প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২২
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
ভার্সিটির করিডোর ফাঁকা হয়ে এসেছে। ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা যে যার মতো চলে গেছে। নিহারিকা, আনুশা, আনিকা—আজ কেউই আসেনি। এমনকি জিয়াও শরীর খারাপের জন্য আজ অনুপস্থিত। একলা করিডোরে দাঁড়িয়ে একা একাই ছটফট করছে রিত্তিকা।বাড়ি থেকে একসাথে আসার কথা ছিল কিন্তু সে তো নিজের খেয়ালেই আগেই চলে এসেছে।
রিত্তিকা মূলত দাঁড়িয়ে আছে জিয়ানকে একটা অনুরোধ করার জন্য। আজ তাকে একটু কষ্ট করে তার বাবার বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। বেশি সময় লাগবে না, শুধু একটা জরুরি জিনিস নিয়ে সে চলে আসবে। কিন্তু যার জন্য অপেক্ষা, তার তো কোনো পাত্তাই নেই!
ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে রিত্তিকা মনে মনে গজগজ করতে লাগলো,
“কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি! তাও এই খচ্চর প্রফেসরটার আসার নাম নেই। অন্য সব ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা তো কখন চলে গেলেন। আর উনি ভেতরে বসে কি এমন হাতি-ঘোড়া মারছেন, হুহ!”
মন তো চাচ্ছিলো এখনই একা একা চলে যায়। কিন্তু এই রাগী প্রফেসরের যে স্বভাব, পরে যদি কথা শুনিয়ে দেয়? সেই ভয়ে পা বাড়াতেও পারছে না। ধুর, ভালো লাগে না কিছুই! আসলে আজ রিত্তিকার মনটা ভীষণ ব্যাকুল হয়ে আছে।
মনে মনে ভাবলো, “আজ যেভাবে হোক মিকুম্মাকে নিয়ে আসবো। কতদিন দেখি না আমার মেয়েটাকে!”
ঠিক যখন রিত্তিকা একলা দাঁড়িয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে রাগ ঝাড়ছিল, তখনই দূর থেকে জিয়ানের গম্ভীর অবয়বটা ভেসে উঠলো। করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছে জিয়ান। রিত্তিকাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও সে এমন একটা ভাব করলো যেন মেয়েটাকে দেখতেই পায়নি! পাশ কেটে চলে যাচ্ছিল সে।
তা দেখে রিত্তিকা আর স্থির থাকতে পারলো না। দৌড়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে পথ আগলে ধরলো,
_”আরে স্যার! চলে যাচ্ছেন কেন? দাঁড়ান!”
জিয়ান ভ্রু কুঁচকে থামলো। রিত্তিকা হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
_”আমাকে না নিয়ে চলে যাচ্ছেন কেন..?”
জিয়ান তার স্বভাবসুলভ শীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
_”কেন, তোমাকে নেওয়ার জন্য কি আলাদা করে আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে হবে?”
_”হ্যাঁ, করবেন! সমস্যা কি এতে?” একটু মুখ ফুলিয়ে বললো রিত্তিকা। তারপর সুর নরম করে আমতা আমতা করে বললো, “শুনুন… আমাকে একটু আমার বাবার বাড়িতে নিয়ে যাবেন? প্লিজ…”
_”পারব না।” জিয়ানের সোজাসাপ্টা উত্তর।
_”কেন পারবেন না? একটু নিয়ে চলুন না প্লিজ! আমার মেয়েটাকে ওখান থেকে একবারে নিয়ে চলে আসবো।”
_”হোয়াট?!” জিয়ানের চোখ জোড়া চড়কগাছ। থমকে গিয়ে তীব্র দৃষ্টিতে রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে বললো, “মেয়ে কোথা থেকে আসলো তোমার? কিছু না করতেই আমি বাচ্চার বাপ হয়ে গেলাম নাকি!”
জিয়ানের এমন অদ্ভুত কথা শুনে রিত্তিকা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে বললো, “আরে ধুর! আমার বিড়াল… মিকুম্মার কথা বলছি!”
জিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়লো, “বিড়াল? বিড়াল তোমার মেয়ে হয় কিভাবে?”
_”তো কি? ওটাই আমার বাচ্চা!” রিত্তিকা বেশ জোর দিয়েই বললো।
_”শাট আপ, ননসেন্স!” জিয়ান বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো।
_”এভাবে বকছেন কেন? নিয়ে চলুন না ওকে! অনেকদিন ওকে দেখি না, আজ খুব দেখতে ইচ্ছা করছে…” কথাগুলো বলতে বলতে রিত্তিকার গলাটা ধরে এলো। তার ডাগর ডাগর চোখ দুটো কান্নায় ছলছল করে উঠলো। মিকুম্মার জন্য তার ভেতরের আকুলতাটুকু যেন চোখের কোণায় এসে জমা হয়েছে।
জিয়ান এক মুহূর্তের জন্য রিত্তিকার ওই ছলছল চোখের দিকে তাকালো। তার ভেতরের কাঠখোট্টা ভাবটা হয়তো কিছুটা নরম হলো, কিন্তু মুখে তা প্রকাশ না করে কঠোরভাবেই বললো,
_”পারব না আমি। আমার কি কোনো কাজ নেই যে একটা বিড়ালকে উদ্ধার করতে যাবো? আর শুনো, এসব বিড়াল-টিড়াল আমি আমার বাড়িতে রাখতে দেবো না।”
রিত্তিকা এবার সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলবে এমন অবস্থা। অশ্রুসজল চোখে অনুনয় করে বললো,
_”প্লিজ স্যার, ওকে একটু রাখতে দিন না… ওই তো আমার সব…”
জিয়ান আর কথা বাড়াতে চাইল না। রিত্তিকার ভেজা চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকাও যেন দায়। সে গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল,
_”চুপচাপ গাড়িতে বসো, বেশি কথা বলবে না। তোমার বিড়ালকে আনার মতো সময় আমার নেই।”
রিত্তিকা আর একটা কথাও বাড়ালো না। অভিমানে তার বুকটা ভেঙে আসছিল। অল্প কয়েকদিনে বিড়াল টা তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হয়ে গেছিল। সে চুপচাপ গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে বসে রইলো। জিয়ানও কোনো কথা না বলে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো। গাড়ির ভেতরের নীরবতা যেন রিত্তিকার একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দিল।
ঠিক ১৫ মিনিট পর গাড়িটা এসে থামলো ‘কায়সার ম্যানশন’-এর সামনে। কিন্তু রিত্তিকা তখন নিজের দুঃখের সাগরে এতটাই ডুবে ছিল যে গাড়ি থামার বিষয়টি তার খেয়ালেই আসেনি। সে জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
জিয়ান আয়না দিয়ে রিত্তিকাকে দেখে নিয়ে বেশ চড়া গলায় বললো,
_ “তোমার কি সারাদিন গাড়িতে বসে থাকার ইচ্ছে আছে?”
জিয়ানের এই কর্কশ ডাকেই যেন রিত্তিকার হুঁশ ফিরলো। তাকিয়ে দেখলো তারা বাড়ি চলে এসেছে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার। কোনো কথা না বলে, জিয়ানের দিকে একবারও না তাকিয়ে সে গাড়ি থেকে নেমে সোজা ভেতরে চলে গেল। জিয়ান কিছুক্ষণ রিত্তিকার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত, অব্যক্ত চাউনি। তারপর আবার গাড়ি ঘুরিয়ে সে তীব্র গতিতে কোথাও চলে গেল।
ভেতরে ঢুকতেই রিহানা কায়সার স্নেহভরে বলে উঠলেন, “আরে রিত্তিকা, চলে এসেছো মা?”
রিমঝিম মনের মেঘ আড়াল করে রিত্তিকা মৃদু হেসে বললো, “জ্বী আন্টি।”
_”কতবার বলেছি তোমাকে আন্টি বলবে না, তাও বলো!” রিহানা কায়সার কৃত্রিম রাগ দেখালেন।
রিত্তিকা একটু লজ্জিত হয়ে জিভ কেটে বললো,
_ “সরি আন্টি… থুরি, আম্মা! আজ থেকে আমি আপনাকে আম্মাই বলে ডাকবো।”
_”আচ্ছা মা। এখন হাত-মুখ ধুয়ে এসো, তোমাকে খেতে দিই।”
রিত্তিকার পেটে খিদে থাকলেও মনে তখন ভীষণ বৈরাগ্য। সে মলিন মুখে বললো,
_”না আম্মা, আমি কিছু খাবো না। একদম ভালো লাগছে না।”
রিহানা কায়সার চিন্তিত হয়ে রিত্তিকার কপালে হাত দিতে গেলেন,
_”কি হয়েছে মা? শরীর খারাপ নাকি?”
_”না আম্মা, তেমন কিছু না। মাথাটা একটু ধরেছে। আমি ঘরে যাচ্ছি, একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
_”আচ্ছা যাও, কোনো দরকার পড়লে আম্মাকে বলো।”
“আচ্ছা।”
রিত্তিকা তার ঘরে এসে ব্যাগটা ধপাস করে টেবিলের ওপর রাখলো। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। মনটা ভীষণ খারাপ। মিকুম্মার কথা ভেবে বুকটা ফেটে যাচ্ছে, আর তার ওপর ওই নিষ্ঠুর জিয়ানের আচরণ! কাঁদতে কাঁদতেই কখন যেন সে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লো।
বেশ কিছুক্ষণ পর। চাদের আলো তখন ঘরের জানালায় এসে পড়েছে।
ঘুমের ঘোরেই রিত্তিকা অনুভব করলো তার হাতের কাছে খুব নরম, তুলতুলে কিছুর স্পর্শ। ঠিক যেন এক দলা তুলো তার হাত ছুঁয়ে আছে। একটা চেনা মৃদু শব্দ “মিউ…” কানে আসতেই রিত্তিকা টিপটিপ করে চোখ মেললো।
চোখ খুলতেই সে যা দেখলো, তা যেন তার কল্পনারও বাইরে! তার আদরের মিকুম্মা তার বুকের কাছে বসে লেজ নাড়ছে!
খুশিতে আত্মহারা হয়ে রিত্তিকা বিছানায় চিৎকার করে উঠে বসলো,
_”মিকুম্মা! তুই? তুই কিভাবে এলি? কখন এলি রে আমার মা!”
সে মিকুম্মাকে কোলে তুলে নিয়ে পাগলের মতো আদর করতে লাগলো। তার নরম লোমে মুখ গুঁজে দিল, অবুঝ বিড়ালটার সাথে কতশত সুখ-দুঃখের কথা বলতে লাগলো। তার চোখের সব জল নিমেষেই আনন্দের হাসিতে রূপ নিল।
ঠিক তখনই দরজার দিকে চোখ যেতেই রিত্তিকা থমকে গেল।
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে জিয়ান। পকেটে হাত গুঁজে সে শান্ত দৃষ্টিতে রিত্তিকার এই পাগলামি দেখছিল। রিত্তিকার মুখের ওই স্বর্গীয় হাসিটুকু দেখে জিয়ানের ঠোঁটের কোণেও হয়তো খুব সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল, যা সে পরক্ষণেই লুকিয়ে ফেললো। মনে মনে বিড়বিড় করলো,
_”স্টুপিড একটা! সামান্য একটা বিড়ালের জন্য মুখটা শুকিয়ে আমসি করে রেখেছিল। ডিজগাস্টিং!”
অনেকক্ষণ মিকুম্মাকে আদর করার পর রিত্তিকা জিয়ানের দিকে তাকালো। তার চোখে এখন আর রাগ নেই, আছে এক পৃথিবী বিস্ময়।
সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,
_ “স্যার… বিড়ালটা কি আপনি এনেছেন? কিন্তু এখন আনলেন যে? তখন তো ওকে আনতে চাইলেন না, তাহলে…?”
জিয়ান তার চিরচেনা গম্ভীর ভাবটা ফিরিয়ে এনে রিত্তিকার দিকে তাকালো। একটু তেরছা চোখে তাকিয়ে বললো,
_”তুমি এত কথা কিভাবে বলো বলতো? মুখ ব্যথা করে না তোমার? আর মনে রাখবে, আমি কারো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই।”
বলেই জিয়ান আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না, হনহন করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
রিত্তিকা জিয়ানের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মিকুম্মার কানে কানে হেসে ফিসফিস করে বললো,
_”দেখলি মিকুম্মা? লোকটা আসলেই একটা আস্ত খচ্চর প্রফেসর! কিন্তু… মনটা খুব একটা খারাপ না, কি বলিস?”
মিকুম্মা যেন সায় দিয়ে আবার “মিউ” করে উঠলো, আর রিত্তিকার পুরো ঘরটা এক নিমিষেই আনন্দে ভরে উঠলো।
বিড়াল কে আদর করার মাঝে নিহারিকা ফোন দিলো তাকে।রিত্তিকা হাসি মুখে ফোন রিসিভ করলো,
রিত্তিকা: হ্যালো, কেমন আছিস?
নিহারিকা: ভালো আছি, তুই?
রিত্তিকা: এখন ভালো আছি।
নিহারিকা: কেন? আগে ছিলি না বুঝি?
রিত্তিকা: ছিলাম, কিন্তু বিড়ালটার জন্য মন খারাপ ছিল। তবে ওই খচ্চর প্রফেসরটা শেষমেশ এনে দিয়েছে!
নিহারিকা: বাহ, ভালোই তো! স্যার দেখছি আমাদের তার বউকে খুব ভালোবাসেন।
রিত্তিকা: চুপ কর তো! ভালো না ছাই বাসে!
নিহারিকা: হ্যাঁ হ্যাঁ, জানি আমি কত বাসে।
রিত্তিকা: ধুর বাদ দে! তুই আজ ভার্সিটি আসিস নি কেন?
নিহারিকা: বাসায় ছিলাম না রে, তাই যেতে পারিনি।
রিত্তিকা: ওহ, আজ শুধু আমি একাই ভার্সিটি গিয়েছিলাম। একদম যেতে ইচ্ছে করছিল না, আমাকে জোর করে পাঠিয়ে দিল।
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২১
নিহারিকা: ভালোই তো করেছে। এখন মন দিয়ে ভালো করে পড়াশোনা কর তুই।
রিত্তিকা: হ্যাঁ, তাই তো করছি! সারাদিন পড়াশোনা করি! যখনই খচ্চরটা ঘরে আসে, তখনই শুধু পড়তে বসতে বলে!
নিহারিকা: আচ্ছা, মন দিয়েই পড়াশোনা কর। এখন রাখি রে, মা ডাকছে।
রিত্তিকা: আচ্ছা, বাই!
