আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১
সাবিলা সাবি
— “তোমার কি একটুও লজ্জা করলো না?”
রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে উঠলেন লিওনার্দোর বাবা আর্থার হায়াস।
“একজন আদর্শ সিআইডি অফিসার হয়ে তুমি কি না দেশের সবচেয়ে কুখ্যাত আন্তর্জাতিক ক্রিমিনালের প্রেমে পড়েছো! যে মেয়ের নাম শুনলে পুরো পৃথিবীর পুলিশবাহিনী তোলপাড় হয়ে ওঠে, তাকেই তুমি ভালোবাসো?”
লিওন কয়েক সেকেন্ড নীরব রইল। তারপর ধীরপায়ে মাথা তুলে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, “না, আমার লজ্জা লাগে না। কারণ ভালোবাসা কোনো ধর্ম, পরিচয় কিংবা অতীত মেনে হয় না। সে আমার জীবনের এমন এক মানুষ, যার গভীর অন্ধকারে আমি নক্ষত্রের মতো আলো হয়ে থাকতে চাই। যদি পৃথিবী তাকে কেবল অপরাধী হিসেবেই চেনে, তবে অন্তত একজন মানুষ থাকুক যে তাকে মানুষ হিসেবে দেখবে।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই বজ্রপাতের মতো এক ঘুষি আছড়ে পড়ল লিওনের মুখে। ভারসাম্য হারিয়ে সে ছিটকে পড়ল মেঝেতে।বাবার গলার স্বর তখন কান্নায় আর ক্ষোভে রুদ্ধ হয়ে আসছে—
“মরলে না কেন তুমি? কেন জন্মেছিলে পৃথিবীতে? আমার সারা জীবনের অর্জিত সম্মান, নিজের সততা—আজ তুমি সব ধুলোয় মিশিয়ে দিলে!”
র/ক্তমাখা ঠোঁটের কোণে লিওনের মুখে ফুটে উঠল একটু মৃদু, বিষণ্ন হাসি। সে জানে পৃথিবীর চোখে ভাইপার একজন কুখ্যাত ক্রিমিনাল হতে পারে, কিন্তু তার হৃদয়ে সেই মেয়েটিই একমাত্র ধ্রুবতারা, যাকে সে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আগলে রাখতে চায়।
সেন্ট্রাল সিআইডি হেডকোয়ার্টারের কনফারেন্স রুমটায় তখন সূচপতন নীরবতা বিরাজমান। ধূসর লন্ডনের বুকে তখন বিষণ্ণ চাদরের মতো বাইরে জুলাইয়ের ঝুম বৃষ্টি নেমেছে আকাশ ভেঙে। বাইরের বৃষ্টির বিপরীতে কক্ষের ভেতরের এসি-র কৃত্রিম ঠান্ডা আবহাওয়াটুকু সেই থমথমে পরিবেশকে আরও বেশি ভারী করে তুলছিল। বিশাল প্রজেক্টর স্ক্রিনটার সামনে এক হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল লিওনার্দো হায়ার্স। পুরো ৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা পুরুষ। চওড়া কাঁধের সাথে গায়ের আকাশী রঙের শার্ট আর নেভি ব্লু টাইটা বেশ মানিয়ে গেছে। পেছনের দিকে আঁচড়ানো ঘন কালো চুল আর মুখজুড়ে হালকা ছাঁটা চাপ দাড়ি তার।
তবে লিওনার্দোর দিকে তাকালে সবার আগে চোখ আটকে যায় ওর কফি কালারের চোখের মণি দুটোর দিকে ওই চোখজোড়া কেমন যেনো তীক্ষ্ণ আবার শান্ত চাউনি। আর যখন ও কথা বলে বা হালকা হাসে, তখন বাম ঠোঁটের ঠিক ওপরে থাকা ছোট্ট কালো তিলটা স্পষ্ট চেনা যায়। এই সাধারণ একটা তিলই ওর ফর্সা, ধারালো চেহারার মধ্য আকর্ষনীয় ভাব এনে দেয়। কোনো বাড়তি আয়োজন ছাড়াই ওকে দেখলে একনজরে একজন পরিপাটি, সুদর্শন অফিসার বলেই মনে হয়। নতুন জয়েন করলেও নিজের অসামান্য দক্ষতা আর একের পর এক জটিল কেস সমাধান করে খুব দ্রুত পুরো ডিপার্টমেন্টের চোখের মণি হয়ে উঠেছে সে।
বর্তমানে লিওনার্দো শুধু লন্ডনের সিআইডি অফিসার নয়, বরং ইন্টারপোলের নির্দেশে গঠিত বিশেষ আন্তর্জাতিক জয়েন্ট টাস্ক ফোর্সের চিফ ইনভেস্টিগেটর। ওপর মহল থেকে তাকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার কারণে সীমান্ত পেরিয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে গিয়ে অপারেশন চালানোর আইনি একচ্ছত্র অধিকার এখন তার হাতে। প্রজেক্টর স্ক্রিনে কোনো মানুষের ছবি নেই, বরং সেখানে জ্বলজ্বল করছে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে নিখুঁত কালিতে আঁকা একটা ফণা তোলা সাপের অবয়ব। ইন্টারপোল একে ‘স্নেক ভাইপার’ নাম হিসেবেই চেনে যেটা তার কোডনেম।
লিওনার্দো এবার যখন কথা বলা শুরু করল, পুরো রুমের সবাই চুপ হয়ে গেল। তার গলার আওয়াজটা খুব বেশি চড়া না হলেও, কেমন যেন একটা জোর ছিল তাতে —”গত তিন বছরে ইউরোপের চারটে বড় বড় মা/র্ডার আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট পতনের পেছনে এই একটাই নাম জড়িয়ে আছে। যেহেতু এটা কোনো সাধারণ ক্রাইম নয়, তাই আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সকে এর পেছনে লাগানো হয়েছে। আমাদের একমাত্র ট্র্যাজেডি হলো আমরা কেউ জানি না এই ভাইপার আসলে ছেলে নাকি মেয়ে, তার আসল পরিচয়টা কী, বা সে দেখতেই বা কেমন।”
টেবিলের সামনে বসা একজন প্রবীণ অফিসার ফাইল ওল্টাতে ওল্টাতে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন, “বাট হায়াস আন্ডারওয়ার্ল্ডে তো কিছু গুজব ছড়ানো আছে ওর বৈশিষ্ট্য নিয়ে?”
লিওনার্দো হাতে থাকা মার্কার পেনটা টেবিলে হালকা একটু ঠুকল। তারপর প্রবীণ অফিসারের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “অপরাধ জগতে গুজব দিয়ে সত্য ঢাকা যায় না, স্যার। হাতে সাপের ট্যাটু,আইব্রো পিয়ার্সিং বা থুতনিতে কাটা দাগ এগুলো স্রেফ বিভ্রান্ত করার গল্পও হতে পারে। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তব লিড হলো, ভাইপার এবার লন্ডনের মাটিতে পা রেখেছে। আর এই আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সের চিফ হিসেবে আমার প্রথম কাজ—ভাইপারকে যেভাবেই হোক আইনের আওতায় আনা।”
ব্রিফিং শেষ করে লিওনার্দো যখন নিজের কেবিনে ফিরে এলো, ততক্ষণে রাত প্রায় আটটা বেজে গেছে। চেয়ারটায় বসামাত্রই ডেস্কের ওপর রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের আলোয় মায়ার ছবিটা ভেসে উঠেছে। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে মায়ার মিষ্টি অভিমানী কন্ঠস্বর ভেসে এলো, “লিও! ভাইয়া তুমি কি আজকেও রাত করে বাড়ি ফিরবে? মামি-মা কিন্তু ডিনার টেবিলে তোমার পছন্দের খাবারগুলো নিয়ে বসে অপেক্ষা করছেন।”
মায়ার গলা শুনতেই লিওনার্দোর সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল, ওর ঠোঁটের কোণে আলতো একটু হাসি দেখা দিল। সম্পর্কে মায়া ওর ফুপাতো বোন, তবে এখন সে লিওনার্দোর হবু বউ। ছোটবেলায় এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় মায়ার বাবা-মা মারা যান। সেই থেকে লিওনার্দোর মা-বাবাই মায়াকে নিজেদের বুকে টেনে নেন, আগলে রাখেন একদম নিজের মেয়ের মতো। মায়ার প্রতি লিওনার্দোর মনে কোনো মাতাল করা প্রেম নেই, কিন্তু ওকে আগলে রাখার মতো অদ্ভুত একটা মায়া আর দায়িত্ববোধ আছে। বড়দের শেষ ইচ্ছেকে সম্মান জানাতেই কিছুদিন আগে তাদের আংটি বদল হয়েছে।
লিওনার্দো ডেস্কের ওপর ছড়ানো ফাইলগুলো এক হাত দিয়ে গুছিয়ে নিল। তারপর ফোনের ওপাশে শান্ত গলায় বলল, “আসছি মায়া। জাস্ট ফাইলগুলো গুছিয়েই বের হচ্ছি।”
ওপাশ থেকে মায়া হালকা একটু হাসল। তারপর আদুরে গলায় বলল, “তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু! তোমার ওই ‘ভাইপার’ ইদানীং আমার চেয়ে বেশি সময় পাচ্ছে তোমার কাছে।” এই বলেই মায়া ফোনটা রেখে দিল।
লিওনার্দো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা রাখতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ডেস্কের এক কোণে ওর চোখ আটকে গেল। নজর কাড়ল ডেস্কে রাখা একটা ছোট কাঁচের পেপারওয়েট। লিওনার্দো হাতটা নাড়িয়ে ফোনটা টেবিল রাখতে পারল না, ওখানেই আটকে গেল। ওর স্পষ্ট মনে আছে এক ঘন্টা আগেও পুরো টেবিলটা ফাঁকা ছিল, এই পেপারওয়েটটা এখানে ছিল না! ও সাবধানে পেপারওয়েটটা তুলে নিল। নিচে চাপা দেওয়া ছোট একটা সাদা কাগজের টুকরো। ভাঁজটা খুলতেই লিওনার্দোর পুরো মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। নীল কালিতে সুন্দর, কাটাকাটা অক্ষরে লেখা:
>”লন্ডনের আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সে স্বাগতম, অফিসার লিওনার্দো হায়ার্স। স্কাই-ব্লু শার্ট আর নেভি ব্লু টাইটাতে তোমাকে আজ বড্ড সুদর্শন লাগছে। তবে তোমার ডেস্কে রাখা ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটার চেয়ে, প্রজেক্টর স্ক্রিনে থাকা ছবিটা কিন্তু বেশি আকর্ষণীয়। আর শিকারী যখন নিজেই শিকারের নজরে থাকে, খেলাটা তখন বেশি জমে, তাই না?” চিরকুটের ঠিক নিচে নিখুঁত করে আঁকা একটা ছোট বিষাক্ত সাপের চিহ্ন।
লিওনার্দোর হৃৎস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ও বিদ্যুৎবেগে জানালার দিকে ঘুরে তাকাল। বাইরে তখন কেবলই বৃষ্টির শব্দ আর জমাট বাঁধা অন্ধকার। সিআইডি অফিসের এত কড়া নিরাপত্তা গলিয়ে কেউ তার পার্সোনাল কেবিনে ঢুকে পড়েছে? লিওনার্দো স্তব্ধ হয়ে রইল। ভাইপার শুধু যে লন্ডনে পা রেখেছে তা-ই নয়, সে এখন লিওনার্দোর একদম নিঃশ্বাসের দূরত্বে ঘোরাঘুরি করছে। চিরকুটের লাইনগুলো আবার দেখল লিওনার্দো। ‘বড্ড সুদর্শন লাগছে’ শব্দটা ওর মাথায় খটকা ধরাল। কোনো পুরুষ খু/নি বা অপরাধী সাধারণত এভাবে লিখবেনা। লিওনার্দোর চোখের দৃষ্টি সরু হয়ে এলো। তার মানে, ভাইপার কোনো পুরুষ নয়… সে একজন নারী! ঠিক সেই মুহূর্তে, সিআইডি অফিস থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে, লন্ডনের এক বিলাসবহুল হোটেলের অন্ধকার কক্ষে বসে ছিল একজন। অন্ধকার রুমের একমাত্র আলোর উৎস ছিল একটা বড় কম্পিউটার স্ক্রিন। সেই স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে লিওনার্দোর কেবিনের লাইভ দৃশ্য। চিরকুটটা পড়ার পর লিওনার্দো যেভাবে স্তব্ধ হয়ে জানালার দিকে ঘুরে তাকাল, তার প্রতিটা এক্সপ্রেশন সে খুব ধীরস্থিরভাবে উপভোগ করছিল।
তার চুলে আধুনিক ‘উলফ কাট’ স্টাইল দেয়া। একদিকের ভ্রু-তে করা পিয়ার্সিং আর চোখের নিচে আর থুতনিতে গভীর কাটা দাগ রয়েছে, যা মনিটরের আলোয় আবছাভাবে চোখে পড়ছে। বাম হাতের নরম চামড়ার ওপর কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত পেঁচিয়ে আছে একটা কুচকুচে কালো সাপের ট্যাটু। এই মেয়েটাই আর কেউনা—স্বয়ং ভাইপার।
স্ক্রিনে লিওনার্দোর ওই থমথমে চেহারাটা দেখতে দেখতেই মেয়েটার ঠোঁটে এক ফালি ধারালো বিষাক্ত হাসি খেলে গেল। ও হাত বাড়িয়ে মনিটরের স্ক্রিনে লিওনার্দোর কফি কালার চোখের ওপর নিজের আঙুলটা ছোঁয়াল। ও স্ক্রিনের দিকে আরো একটু ঝুঁকে বসল। চোখের পলক না ফেলেই লিওনার্দোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর একদম নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, “কত বছর পর দেখলাম তোমাকে বলো তো, লিওন?”
ভাইপার এক মুহূর্তের জন্য হারিয়ে গেল চার বছর আগের সেই ক্যাম্পাস লাইফে। তখন ও ফার্স্ট ইয়ারের ভীষণ সাধারণ একটা মেয়ে, যে সবসময় সবার আড়ালে থাকতেই পছন্দ করত। এক কথায় ইন্ট্রোভার্ট ধরনের। সেদিন বকুলতলার সেই চেনা আড্ডায় একঝাঁক ছেলেমেয়ের মাঝখানে বসে গিটার বাজাচ্ছিল লিওনার্দো। তখন ও ক্যাম্পাসের বেশ পপুলার সিনিয়ার, যার ওপর অনায়াসেই সবার চোখ আটকে যেত।
‘মেয়ে তুমি কি আকাশ চেনো? চেনো না…
মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো? চেনো না…
তবে চিনবে কেমন করে এই আমাকে….’
লিওনার্দোর সেই উদাসীন গানের কণ্ঠ আর গিটারের তারের সুর সেদিন প্রথম দেখাতেই মেয়েটার বুকে এক তীব্র ঝড় তুলে দিয়েছিল। তপ্ত মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টি নামলে যেমনটা হয়, ওর ভেতরটাও ঠিক তেমনি শান্তিতে জুড়িয়ে গিয়েছিল।ব্যস, ওই একটা দিনই তার পুরো জগৎটা ওলটপালট করে দিয়েছিল। তখন থেকেই লিওনার্দো হয়ে ওঠে তার আড়ালে রাখা এক তীব্র অবসেসন এমন ভালো লাগা যাকে ছোঁয়া যায় না, কিন্তু মন থেকে মোছাও যায় না। আর তখন থেকেই সবার আড়ালে থেকে ও লিওনার্দোকে পাগলের মতো স্টক করতে শুরু করল। লিওনার্দোর কখন কোন অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে, কোন বিষয়ের নোট লাগবে সব ওর নখদর্পণে থাকত। সে লিওনার্দোর অ্যাসাইনমেন্টের ভেতরের সম্পূর্ণ লেখা আর জটিল আর্টটুকু ও নিজেই কমপ্লিট করে দিত। ও যে ডান আর বাঁ, দুই হাতেই সমান দক্ষতায় লিখতে পারে—এই সিক্রেটটা কেউ জানত না। যেটা ওর একমাত্র হিডেন ট্যালেন্ট। লিওনার্দো যাতে কোনোদিন হাতের লেখা দেখেও সন্দেহ করতে না পারে, সেজন্য ওর অ্যাসাইনমেন্টগুলো ও সবসময় বাঁ হাতে লিখত।
তারপর লিওনার্দো হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছিল কে তার এই কাজগুলো এত নিখুঁতভাবে করে দিয়ে যায়, কিন্তু কোনোদিন সেই অধরা মানুষের দেখা সে পায়নি। আর তাদের প্রথম এবং শেষ সরাসরি দেখা হওয়ার সেই স্মৃতিটা? ওটা ওর জীবনের বুকে খোদাই করা এমন এক মুহূর্ত, যার মূল্য আর কোনো কিছু দিয়ে চুকানো সম্ভব নয়।
সেদিন ক্যাম্পাসের এক নির্জন করিডোরে কিছু উগ্র সিনিয়র তাকে ঘিরে ধরে বিশ্রীভাবে র্যাগিং করছিল। ভয়ে, অপমানে যখন তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই অন্ধকার ফুঁড়ে এক টুকরো আলোর মতো এসে দাঁড়িয়েছিল লিওনার্দো। এক ধমকে সিনিয়রদের সরিয়ে দিয়ে সে সোজা ওর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ওর মাথায় আলতো করে হাত রেখে খুব নরম গলায় বলল, “সব ঠিক আছে, ভয় পেও না। এবার ক্লাসে যাও।”
সেদিন লিওনার্দোর ওই আলতো স্পর্শ আর অভয় দেওয়া কণ্ঠস্বরটুকুই ছিল তাদের প্রথম মুখোমুখি হওয়া, আর সেটাই শেষ। এরপর হুট করেই তার জীবনে এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যায়, যা তার চেনা জগৎটাকে এক নিমেষে ছারখার করে দিয়েছিল। সেই ঝড়ের পর পৃথিবীর ওপর থেকে সমস্ত বিশ্বাস উঠে যায় তার। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সে কীভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের লেডি ডন হয়ে উঠল, কীভাবে নিজের চেনা পরিচয় মুছে সে ‘ভাইপার’ নামটা নিজের করে নিল সেসব অন্ধকার আর রক্তভেজা ইতিহাস এই পৃথিবীর কেউ জানে না।
ঠিক তখনই অন্ধকার কক্ষের দরজা শব্দ করে খুলে গেল। ভারী বুটের আওয়াজ তুলে ভেতরে ঢুকল এক দীর্ঘকায়, চওড়া পুরুষ। কক্ষের তীব্র লাইটটা জ্বলে উঠতেই ভাইপারের মুখের সব নরম অনুভূতি এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। ভেতরে যে ঢুকেছে, সে এই অন্ধকার জগতের সবচেয়ে বড় মাথার একজন—দানিয়েল, যিনি ভাইপারের ‘বস’। পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের মেইন এই মানুষটাই একসময় নিজের হাতে গাইড করে আজকের এই ভয়ঙ্কর ‘ভাইপার’ তৈরি করেছে, তাকে বানিয়েছে নিজের একমাত্র ডান হাত।
দানিয়েল এগিয়ে এসে মনিটরের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। লিওনার্দোর ছবিটা দেখে ওর চোখ দুটো ঈর্ষায় কুঁচকে গেল। স্ক্রিনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে, কণ্ঠে এক ধরনের চাপা অধিকারবোধ আর তীব্র রাগ মিশিয়ে বলল, “এই নতুন সিআইডি অফিসারটা আমাদের ধরার জন্য বড় বেশি লাফালাফি করছে, ভাইপার। আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সের পাওয়ার পেয়েছে বলে ও ভাবছে আমাদেকে হাতের নাগালে পাবে! একে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া আমার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার।”
ভাইপার চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওর চোখে তখন কোনো ভয় নেই আর না কোনো দুর্বলতা, পুরো চাউনিটাই একদম পাথরের মতো ঠান্ডা। ও দানিয়েলের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল, চোখের পিয়ার্সড আইব্রোটা সামান্য কুঁচকে সরাসরি দানিয়েলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো “লিওনার্দো হায়াসকে ছোঁওয়ার চেষ্টাও করবেন না, বস। ওকে ধরার জাল আমি নিজে বুনেছি। ও আমার শিকার।”
দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে ভাইপারের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সেই ঠোঁটে কোণে ক্রূর হাসি ফুটে উঠলো। নিজের তৈরি করা সেরা অস্ত্রের এই একরোখা জেদ তার খুব ভালো করেই চেনা। ভাইপারের কাঁধে একটা ভারী হাত রেখে সে খসখসে স্বরে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখো ভাইপার, শিকার যেন শেষমেশ শিকারীকেই গিলে না খায়।”
এরপর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই দানিয়েল কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
দানিয়েল চলে যাওয়ার পরই ভাইপার আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল। মনিটরের আলোয় লিওনার্দোর চেনা মুখটা ভেসে উঠেছে—কেমন একটা শান্ত আর বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি তার। স্ক্রিনের আলোয় ভাইপারের চোখের নিচের আর থুতনির কাটা দাগটা আরো একটু স্পষ্ট হয়ে উঠল। ভাইপার অপলক চেয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। আর মনে মনে আওড়ালো, ‘আমার প্রথম যৌবনের হিডেন ক্রাশ… একটা দিনও তোমায় ভুলতে পারিনি, লিওন। এবার আমি নিজেই আসবো তোমার কাছে। তবে সেই আগের মতো কোনো অসহায় মেয়ে হয়ে নয়, তোমার চিরশত্রু তোমার চোখে ক্রিমিনাল হয়ে। দেখি, তোমার আইন আমাকে আটকায়, নাকি আমার ভালোবাসা তোমাকে হারায়!’
