Home প্রেমের বাজিমাত প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৯

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৯

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৯
রোজ ও রুশা

এতগুলো বছর পর জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত– সবচেয়ে মেঘে ঢাকা রোদ্দুরের মতো উজ্জ্বল একটা দিন এসেছে জাওয়াদ খান, কাজল রেখা, জিহান তালুকদার আর তৌহিদা তালুকদারের জীবনে। যে দূরত্ব ভাঙতে ভাঙতে মনে হয়েছিল কোনোদিন আর এক হওয়া সম্ভব নয়। যে অভিমানের দেয়ালে শ্যাওলা জমেছিল— সময় আর নিয়তির অমোঘ টানে আজ সেই দেয়াল ধূলিসাৎ। বহু পথ পেরিয়ে, বহু রাত একাকী কেঁদে আজ তারা আবার মুখোমুখি, কাছাকাছি।
আর এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণে পুরোনো বন্ধু ফারুখ সাহেব দূর নেপালে বসে শান্তিতে চা খাবেন, তা কী করে হয়? কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে, এক বুক আনন্দ আর কিছুটা নাটকীয়তা সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যার ফ্লাইটে সোজা বাংলাদেশে ল্যান্ড করলেন তিনি।
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। ড্রইংরুমে বসে পুরো পরিবার মেতে উঠেছিল গল্পে। ঠিক তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠল। কাজের মেয়ে চামেলি দরজা খুলতেই চোখের সামনে বিশাল এক ফুলের তোড়া দেখে থমকে দাঁড়াল। তোড়ার আড়াল থেকে মুখ বের করে ফারুখ সাহেব স্বভাবসুলভ চওড়া হেসে বলে উঠলেন—

” আসসালামু আলাইকুম! Surprise inspection!”
ভেতর থেকে জাওয়াদ খান বসার ঘর পেরিয়ে আসতেই দরজার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন, যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
“আরে ফারুখ! তুই! এই অসময়ে?”
“কী করব বল? বন্ধুর জীবনে এত বড় রোমান্টিক কামব্যাক (romantic comeback), আর আমি নেপালের পাহাড়ে বসে শুধু চা গিলব? Impossible!”
জাওয়াদ খান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। এক ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন বহু বছরের চেনা, সুসময়ের ও অসময়ের বন্ধুকে।
” আয় আয়, ভেতরে আয়।
ফারুখ সাহেব ড্রইংরুমে পা রাখতেই চারপাশের আলো-আঁধারি আর থমথমে অথচ সুখের পরিবেশটা দেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন—
” বাহ! পরিবেশ তো dangerous রকম romantic! শুধু ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা ভায়োলিন বাজা বাকি।”
পাশে বসে থাকা তৌহিদা তালুকদার হেসে উঠে বললেন—

” ভাইজান, আপনি একদম আগের মতোই আছেন। একটুও বদলাননি।
ফারুখ সাহেব বুক ফুলিয়ে হেসে উত্তর দিলেন—
” আগে কম ছিলাম আপা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ট্যালেন্টও বাড়ছে!
সামনেই বসে ছিল অধীর আর সৃজন। ফারুখ সাহেব ওদের দিকে চোখ পড়তেই বললেন—
” এই যে ইয়াং জেনারেশন, তোমাদের কী খবর?”
অধীর তড়িঘড়ি করে উঠে এসে হাত মেলালো।
” খবর এতক্ষণ ভালোই ছিল আঙ্কেল। তবে আপনি আসার পর আমাদের এন্টারটেইনমেন্ট লেভেল dangerously বৃদ্ধি পেয়েছে।”
সৃজনও হাসিতে যোগ দিয়ে বলল—
” আঙ্কেল, আপনি আসার সাথে সাথেই মামনি আর বড়বাবাকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন। আমাদের Mission Successful!”
ফারুখ সাহেব সোফায় হেলান দিয়ে বললেন—

” এটাকে বলে অভিজ্ঞতা, বাবা! বহু ঘাটের জল খাওয়া অভিজ্ঞতা।”
তারপর হঠাৎ চারপাশটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে গম্ভীর মুখে জাওয়াদ খানের দিকে তাকালেন।
” আচ্ছা জাওয়াদ… ফুল কোথায়?
জাওয়াদ খান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললেন—
” কিসের ফুল?”
“এ মা! এত বছর পর তোর ওয়াইফ অফিশিয়ালি তোর ঘরে ফিরছে, তোর কাছাকাছি এসেছে, আর তুই ফুল ছাড়া খালি হাতে বসে আছিস? তোদের এই জেনারেশনের রোমান্স ডিপার্টমেন্ট এত দুর্বল কেন রে?”
অধীর ফোড়ন কেটে বলল—
” Exactly! আমি তো ভাবছিলাম অন্তত ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, সফট মিউজিক এসব থাকবে। বাবা তো পুরো ফ্লপ!”
জাওয়াদ খান এবার কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে চোখ রাঙালেন।

“এই বেয়াদব ছেলে! বাবা-মায়ের সাথে রসিকতা করা হচ্ছে?”
অধীর নিরীহ মুখ করে বলল—
” আমরা তো শুধু অবজার্ভ করছি বাবা। তোমরা যারা ওল্ড বাট গোল্ড (old but gold) কাপল, তোমাদের দেখেই তো আমাদের মতো নতুনদের ইন্সপিরেশন নিতে হবে।”
পুরো ঘরে হাসির রোল বয়ে গেল। ফারুখ সাহেব নাটকীয়ভাবে বুকে হাত দিয়ে বললেন—
” দেখছিস জাওয়াদ? নতুন জেনারেশন আমাদের থেকেও দুই ধাপ এগিয়ে। আমরা তো ওদের নখের যোগ্যও না।”
সৃজন মুচকি হেসে আলতো করে বলল—
” এগোবো না আঙ্কেল? এত বছর পর অবশেষে একটা হ্যাপি এন্ডিং দেখতে পাচ্ছি। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে?”
কাজল রেখা এতক্ষণ মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। এই কথায় তার ঠোঁটের কোণে মৃদু, লজ্জিত এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। বহু বছর পর তার মুখের এই স্নিগ্ধ হাসি যেন পুরো ঘরের গাম্ভীর্যটাকে এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়িয়ে দিল।

এতক্ষণ পর্যন্ত রুশা, রোজ আর হেরা উপরতলার একটা ঘরে বসে নিজেদের সুখ-দুঃখের গল্প করছিল। নিচে হঠাৎ এমন হৈচৈ আর চেনা কণ্ঠের আওয়াজ শুনে তারা কৌতূহলী হয়ে নিচে নেমে আসে।
নিচে পা রাখতেই ফারুক সাহেবকে দেখে রুশা আর হেরা নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। দুই বোন প্রায় দৌড়ে গিয়ে ফারুক সাহেবকে জড়িয়ে ধরল। এতদিন পর এই মানুষটাকে চোখের সামনে পেয়ে তাদের চোখে-মুখে আনন্দের আলো ঠিকরে বেরোচ্ছিল।
রোজ অবশ্য কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। এক কোণে দাঁড়িয়ে সবার এই পুনর্মিলন, এই নিখাদ আনন্দ সে তৃপ্ত চোখে দেখছিল। তার নিজের কোনো আপন বলতে কেউ নেই, কিন্তু এই মানুষগুলোর আনন্দ তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই ফারুক সাহেবের চোখ পড়ল রোজের দিকে। তিনি পরম স্নেহে ডেকে উঠলেন—

” কী ব্যাপার আম্মুজান? আপনি কি এই বাবার কাছে আসবেন না? নাকি দূর থেকেই পর করে রাখবেন?”
কথাটা শুনে রোজের বুকের ভেতরটা এক অজানা শান্তিতে ভরে গেল। সে মৃদু হেসে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। ফারুক সাহেব তাকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত রাখলেন। এক অদ্ভুত, পবিত্র মায়ায় জড়িয়ে নিলেন মেয়েটাকে। রুশার মাধ্যমেই রোজের ব্যাপারে তিনি আগে সব জেনেছিলেন, ফোনেও কথা হতো। অল্প দিনেই মেয়েটার নিখাদ ভদ্রতা, শান্ত স্বভাব আর চোখের ভেতরের মায়াবী একলা আকাশ মানুষটার মনে আলাদা একটা পিতৃত্বের জায়গা করে নিয়েছিল।
ফারুক সাহেব মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন। রোজকে দেখলেই তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত পিতৃস্নেহ মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, এই মেয়েটার জীবনে খুব যত্নের প্রয়োজন।
তিনি হাসিমুখে একের পর এক বড় বড় গিফট বক্স ওদের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। হেরা আর রুশা তো উপহার পেয়ে আনন্দে আত্মহারা! রোজ বারবার মাথা নেড়ে না করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ফারুক সাহেব শুনলেন না। ধমকের সুরে, পরম মায়ায় কয়েকটা সুন্দর বক্স রোজের হাতেও ধরিয়ে দিলেন।
ঠিক তখনই সদর দরজা দিয়ে নাভান ভেতরে প্রবেশ করল। বাড়ির এমন উৎসবমুখর পরিবেশ আর ফারুক সাহেবকে দেখে সে কিছুটা অবাক হলো। তবে নিজের ভেতরের ঝড় বাইরে প্রকাশ পেতে দিল না। শান্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ফারুক সাহেবকে সালাম করল, কুশল বিনিময় করল। তারপর কোনো এক গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়ে ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। তার এই শান্ত কিন্তু গম্ভীর অবয়ব ঘরের কয়েকজনের দৃষ্টি এড়াল না।

ঘণ্টাখানেক পরের কথা। পুরো বাড়িটা যেন এক জাদুকরী সুবাসে ভরে উঠেছে। চারদিকে শুধু সাদা আর লাল গোলাপের তীব্র, মাদকতাময় সুঘ্রাণ। ফারুক সাহেবের কড়া নির্দেশেই এই আয়োজন। জাওয়াদ খান আর কাজল রেখার ঘরটা যেন রূপকথার মতো করে সাজানো হয়েছে। নরম আলো আর ফুলের পাপড়িতে মোড়ানো সেই বিছানা, যেখানে বহু বছরের একাকীত্ব, চোখের জল আর অপেক্ষা আজ শেষ হতে চলেছে।
অন্যদিকে জিহান তালুকদার আর তৌহিদার রুমটাও সাজানো হয়েছে ছিমছাম, স্নিগ্ধভাবে। বারান্দায় হালকা নীলচে আলো মৃদু কাঁপছে, টেবিলে রাখা এক তোড়া তাজা সাদা গোলাপ।
রোজ, ঝিনুক, তুষার— সবাই মিলে বাড়ির বাকিদের সাথে হাত মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাকে এক স্বর্গীয় রূপ দিয়েছিল। যে বাড়িটা এতদিন একটা নিষ্প্রাণ প্রাসাদের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, আজ সেখানে প্রাণের স্পন্দন।
ফারুক সাহেবকে আজ চেনা যাচ্ছিল না। তার রসিকতা, প্রাণখোলা হাসি যেন সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। যুবক বয়সে মানুষটা যে কতটা আসর জমানো চতুর স্বভাবের ছিলেন, আজ তা বাড়ির নতুন প্রজন্ম খুব ভালো করেই টের পাচ্ছিল। রুশা তার বাবার এই রূপটা খুব চেনে, তাই তো বাবার সাথে তার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো।

সবশেষে, এক প্রকার জোর করেই জাওয়াদ খানকে পাঠানো হলো কাজল রেখার রুমে। আর জিহান তালুকদারকে পাঠানো হলো তৌহিদার জন্য বরাদ্দ করা ঘরে। নিজেদের ছেলেমেয়ে আর বন্ধুদের এই “মিষ্টি কুকীর্তি” দেখে দুই জোড়া প্রবীণ দম্পতির লজ্জায় আর সংকোচে মাটির সাথে মিশে যাওয়ার অবস্থা! কিন্তু মুখে কিছু বলারও উপায় নেই।
ঠিক তখনই সেই থমথমে, স্নিগ্ধ পরিবেশের মাঝে জাওয়াদ খান আর কাজল রেখার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল নাভান। তার সাথে রয়েছে পিসিমণি তৌহিদা এবং ছোট বাবা জিহান তালুকদার। সবাইকে নিয়ে নাভান যখন মায়ের ঘরে ঢুকছে, তখন দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে হেরা পুরো ব্যাপারটা দেখছিল। তার মনে এক তীব্র কৌতুহল আর অভিমান দানা বাঁধছিল। আজ সবাই যেন হেরা নামক মেয়েটাকে পাত্তাই দিচ্ছে না! কেন তার বাবা-মাকে এই ঘরে আনা হলো? কেন তাকে কিছু জানানো হচ্ছে না?
হেরা মনে মনে ফুঁসে উঠে ভাবল—

” আরে, পাত্তা না দেওয়ার কী আছে? আমি তো এই পরিবারেরই অংশ, আমারও তো অধিকার আছে! এই অসভ্য গিটারওয়ালা ছেলেটা নিজেকে কী ভাবে?”
কিন্তু নাভানের গম্ভীর, শান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে সে আর মুখে কিছু বলতে পারল না। নাভানের হাতে তখন দুটো ছোট, আকর্ষণীয় বক্স। তার চোখে এক অদ্ভুত, স্বর্গীয় শান্তি… অথচ সেই শান্তির নিচে চাপা পড়ে আছে এক সমুদ্র সমান কষ্ট আর একাকীত্ব।
রুমে তখন চারজন মানুষ উপস্থিত— জিহান তালুকদার, তৌহিদা, জাওয়াদ খান আর কাজল রেখা। নাভান ভেতরে গিয়ে দাঁড়াতেই ঘরের ভেতরের সমস্ত ফিসফাস, সমস্ত সংকোচ এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল।
নাভান ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বক্স দুটো তাদের হাতে তুলে দিল। তার কণ্ঠস্বর আজ অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি ভারী, অনেক বেশি পরিপক্ব।
সে চারজন মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে নিথর গলায় বলল—

” এই একটা দিনের জন্য… শুধু এই একটা রাতের জন্য আমি নিজের সাথে কত হাজারটা রাত যুদ্ধ করেছি, তোমরা জানো? তোমাদের কাছে হয়তো এটা দীর্ঘদিনের অভিমান শেষে একটা সাধারণ মিলন… কিন্তু আমার কাছে? এটা একটা নতুন জীবন পাওয়ার যুদ্ধ।”
সে বিষণ্ণ কিন্তু সুন্দর একটা মুচকি হাসি হাসল, তারপর চোখ নামিয়ে বলতে লাগল—
” ছোটবেলা থেকে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখে বড় হয়েছি। মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, তারপর কোনো একটা কারণে অভিমান করে, আর সেই অভিমানে বহু দূরে সরে যায়। অথচ অদ্ভুত বিষয় কী জানো? দূরত্ব বাড়লেও ভেতরের ভালোবাসাটা ঠিক আগের মতোই থেকে যায়, এক চুলও কমে না। আমি তখন ছোট ছিলাম, বুঝিনি। কিন্তু আজ বড় হয়ে একটা জিনিস খুব নির্মমভাবে বুঝেছি…
**ভালোবাসার মানুষকে কখনো, কোনো পরিস্থিতিতেই দূরে ঠেলে দিতে নেই। ঝড় আসুক, পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যাক, মানুষ বদলে যাক, সময় ফুরিয়ে যাক… তবুও আঁকড়ে ধরা হাতটা কখনো ছাড়তে নেই।***
বলতে বলতে নাভানের গলাটা এবার আবেগে আর চাপা কান্নায় কেঁপে উঠল। সে তার নিজের বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল—

“আমি মাকে রাতের পর রাত একাকী কাঁদতে দেখেছি। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বালিশে মুখ গুঁজে ভেঙে পড়তে দেখেছি। আবার দূর থেকে বাবাকেও দেখেছি একাকীত্বের এক নরকে বাস করতে। কিন্তু কেউ কোনোদিন কাউকে ডাকোনি। কেউ হাত বাড়াওনি। কেন জানো? কারণ মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল দেয়াল— ইগো, জেদ, অভিমান আর এক অজানা ভয়!”
সে এবার জাওয়াদ খান আর জিহান তালুকদারের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখ দুটো তখন চকচক করছে।
“তোমরা জানো? আমি ছোটবেলায় এই ‘ভালোবাসা’ শব্দটাকেই চরম ভয় পেতাম। আমার মনে হতো, ভালোবাসা মানেই একটা সময় পর আলাদা হয়ে যাওয়া, একা হয়ে যাওয়া। কিন্তু পরে, জীবনের কঠিন পথ চলতে চলতে বুঝলাম—

**আলাদা হয়ে যাওয়াটা ভালোবাসার শেষ নয়। ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় তখন, যখন মানুষ অভিমানের বশে ফিরে আসার সব দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেয়।”**
নাভানের এই গভীর, দর্শনধারী কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল চারটে মানুষের বুকে। কাজল রেখার চোখ বেয়ে তখন নিঃশব্দে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। তিনি নিজের কান্না লুকানোর চেষ্টাও করছেন না।
নাভান একটু দম নিয়ে আবার বলল—
***আমি চাই না, আমাদের পরের প্রজন্ম কোনোদিন ভালোবাসতে ভয় পাক। আমি চাই তারা আমাদের দেখে শিখুক— পৃথিবীতে যত বড় ঝড়ই আসুক না কেন, সম্পর্কের ‘আমরা’ শব্দটা যেন কখনো ভেঙে গিয়ে অহংকারের ‘আমি’ হয়ে না যায় ***
ঘরের ভেতর তখন পিনপতন নীরবতা। কারো একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দও যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। নাভান এবার আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সেই চারজন মানুষের সামনে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। যেন এক সন্তান তার চারজন অভিভাবকের কাছে জীবনের পরম ভিক্ষা চাইছে।
” এতগুলো বছর তোমরা শুধু আমাদের জন্য, এই সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচেছ। নিজেদের সুখ, নিজেদের কান্না, নিজেদের আকাঙ্ক্ষা— সবকিছু লুকিয়ে রেখেছ শুধু আমাদের মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য। আজকে… শুধু একটা রাত… আমি তোমাদের কাছে ভিক্ষা চাইছি। এই একটা রাত অন্তত নিজেদের জন্য বাঁচো। সব অভিমান ভুলে, সব ভয় বিসর্জন দিয়ে, সব দূরত্ব মুছে ফেলে নিজের মানুষটার পাশে এসে দাঁড়াও।”
তার নিজের চোখ থেকেও এবার দু-ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে নেমে এলো। কণ্ঠস্বর জরিয়ে এল তার কিন্তু তার চোখের পানি কাওকে দেখালো না —

” আজকে এই সন্তানের সামনে একটা প্রতিজ্ঞা করে যাও তোমরা… জীবনে এরপর যত বড় ঝড়ই আসুক, যত ভুল বোঝাবুঝিই হোক না কেন… তোমরা কখনো একে অপরের হাত ছেড়ে যাবে না। কারণ এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে সত্যিকারের ভালোবাসা খুব কম মানুষ পায়… আর তোমরা চারজন সেই সৌভাগ্যবানদের দলে , যারা এত ঝড়ের পরেও সেই ভালোবাসাটা হারিয়ে ফেলোনি।”
কথাগুলো শেষ হতেই পুরো ঘরটা যেন এক মহামিলনেক্ষণে পরিণত হলো। তৌহিদা জিহান আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না, মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। কাজল রেখা চোখ মুছতে মুছতে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন জাওয়াদ খানের দিকে— যে দৃষ্টিতে আজ কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু তীব্র সমর্পণ। জিহান তালুকদারের চোখও বহু বছরের জমে থাকা অনুভূতির ভারে ভিজে উঠেছে।
নাভান এবার মেঝে থেকে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে যাওয়ার আগে সে ক্ষণিকের জন্য থামল। হেরা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে নাভানের এই রূপ দেখছিল। নাভান হেরার দিকে একবার তাকাল, তারপর সবার উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো বলল—
“আজ থেকে আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি না। আজ থেকে এই পরিবারে কেউ একা না। আজ থেকে… তোমরা আবার বাঁচবে একসাথে। আর তোমাদের দেখে আমরাও বাঁচতে শিখব, ভালোবাসতে শিখব। এটাই আমার চাওয়া!
তৌহিদা তালুকদার নাভানের মাথায় হাত দিয়ে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে—

” হ্যাঁ এবার তোর আর হেরার ও …..
কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে নাভান বলে উঠে এমন কিছু কথা যা শুনার জন্য জাওয়াদ খান বাদে সবাই অপ্রস্তুত হয়ে পরে। নাভান কথা গুলো বলে চোখের পানি লুকায়। আর একটি মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না নাভান। ধীর, গম্ভীর পদক্ষেপে ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সে। তার বুকের ভেতরের পাথরটা যেন আজ নেমে গেছে, এক অদ্ভুত হালকা অনুভূতি তাকে গ্রাস করল।
আর ঘরের ভেতরে পিছনে রয়ে গেল চারটা মানুষ… যারা বহু বছর পর, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আবার নতুন করে একে অপরকে ফিরে পেয়েছে। নাভানের ইশারা পেয়ে জিহান তালুকদার আর তৌহিদা জিহানও নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
রুমে এখন শুধু জাওয়াদ খান আর কাজল রেখা।
জাওয়াদ খান ধীরে ধীরে কাজল রেখার দিকে এগিয়ে গেলেন। তার চোখে জমে থাকা বছরের পর বছর ধরে বয়ে বেড়ানো অনুতাপ আজ যেন ভাষা খুঁজে পেল। তিনি কাজল রেখার সামনে বসে অত্যন্ত ধীর, কম্পিত গলায় বললেন—

” কাজল রেখা … আমি ভুল করেছি। অনেক বড় ভুল করেছি। সেদিন তোমাকে বিশ্বাস করতে পারিনি, অথচ ছায়ার মতো সবসময় তুমি আমার পাশেই ছিলে। এই অভাগাকে যদি পারো… ক্ষমা করে দিও।”
কাজল রেখার চোখ আবার ভিজে উঠল। তিনি মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থেকে, নিজের আবেগকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন—
” দোষ তো শুধু তোমার একার নয়, জাওয়াদ। আমিও তো দূরে সরে গিয়েছিলাম। অভিমানে, কষ্টে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম… কিন্তু বিশ্বাস করো, একটা দিনও, একটা মুহূর্তও তোমাকে ছাড়া আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি।”
জাওয়াদ খান আর কালক্ষেপ করলেন না। আলতো করে, পরম ভরসায় কাজল রেখার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিলেন।

“এবার আর কোথাও যেতে দেবো না তোমাকে। শক্ত করে ধরে রাখব।”
কাজল রেখা মৃদু কাঁপা ঠোঁটে অশ্রুসজল এক টুকরো হাসি হেসে বললেন—
” আমিও আর কোথাও যেতে চাই না। জীবনের এই শেষ বয়সটা তোমার বুকেই কাটাতে চাই, জাওয়াদ।”
ওদিকে নিজের রুমে ফিরে জিহান তালুকদার তৌহিদার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তৌহিদা স্বামীর সেই ক্লান্ত অথচ ভালোবাসায় পূর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে অপরাধী সুরে বললেন—
“তোমাকে অবিশ্বাস করে, তোমার থেকে দূরে থেকে সবচেয়ে বেশি শাস্তি আমি নিজেকেই দিয়েছি, জিহান।”
তৌহিদার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। জিহান তালুকদার এগিয়ে এসে তৌহিদার চোখের জল মুছে দিলেন। তৌহিদা স্বামীর বুকে মাথা রেখে বললেন—

“আমিও খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি। আর দূরে থাকতে চাই না। তোমার সাথে, তোমার এই বুকে মাথা রেখেই মরার আগের দিন পর্যন্ত থাকতে চাই। আমাদের মেয়েকে নিয়ে আবার একটা সুন্দর সংসার সাজাতে চাই।”
জিহান তালুকদার কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তারপর পরম আবেশে, গভীর ভালোবাসায় তৌাহিদাকে দু-হাতে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিলেন।
বাইরে তখন মৃদু বাতাস বইছে, আর ঘরের ভেতরে বহু বছর পর ভাঙা মন জোড়া লেগে এক নতুন ভোরের গল্প লিখছে।
কাজল ভিলার ওপর আজ যেন এক মায়াবী রাত নেমেছে। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা হাসনাহেনা আর রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস হালকা বাতাসের দোলায় ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। নীলচে আলোর এক মায়াজাল পুরো পরিবেশটাকে কোনো রূপকথার রাজ্যের মতো মোহময় করে তুলেছে।
ফারুক সাহেব আজ যেন তার বয়সের সব জটলা ভুলে এক ঝটকায় ফিরে গেছেন তার তারুণ্যে। ছেলেমেয়েদের হাসির হুল্লোড়ে, খুনসুটিতে মেতে উঠেছেন তিনি। পুরো ছাদটাই যেন এক আনন্দের উৎসবে পরিণত হয়েছে। কখনো তিনি অধীরের পিঠ চাপড়ে মজা করছেন, কখনো রোজকে নিয়ে হাসাহাসি করছেন, আবার কখনো নাভানের কাঁধে হাত রেখে পরম মমতায় শুনিয়ে যাচ্ছেন তার ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর গল্প।

আর হেরা? সে একটু দূরে, ছাদের রেলিং ঘেঁষে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল এই দৃশ্য। এই গম্ভীর মানুষটাকে সে আগে কখনো এতটা প্রাণখুলে হাসতে দেখেনি। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত, অচেনা অনুভূতি মোচড় দিয়ে উঠল তার। এতদিন ধরে মনের কোণে জমে থাকা সব অভিমান আর দূরত্বের বরফগুলো যেন এই হালকা বাতাসে একটু একটু করে গলে জ্বল হয়ে যাচ্ছে।
ওদিকে নাভানের গভীর, সম্মোহনী চোখ দুটো কিন্তু দূর থেকে কেবল হেরার ওপরই নিবদ্ধ ছিল। চাঁদের আলো আর নীল আলোর মিশ্রণে হেরার স্নিগ্ধ মুখটা যেন আরও মায়াবী লাগছিল। যখনই মেয়েটার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠছিল, নাভানের বুকেও যেন প্রশান্তির এক অতল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল। মনে মনে সে ভাবল, “তার এই পরী বউটা আজ সত্যিই ডানা মেলে মেঘের দেশে উড়ছে।”

রাত বাড়তেই কাজল ভিলার কোলাহল কমতে শুরু করল। ঘড়ির কাঁটা তখন দুটো ছুঁইছুঁই। এক এক করে সবাই বিদায় নিতে শুরু করল। রুশা আর অধীর ক্লান্ত পায়ে নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়াল। হেরা এক বুক অস্থিরতা আর ক্লান্তি নিয়ে নিজের ঘরের দরজা আটকে দিল।
কিন্তু রোজকে এত সহজে ছাড়ল না সৃজন। গভীর মায়ায় মেয়েটার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল সে, যেন এই রাতের একটা পলকও সে হারাতে চায় না।
পুরো কাজল ভিলা তখন রাতের আলোয় এক অপার্থিব রূপ ধারণ করেছে। বিশাল গোলাকার এই দোতলা বাড়িটার স্থাপত্যশৈলী চমৎকার। চারপাশ দিয়ে ঘেরা রেলিং দেওয়া গোল করিডর, যেখান থেকে নিচে তাকালেই চোখ জুড়ানো ড্রয়িংরুমটা স্পষ্ট দেখা যায়। দেয়ালে দেয়ালে নীল আলোর আল্পনা আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো ফুলের গন্ধ পুরো বাড়িটাকে এক অবাস্তব মায়ায় জড়িয়ে রেখেছে।
বাড়ির রুমগুলোর বিন্যাসটাও বেশ অদ্ভুত ও সুন্দর। ছাদের সিঁড়ির ঠিক মুখটাতেই নাভানের ঘর। সেখান থেকে দুটো রুম পার হলেই অধীরের ঘর। তারপর আরও কয়েকটা গোলাকার নান্দনিক রুম পেরিয়ে একপাশে রুশা আর রোজের ঘর, আর ঠিক নাভানের রুমের বরাবর উল্টোদিকেই হেরার ঘর।

চারদিকে থমথমে নীরবতা, অথচ হেরার মনের ভেতর তখন কালবৈশাখীর ঝড় বইছে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও সে শান্তি পাচ্ছিল না। তার মনের ভেতর কেবল একটা প্রশ্নই বারবার হাতুড়ি পেটাচ্ছিল—
” তখন অসভ্য গিটার ওয়ালা আসলে সবাইকে রুম থেকে বের করে দিয়ে, দরজা লক করে সবাইকে কী এমন বলেছিল? আর অসভ্য গিটার ওয়ালার চোখ দুটো কেন অতটা ভেজা ছিল? ওনি কি কাঁদছিল?”
কৌতূহলের তীব্রতা হেরা আর সহ্য করতে পারছিল না। নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ আর বিরক্তি লাগছিল তার। কেন বারবার ওই অসভ্য, জেদি ‘গিটার ওয়ালা’র কথাই তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে? কেন ওই মানুষটার মুখোমুখি হলেই বুকের ভেতরটা এভাবে কেঁপে ওঠে?
কিন্তু নারীর মন বড় বিচিত্র। কৌতূহলের কাছে হেরে গিয়ে সে বিছানা ছাড়ল। পা টিপে টিপে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল নাভানের বন্ধ দরজার সামনে। দ্বিধাদ্বন্দ্বে কাঁপতে থাকা হাতটা বাড়িয়ে দরজাটা সামান্য ঠেলতেই তা আলতো করে খুলে গেল।
ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যেন এক কালো কোলাহলহীন নিস্তব্ধতা। হেরা ভ্রু কুঁচকে ভাবল–

“ হয়তো ঘুমিয়ে গেছে।
সে যেই না স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফিরে যেতে চাইল, অমনি অন্ধকারের বুক চিরে এক গম্ভীর, পৌরুষদীপ্ত মখমলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
“এত রাতে আমার রুমে… কী ব্যাপার ?”
অন্ধকারের গভীর খুনসুটি। হেরা চমকে উঠে বুকের ওপর হাত রাখল। হৃদস্পন্দন যেন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে জড়তা জড়ানো গলায় বলল —
“ আসলে… তখন সবাইকে একা রুমে নিয়ে কী বলেছিলেন… ওইটা জানতে এসেছি।”
অন্ধকারের মাঝে নাভানের ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল, যা হেরা দেখতে পেল না। কিন্তু অনুভব করতে পারল। নাভান ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল—
“ সত্যিই ওইটা জানতে এসেছ? নাকি মাঝরাতে বরের সাথে একটু সময় কাটাতে মন চাইল?”
নাভানের এমন সরাসরি তীরের মতো কথায় হেরা ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে গেল। মুখঝামটা দিয়ে বলল —
“ আপনার সাথে সময় কাটাতে আমার বয়েই গেছে!”
“ তাহলে বারবার ঘুরেফিরে আমার কাছেই কেন ছুটে আসো, হেরা?”
নাভানের কণ্ঠস্বর এখন আরও কাছে, আরও গভীর।

“ আমি শুধু জানতে এসেছি। বলুন, শুনেই আমি চলে যাব।”
নাভান এখন হেরার একেবারে কাছাকাছি। তার শরীরের পারফিউমের তীব্র পুরুষালী সুবাস হেরার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল। নাভান ফিসফিস করে বলল—
“ বলেছিলাম… বাসর ঘর রেডি করার জন্যই বিয়েটা করেছি। অনেক দিন তো হলো, আমার বউটা আমার চোখের সামনে দিয়ে সিঙ্গেল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর কত?”
হেরার চোখ দুটো অনায়াসে বড় বড় হয়ে গেল। অপমানে আর লজ্জায় লাল হয়ে সে বলল—
“ কী! আপনি আব্বুর সামনে এসব বলেছেন? মিথ্যে কথা! একদম বানিয়ে বলছেন!”
নাভান আরও এক কদম এগিয়ে এসে হেরার নিশ্বাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলল,
“ মিথ্যে নাকি সত্যি… সেটা যাচাই করার জন্যই তো এত রাতে চোরের মতো আমার রুমে এসেছ। আমার কথা বিশ্বাস না হলে কাল সকালে তোমার আব্বু-আম্মুকে জিজ্ঞেস করেই দেখো !
হেরা নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে অসহায় গলায় বলল—
“ যদি অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করার উপায় থাকত, তবে আপনার মতো লোকের কাছে আমি আসতামই না।”

“ তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমি যা বলেছি সেটাই একমাত্র সত্যি।”
নাভানের কণ্ঠে জয়ের আনন্দ।
হেরা আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকা নিরাপদ বোধ করল না। বিরক্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল–
“ ঠিক আছে, জানা হয়ে গেছে। আমি যাচ্ছি।”
কিন্তু নাভান তাকে সেই সুযোগ দিলে তো! মুহূর্তের মধ্যে একটা শক্ত, উষ্ণ হাত হেরার নরম কবজিটা চেপে ধরল। তীব্র এক বৈদ্যুতিক তরঙ্গ যেন হেরার সারা শরীরে খেলে গেল। সে শিউরে উঠে বলল—
“ হচ্ছেটা কি ? ছাড়ুন আমাকে!”
নাভান টান দিয়ে হেরাকে নিজের তপ্ত বুকের একদম কাছাকাছি নিয়ে এলো। হেরার পিঠ ঠেকে গেল নাভানের শক্ত বুকে। নাভান তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বলল–
“ মানে খুব সহজ, মিসাইল গার্ল । মাঝরাতে একটা মেয়ে নিজের ইচ্ছায় তার বরের রুমে হেঁটে চলে এসেছে… এখন বর যদি একটু রোমান্টিক হতে চায়, তবে কি খুব বেশি অপরাধ হবে? এই ধরো, তোমাকে এভাবে শক্ত করে ঝাপটে ধরে যদি সারা রাত ঘুমিয়ে থাকি?
হেরার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। এই পুরুষের মায়াবী স্পর্শ আর আকুলতা তাকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে। সে কাঁপানো গলায় বলল—

“ আপনি… আপনি এমন কিচ্ছু করবেন না আমার সাথে।”
নাভান এবার আরও নিচে নামল। তার ঠোঁট দুটো প্রায় হেরার কানের লতি ছুঁয়ে যাচ্ছে। ফিসফিসিয়ে বলল—
“ আমি তো অনেক কিছুই করতে পারি, হেরা… ধরো, হুট করে তোমার এই অবাধ্য ঠোঁট দুটোতে টুপটাপ কিছু মিষ্টি চুমু খেয়ে ফেললাম!
লজ্জা, রাগ আর এক অবর্ণনীয় উন্মাদনায় হেরা কেঁপে উঠল। চিৎকার করতে গিয়ে গলা দিয়ে চেনা সুর বের হলো।
“ছিঃ! আপনি এত জঘন্য! উপরে উপরে সাধু সাজেন, আর ভেতরে ভেতরে আস্ত একটা লুচ্চা!”
নাভান এবার শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল এক বুক ভালোবাসা। সে বলল–
“আমি যত রোমান্টিক হব, আমার বউ তত বেশি সুখে থাকবে। তোমার তো গর্ব হওয়া উচিত যে তোমার বরটা এতটা রোমান্টিক, এতটা পাগল তোমার জন্য!”
“ কিসের বর? আমি এসব বিয়ে-শাদি কিচ্ছু মানি না!” হেরা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগল।

“ মানো না? ওকে চলো, আজ রাতেই তবে বাসরটা সেরে ফেলি? দেখবে কাল সকাল হতেই সব নিজে নিজেই মেনে নিয়েছ।”
কথাটা শেষ করেই নাভান হেরাকে এক ঝটকায় নিজের আরও গভীরে টেনে নিল। তার চোখ জোড়া তখন ভালোবাসার তীব্র নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। হেরা যখন নাভানের শক্ত বুকে দুহাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, নাভান তখন মায়াবী এক সম্মোহনে হেরার অধরের দিকে ঝুঁকে এলো।
আর ঠিক তখনই—
“আহ্!”
নাভানের মুখ থেকে একটা মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। হেরা আর কোনো উপায় না পেয়ে ঠিক আগের জায়গাতেই— নাভানের বুকের বাঁ পাশে, হৃদপিণ্ডের ঠিক ওপরটায় নিজের ধারালো দাঁত বসিয়ে দিয়েছে।
তীব্র ব্যথায় নাভানের চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার ঠোঁটের কোণের সেই মনকাড়া মায়াবী হাসিটা মলিন হলো না। হেরা সেই সুযোগে নিজেকে মুক্ত করে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং নিজের রুমে গিয়ে ধড়াম করে দরজাটা আটকে দিল। নাভানের অপেক্ষা ও হেরার ব্যাকুলতা
নিজের ঘরের দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে হেরা হাপাচ্ছে। তার বুকের ভেতর যেন কোনো এক বুনো ঘোড়া দৌড়াচ্ছে। মুখ-কান লজ্জায় আর উত্তেজনায় টকটকে লাল হয়ে গেছে। নিজের ওপরই প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে সে বিড়বিড় করল—

“কেন গেলাম আমি ওই লোকটার কাছে? কেন?”
কিন্তু তার মনের গভীরের এক গোপন কোণ খুব ভালো করেই জানে— নাভানের ওই তীব্র পুরুষালী সুবাস, ওই গভীর কণ্ঠস্বর, আর ওই মায়াবী চোখের চাহনি এক নিমেষে হেরার সাজানো গোছানো পৃথিবীটাকে ওলটপালট করে দেয়। তার প্রতিটা ছোঁয়া হেরাকে এক অদ্ভুত ঘূর্ণিপাকে ফেলে দেয়, যেখানে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।
ওদিকে নিজের অন্ধকার ঘরে নাভান বুকের বাঁ পাশে, যেখানে হেরা কামড়ে দিয়েছে, সেখানে হাত বুলিয়ে এক স্বর্গীয় হাসিতে মেতে উঠল। একই জায়গায় মেয়েটা আবার আঘাত করেছে। সে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। অন্ধকার ঘরে তার কণ্ঠস্বর এক গভীর, তীব্র প্রেমে অনুরণিত হয়ে উঠল—
“আমার অক্সিজেন… তুই একটা তীব্র নেশা রে। তুই কাছে এলে আমার নিজের ভেতরের সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। আমি জেনেশুনে এই নেশায় ডুবতে চাই। আমি শুধু অপেক্ষা করছি সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যেদিন তুই নিজে এসে আমার বুকে মাথা রেখে বলবি— ‘আমি শুধু তোমার।
তার কণ্ঠস্বর আরও গভীর, আরও আবেগঘন হয়ে উঠল—

“ তুই এখন মুখে যতই অস্বীকার করিস না কেন… দূরে সরে থাকিস… রাগ দেখাস… কিন্তু তোর ওই হরিণীর মতো চোখ দুটো আমাকে কখনো মিথ্যে বলতে পারে না। তোর এই অবাধ্য কাঁপা নিশ্বাস, এই ভেতরের অস্থিরতা… সব স্পষ্ট বলে দেয় যে তুইও একটু একটু করে হারছিস আমার কাছে।”
নাভান হালকা হেসে চোখ মেলল। অন্ধকারের মাঝেও তার চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করছে। সে একা একাই বলল—
“ আমি তোর অনুভূতিকে জোর করে, ক্ষমতার জোরে ছিনিয়ে নিতে চাই না, আমার পরী বউ। আমি চাই তুই তোর সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে নিজে থেকে আমার কাছে ধরা দিবি। একটু একটু করে আমাকে ভালোবাসবি, আমার জন্য পাগল হবি। আমার ছোঁয়ায় শিউরে উঠবি। আমি তোর ক্ষতি হয় এমন কিছু কখনো করতেই পারব না। হোক না একটু দেরি, তাতে কী? শেষ অব্দি তুই তো আমারই হবি।****
সে নিজের হৃদপিণ্ডের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে শেষবারের মতো বলল,
“খুব তাড়াতাড়ি তোর সব ভুল ভাঙাবো আমি। তুই নিজেই একদিন বুঝবি… তুই যতটা আমার থেকে পালাতে চাস, তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি তুই আমার এই বুকেই হারিয়ে যেতে চাস।****
ওদিকে নিজের বিছানায় শুয়ে হেরা বারবার নিজের আঙুল দিয়ে ঠোঁট দুটো ছুঁয়ে দেখছে। ঘরের ফ্যান ঘুরছে, অথচ তার মনে হচ্ছে নাভানের গায়ের সেই পুরুষালি tomford ব্রান্ডের পারফিউম সুবাস এখনও তার চারপাশটায় লেপ্টে আছে। এই তীব্র অনুভূতিতেই নিজের ওপর রাগ করে সে বালিশে মুখ গুঁজে দিল এবং বলল—

“ অসভ্য লোক একটা…”
কিন্তু বালিশের অন্ধকারেও তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে না বলা, গোপন সুখের হাসি ঠিকই ফুটে উঠল।
ছাদের অন্যপ্রান্তে প্রেমের আলো-ছায়া
এদিকে কাজল ভিলার ছাদের অন্য প্রান্তে, যেখানে চাঁদের আলো সরাসরি এসে পড়েছে, সেখানে সৃজন আর রোজ চুপচাপ বসে আছে। চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন তাদের প্রেমের সাক্ষী। রোজ পরম নিশ্চিন্তে তার মাথাটা সৃজনের চওড়া কাঁধে হেলিয়ে দিয়েছে। দুজনের মুখে কোনো কথা নেই, অথচ এই নীরবতাই যেন তাদের হাজারটা না বলা শব্দের চেয়েও বেশি মধুর লাগছিল।
সৃজন আলতো করে রোজের নরম আঙুলগুলোর মাঝে নিজের আঙুল গলিয়ে দিল। এক অদ্ভুত ভালোলাগায় সে বলল—
“ জানো ফুল জান … এই মুহূর্তটা যদি এখানেই থমকে যেত, তবে কতই না ভালো হতো।”
রোজ মৃদু হেসে সৃজনের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো–

“ তাহলে তো সারাজীবন আমাদের এভাবেই ছাদের কোণে বসে থাকতে হতো।”
“ তাতে সমস্যা কী?” সৃজন রোজের হাতের ওপর চাপ বাড়িয়ে বলল, “তুমি পাশে থাকলে আমার এই নশ্বর পৃথিবীর আর কিচ্ছু লাগবে না।”
ওদিকে অধীর তখন গুটিগুটি পায়ে, চোরের মতো এসে দাঁড়িয়েছে রুশার ঘরের সামনে। দরজায় মৃদু টোকা দিতেই ভেতর থেকে রুশার চরম বিরক্ত ও ঘুম জড়ানো গলা ভেসে এলো—
“কে?”
অধীর ঠোঁটের কোণে চিরচেনা সেই দুষ্টু হাসিটা ঝুলিয়ে বলল,
“ ঘুমানোর আগে আমার চাঁদের মতো বউটাকে একবার না দেখলে যে আমার চোখে ঘুম আসে না, রূপবতী!”
দরজাটা খুলতেই রুশা বড় বড় চোখ করে তাকাল, ভ্রু কুঁচকে বলল—
“এতো ঢং করছেন কেন বলুন তো?”
“তোমার জন্যই তো এত ঢং!” অধীর এক কদম এগিয়ে এলো।
“ কেউ দেখলে কী হবে বলুন তো? যান নিজের রুমে যান!” রুশা চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল।
“ উঁহু, যাব না। একটা ‘গালটুস’ (গালে চুমু) খেয়ে চলে যাব, সত্যি বলছি আর ডিস্টার্ব করব না।” অধীর বায়না ধরা শিশুর মতো বলল।

সেই কখন থেকে দরজায় টুকাটুকি করছে অধীর। রুশা খুব ভালো করেই জানে, এই পাগল ছেলেটা তার গালে একটা টান না দিয়ে বা আদর না করে আজ রাতে কিছুতেই যাবে না। বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে সে দরজাটা একটু বেশি করে খুলল। কিন্তু অধীর এবার আর বরাবরের মতো গালে টান দিল না। রুশা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অধীর ঝট করে রুশার নরম গালে নিজের উষ্ণ ঠোঁট দুটো ডুবিয়ে দিল এবং এক সেকেন্ডের মধ্যে এক দৌড়ে নিজের রুমের দিকে ছুট লাগাল।
রুশা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভেবেছিল অধীর হয়তো বরাবরের মতো গালটা টেনে দিয়ে চলে যাবে, কিন্তু না! এই ছেলেটার ডিমান্ড তো দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে!
রুশা মুচকি হাসল। নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে সে নিজের গালের সেই অংশটা স্পর্শ করল, যেখানে একটু আগে অধীরের ভেজা, গোলাপী ঠোঁট জোড়া লেগেছিল। জায়গাটা এখনও কেমন যেন একটা ওলটপালট করা অনুভূতি দিচ্ছে। রুশা নিজেই নিজের গালে হাত দিয়ে অধীরের মতো করে একটা চুমু খাওয়ার ভান করল।
আচমকাই তার বুকের ভেতর এক পরম শান্তির হাওয়া বয়ে গেল।
” বাহ! ব্যাপারটা তো আসলেই দারুণ!
এক অদ্ভুত মায়াবী আবেশে জড়িয়ে রুশা রোজের জন্য ঘরের দরজাটা আলতো করে চাপিয়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কাজল ভিলার ওপর তখন ভালোবাসার নীল চাদর বিছিয়ে দিয়ে রাতটা আরও গভীর হতে লাগল।

গভীর রাত।
চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাকে মাঝেমধ্যে নীরবতা কেঁপে উঠছে। শহর ঘুমিয়ে থাকলেও কারাগারের ভেতর সেই ভারী, ঠান্ডা পরিবেশে যেন অদ্ভুত এক দমবন্ধ করা অনুভূতি জমে আছে।
মাথায় হুড টেনে, খুব সাবধানে ভিতরে ঢুকে পড়ে নিলয়। পরিচিত এক গার্ডকে মোটা অঙ্কের টাকা গুঁজে দিয়েই আজ এই দেখা করার সুযোগ পেয়েছে সে। এত রাতে আসার একটাই কারণ— বাবার সাথে কথা বলা খুব দরকার।
লোহার শিকের ওপাশে বসে থাকা শামসুল আজমীর চৌধুরী ছেলেকে দেখেই হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। ক্লান্ত চোখদুটো মুহূর্তেই ভিজে উঠল। যেন এই প্রথম তিনি নিজের একমাত্র আশ্রয়কে সামনে দেখলেন।
” বা… বাবা… আমি তোমায় বের করবো। একটু অপেক্ষা করো… প্লিজ।
নিলয়ের গলা কেঁপে উঠল।বাবাকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় এই প্রথম দেখছে নিলয়। সবসময় বাবাকে যে অবস্থায় দেখেছে। এই বয়সে এসেও বয়স ধরতে পারেন না ব্যক্তিকে এখন হটাৎ বয়স্ক লাগছে।
শামসুল ধীরে ধীরে শিকের ফাঁক দিয়ে ছেলের হাত ধরলেন।বাবার চোখের নিচে কালি, চেহারায় ভাঙাচোরা ক্লান্তি। এই ক’দিনেই যেন অনেকটা বদলে গেছে সে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে শামসুল নিচু গলায় বললেন—

” বাবার উপর রেগে নেই তো, my son?
নিলয় মাথা নিচু করে হালকা হাসল। সেই হাসিতে কষ্ট ছিল, অভিমান ছিল, আবার অদ্ভুত এক মায়াও ছিল।
” রেগে থেকে কি করবো বাবা? যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। কিন্তু এখন তো তুমি চাও হেরা আমার হোক… আর এই দুনিয়ায় তুমি ছাড়া আমার আর কেউও নেই। তোমার উপর রাগ করবো কিভাবে?
কথাগুলো শুনে শামসুল আজমীর চৌধুরীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
এই ছেলেটার ভেতর এত নরম একটা মন আছে— তিনি কোনোদিন বুঝতেই পারেননি। বুঝবেনই বা কীভাবে? সারাজীবন তো ছেলের থেকে দূরেই ছিলেন। টাকা, ক্ষমতা, সম্পদ… সবকিছু দিয়েছেন, কিন্তু ভালোবাসা? সময়? সেগুলো কোনোদিন দেওয়া হয়নি।
আজ প্রথমবারের মতো নিজের ব্যর্থতা তাকে ভেতর থেকে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল।
হঠাৎ করেই বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ মাথা তুলে দাঁড়াল।
এডভোকেট কাজল রেখার উপর প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল তার। কেন সেই মহিলা তাকে কখনো মেনে নেয়নি? কেন তার সৎ বাবা সম্পত্তি দিতে রাজি ছিলেন না? কেন ছোটবেলা থেকে “জারজ” উপাধি শুনে বড় হতে হয়েছে? কেন রাস্তাঘাটে মানুষ অপমান করেছে?
তার মনে হতে লাগল—

এই পৃথিবী যদি তাকে একটু ভালোবাসা দিত, একটু সম্মান দিত… তাহলে হয়তো আজ তার জীবন, তার ছেলের জীবন এতটা অন্ধকারে ডুবে যেত না।
দুই দুইটা বিয়ে করেছে। অসংখ্য মেয়ের সাথে সময় কাটিয়েছে। তবুও কাজল রেখাকে ভুলতে পারেনি কখনো।
আর সেই অপূর্ণতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ভয়ংকর এক জেদ।
মুহূর্তেই তার চোখের কোমলতা বদলে গেল।
ভেতরের মানুষটা আবার শক্ত, নিষ্ঠুর হয়ে উঠল।
ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন—
” দুই দিনের ভিতর… এডভোকেট এম.এল.এ কাজল রেখা নিজে আমায় এই জেল থেকে বের করবে।
নিলয় কপাল কুঁচকে তাকাল। শামসুল আরো নিচু গলায় বললেন—
” সবাইকে আলাদা করে দাও। মানুষ একসাথে থাকলে শক্ত থাকে… আলাদা হয়ে গেলে ভাঙতে সময় লাগে না।

বন্ধুত্ব নষ্ট করো… বিশ্বাসে ফাটল ধরাও… তাহলেই সব সহজ হয়ে যাবে।
নিলয় চুপচাপ বাবার কথা শুনতে লাগল।
শামসুল আরো কিছু পরিকল্পনার কথা বললেন। প্রতিটা কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল নিলয়। তারপর ধীরে ধীরে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক অন্ধকার। অনেকদিন পর ভার্সিটিতে আসে নিলয়। ক্যাম্পাসে পা রাখতেই চারপাশে ফিস-ফাস শুরু হয়ে যায়।
কেউ সরাসরি তাকাচ্ছে, কেউ আড়ালে কথা বলছে।
সবাই যেন তাকে নিয়েই ব্যস্ত। নিলয়ের ভেতরটা রাগে জ্বলতে লাগল।
এই ক’দিন ঘর থেকেও ঠিকমতো বের হতে পারেনি সে। বাবার কেস, মানুষের কথা, মিডিয়ার গুঞ্জন— সবকিছু তার দমবন্ধ করে তুলেছে। আর সে সবকিছুর দায় দিচ্ছে হেরাদের পরিবারকে।
তার মনে হচ্ছিল—

ওরা যদি সেদিন সবার সামনে এত কিছু না বলত, তাহলে অন্তত আজ তাকে মাথা নিচু করে চলতে হতো না।
ভার্সিটির সামনে ক্লাব রুমটার দিকে একপলক তাকিয়েই দাঁত চেপে ফেলল সে। জায়গাটার সাথে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে দোতলায় উঠে যায় নিলয়। আগেই এক ছেলেকে বলে রেখেছিল যেন খবর দেয় হেরা এলে।
গত কয়েকদিন ধরে হেরাকে খুঁজেই পাচ্ছিল না সে। বেশিরভাগ সময় কাজল রেখার সাথেই থাকে মেয়েটা।
ওদিকে রোজ, রুশা, হেরা , আড্ডা দিচ্ছিলো হটাৎ তাদের ক্লাসমেট একটা মেয়ে রোজ আর রুশাকে বাহানা দিয়ে নিয়ে যায়। রোজ রুশা জেতে হেরা একা পড়ে যায় করিডোরে।
ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় নিলয়।
হেরা থমকে যায়।
এই ক’দিনে শামসুল আজমীর চৌধুরীর ব্যাপারে সব জেনেছে সে। নিলয়কে দেখেই বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে নিলয় আজ শান্ত।
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল—

” আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছো নাকি? এতদিন তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি… এখনও করবো না।
তুমি আমাকে বন্ধু ভাবতে, তাই না? তাহলে আজ সেই বন্ধুকেই ভয় লাগছে?
হেরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
” তা না… হঠাৎ দেখে একটু awkward লাগল। কেমন আছো?
নিলয় হালকা হেসে বলল—
” যেমন তুমি আর তোমার পরিবার রেখেছো।
কথাটায় কষ্ট ছিল।
অভিযোগও ছিল। হেরা ধীরে বলল—
” আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম… এটা হওয়ার না। তারপরও কেন এতদূর গেলে নিলয়?
নিলয়ের চোখ হঠাৎ লাল হয়ে উঠল।
” আমার বাবাকে সবাই অপদস্থ করবে আর আমি চুপ করে থাকবো? সেটা পারি না আমি।
হেরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল—

” এটা তাদের পুরোনো হিসাব, নিলয়। সেখানে আমাদের জড়ানো উচিত ছিল না।
তুমি তো যথেষ্ট mature… বোঝার মতো জ্ঞান তোমার আছে। তোমার বাবা কি কি করেছে, সেগুলো নিশ্চয়ই তুমি জানো।
নিলয় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রথমবারের মতো যেন তার ভিতরের শক্ত দেয়ালটা একটু ভাঙল।
অনেকক্ষণ পরে খুব ধীরে বলল—
” আমি… বাবার হয়ে লজ্জিত, হেরা।
অনেক লজ্জিত।
হেরা অবাক হয়ে তাকাল। নিলয়ের চোখ ভিজে উঠেছে।
” জানো… ছোটবেলা থেকে শুধু বাবাকেই নিজের মানুষ ভেবেছি। তাই উনার ভুলগুলোও ঠিক মনে হতো। কিন্তু এখন… এখন বুঝি কিছু ভুল এত বড় হয়, যেগুলোর কোনো justification হয় না।
হেরা কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ শুনতে লাগল।
নিলয় আবার বলল—

” আমি জানি তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি। তোমাকে pressure দিয়েছি। তোমার family কে hate করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো… তোমাকে কখনো সত্যি সত্যি hurt করতে চাইনি।
তুমি আমার জীবনের খুব সুন্দর একটা অংশ ছিলে, হেরা। হয়তো আমি সেটা ধরে রাখতে গিয়ে সব নষ্ট করে ফেলেছি।
তার গলা ভারী হয়ে এলো।
” পারলে… ক্ষমা করে দিও আমাকে।
করিডোরে নীরবতা নেমে এলো। হেরা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার চোখেও মায়া জমেছে।
” সবকিছু আগের মতো হবে না, নিলয়। কিন্তু একটা কথা সত্যি… আমি কখনো তোমাকে খারাপ মানুষ ভাবিনি। তুমি ভুল পথে গেছো, কিন্তু পুরোপুরি খারাপ হয়ে যাওনি। সময় আছে তোনার বাবার মতো হবে না।
” আমি সব সম্পর্ক নষ্ট করে বন্ধুত্বর সম্পর্কেই থাকতে চাই হেরা।
নিলয় নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল কথাটা বলে ।
হেরা ছোট্ট করে হাসল।

” বন্ধুত্ব যদি সত্যি হয়ে থাকে… তাহলে সেটা একদিন না একদিন ঠিক ফিরে আসে। আমি জানতাম তুমি বুঝতে পারবে আমি তোমাকে সব সময় বন্ধুর চোখেই দেখেছি নিলয়। তাই এতকিছুর পরও তোমার উপর অভিযোগ তুলতে পারিনি।
নিলয়ের বুকের ভেতরটা হঠাৎ হালকা লাগল।
অনেকদিন পর যেন অন্ধকারের মাঝেও এক টুকরো আলো খুঁজে পেল সে। সেই আলোটা ঠিক আশা না, ঠিক স্বপ্নও না—তার চেয়েও বেশি কিছু। হয়তো হেরা’র একটা সাধারণ স্বীকারোক্তি, “বন্ধু” শব্দটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত শান্তি। সে তাকে বিশ্বাস করে। আর যাকে ভালোবাসে মানুষ তাকেই তো বিশ্বাস করে। তার মানে হেরার মনে তার জন্য ভালোভাসা আছে ব্যাস। এতেই নিলয় এর মন প্রাণ শান্তি এতোটুকু বুঝে।
নিলয় ধীরে ধীরে শ্বাস নিল। মুখে কোনো অতিরঞ্জিত আনন্দ নেই, কিন্তু চোখে এক ধরনের নীরব তৃপ্তি।
হেরা তখন তার দিকে তাকিয়ে ছিল স্বাভাবিকভাবে। চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধাও নেই। বরং একটা পরিষ্কার বিশ্বাস।
নিলয় বলল,

“তাহলে বন্ধুত্ব মানছো তো হেরা…?
হেরা একটু থেমে মাথা নেড়ে বলল–
“আমি প্রথম থেকেই তোমাকে মনেপ্রাণে বন্ধু মেনেছি, নিলয়।
শব্দগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু নিলয়ের কাছে যেন বুকের ভেতর কিছু একটা থেমে গেল। এতদিন যেটা সে চেয়েছিল—একটা স্বীকৃতি—আজ সেটা এত সহজভাবে পেয়ে যাবে, সে ভাবেনি।
নিলয় বলল–
“যাক… হাজার হাজার শুকরিয়া। ভালোবাসার মানুষটা অন্তত আমাকে বন্ধুর জায়গায় রাখতে পেরেছে। এতকিছুর পরও তুমি আমাকে ঠেলে দাওনি, দূরে সরিয়ে দাওনি। এটাই তো সাত জন্মের ভাগ্য।
নিলয় এবার চোখ নামিয়ে নিল। গলায় একটা ভারী নরম কাঁপন। হেরা বললো —
“তেমন কিছু না, নিলয় … আমি জানি তুমি খারাপ না। আমার বন্ধুরা কখনো খারাপ হতে পারে না।”
হেরা একটু হেসে ফেলল। নিলয় অবাক চোখে বললো —
“এত বিশ্বাস আমার ওপর… অথচ আমার বাবা তোমার পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছে।আর আমি না বুঝে বাবার সাথে যুক্ত হয়েছি। আর তুমি আমায় ভুল বুঝোনি!
নিলয়ের চোখে তখন একটা অদ্ভুত আলো-ছায়ার খেলা। নিলয় কে অপরাধবোধে সিক্ত হতে দেখে হেরা বললো —

“এটাই তো বন্ধুত্বের বিশ্বাস, নিলয় । একটা সম্পর্কে সবার আগে বিশ্বাস থাকা জরুরি। আর আমি জানি, তোমার দ্বারা আমার কোনো ক্ষতি হবে না।
নিলয় এবার একটু সিরিয়াস হয়ে বলল—
“ আজ আর কিছু বলার নেই। এখানে এসেছি শুধু তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে। এতকিছুর মাঝে আমিও নিজেকে বুঝতে শিখেছি। তুমি সবসময়ই ছিলে… আমার ভালোবাসার বন্ধু!
একটা ছোট নিঃশ্বাস নিয়ে সে আবার বলল—
“রাজনীতিতে আমি নেমেছিলাম তোমাকে ভুল বুঝে। হয়তো তোমার মনটা বড় ছিল বলেই আমাকে বন্ধু হিসেবে জায়গা দিয়েছো। যাই হোক… ভবিষ্যতে হয়তো ভালোবাসার দাবি নিয়ে আসব না । কিন্তু বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে আসলে তুমি আবার রাগ করবে না তো?
” না! রাগ করবো না ”
নিলয় এবার একটু হাসল। খুবই ছোট, খুবই ভাঙা একটা হাসি।

কিন্তু তার চোখে তখন অন্য কিছু চলছিল। এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত, এক নীরব বিদায়। সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“তাহলে আজ আসি, হেরা… ভালো থেকো।”
হেরা চমকে উঠল।

“কোথায় যাবে তুমি?”
নিলয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল–
“জানি না। তবে চলে যাব। বাবা ছাড়া এখানে আর কিছু নেই। আর বাবার পাশে দাঁড়িয়েছি তার শাস্তি তো আমাকেও পেতে হবে।”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে আবার বলল।
“আমি মাঝে মাঝে তোমার সাথে দেখা করব… যতদিন আছি।”
হেরা কিছু বলতে পারল না। নিলয় হাত বাড়িয়ে দিল।
হেরা একটু দ্বিধা করল। তারপর ধীরে ধীরে হাত রাখল নিলয়ের হাতে। এক মুহূর্তের স্পর্শ। নিলয়ের হাতটা যেন স্থির হয়ে গেল।
“ভালো থেকো, নিলয়…”
নিলয় মুচকি হাসল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের হাতটা মুঠো করে নিল, যেন সেই স্পর্শটা হারিয়ে না যায়।
“তুমিও ভালো থেকো।”
তারপর সে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
হেরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চেনা মানুষটা যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেল। নিলয়ের পিঠটা যত দূরে যাচ্ছে, ততই তার ভেতরের জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে—কিছুটা শান্তি, কিছুটা ব্যথা, আর এক অজানা টান।
বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল সিয়াম। গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে সে অপেক্ষা করছিল। নিলয়কে দেখেই সে ভ্রু কুঁচকে বলল-

“কিরে, তুই হাত এমন প্যাকেট করে রেখেছিস কেন?”
নিলয় থেমে গেল। ধীরে ধীরে নিজের হাতের দিকে তাকাল। যেন প্রথমবার দেখছে। তার চোখে তখন জ্বল নেই, কিন্তু একটা ভারী শূন্যতা।
সে খুব আস্তে বলল–
“এখানে… আমার হেরা ফুলের ছোঁয়া লেগেছে।”
সিয়াম চুপ হয়ে গেল। নিলয় আবার বলল–
“এই হাতটা এখন যত্নে রাখবো, অন্য কোথাও স্পর্শ করা যাবে না মুছে যাবে। পরে এই ছোঁয়াটা আর কোথাও পাব না।
সিয়াম কিছু বলতে পারল না। শুধু নিলয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
নিলয় গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল, কিন্তু তার পা যেন মাটির সঙ্গে ঠিকমতো লাগছে না।
সিয়াম চোখ নামিয়ে ফেললো —এই মানুষটা শুধু ভালোবাসা হারায়নি… সে নিজের ভেতরেও কিছু একটা শেষ করে ফেলেছে। চোখ মুছে ড্রাইভ করে সিয়াম ।

হেরাকে ক্লাবে আসতে বলেছিল নাভান।
খবরটা শোনার পর থেকেই মেয়েটার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ধুকপুকানি শুরু হয়েছিল।
কারণ সে খুব ভালো করেই জানে— নাভান যখন শান্ত গলায় ডাকে, তখনই সবচেয়ে ভয়ংকর ঝড়টা জমে থাকে তার ভিতরে।
এই ছেলেটাকে সবাই বাইরে থেকে যতটা নরম ভাবে… রাগের সময় সে ঠিক ততটাই ভয়ংকর।
আর হেরা সেই রূপটা আগেও দেখেছে।
চুপচাপ ডেকে, ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে মানুষকে এমনভাবে ভেঙে দেয়— যেন শব্দ ছাড়াই যুদ্ধ জিতে নেয়।
তাই আজ ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়েই হেরার হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। গুটি গুটি পায়ে ভিতরে ঢুকতেই অধীর দূর থেকে তাকিয়ে থমকে গেল। তারপর দ্রুত হেঁটে এসে ফিসফিস করে বলল—
“কি করেছো তুমি, cutiepie বোনু? আমার chocolate hero ব্রো আগুন হয়ে আছে কেন?”
হেরা শুকনো ঢোক গিলল।
” রেগে আছে?”
অধীর নাটকীয়ভাবে ঘড়ির দিকে তাকাল।
” তোমাকে exactly five minutes দিয়েছে। আর বিশ্বাস করো… পাঁচ মিনিট পার হলে ভাইয়ের patience expire হয়ে যায়।।জলদি যাও।

হেরার বুকটা ধক করে উঠল। চারপাশে তাকাতেই বুঝল— আজ ক্লাবের পরিবেশটাই অন্যরকম।
সাধারণত যেখানে সবাই হইচই করে, হাসে, গান বাজে… আজ সেখানে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। রোজ পাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে আছে। ঝিনুক এদিক-ওদিক হাঁটছে। আর সবার চোখে একই ভয় নাভান***
কারণ তারা সবাই জানে— এই ছেলেটা হেরাকে কতোটা নিজের ভাবে। আর যাদের খুব বেশি আপন ভাবে , তাদের নিয়েই সে সবচেয়ে বেশি উন্মাদ হয়ে যায়। সেখানে তো হেরা তার বউ তার ভালোবাসা, যদিও মুখে নাভান বলে নি। কিন্তু তাতে কি বন্ধুর মন যে অনেক আগেই পরে নিয়েছে সবাই।
হেরা ধীরে ধীরে ক্লাবরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাত কাঁপছে। শ্বাস আটকে আসছে। ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই দেখল— নাভান চেয়ার ঘুরিয়ে বসে আছে। হাতে ফোন। কিন্তু ফোনের স্ক্রিন বন্ধ। সে শুধু সময় দেখছিল। অপেক্ষা করছিল।
রুমের বাতাস পর্যন্ত ভারী হয়ে আছে।
হেরার পারফিউম এর গন্ধ নাকে আসতেই ধীরে ধীরে চেয়ার ঘুরাল নাভান। চোখ দুটো এত ঠান্ডা… যে হেরার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। সৃজন পাশে দাঁড়িয়ে আস্তে বলল—
“ ভাই… আমার বোনটা ছোট মানুষ। ভুল করে ফেলছে। মাফ করে দে।”
নাভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—

“তোদের বোনের সাথে আমি বাসর করছি না। আর না তোরা বাসর সাজিয়ে রেখেছিস। So, বাজে বকবক বন্ধ করে বের হ।”
সৃজন বিরক্ত হয়ে বলল—
“ আরে বুঝিয়ে বলবি—”
“বুঝিয়ে বলব না আদর করে বলব, সেটা তোদের কাছ থেকে শিখব?”
রুমের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল। সৃজন এবার একটু রেগে গেল।
“ভাই, ছোট মানুষ বুঝতে পারে নাই—”
হঠাৎ নাভান গর্জে উঠল।
“বের হ!”
পুরো রুম কেঁপে উঠল যেন।
“তা না হলে আমার বোনের সাথে দশদিন দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ!”
সৃজন দাঁত চেপে হেরার দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে ভয় দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল তার। তবুও কিছু বলল না। কারণ সে জানে— এখন নাভানকে থামানো যাবে না। যেতে যেতে বিড়বিড় করল—
“অসভ্য guitar wala একটা…”
দরজা বন্ধ হতেই পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।তারপর—

টিক।নাভান দরজা লক করল। শব্দটা শুনেই হেরার বুক কেঁপে উঠল। তার হাতে ধরা কলমটা আরও শক্ত হয়ে গেল। নাভান ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।
এক পা। দুই পা। তার চোখে এমন এক রাগ… যেন ভিতরে ভিতরে নিজেকেই পুড়িয়ে ফেলছে। হেরা ভয় পেয়েও নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করল। নাভান একদম সামনে এসে দাঁড়াতেই মেয়েটা দেয়ালের সাথে সেঁটে গেল। তারপর আচমকা— নাভান হেরাকে টেনে দরজার সাথে চেপে ধরল।
“বলেছিলাম না নিলয়ের সাথে কথা বলবি না?”
দাঁতে দাঁত চেপে বলল সে।
“তারপরও হাত ধরেছিস তুই?”
হেরা কেঁপে উঠল।
কিন্তু চুপ থাকল না ভয় ডর সরিয়ে বললো —
“ নিলয় আমার বন্ধু। বন্ধুর হাত ধরেছি! এতে এতো রিয়েক্ট করার কি আছে?
“চুপ!”
নাভানের কণ্ঠে ভয়ংকর গর্জন।
“আমার সামনে ওর নাম নিবি না!”
হেরারও রাগ উঠতে শুরু করল।
প্রথমে সে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু এখন?
এখন তার মনে হচ্ছে— নাভান সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে কষ্টে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।

“আপনি এত overreact করছেন কেন? নিলয় শুধু আমার friend!”
“Friend?” নাভান তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। “ও যেভাবে তোর দিকে তাকায় সেটা friendship?
“সবাই আপনার মতো না!”
কথাটা শুনেই নাভানের চোখ রক্তলাল হয়ে উঠল।
সে হেরার কবজি শক্ত করে চেপে ধরল।
“আমি কেমন?”
হেরা এবার রেগে গেল। অনেকদিনের জমে থাকা অভিমান যেন একসাথে বেরিয়ে আসছে।
“আপনি শুধু রাগ করতে জানেন! সবসময় নিজের কথাই ঠিক ভাবেন! আমি কার সাথে কথা বলব, হাসব, হাত ধরব— সব আপনি ঠিক করবেন? কি হন আপনি আমার? ভালোবাসার মানুষ? না ! তাহলে?
“হ্যাঁ! করব!”
চিৎকার করে উঠল নাভান।
“ কারণ তুই আমার!”
“ আমি আপনার কিছু না!”

কথাটা শুনে যেন মুহূর্তেই থমকে গেল নাভান।
তার চোখের ভিতর কষ্টের ছায়া নেমে এল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই কষ্টটা আবার ভয়ংকর রাগে বদলে গেল।
সে হেরার হাত টেনে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল।
ফ্লাক্স খুলে এক গ্লাস গরম পানি ও হ্যন্ড ওয়াশ নিয়ে হেরার হাত ধুয়ে দিতে লাগে । হেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতের উপর গরম পানি ঢালে নাভান।
“যে হাত অন্য কাউকে ছুঁয়েছে, সেই হাতের শাস্তি তো হবেই!”
“আহহ! ছাড়ুন!”
হেরা ছটফট করতে লাগল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“আপনি পাগল হয়ে গেছেন!”
” yes I’m mad
হেরার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
কিন্তু রাগটা আরও বেড়ে গেল।
“আপনি কে আমার?!
কাঁপা গলায় চিৎকার করল সে।
“বন্ধুর হাত ধরেছি! আরো ধরব! নিলয় আমার friend!
নাভান দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছে।
হেরা থামল না। আজ তারও ভিতরে জমে থাকা কষ্টগুলো বেরিয়ে আসছে।

“আর আপনার সাথে এই বিয়েটা? আমি মানিই না! সব সম্পর্ক ঠিক করেছেন বলে আমাকেও মানতে হবে নাকি আপনাকে ?যে সম্পর্ক ভুল, মিথ্যা দিয়ে শুরু সেটা মানি না আমি। আমি ঘৃণা করি।
কথাটা যেন ছুরি হয়ে বিঁধল নাভানের বুকে।
সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“মানো না?”
হেরা চোখ মুছল।
“না! আপনার এই toxic behaviour আমি মানি না!”
ঠাস! একটা থাপ্পড়। হেরা হতভম্ব হয়ে গেল। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
সে বিশ্বাসই করতে পারছে না— নাভান তাকে আবার মেরেছে। আর পরের মুহূর্তেই— ঠাস! দ্বিতীয়টা।
পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেল। নাভানের নিজেরও যেন হুঁশ ফিরল। সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে হেরার দিকে তাকিয়ে রইল। হেরার চোখে ভয়। ঘৃণা। কষ্ট। আর সেই দৃষ্টিটাই যেন তাকে ভিতর থেকে ছিঁড়ে ফেলল।
হঠাৎ উন্মাদের মতো দেয়ালে ঘুষি মারল নাভান।
একবার। দুইবার। তিনবার। রক্ত বেরিয়ে এল হাত থেকে। বাইরে সবাই শব্দ শুনে দরজার সামনে এসে গেছে। অধীর আতঙ্কিত গলায় ডাকছে—

“ভাই! দরজা খোল!”
সৃজনের গলা কাঁপছে।
“হেরা!”
কিন্তু ভিতরে দাঁড়িয়ে নাভান শুধু হাঁপাচ্ছিল।
তার চোখে ভয়ংকর অপরাধবোধ। সে হেরার দিকে তাকাচ্ছিল… আবার তাকাতেও পারছিল না।
কারণ আজ প্রথমবার— সে নিজে ইচ্ছাকৃত ভাবে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার চোখে তার জন্য কান্না দেখেছে। আর সেই ভয়টাই তাকে শেষ করে দিচ্ছে।
হেরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার গাল লাল হয়ে গেছে। হাত লাল। কিন্তু বুকের ব্যথাটা সবচেয়ে বেশি।
সে কাঁপা গলায় বলল—
— “I hate you…”
কথাটা শুনে নাভানের বুকের ভিতরটা ধ্বসে গেল।
নিজের হাতে পর পর কয়েকটি ঘুসি বসিয়ে দিলো, ঝরঝর করে রক্ত পরতে নাভান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াতে পারল না।
দ্রুত দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
অধীর হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।
“ ভাই—”
কিন্তু নাভান কারও কথা শুনল না।
রক্তাক্ত হাত নিয়েই ক্লাব থেকে বেরিয়ে গেল।
রোজ দ্রুত ভিতরে ঢুকে হেরাকে জড়িয়ে ধরল।
আর মেয়েটা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো
কারও বিশ্বাস হচ্ছিল না— নাভান এমন করতে পারে।
সৃজন বিরক্ত চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বলে-

“ওর রাগ আছে জানতাম… কিন্তু বনুর গায়ে এমন ভাবে হাত তুলবে ভাবিনি…”
অধীর চুপচাপ বসে ছিল। তার chocolate hero- ভাই কে আজ তার নিজের কাছেই অপরিচিত লাগছে।
নাভান পাগলের মতো গাড়ি চালাচ্ছিল। চোখের সামনে শুধু একটা দৃশ্য ভাসছে। হেরার ভেজা চোখ।
“আমি আপনার কিছু না…”
কথাটা বারবার মাথায় আঘাত করছিল।
এতক্ষণ হেরা শুধু চুপচাপ তাকিয়ে দেখছিল নাভানের কর্মকাণ্ড।
লোকটার চোখের সেই তীব্র রাগ, চোয়ালের শক্ত হয়ে থাকা রেখা, কথা না বলেও চারপাশ কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা— সবকিছু কেমন যেন কারো সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। খুব পরিচিত কারো সঙ্গে।
আর সেই কারণেই হয়তো ইচ্ছে করেই সে নাভানকে আরও রাগিয়ে দিয়েছিল। যেন দেখতে চেয়েছিল, এই মানুষটার ধৈর্যের শেষ কোথায়।

নাভান চলে যেতেই চারপাশে এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে।
ঝিনুক তাড়াতাড়ি হেরার পাশে এসে বসে তার হাতটা নিজের কোলের উপর তুলে নেয়। লাল হয়ে যাওয়া জায়গাটায় আলতো করে ঠান্ডা পানি ঢালতেই হেরা কেঁপে ওঠে।
রোজ দৌড়ে বরফ নিয়ে আসে। তুষার ফার্স্ট এইড বক্স এনে দেয়।
সবাই একসাথে হেরাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সৃজন একটু গম্ভীর গলায় বলল,
“নাভান সহজে রাগে না বনু। কিন্তু নিলয়কে ওর সহ্য হয় না। এরা ভালো মানুষ না। তাদের সাথে এতটা কাছাকাছি হওয়াটাও তোমার ঠিক হয়নি।”
হেরা কিছু বলার আগেই রোজ আবার ধীরে ধীরে বলল,
“শোন, ভালো মানুষের সামনে দিয়েও হাঁটলে মানুষ ভালো বলে না। কিন্তু খারাপ মানুষের পিছন দিয়ে একবার গেলেও মানুষ দু’বার ভাবে না খারাপ বলতে। পুরো দেশ জানে নিলয়ের বাবার কর্মকাণ্ড। একই রক্ত তো ওদের শরীরে বইছে।”
রোজের মুখের কথা প্রায় কেড়ে নিয়েই রুশা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল–
“একদম ঠিক। রক্ত কথা বলে। এদের রক্তই খারাপ। যার বাপের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন আছে, সে রূপ বদলাতে সময় নিবে না। দেখবি, ভালো মানুষের মুখোশ পরে একদিন জীবনটাই ধ্বংস করে দিবে।”
কথাগুলো যেন আগুন হয়ে বিঁধতে লাগল হেরার ভেতরে। হাতের পোড়ার জ্বালার চেয়েও এই কথাগুলো তাকে বেশি পোড়াচ্ছিল। হঠাৎ করেই গর্জে উঠল সে।

“নিলয় ওইরকম না! আমি ওর ভিতরে অন্যরকম একটা মন দেখেছি। আর সে আমার বন্ধু!”
পরিবেশ মুহূর্তেই ভারী হয়ে যায়।
ঝিনুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেরার মাথায় হাত রাখে।
“সব মানুষকে বাইরে থেকে বুঝা যায় না হেরা।”
তুষারও শান্ত গলায় বলল,
“আমরা শুধু চাই তোমরা কেউ কষ্ট না পাও। অনেক ঝামেলার পর একসাথে হয়েছো তোমরা সবাই। এখন কিছু ভুলের জন্য আবার ঝর আসুক তা চাই না।
কিন্তু হেরা কিছুতেই বুঝতে চাইছিল না।
তার বিশ্বাস, নিলয়ের ভিতরে এমন কিছু আছে যেটা সবাই দেখতে পাচ্ছে না।
সারাদিন ঝিনুক আর তুষারের যত্নে গালের লালচে দাগটা কিছুটা কমে আসে। গালেও বরফ দেওয়ার কারণে থাপ্পড়ের ছাপটা আগের মতো তীব্র থাকে না।
ঝিনুক ইচ্ছে করেই সন্ধ্যার দিকে হেরাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। কারণ এতদিন পর নাভানের পরিবার আবার একসাথে হয়েছে— এই সময়ে কারো মন খারাপ হোক, সেটা সে চাইছিল না।
তার উপর পুরো বন্ধুমহলও ছিল সেখানে। এরপর কেটে যায় দুইটা দিন।
এই দুই দিনে নাভানকে আর কেউ দেখেনি।
শুধু তার মাকে ছোট্ট একটা মেসেজ দিয়েছিল—

“ কাজে বাইরে যাচ্ছি।”
কিন্তু এই ছোট্ট মেসেজটাই যেন পুরো বাড়িটাকে খানিকটা ফাঁকা করে দিয়েছিল।
হেরা বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল।
ভিতরে ভিতরে মনটা খারাপ হলেও সেটা কাউকে বুঝতে দেয়নি।
ইচ্ছে করেই বাবা-মায়ের সাথে সময় কাটাত, সবার সাথে গল্প করত, আড্ডা দিত।
রোজ, রুশা— সবাইকেই তারা নিজের আপন মানুষের মতো ভালোবাসে।
আর তাদের এই সহজ মিশে যাওয়ার স্বভাবটাই হয়তো সবাইকে তাদের প্রতি আরও দুর্বল করে দেয়।
এডভোকেট কাজল খান প্রায়ই মুগ্ধ চোখে ছেলে-মেয়েদের হাসি-আড্ডা দেখতেন।
এতদিন পর বাড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে যেন।
তৌহিদা জিহানও ভিতরে ভিতরে অনেক শান্তি অনুভব করছিলেন।
সেদিন বিকেলে সবাই ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে বসেছিল।
অধীর সোফার হাতলে হেলান দিয়ে বসে আছে।
সৃজন চায়ের কাপ হাতে টুকটাক মজা করছে।
ঝিনুক বারবার হেরার হাতটা দেখে নিচ্ছে এখনও ব্যথা আছে কিনা।
রোজ আর রুশা নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে।
চারপাশটা একদম পরিবারের মতো উষ্ণ হয়ে ছিল।
টেবিল ভর্তি নানারকম নাস্তা।

গরম গরম সিঙ্গারা, চিকেন প্যাটিস, চা আর কফির গন্ধে পুরো পরিবেশটা আরও আরামদায়ক লাগছিল।
এডভোকেট কাজল খান নিজেই আজ সবাইকে নাস্তা পরিবেশন করতে করতে তাদের মাঝখানেই বসে পড়লেন।
তৌহিদা জিহান হেসে বললেন,
“তোদের এই আড্ডা দেখলে মনে হয় বাড়িটা পরিপূর্ণ।
ঠিক তখনই তুষার হঠাৎ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে উঠল,
“তা মামনি, কোথাও ঘুরতে গেলে কেমন হয় বলো তো?”
কাজল খান ভুরু তুলে মুচকি হেসে বললেন,
“মন্দ হয় না তো। কিন্তু কোথায় যাবা শুনি?”
তুষারের চোখ চকচক করে উঠল।
“এই যে পাহাড়ি কোনো অঞ্চলে গেলে কেমন হয়? শহরের এই কোলাহল বাদ দিয়ে একটু শান্ত জায়গায়।”
রোজ সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।
“ইসস! পাহাড় মানেই মেঘ, ঠান্ডা বাতাস, আর রাত জেগে আড্ডা!”
রুশাও যোগ দিল,

“আর ছবি! আমি কিন্তু হাজারটা ছবি তুলব।”
অধীর হাসতে হাসতে বলল–
“তুই ছবি তুলবে নাকি মানুষকে দাঁড় করিয়ে torture করাবে ।”
সবাই একসাথে হেসে ওঠে।
হেরা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল।
কিন্তু পাহাড়ের কথা শুনে তার মনেও অদ্ভুত একটা অনুভূতি জাগে।
হয়তো সত্যিই একটু দূরে কোথাও গেলে ভালো লাগবে।
এই অদ্ভুত ভারী অনুভূতিগুলো থেকেও কিছুটা মুক্তি পাওয়া যাবে।
ঝিনুক হেরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৮

“কি হেরা পাখি? তুই যাবি তো?”
হেরা একটু থেমে ধীরে মাথা নাড়ে।
“যাওয়া যায়…”

প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here