Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৮

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৮

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৮
সাবিলা সাবি

মেফেয়ারের টাউনহাউসে ফিরে হিয়া সোজা তার গোপন কক্ষে ঢুকল। শরীরটা এখনো উত্তেজনায় কাঁপছে, তবে মনের ভেতর এক মরীচিকার মতো প্রশান্তি অনুভব করলে সে। ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তার ছোঁড়া সেই ইশারার পর লিওনের যে ক্ষুব্ধ রূপ সে দেখেছে, তা এখনো তার চোখের সামনে ভাসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইল হিয়া। লিওনের প্রতিটি অভিব্যক্তি, তার স্থির অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আর ওই কফির মগ ভেঙে ফেলার তীব্রতা—সবকিছুই হিয়ার স্নায়ুতে মাদকতা তৈরি করছিল।
বিশাল আরামদায়ক বিছানাটার ওপর গা এলিয়ে দিল হিয়া। চোখ বুজে সে কল্পনায় লিওনকে আঁকতে লাগল। আইনের রক্ষক হয়েও আজ লিওন তার এই পাগলামোর খেলায় অস্থির। এই উপলব্ধিটাই হিয়াকে এক ঘোর লাগা জগতে নিয়ে গেল।
ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার আগে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো শীতল, অটল হাসি। সে বিড়বিড় করে বলল, “তুমি যতই আমাকে ঘৃণা করো দিলবার, একদিন তোমার পৃথিবীজুড়ে শুধু আমিই থাকব।”

গভীর রাত। মেফেয়ারের সেই গোপন কক্ষটি এখন নিস্তব্ধ। হিয়া ঘুমের অতল সাগরে ডুবে থাকলেও, তার অবচেতন মন তখন এক ভয়াবহ বিভীষিকার গোলকধাঁধায় বন্দি।
স্বপ্নে হিয়া দেখল চারপাশটা এক অসহ্য লাল রঙে আবছা হয়ে আছে। রক্তের লোনা গন্ধে বাতাস ভারি। সে ঠিক যা দেখছে তা কিছু্ই স্পষ্ট নয়, কেবল অস্পষ্ট কিছু ছায়া আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা রক্ত। হিয়া যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল, তার ঠোঁট কাঁপছে। ঘুমের ঘোরেই অস্ফুট স্বরে সে বিড়বিড় করে উঠল, ” নাআআআ মা… বাবা… ছেড়ে দিন আমার মাকে হাত জোড় করছি!”
এর পরেই হঠাৎ তার কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত উদ্বেগ ফুটে উঠল। সে যেন সামনেই কাউকে দেখছে, যাকে বাঁচানোর তাগিদ তার রক্তে বইছে। হিয়া আবার বিড়বিড় করল, “অয়ন… পালা! অয়ন, আমার কথা একদম চিন্তা করিস না… তুই শুধু পালা ওই জঙ্গল দিয়ে পালিয়ে যা!”

হিয়া যেন সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে নিজের কারো অস্তিত্বকে আঁকড়ে ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। তার নিশ্বাস দ্রুত হয়ে এল, কপালে জমে থাকা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে বালিশে। হিয়া যখন ঠিক সেই দুঃস্বপ্নের চরম সীমায়, তখনই অন্ধকার থেকে একটা কালো ছায়া তার ওপর বিদ্যুৎগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেই অতর্কিত ঝাপটায় হিয়ার সারা শরীরে এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল। ভয়ে ও আতঙ্কে তার ঘুম ভেঙে গেল এক ঝটকায়। ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল সে। ঘরের টিমটিমে আলোয় সে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো, সারা ঘর ফাঁকা—কেউ নেই। হিয়া হন্তদন্ত হয়ে নিজের শরীর চেক করল, বুক ধড়ফড় করছে। চারিদিকে অন্ধকার আর তার নিজের ভারী নিশ্বাসের শব্দ। তার দুচোখ দিয়ে তখনো ঝরে পড়ছে ভয়ের অশ্রু, আর সেই রক্তমাখা স্মৃতির রেশ এখনো তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে দাউদাউ করে জ্বলছে।
নিজেকে আর সামলাতে না পেরে সে বিছানা থেকে ধপ করে নিচে নেমে এল। কোনো এক অদৃশ্য ভয়ের হাত থেকে বাঁচতে সে দ্রুত ডেস্কে গিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিল এমনভাবে যেনো অন্ধকার এই ছোট্ট জায়গাটুকুই এখন তার একমাত্র আশ্রয়। ডেস্কের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে সে নিস্তব্ধে বসে রইল, দুই হাত দিয়ে খামচে ধরে আছে নিজের ট্যাংক টপ। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার পুরো শরীরজুড়ে বয়ে গেল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো তীব্র এক কাঁপুনি।

পুরোনো স্মৃতিগুলো আজ আর কেবল মনের ভেতরে বন্দি নেই; সেগুলো এক জীবন্ত বিভীষিকা হয়ে তার শরীরে আছড়ে পড়লো। রক্ত, প্রিয়জনদের আর্তনাদ আর তার সাথে ঘটা সেই বীভৎস মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি—সবই এখন তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। হিয়া নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না। তার শরীরটা হঠাৎ ধনুকের মতো বেঁকে গেল। মেঝেতে আছড়ে পড়ে মৃগী রোগীর মতো তার পুরো শরীর তীব্র কাঁপুনিতে কেঁপে উঠল এক প্রকার খিঁচুনি শুরু হলো। মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো তখন অতিরিক্ত চাপে অকেজো হয়ে আসছে, যেন মাথার ভেতরটা এখনই বিস্ফোরিত হবে।
হিয়ার শরীর তখন এক ভয়াবহ শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সিউডো-সিজার’ (Pseudo-seizure) বা সাইকোজেনিক নন-এপিলেপটিক সিজার (PNES) এর সমতুল্য। এটি মূলত তীব্র মানসিক ট্রমা বা প্যানিক অ্যাটাকের এক চরম রূপ, যেখানে মস্তিষ্ক প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে শরীরকে সাময়িকভাবে অকার্যকর করে দেয়।
তখনই হিয়ার মুখ দিয়ে হালকা সাদা ফেনা গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে, কিন্তু হিয়া জ্ঞান হারাচ্ছে না। তার মস্তিষ্ক অতীতের সেই ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডির স্মৃতিকে এই মুহূর্তে বাস্তব কোনো বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার ফলে অ্যামিগডালা থেকে অ্যাড্রেনালিনের এক বিধ্বংসী স্রোত পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রচণ্ড উত্তেজনায় তার অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।
হিয়া নিজের শরীরকে শান্ত হওয়ার জন্য বারংবার সংকেত পাঠাচ্ছে, কিন্তু শরীরের প্রতিটি পেশি তার আদেশ অমান্য করে এই অবস্থায় তার প্যানিক অ্যাটাকটি শারীরিক খিঁচুনি ও সাদা ফ্যানার জাতীয় লালা নিঃসরণের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।

হিয়া আজ রাতে ড্রাগস নিতে পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিল। রোজ রাতে এই ড্রাগস তার মস্তিষ্কের সেই ‘ভয়ংকর আর্কাইভ’ বা স্মৃতিগুলোকে তালাবদ্ধ করে রাখত, যাতে ঘুমের ঘোরে তাকে ওই বিভীষিকার মুখোমুখি হতে না হয়। আজ সেই সুরক্ষাকবচ ছিল না।
প্রথমবারের ঘুমটা এসেছিল খুব মিষ্টি এক ঘোর নিয়ে। স্বপ্নে সে দেখছিল লিওনকে। মায়াবী আবহে লিওনের সান্নিধ্য তাকে মোহিত করে রেখেছিল। তারপর তো উঠে গিয়ে লিওনের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু ফিরে এসে ঘুমানোর পর স্বপ্নের মোড় নিল এক দুঃস্বপ্নে। সেই পুরনো ট্র্যাজেডির বীভৎসতায় রূপ নিল।ঘুমের মধ্যেই তার মস্তিষ্ক সেই ভয়াবহ অতীতকে বর্তমানের সাথে মিলিয়ে ফেলল। বিছানা থেকে ধপ করে নিচে নেমে এসে সে ডেস্কে আশ্রয় নিল ঠিকই, কিন্তু ড্রাগসের প্রভাবহীন মস্তিষ্ক তখন স্নায়বিক বিপর্যয়ের চরমসীমায়।

ঘরের মেঝেতে হিয়া তখনও কুঁকড়ে পড়ে আছে। তার শরীরের প্রবল কাঁপুনি থেমে গেলেও, সাইকোজেনিক সিজারের পর চরম অবসাদে তার শরীর অবশ হয়ে আসছে। সে এখন আধো-অচেতন, মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের অস্তিত্বকে যেন ঠিকমতো টের পাচ্ছে না।
বাইরে থেকে ইভানার পদক্ষেপের শব্দ পাওয়া গেল। ইভানা জানতো হিয়া বাইরে গিয়েছিলো আর বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে হিয়ার বাইকটি দেখেই ইভানা বুঝেছিল সে ফিরেছে, তাই এতো রাতে হিয়া কোথায় গিয়েছিল তা জানতেই সে সোজা তার রুমের দিকে এগিয়েছে। ইভানা তার আঙুল দিয়ে ডিজিটাল প্যানেলে কোডটি টাইপ করতেই মৃদু বিপ শব্দে দরজাটি খুলে গেল।
ভেতরে পা রাখতেই তার পায়ের বুটের শব্দ নিস্তব্ধ ঘরটাকে চিরে দিল। কিন্তু পরক্ষণেই ইভানার সমস্ত জগত থমকে দাঁড়াল। ডেস্কের নিচে অন্ধকার কোনে হিয়ার সেই বীভৎস এবং অসহায় অবস্থা দেখে তার গলা দিয়ে একটি অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল—”মিস্ট্রেস!”

ইভানা দ্রুত হিয়ার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। হিয়ার ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া সাদা ফেনার দাগ, চুলগুলো এলোমেলো এবং মুখমণ্ডল বিবর্ণ।
ইভানা দ্রুত তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলে হিয়া হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক প্রচণ্ড ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তার হাতগুলো তখন নিস্তেজ, কোনো জোর নেই। ইভানার স্পর্শের ঠিক আগমুহূর্তে হিয়া কোনোমতে তার কাঁপা হাতটি তুলে ইভানার দিকে নির্দেশ করল—”দূরে যাও ছোবেনা আমাকে’।”
তার গলা থেকে কেবল একটি অদ্ভুত খসখসে, রুদ্ধশ্বাস গোঙানি বেরিয়ে এল। সে চিৎকার করে সেই রাতের পিশাচদের নিষেধ করতে চাইছে, কিন্তু তার কণ্ঠ তখন আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই; শব্দগুলো গলার কাছে এসে পাথরের মতো আটকে যাচ্ছে।
ইভানা আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, “মিস্ট্রেস! মিস্ট্রেস, আমার দিকে তাকান!”
কিন্তু হিয়া ইভানার দিকে তাকাতে পারছে না, তার চোখের মণি উল্টে যাচ্ছে।

ইভানা মুহূর্তেই বুঝে গেল, হিয়া এখন আর নিজের জগতের নেই—অতীতের সেই বিভীষিকা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে। সে জানত, হিয়ার এই প্যানিক অ্যাটাক যখন তীব্র রূপ নেয়, তখন সাধারণ ওষুধে কাজ হয় না। ইভানা দৌড়ে গিয়ে টেবিলের গোপন ড্রয়ারটি খুলল। সেখান থেকে বের করে আনল হিয়ার সংরক্ষিত সেই জরুরি ইনজেকশনটি—খিঁচুনি থামানোর এক জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টি-কনভালস্যান্ট।
ইভানা কাতর স্বরে বলল, “মিস্ট্রেস, দয়া করে স্থির হোন! আমি আপনাকে কষ্ট দিতে আসিনি, এই ইনজেকশনটা না নিলে আপনার মস্তিষ্ক আর কাজ করবে না। প্লিজ, নিজেকে একটু শান্ত করুন ।”
হিয়া মেঝেতে পড়ে কাতরাচ্ছে, তার নখ দিয়ে সে মেঝে খামচে ধরছে। ইভানা অত্যন্ত সাবধানে, হিয়ার সম্মতির তোয়াক্কা না করেই, তার বাহুতে ইনজেকশনটি পুশ করার প্রস্তুতি নিল। হিয়ার তীব্র ছটফটানির মাঝেও ইভানা অভ্যস্ত হাতে নির্ভুলভাবে ইনজেকশনটি তার পেশিতে ঢুকিয়ে দিল।
ওষুধের কার্যকারিতা শুরু হতেই হিয়ার শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের প্রবল টানটান উত্তেজনার পর তার খিঁচুনি কমে এল, শক্ত চোয়াল ধীরে ধীরে ঢিলা হয়ে গেল। কিন্তু হিয়া তখনো গভীর ট্রমার ঘোরে আচ্ছন্ন। ইভানা তাকে জড়িয়ে ধরে আলতো করে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
হিয়া অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “অয়ন… তুই পালা… ওরা আসছে…”
ইভানা চোখের জল মুছে বিড়বিড় করে বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে মিস্ট্রেস। শুধু একটু ঘুমানোর চেষ্টা করুন এখন।”

ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে কেবল হিয়ার বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস আর ইভানার চাপা কান্না শোনা যাচ্ছে। এই রাতে হিয়া কেবল লিওনের ভালোবাসা বা ঘৃণা পাওয়ার লড়াইয়ে ছিল না; সে লড়ছিল নিজের অস্তিত্বের সেই অন্ধকারতম অতীতের সাথেযে স্মৃতিগুলো প্রতিবার তাকে জীবন্ত মৃ*ত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
ইভানা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে হিয়াকে বিছানায় তুলে দিল। ওষুধের প্রভাবে হিয়া এখন অনেকটা শান্ত, কিন্তু তার অবচেতন মন এখনো সেই রক্তমাখা স্মৃ*তির দংশনে কাতরাচ্ছে। ইভানা তার চাদরটা ভালোভাবে টেনে দিয়ে রুমের আলোটা কমিয়ে দিল। হিয়া ঘুমের ঘোরেও মাঝে মাঝে আঁতকে উঠছে, ইভানা তার হাতটা ধরে আলতো করে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে পাশে বসে রইল।

ভোরের প্রথম আলো যখন মেফেয়ারের সেই অন্ধকার কক্ষের জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি মারল, হিয়ার ঘুম ভাঙল হাড়কাঁপানো এক তীব্র শিরশিরানি দিয়ে। রাতের সেই বীভৎস স্মৃতির প্রতিটি মুহূর্ত যেন সিনেমার রিলের মতো তার চোখের সামনে ধীরলয়ে ভেসে উঠল, ছোট্ট ভাই অয়ন, মা-বাবা আর সেই নরপিশাচদের অট্টহাসি। আর সেই সাথে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল এক অপার্থিব আতঙ্কে।
হিয়া শোয়া থেকে উঠে বসল বিছানায়। তার সারা শরীরে এখনো ব্যথার রেশ, কিন্তু তার দৃষ্টিতে এখন আর নূজহাত হিয়ার অসহায়ত্ব নেই, আছে ভাইপারের এক বরফের মতো শীতল কঠিন স্থিরতা।
লিওন! লিওনের কারণেই আজ সে তার ড্রাগসের সুরক্ষা কবচ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, আর তার ফলেই এই বিপর্যয়। হিয়া বুঝতে পারল, সে এতদিন ভুল পথে ছিল। আইনের আড়ালে নিজেকে লুকানোর কোনো প্রয়োজন নেই, বরং লিওন তাকে যেভাবে অস্থির করে তুলছে, তাতে এখন দ্রুত তার আসল মিশন শেষ করতেই হবে।

সে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দেয়ালের একটি গোপন অংশ সরাতেই বেরিয়ে এল এক রহস্যময় বোর্ড। সেখানে টাঙানো রয়েছে চারটি ছবি। চারজন মানুষ—যাদের প্রত্যেকের বুকের ওপর লাল কালিতে দেওয়া একটি করে বড় ‘ক্রস’ চিহ্ন। ছবির দিকে তাকিয়ে হিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ছবিগুলোর মধ্যে দুজন বয়স্ক আর বাকি দুজন যুবক। সে জানে, এই চারজনই তার পুরো পৃথিবীকে মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।
ঠিক তখনই ডিজিটাল প্যানেলে কোড চাপার শব্দ হলো। দরজা খুলে ইভানা ভেতরে ঢুকল। হিয়ার ঘরের এই আমূল পরিবর্তন আর দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলোর দিকে তাকাতেই ইভানা থমকে গেল।
হিয়া ইভানার দিকে না তাকিয়েই দেওয়ালে লাগানো ছবিগুলোর ওপর আঙুল বুলিয়ে শীতল গলায় বলল, “সময় হয়ে এসেছে ইভানা। আর অপেক্ষা করা যাবেনা এবার আসল প্রতিশোধের খেলা শুরু করতে হবে।”
ইভানা চিন্তিত স্বরে বলল, “মিস্ট্রেস, কিন্তু এই অবস্থায় কি আপনি তৈরি? অফিসার লিওন তো আপনাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।”

হিয়া ইভানার দিকে ফিরল। তার চোখের চাহনিতে এখন কোনো দ্বিধা নেই, আছে এক জমাটবাঁধা শীতলতা। সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “লিওন কী করল, সেটা নিয়ে আমার আর কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি খবর পেয়েছি গোপনে, ওই নরকের জানোয়ারটা খুব তাড়াতাড়ি লন্ডনে পা রাখছে। এবার আমি কাউকে ছাড়ব না ইভানা। এতদিন ধরে তিলে তিলে নিজেকে তৈরি করেছি শুধু এই দিনটার জন্য। লন্ডন থেকেই শুরু হবে আমার সব হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার পালা।”
ইভানা হিয়ার স্থির দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে অনুভব করল, তার মিস্ট্রেস আজ সত্যিই সেই বিধ্বংসী ভাইপারে পরিণত হয়েছে, যে গত কয়েক বছর ধরে রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের নীল নকশা তৈরি করে নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে।
অন্যদিকে, সিআইডি হেডকোয়ার্টারের ল্যাবরেটরিতে লিওন তখনো তার কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। তার চোখের নিচে ক্লান্তির গাঢ় ছাপ। কাল থেকে সে বাড়িতে বসেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে সেই সিসিটিভি ফুটেজগুলো বারবার বিশ্লেষণ করেছে এখনও অফিসে এসেও করে যাচ্ছে।
কিন্তু ফলাফল—শূন্য।

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষে সব কিছুই স্পষ্ট ধরা পড়ছে, কেবল হিয়া যেন এক রহস্যের কুয়াশা মেখে দাঁড়িয়ে আছে—যার গভীরে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই।
লিওন তার চেয়ারে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মাথায় তখন জেদ চেপে গেছে। এই ‘ভাইপার’ নামটা এখন আর অপরাধীর পরিচয় বহন করে না; সে এখন এক অদৃশ্য আতঙ্ক, যা নিভৃতে নিজের অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তার কাজের ধরন, তার নিখুঁত কৌশল সবই বলছে, এই ব্যক্তিটি আইনকে তুচ্ছ করার এক অসীম ক্ষমতা রাখে।

“তুমি আসলে কি?” লিওন নিজের মনেই বিড়বিড় করল। “লন্ডনের রাস্তায় তুমি আমার নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ, অথচ আমার প্রযুক্তি তোমার কোনো ছাপ খুঁজে পাচ্ছে না?”
ল্যাবের ভেতর লিওনার্দোর মাথায় আগুন জ্বলছে। কয়েকদিন ধরে ভাইপারের কেসটা নিয়ে সে প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করে যাচ্ছে কিন্তু কোনো কূল-কিনারা করতে পারছে না। ফেস রিকগনিশন সফটওয়্যারের বারবার ব্যর্থতা, সেই হোটেল রুমের দৃশ্য—সব মিলিয়ে লিওন যেন মানসিক অবসাদের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। তার মনে হচ্ছে, সে এক গোলকধাঁধায় বন্দি, যেখানে ভাইপার অদৃশ্য এক সুতোয় তাকে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে ল্যাবের টেবিল চাপড়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অফিসার রওশন তখন পাশে এসে বলল, “স্যার, আপনি একটু বিরতি নিন। আপনার ব্রেইন এখন জ্যাম হয়ে গেছে, কোনো কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না। একটু রিফ্রেশ হন, পরিবারকে সময় দিন।”

লিওন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। রওশনের কথাগুলো তার কানে বাজছে। সে বুঝতে পারল, এই অবস্থায় তদন্তে থাকলে সে উল্টো নিজের ক্ষতিই করবে। ভাইপারকে ধরার নেশায় সে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। একটু দম নেওয়া এখন খুব জরুরি।
অবশেষে লিওন তার ল্যাপটপটা বন্ধ করে ফেলল। কিছুটা দ্বিধা থাকলেও, নিজের মনের অস্থিরতা কাটাতে সে এক বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল— থাইল্যান্ডের টিকিট কেটে ফেলল সে। তার পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে তার সাথে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। ভাবল, কয়েকদিনের এই ফ্যামিলি ট্যুর হয়তো তাকে আবার নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে।
লন্ডনের সেই বিলাসবহুল হায়াস ম্যানশনের দোতলার রুমে সন্ধ্যাটা বেশ শান্ত। লিওন জানালার পাশে বসে বাইরের শহরের ব্যস্ততার দিকে তাকিয়ে ছিল। অফিস থেকে ফিরেও মাথায় ভাইপারের চিন্তা, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় মৃদু শব্দ হলো। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল মায়া, তার হাতে একটি ড্রয়িং প্যাড।
মায়া লাজুক হেসে বলল, “আমি জানি তুমি খুব ক্লান্ত লিও ভাইয়া, কিন্তু তোমার জন্য একটা ছোট সারপ্রাইজ আছে।”

লিওন চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। মায়া তার হাতে থাকা স্কেচবুকটি খুলল। বুকটার পাতায় লিওনের একটি পোট্রেইট আর্ট। এতটা নিখুঁত, এত জীবন্ত যে লিওনের চোখের সেই গভীরতা আর মুখের সূক্ষ্ম ভাবগুলো মায়া যেন তুলির আঁচড়ে প্রাণ পেয়েছে। লিওন অবাক হয়ে গেল। একজন মানুষের প্রতি কতটা ভালোবাসা আর মনোযোগ থাকলে এমন নিখুঁত ছবি আঁকা সম্ভব! মায়ার মুখের হাসি দেখে লিওনের চোখেও অদ্ভুত মায়া ফুটে উঠল। সে খুব আলতো করে মায়ার মাথায় হাত রাখলো, তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক বিরল, তৃপ্তির হাসি।
কিন্তু এই পুরো দৃশ্যটি অন্য এক প্রান্তে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখছিল হিয়া। ল্যাপটপের ক্যামেরায় যখন সে লিওনের সেই পরম আয়েশি, হাসিখুশি চেহারাটা দেখল, হিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আর ঠিক পরের মুহূর্তেই যখন তার চোখে পড়ল মায়ার আঁকা লিওনের পোর্ট্রেট আর লিওনের সেই নরম চাহনি— হিয়ার পুরো শরীর যেন রাগে জ্বলে উঠল।
হিয়ার হাতের মুঠো থেকে মাউসটা প্রায় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। সে বিড়বিড় করে উঠল, “মায়া… এইতো সেই মেয়ে?”
তার বুকের ভেতরটা হিংসার আগুনে পুড়ছে। হিয়া দেখছে, যে লিওন তাকে ভাবলেই ঘৃণায় চোখ কুঁচকে ফেলে, যে লিওন তাকে এক পশলা বাঁকা হাসির যোগ্যও মনে করে না, সেই লিওনের মুখে আজ মায়ার জন্য কত কোমলতা! সে তো কখনও হিয়ার কথা ভেবে এভাবে হাসেনি। হঠাৎ হিয়ার ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন ভালোবাসা বা কৌতূহল নেই, আছে আগ্নেয়গিরির মতো তেজ।

ভোরের প্রথম আলো যখন টাউনহাউসের জানালার পর্দা চিরে খোলা একটা ঘরের ভেতরে এসে পড়ছে, তখন ঘরটাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক দীর্ঘ যুদ্ধের রণাঙ্গন। আর সাথে এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে রঙ-তুলির সরঞ্জাম, যার প্রতিটি দাগে লেগে আছে গত রাতের সেই মানসিক ঝড়ের ছাপ। হিয়া সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে লিওনের ছবি আঁকার ব্যর্থ চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু প্রতিবারই তার তুলির টানে লিওনের সেই চোখের গভীরতা বা ঠোঁটের কোণের সেই পরিচিত ভঙ্গিটা ফুটে উঠছে না। হিয়া একজন ক্রিমিনাল সে নিখুঁতভাবে মানুষকে নিকেশ করতে পারে, এছাড়াও সে মাল্টি ট্যালেন্টেড , বাইক রেসিং,বক্সিং কি না পারে, কিন্তু লিওনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে আজ সে নিজেকে চূড়ান্ত অযোগ্য মনে করছে।
হিয়ার হাতের আঙুলগুলো কালিতে নীল হয়ে গেছে। পাশে রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিনে লিওনের ছবিটার দিকে সে অপলক তাকিয়ে আছে। লিওনের প্রতিটি রেখাকে সে কাগজে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল।
সেই সময় ইভানা রুমের ভেতরে ঢুকল। ঘরের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে সে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেল না, বরং দূরত্ব বজায় রেখেই শঙ্কা ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো, “মিস্ট্রেস, আপনি এসব কী করছেন? সারা রাত তো ঘুমাননি, নিজের ওপর এত অত্যাচার কেন করছেন?”
হিয়া নিথর হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, “মায়া… ওই মেয়েটা পারল, আর আমি পারছি না, ইভানা? ও লিওনের ছবি আঁকছে, আর আমি শুধু তার প্রতিচ্ছবিটা নষ্ট করে ফেলছি। আমার সহ্য হচ্ছে না। কেন আমি পারছি না? আর সেই ছবি দেখে লিওন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কেনো ওই মেয়েটা লিওনের কাছে এতো আপন?”

ইভানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল, “মিস্ট্রেস, শান্ত হন। মায়া অফিসার লিওনের কাজিন, ও ওই বাড়িতেই বড় হয়েছে, তাই তার ওপর অফিসার লিওনের অধিকারবোধটা সহজাত। এসব নিয়ে জেলাস হওয়া আপনার সাজে না। আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনি কে!”
হিয়া ধীরে ধীরে ঘুরে ইভানার দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে জল নেই, আছে এক গভীর বিষণ্ণতা আর শূন্যতা। সে ফিসফিস করে বলল, “জানিস ইভানা, আমি আজ একটা অদ্ভুত কথা ভাবছিলাম…
“লন্ডনের বাতাসটাও আমার চেয়ে অনেক বেশি ভাগ্যবান। এই বাতাসটা লিওনকে স্পর্শ করে যাচ্ছে, তাকে অগোচরে ছুঁয়ে দিচ্ছে,কিন্তু আমি ওকে চাইলেও ছুঁতে পারছিনা।”
হিয়া মেঝেতে পড়ে থাকা লিওনের একটি অসম্পূর্ণ স্কেচের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছে, মায়া শুধু একটি ছবি আঁকছে না, সে লিওনের হৃদয়ের এক একটা কোণ দখল করে নিচ্ছে। আর হিয়া? সে তো কেবল অন্ধকারের ছায়া হয়েই লিওনের চারপাশে ঘুরছে। প্রতিশোধের নেশা থাকা সত্ত্বেও, এই মুহূর্তে হিয়ার কাছে নিজের এই অক্ষমতাটাই সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইভানা এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারলো না। রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।ইভানার পায়ের শব্দ করিডোর দিয়ে মিলিয়ে যেতেই হিয়ার মুখমণ্ডলে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক হাসি। এতক্ষণ যে চোখে ছিল পরাজয়ের গ্লানি আর বিষণ্ণতা, এখন সেখানে খেলা করছে এক নিষ্ঠুর জয়ের নেশা। হিয়া মেঝেতে বসে থাকা অবস্থাতেই হাতের কাছে থাকা ধারালো ছু*রিটা তুলে নিল। তার দৃষ্টি তখন অস্থির, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই পরিচিত কুটিল হাসি।”

“মায়া…” হিয়া নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল, “তুমি রং-তুলি দিয়ে লিওনের ছবি এঁকেছো, বড্ড সাধারণ তোমার ভালোবাসা। কিন্তু আমার আসক্তি ভিন্ন। আমি ওর নাম লিখব কাগজের পাতায় নিজের রক্ত দিয়ে।”
হিয়া মুহূর্তের দ্বিধাহীনতায় ছুরিটা নিজের বাঁ হাতের কব্জিতে চালিয়ে দিল। কব্জি চিরে উজ্জ্বল লাল রক্ত টপ টপ করে ঝরে পড়ছে মেঝেতে। ব্যথার কোনো বিকার নেই তার চোখে-মুখে, বরং এক ঘোরের মধ্যে সেই উষ্ণ রক্তে আঙুল ডুবিয়ে হিয়া সাদা আর্ট পেপারের ওপর লিখতে শুরু করল।
হিয়ার প্রতিটি অক্ষরের ভেতর দিয়ে তার অভিশপ্ত ভালোবাসা আর অন্ধ আক্রোশ বেরিয়ে এল। রক্তে রাঙানো সেই কাগজের পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা ফুটে উঠল—”লিওন শুধুমাত্র আমার।”
রক্তমাখা কাগজটির দিকে তাকিয়ে হিয়ার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক বিকৃত তৃপ্তির হাসি। লিওনের প্রতি তার এই ভালোবাসা কোনো কোমল অনুভূতি নয়, বরং এক মারণব্যাধি আসক্তি। সে জানে,মায়ার আঁকা ওই ছবি হয়তো লিওনকে কেবল মুগ্ধ করবে, কিন্তু হিয়ার এই রক্তক্ষয়ী ঘোষণা তার অস্তিত্বের গভীরে এক গভীর ক্ষত হয়ে খোদাই হয়ে থাকবে।

দুপুরের কড়া রোদ জানালার কাঁচ চুইয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। ইভানা ঘরে ঢুকল, তার চেহারায় স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। হিয়ার কবজিতে তখনো সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো, আর সেই রক্তমাখা কাগজটি সে অতি সাবধানে ড্রয়ারের গোপন কুঠুরিতে রেখেছে।

ইভানা সরাসরি মূল কথায় এল, “মিস্ট্রেস, একটা খবর পেয়েছি। আপনি আমাকে ওই অফিসারের ওপর বিশেষ নজর রাখতে বলেছিলেন। খবর এসেছে, সে আগামীকাল পরিবার নিয়ে থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে। টিকিট কনফার্ম, থাইল্যান্ডের কোনো এক প্রাইভেট আইল্যান্ডে তারা ঘুরতে যাচ্ছে।”
হিয়া স্থির দৃষ্টিতে ইভানার দিকে তাকাল। তার চাহনিতে এখন হাড়কাঁপানো শীতলতা।
“থাইল্যান্ড?” হিয়া বিড়বিড় করে উঠল। তার ভেতরটা রাগে দাউদাউ করে জ্বলছে। সে স্থির স্বরে বলল, “লন্ডন থেকে থাইল্যান্ডের দূরত্ব প্রায় ছয় হাজার মাইল। ইভানা, আমার থেকে আমার লিওন এতখানি দূরে সরে যাবে? ও কী ভেবেছে, মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে আমার দৃষ্টির আড়ালে গেলেই ও শান্তিতে থাকবে? এক মুহূর্ত ওকে না দেখে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব ইভানা।”
ইভানা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “থাইল্যান্ডের ওই এলাকাটা অনেক বেশি সুরক্ষিত, মিস্ট্রেস। সেখানে অফিসার লিওনের গার্ডদের নজরদারি আরও বেশি থাকবে। আমাদের পক্ষে সেখানে তাকে ট্র্যাক করা অনেক কঠিন হবে।”

হিয়ার ছায়া ইভানার ওপর গিয়ে পড়ল। সে ইভানার একদম কাছে এসে বরফের মতো জমাট বাঁধা কন্ঠস্বরে ফিসফিস করে বলল, “ইভানা, নিরাপত্তা দেয়াল দিয়ে ঘেরা যায়, কিন্তু ভাগ্যকে নয়। লিওন আমার কাছেই সুরক্ষিত থাকবে সবচেয়ে।”
হিয়া ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে থাইল্যান্ডের সেই নির্জন আইল্যান্ডটির ছবি ভেসে উঠছে। তার চোখে এক ঘোরলাগা আবেশ, শিকারি পশুর মতোই স্থির। ইভানা পাশে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে জানতে চাইল, “মিস্ট্রেস, আপনার চোখের এই চাহনি… এটা কি কেবলই তাকে কাছে পাওয়ার নেশা, নাকি এর পেছনে অন্য কিছু আছে?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। সে নিপুণ দক্ষতায় ল্যাপটপে থাইল্যান্ডগামী ফ্লাইটের দুটো টিকিট বুক করে ফেলল। এরপর স্ক্রিনটা ইভানার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আমার জিনিস পত্র গুছিয়ে রাখবি আজকের মধ্যে।”
ইভানা হতবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এল অস্ফুট বিস্ময়, “তারমানে আপনিও ওখানে যাচ্ছেন?”

হিয়া জানালার বাইরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় কুটিল হাসি হাসল। শীতল স্বরে সে বলল, “শুধু আমি নই ইভাষা, আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তুইও যাচ্ছিস।”
হিয়া ইভানার দিকে না তাকিয়েই দেয়ালের প্রজেক্টের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা লিওনের ছবির ওপর আঙুল বুলাল। তার স্পর্শ আলতো, কিন্তু দৃষ্টিতে এক ভয়াবহ নেশা। তার কণ্ঠস্বর মখমলের মতো মসৃণ, অথচ তাতে মিশে আছে এক শীতল উন্মাদনা। “আমার এই শূন্যতা কি কখনো পূরণ হওয়ার? লিওন আমার এমন এক নেশা, যা থেকে আমি মুক্ত হতে চাই না। সে পৃথিবীর যেখানেই থাকুক না কেন, আমাকে সেখানেই থাকতে হবে।ও আমার অক্সিজেনের মতোই, এক মুহূর্তের জন্যও ওকে আমার চোখের আড়াল করা চলবে না। প্রতি মুহূর্তে, প্রতি সেকেন্ডে ওকে আমার নজরে থাকতেই হবে।”
পরদিন সকাল। থাইল্যান্ডের ফ্লাইটের আগে লিওনের বাড়ির পরিবেশটা বেশ জমজমাট। লিওন তার লাগেজে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখছে। তার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি—এই ট্যুরটা তার দরকার ছিল। কিন্তু লাগেজের এক কোণে রাখা ফাইলগুলো এখনো তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সে আসলে একটা গোলকধাঁধায় বন্দি।

পাশের ঘরে মায়ার ব্যস্ততা দেখার মতো। তার ড্রয়ারে সাজানো দামী পারফিউম, মেকআপ কিট আর সেই বিশেষ পোশাকগুলো যা সে থাইল্যান্ডের সমুদ্র সৈকতের জন্য আলাদা করে কিনেছে। মায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। সে জানে লিওন তাকে সব সময় ‘ছোট্ট মায়া’ বা বাচ্চার মতো আদর করে, কিন্তু এবার মায়া আর সেই ‘বাচ্চা’ হয়ে থাকতে চায় না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “লিও ভাইয়া, তুমি আমাকে এখনো ওই ছোট মায়া ভাবো। কিন্তু এবার থাইল্যান্ডের নীল জলরাশির নিচে, চাঁদের আলোয় আমি তোমাকে দেখাব, তোমার এই বাচ্চা ভাবা মায়া আসলে কতটা পরিণত নারী হতে পারে।”

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৭

মায়া নিজের পরিধেয় পোশাকটির ওপর একবার চোখ বুলাল। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক আত্মবিশ্বাসী হাসির রেখা। সে ঠিক করে ফেলেছে, এবার লিওনের সামনে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করবে, যা লিওনের চোখের সেই জমে থাকা শীতলতাটুকু তার নিজের উষ্ণতায় গলিয়ে দেবে, তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে এক নতুন মোহে।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here