বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ২২
Muntaha jahan
পাঁচ বছর আগেই একটা একিডেন্টে মারা গেছেন অ্যন্যার মা।তার আর কোনো ভাই বোন নেই। শুধু বাবাই ছিলো।যে পাঁচ বছর আগেই এ্যাশের বন্দিনী ছিলো।সেটা জানতো অন্যন্যা কিন্তু কখনো প্রকাশ করে নি আর না এ্যাশকে জিজ্ঞেস করেছে।জিজ্ঞেস কি করে করবে?এ্যাশকে তো অন্ধের মতো ভালো বাসতো।আর তার বাবার কাজ কর্ম ও জানতো।এবং পাঁচ বছর আগের এ্যাশের সাথে কি করতে চেয়েছিলো।ছোট বেলা থেকে এ্যাশের সাথে কি করে এসেছে। এ্যাশ কেনো তাকে বন্দি করেছে সে সবকিছুই সে জানতো।তাই আর তার বাবার বিষয়ে মাথা ঘামায় নি।বাবাকে ঘৃণা করে ছোট বেলা থেকেই।তার মায়ের গায়ে হাত তুলতো বলে ছোট বেলা থেকেই বাবার প্রতি বিষ্ণতা অন্যন্যার। সে কখনোই মা বাবার ভালোবাসা পায় নি।ছোট বেলা থেকে ফেলে রেখেছিলো বাংলাদেশে। কোনোদিন খোঁজ ও নিতো না। অন্যন্যা এভাবেই দিন কাটাতো সব সময়।
সময়ের সাথে সাথে এক সময় বাংলাদেশের টপ বিজনেস ম্যানদের মধ্যে একজন হলো অন্যন্যা। যার নাম সবার উপরে।যাকে সবাই একজন গম্ভীর বিজনেস ম্যান হিসেবে জানে।অন্যন্যার নামে কখনো কেনো খারাপ রের্কড আজ অব্ধি কেউ শুনে নি।একজন সৎ আর্দশবান বিজনেস ম্যান এর খাতায় তার নাম আছে।ছোট বেলা থেকেই সে চাইতো কিছু করতে।নিজের পায়ে দাঁড়াতে যার জেদ ধরে আজ অন্যন্যা একজন বিজনেস ম্যান।কাপড়ের বিজনেস অন্যন্যার।অনেক কষ্ট সে এখানে এসেছে। কম ঝড় পোহায়নি এখানে আশার জন্য। কিন্তু এতে এ্যাশের ও কিছুটা অবদান রয়েছে। অন্যন্যার বিজনেস টাকে এতদূর অব্ধি আনতে এ্যাশ অনেক হেল্প করেছে।যারজন্য দুজনের অনেক বার কাজ করতে হয়েছে। একসাথে দেখেছে।এই একসাথে কাজ করতে করতেই এ্যাশের প্রতি একটা দূর্বলতা তৈরী হয় অন্যন্যার। তবে দুজনের মধ্যের সম্পর্কটা সুন্দর ছিলো অনেক। বন্ধু ছিলো একে অপরের কিন্তু সব কেমন হঠাৎই নষ্ট হয়ে গেছে অন্যন্যার মনে হলো। প্রায় বছর খানেক হলো এ্যাশের সাথে তার কেনো যোগাযোগ নেই। আজকে এখানে এসেছিলো ইহান আর নূরের বিয়ে জন্য আর এক পলক এ্যাশকে দেখার জন্য। কাজের চাপে সে একটু ও নরতে পারে না কোথাও।তবে এখানে এসে এমন কিছু শুনবে আশা করে নি।যদিও এ্যাশ তাহার বিয়ের খবর অনেক আগেই শুনেছে কিন্তু মিনাল খান আর তাহা মানে দেখে সে কিছুটা সস্তিতে ছিলো এতোটা মাথা ঘামায় নি। কিন্তু এখন….?
আর কিছু ভাবতে পারলো না অন্যন্যা। মাথা ব্যাথা করছে প্রচন্ড। সে দু’হাতে মাথা চেপে ধরলো।তাতেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো “আহহ” শব্দ। হাত যে কাটা এটা সে ভুলেই গিয়েছিলো।অন্যন্যা হাতটা সামনে নিয়ে আসলো।রক্ত বপর হচ্ছে চুইয়ে চুইয়ে।হাতটা অনেক খানিই জখম হয়েছে। তবে তার থেকে হৃদয় বেশি।একটু আগের এ্যাশ আর তাহার সিঁড়ির দৃশ্য দেখে এসেছে সে।যেটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না।বুকে ব্যাথা হচ্ছে অনেক। অন্যন্যা নিজের ভালো বাম হাতটা বুকের বা পাশে চেপে ধরলো। ধরে আসা গলায় ফিসফিস করে বললো,
—“তুই হারিয়ে যাবি জানলে আমি আরো আগেই তোকে আমি বন্দিনী করে নিতাম!! তুই আমার হয়েও কেন হারিয়ে যাচ্ছিস এ্যাশ? না পাওয়ার ব্যাথা এক।কিন্তু একদিন পাবো জেনেও না পাওয়ার ব্যাথা সহ্য করার মতো নাহ।আমি তো তোকে পাবো জেনেই ভালো বেসেছি।তাহলে এখন কেনো পাচ্ছি না?তুই কেনো অন্যের হচ্ছিস?আমার হয়ে যা নাহ আমার তো কেউ নেই।
খান বাড়ির বিশাল বড় ড্রয়িং রুমে বসানো হয়েছে এ্যাশের স্পেশাল গেস্ট। ফাহাদের বাবা মা মিস্টার আনাফ চৌধুরী মিসেস সানজিদা চৌধুরী আর তার দাদী নূরজাহান চৌধুরী। ড্রয়িংরুমের একপাশের সোফায় বসে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে ফাহাদ।আর সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ফাহাদের দিকে তাকিয়ে আছে আরাবী।পাশেই তাহা।নূরকে সোফায় বসানো হয়েছে তাদের সাথে। নিল আয়ান একপাশে দাড়িয়ে। এ্যাশ আপাতত এখানে নেই। মিনাল খানের সাথে গেটের সামনে তাদের দেখা করিয়েই বেরিয়েছে এ্যাশ।কাউকে কিছু বলে যায় নি। তখন গেটের সামনে তাদের দেখে চমকে ছিলেন মিনাল খান।অনেক কষ্ট নিজের চমকিত দৃষ্টি সামলে তাদের এখানে নিয়ে এসেছেন।কিন্তু কোনো কথা বলেন নি এখনো।সেই থেকে মাথা নিচু করে চুপ করে সোফায় বসে আছেন।
ফাহাদের পরিবারের সাথে পরিচয় ফাহাদ নিজেই করিয়েছে। তারপর থেকেই সবাই চুপ।পরিস্থিতি এখন গম্ভীর। এই গম্ভীর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই খান বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো কেউ। তার পিছু পিছু এসে তার পায়ের কাছে দাঁড়ালো একটা বাচ্চা মেয়ে।যার পায়ের নুপুরের ঝনঝন শব্দে সবার দৃষ্টি তাক হলো সেদিকে। আনাফ চৌধুরী মেয়েটিকে দেখেই হেঁসে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
—“ভিতরে এসো মা।
আনাফ চৌধুরীর মুখে “মা” সম্বোধন শুনে এবার মাথা তুললেন মিনাল খান।সবার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালেন গেটের দিকে।তাতেই তার কলিজা ধক করে উঠলো।সে লাল লাল গভীর চোখ দুটো নিয়ে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। মেয়েটা তার পা আস্তে ধীরে ফেলে খান বাড়িতে প্রবেশ করলো।সাথে প্রবেশ করলো সেই বাচ্চাটাও।আবার ঝনঝন শব্দ হলো।পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। বাচ্চা মেয়েটার নুপুরের শব্দ ছাড়া আর কিছুরই শব্দ নেই। সাউন্ড বক্সে গান বাজছিলো কিন্তু এ্যাশ সেটা যাওয়ার সময় বন্ধ করে দিয়ে গেছে।
মেয়েটা ড্রয়িং রুমের মধ্যে এসে দাঁড়াতেই আনাফ চৌধুরী হেঁসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—“আমার ছোট মেয়ে “এডভোকেট ফারাহ চৌধুরী” আর এই হলো তার মেয়ে “নিহারা চৌধুরী”
নিহারাকে কাছে টেনে কোলে বসিয়ে বললেন তিনি। মিনাল খানের চোখ দিয়ে এই পর্যায়ে পানি বের হলো।তিনি অসুস্থতরার কথা বলে সেখান থেকে চলে গেলেন।তাহা সাথে যেতে চাইলেও তিনি নিলেন না। আয়েশা বেগম এসে ফারাহ মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।থুতনি ধরে মুখ উঁচিয়ে বললেন,
—“মাশাল্লাহ। কারো নজর জেনো না লাগে”—কথাটা বলে চোখ থেকে কাজল নিয়ে সেটা ফারাহ কানের নিচে দিলেন তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন”—”তোমার স্বামী কোথায়?তাকে নিয়ে আসোনি?
—“স্বামী নেই।
গম্ভীর কন্ঠে উওর ফারাহ।একদম ফাহাদের ফটোকপি মনে হলো তার। স্বামী নেই শুনে একটু কষ্ট পেলেন আয়েশা বেগম।মনে করলেন ফারাহ স্বামী হয়তো মারা গেছে। তাই আর কিছু জিজ্ঞেস না করে সরে যেতে নিলেই ফারাহ আবার গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—“আমার এখনো বিয়ে হয় নি।তাই স্বামী নেই। আপনি আবার ভাবনেন না আমার স্বামী মারা গেছে। আসলে বিয়ে করলে যদি আমি ও কন্যা সন্তান জন্ম দেই তাই বিয়ে করি নি।একটা বাচ্চা এডপ্ট করে নিয়েছি!
ফারাহর মুখে এমন কথা শুনে থমকে গেলেন আয়েশা বেগম।কন্যা সন্তান জন্ম দিবে না বলে বিয়ে করে নি?এটা কেমন কথা? তিনি থমকানো গলায়ই প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
—“এটা কেমন কথা মা?মেয়ে জন্ম দিবে না বলে বিয়ে করো নি?মেয়ে জন্ম দেওয়া পাপ নাকি?
—“মনে হয়তো পাপ।তাই তো কিছু মানুষ মেয়েকে সন্তানকে ঘরে তুলে না।অন্যের কাছে দিয়ে দেয়। সন্তান ও ওদল…
—“ফারাহ?
ফারাহ নিজের কথা শেষ করাই আগেই গম্ভীর কন্ঠে ধমক দিলেন নূরজাহান বেগম।ফারাহ তার দাদুর ধমকে চুপ করলো।চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে সিঁড়ির পাশে আরাবী আর তাহাকে দেখে এগিয়ে গেলো সেদিকে।তাহার সামনে দাঁড়িয়ে তাহার গাল টেনে বললো,
—“তুমি তো ভারী মিষ্টি।
আরাবী অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ফারাহর দিকে।ফারাহ সেটা খেয়াল করলো।মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো,
—“কি হয়েছে? এভাবে কেনো তাকিয়ে আছো?
—“তুমি দেখতে কিছুটা আমার মতো!
নিচের দিকে তাকিয়ে আবার ও হাসলো ফারাহ।
—“আমি তোমার মতো?না তুমি আমার মতো? হুম?
আরাবীর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো ফারাহ।আরাবী উওর করলো না।শুধু তাকিয়ে রইলো ফারাহ মুখের দিকে।তখনই সেখানে উপস্থিত হলো ফাহাদ।এক পলক আরাবীর দিকে তাকিয়ে পরে ফারাহর দিকে তাকিয়ে বললো,
—“চল এখান থেকে।
ফারাহ আর ফাহাদের চেহারার মিল খুঁজলো আরাবী। তবে পেলো না।তবে একটা জিনিস মিল পেলো সেটা হলো দুজনের কথা বলার ধরন।একই ভঙ্গি,দুজনেই একইভাবে কথা বলে,গম্ভীর। আরাবী নিজের ভাবনায় ইতি টেনে বাস্তবে ফিরলো।তখনই তার মনে হলো ফাহাদ কি তাকে ইগনোর করলো?কথা বললো না যে?তার সাথে সকাল থেকে এমন কেনো করছে?ভালোবাসা শেষ? নতুন কাউকে পেয়েছে?কথাটা মনে আসতেই হাত মুঠো করে ফেললো আরাবী।চোখ মুখ শক্ত করে তাকালো ফাহাদের দিকে।ওর দিকে চোখ রেখেই বললো,
—“আশতিয়াক এ্যাশের বোন আমি।আমি দূর্বল না।আমাকে ঠকানোর কথা ভাবলে আপনাকে আমি খুন করে ফেললো ফাহাদ।
কথা গুলো বলার সাথে সাথেই আরাবীর চোখ দিয়ে পানি পড়লো।আরাবী সেগুলো মুছে ফাহাদের থেকে চোখ সরিয়ে বেরিয়ে গেলো বাহিরের দিকে।আরাবী বের হতেই এক জোড়া লাল চোখ নিবদ্ধ হলো তার উপর।তার পা ও সেখানে আর দাঁড়িয়ে রইলো না।গুটিগুটি পাতা ফেলে সেটা বাহিরে বেরিয়ে গেলো আরাবীকে অনুসরণ করে।
রাত তখন ১১ টা সবাই উপস্থিত এখন মেহেদী স্টেজের ওখানে। তাহা আর নূরকে পাশাপাশি সোফায় বসানো হ’য়েছে আলাদা স্টেজে।দুটো স্টেজ করা হয়েছে। একটাতে বর বউকে বসানো হবে আরেকটায় নাচ গান।নূর আর তাহাকে সেখানেই বসানো হলো।তবে দুজনের একজন ও স্হির না।দুজনেই চিন্তিত তাদের স্বামীর জন্য। সবাই যেখানে পাশের স্টেজে নাচ দেখতে ব্যাাস্ত সেখানে তারা,দুজন গেটের দিকে তাকিয়ে আছে কারো দেখা পাওয়ার আশায়।কিন্তু তাদের আশা পূরণ করে কেউই আসছে।নূরের চোখে পানি চিকচিক করছে।যেকোনো মূহুর্তে তা গড়িয়ে পড়বে।দূর থেকে তা লক্ষ করলো ফারাহ।সে তার মেয়েকে নিয়ে একপাশে দাড়িয়ে ছিলো।এইসব কোলাহল তার পছন্দ না।শুধমাএ ফাহাদ আর এ্যাশের কথায় এসেছে নয়তো সে কিছুতেই এখানে আসতো না।
ফারাহ তার মেয়েকে নিয়ে নূর আর তাহার কাছে আসলো।নূরের পাশে বসে নিহারাকে কোলে তুলে বললো,
—“কি হয়েছে? চোখে পানি কেনো হুম?এতো সুন্দর করে সেজেছো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না?
ফারাহর কথায় তাহা ও এবার তাকালো নূরের দিকে।নূর এবার শব্দ করে কেঁদে উঠেছে।বিচলিত হলো তাহা।নূরের আরেকপাশে বসে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
—“কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো?ইহান ভাইয়া চলে আসবে কেঁদো না!
—“এখনো কেনো আসছে না আপু?কতো রাত হয়ে গেলো।আমি সেই সকাল থেকে তাকে একবার ও দেখিনি।
কাঁদতে কাঁদতেই বললো নূর।ইতিমধ্যে হেঁচকি উঠে গেছে নূরের।হাঁপাচ্ছে নূর।এই সময়টায় প্রাপ্ত বয়স্ক নারীরা ও অনেক দূর্বল হয়ে পড়ে সেখানে নূর তো বাচ্চা ১৫ বছর বয়স মাএ।এতটুকু বয়য়সে এতো ধকল সামলাতে পারে? পেগন্সির জার্নিটা কি এতোটাই সহজ?মা হওয়া এতোটা ও সহজ নয়।এই নয়টা মাস একজন নারীর কি রকম কাটে সেটা শুধু সেই জানে। তাহা নূরকে শান্ত করতে চাইলো কিন্তু পারলো না।ইতিমধ্যে আশপাশ ও গম্ভীর হয়ে উঠলো।আয়েশা বেগম এখন চিন্তিত হলেন ছেলের জন্য। আয়ুশ ও এখন এখানে নেই। কাকে পাঠাবেন হসপিটালে সেই চিন্তায় নিজের প্রেশার বাড়িয়ে নিচ্ছেন।তাহা আয়েশা বেগমকে উওেজিত হতে দেখে তাকে গিয়ে ধরে সামলালো। নূরকে ও নিয়ে এসে সেখানে বসাতেই শুনা গেলো প্রত্যাশিত সেই কন্ঠ,
—“নূর?
পরিচিত কন্ঠে “নূর” নাম শুনতেই চকিত চাইলো নূর।ঝাপসা চোখে ইহানকে দেখতে পেতেই দৌড়ে গেলো তার দিকে।লেহেঙ্গা কোণা উঠিয়ে ছুটলো সে।পিছন থেকে সবাই সাবধানী বাণী ছুড়লো কিন্তু তা কানে এলো না নূরের।আপাতত সে প্রিয় স্বামীর বুকে পড়তেই ব্যাস্ত।
নূর দৌড়ে গিয়ে ঝাপটে ধরলো ইহানকে।আচমকা নূরের ধাক্কা সামলাতে পারলো না ইহান।যার দূরুন দুই পা পিছিয়ে গেলো।কিন্তু নূরকে ছাড়লো না।দুই হাতে ঝাপ্টে ধরে রাখলো। আস্তে আস্ত সবাই সেখানে উপস্থিত হলো।ইহানের পাশে দেখা গেলো এ্যাশ এবং আয়ুশকেও। তাহা এ্যাশকে দেখে সস্হির নিঃশ্বাস ফেললো। এতক্ষণ সে ও অস্হির হয়ে ছিলো।তবে নূরের মতো হয়তো কখনো কাঁদতে পারতো না।কারণ সে তো কখনো কারল,সামনে তার দূবলতা প্রকাশ করে না।
ইহান নূরের মাথা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এতগুলো মানুষের সামনে লজ্জা ও লাগছে তার।ইহান নূরের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া অবস্থায় ফিসফিস করে বললো,
—“নূর পাখি? উঠো।দেখো কতো মানুষ। কি ভাবছে বলোতো?
প্রথম বার স্বামীর মুখে “পাখি” সম্মেদন শুনতে পেলো নূর।যার জন্য তার কান্না থেমে গেলো।মাথা তুলে ইহানের দিকে তাকাতেই পৃথিবী ঘুরে উঠলো তার।ইহানের গালে হাত দিয়ে আতংকে উঠে জিজ্ঞেস করলো—
—“কি হয়েছে আপনার ডাক্তার সাহেব? কপালে বেন্ডেজ কেনো?
ইতিমধ্যে সেখানে উপস্থিত হয়েছে সবাই। শুধু নেই ইহানের ফুফু,তিশা আর মিনাল খান।তিশা একটু গিয়েছে তার অফিসে আর সাইরা বেগম রুমে ভাইয়ের কাছে আছেন।যার জন্য এখানে উপস্থিত নেই তিনি। আয়েশা বেগম ও ছুটে আসলেন ছেলের কাছে কপালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
—“এটা কি করে হলো ইহান?
ইহান পাশের দাঁড়ানো এ্যাশের দিকে এক পলক তাকিয়ে মা আর বউয়ের দিকে তাকালো আবার।ছোটোখাটো এক্সিডেন বলে বিষয়টা ধামাচাপা দিয়ে দিলো।তারপর আবার এ্যাশের দিকে তাকিয়ে নূরকে একহাতে জরিয়ে ভিতরে যেতে যেতে তাহার কানে বললো—
—“ভাইয়ার হাত কেটে গেছে ঘরে নিয়ে বেন্ডেজ করে দে।
ইহানের কথায় এ্যাশের দিকে তাকালো এ্যাশ।এ্যাশের হাতের মুঠোয় সাদা রুমাল চেপে রাখা যেটা ইতিমধ্যে লাল হয়ে উঠেছে এ্যাশের রক্তে।একটু দূর থেকে সেটা চোখ পড়লো সানজিদা চৌধুরীর।তাহা যাওয়ার আগে তিনি গিয়ে এ্যাশের পাশে দাঁড়ালেন। এ্যাশের হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—
—“হাত কেটেছো কি করে?আর কোথায় গিয়েছিলে?
এ্যাশের দৃষ্টি স্থির তাহার দিকে।তাহা সেখানেই দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে এ্যাশের দিকে।দুজনেই দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।সানজিদা চৌধুরীর কথায় এ্যাশ তার চোখ সরালো।সানজিদা চৌধুরীর উপর দৃষ্টি ফেলে আস্তে করে বললো—
—“কি করে কেটেছে না জিজ্ঞেস করে আপনার ওই বউমাকে গিয়ে বলুন আমার হাতটা বেন্ডেজ করে দিতে।
এ্যাশের কথায় মুচকি হাসলেন তিনি।এ্যাশ তাকিয়ে রইলো সেই হাসির দিকে।সানজিদা চৌধুরীর হাসিটা এ্যাশের অনেক ভালো লাগে।হাসলে তার দুই গালে ঠোল পড়ে।বয়স পেরিয়েছে হয়তো অনেক কিন্তু এখনো মারাত্মক সুন্দরী তিনি।যুবতী বয়সে যে কত যুবকের বুকে ঢেউ তুলেছেন কে জানে।
সানজিদা চৌধুরী এ্যাশকে টেনে সাথে নিয়ে এসে তাহার সামনে দাঁড়ালেন। এ্যাশের কাটা হাতটা তাহার হাতে তুলে দিয়ে বললেন-
—“স্বামীর হাতে ওষুধ লাগিয়ে বেন্ডেজ করে নিয়ে আসো যাও।
কথাটা বলেই তিনি চলে গেলেন।তাহা অসস্তিতে তার হাতটা হাসফাস করলো।কিছুপল এদিক ওদিক তাকিয়ে এ্যাশের হাত টেনে বাড়ির ভেতর যেতে যেতে বললো-
—“চলুন।এতো মারামারি না করলে শান্তি লাগে না?আজকের দিনেও এভাবে বাসায় আসতে হলো?
শরীলে হাজার কাটা ছেঁড়া থাকলে ও এ্যাশ কখনো সেখানে ওষুধ কিংবা বেন্ডেজ করে না।আজকে করতে চেয়েছ মূলত তাহার একটু যত্ন পেতে।এ্যাশ শুনেছে নারীরা অনেক যত্নশীল।কিন্তু কখনো সে নারীর যত্ন পায়নি।আজকে পেতে চায় তার ব্যাক্তিগত নারীর একটু যত্ন। শুধু আজকে নয় এখন থেকে প্রতিটা দিন,প্রতিটাক্ষন সে এই নারীর যত্ন ভালোবাসা পেতে চায়।
তাহা এ্যাশের হাতটা সাজা বেন্ডেজ মুড়িয়ে দিলো,আর এ্যাশ শুধু তাকিয়ে রইলো সেই মুখের দিকে।তবে তাহার এই মেকাপে আবৃত্ত চেহারা তার ভালো লাগলো না। এ্যাশ মুখটা বিকৃত করে বললো-
—“চেহেরায় এই আটা ময়দা লাগিয়ে ভূত হয়ে বসে আছো কেনো?তুমি কি জানো তোমাকে এখন ভূত লাগছে দেখতে?
বেন্ডেজ করা শেষ। তাহা ফাস্ট এইড বক্সটা বিছানার টেবিলের পাশে গিয়ে রেখে আসলো।এ্যাশের প্রশ্নের উওর দিলো না।যার জন্য রাগ উঠে গেলো এ্যাশ।নাকের ঢগায় রাগ তার সব সময় সেটা হাসফাস করে কারো উপর পড়ায় জন্য। এখনো করছে।যার জন্য চেঁচিয়ে উঠলো এ্যাশ-
—“কথা কানে যায় না?চুপ করে আছো কেনো বোবা হয়ে গেছো?
—“চেনাচ্ছেন কেনো?আস্তে কথা বলুন।আশেপাশে চোখ যায় না?আজকে যে আমাদের এনগেজমেন্ট ভুলে গেছেন?স্মৃতি শক্তি দূর্বল?
—“তো এতে এতো সাজতে হবে?
—“হ্যাঁ।
—“কাকে দেখাবে এই সাজ?তোমার স্বামী তো তোমাকে সাজতে দেখতে পছন্দ করে না।
চুপ করে গেলো তাহা।প্রথমেই কিছু বলতে পারলো না।মেয়েরা তো সাজে তার প্রিয় মানুষকে দেখানোর জন্য। সে ও তো তার প্রিয় মানুষের জন্যই সেজেছ। নয়তো এতে একটু আগ্রহ নেই তাহার।আর সেই কিনা এই সাজ পছন্দ করে না?মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো তাহার।হাতের নকের দিকে তাকিয়ে মিনমিনে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
—“মেকাপ তুলে ফেলবো?
এ্যাশ ইতিমধ্যে বিছানায় গিয়ে শুয়েছে।হাতটা চোখের উপর দেওয়া।সেভাবেই থেকেই এ্যাশ বললো-
—“মুখের মেকাপ তুলে এখানে আসো।লিপস্টিক আমি তুলে দিবো।
ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে তাহা বললো-
—“মেকাপ তুলতে পারলে লিপস্টিকে কি সমস্যা? আমি সেটা ও তুলতে পারবো।
—“রাগাবে না আমায়,যেটা বলছি সেটা করো।যাও।
এ্যাশের কথা মুখ বাকালো তাহা।মনে মনে এ্যাশকে ঝাড়তে ঝাড়তে চলে গেলো ওয়াশরুমের দিকে। মুখের মেকাপ সহ লিপস্টিক তুলে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। মুখে হালকা একটু ক্রিম দিয়ে পিছনে ফিরলো।এ্যাশ দাঁড়িয়ে। তাহাকে বের হতে দেখেই এ্যাশ তাহার পিছন পিছন এসে দাঁড়িয়েছে।তাহার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে এ্যাশ গম্ভীর কন্ঠে বললো-
—“না করেছিলাম না আমি?
তাহা এতো বোকা না যে এ্যাশের মনে কি কুবুদ্ধি চলছে বুঝবে না।এ্যাশ কেনো নিজে লিপস্টিক মুছবে বলেছে সে সম্পর্কে তার ধারণা আছে।তাহা ঠোঁট শয়তানি হাসি ফুটিয়ে এ্যাশকে একটু সাইড কাটিয়ে সরে যেতে যেতে বললো-
—“আমার ঠোঁট আমার ইচ্ছে করেছে তাই মুছেছি আপনার কি?
তাহা দরজা দিয়ে বের হওয়ার আগেই থাবা মেরে ধরলো এ্যাশ।দরজা লাগিয়ে দরজায়ই তাহাকে চেপে ধরে তাহার উপর ঝুঁকে এসে হাস্কিস্বরে বললো-
—“ঠোঁট আপনার হলেও সেই ঠোঁটে অধিকার কিন্তু আমার ম্যাডাম।
ব্যাস আর কিছু বললো না এ্যাশ।তাহার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিলো।চোখ বন্ধ করে এ্যাশের চুল কামছে ধরলো তাহা।প্রতিবারের ন্যায় এবার আর দূরে সরাতে চাইলো না।স্বামীর সাথে সায় জানালো।নতুন সূচনা তৈরি হলো এখান থেকেই।যে সূচনার সমাপ্তি তাদের কারোরই জানা নেই।
রাতে কেনোরকমে এ্যাশ আর তাহার আন্টি বদল হলো।ছোট কাটো করে নাচগান হলো।কিন্তু তাহা বা নূরকে মেহেদী পড়ানো হলো না।কারণ নূর যে সেই ঘরে গিয়েছিলো আর আসে নি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো সে।তাই ইহান আর তাকে নিচে নিয়ে আসে নি।নূরকে ছাড়াই আন্টি বদল হলো।কিন্তু তাহা মেহেদী পড়লো না।তার ইচ্ছে নূরের সাথে মেহেদী পড়বে একসাথে। যারকারণে সকাল সকাল দুইজন মেহেদী আটিস্ট আনা হলো।যারা এই মুহূর্তে মেহেদী পড়াচ্ছ তাহা আর নূরকে।আর তাদের পাশে বসে মেহেদী পড়া দেখছে নিহারা।সে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে।জেনো এতটুকু বয়সেই মেহেদী পড়ানো শিখতে চাইছে।
তাদের যেতে,দিননি আয়েশা বেগম।বিয়ে শেষ হওয়া অব্দি তারা এ বাড়ি থাকবে ঠিক হলো।সাথে আয়ান,নিল,ও থাকবে।আজকে যেহেতু তাদের বিয়ে সেজন্য সবাই সকাল সকাল উটে পড়েছে যে যার কাজে লেগে পড়েছে ইতিমধ্যে। তাহা আর নূরকে গোসল করানোর ব্যাবস্হা করানো হয়েছে ছাদে।যেখানটা ছোট করে,সাজানো হচ্ছে আর সেটা সাজাচ্ছে আরাবী।তাও একা হাতে।সকাল হতেই সে ছাদে এসেছে সাজাতে এখন অব্দি খায় ও নি।গভীর মনোযোগ তার কাজের দিকে।হঠাৎই পায়ের শব্দ কানে আসতেই আরাবীর মনোযোগ ভঙ্গ হলো।গাড় ঘুরিয়ে তাকালো পিছনে।ফাহাদ আসছে এদিকেই। ফাহাদকে দেখেই গাড় ফিরিয়ে নিলো আরাবী মনোযোগ দিলো আবার সাজানোতে।
ফাহাদ ঠোঁটে মুচকি হাসি। হাতে কুড়িয়ে পাওয়া কিছু ফুল।যার নাম জানে না ফাহাদ।সকালে হাঁটার পথে রাস্তায় পেয়েছে তাই সেগুলো কুড়িয়ে এনেছে তার প্রিয়তমার জন্য। প্রিয়তমা যে ভয়ংকর রেগে আছে সেটা সে জানে।তবে তার কিছু করার নেই। অভির সাথে দেখা করে দোষ করেছে আরাবী।যার শান্তি কথা বলে আরাবীকে দিয়েছে। অভিকে ও দিয়েছে।ফাহাদের মনে দোষ করলে তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে।এখন তুমি যেই হয় না কেনো।দোষ করে পার পাবে না।অনন্ত ফাহাদের কাছ থেকে নয়।দুজনকে শাস্তি দিয়ে ফাহাদের মন ফুরফুরে যার জন্য মূলত প্রিয়তমার জন্য ফুল কুড়িয়ে নিয়ে এসেছে রাগ ভাঙাতে।নয় এসবে সে নেই। ফাহাদ তার ফুড়ফুরা মন নিয়ে আরাবীর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর ফুল গুলো ছিটিয়ে দিলো আরাবীর গায়ে।আরাবীর কোনো ভাবান্তর নেই। সে একমনে সাজাতে ব্যাস্ত।ফাহাদ এবার আরাবীর সামনে গিয়ে দাড়ালো তাও গম্ভীর হয়ে।মানুষের সামনে হাসতে পারে না সে।মনে হয় জগন্য লাগে তাকে হাসলে তাই সে হাসে না।গম্ভীর হয়ে থাকে।এতেই তার সৌন্দর্য।
ফাহাদ গলা খাঁকারি দিয়ে আরাবীর মনোযোগ আর্কষন করতে চাইলো।কিন্তু পারলো না।আরাবী পাওাই দিলো না।এবার রাগ উঠে গেলো ফাহাদের।গম্ভীর কন্ঠে বললো-
—“কি হলো কথা বলছো না কেনো?
চোখ তুলে ফাহাদের দিকে তাকালো।তাতেই ফাহাদের গম্ভীরতা কেটে গেলো।চোখে মুখে নেলো এলো কোমলতা।কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আরাবীর মুখের দিকে।আরাবী তপ্ত শ্বাস ফেলে অভিমানী কন্ঠে বললো-
—“আপনি কথা না বললে কিছু না আর আমি না বললেই দোষ?কালকে অবহেলা কেনো করলেন?ভালোবাসা কি ফুরিয়ে গেছে?আমার কাছে আসলেই সবার ভালোবাসা ফুরিয়ে যায় নাকি?
ফাহাদের মুগ্ধতা কেটে গেলো।আবার গম্ভীর হয়ে গেলো সে।প্রিয়তমার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলো কিছু হয়েছে। নয়তো এভাবে কথা বলার মেয়ে আরাবী নয়। যে সে যতই অভিমান করুক!ফাহাদ আরেকটু এগিয়ে এসে আরাবীর মুখটা হাতের আজলায় নিয়ে বললো-
বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ২১
—“কি হয়েছে আরা?কেউ কিছু বলেছে?এমন কথা বলছো কেনো?
আরাবীর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।সেটা যত্নে মুছিয়ে দিলো ফাহাদ।এবার সে সিওর হয়ে গেলো কিছু হয়েছে আরাবীর। ফাহাদ কন্ঠে কোমলতা এনে আবার জিজ্ঞেস করলো
—“আমাকে কি বলবে না প্রিয়তমা তার মনের কথা?
এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না আরাবী।ফাহাদের বুকে মাথা রেখে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো ওকে।কাঁদতে কাঁদতে বললো-
—“আপনিও কি আমাকে বিয়ের আসরে রেখে চলে যাবেন ফাহাদ বিয়ে করবেন না আমায়?বউ হবো না আমি আপনার?
