ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৩
নওরিন কবির তিশা
রাগে ক্ষোভে রীতিমতো ফুঁসে চলেছে তিয়াশা। প্রবল নিদ্রাকর্ষণে ভারী হয়ে আসা চোখের মনির পার্শ্ববর্তী শ্বেতশুভ্র অংশটা মুহূর্তেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। এদিকে ওর এই রাগটাকেই পরম তৃপ্তিতে উপভোগ করছে বিছানার প্রান্তে বসে থাকা আরাভ। ওষ্টাধর কোনে এক চিলতে বক্র হাসির রেখা যেন অমলিন ওর।
তিয়াশার ক্ষোভ ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্বিগুণ হারে।ও দুই হাত কোমরে অনড় রেখে, চোখের মণি জোড়া বিস্ময়ে ও ক্রোধে বড় বড় করে বিছানা আগলে বসে থাকা আরাভের দিকে চাইল; তারপর আকুল কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
— কী শুরু করেছেন আপনি হ্যাঁ? ফাজলামো নাকি? বিছানা দখল করে সংয়ের মতো বসে আছেন কেন? নামুন বলছি, আমি ঘুমাব!
এদিকে তিয়াশার এত চেঁচামেচিও যেন কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না আরাভের। ও পিঠের নিচে একখানা কুশন আর বক্ষের উপর আরেকখানে কুশন রেখে বিছানায় বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে বসে আছে। তিয়াশা থামতেই ও শীতল কন্ঠে বলল,,
— দেখো তিয়াশা, রিল্যাক্স! রাত সাড়ে বারোটা বাজে। এখন যদি তুমি ওই টিপিক্যাল বাংলা সিরিয়ালের বউদের মতো ডায়লগ দাও যে, আমাকে ছোঁবেন না, আপনি নিচে ঘুমান, আমি সোফায় যাব। তাহলে কিন্তু ওসব নাটক আমি একদমই টলারেট করব না। লিগ্যালি বিয়ে যখন করেছি, তখন একই বিছানায় শান্তিতে ঘুমিয়ে যাও, ড্রামা কোরো না।
রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে হিতাহিত জ্ঞান শূন্যতায় তিয়াশা এক কদম এগিয়ে এসে বলল,
— নাটক আমি করছি, নাকি আপনি করছেন? আপনার মতো একটা ক্যারেক্টারলেস লোকের সাথে আমি একই বিছানায় ঘুমাব? কক্ষনও না!
আরাভ ঈষৎ বক্র হাস্যে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তিয়াশার বেশ কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে নিরাসক্ত দৃষ্টি ওর দৃষ্টিতে নিবদ্ধ করে বলল,,
— শোনো সুইটহার্ট, বিয়ে যখন করেছি, তখন বউয়ের বুকেই ঘুমাব,এটাই ফাইনাল! নিজের রাইট আদায় করতে আরাভ খান কাউকে পরোয়া করে না।
আরাভের এমন চরম একতরফা ও আধিপত্যশীল কথায় তিয়াশার সর্বাঙ্গে এক অস্থির ক্রোধান্বিত কম্পন শুরু হলো,ও ঠোঁটটা ইঞ্চি কয়েক বাঁকিয়ে বলল,,
— আপনার রাইটের কাঁথায় আগুন।
পরপর ও ক্ষিপ্ত কদমে যেই না এক পা পিছিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হলো, অমনি আরাভ চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় ওর হাতটা ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল।
ঘটনার আকস্মিকতায় ভারসাম্য হারালো তিয়াশা। ছিটকে সরাসরি এসে পড়ল আরাভের চওড়া, শক্ত বক্ষদেশ বরাবর। দুজনেই তাল সামলাতে না পেরে বিছানায় অর্ধশায়িত হলো। তবে আকস্মিকতা গ্রাস করেনি আরাভকে বরং স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হয়েছে যেন। তাই সুযোগটা সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিয়ে ও একখানা মজবুত হাত তিয়াশার কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের সাথে একদম বন্দি করে ফেলল।
তিয়াশার অবিন্যস্ত চুলের কিছু অংশ আরাভের মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়তেই সে এক গভীর শ্বাস নিয়ে চোখ বুজল। তিয়াশা তীব্র অস্বস্তি আর আতঙ্কে ওর বুক থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতে বলল,
— ছাড়ুন! ছাড়ুন আমাকে! আপনার এই নোংরা জোর-জবরদস্তি আমি একদম সহ্য করব না, আরাভ!
আরাভ ওর কোনো কথাই কানে তুলল না; বরং নিজের বাহুবন্ধন আরও কিছুটা শক্ত করে তিয়াশার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল,,
— চুপচাপ শুয়ে থাকো বউ। যত বেশি ছটফট করবে, নিজের জন্য তত বেশি বিপদ ডেকে আনবে। জাস্ট ফিল মাই হার্টবিট, এটা এখন শুধু তোমার জন্যই চলে।
জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের এতটা সান্নিধ্য সঙ্গে আরাভের সেই গভীর, মায়াবী ও রোমাঞ্চকর কণ্ঠস্বরের তীব্রতায় তিয়াশা ক্ষণিকের জন্য যেন একদম জমে গেল; স্তব্ধ হয়ে গেল ওর ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ। তবে পরক্ষণেই সে নিজের অবশ ভাবটা কাটিয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
আরাভ এক হাত বাড়িয়ে কোনোমতে বেডসাইড টেবিলের ল্যাম্পের সুইচটা নিভিয়ে দিয়ে পুরো কক্ষটাকে ঘুটঘুটে আঁধারে ডুবিয়ে দিল। তবে তাতেও বিন্দু পরিমাণে ও দমলো না তিয়াশা। পূর্বের ন্যায় সর্বশক্তিতে নিজেকে ছাড়ানোর প্রয়াসে চিৎকার করে ও বলল,,
— এর পরিণতি ভালো হবে না কিন্তু! সময় আছে এক্ষুনি ছেড়ে দিন আমায়।
— ট্রাস্ট মি সুইটহার্ট, এখন যদি তুমি আরো বেশি নাড়াচাড়া করো তাহলে পরিনীতি এতটা ভালোর দিকে গড়াবে যে বিয়ের এক সপ্তাহ পেরোতে না পেরোতেই তোমার বাবা নানা আর আমার বাবা দাদা হওয়ার সুসংবাদ পাবে। বেশি নড়াচড়া না করে সোনা বউয়ের মত ঘুমিয়ে যাও তো। উম্মাহ জানেমান।
কথার ঠিক সমাপ্তি লগ্নে মুখ দিয়ে এমন বাজে শব্দের প্রেক্ষিতে নিশ্চল হয়ে পড়লো তিয়াশা। আর কোনো কথা নয় এই ছেলেকে বিশ্বাস নেই! এখন তো শুধু শব্দ করেছে কখন যে এটাকে বাস্তবে রূপান্তর করে ফেলে! রাগে-ঘৃণায় সর্বাঙ্গ রি-রি করে উঠলেও নিশ্চুপ হয়ে ঘাপটি মেরে পড়ে রইল তিয়াশা।
রজনীর নিস্তব্ধতা যত ঘনীভূত হয় দুঃখী হৃদয়ের দুঃখগুলো ততটা বৃদ্ধি পায়। জানালার গ্রিল ধরে দূর অন্তরীক্ষের পানে চেয়ে চোখের জল ফেলছিল আনু। রণধীর আর ক্ষমতার সেই চিরন্তন লড়াইয়ের মাঝে আনু এক ছিটকে পড়া ধূলিকণা। বাবার অবহেলার কারণে ওকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল সৎ মায়ের বাড়ির এক অন্ধকার কোণে। আর সেই চরম একাকীত্বের দিনগুলোতেই অবচেতন মনে ওর জীবনে এক চিলতে রোদ্দুর হয়ে এসেছিল আরাভ।
উগ্র, বেপরোয়া আর খামখেয়ালি আরাভের ভেতরের লুকিয়ে থাকা এক নরম রূপকে কেবল আনুই দেখতে পেয়েছিল। নাহ নায়ক হিসেবে কখনোই নয় তবে খলনায়ক হিসেবেই কখন যে দেখার মাঝে ওর অবচেতন মন আরাভকে নিজের করে ভালোবেসে ফেলেছিল, তা আনু নিজেও টের পায়নি। ও ভালো করেই জানত, এই একতরফা ভালোবাসার পরিণতি কেবলই শূন্যতা।
আরাভ কখনো ওর হবে না, এই চিরন্তন সত্যটা জানা সত্ত্বেও যখন ও শুনল আরাভ অন্য একটা মেয়েকে জোর করে বিয়ে করে ঘরে তুলেছে, তখন ওর বুকটা যেন এক লহমায় দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে গেল। ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারো বাহুবন্ধনে চিন্তা করার চেয়ে বড় কোনো নরকযন্ত্রণা বোধহয় এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। একতরফা প্রেমের এই তীব্র দহন বুকে চেপে আনু শুধু ফিসফিসিয়ে বলল,,
— কেন এমন করলেন আরাভ ভাই? ভালো তো আমাকেও বাসতে পারতেন। আমি না হয় একটু অবহেলা নিয়েই আপনার সঙ্গে সারা জীবন কাটিয়ে দিতাম।
প্রভাতে রৌদ্র রশ্মির আগমন ঘটে পারে না তার আগেই শুরু হয় যান্ত্রিক জীবনের। এমনিতেই দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষীদের কাজের চাপ ব্যাপক আর সেটা যদি হয় কর্তব্যরত কোনো পুলিশ সদস্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্ত তাহলে তো কথাই নেই। তেমনই এক ব্যতিব্যস্ত প্রভাতের আগমন ঘটেছে রুদ্রদ্বীপের জীবনে।
সকাল সকাল কোনমতে গোসলটা সেরে সদ্য পেশাদারী বসনে নিজেকে আবৃত করেছে ও। দীঘল আতশীতে চেয়ে জলসিক্ত কেশগুচ্ছ কোনোমতে চিরুনি চালনা করে বিন্যস্ত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে বেশ ধীর পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করলো কেউ একজন। প্রথম প্রথম ততটা গুরুত্ব না দিলেও হঠাৎ পিছনে করো অবস্থান অনুভূত হতেই মস্তিষ্ক সচল হলো রুদ্রর। তৎক্ষণাৎ পশ্চাতে চাইলো ও।
বেশ জড়সড় ভঙ্গিতে সেথায় দাঁড়িয়ে ছিল নয়নিকা। রুদ্রর ফুপাতো বোন। তবে নয়নিকাকে দেখে বড্ড অবাক হলো রুদ্রর। ফুপুর বাসা কাছে হলেও তাদের আগমন ঘটে কালেভদ্রে। বিষ্ময়টুকু অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে সৌজন্যমূলক হেসে রুদ্র বলল,,
— নয়ন, তুই?
নয়নিকা সবে সালাম দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বরাবরের ন্যায় রুদ্র নয়ন সম্বোধনে কিঞ্চিত ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো ও,,
— আহ রুদ্র ভাই! আপনি আমাকে নয়ন কেন বলেন?
একরাশ দুশ্চিন্তার মাঝেও ঈষৎ হাসলো রুদ্র,,— কেন? পছন্দ হয় না?
নয়নিকা স্বভাবসুলভ গাল ফুলিয়ে বলল,,— একদম না। ওটা তো ছেলেদের নাম।
— তোর ফোলানো স্বভাবটা গেল না?
— আমি কি ইচ্ছাকৃত গাল ফোলাই নাকি? তোমরাই তো বাধ্য করো।
রুদ্র হাসলো ফের। চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে পুনর্বার ঘুরলো নয়নিকার দিকে,
— কখন এসেছিস? আর কিছু বলবি?
— এইতো একটু আগে আসলাম। না এমনি আপনাকে দেখতে এলাম অনেকদিন।
— আচ্ছা থাক তাহলে। আমাকে ডিউটিতে যেতে হবে।
নয়নিকা মৃদু হেসে মাথা ঝাকালো,— যান।
রুদ্র কক্ষ ছেড়ে বেরোতে এই পিছু পিছু বের হলো নয়নিকা। আকস্মিক পিছু ডেকে বলল,,
— রুদ্র ভাই শুনুন?
পিছু ডাকে হয়তো কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো রুদ্র। তবুও বিরক্তিভাব প্রকাশ না করে বলল,,
— হ্যাঁ,বল?
— কখন আসবেন?
— জানা নেই। একটা ভীষণ সিরিয়াস কেস হ্যান্ডেল করছি। ফিরতে অনেক রাত হবে।
রুদ্র বেরিয়ে গেল। নয়নিকা মৃদু হাসির রেখা ওষ্টাধর প্রান্তে ঝুলিয়েই আনমনে বলল,,
— অপেক্ষা করবো, মি. সিরিয়াস। তবে দ্রুত ফিরবেন, ছোট্ট মনটা আর বেশি কষ্ট পেতে চাচ্ছে না আমার। ইস এই লোকটাকে বিয়ে করলে তো আমি কখনো কাছেই পাব না! সারাক্ষণ শুধু এ কেস, সে কেস করতে করতেই তো উনার দিন চলে যাবে!
পরক্ষণেই জিভ কাটলো নয়নিকা। ছিঃ! কি সব ভাবছিল ও! নিজের মাথায় নিজেই গাট্টা মেরে বলল,
— তুই আসলেও দিন দিন ছাগল হচ্ছিস নয়নিকা!
— ড্যু ইয়্যু লাইক তিয়াশা, রুদ্র?
তাহের চৌধুরীর সরাসরি এহেন প্রশ্নে প্রচণ্ড অপ্রস্তুত হয়ে উঠল রুদ্রদ্বীপ। ক্ষণিকের জন্য ওর পেশাদারী চটপটে ভাবটা যেন উধাও হয়ে গেল। এমন একজন বিচক্ষণ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মুখ থেকে এ জাতীয় ব্যক্তিগত প্রশ্ন ও এই মুহূর্তে একদমই আশা করেনি। তবে সামনে বসা মানুষটার মুখের দিকে তাকাতেই রুদ্রর ভেতরের অস্বস্তিটা এক লহমায় কেটে গেল। পিতৃত্বের চরম অসহায়ত্বেই যে উনি সমস্ত ম্যানার্স গুলে খেয়েছেন তা ওনার অবয়বের স্পষ্ট।
রুদ্রর নীরবতা দেখে তাহের চৌধুরী ওনার টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটার ওপর হাত রেখে আকুল কণ্ঠে আবার বললেন,,
— উত্তর দাও রুদ্র। ড্যু ইয়্যু লাইক হার?
রুদ্রদ্বীপ একটা গভীর শ্বাস নিয়ে অত্যন্ত সংযত ও স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,,
— স্যার, আমি তিয়াশাকে আমার সর্বোচ্চ দিয়ে সম্মান করি। একজন ডিউটি অফিসার হিসেবে তো অবশ্যই, ব্যক্তিগতভাবেও ওর এই পরিণতির জন্য আমার ভেতরের অপরাধবোধ কাজ করছে। কিন্তু এখন এই পরিস্থিতিতে আমার কোনো ব্যক্তিগত ভালোলাগা বা মন্দলাগা প্রকাশ করাটা বড্ড অযৌক্তিক, স্যার।
তাহের চৌধুরী ওনার দুই হাতের তালুতে মুখটা ঢেকে এক প্রকার ভেঙে পড়ার ভঙ্গিতে বললেন,,
— আমি এখন ডিআইজি হিসেবে কথা বলছি না বাবা, আমি তিয়াশার বাবা হিসেবে বলছি। দেখো, ওই কুলাঙ্গারটা আমার শান্ত মেয়েটার জীবনটা এক রাতে কীভাবে তছনছ করে দিল! একটা মিথ্যে আর জবরদস্তির বিয়ে দিয়ে ও পুরো সমাজ আর আইনের মুখ বন্ধ করে রেখেছে। এখন আমার মেয়েটার কী হবে? ও যদি ওই নরকে থাকে, তবে প্রতিটা মুহূর্ত ম*রে ম*রে বাঁচবে। আর ওখান থেকে যদি ও চলেও আসে, এই সমাজ কি ওকে শান্তিতে বাঁচতে দেবে? একটা ডিভোর্সী বা স্ক্যান্ডালের দাগ নিয়ে আমার মেয়েটা আজীবন অসুখী থেকে যাবে বাবা! আমি এই জ্বালা কীভাবে সহ্য করব?
বাবার এই তীব্র আকুতি রুদ্রর বুকে তীরের মতো বিঁধল। ও এক কদম এগিয়ে এসে তাহের চৌধুরীর কাঁধে শক্ত করে হাত রাখল, অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,
— স্যার, আপনি কোনো সমাজ বা দাগের কথা ভাববেন না। সমাজ আঙুল তোলার আগেই আমি ওই আরাভ খানের হাত ভেঙে দেব। তিয়াশা যদি কোনোদিন ওই নরক থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসে, তবে ওর সমস্ত দায়িত্ব, ওর সম্মানের দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিতে এক সেকেন্ডও ভাবব না। আই প্রমিস ইউ, স্যার।
— আবেগের তাড়নায় বিবেক যারা বিসর্জন দেয় তাদের কি বলা হয় জানেন?
তিয়াশার প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে ওর দিকে শুধু ফিরে চাইল আরাভ।তিয়াশা আয়নায় আরাভের প্রতিচ্ছবিতে চেয়েই তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলতে শুরু করল,,
— অপরিণত মেয়েরা। সহজ ভাষায় বললে ইদানিং নিব্বি শব্দটা ব্যবহার করা হয়! শব্দটা বাজে তবে প্রতিশব্দ হিসেবে ইংরেজিতে ইম’ম্যাচিউর বললে একটু মর্ডান লাগে এই যা!
তিয়াশার কথার হেতু খুঁজে পেল না আরাভ। পাগলের প্রলাপের ন্যায় ঠাওর হলো ওর কাছে। সকাল সকাল এ কোন ধরনের কথাবার্তা? কৌতূহল অবদমনে ব্যর্থ হয়ে আরাভ প্রশ্নটা করেই বসলো,,
— হঠাৎ এ কথা কেন?
— কারণ যেটাকে আপনারা বলেন ভিলেনগিরী। ওটা কোনো স্বাভাবিক সুস্থ ম্যাচিওর মেয়ের পক্ষে পছন্দ করা সম্ভব নয়। কজ একটা ম্যাচিওর সুস্থ বিবেকবান মেয়ে কখনোই চাইবে না তার হাসবেন্ড ভিলেন হোক, ভিলেন কল্পনাতে সুন্দর বাস্তবতায় নয়। বাস্তবে প্রত্যেকটা নারী জীবনে হিরো চায়।
আরাভ হাসলো ঈষৎ,,
— কল্পনায় যে মেয়ে ভিলেনকে নিজের সঙ্গে জড়াতে পারে সে বাস্তবতায় হিরো চায়? কেন?
— কারণ বাস্তবতা আর কল্পনার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
— তবে ইতিহাসে বরাবর ভিলেনেরই জয় হয়েছে। হিরো তো শুধু পারে সমাজের ভয়ে,কলঙ্কিত কালীর দাগের ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ভালোবাসাকে ছেড়ে দিতে-ত্যাগ করতে। একমাত্র ভিলেন-ই পারে সমগ্র পৃথিবীকে উপেক্ষা করে কলঙ্কের কালি নিজের হাতে মুছে ভালবাসাকে আপন করতে। এজন্য ভালোবাসাকে নিজের করে নিতে ভিলেন হওয়া প্রয়োজন। হিরোগিরি দিয়ে ভালোবাসাকে আপন করা যায় না।
— ভুল বলছেন, মিস্টার আরাভ খান! ভিলেনরা পৃথিবীকে উপেক্ষা করে ভালোবাসাকে আপন করে না, বরং নিজের জেদ আর অহংকারকে জেতাতে একটা মেয়ের জীবনকে ছারখার করে। ওটা ভালোবাসা নয়, ওটা এক ধরনের মানসিক ব্যাধি। আপনি যেটাকে ত্যাগ বলছেন, একজন হিরোর কাছে ওটাই হলো ভালোবাসার মানুষের সম্মানের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা। একটা সুস্থ মেয়ে কখনোই এই আদিম উগ্রতা পছন্দ করতে পারে না।
আরাভ এবার তিয়াশার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,,
— শ্রদ্ধা দিয়ে পেটের ভাত জোটে না, সুইটহার্ট! আর সম্মান? এই দুনিয়াটা ক্ষমতার পেছনে ঘোরে। যে হিরো নিজের ভালোবাসাকে সমাজের ভয়ে রক্ষা করতে পারে না, তার ওই জেন্টলম্যানগিরির কোনো মূল্য নেই। দিনশেষে মানুষ তাকেই মনে রাখে, যে নিজের জিনিস ছিনিয়ে নিতে জানে। আমি ভিলেন হতে রাজি আছি, যদি সেই ভিলেনগিরি তোমাকে আমার পাশে এনে দাঁড় করায়।
— ছিনিয়ে আনা আর আপন করে নেওয়ার মধ্যে মস্ত বড় তফাত আছে। আপনি জোর করে কাবিননামায় সই নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তিয়াশা চৌধুরীর মনটাকে ছোঁয়ার ক্ষমতা আপনার এই গুন্ডামির নেই। আপনি আজীবন আমার চোখে একজন সস্তা অপরাধীই থেকে যাবেন।
আরাভ তিয়াশার এই সটান জবাবে এতটুকুও দমল না। ও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্রুর হাসি ফুটিয়ে তিয়াশার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এল। ওর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু-গভীর গলায় শুধাল,,,
— সুইটহার্ট? তুমিও কি তবে এমন কোনো জেন্টলম্যান আশা করেছিলে?
তিয়াশা কোনো উত্তর দিল না। শক্ত মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। ওর এই মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরা দিলো। আরাভ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ঘড়ির স্ট্র্যাপটা ঠিক করতে করতে গম্ভীর কন্ঠে বলল,,
— ওকে, ফাইন! আমি তোমাকে ফুল স্পিডে জেন্টলম্যান হয়ে দেখাব। তুমি যেমন ভদ্রতা পছন্দ করো, আমি ঠিক তেমনটাই হব। তবে একটা কথা মাথায় রেখো,তোমাকে ভালোবাসা কিংবা নিজের করে আগলে রাখার ক্ষেত্রে, এই আরাভ খান আজীবন ওই অবাধ্য ভিলেনই থাকবে। সেখানে কোনো জেন্টলম্যানগিরি চলবে না।
কথাটা বলেই আরাভ দরজার দিকে দু-পা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। ও হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেশ স্বাভাবিক ও ফুরফুরে মেজাজে বলল:
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১২
— অনেক ফিলোসফি ঝাড়া হয়েছে, এবার জলদি রেডি হয়ে নাও। আজকে তো তোমার কলেজ আছে। আমার গাড়িতেই যাবা, সো নো লেট!
বলেই আরাভ আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তিয়াশা চিরুনি হাতে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই পুরুষটার রূপ যে কত দ্রুত বদলায়, তা ভেবে ও কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পেল না।
