Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭১
ইসরাত জাহান দ্যুতি

রাত সাড়ে এগারোটা। ফ্রেশ হয়ে জাকির সাহেবের সাথে কথা শেষ করে বিশ্রাম নেওয়ার বদলে নাওফিল নিচে নেমে এলো৷ উদ্দেশ্য চুপিচুপি দীধিতির বাসায় ঢুকবে আবারও। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মনে পড়ল, আজ সন্ধ্যায় অফিস থাকাকালীন বউয়ের জন্য একটি বিশেষ উপহার অনলাইন থেকে কিনেছিল সে। ওটার কথা মনে পড়তেই সোফাতে দৃষ্টি ফেলল। তখন দীধিতির সাথে কথার ফাঁকে প্যাকেটটা ওখানে ফেলে রেখেছিল। ফিরে এসে সেটা তুলে নিতেই কলিংবেল বেজে উঠল হঠাৎ। দরজার কাছে এগিয়ে এসে পিপহোলে দেখতে পেলো তাওসিফকে৷ এমন সময় তাকে দেখে একটু চিন্তার রেশ দেখা গেল ওর চোখে৷ দরজাটা খুলতেই বড়ো এক চমকও পেলো। তাওসিফের পিছে ফিহা দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য কথাটা দাঁড়িয়ে না বলে লুকিয়ে আছে বললেই সঠিক লাগবে। নাওফিলের সামনে তার দাঁড়াতে যতখানি ভয়, ততখানিই আবার আগ্রহও। সাহস আর ভয় একত্রে নিয়েই সে এসেছে নাওফিলের দোরগোড়ায়।

-‘এত রাতে আমার কাছে কী তোদের?’ জলদগম্ভীর মুখে বলে উঠল নাওফিল, তাওসিফের উদ্দেশ্যে।
-‘আমাদের দেওয়ার মতো কিছু আছে তোর কাছে?’ বলতে বলতে তাওসিফ নাওফিলকে ধাক্কা মেরে বেপরোয়া গতিতে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
সেই মুহূর্তে কেবল ফিহা ঘাবড়ানো মুখভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নাওফিলের সামনে। ওর চোখে ভীতসন্ত্রস্ত চাউনিতে চেয়ে মৃদৃস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছো, ভাইয়া?’ কিন্তু পুরো কথা শোনার আগেই নাওফিল তাকে অবহেলায় ফেলে রেখে ভেতরে ফিরে এলো৷ তা দেখে তাওসিফ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গলা উঁচু করে ফিহাকে বলল, ‘তোর ভাবির কাছে গিয়ে রেস্ট কর। এখানে তোর কোনো কাজ নেই।’
এরপর ফিহা ফিরে গেল কি গেল না, তা ভ্রুক্ষেপ করল না ওরা দুজন। গা ছেড়ে সোফায় বসে চোখদুটো বুজে তাওসিফ আদেশ গলায় বলল নাওফিলকে, ‘এসির রিমোটটা দে তো, জাদ।’

বড়ো ভাইয়ের আদেশ মান্য তো দূর, নাওফিল তাকেও অবহেলা করে হনহনিয়ে উপরে চলে এলো৷ ওর কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে তাওসিফ যখন চোখ মেলল, নাওফিল তখন ঘরের সামনে৷ উপরে তাকিয়ে তা দেখতে পেয়ে তাওসিফ বিড়বিড়িয়ে ভাইকে গালি ছুঁড়ে উঠে এলো সিঁড়ি বেয়ে। ঘরে ঢুকে দেখল, নাওফিল হাতের প্যাকেটটা ক্যাবিনেটে তুলে রাখছে৷ ওটা কী ছিল তা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করতে এসে তাওসিফের নজরে বিঁধল দারুণ চমকপ্রদ এক জিনিস। খপ করে নাওফিলের গোল গলার টি-শার্টটার কাঁধ টেনে ধরে গলার বাঁ পাশে ইশারা করল, ‘কীরে! তোর এখানে কামড়ের দাগ কীভাবে এলো? রক্তও জমে গেছে দেখছি।’
উত্তরের বদলে মেজাজের সঙ্গে নাওফিল টি-শার্ট ছাড়িয়ে নিলো তাওসিফের থেকে। তাতে অবশ্য মুখভঙ্গি বদলালো না তার৷ উপরন্তু রগড় করে বলল, ‘এই-ই হয় ভিআইপিদের চরিত্রের ছিরিছাঁদ। শেষ পর্যন্ত গানম্যানের সঙ্গে ঘষাঘষি করতে গেলি, জাদ? দাদা তো তাহলে ঠিকই বুঝেছে রে। স্ত্রী পরিত্যক্ত নাতির হাহাকার দাদাই শুনতে পেয়েছে। তাই তো এত অসুস্থতা নিয়েও নাতির বউ খুঁজতে দেরি করেনি।’

-‘কী?’ চমকেই উঠল যেন নাওফিল। ওর সে অভিব্যক্তি দেখে এবার শোধ নিতে তাওসিফ ওকে অবহেলা করে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। পেছন থেকে নাওফিল চেঁচিয়ে বলল সে সময়, ‘লাত্থি মেরে বসব, যদি পুরো কথা না বলিস।’ কথাটা শুনতেই তাওসিফ তেড়ে এসে ওর মুখ চেপে ধরে ধমকে উঠল, ‘কী বললি আমাকে? বড়ো ভাইকে লাথি মারবি? পা’টা তোল তো। তোল, কত লম্বা হলো দেখি বড়ো ভাইকে লাথি মারার জন্য।’
মৃদু এক ধাক্কায় নাওফিল তাওসিফকে সরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল পুনরায়, ‘কী ঘটছে বাড়িতে? ক্লিয়ার করে বল জলদি।’

-‘তার আগে পা ধরে মাফ চা আমার।’ নিজের পা ইশারা করে ধমক সুরে আদেশ দিলো তাওসিফ। নাওফিল তখন একবার তার পায়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ জুতোর ক্যাবিনেট থেকে একটি। বক্স আনপ্যাক করে এক জোড়া বিজনেস ফরমাল জুতো বের করল আনল। তাওসিফের পায়ের কাছে রেখে বলল, ‘পরে দ্যাখ তো।’
বিনা বাক্যে তাওসিফ জুতোর ভেতর পা ঢোকাতে ঢোকাতে জিজ্ঞেস করল, ‘কবে এনেছিস?’
-‘ইউএস থেকে ফিরলাম যেদিন।’
-‘ওহ, তাহলে গত মাসে? আর দিচ্ছিস আজকে? তো দেওয়ার দরকার কী ছিল? শো পিসের সঙ্গে সাজিয়ে রাখতি।’

-‘দেওয়ার মতো সুযোগ আর সময় পেয়েছি এতদিনে?’ বিরক্তি নিয়ে বলল নাওফিল। ‘পায়ে ঠিক আছে, না?’
-‘হুঁ। আজকে যদি ঘরে না আসতাম, তাহলে আগামী এক মাসেও পেতাম না মনে হয়।’
-‘না, পেতি না৷ রুমানকে দিয়ে দিতাম।’ বক্রোক্তিটা করে তাওসিফের ব্যবহৃত জুতোটা বক্সের ভেতর ভরে দিলো নাওফিল৷ তারপর জিজ্ঞেস করল তৃতীয়বারের মতো, ‘দাদা কী করছে? সত্যি করে বল।’
-‘তার আগে বল গলায় ওরকম ভয়াবহ কামড় খেলি কীভাবে? মলেস্ট করেছিলি ওকে, তাই না?’ বলেই হো হো শব্দে হাসল তাওসিফ। ‘পাঞ্চ টাঞ্চ দেয়নি তো আবার? না-কি খালি কামড়ই দিয়েছে?’
ভার মুখ করে সরু চোখে ভাইয়ের দিকে কতক পল তাকিয়ে থাকল নাওফিল৷ তাওসিফের হাসি থামল না তবু৷ সে আবারও জানতে চাইলো, ‘আরে বলিস না কেন? মারধোর খেয়েছিস?’
প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে নাওফিল টি-শার্টটা খুলে উন্মুক্ত বুক ইশারা করল ভাইকে। দুঃখ গলায় তাকে বলল, ‘দ্যাখ দ্যাখ, এগুলো দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না মানুষ কখনো কোনো মানুষকে এমন নৃশংসভাবে কামড়াতে পারে। কিন্তু আমার বউ পেরেছে। এতগুলো মাস বউ ছাড়া কীভাবে থেকেছি তা তো বলতেই দিলো না৷ আজকে আর ধৈর্য মানেনি বলে এইভাবে জখম হতে হলো।’

-‘লাথি, ঘুষি যে খাসনি সেটার জন্য শুকরিয়া কর, ছাগল। ওর বদলে আর কেউ হলে তোকে সম্মানের ধার ধারত?’
-‘লাথি, ঘুষি দেয়নি বলে যে থাপ্পড়ও দিতে চায়নি, তা কে বলল তোকে? হাজবেন্ড, স্টেট মিনিস্টার, আমার কোনো টাইটেলকেই রেসপেক্ট করে না ও।’
-‘ওটাই নরমাল। বরং এত কিছুর পরও রেসপেক্ট যদি দেখাত, সেটা হত অ্যাবনরমালিটিতি।’
-‘হুঁ’, হতাশাপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল নাওফিল। ‘চল ওর ঘরে।’
দীধিতির বাসার উদ্দেশ্য বের হলো ওরা। যেতে যেতে মাহতাব সাহেবেন কর্মকাণ্ড অবগত করল নাওফিলকে। নাওফিলের বিয়ের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাতিজিকে নাকি পছন্দ করেছেন তিনি। শেখ বাড়িতে এ মাসেই বিশেষ একটি দিন উপলক্ষে পার্টির আয়োজন হবে৷ তখনই মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় করানো হবে নাওফিলকে৷ এ খবরটা এখনো ভেতরের খবর৷ তাওসিফ আজই জেনেছে সেটা৷ মাহতাব সাহেবের নিকটবর্তী এক সহকারী খবরটা প্রদান করেছে তাওসিফকে। যাকে মোটা অঙ্ক দিয়ে হাত করেছে সে।
দীধিতির ঘরের দরজাতেই দাঁড়িয়ে ওরা এখনো৷ কথা শেষ হয়নি দু ভাইয়ের৷ নাওফিল জিজ্ঞেস করল, ‘নিহাদকে জানিয়েছিস?’

-‘কীভাবে জানাব? ও কি বাড়িতে গেছে? ঢাকাতেও নেই। চট্টগ্রাম আছে কী এক জরুরি কাজে। আর ফোনকলে তো এসব বিষয় শর্টকার্ট বলা যায় না৷’
-‘দরকারও নেই। ফোনে আমাকে নিয়ে এ ধরনের কথাবার্তা বলবিই না তোরা৷ তোদের কথাতে শুধু এটাই পরিষ্কার হবে, আমার সঙ্গে এখনো তোদের বিবাদ আগের মতোই আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে। মাহতাব শেখ আজীবনই স্বার্থপর। নিজের বাপ আর বড়ো ভাই তার হাত থেকে নিস্তার পায়নি৷ সেখানে তো তোরা নাতি।’

-‘অথচ দাদা-দাদি, নানা-নানিদের কাছে নাকি আসলের চেয়ে সুদের টান বেশি হয়।’ কথাটা বলতে গিয়ে তাওসিফের গলাটা ধরে এলো হঠাৎ৷ তাকে দেওয়ার মতো সান্ত্বনার ভাষা নেই নাওফিলের কাছে৷ মাহতাব সাহেব আপন আর সৎ ছেলেদের মাঝে বৈষম্য করলেও নাতিদের মাঝেও যে একই কাজ করতে পারেন, তা নাওফিল বা তাওসিফ, ইয়াসিফ, কারোরই কল্পনাতে ছিল না। যবে থেকে এই মর্মান্তিক সত্যিটা প্রকাশ পেলো ওদের তিন ভাইয়ের কাছে, তবে থেকেই ওদের তিন ভাইয়ের সম্পর্কের মাঝেও পরিবর্তন ঘটে গেল। বলা ভালো, ঘটাতে বাধ্য হলো তিন ভাই। তিন ভাই একে অপরকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার পরও আজ ওরা নিজেদের মাঝে শত্রুদের মতো আচরণ করতে বাধ্য। এর পেছনে যে কারণটি দায়ী, আপাতদৃষ্টিতে তা হয়ত সাধারণ লাগলেও কারণটির ভেতরের গল্পটা তিন ভাইয়ের কাছে গভীর।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭০

যে দাদার প্রতি এতগুলো বছর অসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছিল ওদের, তাতে আজ মরিচা পড়তে শুরু করেছে৷ ইয়াসিফ আগাগোড়াই অনেক শক্ত আর নিষ্ঠুর গোছের পুরুষ। কিন্তু সে তুলনায় তাওসিফ বেশ কোমল মনের। তাই তো দাদার দেওয়া আঘাতের কথা ভাবতে বসলে ইয়াসিফ যতটা কঠিন বনে যায়, তাওসিফ ততটাই নিদারুণ কষ্ট অনুভব করে। আর নাওফিল! সে বাহ্যিক দিক থেকে সব সময়ের মতোই শীতল। কিন্তু মনের ভেতরটাতে কী আছে, আদৌ কিছু আছে কি-না, তা বোঝা মুশকিল।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here