Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৮

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৮

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৮
মাইশা জান্নাত নূরা

সকালবেলার মেহেন্দি অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর থেকেই খান ভিলার ব্যস্ততা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। বাগানের মঞ্চ থেকে মেহেন্দির সাজসজ্জা সরিয়ে সেখানে গাঁদা ফুল, কাঁচা হলুদ, কলাগাছ আর মাটির প্রদীপ দিয়ে গায়ে হলুদের নতুন সাজ তৈরি করছেন ডেকোরেশনের লোকেরা। রান্নার জায়গায় তো কাজ করে ফুরসত পাচ্ছেন না সেখানের দায়িত্বে থাকা লোকজনেরা। অতিথিদের আপ্যায়ন ও সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি কোনো ত্রুটি রয়ে যাক এমনটা চান না গুরুজনরা।
এদিকে……..
পিহুর রুমে বিছানার সামনে একটা স্ট্যন্ড আলনার উপর পাশাপাশি রাখা হয়েছে একটা হলুদ রংয়ের লেহেঙ্গা আর একটা সরিষা রঙের শাড়ি। পিহুকে মাঝখানে বসিয়ে ওকে তিন দিক থেকে ঘিরে বসে আছে নীরা, ইলমা আর অনু।
নীরা লেহেঙ্গা ও শাড়ি দু’টোই ধরে ধরে দেখছে অনেকসময় হলো। অতঃপর নীরা বিরক্ত হয়ে বললো….

—”উফ! এতো সুন্দর দু’ধরণের পোশাক একসাথে কেনো কিনলাম? এখন তো কোনটা রেখে কোনটা পরাবো ভাবীকে সেটাই বুঝতে পারছি না।”
অনু শাড়িটার দিকে তাকিয়ে বললো….
—”আমার কাছে শাড়িটাই বেশি ভালো লাগছে। এটা পড়াী মাধ্যমে ভাবীর স্নিগ্ধ সৌন্দর্য আরো ফুটে উঠবে।”
ইলমা মাথা নাড়িয়ে বললো….
—”হ্যাঁ, কিন্তু হলুদের অনুষ্ঠানে লেহেঙ্গা পড়লেও খুব মানায়।”
নীরা পিহুর দিকে তাকিয়ে বললো….
—”ভাবী তুমি কিছু বলো!”
পিহু মৃদু হেসে বললো….
—”আমাকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। কারণ আমি দু’টোর মধ্যে কোনটা ভালো হবে তা বুঝতে পারছি না।”
নীরা আবারও বললো….

—”ভাড়ি মুসকিলে পড়লাম তো! এখন আমাদের পছন্দ অনুযায়ী একটা পড়িয়ে দেওয়ার পরে যদি বড় ভাইয়া বলে, ‘অন্যটা পরালে ভালো লাগতো’ তখন কি হবে?”
পিহু হালকা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বললো…..
—”তিনি এসব বলবেন না।”
নীরা ভ্রু উঁচিয়ে রসিকতার স্বরে বললো….
—”হুম জানি তো। এখন আমাদের ভাবী যাই পড়বে, বড় ভাইয়ার কাছে সেটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পোশাক বলে মনে হবে।”
অনু আর ইলমাও এবার নিঃশব্দে হাসলো। আর পিহুর শ্যমরঙা গাল দু’টো হলো লজ্জায় লাল। তখনই দরজায় টোকা পড়লে নীরা গিয়ে দরজা খুলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো তেজ, নির্ঝর আর সারফারাজ তিনজনকে। নীরা ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো…..
—”কি চাই এখানে তোমাদের?”
তেজ ভেতরে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বললো….
—”অনেকক্ষণ ধরে তোরা দরজা আটকে বসে আছিস। কোন গোপন মিটিং চলছে তোদের মধ্যে সেটাই জানতে এসেছি।”

—”লেডিস কক্ষে, লেডিসদের মধ্যে হওয়া কথপোকথন শুনে তোমাদের কোনো কাজ নেই। তাই এখন আসতে পারো।”
এই বলে যেই না নীরা ওদের মুখের উপর দরজা আটকে দিতে যাবে ওমনই সময় পিছন থেকে অনু বললো…..
—”নীরা আপু! দরজা দিও না। আমার মনে হয় আমাদের দোটানা যদি কেউ দূর করতে পারে তাহলে সেটা একমাত্র সারফারাজ ভাই-ই পারবেন। ওনার সাথে একবার কথা বলা উচিত আমাদের!”
নীরা থেমে গেলো। ইলমাও সমর্থন জানালো। এবার সারফারাজ বললো….
—”কি নিয়ে দোটানায় ভুগছিস তোরা?”
নীরা বললো…..
—”হলুদে ভাবীকে শাড়ি পড়াবো নাকি লেহেঙ্গা এটাই বুঝে উঠতে পারছি না। কারণ দু’টো পোশাকই যথেষ্ট সুন্দর।”
তেজ বললো…..
—”এতো ভাবাভাবির কি আছে? দু’টোর রং-ই নিশ্চয়ই হলুদ! তো একটা পড়লেই হলো৷”
নীরা বিরক্তি মিশ্রিত স্বরে বললো….
—”তুমি যাও তো এখান থেকে। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।”
তেজ প্রতিত্তুরে মুখ ভে*ঙা*লো কেবল। নির্ঝর সারফারাজকে একপ্রকার ঠেলে সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো….

—”তোমার দায়িত্ব তুমি সামলাও। এসব মেয়েলি বিষয়ে আমরা নেই ভাই।”
নীরা দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। সারফারাজ রুমের ভিতরে প্রবেশ করলো। নির্ঝর আর তেজ দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে রইলো। সারফারাজের উপস্থিতিতে লজ্জারা পিহুকে আরো আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে যেনো। পিহু মাথা নিচু রেখে দু’হাতে বিছানার চাদর খাঁ*ম*চে ধরলো। সারফারাজ পিহুর লজ্জামাখা মুখটা দেখে হালকা হাসলো। অতঃপর সামনে থাকা পোশাক দু’টোতে চোখ বুলিয়ে বললো……
—”শাড়িটাই পরুক।”
ইলমা জিজ্ঞেস করলো….
—”শাড়ি পড়তে বলার পিছনে বিশেষত্বটা কি জানতে পারি সারফারাজ ভাই?”
—”ওকে শাড়িতেই বেশি মানায়।”
সারফারাজের এই ছোট্ট প্রশংসা বাক্যে পিহুর ঠোঁটে ফুঁটে উঠলো এক চিলতে হাসির রেখা। কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর সারফারাজ আবারও বললো…..

—”ওকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম সেদিন ও একটা হালকা গোলাপি রংয়ের শাড়ি পড়েছিলো। চুলগুলো খুলে রেখেছিলো। কাজল রাঙা চোখ দু’টো নিয়ে আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে ছিলো উফহহহ! কোনো অতিরিক্ত গহনা শরীরে না জড়িয়ে, সাজসজ্জা না করেও যে আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো মুগ্ধতা ছড়িয়েছিলো ও সেই রূপ তাতেই আমি পা*গল হয়ে গিয়েছিলাম। তাই আমি চাই ও শাড়িই পড়ুক আর বারংবার ওর মুগ্ধতায় আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাক। নতুন করে আবারও ওর প্রেমে পড়ার সুযোগ আসবে তখন যা আমি হাতছাড়া করতে চাই না।”
ছোট ভাই-বোনদের সামনে নিজের স্বামীর মুখে এমন প্রেম ভালোবাসায় ভরপুর মধুর বাক্যগুলো শুনে পিহুর কান যেনো গরম হয়ে উঠলো। পারছে না তো ছুটে এখান থেকে পালিয়ে যেতে। ইলমা, নীরা, অনু একসাথে ‘ও হো হো ওওওও’ বলে উঠলো আর তেজ, নির্ঝর তো সিঁটিই বাজিয়ে দিলো। পিহু আর না পেরে ওর ওড়নার আঁচল টেনে তৎক্ষনাৎ মুখটা পুরো ঢেকে ফেললো। সারফারাজ ঠোঁট কাঁ*ম*ড়ে হেসে বললো……
—”তোরা ওকে তৈরি কর। অনুষ্ঠান শুরু হতে বেশি দেড়ি নেই কিন্তু।”
এই বলে সারফারাজ রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। সাথে নিয়ে গেলো নিজের ২ গুণধর ভাইদেরও।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা……

বাগানের পুরো পরিবেশটাই বদলে গিয়েছে মঞ্চের চারদিকটা হলুদ অনুষ্ঠানের উপযোগী করে সাজানোর কারণে। মন্ঞ্চের ঠিক মাঝখানে ঘন ফুলের পর্দা করা হয়েছে। যা মন্ঞ্চ টাকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। দুইপার্শে বসানো হয়েছে দুইটি কাঁঠের তৈরি পদ্ম ফুলের সেপের আসন। মূলত সেই আসনের মধ্যেই সারফারাজ ও পিহু বসবে। দুই আসনের পায়েই রাখা রয়েছে বড় পিতলের কলসী। এছাড়াও পিতলের প্লেটের উপর ধানের শিষ, ঝড়ানো গাঁদা ও গোলাপ ফুলের পাপড়ি। সারফারাজের পার্শে একটা এক্সট্রা পিতলের বাটিতে কাঁচা হলুদ বাটা রাখা হয়েছে। সারফারাজকে হলুদ প্রথমে মাখানো হবে এরপর সেই হলুদ ছুঁয়ে যাবে পিহুর শরীরও।
অতিথিরাও একে একে এসে বসেছেন নিজ নিজ চেয়ারে।ছোটরা তো এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতেই ব্যস্ত থাকে। আর বড়রা যখন একসাথে হয় তখন তারা দিন-দুনিয়া ভুলে নিজেদের জীবনের সুখ-দুঃখের গল্পে মশগুল হয়ে যান। এখানেও তার ব্যতিক্রম কিছু হচ্ছে না। নীরা মন্ঞ্চে উঠে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললো…..
—”সবার এটেনশন চাচ্ছি এইমূহূর্তে। সবাই শোরগোল থামিয়ে দিয়ে আমার কথা শুনুন মন দিয়ে।”
চারপাশের পরিবেশ ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেলো। নীরা হাসিমুখে বললো….
—”আজকে অনুষ্ঠানের ২য় পর্ব অথ্যাৎ সকালের মেহেন্দি অনুষ্ঠানের পর এখন অনুষ্ঠিত হবে গাঁয়ে হলুদের অনুষ্ঠান।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইজন মানুষকে আমরা এখন মঞ্চে নিয়ে আসবো। তাই সবাই তাদের স্বাগতম জানানোর জন্য প্রস্তুত থাকুন।”
তেজ নিচ থেকে বললো…..

—”কি রে নীরা, সকালের মতো এখনও ভাইয়া-ভাবীকে আসামি বলে সম্বোধন করলি না যে?”
—”সবাই তো তোমার মতো কাঁচা ব্রেইন নিয়ে ঘুরে না। তাদের একবার পরিচয় করিয়ে দিলেই হয়।”
সঙ্গে সঙ্গে সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো। তেজ তো ক্ষে*পে উঠলো সবার সামনেই কিনা ওকে অ*প*মান করলো নীরা! তেজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো….
—”তোর মাথায় যে চারটে চুল আছে সেগুলোও আমি একটা একটা টেনে ছিঁ*ড়*বো রে। আমায় অ*প*মান করলি! হাতের নাগালে পেয়ে নেই একবার।”
অতঃপর নির্ঝর আর তেজ মিলে সারফারাজকে নিয়ে এলো প্রথমে। স্টেজের সামনে এসে দাঁড়ালো সারফারাজ। আজ সে সরিষা রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে। ফর্সা ও ফিট শরীরে এই রঙটাতে দারুণ সুদর্শন দেখাচ্ছে সারফারাজকে। কিছুক্ষণ পর ইলমা, অনু ও আরো কয়েকজন মেয়ে পিহুর মাথার উপর ফুলের ছাদ বানিয়ে ধীরে ধীরে পিহুকে নিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করলো স্টেজের দিকে। সারফারাজের পান্ঞ্জাবির সাথে মানিয়ে গিয়েছে পিহুর পরণে থাকা সরিষা রঙের শাড়িটা। খোঁপা ভর্তি গাঁদা আর সাদা জুঁই ফুল দিয়েছে। সাথে হালকা সাজ রয়েছে। হাতে সকালের মেহেন্দির রংগুলো আবছা দেখা যাচ্ছে। অর্গানিক হওয়ায় রংটা গাঢ় হতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। পিহুকে সারফারাজের পাশে এনে দাঁড় করালো ওরা সবাই। সারফারাজ আঁড়চোখে বারবার দেখছে পিহুকে। পিহু মাথা হালকা নিচু করে রেখেছে। ওর ঠোঁটে ফুটে আছে লজ্জামাখা চিরচেনা হাসির রেখা। সবাই ওদের জুটির প্রশংসার ব্যস্ত।তেজ নির্ঝরের দিকে হালকা হেলে নিচু গলায় বললো…..
—”আজ বড় ভাইয়ার রক্ষে নেই। সকালে ভাবীর এক ঝাক্কাস লুক দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিলো তার এখন আরেক লুক।”
নির্ঝর বললো…..

—”সারফারাজ ভাইয়ের কথা ছাড়ো। তুমি যে বারবার ইলমার দিকে তাকাচ্ছিলে সেটা আর কেউ নোটিশ না করলেও আমি কিন্তু ঠিকই করেছি তেজ ভাই। তাই নিজেকেও সামলে রেখো। পিহু ভাবী তো বাংলাদেশী বুলবুল, শান্ত ও স্নিগ্ধ। কিন্তু ইলমা কারাক বোম্বাই মরিচ।রূপে যেমন ধাঁর আছে তেমন বুদ্ধি ও জিহ্বাতেও ধাঁর আছে। রাগলে তোমাকে পুরো কঁ*চু কাঁ*টা করে রেখে দিবে একদম।”
তেজ শব্দ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো….
—”এই বাংলাদেশী বোম্বাই মরিচের ঝাঁঝ দেখেই তো ওর প্রতি ফিদা হয়ে গিয়েছি রে নিজ্ঝরিয়া। এই ঝাঁঝ ছাড়া জীবনটা বড্ড পানসেটে লাগবে তাই ওর ঝাঁঝের জন্য যদি জীবন ঝাঁ*ঝরাও হয়ে যায় তাও কবুল করবো।”
—”ইসস কি প্রেম, কি রস।”
তেজ নাক সিটকে বললো….
—”রস? কিসের রস? ছিহ: নিজ্ঝরিয়া, ছিহ: কিসব নোংরা শব্দ ব্যবহার করা শুরু করেছিস তুই আজ কাল।”
—”হ হ, তোমরা করলে সাত খু*ন মাফ আর একই কাজ আমি করলেই তা হয়ে যায় মহাপাপ।”
সারফারাজ পিহুর দিকে হালকা ঝুঁকে বললো…..
—”শাড়িটা পড়ে হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিলো না তো?”
পিহু মাথা নেড়ে বললো…..
—”না।”

—”সাবধানে হেঁটো। শাড়িটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কাজগুলো যথেষ্ট ভাড়ি। আর কুঁচিগুলোও তুলনামূলক পায়ের দিকে এগিয়ে আছে লম্বায়।”
পিহ মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর ওদের দু’জনকে দুই পার্শে মঞ্চে রাখা সেই কাঠের পদ্মফুলের উপর বসানো হলো। নীরা মাইক্রোফোন হাতে বললো….
—”আজ প্রথম হলুদ লাগাবেন আমাদের বাড়ির বড়রা। আর শুরুটা সারফারাজ ভাইকে দিয়েই করা হবে। বড় ভাইয়াকে হলুদ লাগানোর পর সেখান থেকে হলুদ নিয়ে ভাবীকে লাগানো হবে। একই নিয়ম অনুসরণ করে একে একে আমরা সবাই হলুদ লাগাবো ভাইয়া-ভাবীকে। ঠিক আছে…?”
সবাই একসাথে ‘হ্যা’ বলে উঠলো। এরপর গুরুজনরা সবাই ওদের দু’জনকে হলুদ মাখানোর পর্ব শেষ করলো। তারপর শুরু হলো সকল কমবয়সী তরুণ-তরুণীদের হলুদ মাখানোর পালা। নীরা, ইলমা, অনু, তেজ, নির্ঝর ও আরো ছোট ছোট বাচ্চারা সবাই হলুদ মাখাতে শুরু করলো ওদের দু’জনকে। সাউন্ডবক্সে গান বাজছে…….
গতরে হলুদ লাগাইয়া কন্যারে

সাজাও বধূর সাজে মিলিয়া….(২)
হলুদ বাটো, হলুদ মাখো, হলুদ করো আলো
আজ কনের মুখে হাসি দেখতে লাগে ভালো।
সখি রে… হলুদ বাটো, হলুদ মাখো, হলুদ করো আলো
আজ কনের মুখে হাসি দেখতে লাগে ভালো!
আজকে কনের গায়ে হলুদ,
সবার মনে কত আনন্দ….(২)
চলো সবাই মিলে, গীত গাইয়া-বাজাইয়া
সাজাই কন্যারে, মনের মতো সাজাইয়া
গতরে হলুদ লাগাইয়া কন্যারে
সাজাও বধূর সাজে মিলিয়া….(২)

হলুদ অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত প্রায় সাড়ে নয়টা বেজে গিয়েছে। এক এক করে অতিথিরা খাওয়া-দাওয়া আবারও তাদের সেরে গল্পের আসরে মেতে উঠেছে। বড়রা ও ছোটটা বাগানের ২ পাশ নিজেদের দখলে নিয়ে রেখেছেন। এদিকে পিহুকে আবার রুমে নিয়ে আসা হয়েছে। ভালোভাবে গোসল করে একটা আরাম দায়ক থ্রি-পিচ পরিধান করেছে পিহু। ওর মুখে এখনও লাজুক হাসি লেগে আছে। হলুদের হালকা আভা গালজুড়ে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে। নীরা বিছানায় বসেই বললো….
—”উফ! আজকে আমার অবস্থা একদম শেষ। সকাল থেকে দৌঁড়ের উপর থাকার কারণে আমার দুই পা আর নিজের আছে বলে মনে হচ্ছে না।”
অনু হাসিমুখে বললো….
—”তবুও মজা হয়েছে আজ অনেক।”
ইলমা নীরার পাশে বসে পানি পান করতে করতে বললো…
—”কাল তো আরো চাপ যাবে নীরা। কারণ কাল ভাই-ভাবীর বিয়ে। ভেবে দেখেছো একবার!”
পিহু নীরব হয়ে ওদের দেখছে কেবল। তখনই নীরা পিহুর দিকে তাকিয়ে বললো……
—”জানো ভাবী! তুমি এই বাড়িতে আসার পর থেকে বড় ভাইয়াকে আমরা অন্যরকম ভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আগে ভাইয়া শুধু কাজ আর নিজের উপর বর্তে থাকা দায়িত্ব গুলো পালন করা বুঝতো। পরিবারকে ঠিকভাবে সময় দিতো না। আর এখন পর্যাপ্ত সময়ও দেয় আর সবসময় হাসিখুশি ভাবেও চলাফেরা করে।”
পিহু ওর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো….

—”সব মানুষের ভেতরেই ভালোবাসা নামক জিনিসটা থাকে। শুধু তার বহিঃপ্রকার ঘটানোর জন্য সঠিক মানুষটার অপেক্ষায় থাকে তারা।”
ওরা ৩ জন পিহুর কথায় একসাথে সম্মতি প্রকাশ করলো। ঠিক তখনই ওদের রুমের দরজায় টোকা পড়লে নীরা দরজার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো…..
—”এত রাতে আবার কে এলো?”
এই বলে নীরা দরজা খুলতেই দেখলো বাইরে নির্ঝর আর তেজ দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনের মুখেই ফুটে আছে রহস্যময় হাসি। তেজ ঘাড় একটু কাঁত করে রুমের ভেতরে উঁকি দিয়ে বললো…..
—”তোদের গোপন মিটিং শেষ হলে ভাবীকে আমাদের সাথে কিছুসময়ের জন্য পাঠাতে হবে।”
নীরা দু’হাত বুকে গুটিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
— “কী দরকার?”
— “দরকারটা আমাদের না। বড় ভাই আমাদের পাঠিয়েছেন ভাবীকে পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও ছাদে যাওয়ার জন্য।”
পিহু অবাক হয়ে বললো….
— “এখন? এই সময়ে?”
নির্ঝর শান্তভাবে মাথা নেড়ে বললো…..

— “হ্যাঁ। এখনই। বড় ভাই শুধু এটুকুই বলেছেন আমাদের ভাবী।”
ইলমা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো….
— “কেনো? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?”
তেজ সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বললো…..
— “এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছেও নেই। আমরা শুধু বার্তাবাহক। আমাদের কাজ কেবল যথাস্থানে খবর পৌঁছে দেওয়া, তার পিছনে থাকা কারণ জানা নয়।”
নীরা সন্দেহভরা চোখে দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললো….
— “তোমরা আবার পেটে পেটে কোনো ব*দ মতলব আঁ*টো নি তো?”
তেজ গর্বের সহিত বললো…
— “আরে না! আমরা অত্যন্ত ভদ্র, দায়িত্বশীল এবং সৎ মানুষ। এসব ব*দ মতলব আ*টা*নো আমাদের সাথে যায় না।”
নীরা এক সেকেন্ডও দেরি না করে বললো…..
—“জোকস অফ দ্যা ডে এর অস্কারটা তুমিই ডিজার্ভ করো মিডেল ব্রো।”
তেজ মুখ বাঁকিয়ে বললো…..
—“নিজ্ঝরিয়া! এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অ*প*মান হজম করার থেকে উত্তম ভাবীকে এদের সামনে থেকেই তার অনুমতিতে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া।”
নির্ঝর হাত উঠিয়ে পিহুকে ইশারা দিয়ে বললো…..
—”ভাবী! আপনি কি রাজি আছেন?”
পিহু নম্র ভাবে হেঁটে রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললো….
—”হ্যাঁ চলো।”
তেজ নীরাকে বললো….

—”নেই কাজ! এবার মুখ ভাঙা পাতিল হট হওয়া মাথায় বসিয়ে তোরা খই ভাঁজ। আমরা গেলুম।”
পিহুকে সঙ্গে নিয়ে ওরা দু’জন এগোলো ছাদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। নীরা, ইলমা আর অনুও পিছু হাঁটা ধরলো ওদের। খান ভিলার ছাদের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই পিহু অবাক হয়ে চারদিকে তাকালো। চারপাশের প্রায় সব আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছে। পুরো ছাদটা আধো আলো-অন্ধকারে ঢাকা। শুধু মাঝখানে ছোট্ট গোলাকার করা জায়গাটায় হলুদ রঙের ফেয়ারি লাইটগুলো নরম আলো ছড়িয়ে জ্বলছে। পরিবেশটা জুড়ে যেনো এক অন্যরকম সৌন্দর্য বিরাজ করছে। পিহু ধীর পায়ে খানিক সামনে এগিয়ে যেতেই আলো-আঁধারির মাঝখান থেকে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো সারফারাজ। সারফারাজের হাতে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর একগুচ্ছ ফুল দিয়ে তৈরি তোড়া। পিহুর বিস্মিত চোখে সারফারাজের দিকে তাকিয়ে বললো….
— “এসব কি করেছেন আপনি?”
সারফারাজ মৃদু হেসে ফুলের তোড়াটা পিহুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো….
— “আজ সারাদিন এতো মানুষের ভিড়ে তোমার সাথে ঠিকমতো পাঁচ মিনিটও নিজের মতো করে সময় কাটাতে পারি নি। তাই ভাবলাম, সবার অগোচরে, একটু আড়ালে কিছু মুহূর্ত নিজেদের জন্য রাখলে মন্দ হয় না।”
পিহু ফুলের তোড়াটা হাতে নিলো। নিজের ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো…..

— “এতোটুকু সময়ের মধ্যে আবার এতো আয়োজন করার কী দরকার ছিলো?”
সারফারাজ একদৃষ্টিতে পিহুর দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললো…..
— “আজকের সব আয়োজন তো কেবল মানুষকে দেখানোর জন্যই ছিলো। কিন্তু এই ছোট্ট আয়োজনটুকু আমি করেছি আমার একান্ত তুমিটার জন্য। কাল যে আবারও আমার সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবব্ধ হবে, আমার অর্ধাঙ্গিনী হবে তার হাসিটা মন ভরে দেখার জন্য করেছি। হাসিটা দেখলাম, এখন মনে হচ্ছে আমার সব কষ্ট সার্থক হয়েছে।”
পিহু ওর দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। মুখ ফুটে কিছু না বললেও ওর লাজুক নীরবতাই সব উত্তর দিয়ে দিয়েছে। ওদের থেকে খানিক দূরে একে অপরের পিঠের উপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে অনু, ইলমা, নীরা, নির্ঝর, তেজ পুরো দৃশ্যটা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো। নীরা হালকা হেসে ফিসফিস করে বললো….
— “আজ তো দেখি বড় ভাইয়ার একেবারে অচেনা রূপ বের হয়ে এসেছে। এতোটা রোমান্টিক মানুষ উনি আগে জানতাম না।”
তেজ বললো…..
— “ভালোবাসা মানুষকে দিয়ে এমন সব কাজ করিয়ে নেয় যা সে নিজেও আগে কখনো ভাবে নি।”
নির্ঝর তেজের কানে কানে বললো….
— “কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছো তুমি ভাই!”
তেজ সঙ্গে সঙ্গে কাশির ভান করে বললো….
— “সবক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত জীবনকে জড়িয়ে বাম হাত দিয়ে তা ঘেঁটে ঘ করতে আসবি না তুই নিজ্ঝরিয়া।”

এদিকে সারফারাজ পিহুর দিকে তাকিয়ে নিজের কণ্ঠ আগের চেয়ে আরো নরম করে বললো…..
— “কাল থেকে তুমি সামাজিক ভাবে এই বাড়ির বউ হয়ে যাবে। যদিও এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ তোমাকে নিজের মানুষ মনে করেই ভালোবাসে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু একটা কথা সবসময় মনে রেখো, জীবনে কখনো যদি কোনো বিষয় নিয়ে কষ্ট হয়, মনে অভিমান জমে বা কোনো কারণে ভয় কাজ করে তাহলে সবার আগে আমাকে বলবে। নিজের ভেতরে কোনো কিছু জমিয়ে রাখবে না। একা একা সব সহ্য করার চেষ্টা করবে না। কারণ তোমার প্রতিটা কষ্টের ভাগ নেওয়ার অধিকার থেকে আমি নিজেকে কোনোভাবেই বন্ঞ্চিত করতে রাজি নই।”
সারফারাজের বলা কথাগুলো শুনে পিহুর চোখ চিকচিক করে উঠলো। কন্ঠস্বর হালকা ভার হয়ে এলেও সে বললো….

— “আপনি যদি এভাবেই আমার পাশে থাকেন তাহলে সত্যি বলছি, আমার কখনও কোনো বিষয় নিয়ে কষ্ট পাওয়ার অবকাশ থাকবে না, মনে কোনো অভিমান জমবে না, কোনো কারণে ভয় পাওয়ার প্রশ্নই উঠবে না।”
সারফারাজ মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললো….
— “আমি আছি, আর সবসময়ই থাকবো ইনশাআল্লাহ। এখন তাড়াতাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল আমাদের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। যা ক্লান্তিহীন ভাবে হাসিখুশি হয়ে উদযাপন করতে চাই আমি।”
পিহু নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ঠিক তখনই লুকিয়ে থাকা ওরা সবাই ছাদে এসে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠলো। পিহু চমকে উঠে সেদিকে তাকিয়ে ওদের দেখা মাত্র লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। তেজ হেসে উচ্চস্বরে বলে উঠলো….

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৭

— “তোমাদের রোমান্স শেষ হওয়ার পর এই হাততালিটা দেওয়ার জন্য আমরা সবাই অনেকক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে মশার কাছে রক্তদান করে যাচ্ছিলাম ভাই!”
সারফারাজ হেসে ফেললো তেজের কথা শুনে। হাসি, আনন্দ, খুনসুটি আর ভালোবাসায় ভরে থাকা সেই হলুদের রাত এভাবেই শেষ হয়ে এলো।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here