আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩
সাবিলা সাবি
লাশের শীতল দেহটা ফরেনসিক ল্যাবের গন্তব্যে রওনা হতেই হোটেলের সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষটি কড়া নিরাপত্তায় মুড়িয়ে দেওয়া হলো। এদিকে সিআইডি সদর দপ্তরে তখন জরুরি মিটিং চলছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সম্মেলন কক্ষের হাওয়া ভারী হয়ে উঠেছে এক অজানা আশঙ্কায়। সবারই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে সেই চিরকুট—ভাইপারের ফেলে যাওয়া এক টুকরো কাগজ, যা গোটা তদন্তকেই যেন এক গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। এসিপি’র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল লিওনের ওপর। আদেশের ভঙ্গিতে তিনি হাত পাততেই লিওনের পেশিবহুল হাত জোড়া মুহূর্তের তরে স্থির হয়ে গেল। নিজের নামের পাশে ওই বি/কৃত খু/নিটার বাঁকা হস্তাক্ষরে লেখা সেই সম্বোধন—‘দিলবার’। শব্দটা যেন একটা জ্বলন্ত ছোড়া গু*লির মতো লিওনের হৃদপিণ্ডে এসে বিঁধল। নিজের পেশাগত সম্মানের ওপর এমন বীভৎস এক উপহাস যা তার সমস্ত অস্তিত্বকে ওই খু/নিটা নিজের জাঁতাকলে পিষছে। এক আকাশসম বিতৃষ্ণা নিয়ে সে বিষাক্ত চিরকুটটি এসিপি’র হাতে তুলে দিল।
কাগজটা হাতে পেতেই কক্ষজুড়ে এক অদ্ভুত গুঞ্জন শুরু হলো। সহকর্মীদের বাঁকা চাহনি আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চারপাশটা লিওনের জন্য ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। একজন সিনিয়র কর্মকর্তা চিরকুটের ওই শব্দটার ওপর আঙুল ঘষতে ঘষতে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, “লিওন, ভাইপার এখানে তোমার নাম কেন লিখেছে? আর এই ‘দিলবার’ এই শব্দটার মানেই বা কী? এই নরপিশাচ ক্রিমিনাল তোমাকে এত ব্যক্তিগতভাবে চেনে কোন অধিকারে? তার কাছে কি তুমি শুধুই একজন অফিসার, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো কাহিনী আছে?”
পুরো কক্ষ তখন এক জমাটবদ্ধ স্তব্ধতায় নিমজ্জিত। লিওনের গায়ের রক্ত রাগে আর অপমানে ফুটছিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল পাথরের মতো, মনে হলো ওই শব্দটা উচ্চারিত হওয়া মাত্রই তার ভেতরের কোনো সুপ্ত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠছে। টেবিলের ওপর হাতের মুঠো পাকিয়ে, আগুনের মতো দাহ্য দৃষ্টিতে সে গর্জে উঠল, “আমার পরিচিত? এমন এক বিকৃত মানসিকতার নরখাদক আমার পরিচিত হবে—এই ধারণাটাই তো হাস্যকর! এই ‘দিলবার’ শব্দটা সে বেছে নিয়েছে আমাকে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করতে, আমার পেশাদারিত্বের মোড়কে একটা নোংরা বিভ্রম তৈরি করতে। সে আমাকে আমার নিজের ভেতর থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইছে, এটাই তার আসল গেইম।”
লিওনের দৃঢ় কন্ঠস্বর রুমের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুললেও বাতাসে ঝুলে রইল এক ভারী অস্বস্তিকর রেশ। সে বুঝতে পারল, ভাইপারের এই খেলার জাল কেবল বাহিরের নয়; এই ‘দিলবার’ শব্দটি তার হৃদয়ের কোণে এক অজানা শিহরণ আর রাগের যে সংমিশ্রণ তৈরি করছে, সেটাই ভাইপারের আসল বিজয়।
মিটিংয়ের উত্তেজনার মাঝে হঠাৎ করেই অফিসার রওশন এক অদ্ভুত সাহসিকতা নিয়ে মৃদু হেসে বলে উঠল, “স্যার, পরিস্থিতিটা বড্ড গুরুগম্ভীর হয়ে যাচ্ছে, একটা কথা মাথায় এল—ভাইপার যখন আপনাকে ‘দিলবার’ বলে সম্বোধন করেছে, তখন কি ধরে নিতে হয় যে ওই লেডি ক্রিমিনালটা আপনার ওপর ক্রাশ খেয়েছে? আপনি এতটা হ্যান্ডসাম তাই হয়তো খু/নের পাশাপাশি প্রেমপত্র দিয়ে গেছে, নইলে একটা লা/শের পাশে এমন অদ্ভুত সম্বোধনের চিরকুটের আর কী মানে হতে পারে?”
রওশনের রসিকতায় সহকর্মীদের মুখে চটজলদি এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। কিন্তু লিওনের জমাটবাঁধা গম্ভীর মুখ দেখে সেই হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, যেন বরফশীতল বাতাসে সবটুকু উত্তাপ হারিয়ে গেল। লিওন তার তীক্ষ্ণ, শীতল দৃষ্টি রওশনের দিকে ঘুরিয়ে দিল। তার গলার স্বর ছিল শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত স্বরে ছিল এক ধারালো শাণিত ছুরি—যা রওশনের শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বইয়ে দিল। লিওন ধীর গলায় উচ্চারণ করল, “রওশন, তোমার এই আলগা রসবোধটা যদি খু/নি ধরার তীক্ষ্ণতায় কাজে লাগাতে, তবে হয়তো জটটা এতক্ষণে খুলে যেত। পেশাদারিত্বের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত ইয়ার্কি এটা কি খুব জরুরি?”
রওশন নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমতা আমতা করে চুপ হয়ে গেল, দৃষ্টি নামিয়ে নিল টেবিলের দিকে। লিওন আবার তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করল বোর্ডের দিকে, ফাইলটা খুলল। তার ভেতরটা তখনো উত্তাল—রওশন হয়তো মশকরাই করেছে, কিন্তু ওই ‘দিলবার’ শব্দটা তার অস্তিত্বের গভীরে বিষাক্ত কাঁটার মতো বিঁধে আছে। লিওন নিজেকে যতটা কঠিনভাবে স্থির রাখার চেষ্টা করছিল, মনের গহীনে ততটাই যেন অস্থিরতার ঢেউ আছড়ে পড়ছিল।
হাসপাতালের বেডে ক্লোইয়ের জ্ঞান ফিরতেই লিওনের স্থির দৃষ্টিতে কোনো বিরাম রইল না। অফিসারদের কেবিনের বাইরে পাঠিয়ে দিলো সে, নিভৃতে কথা বলার এক নিশ্ছিদ্র পরিসর তৈরি হলো। লিওনের কফি কালারের চোখদুটো ক্লোইয়ের আতঙ্কিত চোখের ওপর স্থির হলো। শান্ত গলায় সে জিজ্ঞেস করলো,“ক্লোই,ওই রাতে ঠিক কী হয়েছিল? আমাকে পুরো ঘটনাটা বলো।”
ক্লোই তখনো ঘটনার ভয়াবহতা থেকে বের হতে পারেনি। কণ্ঠস্বর তার কাঁপছে, চোখের জল মুছে সে বলতে শুরু করল, “স্যার, আমি বুঝতে পারিনি… আমার সেই বন্ধু আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। সে… সে আমার সঙ্গে জোরাজুরি করছিল, আমাকে রেই/প করতে চেয়েছিল।”
ক্লোই একটু থামল, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করল, “ঠিক সেই চরম মুহূর্তেই কেউ একজন রুমে ঢুকল। আমি তখন ধস্তাধস্তিতে এতটাই বিধ্বস্ত ছিলাম যে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে একটা জিনিস আমার মনে আছে—হুডি পরা সেই মানুষটার চোখ দুটো। সে যখন সামনে এসে দাঁড়াল, তার চাহনি ছিল হাড়হিম করা। আর তার ভ্রুতে পিয়ার্সিং করা ছিলো কারন ওটা চকচক করছিলো। বাকি কোনো কিছুই আমি ঠিকমতো দেখতে পাইনি, মনে হচ্ছিল সব ঝাপসা দেখেছিলাম আমি কারন আমার ড্রিংকসে আমার ফ্রেন্ড ড্রাগস মিশিয়েছিলো।”
ক্লোইয়ের চোখটা আরও বড় হয়ে উঠল, যেন পুরনো আতঙ্ক তাকে আবার ঘিরে ধরছে। সে ফিসফিস করে বলল, “এই হুডি পড়া আগুন্তক সে আমার হাত ধরে বারান্দায় টেনে নিয়ে গেল। আমার মনে আছে সে কী একটা বলল, তারপর আমার সব অন্ধকার হয়ে গেল। এরপর আর আমি কিছুই জানি না। জ্ঞান ফেরার পর তো আমি এখন এই হাসপাতালে।”
লিওন চুপচাপ সব শুনলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল পাথরের মতো। সে নিশ্চিত হলো, ক্লোইও ভাইপারের আসল চেহারা দেখতে পায়নি। ভাইপার এতোটাই নিখুঁত যে তার উপস্থিতির কোনো চিহ্নই সে রাখে না, শুধু রেখে যায় তার নৃ/শংসতার ছাপ। লিওনের বুকের বাঁপাশটা জ্বলতে শুরু করল রাগে। সে মনে মনে ভাবলো, এই খু/নিকে ধরার জন্য তাকে আরও গভীরে নামতে হবে।
পরদিন সকালে লিওন এক স্কেচ আর্টিস্টকে সাথে নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করলো। ক্লোইয়ের চোখে তখনো আতঙ্ক লেগে আছে, তবুও সে আপ্রাণ চেষ্টা করল সেই ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতি রোমন্থন করতে। ক্লোই বর্ণনা দিতে শুরু করল, আর আর্টিস্টের পেন্সিল কাগজের ওপর দ্রুত ছন্দে ছুটল। মিনিট পনেরো পর স্কেচবোর্ডটি লিওনের সামনে ধরা হলো। স্কেচে ভেসে উঠল একজোড়া তীক্ষ্ণ, শীতল চোখ। সেই চোখের ওপর ভ্রু-এর অংশে একটি পিয়ার্সিংয়ের স্পষ্ট ছাপ, আর মাথায় হুডির ছায়া এমনভাবে পড়েছে যে পুরো মুখমণ্ডল আঁধারে ঢাকা।
লিওন স্কেচটির দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো। তার বুকের বাঁপাশটা অকারণে তোলপাড় করে উঠল। চোখজোড়া পরিচিত নয়, অথচ এক অদ্ভুত চুম্বকীয় টান অনুভব করলো সে। পিয়ার্সিং করা ভ্রু আর হুডির আড়ালের সেই রহস্যময় চাহনি—ঠিক যেন সেই খুনি কাগজের ওপার থেকে তাঁকেই দেখছে। লিওন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলো। সে নিজেকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলো, ‘না, একে আমি চিনি না।’ কিন্তু মনের গহীনে এক সূক্ষ্ম অস্বস্তি বিষের মতো দানা বাঁধল। ভাইপার কি সত্যিই সাধারণ কেউ, নাকি এই চোখের আড়ালে লিওনের জীবনের কোনো ফেলে আসা অতীত লুকিয়ে আছে?
লিওন স্কেচটা হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলো। ক্লোই ফিসফিস করে বলল, “স্যার, এই চোখগুলো… এগুলো যেন কোনো মানুষের নয়, কোনো শিকারি জন্তুর।”
লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল পাথরের মতো। সে স্কেচটা পকেটে পুরে নিলো। মনে মনে ঠিক করলেন, এই পিয়ার্সিং আর হুডির আড়ালে থাকা মানুষটিকে খুঁজে বের করতেই হবে—সে যত অন্ধকারেই থাকুক না কেন।
স্কেচটা ইতোমধ্যে তার পকেটের অন্ধকারে বন্দি, তবু সেই তীক্ষ্ণ চাহনি লিওনের পিঠের ওপর বিঁধে আছে। কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য লিওন যেই না দরজাটা খুলেছে, ক্লোই একটু কাঁপাকাঁপা গলায় ডেকে উঠল, “স্যার, একটা কথা বলতে দ্বিধা হচ্ছে—যে ওইদিন রুমে ঢুকেছিল, সে যদি না আসত, তবে আমার ওই বন্ধু আমাকে মে/রেই ফেলত।”
লিওন দরজায় হাত রেখে থমকে দাঁড়ালো। ক্লোইয়ের এই কথাটুকু তার মাথার ভেতর এক গভীর দ্বিধার জন্ম দিল। স্কেচটা পকেটের ভেতর থাকলেও, তার অবয়বটা লিওনের মনের আয়নায় স্পষ্ট। ভাইপার কি কেবলই একজন খু/নি, নাকি তার নিজস্ব কোনো এক অদ্ভুত নীতিবোধ বা বিচার ব্যবস্থা আছে? যে অপরাধী নিজেই একজনকে রে/ইপ করতে চাইলো, তাকেই আবার ভাইপার অত্যন্ত নৃ/শংসভাবে বিচার করল—এই সমীকরণটা লিওনের মস্তিষ্কে তোলপাড় শুরু করল।
লিওন ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্লোইয়ের দিকে তাকালো। ক্লোই আবার বলল, “আমি জানি না সে কেন আমার প্রাণ বাঁচাল, কিন্তু সেই মুহূর্তে সে আমার কাছে ঈশ্বরের ছায়ার মতো এসেছিল… যদিও তার পরবর্তী নৃ/শংসতা আমাকে এখনো কাঁপাচ্ছে।”
লিওন কোনো উত্তর না দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এক খু/নি অন্য এক অপরাধীকে শাস্তি দিচ্ছে—আন্ডারওয়ার্ল্ডে এমন কোনো নতুন শক্তি কি মাথাচাড়া দিচ্ছে, যে আইনকে তোয়াক্কা না করে নিজের হাতে বিচারের ভার তুলে নিয়েছে?
সিআইডি অফিসের সকালটা আজ এক অন্যরকম আমেজ নিয়ে এসেছে। নতুন অফিসার নোভা—তার চোখেমুখে এক তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ঝিলিক, যা প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ করার মতো। লিওন তার অতীত কাজের রেকর্ড দেখে এক মুহূর্তও নষ্ট করলো না; এই রহস্যের গোলকধাঁধায় নোভাকেই তার নতুন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলো। মিটিং শেষে লিওন নোভাকে নিজের টেবিলে ডেকে বসালো। অফিসের নিস্তেজ বাতাসে তখনও এক চাপা অস্বস্তি। লিওন ধীরে ধীরে তার পকেট থেকে সেই অভিশপ্ত চিরকুটটা বের করলো। ভাইপারের হাতের লেখার সেই কাগজটা নোভার দিকে এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, “নোভা, এটা একটা ক্রাইম সিনের চিরকুট। ভাইপার এটা ফেলে গেছে। আমি চাই তুমি এর হাতের লেখা নিয়ে গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করো। এর গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো প্যাটার্ন, কোনো সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বা ব্যক্তিগত কোনো ক্লু আছে কি না—তা তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে। এটা তোমার প্রথম বড় অ্যাসাইনমেন্ট। আমি চাই তুমি আমার চোখের মতোই সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিষয়টাকে দেখবে।”
নোভা চিরকুটটা হাতে নিতেই ঘরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে এল। তার শান্ত চাহনি স্থির হয়ে রইল কাগজের সেই বাঁকা হস্তাক্ষরে। লিওন তার দিকে তাকিয়ে রইলো, তার বুকের বাঁপাশটা অকারণে আবার একবার কেঁপে উঠল। নোভা গম্ভীর মুখে চিরকুটটা হাতে নিল। কাগজের প্রতিটি ভাঁজ, কালির প্রতিটি সূক্ষ্ম আঁচড় সে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেপে নিল। নিস্তব্ধতা ভেঙে সে শান্ত কণ্ঠে বলল, “জি স্যার, আমি এখনই কাজ শুরু করছি। ভাইপারের সাইকোলজি আর তার রাইটিং স্টাইলের গভীরে গিয়ে আমি এর উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।”
নোভা’র সেই অটল আত্মবিশ্বাসের দিকে তাকিয়ে লিওনের দীর্ঘদিনের জমে থাকা শ্রান্তিতে এক ফোঁটা আশার ঝিলিক লাগল। সে জানে, এই চিরকুটটা নিছক কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়; এটি ভাইপারের সেই গোলকধাঁধার এক প্রধান অংশ, যা তাকে ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে। নোভা যদি এই রহস্যের জট একটু হলেও আলগা করতে পারে, তবে হয়তো সেই অদৃশ্য ঘাতককে ধরা সম্ভব হবে।
লিওন নিজের ডেস্কে ফিরে গিয়ে আবার ক্লোইয়ের দেওয়া সেই স্কেচটার দিকে তাকালো। পকেটের সেই কাগজের ভাঁজে আঁকা পিয়ার্স করা ভ্রুর রহস্যটা তার মস্তিষ্কে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাকে ভাইপারের আরও কাছে ঠেলে দিচ্ছে, অথচ খু/নি এখনও তার নাগালের অনেক দূরে।
রাতের স্তব্ধতা তখন শহরের বুকের ওপর ভারী পাথরের মতো চেপে বসেছে। ক্লান্ত লিওন যখন বাড়ি ফিরল, চারপাশটা তখন নিস্তব্ধতায় মগ্ন। বাড়ির সবাই তখন ঘুমের অতল গহ্বরে, কেবল ডাইনিং টেবিলের এক কোণে আবছা আলোয় মায়ার নিথর অবয়ব। সে একাই জেগে আছে লিওনের অপেক্ষায়।
লিওন অবাক বিস্ময়ে কাছে এগিয়ে এল, “মা আর ড্যাড তো সেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। তুই এখনও জেগে, মায়া?”
মায়া মুখ তুলে তাকাল, ঠোঁটের কোণে তার এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি। শান্ত স্বরে সে বলল, “মামিমা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন—এখন থেকে তোমার দেখভালের ভার আমার। সেই দায়িত্ব পালন করছি।”
লিওনের চোখের কোণে বিস্ময় আর অকৃত্রিম স্নেহের এক অদ্ভুত আবেশ। সে মায়ার মাথার ওপর হাত রেখে হাসিমুখে বলল, “এত ছোট বয়সে এত বড় দায়িত্বের পাঠ শিখে গেলি? খুব বড় হয়ে গেছিস তো তুই।”
মায়া ভ্রু কুঁচকে, কৃত্রিম অভিমানের সুরে প্রতিবাদ করল, “কেন? আমাকে কি তোমার এখনো ছোট্ট মেয়ে মনে হয়?”
লিওন হাসল, তার সেই হাসিতে সারাদিনের সব গ্লানি মুছে গিয়ে এক প্রশান্তির ছায়া ভর করল। সে বলল, “তুই আমার কাছে চিরকাল ছোটই থাকবি। বয়স তো মোটে বাইশ, আমার থেকে ন’বছরের ছোট। বড় হতে তো তোর এখনও অনেক বাকি!”
মায়া মৃদু হাসল ঠিকই, কিন্তু লিওনের দৃষ্টি তখন সেই আলোর বৃত্ত ছেড়ে অন্ধকারের কোনো অতলান্ত গহ্বরে হারিয়ে গেছে। মায়ার এই কথাটুকু যেন এক তপ্ত চাবুকের মতো লিওনের চৈতন্যে এসে লাগল। ঘরের নিস্তব্ধতা মুহূর্তেই এক অজানা ভারে থমকে গেল। মায়া শান্ত কিন্তু এক অটল দৃঢ়তায় তাকাল লিওনের চোখের দিকে, “আমাকে বাচ্চা বলো না। ভুলে যেও না, আমাদের এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে।”
লিওন এক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। তার দৃষ্টি নিজের আঙুলের সেই আংটির দিকে নিবদ্ধ—সম্পর্কের এক উজ্জ্বল অঙ্গীকার, যা এখন তার কাছেই এক নিগূঢ় রহস্যের মতো ঠেকছে। লিওনের বুকের ভেতর এক অস্থির টানাপোড়েন, এক অদৃশ্য দেয়াল যেন তার আর মায়ার সম্পর্কের মাঝে ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠছে।
সে কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। মায়ার স্নিগ্ধ মুখের দিকে একবার তাকিয়েই দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল, যেন ওই চাহনি তার হৃদয়ের কোনো এক গোপন ক্ষতকে উন্মোচিত করে দিচ্ছে। মনের ভেতরকার এই তুমুল ঝড় সামলাতেই সে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু চার দেয়ালের নিভৃতেও মুক্তি নেই—মস্তিষ্কের গভীরে ভাইপারের সেই রহস্যময় চ্যালেঞ্জ আর মায়ার ওই অমোঘ অধিকারবোধ একই সাথে তীব্র হয়ে ঘুরপাক খেতে লাগল। দিনটি যেন তার কাছে এক অন্তহীন মানসিক দহনের পরীক্ষা। লিওন বুঝলো, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই অন্ধকার জগত আর তার ঘরের এই স্নিগ্ধ পৃথিবী—দুটোর মাঝে দাঁড়িয়ে সে আজ এক গোলকধাঁধায় বন্দি।
লিওন চলে যেতেই ডাইনিং টেবিলের নিস্তব্ধতায় মায়ার অবয়বটা আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। তার চোখের কোণে জেদের এক গাঢ় ছায়া ফুটে উঠলো লিওনের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে সে আপন মনে ভাবল, ‘লিও ভাইয়া এখনও আমাকে বাচ্চা বলেই আগলে রাখে। বিয়ের কথা তুললেই সে অকারণেই এড়িয়ে যায়, তারমানে বিয়ে নিয়ে অবহেলা এই কারনেই?’
মায়ার দৃষ্টিতে এবার এক নতুন সংকল্পের আগুন, যা তার কোমল মুখাবয়বকে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা দিয়েছে। নিজের হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে সে ভাবল, ‘আমার আদুরেপানা আর বয়সই হয়তো তার চোখে আমাকে চিরকাল সেই ছোট্ট মায়া বানিয়ে রেখেছে। এই ভুল আর চলতে দেওয়া যায় না। এখন থেকে আমাকে আরও পরিণত, আরও তীব্র হয়ে তার সামনে দাঁড়াতে হবে। আমি প্রমাণ করব—আমি শুধুই তার আদরের ছোট বোনটি নই, আমি তার জীবনসঙ্গিনী হওয়ার যোগ্য।’ সে জানে, লিওনের মনের অন্ধকার গহ্বরে যে জটিলতা দানা বাঁধছে, তা নিরসনের জন্য তাকে হতে হবে পাহাড়ের মতো দৃঢ়, আগুনের মতো উজ্জ্বল। মায়া স্থির করল, আগামীকাল থেকেই তার সাজপোশাক আর ব্যক্তিত্বে আসবে এক আমূল পরিবর্তন—এক নতুন রূপান্তর। সে জানত না, এই রূপান্তরের নেশা কেবল লিওনের নজর কাড়ার নয়, বরং তার ভালোবাসার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক মরিয়া লড়াই।
লিওন বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াল। শীতল জলধারা তার শরীরের অস্থিরতা ধুয়ে ফেলার বদলে যেন স্নায়ুগুলোকে আরও টানটান করে তুলল।
শহরের এক অন্ধকার হাউজে তখন ভাইপার মগ্ন ল্যাপটপের নীল আলোয়। লিওনের রুমে বারান্দার কোণে থাকা গোল্ডেন ঈগল মূর্তিটির চোখের নিচে লুকানো ক্যামেরাটা লিওনের রুমের খুঁটিনাটি সব রেকর্ড করছে। লিওনকে ঘরে না দেখে ভাইপারের বিরক্তি ছিল চরমে, কিন্তু ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে লিওন বেরিয়ে এল। পরনে শুধু একটি তোয়ালে, জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে সুঠাম পেশিবহুল দেহ বেয়ে—বাষ্পভেজা সেই দৃশ্য ভাইপারকে যেন মুহূর্তেই পাথর করে দিল। স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে ভাইপারের চোখের মণি বড় হয়ে উঠল। খুনিসুলভ শীতলতার আড়ালে তখন এক আদিম কামনা খেলা করছে। ঠোঁট চিপে সে অস্ফুটে বলে উঠল, “সো হট… ড্যাম ইট!”
তার কণ্ঠে তখন খুনিসুলভ শীতলতার চেয়েও এক তীব্র আকর্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, তার এই ‘দিলবার’-এর ওপর নজর রাখাটা এখন কেবল নিছক কোনো গোয়েন্দাগিরি নয়, এর মধ্যে মিশে গেছে এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা।
লিওন তখন আলমারি খুলে রাতের পোশাক হিসেবে ট্রাউজার আর টি-শার্ট বের করল। তোয়ালে খুলে সে যখন ট্রাউজার পরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই ভাইপার ল্যাপটপটা এক ঝটকায় বন্ধ করে দিল। তার বুক তখন প্রচণ্ড জোরে ওঠানামা করছে। একটু হলে সব দেখে ফেলত সে। ভাইপারের গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, সে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, “শিট! এটা কী ছিল? আরেকটু হলেই আমার হবু জামাইয়ের সম্পদ দেখে ফেলতাম। যদিও ও আমারই জিনিস, তবে এখন এভাবে দেখাটা ঠিক হবে না। সব সময় মতো দেখে নেব।” কথাটা বলেই সে থমকে গেল। পরক্ষণেই তার মাথায় এল, গোল্ডেন ঈগলের হিডেন ক্যামেরা তো সবই রেকর্ড করছে। সে বিড়বিড় করে উঠল, “আচ্ছা, আমার দিলবারের ওই হটনেস কি তবে শ্যাডো দেখে নিল? ধুর! শ্যাডো তো ছেলে ঈগল। মেয়ে ঈগল হলে কি আর তাকে আমি ওই কাজে পাঠাতাম? মানুষ হোক বা জন্তু—কোনো মেয়েকে আমি আমার জিনিসের দিকে চোখ তুলে তাকাতে দেব না।”
ভাইপার তখন অস্থির হয়ে আবার ল্যাপটপটার দিকে হাত বাড়াল, লিওনের সেই দৃশ্যটা আরেকবার দেখার অদম্য বাসনায় তার হাত কাঁপছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষের ভারি দরজার ওপাশ থেকে একজন গার্ড হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকে পড়ল। ভাইপার বিরক্তির চোটে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। গার্ড কাঁচুমাচু স্বরে বলল, “মিস্ট্রেস, বস ডেকেছেন। জরুরি মিটিং।”
ভাইপারের ল্যাপটপ খোলা হলো না। সে রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। নিজের দিলবারের ওপর এই নজরদারি ছাড়া যেন তার এক মুহূর্তও কাটছে না, আর ঠিক তখনই বসের ডাক! সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল, ‘আজকের মতো বেঁচে গেলে আমার বাজপাখি, কিন্তু বসের কাজ সেরে ফিরে এসেই তোমাকে আমি তন্ন তন্ন করে দেখব।’
সে উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নিল। বসের সামনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে তার মনে হলো—এই কাজটা দ্রুত শেষ করে তাকে ফিরতেই হবে। তার দিলবারকে নিজের আড়াল থেকে দেখার নেশা এখন তার রক্তের প্রতিটি কোষে মিশে গেছে।
দানিয়েলের কক্ষের পরিবেশটা তখন বরফের মতো ঠান্ডা। ভাইপার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার চোয়াল শক্ত।বস দানিয়েল গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “ভাইপার, তুমি কি জানো সেই মেয়েটার মাধ্যমে তোমার স্কেচ করানো হয়েছে? খু/নের দিন ওই মেয়েটাকে জিন্দা কেন ছেড়ে এসেছিলে?”
ভাইপার সামান্য দ্বিধা নিয়ে বলল, “কিন্তু বস, মেয়েটা তো ভিক্টিম। সে তো কোনো অপরাধী নয়, তাকে আমি কেন মারব?”
বস টেবিলের ওপর জোরে এক ঘুষি মারলেন। তার কণ্ঠের শীতলতা হাড় হিম করে দিল, “অপরাধের কোনো চিহ্ন রাখা যাবে না, ভাইপার! কোনো ক্লু থাকা যাবে না। এত বছর ধরে কেউ তোমার ছায়া পর্যন্ত ধরতে পারেনি, আর আজ তোমার একটা স্কেচ আইনের হাতে! এটা তোমার চরম ভুল।”
দানিয়েল পুনরায় কড়া গলায় যোগ করলেন, “মনে রেখো, আবেগ খু/নিদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই আস্তানায় আজ বাতাসের গতিও স্তব্ধ। বিশাল রাউন্ড টেবিলের ওপর লন্ডনের সেন্ট্রাল ব্যাংকের ব্লু-প্রিন্ট ছড়িয়ে রাখা। চারপাশে কুখ্যাত সব অপরাধী, সবার দৃষ্টি ব্লু-প্রিন্টের ওপর। দানিয়েল চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে গম্ভীর গলায় বললেন, “আগামীকাল রাত ঠিক দুইটা। এই অপারেশনটা সফল করতে হবে আমাদের।”
দানিয়েল ম্যাপের ওপর একটা আঙুল রেখে বললেন, “ব্যাংকটা কেবল সোনা আর টাকার খনি নয়, এটা আমাদের শক্তিমত্তার প্রতীক। সিকিউরিটি সিস্টেমটা হ্যাক করতে আমাদের মাত্র তিন মিনিট সময় লাগবে—সেই দায়িত্ব ভাইপারের।”
ভাইপার ল্যাপটপটা নিজের কাছে টেনে নিল। স্ক্রিনে ব্যাংকের ব্লু-প্রিন্টগুলো ভেসে উঠল। সে দেখল, ভল্টের পাসওয়ার্ড কোডটি প্রতি ষাট সেকেন্ডে পরিবর্তন হচ্ছে। সে শান্ত স্বরে বলল, “সময় খুব কম, বস। কিন্তু আমি ভল্টের সার্ভার আইসোলেট করে ফেলব। আমরা বেসমেন্ট দিয়ে ঢুকব এবং ছাদ দিয়েই বেরিয়ে আসব।”
আরেকজন পাশ থেকে যোগ করল, “আমরা গ্রাউন্ড ফ্লোরের সিসিটিভিগুলো আড়াই মিনিটের জন্য লুপে রাখব। গার্ডদের রুটগুলো আমরা ড্রোন থেকে ট্র্যাক করছি।”
বস ভাইপারের দিকে তাকিয়ে কড়া স্বরে বললেন, “ভাইপার, পুরো অপারেশনের প্রাণকেন্দ্র তুমি। মনে রেখো, কোনো ক্লু বা চিহ্ন থাকা যাবে না। যদি আগামীকাল রাতে এই লুট সফল হয়, তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সিংহাসন আমাদের হাতে থাকবে।”
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২
সবাই মনোযোগ দিয়ে ম্যাপটা দেখছিল। কিন্তু ভাইপারের মস্তিষ্ক তখন অন্য কোনো ভাবনায় ব্যস্ত। আগামীকাল রাত—অপারেশনের দিন। সে ভাবল, “এই ডাকাতির সূত্র ধরেই কি বাজপাখির সাথে আমার লড়াইটা অনিবার্য হয়ে উঠবে?”
অপারেশনের নীল নকশা চূড়ান্ত হলো। আগামীকাল রাতের জন্য পুরো দল প্রস্তুতি নিতে লাগল। পুরো লন্ডন তখন অন্ধকারে ঢাকা, কিন্তু এই ব্যাংক ডাকাতির ছক শহরের বুকে এক ভয়াবহ বিপদের ঘণ্টা বাজিয়ে দিল।
