Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৮

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৮

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৮
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

বরপক্ষের বাকি আত্মীয়রাও এবার চিল্লিয়ে স্টেজ কাঁপাতে লাগল।
​নাচগান পর্ব ধামাকাদারভাবে শেষ হতেই কনেপক্ষের লোকেরা এসে হাসিমুখে বললেন, “চলুন চলুন, বরযাত্রী আর বাকি সকলকে এবার খেতে দেওয়া হবে!”
​সবাইকে তখন খাবারদের দিকে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল। জিয়ানের টেবিলের দিকে রিত্তিকাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আর ঠিক তখনই, ভিড়ের মাঝে হুট করে জিয়ানের চোখ পড়ল রিত্তিকার ওপর। এতোক্ষণ খেয়াল না করলেও, এখন একদম সামনাসামনি রিত্তিকাকে দেখে জিয়ান যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। লাল ওড়নার নিচ থেকে উঁকি দেওয়া রিত্তিকার ফর্সা লাজুক মুখ, চোখের পাপড়িতে হালকা জলের কণা আর ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই চেনা চঞ্চলতা—সব মিলিয়ে তাকে এতটাই মোহনীয় লাগছিল যে জিয়ান নিজের অজান্তেই বেশ কিছুক্ষণ রিত্তিকার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

জিয়ানকে ওভাবে রিত্তিকার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে পাশ থেকে আরিফ কনুই দিয়ে জিয়ানের পাঁজরে একটা আলতো গুঁতো মারল। তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল, “কী রে ভাই? মুখে তো বললি জোর করে বিয়ে দিচ্ছে, এখন তাহলে কনের দিকে ওভাবে হাভাতের মতো তাকিয়ে আছিস কেন? যেভাবে দেখছিস, মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই আস্ত গিলে খেয়ে ফেলবি!”
​আরিফের এমন খোঁচায় জিয়ানের ঘোর কাটল। চট করে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে আরিফকে করা গলায় ধমকে বলল, “বেশি কথা না বলে নিজের চরকায় তেল দে। আর যদি মার খেতে না চাস, তবে দয়া করে তোর ওই ফাজিল মুখটা একদম বন্ধ কর!” জিয়ানের এমন লাল হয়ে যাওয়া মুখ দেখে আরিফ মনে মনে হেসেই খুন হলো।
​খাওয়া-দাওয়ার এলাহী পর্ব শেষ হতেই মূল আসর জমল। কাজী সাহেব বড় একটা খাতা আর কলম নিয়ে প্রধান টেবিলে এসে বসলেন। বর ও কনে—উভয় পক্ষের অভিভাবক, অর্থাৎ বরপক্ষের নওশাদ কায়সার এবং কনেপক্ষের আরিশান ইসলাম সাহেবের সম্মতি ও সাক্ষ্য নিয়ে কাজী সাহেব বিয়ের আনুষ্ঠানিক খুতবা ও নিয়মাবলি শুরু করার প্রস্তুতি নিলেন।

​কাজী সাহেব চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক বসিয়ে, খাতা খুলে আরিশান ইসলাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, “মেয়েকে কি এখানেই জনসমক্ষে এনে বিয়ে পড়ানো হবে, নাকি ঘরে পড়ানো হবে..?”
​আরিশান ইসলাম সাহেব একটুও দ্বিধা না করে স্পষ্ট গলায় বললেন, “এখানেই সবার সামনে পড়ানো হোক কাজী সাহেব।”
​কথাটা বলেই তিনি রিতু ইসলামকে ইশারা করলেন রিত্তিকাকে ডেকে নিয়ে আসার জন্য। ওদিকে ভেতরের ঘরে তখন অন্য এক কাণ্ড চলছে। রিত্তিকা নিজের চেনা বাড়ি, বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভেবে অঝোরে কাঁদছে। তার বান্ধবীরা, চাচিরা সবাই তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু রিত্তিকার চোখের পানির কোনো থামাথামি নেই।
​ঠিক তখনই ঘরের কোণ থেকে রিত্তিকার এক বৃদ্ধা দাদি, রুনা খাতুন পান চিবোতে চিবোতে এগিয়ে এলেন। তিনি রিত্তিকার পিঠে একটা চাপড় মেরে গেঁয়ো সুরে বললেন,
“আরে থ্যাম ছেঁড়ি, থ্যাম! এহনই যদি কাইদা চোখের সব পানি ফুরাই ফেলোস, তো যহন জামাই ব্যথা দিবো, তহন কান্দার জন্য পানি পাবি কই? কাইদা কি কোনো লাভ আছে? একদিন তো হকগোলকেই বাপের বাড়ি ছাইড়া জামাইয়ের ঘর করতে হয়।”

​দাদির এমন সোজা সাপটা আর ইঙ্গিতবাহী কথা শুনে রিত্তিকা লজ্জায় যেন একেবারে মাটির সাথে মিশে গেল! সে চোখ দুটো বড় বড় করে বলল, ‘ও খোদা! সবার সামনে বুড়ি এসব কী উল্টোপাল্টা কথা বলছে!’
​রুনা খাতুন রিত্তিকার লজ্জা পাওয়া দেখে মুখ টিপে হেসে ফের বললেন, “হ ভাই, এহন তো আমার কথাই বুড়ি মনে হইবো! জামাইয়ের সোহাগ যহন নেবি, তহন দেহিস—তোরে ঘর থেকে বার কইরা মুই যামু!”
​রিত্তিকা কোনোমতে নিজের লজ্জা আড়াল করে বলল, “দাদু! তুমি যেয়ো, তাও দয়া করে এখন একটু চুপ থাকো তো!”

​তখনই নিহারিকা পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলল, “আরে তোরা জানিস না? দুইদিন আগেও তো অন্য কারোর বিয়ে দেখে রিত্তি আমাদের বলতো—’ সবার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, আমার কেন বিয়ে হয় না?’ আর আজ যখন নিজের বিয়ে হচ্ছে, তখন কান্নার শেষ নেই! বিয়ে না হলেও কান্না করতিস, আবার হচ্ছে তাও কান্না করছিস!
​বান্ধবীদের এমন ঠাট্টার মাঝে বরের ছোট বোন জেসমিন রিত্তিকার হাতটা পরম মমতায় নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “আরে ভাবি আপু! তুমি এত কান্না করছ কেন বলো তো? আমার জিয়ান ভাইয়া কিন্তু অনেক জেন্টাল। তোমাকে একদম ফুলের মতো আগলে রাখবে, দেখে নিও।”
​জিয়া পাশে দাঁড়িয়ে জেসমিনের কথা শুনে হেসে ফেলল এবং জেসমিনকে একটু থামিয়ে দিয়ে বলল, “আহ জেসমিন! তুই এখন একটু চুপ কর তো। দেখছিস তো রিত্তি মনে মনে কতটা আপসেট আর নার্ভাস হয়ে আছে, আর তোরা সবাই মিলে ওকে নিয়ে অনবরত মজা করছিস!” রিত্তিকা জিয়ার দিকে কৃতজ্ঞতার চাউনি হানতেই জিয়া রিত্তিকার কপালে হাত দিয়ে আদর করে বলল, “বুড়ি, তুমি এখন একদম চুপচাপ থাকো, কিচ্ছু ভাবতে হবে না।”

​কিছুক্ষণের মধ্যেই রিতু ইসলাম রিত্তিকাকে ধরে ধরে ঘর থেকে বের করে নিয়ে এলো এবং স্টেজে জিয়ানের ঠিক পাশের খালি আসনটিতে বসিয়ে দিল। রিত্তিকা তখনও মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁপেই যাচ্ছে, তার চোখের জল ওড়নার এক কোণ ভিজিয়ে দিচ্ছে।
​রিত্তিকা এসে বসার সাথে সাথেই কাজী সাহেব আর দেরি করলেন না। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে পবিত্র নিকাহ খুতবা পাঠ শুরু করলেন। খুতবা পাঠ শেষ করে তিনি আরিশান ইসলাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে দেনমোহরের অঙ্কটা নিশ্চিত করে জিয়ানের দিকে ঘুরলেন।
​কাজী সাহেব জিয়ানের হাতটা ধরে বললেন, “বাবা জিয়ান কায়সার, আরিশান ইসলামের একমাত্র কন্যা রিত্তিকা ইসলামকে দুই কোটি দুই টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া, উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে আপনি কি বিবাহ করিতে রাজি? রাজি থাকিলে বলুন—আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
​জিয়ান এক সেকেন্ডের জন্যও সময় নষ্ট করল না। তার কাছে এই সমস্ত কান্নাকাটি আর আনুষ্ঠানিকতায় অযথা সময় নষ্ট করার কোনো মানেই ছিল না। সে অত্যন্ত স্পষ্ট, দৃঢ় এবং গম্ভীর গলায় সাথে সাথেই বলে উঠল, “আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”

​জিয়ানের মুখ থেকে প্রথমবার কবুল শব্দটা বের হতেই রিত্তিকার কাজিন আর বান্ধবীরা সবাই মিলে একসাথে সমস্বরে টিটকিরি দিয়ে গেয়ে উঠল, “মিয়া বিবি রাজি তো আব ক্যায়া কারেগা কাজি! বাহ দুলাভাই! ইতনি জলদি? তর আর সইছে না বুঝি!” তাদের এই চিল্লানিতে জিয়ান মনে মনে চরম বিরক্ত হলো।
আরিশান ইসলাম সাহেব পরিস্থিতি সামলাতে চোখ রাঙিয়ে মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন, ” একদম চুপ করো তো তোমরা! কাজী সাহেবকে কাজ করতে দাও।”
​তার ধমক খেয়ে মেয়েরা একটু চুপ হলো। কাজী সাহেব পরপর তিনবার জিয়ানের কাছ থেকে পূর্ণ সম্মতি নেওয়ার পর কাবিননামার বড় খাতাটা জিয়ানের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এখানে একটা সাইন করো বাবা।” জিয়ান কলমটা নিয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়াই খটখট করে নিজের সই বসিয়ে দিল।
​জিয়ানের সাইন করা শেষ হতেই কাজী সাহেব এবার খাতাটা নিয়ে রিত্তিকার সামনে এসে বসলেন। বরের বাড়ির লোক, কনের বান্ধবীরা—সবাই মিলে রিত্তিকার চারপাশে এসে ভিড় জমাল। সবাই আসলেও কনের ভিড়ের মধ্যে শুধু একজনের দেখা মিলছিল না, সে হলো রিত্তিকার নিজের বড় ভাই ইফাত। তাকে সকাল থেকে কেন যেন বাড়ির কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, যা রিত্তিকার মনের ভেতর একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি তৈরি করছিল।

​কাজী সাহেব এবার রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, “মা রিত্তিকা ইসলাম, নওশাদ কায়সারের জ্যেষ্ঠ পুত্র জিয়ান কায়সারের সাথে দুই কোটি দুই টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া আপনার বিবাহ দেওয়া হইতেছে। আপনি কি এই বিবাহে রাজি? রাজি থাকিলে বলুন মা—আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
​পুরো আসর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু এক মিনিট, দুই মিনিট করে প্রায় দীর্ঘ ৬ মিনিট পেরিয়ে গেল, তবুও রিত্তিকার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে। রিত্তিকার এই নীরবতা দেখে জিয়ানের বিরক্তি যেন চরমে পৌঁছাল।
​পরিস্থিতি থমথমে দেখে রিত্তিকার প্রবীণ দাদু সাদমান ইসলাম সাহেব এগিয়ে এলেন। তিনি রিত্তিকার মাথায় হাত রেখে অত্যন্ত নরম গলায় বললেন, “দিদিভাই! আমার সোনা দিদিমণি, কাজী সাহেবকে কবুল শব্দটা বলে দাও সোনা। সবাই অপেক্ষা করছে।”

​রিত্তিকা তাও কিছু বলছে না, সে অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে। আর ঠিক তখনই, আরিশান ইসলাম আর ওনার ঠিক পেছন পেছন কোথা থেকে যেন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির হলো ইফাত! তারা দুজনে সটান রিত্তিকার সোফার সামনে এসে দাঁড়াল এবং রিত্তিকাকে বিয়ের সম্মতি দেওয়ার জন্য বলতে লাগল।
​ইফাত রিত্তিকার পাশে বসে ওনার কাঁপতে থাকা কাঁধটা জড়িয়ে ধরে ফের আদুরে গলায় বলল, “রিত্তি… আমার লক্ষ্মী বোন, বল সোনা—আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
ভাই ইফাতকে সামনে দেখেই রিত্তিকার ভেতরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। সে হুট করে ভাইয়াকে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওনার বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করল, “ভা… ভাইয়া! আমি বল… বলব না! আমি তোদের ছেড়ে কোথাও যাব না ভাইয়া!”
​ইফাত রিত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো করে হেসে বলল, “এমন করে না সোনা! বল, দেখ কাজী সাহেব তাড়া দিচ্ছেন তো।

​ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে জিয়ানের কথা মনে পড়তেই রিত্তিকা আস্তে আস্তে কিছুটা শান্ত হয়ে গেল। সে রূঢ় বাস্তবতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিল যে, আজ থেকে তার এক নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে এবং যাকে সে ভালোবেসেছে, সে-ই এখন তার স্বামী। তার কান্নার বেগ অনেকটাই কমে এলো। সে ইফাতের বুক থেকে মাথাটা তুলে, চোখ দুটো মুছে অত্যন্ত মৃদু, কাঁপাকাাঁপা কণ্ঠে আস্তে করে বলল—”আলহামদুলিল্লাহ ক… কবুল।”
​কাজী সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আরো দুইবার স্পষ্ট করে বলো মা।”
​রিত্তিকা এবার জিয়ানের দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে একটু দৃঢ় গলায় বলল,
“কবুল, কবুল।”
​কনে মুখ খোলামাত্রই চারপাশের পুরো বাড়ি একসাথে খুশিতে মুখরিত হয়ে চিৎকার করে উঠল—”আলহামদুলিল্লাহ!”

​কাজী সাহেব খাতাটা বন্ধ করতে করতে মোনাজাতের জন্য হাত তুলে বললেন, “আজ থেকে আপনারা ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী আইনত স্বামী-স্ত্রী। স্ত্রী হিসেবে স্বামীর সকল ন্যায় কথা মান্য করবে এবং দুজনে মিলে সুখের সংসার গড়বে।” এই বলে তিনি নবদম্পতির দীর্ঘায়ু ও সুখের জন্য আল্লাহর দরবারে বিশেষ দোয়া করলেন এবং উপস্থিত সবাই আমিন আমিন বলে মোনাজাতে শরিক হলো।
​দোয়া শেষ হতেই ইরা জিয়ানের কাছাকাছি এসে বাঁকা হেসে রসিকতা করে বলল, “আরে দুলাভাই! বিয়ে তো হয়ে গেল, এখন অন্তত নিজের বউডারে একটু ভালো করে চাইয়া দেহো!”
​জিয়ান চিরচেনা গম্ভীর ভাব নিয়ে সোজা তাকিয়ে রইল, সে রিত্তিকার দিকে মুখ ফিরিয়েও তাকাল না। জিয়ানের এই পাথরের মতো ভাব দেখে রিদিতা পাশ থেকে ইরাকে টেনে সরিয়ে দিয়ে বলল, “আরে তোরা সর তো এখান থেকে! দেখছিস না আমাদের দুলাভাইয়ের লজ্জা একটু বেশি! তোরা সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে ওনার লজ্জা আরও বেড়ে যাবে, সর যাহ তোরা!” জিয়ান মনে মনে রিদিতার ওপর ভয়ানক চটল, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারল না।
​দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা বিকেল ৪টা বেজে গেছে। এবার বরযাত্রীদের বিদায় নেওয়ার এবং কনেকে বরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পালা।

​বিদায়ের ঠিক পূর্বমুহূর্তে ইফাত জিয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল। ওর চোখে তখন বোনকে হারানোর এক চাপা কান্না। ইফাত জিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরে আবেগময় গলায় বলল, “জিয়ান, আমার এই ছোট বোনটাকে একটু দেখে রেখো ভাই। ও বড্ড বেশি দুষ্টু, মাঝে মাঝে বড্ড খামখেয়ালি করে ফেলে। আজ আমাদের বাড়ির আমানত তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি, ওকে একটু সাবধানে আগলে রেখো। বড্ড আদরের বোন আমার!”
​ভাইয়ের এই আবেগঘন কথাগুলো পাশ থেকে শুনতেই রিত্তিকা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ছুটে গিয়ে ইফাতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওনার বুকে কেঁদে কেঁদে বলল, “ভা… ভাইয়া! আমি যাব না ভাইয়া। তোকে ছাড়া আমি নতুন বাড়িতে কিভাবে থাকব বল? কাকে ওভাবে অত জ্বালাবো? আমার তোদের সবাইকে ছাড়া থাকতে বড্ড কষ্ট হবে রে ভাইয়া!”
​ইফাত নিজের চোখের জল লুকিয়ে রিত্তিকার নাকটা টেনে দিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, “আরে যাহ তো বোন! তুই এ বাড়ি থেকে বিদায় নিলে আমরা অন্তত একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারব। ঘরের শান্তি ফিরে আসবে।”
​রিত্তিকা ভাইয়ের বুকে একটা মৃদু কিল মেরে অভিমানের সুরে বলল, “তার মানে তুই আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিস?”

​ইফাত এবার রিত্তিকার কপালে একটা গভীর চুমু খেয়ে বলল, “পাগলী আমার! তোকে কি কখনো তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব বল? তুই যেখানেই থাকিস না কেন, আমাদের ঘরের লক্ষ্মী হয়েই থাকবি।” এভাবে দুই ভাইবোন নিজেদের আবেগ আর ভালোবাসার মধ্যে সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল।
​বিদায়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে আরিশান ইসলাম সাহেব জিয়ানের কাঁধে হাত রাখলেন। ওনার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি অত্যন্ত ভারী গলায় বললেন, “বাবা জিয়ান, মেয়েটার খেয়াল রেখো। অনেক আদরে, রাজকন্যার মতো ওকে বড় করেছি। কখনো কোনো অভাব বুঝতে দিইনি। আজ থেকে তোমার হাতে ওকে সঁপে দিলাম, কখনো কষ্ট দিও না। ও যদি কখনো কোনো ভুল করে ফেলে, তবে শাসনের আগে একটু ভালোবাসা দিয়ে মানিয়ে নিও।”

​জিয়ান আরিশান সাহেবের চোখের জলের দিকে তাকিয়ে নিজের সমস্ত বিরক্তি আর গম্ভীরতা ভুলে গেল। সে অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন পুরুষের মতো আরিশান সাহেবের হাত দুটো ধরে বলল, “আপনি কোনো চিন্তা করবেন না আঙ্কেল। ও আমাদের বাড়িতে কোনো কষ্ট পাবে না।”
গাড়ির কাছে যেতে যেতে ইরা বললো,বলছি কি ভাইয়া রিত্তিকে কোলে নিয়ে চলুন বেচারি ভারি লেহেঙ্গা পড়ে যেতে পারছে না।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৭

তার সাথে আরিফও তাল লাগালো, হ্যাঁ জিয়ান ভাবিকে কোলে নে।
রাগি দৃষ্টি নিয়ে আরিফের দিকে তাকালো জিয়ান।
​রেগে বললো,তোর যদি শখ থাকে তাহলে বিয়ে করে বউ কোলে না যাহ, তবুও মাথা খাস না।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here