সে আমার বন্দিনী পর্ব ১০১
তানিয়া হুসাইন
৭২ঘণ্টা পর ইশায়ার জ্ঞান ফিরে।চোখ খুলতেই চারপাশ ঝাপসা দেখে। শরীরের প্রতিটি অস্থি-মজ্জায় যন্ত্রণা। কিন্তু শারীরিক ব্যথার চেয়েও ভয়ংকর ছিল তার মনের অবস্থা। গত কয়েকদিনে তার সঙ্গে যা যা ঘটেছে, সেসব স্মৃতি একের পর এক ঝড়ের মতো আছড়ে পড়তে থাকে তার মস্তিষ্ক জুড়ে।হঠাৎই তার হাত দুটো পেটের ওপর চলে যায়।তারপর আতঙ্কিত চোখে চারপাশে তাকায় ইশায়া।?নার্স কে জিজ্ঞেস করে,
____আমার বাচ্চা কোথায়?
কেউ উত্তর দেয় না।
ইশায়া আরও ব্যাকুল হয়ে উঠে।
___আমার বাচ্চা কোথায়? আমাকে আমার বাচ্চাকে এনে দিন।বারবার একই প্রশ্ন করতে থাকে।
কক্ষের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়া এলেনার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে।তিনি জানেন না কী উত্তর দেবেন।কীভাবে বলবেন এমন এক সত্য, যা একজন মায়ের হৃদয়কে চিরদিনের জন্য ভেঙে দেবে? কিভাবে সইবে সে এতো শোক।
এইটুকুন বয়সে একসাথে স্বামী সন্তান হারিয়েছে।
মারিয়া এলেনার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে, তিনি নিজেই মানতে পারছেন না এসব।
সবকিছু একসঙ্গে হারিয়ে গেছে।নিক স্যার নেই। বস নেই,তার সন্তানও নেই।একই দিনে বাবা আর মেয়ে পৃথিবীর সমস্ত মায়া ত্যাগ করে চলে গেছে।
কিন্তু তিনি এখন এটাই ভাবছেন ইশায়াকে নিয়ে কী করবেন তিনি?কীভাবে বাঁচাবেন তাকে?
চারদিকে লুকা আর মাতেও হন্যে হয়ে খুঁজছে ইশায়াকে। আর সিনালোয়াতে তাকে নিয়ে যাওয়ার ও কোনো উপায় নেই। ক্যাটালিনা কখনোই তাকে বেঁচে থাকতে দেবে না।
___ইশায়াকে আর সামলানো যাচ্ছিলো না।
অবশেষে তার মেয়েকে এনে দেওয়া হয় তার কাছে।ছোট্ট, নিশ্চুপ দেহটা কোলে নিতেই ইশায়া ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।।সে নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠে, কান্না করতে থাকে,বেবি বেবি উঠো, নড়ছো না কেন তুমি পেটা থাকতে তো নড়তে,ও বেবি।ইশায়া কথা বলতে বলতে কান্না করতে থাকে।ইশায়ার কান্নায় উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয় কেঁপে উঠে।
একজন মায়ের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠে চারপাশের পরিবেশ।
আমার মেয়ে…আমার বাচ্চা…আমার বাচ্চা…
কাঁদতে কাঁদতে সে শিশুটির নিথর মুখে বারবার চুমু খায়।
___আল্লাহ… আমি কী করেছি?কেন এমন করলে আমার সঙ্গে?কেন আমার বাচ্চাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে নিলে?আমার কী দোষ ছিল?
আমি কী করেছি?কেন আমার সঙ্গে এমন হয় বারবার? ইশায়ার কান্না থামার নামে নেই।
চোখের জল ফুরিয়ে যাচ্ছে, তবুও কান্না থামছে না।চিৎকার করতে করতে একসময় হাঁপিয়ে উঠে সে।তার গলা ভেঙে যায়,স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে।
গলা থেকে আর ঠিকমতো শব্দও বের হচ্ছে না।
তবুও থামেনা তার আহাজারি।
নিজের মেয়েকে বুকে শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলতে থাকে,
___আমি আপনার বাচ্চাকে মারিনি, ভীর..
আমি মারিনি,ওরা বাঁচতে দিল না আপনার সন্তানকে।আমি বাঁচাতে পারলাম না।আপনার বাচ্চাকে মেরে ফেলেছে ওরা,তারপর হঠাৎ-ই চারপাশে উন্মাদের মতো তাকাতে থাকে সে।
যেন কোথাও থেকে ভীর এসে দাঁড়াবে। দরজা খুলে সে ভেতরে প্রবেশ করবে। সবকিছু ভুল প্রমাণিত হবে।এগুলো যেন সব একটা দুস্বপ্ন তার ঘুম ভাঙলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কেউ আসে না।কেউ কোন উত্তর দেয় না।তখন ইশায়া বুকফাটা আর্তনাদ করে চিৎকার করে উঠল,
—আপনি কোথায়, ভীর?আপনি কোথায়?
আপনার মেয়েকে একবার দেখবেন না?আসুন না…আসুন না, ভীর…একবার আসুন…শুধু একবার…তার কণ্ঠে আকুতি, অভিযোগ, ভালোবাসা, অসহায়ত্ব আর সীমাহীন শোকের মিশ্রণ।ইশায়া নিজের মৃ*ত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে আহাজারি করতে থাকে, আর ভীরকে ডাকতে থাকে।
____ইশায়ার অবস্থা ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।ইশায়ার অবস্থা খারাপ হতে দেখে চিকিৎসকরাও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন।অতিরিক্ত মানসিক আঘাত, শারীরিক দুর্বলতা এবং লাগাতার কান্নায় তার শরীর আর সাড়া দিচ্ছেনা। তাই ডাক্তাররা তাকে ঘুমের ইনজেকশন দেয়।
ধীরে ধীরে তার চোখ দুটি ভারী হয়ে আসে।তবুও ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে একই নাম উচ্চারণ করে যাচ্ছে
___ভীর…
আমার বাচ্চাকে ফিরিয়ে দিন…ওরা মেরে ফেলবে আপনি আসু… তারপর একসময় নিস্তব্ধ হয়ে আসে সবকিছু।গভীর অচেতন ঘুমে তলিয়ে যায় ইশায়া।এদিকে সম্পন্ন করা হয় ভীরের সন্তানকে দাফনের সমস্ত ব্যবস্থা।ছোট্ট সাদা কাফনে মোড়ানো শিশুটিকে যখন মাটির বুকে শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন মারিয়া এলেনার বুকটা হাহাকারে ভরে উঠে।চোখের সামনে ভেসে উঠে শিশুটির পরিচয়।সে কোনো সাধারণ শিশু না।সে এক রাজার মেয়ে।ভীরের রক্ত।এক বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী।কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস!যে শিশুর জন্ম হওয়ার কথা ছিল রাজকীয় নিরাপত্তা আর ভালোবাসার মাঝে, তার আজ কি পরিনাম।নিজের বাড়ি,নিজের মানুষের মাঝে নয়।নিজের পিতার উপস্থিতিতেও নয়।কেউ তাকে দেখতেও পেলোনা।
মারিয়া এলেনার চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ে।জীবন কখনো কখনো মানুষের কাছ থেকে এত কিছু কেড়ে নেয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
এরপর কেটে যায় কয়েকটা দিন।সেই দিন গুলোতে ইশায়াকে সব সময় ইঞ্জেকশন দিয়েই রাখা হয়।কারণ জ্ঞান ফিরলেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হতো।চোখ খুলেই সে তার মেয়েকে খুঁজতে শুরু করে।ভীরকে খুজে,তারপর সত্যটা মনে পড়তেই উন্মাদের মতো চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।কখনো ভীরের নাম ধরে ডাকত।
কখনো নিজের সন্তানকে বুকে চাওয়ার আকুতি জানাতো।
কখনো আবার আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করত, কেন তার জীবন থেকে সবকিছু একে একে ছিনিয়ে নেওয়া হলো।তার কান্না থামতো না।তার আর্তনাদ থামতো না।ভীরের মৃত্যু, তার সন্তানের মৃত্যু এই দুই নিষ্ঠুর সত্যকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিনো না ইশায়া।তার কাছে সবকিছু যেন এখনো এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন।একটা দুঃস্বপ্ন, যেখান থেকে জেগে উঠলেই সে ভীরকে দেখতে পাবে, নিজের মেয়েকে বুকে তুলে নিতে পারবে।
কিন্তু প্রতিবার জ্ঞান ফিরলে বাস্তবতা তাকে একই নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।আর প্রতিবারই সে একটু একটু করে আরও ভেঙে পড়ে।আরও নিঃস্ব হয়ে যায়। তার বুকের ভেতর থেকে জীবনের শেষ আলোটুকুও নিভে যায়।
____সত্য যতই নির্মম, যতই অসহনীয় হোক না কেন, একসময় আমাদের তা মেনে নিতেই হয়। সেই কঠিন সত্যের সামনে আজ দাঁড়িয়ে আছে ইশায়াও। বাস্তবতা তাকে নিষ্ঠুরভাবে শিখিয়ে দিয়েছে জীবন সব সময় মানুষের ইচ্ছামতো চলে না।এদিকে মারিয়া এলেনা পড়েছেন এক ভয়াবহ সংকটে।লুকা এবং মাতেও মেক্সিকো জুড়ে নিজেদের ক্ষমতার বিস্তার করে চলেছে। একের পর এক এলাকা তাদের দখলে চলে যাচ্ছে। তারা শুধু ক্ষমতা বাড়িয়েই থেমে নেই, ভীরের বিশ্বস্ত লোকদেরও খুঁজে বের করে নির্মমভাবে শেষ করে দিচ্ছে। যে-ই ভীরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলো, তাদের কারো রেহাই নেই।আর তাদের খোঁজের তালিকায় রয়েছে ইশায়াও।মারিয়া এলেনা ভালো করেই জানেন, ইশায়াকে এখানে রাখা নিরাপদ নয়। বেশিদিন এভাবে আড়ালে থাকা সম্ভব হবে না। আজ না হয় কাল, কোনো না কোনোভাবে তারা ইশায়ার অস্তিত্বের খবর পেয়ে যাবে।শুধু ইশায়াকে নিয়েই যে তিনি ভয় পাচ্ছেন তা নয়। তিনি নিজেও জানেন, যদি সে কখনো লুকা মাতেওর হাতে ধরা পড়ে তাহলে তার পরিণতিও হবে মৃ*ত্যু। কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে তিনি যতটা না চিন্তিত, তার চেয়েও অনেক বেশি চিন্তিত ইশায়াকে নিয়ে।কীভাবে তাকে রক্ষা করবে,কীভাবে তাকে এই রক্তাক্ত অন্ধকার জগতের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখবে।তবুও মারিয়া এলেনা মনে মনে শপথ করেন নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি ইশায়াকে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে হলেও তাকে বাঁচিয়ে রাখবেন।কারণ ইশায়ার চারপাশে এখন শুধু বিপদ আর বিপদ।একদিকে ক্যাটালিনা।অন্যদিকে ভীরের শত্রুরা।দুই দিক থেকেই বিপদ তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।তারা যদি কোনোভাবে জেনে যায় যে ইশায়া এখনও বেঁচে আছে, তাহলে আর কোনো শক্তিই তাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না।অনেক ভেবেচিন্তে অবশেষে মারিয়া এলেনা একটি সিদ্ধান্ত নেন।তিনি ইশায়াকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন।এই অন্ধকার, রক্তাক্ত, নিষ্ঠুর জগত থেকে বহু দূরে। এমন এক জায়গায়, যেখানে বন্দুকের শব্দ নেই, ক্ষমতার লড়াই নেই, প্রতিশোধের আগুন নেই।যেখানে এই কালো ছায়াগুলো আর তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
যেখানে সে নতুন করে নিজের জীবন শুরু করতে পারবে,সাধারন মানুষের মতো বাঁচবে।
__মারিয়া এলেনাকে এতটা চিন্তিত দেখে ইশায়ার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।কারণ সে জানে তার জন্যই তিনি ভয় পাচ্ছেন।ইশায়া নিজের হাতের দিকে তাকায়।সেখানে এখনো জ্বলজ্বল করছে ডায়মন্ডের চুড়ি, আংটি, দুল অসংখ্য মূল্যবান গয়না।
ইশায়া একে একে সব খুলে মারিয়া এলেনার হাতে তুলে দেয়। গলায় কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো দ্বিধা।শুধু শান্ত স্বরে বলে,এগুলো রাখুন।
মারিয়া এলেনা বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।কিন্তু তিনি সব নিতে রাজি হন না।
মাথা নেড়ে বলেন,
__এত কিছুর প্রয়োজন নেই, ম্যাম।
শেষ পর্যন্ত তিনি শুধু হাতের চুড়িগুলো রেখে দেন।
মৃদু স্বরে বলেন,
___এগুলো দিয়েই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এগুলোর মূল্যই অনেক।
বাকি সব গয়না আবার ইশায়ার হাতেই ফিরিয়ে দেন তিনি।কিন্তু ইশায়া আর সেগুলো নেয় না।নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে বাঁচিয়েছে মারিয়া এলেনা,এর কাছে এগুলো কিছুই না।
ঘরের এক কোণে বসে আছে ইশায়া।সামনের ছোট্ট জানালাটা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশের এক টুকরো অংশ।সে নির্বাক দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে থাকে।এখনো তার বিশ্বাস হয় না।কি থেকে কি হয়ে গেল!সবকিছু এত দ্রুত, এত আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়বে, তা সে কখনো কল্পনাও করেনি।
কিছুদিন আগেও তার জীবন ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম।ধীরে ধীরে তার চোখ ভিজে ওঠে।
তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা অশ্রুকণা।
অভিমানে, কষ্টে, বুকভাঙা যন্ত্রণায় তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।আকাশের দিকে তাকিয়েই সে ফিসফিস করে বলে,
__আপনার পাপ আমার বাচ্চাকে নিয়ে নিল, রাজভীর…
কথাটা বলেই তার বুকটা হাহাকার করে ওঠে।
___দেখুন, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আপনি চেয়েছিলেন না আপনার মেয়ে হোক…
হয়েছিলো।আপনার মেয়েই হয়েছিলো।কিন্তু সে আর নেই।তাকে একবার দেখতেও পারেননি আপনি।একবার কোলে নেওয়ার সুযোগও পাননি।একবার তার ছোট্ট আঙুল ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্যও আপনার হয়নি।ইশায়ার চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়তে থাকে।
কাঁপা গলায় সে আবার বলে,
___হাজারো মায়ের বুক খালি করেছেন আপনি… হাজারো মানুষকে কাঁদিয়েছেন। কিন্তু আপনার পাপের শাস্তি আমার বাচ্চা কেন পেল, ভীর?
কেন?আমাদের কী দোষ ছিলো?আমার কী দোষ ছিলো?বলুন..আমার কী দোষ ছিলো?শেষ কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যায়।কোনো উত্তর আসে না।শুধু নীরব আকাশ মাথার ওপর বিস্তৃত হয়ে থাকে।আর সেই নীরবতার নিচে বসে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে ইশায়া। তার কান্নার সাক্ষী হয় শুধু আকাশ।
___মারিয়া এলেনা সব ব্যবস্থা করে ফেলে ইশায়াকে বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য। প্রথমে প্রাইভেট কার্গো ভেসেল-এ অন্য দেশে যাবেন তারপর সেখান থেকে বিমানে বাংলাদেশ।
সবকিছু নিখুঁতভাবে করেছেন তিনি। অবশেষে মেক্সিকোকে বিদায় জানানোর দিন চলে আসে।
যে দেশ তার জীবনকে বদলে দিয়েছে,তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে সেই দেশ ছেড়ে আজ চলে যাবে ইশায়া।
মারিয়া এলেনা তাকে একা ছাড়তে রাজি হননি।
এই আদুরে, সরল মেয়েটিকে নিয়ে বিপদের কোনো শেষ নেই।তার এই অপরূপ সৌন্দর্যই তার সবচেয়ে বড় শত্রু।যেকোনো সময় এই রূপ তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।এমন অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারী একটি মেয়েকে যে একবার দেখবে, সে দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য হবে।আর এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার তাকানো মানুষ সবাই যে ভালো হয়, তা নয়।তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইশায়ার পাশ ছাড়তে রাজি না মারিয়া এলেনা।
গভীর রাত।চারপাশে নেমে এসেছে ঘন অন্ধকার।
দূরে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।সেই রাতের আঁধারেই রওনা দেয় তারা।
ইশায়া গুটি গুটি পায়ে সামনে এগিয়ে যায়।তার প্রতিটি পদক্ষেপ ভারী হয়ে উঠে।
মারিয়া এলেনা তাড়া দিয়ে বলেন,
__দ্রুত করুন, ম্যাম।
কিন্তু ইশায়ার পা এগোতে চায় না।বারবার সে পিছন ফিরে তাকায়।আর তার বুকের ভেতর এক অদৃশ্য ঝড়।
___আপনি আমাকে একদিন এই জায়গায় নিয়ে এসেছিলেন… আমার পরিবার থেকে বহু দূরে।
সেদিন আমার খুব কষ্ট হয়েছিল, জানেন?
আর আজ দেখুন আমি আপনার শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। নিজের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি।কিন্তু আজ আপনি নেই,
আমাকে আটকানোর জন্য আপনি নেই।
ইশায়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।এতগুলো দিন আমি এটাই চেয়েছিলাম। নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চেয়েছি।প্রতিটা রাতে সেই স্বপ্ন দেখেছি।কিন্তু আজ যখন সেই দিনটা সত্যিই চলে এলো,তাহলে কেন আমার বুকটা এত পুড়ছে?
কেন এই চিনচিনে ব্যথা থামছে না?কেন মনে হচ্ছে আমি আমার নিজের একটা অংশ এখানে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছি?
হঠাৎ মারিয়া এলেনার কণ্ঠ আবার ভেসে আসে।
___ম্যাম, দেরি হচ্ছে দ্রুত আসুন।এখানে এভাবে থাকা বিপজ্জনক।
ইশায়া চমকে ওঠে।তারপর চোখের পানি মুছে ফেলে।
অন্ধকার রাতের মধ্যে তার শরীরটা আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে।সিঁড়িগুলো নামানো।শুধু উঠে বসার অপেক্ষা।কিন্তু সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখার আগে ইশায়া থেমে যায়।আরও একবার।শেষ বারের মতো।সে পিছন ফিরে তাকায়। চারপাশে শুধু অন্ধকার। নিস্তব্ধতা,শূন্যতা।তবুও কেন জানি এই বেহায়া মন বারবার বলছে,
কেউ একজন আসবে।তার নাম ধরে ডাকবে।
কিন্তু কিছুই হলো না।শুধু নীরব রাত দাঁড়িয়ে রইলো সাক্ষী হয়ে।
ইশায়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে,তারপর সমস্ত পিছুটান, সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত অপূর্ণতা রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল।এক নতুন জীবনের দিকে।
তার ভাঙা হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে উঠে সুর,
___এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম…
প্রেম মিলে না…
শুধু সুখ চলে যায়…
এ মনে মায়ার ছলনা…
এরা সুখের লাগি…
______মারিয়া এলেনা সরাসরি বাংলাদেশ যাওয়ার ঝুঁকি নিলেন না। বিমানবন্দরগুলোতে নজরদারি থাকতে পারে, তাই তিনি অন্য পথ বেছে নেন। প্রাইভেট কার্গো ভেসেলে করে তারা মেক্সিকো থেকে পানামায় যাওয়ার উদ্দেশ্য রওনা হয়।
সমুদ্রযাত্রা দীর্ঘ ছিলো না, তবুও ইশায়ার কাছে প্রতিটি দিন এক, একটি বছরের সমান মনে হচ্ছে। পাঁচ দিন ধরে চারপাশে শুধু সমুদ্র আর সমুদ্র। মাঝে মাঝে ডেকে দাঁড়িয়ে দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকতো সে। কখনো ঢেউয়ের গর্জন শুনে,কখনো রাতের অন্ধকারে আকাশভরা তারার দিকে চেয়ে থাকে।
পঞ্চম দিনের সকালে তাদের ভেসেল পানামার বন্দরে নোঙর ফেলে। সেখানে এক রাত বিশ্রাম নেওয়ার পর নতুন কাগজপত্র ও পরিচয় নিয়ে তারা বিমানে ওঠে।পানামা থেকে প্রথমে ইস্তাম্বুল, তারপর সেখান থেকে ঢাকার ফ্লাইটে ওঠে।মারিয়া এলেনার ভয় কাটে এখন সে ইশায়াকে তার বাড়িতে পৌছে দিতে পারবে।আর কোন ভয় নেই তার।
এদিকে ইশায়ার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে।
সে বাংলাদেশের ফ্লাইটে উঠেছে।১ বছর ৮মাস পর সে তার বাবা-মা কে দেখবে।
হাজার কষ্টের মাঝেও বাবা-মাকে দেখার তাদের ছোয়ার ইচ্চা আনন্দ তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে।
___রহমান বাড়িতে আজ চারদিকে ব্যস্ততা, সাজসজ্জা আর অতিথিদের আনাগোনা। আজ আদ্রিয়ান ও রাহির বিয়ে।তবুও সকাল থেকেই বাড়ির পরিবেশে একটা অদৃশ্য অস্থিরতা কাজ করছে। সবার মুখে আনন্দ থাকলেও চোখেমুখে উদ্বেগ স্পষ্ট। কারণ আদ্রিয়ান সারারাত বাড়ি ফেরেনি। ফোন বন্ধ, কোনো খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না।
সায়মা রহমান বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। ছেলের জন্য তার বুকটা ছটফট করছে।
___এভাবে কেউ নিজের বিয়ের দিন উধাও হয়ে যায়। ফোনটাও বন্ধ, আল্লাহ জানে কোথায় আছে।
তিনি একবার আদনান রহমানের কাছে যান, একবার আবিরের কাছে।
___চিন্তা করো না আম্মু। ও ঠিক সময়মতো চলে আসবে।
সায়মা রহমান বিরক্ত হয়ে বলেন,
___তোদের কারো কোনো চিন্তা নেই,ও যদি না আসে তখন কি হবে। কি জবাব দেবো আমি আমার বোনকে।
আদনান রহমান মৃদু হেসে বলেন,
__তুমি শান্ত হও।তুমি যেরকম ভাবছো সেরকম কিছুই হবে না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন তার ছেলে কোথায় আছে। তাই তাকে একা থাকতে দিচ্ছেন তিনি। কিছুটা সময় প্রয়োজন তার আজকের এই দিনের জন্য। কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভূতি চাপা দেওয়ার জন্য,নতুন করে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় তার প্রয়োজন। তাই তিনি একটুও বিচলিত নন।
অন্যদিকে রেহেনা বেগম রাহিকে নিয়ে চিন্তায় আছেন।
___আমি আগেই বলেছিলাম এসবে না জড়াতে। এখন দেখো, বিয়ের দিন বরের কোনো খবর নেই।
রাহি কিছু বলে না।সে শুধু চুপচাপ বসে থাকে।
কারণ সে ও জানে আদ্র কোথায়, আর এটাও যানে সে ফিরে আসবেই।
ঠিক সময়মতো।
___পার্লারের মেয়েরা এসে পৌঁছায়।রাহিকে বসানো হয় বড় আয়নার সামনে।প্রথমে তার চুল সুন্দর করে সেট করা হয়। কোমর ছুঁইছুঁই কালো চুলগুলো হালকা কার্ল করে খোলা রাখা হয়। সামনের কিছু চুল দুপাশে ছেড়ে দেয় এরপর বের করা হয় তার বিয়ের শাড়ি।গাঢ় লাল রঙের ভারী শাড়ি।শাড়িজুড়ে সোনালি জরির সূক্ষ্ম কাজ। আঁচলের নকশাগুলোতে আলো পড়তেই ঝিলমিল করে উঠছে।শাড়িটি পরিয়ে দেওয়া হয় তাকে।
দেখাচ্ছে।হালকা মেকআপ করে রাহি।
হালকা গ্লোই বেস।চোখে ব্রাউন ও গোল্ডেন শেডের আইশ্যাডো।ঘন কাজল।লম্বা আইল্যাশ।
ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক।কপালের মাঝখানে ছোট্ট লাল টিপ।তারপর শুরু হয় গয়না পরানোর পালা।গলায় প্রথমে একটি চোকার নেকলেস।
তার নিচে ভারী সোনার হার।কানে ঝুমকা।
কপালে টিকলি।নাকে ছোট্ট নথ।দুই হাতে সোনার চুড়ি, বালা আর কাঁকন।আঙুলে কয়েকটি সূক্ষ্ম নকশার আংটি।কোমরে কোমরবন্ধ।রাহি থেকে চোখ সরানো যাচ্ছেনা, এতো সুন্দর লাগছে তাকে।হাতের মেহেদির রং গাঢ় লালচে-খয়েরি হয়ে ফুটে উঠেছে।মেহেদির ভেতরে লুকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের নামপায়ে পরানো হয় টকটকে লাল আলতা।আলতার লাল রঙে পায়ের আঙুলগুলো আরও সুন্দর দেখাচ্ছে।সবকিছু শেষ হলে আয়নায় নিজেকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে রাহি।আজ সত্যিই তাকে অপূর্ব লাগছে।রেহেনা মেয়েকে দেখে কালো টিকা পরিয়ে দেন কানের কাছে।
___শুক্রবার।
জুমার নামাজ শেষে বিয়ে পড়ানো হবে।
আদ্রিয়ানের ইচ্ছাতেই বড় আয়োজন করা হয়নি।
তবে ছোট বললেও ভুল হবে।সায়মা রহমান ছেলের বিয়ে বলে যথাসাধ্য সুন্দর আয়োজন করেছেন।বাড়ির সামনের বাগান রঙিন আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে।সাদা আর সোনালি ফুলের তোড়া দিয়ে পুরো বাড়ি সজ্জিত।খুব কাছের আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।
ধীরে ধীরে অতিথিরা আসতে শুরু করেন।
চারদিকে মানুষের কথাবার্তা, হাসির শব্দ আর উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।ঠিক তখনই আদ্রিয়ানের গাড়ি ঢুকে।গাড়ি থেকে নামতে দেখা যায় আদ্রিয়ানকে।
কালো শার্ট আর জিন্সে তাকে আগের মতোই স্থির ও গম্ভীর লাগছে।সায়মা বেগম ছেলেকে দেখে এগিয়ে গিয়ে কড়া গলায় কয়েকটা কথা বলেন।
রেহেনা বেগম দূর থেকে তাকে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা নেমে যায়।মেয়েকে নিয়ে তার ভয় কাজ করে।
হাজারবার বুঝিয়েছেন তাকে কিন্তু রাহি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি।এখন তার একটাই চাওয়া,মেয়েটা যেন সুখে থাকে।বিয়েটা যেন শান্তিতে সম্পন্ন হয়।
উপরে নিজের ঘরে বসে আছে রাহি। সে অস্বাভাবিক চুপচাপ।মুখে কোনো হাসি নেই।
হৃদপিণ্ডটা কেমন অস্থির হয়ে আছে।ঠিক তখনই দরজা খুলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে জান্নাত।
মুখভরা হাসি নিয়ে বলে,
___ওই রাহি! তোর বর এসে গেছে!আর চিন্তা করিস না মুহূর্তেই রাহির মুখের অন্ধকার কেটে যায়।তার ঠোঁটের হাসি ফুটে ওঠে।
উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে,
___সত্যি?
না মিথ্যা।আমি কি মিথ্যা বলি?
___সবসময়।
এইই মেয়ে,বিয়ের আগে থেকেই আমার সম্মান নষ্ট করছিস।
রাহি হেসে ফেলে।জান্নাত আরও কিছুক্ষণ তাকে নিয়ে মজা করে, খোঁচাখুঁচি করে।
তারপর নিচে নেমে যায়।আর রাহি আয়নার সামনে বসে থাকে।হাতের মেহেদির দিকে তাকায়।
তারপর আবেশে চোখ বন্ধ করে।অবশেষে…
অপেক্ষার প্রহর শেষ হতে চলেছে। আজ সে আদ্রিয়ানের স্ত্রী হবে। আজ থেকে তাদের জীবনের নতুন গল্প শুরু হবে।
____ইশায়ার পৌছাতে ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে বিমান ঢাকার এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করে।তখন ইশায়ার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নেয়। বহুদিন পর সে নিজের দেশের মাটিতে ফিরেছে,নিজের আপনজনের কাছে ফিরেছে।
____এয়ারপোর্টের স্বয়ংক্রিয় কাঁচের দরজা পেরিয়ে বাইরে পা রাখতেই ইশায়া থমকে দাঁড়ায়।
চারপাশে মানুষের ভিড়, গাড়ির শব্দ, ব্যস্ত শহরের ছুটে চলা জীবন।তবুও তার কাছে সবকিছু কেমন স্থির লাগছে।তার দৃষ্টি চারপাশে ঘুরে বেড়ায় এই পরিবেশ,এই রাস্তা,এই বাতাস,সবকিছু তার ভীষণ চেনা।কতদিন কত বছর পর আবার সে নিজের শহরের মাটি স্পর্শ করছে!ইশায়ার চোখ ভিজে উঠে,সে মাথা উঁচু করে গভীর একটা নিশ্বাস নেয়।
ভেজা মাটির গন্ধ বুকভরে টেনে নেয় নিজের ভেতরে।মুহূর্তের মধ্যেই মনে হয় বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারটা ঝড় একটু একটু করে শান্ত হয়ে আসছে। বহুদিন পর সে নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ ফিরে পেয়েছে।চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা মুছার চেষ্টা করে না সে।
শুধু দাঁড়িয়ে রয় নীরবে,নিস্তব্ধ হয়ে।
___ম্যাম?
মারিয়া এলেনার ডাকে ধ্যান ভাঙে তার
ইশায়া চমকে তাকায়
___জ্বি?
আপনার বাড়ির ঠিকানাটা? ইশায়া ঠিকানাটা বলে।এরপর তারা একটি গাড়ি ভাড়া করে মারিয়া এলেনা।গাড়ি শহরের রাস্তায় এগিয়ে চলছে,
ইশায়া জানালার পাশে বসে আছে।
তার চোখ দুটি যেন পলক ফেলতে ভুলে গেছে।সে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।একটার পর একটা পরিচিত রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে।পুরোনো দোকান।
পরিচিত মোড়।পরিচিত গলি।সবকিছুই তার স্মৃতির পাতায় আটকে আছে।আজ আবার সেগুলো বাস্তব হয়ে সামনে ফিরে এসেছে।হঠাৎ গাড়ি একটা জায়গা অতিক্রম করে যেতেই ইশায়ার চোখ আটকে যায়।সে জানালা দিয়ে বাইরে ঝুঁকে পড়ে।
ইশায়াকে এরকম করতে দেখে মারিয়া এলেনা ড্রাইভারকে বলে,
__একটু ধীরে।
ড্রাইভার গাড়ির গতি কমায়।
___তার কলেজ।
বড় গেটটা এখনও আগের মতোই,দেয়ালগুলো হয়তো নতুন রঙ করা হয়েছে।কিন্তু স্মৃতিগুলো?
সেগুলো তো একটুও বদলায়নি।হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠে শত শত মুহূর্ত।
স্কুল ড্রেস পরে বাবার সাথে স্কুলে আসা বাবা তাকে নামিয়ে দিয়ে তারপর অফিসে যেতেন।
বন্ধুদের সাথে আড্ডা,ক্যান্টিনে কাটানো সময়।
পরীক্ষার আগে আতঙ্ক,পড়ার চাপ,বিরক্তি
বৃষ্টিভেজা বিকেল,স্বপ্নে ভরা দিনগুলো।
কতশত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই জায়গাটার সাথে!ইশায়ার ঠোঁটে কষ্টমাখা একটা হাসি ফুটে উঠে।
কিছু স্মৃতি মানুষ যতই ভুলে যেতে চায়
সেগুলো ততই গভীরভাবে হৃদয়ে গেঁথে থাকে।
____অন্যদিকে রহমান বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে।সব আত্মীয়-স্বজন একত্র হয়েছে।নির্ধারিত সময়মতো কাজি সাহেব এসে পৌঁছেছেন।সবার সাথে কুশল বিনিময় শেষে তিনি বিয়ের কার্যক্রম শুরু করেন।কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন,
___কনেকে নিয়ে আসুন।
রেহেনা বেগম আর জান্নাত একসাথে রাহিকে নিয়ে আসেন।লাল বিয়ের শাড়িতে রাহিকে পরির মতো লাগছে।
কাজি সাহেব নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের খুতবা পাঠ করতে শুরু করেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের শর্তাবলি ঘোষণা করেন।কনের মোহরানা বা কাবিন নির্ধারণ করা হয়েছে বিশ লক্ষ টাকা।উপস্থিত সাক্ষীরা সম্মতি জানালেন।
___ গাড়ি এসে থামে একটি পুরোনো গেটের সামনে।নিজের বাড়ি দেখতেই ইশায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।সে তো ভেবেই নিয়েছিলো এই জীবনে কখনো আর এখানে আসা তার হবে না।বাবা-মায়ের সাথে আর কোনদিনো কথা বলা হবে না। ইশায়া সামলায় নিজেকে গাড়ি থেকে নামে।কিন্তু চেয়েও সে নিজের অনুভূতিগুলোকে দমাতে পারছে না।ইশায়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়।
তার বাড়ি,তার শৈশব।তার বেড়ে ওঠা।তার সমস্ত স্মৃতির আশ্রয়।
ইশায়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে,
তার মনে হচ্ছে চোখ সরালেই হয়তো সবকিছু আবার হারিয়ে যাবে।বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে উথাল-পাথাল করছে সব অনুভূতি একসাথে জড়ো হয়েছে।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়া এলেনা নরম গলায় বলে,
___এটাই আপনার বাড়ি, ম্যাম?
ইশায়া মাথা নাড়ে,
__হ্যাঁ।
মারিয়া এলেনা মৃদু হাসেন।
___ঠিক আছে ম্যাম। তাহলে আপনি যান। আমি আসছি।
ইশায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকায়।
___তুমি-ও চলো আমার সাথে।
মারিয়া এলেনা মাথা নাড়েন,
___না ম্যাম। আমার জন্য এই জায়গা না। আপনি যান।
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে ছিলো এক অদ্ভুত শান্তি।ইশায়া আর কিছু বলে না।
শুধু এক পা এগিয়ে এসে হঠাৎ মারিয়া এলেনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরব।খুব শক্ত করে।দুজনের কেউ কোনো কথা বলে না।শব্দহীন সেই আলিঙ্গনে ইশায়ার লুকিয়ে ছিলো অসংখ্য না বলা কথা, কৃতজ্ঞতা।মারিয়া এলেনা তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলোতে পাশে ছিল।
সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর কাজি সাহেব আদ্রিয়ানের দিকে তাকান।
গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
__আদ্রিয়ান রহমান, কনে রাহি আহমেদকে বিশ লক্ষ টাকা মোহরানায় আপনার সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হলো। আপনি কি এই বিবাহ কবুল করছেন?
সবাই তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের দিকে।
কিন্তু আদ্রিয়ান চুপ।একদম চুপ।
কাজি সাহেব আবার বলন,
সে আমার বন্দিনী পর্ব ১০০
__বলো বাবা।
চারপাশের মানুষজনও কৌতূহলী হয়ে উঠে ।
সায়মা রহমানের বুক ধড়ফড় করছে।রাহির আঙুল কাপছে।
আদ্রিয়ান নিজেকে ধাতস্ত করে। এক মুহূর্তের জন্য চোখ দুটো চোখ বন্ধ করে সে,অন্ধকারের ভেতর ভেসে উঠে একটি মুখ।সাফা।তার হাসি,
তার কণ্ঠস্বর তার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত।
প্রতিটি স্মৃতি,প্রতিটি অপূর্ণ স্বপ্ন,প্রতিশ্রুতি।
এক নিমিষে সবকিছু ফিরে আসে।বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে আদ্রিয়ানের।নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে তার।
নিজেকে সামলে নেয় সে চোখ খুলে।
বুকের গভীরে চাপা যন্ত্রণাটাকে শেষবারের মতো গিলে ফেলে।
তারপর ধীরে অস্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করে,
__ক….
____বাবা…..
