সে প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকত একটা ফোনকলের। কিন্তু আসেনি। নাওফিল নিজের মতো করে এগিয়ে গেছে জীবনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সে দেখত, দুর্দান্ত উদ্যোমে স্বার্থপর মানুষটা নিজের স্বপ্নপূরণ করে চলেছে। নিজের পরিবারের সঙ্গে দর্শনীয় কত স্থানে সময় কাটাচ্ছে, বন্ধুদের বিয়েতে অংশ নিচ্ছে, আনন্দ করছে, বিদেশ সফর করছে। আর সেই সময়টাতে শুধু দীধিতিই একা পড়ে থেকেছে দূর দূরান্তের জেলায়।
কেউ ছিল না ওর হাহাকার করা বুকের আর্তনাদ শোনার জন্য। ইয়াসিফ ছিল কেবল ওর স্বপ্ন পূরণে সহায়াতাকারী হিসেবে৷ কিন্তু রাত নামলে ঘুমের আশ্রয়ে যখন বিছানায় শরীরটা ছাড়ত সে, সারাদিনে ভুলে থাকা যন্ত্রণাগ্রস্ত সকল স্মৃতিগুলো তখন ওকে আঁধারে গ্রাস করে নিতে চাইত। বোবাকান্নায় অর্ধেকটা রাত পার হয়ে যেত। কেউ-ই ছিল না ওকে দুটো সান্ত্বনার বাক্য দেওয়ার জন্য অথবা কাঁধে হাত রেখে নীরব বাক্যে ‘পাশে আছি তো’ বলে আশ্বস্ত করার জন্য। গুমরে মরেছে সে প্রত্যহ। আর এখন কিনা ওকে জোরকণ্ঠে স্ত্রী বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে নাওফিল! তথাকথিত আর্দশবান স্বামী অধিকার প্রয়োগ করতে চাইছে! কীসের জন্য এই নতুন নাটক তার? তবে যত যা-ই হয়ে যাক– চার বছর আগেও নিজের দুঃখ নিজেই বয়ে চলে জীবনে এগিয়েছে সে একাই। শত বিষণ্নতার মাঝেও নিজের আত্মসম্মানকে কক্ষনই তুচ্ছ করেনি। আজও করবে না– সে যতই পুরোনো ভালোবাসার তরঙ্গ বাড়ি দিক ওর বুকের দেওয়ালে।
মনকে পূর্বের চেয়েও আরও বেশি দৃঢ় করে নিলো দীধিতি। ঘরে ফিরে নিজেকে তৈরি করে নিতে নিতে বেলা সাড়ে আটটা বেজে গেল। এর মাঝে কিরণের সঙ্গে কথা হলো ওর। কিরণ আসবে সন্ধ্যায়৷ তাওসিফই হল থেকে তার বউকে রিসিভ করে একসঙ্গে এখানে আসবে তারা৷ এবং সঙ্গে অবশ্যই ফিহাও থাকবে বলে ওকে আরও একবার নিশ্চিত করেছে কিরণ৷
নাশতা করতে বসে দীধিতি খেতে খেতেই আনমনে হাসল ব্যঙ্গাত্মক হাসি। ফিহার হঠাৎ আগমনের কারণ এবার স্পষ্ট ওর কাছে। চার বছর আগে ওর সঙ্গে ফিহার আচরণ কখনোই আক্রমণাত্মক ছিল না৷ বরং সব সময় মিষ্টি ননদের চরিত্রে দারুণ অভিনয় করে গেছে চতুর মেয়েটা। তার স্বরূপ দেখল তো সেদিন দীধিতি, যেদিন জাকির শেখের বিরুদ্ধে সমর্পণ করা ওর সকল প্রমণাদি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হলো। আর তারপর ও ট্রেনিং থাকাকালীন ইয়াসিফই একদিন অপরাধী গলায় ওকে জানাল, খুশি বেগমের করা অন্যায়ের সঙ্গে ফিহাও সমানভাবে জড়িত ছিল।
কিন্তু খুশি বেগম তার অন্যায়ের শাস্তি পেলেও ফিহাকে কোনোরূপ দণ্ড দেওয়া হয়নি। এমনকি নাওফিলও সেদিন টু শব্দ উচ্চারণ করেনি ফিহার ব্যাপারে। তবে ইয়াসিফের ভাষ্যমতে ফিহার শাস্তি হয়েছিল। বোনকে তারা শাস্তিস্বরূপ বিদেশ পাঠিয়ে দিয়েছিল অনির্দিষ্টকালের জন্য৷ পরিবার ছাড়া দিনের পর দিন থাকায় না-কি ফিহার জন্য কঠিন শাস্তি। কারণ, সে বিদেশ যাপন করতে চায়নি কখনোই। দীধিতি তখন ভীষণ হেসেছিল। হাসতে হাসতেই ইয়াসিফকে বলেছিল, ‘মিসেস খুশি তাহলে কেন বঞ্চিত হলো ভাই, অ্যাব্রোডে লাক্সারিয়াস লাইফ লিড থেকে? ও বেচারি নাওফিল শেখের আপন মা নয় বলে? আহারে!’
দীধিতির তীব্র কটাক্ষটা ইয়াসিফ ভালোই টের পায়। আর উপলব্ধিও করে বিষয়টা। আসলেই তো, ফিহা বিদেশ থাকলেও তাকে তো মাস শেষে বিশাল অঙ্কের টাকা পাঠানো হচ্ছে বিলাসপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য। তাহলে একা থাকলেই বা কীসের কষ্ট ভোগ করছে সে? বরঞ্চ খুশি হওয়ার কথা যে, স্বাধীনভাবে চলতে ফিরতে পারছে সে, যা খুশি তাই করতে পারছে। জবাবে দীধিতিকে তখন কিছু না বললেও ইয়াসিফ কিন্তু যা করণীয় ছিল তার, তা করতে এক মুহূর্ত ভাবেনি। গাজীপুর ফিরেই বাবা আর দাদাকে সাফসাফ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিল, ‘এক পয়সা কেউ ফিহাকে দেবেন না আপনারা। মন্ত্রীর নাতনি হোক আর যা-ই হোক ও, নিজের ভরনপোষণ ওকে নিজেরই বহন করতে হবে। অড জব করেই নিজের থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করে নেবে ও।’ জবাবে মাহতাব শেখ চুপ থাকলেও তার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন জাহিদ সাহেব। তাতে ইয়াসিফ আরও ভয়ঙ্কর জেদি গলায় বলেছিল, ‘আমি তাহলে এই বাড়ি ত্যাগ করব৷ চুরি করেও যদি ওকে কেউ টাকা পাঠায়, তার সঙ্গে আমি বিনা বাক্যে সম্পর্কও ত্যাগ করব। এবং অবশ্যই আমি এ ব্যাপারে খোঁজ রাখব।’
মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল তাইন মাহতাব শেখ। তিনি তো মূলত ফিহাকে শাস্তির নামে বিদেশ পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন নাওফিলের আক্রোশ আর ক্রোধ থেকে বাঁচানোর জন্য। ফিহা আর খুশির কর্মকাণ্ডে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষিপ্ত আচরণ দেখালেও আদপে সন্তুষ্টই হয়েছিলেন৷ দীধিতিকে তো তিনি শুরু থেকেই গ্রহণ করেননি। কোনো এক সময় ওকে নাওফিলের জীবন থেকে বের করতেনই। এমন প্রতিজ্ঞা মনে মনেই করে রেখেছিলেন তিনি আর তার স্ত্রী জান্নাতি বেগম। আর খুশি বেগম তো ছিলেন সৎ ছেলের স্ত্রী। সেই নারী তার আদরের নাতির ক্ষতি করে এসেছে চিরটাকাল৷ তাই তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে কার্পণ্য করেননি একদম। ওদিকে দীধিতির ক্ষতিসাধনের জন্য ফিহা যা করেছিল, তাতে তার কোনো আপত্তি না থাকলেও তার শান্ত আর ধীর স্বভাবের নাতির শীতল চোখে ফিহার জন্য ভয়ানক ক্রোধ দেখতে পেয়েছিলেন। দীধিতিকে হারানোর শোক কোনোরকমে সামলে নিলেও নাওফিল যে পুনরায় জ্বলে উঠছিল ফিহার দুঃসাহস দেখে, তা বাড়ির সকলের নজরেই পড়েছিল। তাই যত দ্রুত সম্ভব মাহতাব শেখ ফিহাকে স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডা পাঠিয়ে দেন। তখন চাইলেও আর নাওফিল কিছু করতে পারেনি ফিহাকে। আর কিছু করতে পারেনি বিধায়ই ক্ষোভটা জমা হয় ওর তাওসিফ, ইয়াসিফের প্রতি৷ মারিহামের বিষয়টা থেকেও বেশি রাগ চেপে যায় নাওফিলের এ কারণেই। কেননা, সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে তো ফিহাকে শাস্তি পাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে ওরা।
কাটায় কাটায় যখন ঠিক ন’টা, নাওফিলের থেকে তখনই কল পেয়েছে দীধিতি৷ পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করে তাই দাঁড়িয়ে এখন সে। দরজাটা খুলতে একদম সময় লাগল না। সেলোয়ার কামিজ পরিহিত একটি মেয়ে হাসি মুখে ওকে ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। যতটা বিরক্ত আর ক্ষোভ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দীধিতি, মেয়েটিকে দেখার পর এক লহমায় সেসব দূর হয়ে একরাশ বিস্ময় খেলে গেল ওর মনে। ‘হু আর ইউ?’, ভ্রু কুঁচকে ফেলে অজান্তেই মালিকানাসূচক কণ্ঠে প্রশ্ন করে বসল।
-‘আমি মিথিলা হাসান। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। স্যার তো বেডরুমে। আমি ড্রয়িংরুমে ছিলাম, তাই আমিই ডোর ওপেন করলাম। ভেতরে আসুন প্লিজ।’
খটকা নিয়েই দীধিতি ঘরে এলো। মিথিলার সঙ্গে ড্রয়িংরুমে এসে জিজ্ঞেস করল তাকে, ‘আপনার সহকারীরা কোথায়? আপনি একাই না-কি?’
-‘হ্যাঁ, ইনডোর প্লান্টের বিষয়ে কথা বলার জন্য স্যার ডেকেছিলেন।’ সহাস্যেই বলল মিথিলা
-‘এত সকালে?’ সন্দিগ্ধ গলা দীধিতির।
-‘আসলে স্যারের আজ সারাদিনে এই সময়টুকুতেই নাকি কথা বলার মতো সময় আছে। তাই সকালবেলাতেই চলে আসা।’ হাসি মুখ করেই বলে গেল মিথিলা। তাকে এত বেশি হাসতে দেখে ভেতরে ভেতরে বিরক্তই হলো দীধিতি। জিজ্ঞেস করল, ‘কথা হয়েছে স্যারের সঙ্গে?’
-‘হ্যাঁ। আপনি উপরে যান, ম্যাডাম৷ স্যার ওনার ঘরে আছেন।’
-‘আর আপনি?’
-‘স্যার নিচে এলে আমি বিদায় নেব। তাই অপেক্ষা করছি।’
-‘বুঝলাম না ঠিক। আপনি না বললেন স্যারের সঙ্গে কথা শেষ?’
হাসি মুখটাতে মিথিলার বিব্রতভাব দেখা গেল এ মুহূর্তে। তার মুখপানে তখন দীধিতির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আটকে আছে। সে দৃষ্টি দেখে কেমন ঘাবড়েও গেল মনে হয় মিথিলা। জবাব দেওয়ার জন্য কথা সাজিয়ে নিয়ে মুখ খোলার পূর্বেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নাওফিল। ‘তুমি তো দেখি এসে গেছ, স্মরণ। দারুণ পানচুয়ালিটি। ভালো লাগল।’
-‘থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার।’ মুখে কৃত্রিম হাসি টানল দীধিতি।
নাওফিল এগিয়ে এলে মিথিলা বলল, ‘আমি এখন তাহলে আসি, স্যার।’
-‘আরে স্যার ফার বলা বন্ধ করুন তো, ভাবি৷ ভাই ডাকতে না পারলে কিছুই সম্বোধনের দরকার নেই।’
লাজুক হেসে মিথিলা দীধিতির দিকে একবার তাকিয়ে সরস গলায় বলল, ‘আসলে আপনাকে তো প্রথম থেকেই স্যার বলে আসছি৷ ভাইয়া ডাকতে তাই আনইজি লাগে।’
-‘তাহলে যতদিন আনইজি লাগবে, ততদিন তুষারকেও বলবেন আমাকে যেন স্যার ডাকে।’
হা হা শব্দে হেসে ফেলল মিথিলা। বরাবরই সে বেশি হাসে। তার হাসিটাও চমৎকার অবশ্য। নাওফিল তার হাসিতে তাল না মেলালেও আন্তরিকতার সঙ্গে তার পরিচয় দিলো দীধিতিকে, ‘স্মরণ, উনি হচ্ছে তুষারের ওয়াইফ। ওনার আরেকটি পরিচয় হলো, একজন ফ্যান্টাসটিক ইন্টেরিয়র ডিজাইনার।’
-‘ও আচ্ছা’, অপ্রস্তুত হেসে দীধিতি বলল, ‘দ্বিতীয় পরিচয়টা দিয়েছেন আপু। ভালো লেগেছে আপুর সঙ্গে পরিচিত হয়ে।’
-‘তুমি আবার আপু বলছ কেন? আমি তো ভাবি ডাকি, শোনোনি?’
-‘আমি কেন ভাবি ডাকব, স্যার? উনি তো আপনার ফ্রেন্ডের ওয়াইফ। আমার ফ্রেন্ডের না।’ কপট মুচকি হাসিটা ঠোঁটে ধরেই বলল দীধিতি। নাওফিল স্থির চোখে ওর দিকে তাকালে মিথিলা পরিস্থিতি বুঝে নাওফিলের পক্ষ ধরেই বলে উঠল, ‘ভাবি, আমি কিন্তু আপনাকে দেখার জন্যই বসেছিলাম। মাশা আল্লাহ, আমি তো চোখই ফেরাতি পারছিলাম না। ভীষণ সুন্দর আপনি৷ আমার যে কী ভালো লাগছে আপনাকে দেখে!’
দীধিতি ঠিকঠাক প্রতিক্রিয়া দিতে পারল না তার কথায়। মিথিলা সে সুযোগ দিলোও না ওকে। নাওফিলকে বলল সে, ‘খুব তাড়াতাড়ি আপনাদের দুজনকে ইনভাইট করব, ভাইয়া। প্লিজ সেদিন ব্যস্ততার অজুহাত দেবেন না। ভাবিকে নিয়ে অবশ্যই আসতে হবে।’
-‘ইনশা আল্লাহ’, দীধিতির দিকে স্থির চাউনি ফেলেই জবাব দিলো নাওফিল, ‘চেষ্টা থাকবে অবশ্যই।’
-‘আসি তাহলে, ভাবি। দেখা হবে আবার ইনশা আল্লাহ।’
বুঝতে পারছে না দীধিতি, প্রতিবাদ জানাবে না-কি ভদ্রতা বজায় রাখতে চুপচাপই থাকবে। কিন্তু চঞ্চলা মিথিলা এবারও ওর প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষা না করে নাওফিলের থেকেও বিদায় নিলো সে, ‘আসি ভাইয়া। কোনো দরকার হলে কল দিয়েন।’
-‘নিশ্চয়৷ আমি ড্রাইভারকে বলে দিয়েছি, ভাবি৷ পৌঁছে দেবে আপনাকে।’
-‘এর কোনো দরকার ছিল না।’ বিনয়ী হাসল মিথিলা।
-‘অবশ্যই ছিল। আমার বেসফ্রেন্ডের আমানত আপনি।’
দরজা অবধি নাওফিল এগিয়ে দিয়ে এলো মিথিলাকে। দীধিতি একই জায়গাতে কঠিন অভিব্যক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে তখন। ফিরে এসে ওকে আদেশ গলায় বলল নাওফিল, ‘ঘরে আসুন, স্মরণ।’
আচমকা আপনি সম্বোধনে কিছুটা অবাক হলেও দীধিতি রাগ আর বিরক্ত প্রকাশে বিলম্ব করল না, ‘আপনি কি বারবার ভুলে যান, আমি আপনার এক্স ওয়াইফ? ডিভোর্স হয়েছে আমাদের।’
-‘হয়েছে না-কি?’ গা-ছাড়া ভাবে প্রশ্নটা করল নাওফিল।
-‘ফাজলামি বন্ধ করুন আপনি।’ মুহূর্তেই ধমকে উঠল দীধিতি।
শীতল দৃষ্টিতে নাওফিল ওর মুখপানে তাকিয়ে থেকে রাশভারী গলায় বলল, ‘এই মুহূর্ত থেকে আপনি আমার গানম্যানের ভূমিকায় আসবেন। আপনার সামনে এখন ইন্ড্রাস্টিয়ালিস্ট অ্যান্ড স্টেট মিনিস্টার নাওফিল শেখ দাঁড়িয়ে। অলরাইট?’
আকস্মিক থমকে গেল দীধিতি। নাওফিলের ঠান্ডা স্বরের আদশেসূচক বাক্য ওকে কী পরিমাণ অপমানিত করল, কতটা রাগিয়ে দিলো, তা প্রকাশের সাহসটা আর হলো না ওর। শুধু অনুগত ভৃত্যের মতো মাথা নাড়িয়ে মৃদুস্বরে ‘ইয়েস, স্যার’ বলে কঠোর দৃষ্টি নত করে নিলো।
-‘ওয়েল, গাড়িতে অলরেডি আমার আরেকজন গানম্যান ওয়েট করছে। আপনি রেডি হয়ে সেখানে চলে যান।’
-‘আই অ্যাম ফুললি প্রিপেয়ারড, স্যার।’
-‘আসলেই?’ কয়েক ঘণ্টা আগের মতোই দীধিতিকে আগাপাছতলা মেপে নিয়ে নাওফিল নির্বিকারভাবে বলল, ‘আপনি সাদা পোশাকে থাকলেও আপনার ফরমাল ড্রেস আপ, গান হোলস্টার, এগুলো খুব সহজেই যে কাউকে বুঝিয়ে দেবে আপনি আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। আর আমি চাই না, আমার দুজন গানম্যানকে খুব সহজেই কেউ চিহ্নিত করে ফেলুক। বোঝাতে পেরেছি? আপনাকে পনেরো মিনিট সময় দেওয়া হলো রেডি হওয়ার জন্য।’ বলেই গটগটিয়ে নাওফিল ওপরে চলে গেল, দীধিতিকে স্তব্ধী-ভূত বানিয়ে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নাওফিলের আচমকা পরিবর্তন হজম করতে ওর সময় লাগছে আরকি। কখনো ওর সঙ্গে নাওফিল এরকম ফরমালি, সোজাসাপটা হুকুম স্বরে কথা বলতে পারে, এমনটা ভাবনার বাইরে ছিল কিনা! মুক হয়েই সে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল আগে। ধূসর রঙের ফরমাল প্যান্টের সঙ্গে সাদা শার্ট ইন করে কোমরে গান হোলস্টার রাখা ওর।
আর সোনালী, কালো মিশেলে চুলগুলো উঁচু করে পনিটেল। পুরোদস্তুর এই অফিস সাজটাতে কেবল গান হোলস্টারটা বাদ দিলেই যথেষ্ট ছিল৷ অথচ না-কি পুরো পোশাকই পরিবর্তন করতে হবে আবার! রীতিমতো ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল দীধিতি। কারণ, ওর বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না নাওফিল তখনের মতোই ওর ওয়েস্টার্ন সজ্জা সহ্য করতে পারছে না এবং সেই সাথে চাইছে না– বাইরে ও এই সজ্জায় বের হোক। কিন্তু তা মেনে নিলে নাওফিল ধরেই নেবে, সে আজও তার চাওয়া তার পছন্দকেই প্রাধান্য দেয়। কিন্তু সেটা পুরোপুরিই মিথ্যা। দীধিতি নিজের মর্জির মালিক। নিজের রুচি, নিজের পছন্দই ওর একমাত্র পছন্দ সেখানে। তাই কোনো কথায় আসে না নাওফিলের কথা মতো পোশাক পরিবর্তন করার। আবার পরিবর্তন না করলেও যে বেয়াদব লোকটা কথার প্যাঁচে ফেলে বাধ্য করবেই ওকে। তাই ভাবনাচিন্তা করে দীধিতি গলায় কালো রঙের একটা স্কার্ফ বেঁধে ফরমাল প্যান্টটা পরিবর্তন করে খাকি রঙের ওভেন প্যান্ট পরে নিলো। আর গান হোলস্টারের পরিবর্তে গানটা নিলো নিজের হ্যান্ডব্যাগেই। এরপরও নাওফিল ক্ষিপ্ত হবে জানে সে। কিন্তু তার রাগ বা ক্ষিপ্ততা ও গায়েই নেবে না।
নাওফিলের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে দীধিতি তাকে কল করলে নাওফিল দ্রুত এসেই দরজাটা খুলে দিলো। কিন্তু ওকে নিশ্চুপে কয়েক পল আপাদমস্তক দেখে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল শুধু। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল, ‘দাঁড়ান এখানেই৷ আসছি আমি।’ ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেই সে ভেতরে চলে গেল৷ ঠোঁটের এক পাশ কামড়ে, কপাল কুঁচকে দীধিতি ওর যাওয়ার পানে চেয়ে রইল তখন। ভাবতে থাকল, শয়তানটা কিছুই বলল না কেন ওকে? আবার ঘরেই বা ফিরে গেল কী কারণে? জবাবটা পেলো দীধিতি গাড়িতে ওঠার পর।
নাওফিলের সরকারি গাড়িটাতে তার দ্বিতীয় গানম্যান আর ব্যক্তিগত সহকারী প্রথমে বের হলো মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্যে। ওই গাড়িতে ইচ্ছাকৃতই গেল না নাওফিল। এমনকি দীধিতিকেও যেতে দিলো না৷ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা এক দপ্তর থেকে নেওয়া জিপ গাড়িতে চেপে বের হলো সে দীধিতিকে নিয়ে। তার গাড়ির পেছনে আরেকটি গাড়িতে রওনা হলো পুলিশ ফোর্স।
-‘রাজন, তোমার পূর্ণ মনোযোগ কেবল সামনে থাকবে, ও.কে?’ ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে ভরাট কন্ঠে আদেশ করল নাওফিল।
-‘ও.কে, স্যার।’
নাওফিলের পাশে দীধিতি ভার মুখ করে বসে আছে। ভেতরে ভেতরে সে অসহনীয় রাগে ফেটে পড়ছে। নাওফিল তা নীরবে খুব উপভোগ করছে। তখন সে ঘরে ফিরে গিয়েছিল তার ক্যাবিনেট থেকে দীধিতির হিজাব নিয়ে আসার জন্য৷ চার বছর আগে দীধিতি শেখ বাড়িতে ওর সমস্ত কিছুই ফেলে গিয়েছিল৷ তা নাওফিল এতকাল যত্নের সঙ্গে নিজের কাছেই রেখেছে গুছিয়ে।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৭
দীধিতিকে নিয়ে যখন সে জিপে ওঠে, রাজন নামের ছেলেটিকে তখন জিপ থেকে নেমে যেতে বলে কিছুক্ষণের জন্য। তারপর দীধিতিকে নিয়ে জিপের ভেতর এসেই ওকে হিজাবটা ধরিয়ে দিয়ে প্রচণ্ড কর্কশ সুরে বলল, ‘ওয়্যার হিজাব কুইকলি। আমার গানম্যানের পুডেন্ট পোর্শনে আমার চোখ বিঁধছে ঘনঘন। সো আই ফিল সামথিং এলস্। যেটা ফিল করা এই মুহূর্তে আমার জন্য সমস্যা।’
