Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৭

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৭

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৭
তোনিমা খান

রাত যত গভীর হচ্ছিল ঝড়ের বেগ ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সাথে বিন্দুর জ্বর আর অনুভূতিরাও সীমা ছাড়িয়ে যায়। ওষুধ খাওয়ানোর পরেও মাত্রারিক্ত জ্বরের কারণে সেই রাতেই বাধ্য ডক্টর আনালো তালহার।
ঘড়িতে তখন ভোর চারটা। ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দিয়ে দিল বেহুঁশ প্রায় বিন্দুকে। খানিক অসন্তোষের সাথেই বলল,

“খাওয়া-দাওয়া একদম না করতে পারলে সকালে স্যালাইনটা লাগিয়ে দেবেন। অনেকদিন যাবৎ জ্বর। শরীর অস্বাভাবিক দূর্বল। এভাবে ঘরোয়া চিকিৎসা করা উচিত হয়নি। আগামীকাল ব্লাড টেস্টটা করিয়ে নেবেন। সাথে আরো কিছু টেস্ট দিয়েছি সেগুলোও করিয়ে নেবেন।”
ডক্টর প্রেসক্রিপশনটা তালহারের হাতে দিল। সেদিকে এক পলক চোখ বুলাতেই তালহারের ভ্রুযুগলে ভাঁজ পড়ল। সেখানে প্রেগনেন্সি টেস্ট ও রয়েছে। যেটা অসম্ভব, অপ্রয়োজনীয়! সে নির্বিকার আবার মনোযোগ দিল ডক্টরের দিকে। ডক্টর ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়াল। বলল,
“তাড়াতাড়ি করে পুরো গা মুছিয়ে দেবেন আর মাথায় পানি দেবেন।”
তালহার নীরবে মাথা নেড়ে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। তার পরনে তখন একটা ওভার সাইজ টিশার্ট আর ট্রাউজার। যেগুলো কিছুক্ষণ আগে কবির এনেছে। বাইরের ঘরে বসা কবির চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এদিক ওদিক পর্যবেক্ষণ করছিল। স্যারের রাগের প্রকোপ থেকে বাঁচতে সে এই ঝড়ের রাতে খুব সানন্দেই এসে হাজির হয়েছে‌।
তালহার বের হয়ে বলল,

“ওনাকে ঠিকমতো পৌঁছে দিয়ে আসো।”
কবির ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
“ওকে স্যার।”
ডক্টর নাকচ করে বলল,
“কোনো প্রয়োজন নেই, মিঃ তালহার। আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি।”
“আচ্ছা, তবে নিচ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসো।”
কবির তাই করল। যখন আবার ফিরল তখন তালহার সদর দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে‌। কবির বেশ বিচক্ষণ ভঙ্গিতে বলল,
“স্যার, ম্যাডামের জন্য এই ঘরটা ভালো না। যদি কখনো বিপদ হয় তবে বের হওয়ার দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই।”
তালহার বুকে হাত গুঁজে শান্ত স্বরে বলল,

“তোমাকে ঘাস কাটতে রেখেছি আমি?”
কবিরের বিচক্ষণ মুখটা এক নিমিষেই চুপসে গেল।
“না মানে স্যার, আমি তো আছিই। কিন্তু তবুও…বাই এনি চান্স।”
তালহার সায় জানালো।
“ঠিক বলেছো।”
কবিরের মুখে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সেই হাসিটা হারিয়ে গেল তালহারের পরবর্তী কথায়।
“তুমি যেই গর্ধব! দেখা যাবে কেউ তোমার সামনে থেকে বিন্দুর ক্ষতি করে গেলেও তুমি টের পাবেনা। আমার আরো সতর্ক থাকা উচিত।”
কবির পাণ্ডুর মুখে বলল,
“আপনি একটু বেশিই আমায় ছোট করে দেখছেন স্যার।”
তালহার চোয়াল শক্ত করে বলল,
“বাধ্য করছ। আগের মতো তোমার কাজের পার্ফমেন্স আর নেই। আমার ই ভুল। আমায় অন্য কাউকে এই দায়িত্ব দেয়া উচিত ছিল।”

কবির ভীষণ আশাহত হলো। আজ কত বছর হলো সে স্যারের স্পাই হিসেবে কাজ করছে। সে বলল,
“আপনি এমনটা বলতে পারলেন স্যার? আমি আজ কত বছর ধরে আপনার সব কাজ নিখুঁতভাবে করছি?”
তালহারের চোখেমুখে অসন্তোষ। এটা সত্যি। কবির তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর চতুর একজন সহায়ক। কিন্তু হয়তো আজ কাজটাই এমন যে সে নিজেকে ব্যতীত আর কারোর উপর বিশ্বাস করতে পারছে না। সে গভীর এক নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“এখন যেতে পারো। আর যা যা বলেছি তা যেন সব ঠিকঠাক ভাবে হয় আগামীকাল।”
“ওকে স্যার।”
কবির চলে গেল। তালহার দরজা আঁটকে রুমে ফিরল। বালতিতে পানি আর গামছা নিয়ে মেয়েটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। বিন্দু নিভু নিভু চোখ মেলে তাকালো। শক্ত কণ্ঠে বলল,
“গা মোছাতে হবে না। ডক্টর বলেছে বলেই করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ডক্টর তো আর জানে না আমাদের সম্পর্কটা ঠিক কেমন।”
তালহারের স্বভাবসুলভ গম্ভীর মুখে প্রহসনের রেশ দেখা গেল। সে গামছা নিঙরে নিতে নিতে ভ্রু টানটান করে বলল,

“ঠিক বলেছো। উনত্রিশটা তিল, দু’টো বার্থমার্ক, একটা এপেনডিক্সের সার্জারির দাগ আর একটা পোড়া দাগ ওয়ালা এই শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি সম্পর্কে তো আমি জানি। তবে ডক্টর কী করে জানবে আমাদের সম্পর্কের গভীরতা ঠিক কতটা? নাউ প্লীজ ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম। আমায় আমার কাজ করতে দাও। অন্ধকার কাটার আগে আমায় এখান থেকে বের হতে হবে।”
বিন্দুর চোখ টলটল করে উঠল রাগে দুঃখে। কিন্তু প্রতিবাদে সে কিচ্ছুটি করতে পারল না। তালহারের কাজে বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা তার আজো ছিল না। সে ক্ষোভে ভরা কণ্ঠে বলল,
“আপনি মেঘের পরিচয় দিতে পারেননি, তালহার।”
তালহার এবার চোয়াল শক্ত করে কঠিন চোখে তাকালো নারীটির পানে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ঘরের বাইরে পা রাখার মতো বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এই প্রশ্ন করা উচিত ছিল, আমি জবাব দিতাম‌। কিন্তু অপরাধের শাস্তিই যখন পাওয়া হয়ে গিয়েছে তখন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার কী প্রয়োজন? ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর যদি আদালত নির্দোষ বলে খালাস দেয় সেই বিচারের কোনো মূল্য আছে?”
“প্রমাণ ছাড়া কোনো আদালত কাউকে ফাঁসি দেয় না মিঃ তালহার।”
বিন্দু থমথমে মুখে বলল।

“কিন্তু আমার ব্যক্তিগত আদালতের জজ আমায় প্রমাণ ছাড়াই ফাঁসি দিয়েছে।”
“আর আমি যা চোখে দেখেছি তা মিথ্যা?”
“সত্য যদি সবসময় চোখের সামনে থাকত তবে আজ আমি একজন গোয়েন্দা হতাম না।”
তালহার স্মিত হেসে বলল।
বিন্দু বোঝে না তালহারের সেই জটিল কথাগুলোর মানে। শুধু মনে হয় লোকটা তাকে কথার জালে ম্যানুপুলেট করছে। কিন্তু সে ভীষণ ত্যক্ত হয়ে পড়েছে নীরব ভালোবাসা বুঝে নিতে নিতে। সে টলটলে নেত্রে বলল,
“না বলতে পারা ভালোবাসা নিজের মতো বুঝে নিয়ে অনায়াসে বহু বছর ঘর করা যায়। কিন্তু কারোর চরিত্রের অধঃপতকেও ভালোবাসা ভেবে ঘর করা কঠিন।”
তালহার ম্লান হাসল মেয়েটির ছলছলে চোখে চোখ রেখে। তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বলল,
“যাকে তিন বছরেই চরিত্রের সার্টিফিকেট দিতে পারলাম না, তাকে দশ মিনিটে কিসের চরিত্রের সার্টিফিকেট দেব?”

“তারমানে আপনি বলছেন আপনি নির্দোষ, তাই তো?”
“আমি কিছুই বলছি না।” তালহার রুক্ষ স্বরে বলেই উঠে দাঁড়ালো। বালতি পানি সব রেখে এসে ব্যস্ত ভঙ্গিতে জানালার বাইরে এক পলক তাকালো। বৃষ্টির বেগ কমে আসছে। তার সময় ও ফুরিয়ে এসেছে। সে টেবিলে রাখা নিজের মানিব্যাগ আর ফোন পকেটে ঢুকিয়ে নিলো।
গমগমে স্বরে বলল,
“তোমার আর আমার মাঝে মেঘ একটা অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ। তোমার জন্য যদি কিছু প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ হয় সেটা একমাত্র আমি। আর আমি এখানে তোমার সামনে, তোমার স্বামী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছি। এবং তোমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমিই থাকব। এটা ব্যতীত আর কিছু জানার প্রয়োজন নেই তোমার। মাথায় যেসব আবর্জনা ঢুকিয়েছ তা বের করে দিও। আমার থেকে মুক্তি তুমি এ জীবনে পাবে না। আগামী এক মাস তুমি এখানেই থাকবে। এই এক মাস তুমি আমাকে চেনো না, আমি তোমাকে চিনি না। কবির সবসময় তোমার আশেপাশে থাকবে আর তোমার সব কিছুর খেয়াল রাখবে। যা লাগবে ওকে বলবে। আর জব করছ, করো। কিন্তু ওই কোচিং এর মালিকের থেকে দূরে থাকবে। সে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে আসলেও সোজা জুতা দেখাবে বুঝেছো? আর যদি জুতা না দেখাও, বিষয়টা কোনোভাবে আমায় হ্যান্ডেল করতে হয়— তবে আমার পদ্ধতি তোমার ভালো নাও লাগতে পারে। আমি চাই না এখানে আমাকে জড়িয়ে কোনো ঝামেলা হোক।”
তালহার থামে। পুনরায় বলল,

“তোমার শাশুড়িকে ফোন করে কথা বলবে স্বাভাবিকভাবে। আমার কাছে যেন আর তার ফোন না আসে। তাকে বলবে যে এখানে সব ঠিক আছে। আর যদি এটা না বলতে পারো, তবে বলবে তুমি তার ছেলের সংসার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছ। কিন্তু আমায় যেন আর কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে না হয়।”
এক নাগারে বলেই পি-ক্যাপটা মাথায় পরে নিয়ে এগিয়ে এলো তালহার। হাঁটু গেড়ে বসে বিন্দু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তার কথা শুনতে থাকা মেয়েটির দিকে। গলার আওয়াজ থেকে রুক্ষতা স্বরে যায়। এলোমেলো রুক্ষ শুষ্ক চুলগুলো মুখের উপর দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আগামীকাল রাতে আমায় ঢাকার বাইরে যেতে হবে। এই সপ্তাহ থাকব না এখানে‌। কাল সকালে হসপিটালে গিয়ে টেস্ট গুলো করিয়ে নেবে। কবির নিতে আসবে। আমি হসপিটালেই থাকব। আর ফোন অন রাখবে সবসময়। আমি ফোন দিলে যেন বন্ধ না পাই।”
বিন্দু নিভু নিভু চোখে চেয়ে নির্বিকার তার আদেশ শুনলো। নীরবতা ভেঙে দাঁতে দাঁত চেপে ভীষণ জেদি কণ্ঠে বলল,

“হসপিটালে যাব না। ফোন অন রাখব না‌। ফোন ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেবো। এমনকি আপনি আমায় হাতের নাগালেও পাবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি আমার এক্সপ্লেনেশন পাচ্ছি। আর না, নীরবে ভালোবাসা বুঝে নিয়ে আপনার হয়ে থাকব।”
তালহার নিঃশব্দে হাসল। মুখ নামিয়ে নিয়ে মেয়েটির কপাল বরাবর শব্দ করে একটা চুম্বন করে নিজেও একই সুরে ঠান্ডা গলায় বলল,
“কোনো এক্সপ্লেনেশন পাবে না। হসপিটালে যাবে, টেস্ট করাবে, ফোন একটা ভাঙলে পাঁচটা এনে দেব তবুও তুমি আমার হাতের নাগালের বাইরে কোথাও যেতে পারবে না। এবং এভাবেই নীরবে না বলা ভালোবাসা বুঝে নিয়ে আমার হয়ে থাকবে‌।”
দুই চোখ বরাবর আরো দু’টো চুম্বন করে তালহার দাঁড়িয়ে গেল। বিন্দু রাগে ক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। পি-ক্যাপ, সানগ্লাস আর মাস্ক পরার পর চেনার উপায় নেই ওটা তালহার মুজাহিদ। যাওয়ার আগে আরো একবার ওই ক্ষোভে ভরা চোখে চোখ রাখে তালহার। নম্র স্বরে বলল,
“নিজের খেয়াল রাখবে। আর আমার কথার নড়চড় হলে কিন্তু বিষয়টা খুব একটা ভালো হবে না।”
তালহার বেরিয়ে যায়। আর বিন্দু নিজের ভেতরের অসহনীয় দ্বন্দ্বের সাথে লড়তে লড়তে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। নিজের চোখে দেখা ওই ছবি, ওই প্রেমময় চ্যাটগুলো, মালার বলা কথাগুলো সে অবিশ্বাস করতে পারছে না। আর না পারছে তালহারের কথা বিশ্বাস করতে।

সকাল হলো। বেলা গড়ালো। তীব্র ওষুধের প্রভাবে বিন্দুর শরীর তখন বেশ ঝরঝরে হয়ে উঠল। বিছানায় হাঁটু মুড়ে বসে আছে বিন্দু‌। কানে ফোন ঠেকিয়ে সে উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রৌদ্রজ্জ্বল অম্বরপানে। ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলল,
“তালহার আমার সাথে কোনো খেলা খেলছে, নিশি।”
সব শুনে নিশি স্তব্ধ। সেও বিন্দুর মতোই মিইয়ে গেল। ভাবুক কণ্ঠে বলল,
“বিন্দু, তোর কী মনে হয়না তালহারকে একবার ভরসা করা উচিত? দেখ, এটা তো সত্যি যে তালহার আজ পর্যন্ত কখনো তার ব্যপারে তোকে কিছু জানায়নি। ইভেন বিয়ের এই তিন বছরে তুই শুধু এতটুকুই জানিস যে তালহার একজন ইন্টেলিজেন্স অফিসার। কিন্তু ওর অফিস কোথায়, কী কাজ করে, কাজের ধরণ কেমন কিচ্ছু জানিস না তুই। মাঝরাতে হাত ভেঙে এসে বলত, ” ইটস অলরাইট। কিছু হয়নি।” স্বাভাবিকভাবেই সেই মানুষের পেট থেকে সহজে কিছু বের হবে না।”
বিন্দু ভাবুক হলো না। বলল,
“কিন্তু তাই বলে এতবড় একটা ঘটনার পরেও সে এমনভাবে নির্লিপ্ত থাকবে? তার কাছে কৈফিয়ত দেয়ার মতো কিছুই নেই। তাই সে কৈফিয়ত দেবে না নিশি। ওই চ্যাট, একাধিক ছবি কী করে মিথ্যা হবে? আর মালাও তো বলল, আমি যাওয়ার পরেই সে সে মেঘকে বাড়িতে এনেছে। যেখানে সে এত বছরে কাউকে কখনো বাড়িতে আনেনি।”
নিশি মুখ গোমড়া করে নিলো। বিন্দুর কথাও ঠিক। সে বলল,

“এটাও ঠিক।”
“হ্যাঁ, তাই আমি এবার আর কম্প্রোমাইজ করব না। জীবন একটাই। কারোর অধিকার নেই আমার জীবন নষ্ট করার। সে যদি আমায় সঠিক জবাব না দিতে পারে তবে আমি কখনো ওই সংসারে ফিরে যাব না।”
“কিন্তু আমার মনে হয় না তালহার তোকে কোনোভাবেই তোর পিছু ছাড়বে।”
বিন্দু বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“সে তালহার মুজাহিদ হলে আমিও মিসেস তালহার মুজাহিদ। যতদূর পর্যন্ত লড়াই করতে হয় করব। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার চরিত্রের স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে পারছে, ততক্ষণ আমি তার হাতের নাগালে আসছি না।”
“তুমি তার হাতের নাগালেই আছো। সে কতবড় ধূর্ত আর শয়তান। সে তোমার বিষয়ে সব খবরাখবর রাখে এমনকি তোমার উপর নজর ও রাখে। কিন্তু একটাবার সামনে এসে কথা বলেনি।”
“কথা বলার সাহস তো থাকা লাগবে। আমায় জবাব দিতে পারবে না বলেই আসেনি। অন্যদিকে আমি না থাকলে মেঘের সাথেও ভালো টাইম স্পেন্ড করা যাবে। সে সুযোগটা খুব ভালোভাবে কাজে লাগাচ্ছে।”
বিন্দু তাচ্ছিল্য করে বলল।
নিশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা শোনো, একটু সময় নাও। রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নিও না। তাকে আরো একবার বোঝার চেষ্টা করো। যদি এবার তার সত্যতা প্রমাণিত না হয় তবে নাহয় ডিভোর্স নিয়ে নেবে।”

“হুম।”
“জ্বর কমেছে?”
“একটু। শরীর খুব দূর্বল।”
“তোমার উচিত তালহারের সাথে হসপিটালে যাওয়া।”
নিশি সতর্ক কণ্ঠে বলল। বিন্দু মুখ বিকৃত করে নিলো।
“আমার তারসাথে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা নেই।”
“দেখো একবার টাইফয়েড, নিউমোনিয়া হয়ে গেলে বিপদ হয়ে যাবে।”
সেই মুহুর্তেই আবার দরজা ধাক্কানোর বিকট শব্দ হলো। দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে এবার ভেঙে ফেলার উপক্রম। বাড়ি ওয়ালির বিকট চিৎকার ভেসে আসতেই বিন্দু নড়েচড়ে উঠল। সে নিশিকে বলল,
“আচ্ছা রাখো তো। তালহার আমার নাক দম করে রেখেছে।”
না চাইতেও দরজা খুললো সে। কবির বিগলিত হেসে সালাম দিল। বলল,
“ম্যাডাম, হসপিটালে যেতে হবে। স্যার অপেক্ষা করছেন।”
দরজার হাতল ধরে দাঁড়াতেই দেখল তন্ময়ের মা খুনতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“উনি কে? দরজা খুলছিলে না কেন? তোমার জ্বর কমেনি?”
বিন্দু শুধু ছোট্ট করে বলল,

“জ্বর কমেছে, আন্টি।”
আর কিছু বলল না সে। তন্ময়ের মা বাঁকা চোখে দেখল। তারপর নিজেদের ফ্লাটে চলে গেল। তিনি যে কবিরের আসাটা ভালোভাবে নেননি তা বেশ বুঝেছে বিন্দু।
সে এবার দৃষ্টিপাত করে কবিরের দিকে। ঘাড় শক্ত করে বলল,
“আমি কোথাও যাব না। আপনার স্যারকে বলে দিন। আর দ্বিতীয়বার যদি আমি আপনাকে এখানে দেখি তালহারের চামচামি করতে, তবে আপনার অন্য ব্যবস্থা করব আমি। যেটা আপনার জন্য খুব একটা ভালো হবে না।”
এহেন হুমকি যেন কবিরের জন্য রোজকার ডাল ভাত। সে ওই বিষয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে বিনম্র কণ্ঠে বলল,
“ম্যাম, ভালোভাবে না গেলে আমায় সিনক্রিয়েট করতে হবে। আপনি তো জানেন আপনি কোন পরিবেশে আছেন। এখানে যদি আমি কোনো সিনক্রিয়েট করি বিষয়টা আপনার জন্য একটুও ভালো হবে না। আপনার কাছে দশ মিনিট সময় আছে‌।”

বিন্দুর চোখেমুখে রাগে শক্ত হয়ে উঠল। সে ধাড়াম করে দরজা আটকে ভেতরে চলে গেল।
প্যাথলজি ওয়ার্ড। এক হাতে প্রেসক্রিপশন আর একহাতে স্ত্রীর মাথা নিজের পেটের সাথে চেপে ধরে আছে তালহার। সংকুচিত দৃষ্টি নার্সের হাতে থাকা টিউবটির দিকে। যেটা পুরোটা পরিপূর্ণ সদ্য নেয়া রক্তে। সামান্য টেস্টের জন্য কতখানি রক্ত নিয়ে নিলো। ডাকাত!
সে নার্সের হাতে প্রেসক্রিপশন দিয়ে বলল,
“প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার প্রয়োজন নেই।”
নার্স নীরবে মাথা নেড়ে চলে গেল। বিন্দু চোখমুখ কুঁচকে তালহারের পেটের সাথে লেগে আছে। এমন নয় যে সে ইনজেকশন কিংবা রক্তে ভয় পায়। কিন্তু আজ রক্ত নিতে গিয়ে হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে সবটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। তাই শরীর ভেঙে পড়েছে।
তালহারের কথাটা কানে আসলেও আজ আর বিন্দু প্রতিক্রিয়া দেখালো না। নয়তো সম্পর্কটা আগের মতো হলে দু’দিন পর পর একবার প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা তার বদ অভ্যাস ছিল। হয়তো কোনো একদিন আসবে যেদিন সে চমকে যাবে প্রেগন্যান্সি কীটে দুটো লাল দাগ দেখে। আর সে চিৎকার করে তালহারকে বলবে, সে মা হতে চলেছে। কিন্তু এমন মিরাকেল কখনোই হয় না তার সাথে।
কবির ডাব এনে দিল। তালহার ঝিমুনি দিয়ে বসে থাকা মেয়েটির ঠোঁটের ভাঁজে স্ট্র ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
“খেয়ে নাও।”

বিন্দু খেয়ে নিলো। তার পরনে একটি কলা পাতা রঙের কোটা শাড়ি। ঠিক যেন গাছের কান্ডের মাথায় দুলতে থাকা কচি এক পাতা। তালহার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সেই কচি পাতাটি থেকে। বাম হাতটি তখনো ভারী খোঁপায় আবৃত মাথাটা আগলে রেখেছে নিজের সাথে।
বিন্দুর চোখের সামনে সবটা পরিষ্কার হতে লাগল। কিন্তু তার মন মস্তিষ্ক আঁটকে আছে আগলে রাখা স্বামীর মাঝে। কী হতো তাদের এই সম্পর্কে কোনো দাগ না থাকলে? সে ঝাঁপসা চোখ অদূরে ফেলে ধিমি কণ্ঠে শুধাল,
“মেঘকে বিয়ে করে নিয়েছেন?”
নিজের ফোনে মগ্ন তালহারের ভ্রু কুঁচকে গেল আচমকা এই প্রশ্নে। সে আশ্চর্য হয়ে ফোন থেকে মুখ তুলে দৃষ্টি রাখে মেয়েটির পানে। বলল,
“এখুনি এটা বলা ঠিক হবে না মনে হয়। আফটার‌ অল তোমার আর তোমার ফ্রেন্ডের হাতে আমার গোটা ক্যারিয়ার। দেখাযাবে তোমার ফ্রেন্ড আমার নামে কয়েকটা মামলা ঠুকে দিয়ে আমার ক্যারিয়ার ধূলোয় মিশিয়ে দেবে। ভেরি ডেঞ্জারাস!”
তালহারের কণ্ঠে ভয়ের আভাস ছিল। বিন্দু আচমকা ছিটকে তার থেকে দূরে সরে আসল। অবিশ্বাস্য চাহনিতে চেয়ে বলল,

“আপনি আমার ফোন মনিটর করেন?”
তালহার একই রকম থমথমে মুখে বলল,
“মনিটর না করলে তো জানতেই পারতাম না তোমার বন্ধু নির্বাচন এত বাজে। ইঁদুরের বিষের থেকে সায়ানাইড বেশি পাওয়ারফুল তাকে বলে দিও‌।”
তার কণ্ঠে ভরপুর রসিকতা থাকলেও মুখ একদম গম্ভীর। এমন গম্ভীর মুখে এমন রসিকতা করা যায়?
বিন্দু দূর্বল কণ্ঠে বলল,
“এগুলো করে কী প্রমাণ করতে চাইছেন?”
“কিছুই না।”
সে পকেটের ফোনটা অনবরত ভাইব্রেট করছে তালহার ঘড়ি দেখল। অতঃপর বিন্দুর দিকে ব্যস্ত দৃষ্টি ফেলে বলল,
“তুমি বাসায় চলে যাও। আমি রিপোর্ট নিয়ে নেবো।”
বিন্দু চোখ ডলতে ডলতে দূরে সরে আসল তার থেকে। গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি ঠিক আছি। রিপোর্ট আমি নিয়ে যাব। আপনার যেখানে যাওয়ার আপনি যেতে পারেন।”
তালহার এক বাক্যেই সায় জানালো। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“ওকে, ডাক্তারকে রিপোর্ট দেখিয়ে তারপর যাবে। এরপর কবির ড্রপ করে দিয়ে আসবে।”
বিন্দু চোয়াল শক্ত করে বলল,
“এত লোকদেখানো দুশ্চিন্তা লাগবে না, তালহার।”
তালহারের ব্যস্ত দৃষ্টি স্থির হয়। ইন করা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টে আবৃত ছয় ফুটিয়া লোকটি পেশাগত রুপে ছিল। সে দুই পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়ালো চেয়ারে বসা স্ত্রীর সামনে। প্রহসনের সুরে বলল,
“দেখেছো কত বাজে দিন এনেছো? এখন আমায় লোকদেখানো দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে।”
বিন্দু কপাল কুঁচকে বলল,

“আমি এনেছি?”
“তুমি নয়তো কে? এই তুমিই আগে এগুলোকে ভালোবাসা বলতে আর এখন লোক দেখানো দুশ্চিন্তা বলছ।”
তালহার কাঁধ ঝাঁকিয়ে জবাব দিল।
“তো আপনার কাছে এগুলো কী?”
“যেন ঘরে ফিরে বলতে পারি এটা ঘর—তার ক্ষুদ্র চেষ্টা।”
বিন্দু কপাল কুঁচকে অবুঝ পানে তাকায়।‌
“মানে?”
তালহার জবাব দিল না। স্মিত হেসে তার গালের উল্টোপিঠে হাত ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“আর দেখা হচ্ছে না সহজে। চোখ কান খোলা রেখে চলবে সবসময়। কোনো প্রকার সমস্যা মনে হলে কবিরকে জানাবে। আসছি।”
বলেই সে পকেট থেকে ফোন বের করে গটগট করে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। আর বিন্দু অবুঝ পানে চেয়ে রইল। সে জানত না তালহার মুজাহিদের কাছে বিন্দুই তার একমাত্র ঘর। আর না এটা তাকে জানানোর কোনো ইচ্ছা ছিল তালহারের মাঝে।

পায়ের কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসা দেহটি কাঁপছে সমানতালে। এক হাতে আঁকড়ে ধরা গ্লক নাইনটিন এর সরু নলটা আরো জোরে কণ্ঠনালী পর্যন্ত চেপে দিল তালহার। সহসা লোকটি ব্যথায় গড়গড় শব্দ করে উঠল। চোখ বেঁয়ে অবাধে নোনাজল গড়াচ্ছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারীদের দিকে হিংস্র চাহনি ফেলে তালহার হিসহিসিয়ে বলল,
“আমায় যেন বুলেট এফোঁড়ওফোঁড় না করা লাগে। শিপে ওঠানো সবকটা কন্টেইনার এই মুহুর্তে নামাবি। আর একটা কন্টেইনার ও যেন শিপে না ওঠে।”
মোংলা বন্দরে কর্মচারীদের শেষ প্রান্তে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত কালো কুচকুচে দেখতে লোকটির সাদা ধবধবে দাঁত গুলো বেরিয়ে এলো। সে পান চিবুতে চিবুতে ফিচলে হেসে বলল,
“আপনি কোনোদিন ইনকাউন্টার করতে পারবেন না গোয়েন্দা স্যার। ফাঁকা হুমকি দিয়ে লাভ নেই।”
তার কথাটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই একটা গুলি ছোঁড়ার বিকট শব্দ শোনা গেল। উপস্থিত সকলে চমকে উঠে তালহারের হাতের দিকে তাকালো। বন্দুকের নলটি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। মেহমেদ আর বাকি কর্মকর্তারা চমকে তাকায় বাহু আঁকড়ে ধরে মেঝেতে ছটফট করতে থাকা সেই লোকটির দিকে যে এই মাত্র কথাটি বলেছে‌। তাদের সত্যিই ইনকাউন্টার করার অনুমতি নেই।
তালহার ভীড় টপকে দৃষ্টি রাখে মেঝেতে। উঁচু স্বরে বলল,

“তোর জবাব পেয়েছিস মাশুক? আমি এখানে তোদের সাথে ফাজলামো করতে আসিনি।”
মাশুক বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে হিসহিসিয়ে বলল,
“কাজটা ঠিক করলেন না স্যার। পরিনতি খারাপ হইবে।”
তালহার স্মিত হেসে বলল,
“কে আমার পরিনতি খারাপ করবে সেটা দেখার জন্যই অপেক্ষা করছি।”
পরপরই হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
“আমি কী বলেছি?”
উপস্থিত সকল কর্মচারী এবার আর একটুও দেরি করল না। সবাই ছুটে গেল কন্টেইনার নামাতে।
এক ঘন্টা বাদ তালহার বেরিয়ে আসে বন্দর থেকে। পরদিন প্রভাতের সংবাদ মাধ্যমে শীর্ষ সংবাদ হলো বিগত এক সপ্তাহে গোয়েন্দা সংস্থা চার হাজার টন তেল এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদ উদ্ধার করেছে অবৈধভাবে পাচারকালে। আশা করা যায় উদ্ধারকৃত এই তেল আর খনিজ সম্পদ সাময়িক দূর্ভোগ নিরসনে সফল হবে।
সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। গাড়ি তখন কেবল ঢাকায় ঢুকেছে। তালহার ভীষণ অধৈর্যশীল হয়ে ফোনে কিছু করছে। কিন্তু বারংবার তার মুখে হতাশা ফুটে উঠছে।
মেহমেদ রাস্তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার দিকে তাকালো।

“কোনো সমস্যা হয়েছে স্যার?”
তালহার অধৈর্য ভঙ্গিতে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“একটা ফোনের কল লগে অ্যাক্সেস করার চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না।”
মেহমেদ ফোনটা নিয়ে একটু পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“স্যার, মনে হচ্ছে টার্গেট ফোন থেকে ম্যালওয়্যারটা আনইনস্টল করা হয়েছে। নয়তো ফোনটা রিসেট করা হয়েছে। তাই সফটওয়্যারটা আর কল ডেটা সংগ্রহ করতে পারছে না।”
তালহার নীরবে মাথা নাড়লো। এটা তার স্ত্রী জেনেবুঝে করেছে। কখনোই ভাবেনি তার বাধ্যগত স্ত্রী ঠিক এই মাত্রায় রাগ, জেদ, ঘৃণা দেখাতে পারে। একে অপরের সাথে নীরব দ্বন্দ্বটা একটু বেশিই ভারী পড়ছে তা স্পষ্ট তালহারের চোখেমুখে।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। মাহির চৌধুরী এখনো নড়াচড়া করছে না। এই কেস আর এক মাসের বেশি সময় ধরে টানলে তার সংসার ঠিক নিলামে উঠবে। তার সেই পৃথিবী সবার সামনে চলে আসবে যেই পৃথিবীকে সে গোটা এই নোংরা দুনিয়া থেকে লুকিয়ে রেখেছিল।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে নিলো।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৬

সরকারি মজুদে বিপুল পরিমাণে তেলের সঞ্চার করা হয়েছে। দেশের বিপর্যস্ত জনজীবন একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে আশা রাখছেন সরকার। ল্যাপটপের স্ক্রিনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহির চৌধুরী। কিয়ৎকাল বাদ সে হাত বাড়িয়ে স্লাইড পরিবর্তন করল। ভেসে উঠল সাদা শার্ট, কালো ব্লেজার, টাই আর প্যান্ট পরিহিত এক সুদর্শন সুপুরুষের অবয়ব। যার চোখেমুখে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়ত। ছবিটির ঠিক নিচে লেখা,
“সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার তালহার মুজাহিদ”

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here