ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৫
নওরিন কবির তিশা
স্মৃতির পাতাকে আন্দোলিত করে তরতরিয়ে বেড়ে চলেছে সময়ের কাঁটা। দিনপঞ্জিকার ধূলিধূসরিত পাতা হতে খসে পড়েছে প্রায় একটি সপ্তাহ। বাবার স্নেহচ্ছায়া — মায়ের শাসনমিশ্রিত আকুল কণ্ঠস্বর শ্রবণ হয় না কতকাল! ভাবতেই বুকের গহীনটা এক নিদারুণ যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে ওঠে তিয়াশার। নয়নকোণ ফেটে বেরিয়ে আসতে চায় নোনা জলের অবাধ্য শ্রাবণধারা। তবুও প্রবল আত্মসংবরণে নিজেকে শক্ত ও অটল রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় লিপ্ত থাকে ও।
এদিকে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে মস্ত বড় এক ব্যস্ততার আবর্তে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে আরাভ। ফলশ্রুতিতে, বিগত কয়েকদিন যাবৎ তিয়াশার সম্মুখে ওর আগমন ঘটছে যৎসামান্য। ওর এই অনুপস্থিতি তিয়াশার বন্দিজীবনে একপ্রকার স্বস্তির নিঃশ্বাস বয়ে এনেছে। তবে এই আপাত শান্ত আবহাওয়ার মাঝেই ঘটে গিয়েছে এক রুদ্ধশ্বাস কাণ্ড।
গত পরশু আদ্রিতার মাধ্যমে রুদ্রদ্বীপ ওর নিকট একখানা অতি গোপনীয় বার্তা পাঠিয়েছে। একান্তে তারা দেখা করতে চায় তিয়াশার সঙ্গে। তারা বলতে রুদ্র আর তাহের চৌধুরী। এই অমোঘ বার্তা প্রাপ্তির পর থেকেই তিয়াশার চিত্তাকাশে এক চরম উশখুশ ভাব আর অস্থিরতার দহন শুরু হয়েছে। যেকোনো মূল্যে আজ ওকে বাইরে পা রাখতেই হবে।
দুর্ভাগ্যবশত, আজ মধ্যাহ্ন পেরিয়ে গেলেও আরাভ বাড়ির বাইরে যায়নি। ও বিছানার এক প্রান্তে অর্ধশায়িত অবস্থায় অলস ভঙ্গিতে নিজের সেলফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে আছে। কক্ষের মাঝে তিয়াশার এই অনিয়ন্ত্রিত পায়চারি আর চঞ্চলতা ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারল না। আরাভ ফোন থেকে চোখ না তুলেই আচমকা অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে শুধাল,,
— হোয়াট হ্যাপেন্ড, সুইটহার্ট? আজকে তোমাকে এতটা রেস্টলেস লাগছে কেন? এনি প্রবলেম?
তিয়াশা চকিতে থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতরের ধকধকানিটা লুকিয়ে কোনোমতে অবয়বে এক কৃত্রিম স্বাভাবিকতা ফুটিয়ে বলল,,
— কিছু না। আই অ্যাম ফাইন।
বলেই ও পুনরায় জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরও কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর, আরাভ যখন পুনরায় গভীর মনোযোগে স্ক্রল করায় ব্যস্ত, তখন তিয়াশা এক বুক সাহস সঞ্চয় করে আকস্মিক বলে উঠল,,
— আমার না,একটু বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।
কথাটা শোনামাত্রই আরাভের হাতের আঙুল স্তব্ধ হয়ে গেল। ও ফোনটা বুকের ওপর নামিয়ে রেখে, দৃষ্টিদ্বয় সংকীর্ণ করে অত্যন্ত সন্দিহান নেত্রে তিয়াশার পানে চাইল। ওর সেই অন্তর্ভেদী চাউনিতে তিয়াশার মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল মুহুর্তেই। আরাভ শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো,,
— বাইরে? হোয়ার?
তিয়াশা সামান্য তোতলামি সামলে নিয়ে বলল,,
— আ-আদ্রিতার বাসায় যাব। অ্যান্ড ইট’স আর্জেন্ট।
— হঠাৎ আদ্রিতার বাসা? কেন?
— গতকাল আমি কলেজে যেতে পারিনি। কিছু ইম্পর্ট্যান্ট লেকচার নোটস বাকি পড়ে আছে, ওগুলো আজ ওর কাছ থেকে কালেক্ট করতে হবে। কালই আমার ক্লাস টেস্ট।
আরাভ এবার শয্যা ত্যাগ করে ধীর চরণে উঠে দাঁড়াল। তিয়াশার খুব কাছে এসে লোকায়িত চাতুরী খোঁজার প্রচেষ্টা ওর চোখের মণি দুটো ভালো করে পরখ করে দেখলো। অতঃপর পকেটে হাত গুঁজে বাঁকা হেসে বলল,,
— নোটস নেওয়ার জন্য বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কী দরকার, বউ? তুমি বরং ওকেই কল করো। আরাভ খানের গাড়িতে করে আদ্রিতাকে এখানে নিয়ে আসা হবে। জাস্ট স্টে হোম।
তিয়াশা মনে মনে প্রমাদ গুনল। ও দমে না গিয়ে কণ্ঠস্বরে চরম বিরক্তি এনে ওষ্ঠাধর বাঁকিয়ে বলল,,
— সবকিছুতে আপনার এই ওভার-পজেসিভনেস আর সন্দেহবাতিকতা বন্ধ করবেন, মিস্টার আরাভ খান? আদ্রিতার ফ্যামিলি আছে, ও চাইলেই যখন-তখন আমার এই বন্দিশালায় ছুটে আসতে পারে না। আর আমি তো আপনার ওই দশটা প্রহরী বেষ্টিত খাঁচাতেই থাকব, তবে এত ভয় কিসের? নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের বীরত্ব কেবল এই ঘরের চার দেওয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ?
তিয়াশার এই তীব্র খোঁচায় আরাভের চোয়াল মুহূর্তেই শক্ত হয়ে উঠল। ও এক পলক জানালার বাইরে চেয়ে তিয়াশার দিকে ফিরে অত্যন্ত রাশভারী গলায় বলল,,
— ওকে, স্টপ ইট! আরাভ খান কাউকে ভয় পায় না, তিয়াশা। জাস্ট গো অ্যান্ড গেট রেডি। আই উইল ড্রপ ইউ দিয়ার।
কথাটা শেষ করেই আরাভ নিজের জ্যাকেটটা টেনে নিয়ে দ্রুত পায়ে কক্ষ ত্যাগ করল। তিয়াশা এক দীর্ঘ তপ্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করে নিজের ওড়নাটা খানিক টেনে নিল। এক অজানা আশঙ্কায় দুরুদুরু কাঁপছে বুক,গলা শুকিয়ে কাঠ! তবে পরক্ষনেই এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে একবুক সাহসের সঞ্চয় করে এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের উদ্দেশ্য।
অপরাহ্নের তাম্রাভ রৌদ্রালোকের উজ্জ্বলতা আরও কিঞ্চিৎ ম্লান হয়ে এসেছে। সদর দরজার অগ্রভাগে পা রাখতেই তিয়াশার চোখের মণি জোড়া বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। একখানা কুচকুচে কালো রঙের স্পোর্টস বাইক নিয়ে অত্যন্ত আয়েশী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে আরাভ। পরনে ওর কালো লেদার জ্যাকেট আর চোখে সেই চিরচেনা ডার্ক সানগ্লাস। মধ্যাহ্নের রুদ্রতা শেষে প্রকৃতির এই মৃদু বাতাসে ওর অবিন্যস্ত অলকগুচ্ছ কপাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাইকের ফুয়েল ট্যাংকের ওপর এক হাত রেখে ও তিয়াশার আগমনী বার্তা টের পেয়েই চশমাটা সামান্য নামিয়ে এক ভুবনমোহিনী বক্র হাসি উপহার দিল।
তিয়াশা বাইকটির দিকে চাইল, অতঃপর চরম বিরক্তি ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব বুকে চেপে কয়েক কদম এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে শুধাল,,
— হোয়াট ইজ দিস? বাইক কেন? গাড়ি কোথায় আপনার?
আরাভ বাইকের স্টার্টটা বন্ধ করে, এক পা মাটিতে ভর দিয়ে বেশ রসিয়ে বলল,,
— কেন সুইটহার্ট? বাইক পছন্দ হলো না? এই শহরের টপ মোস্ট রেসিং বাইকার হয়ে লাভ কী হলো, যদি জীবনের প্রথম এবং শেষ স্পেশাল মানুষটাকেই কখনো পেছনে বসিয়ে একটু রোম্যান্টিক হাওয়া খেতে না পারলাম? জাস্ট কাম অ্যান্ড সিট,জানু।
তিয়াশা এক কদম পিছিয়ে গিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
— আপনার ওই সস্তা রোম্যান্সের নিকুচি করেছে! আমি আপনার সাথে এই অদ্ভুত যানে চেপে কোথাও যাব না। লোকলজ্জা বলে আমার অন্তত একটা সেন্স আছে। আপনি দয়া করে গাড়ি বের করুন, নইলে আমি একাই রিকশা নিয়ে চলে যাব।
আরাভ এবার বাইক থেকে নেমে তিয়াশার একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে ওর চোখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বলল,,
— রিকশা? ইম্পসিবল! আরাভ খানের বউ এই খোলা রাস্তায় একা একা রিকশায় ঘুরবে, আর দশটা সাধারণ পাবলিক তার দিকে হা করে চেয়ে থাকবে,দিস ইজ নট গোয়িং টু হ্যাপেন, তিয়াশা। আর লোকলজ্জার কথা বলছ? পুরো শহর জানে তুমি আমার ওয়াইফ। বর-বউ বাইকে ঘুরলে সমাজ এসে কোনো ফাইন কাটবে না। সো, ডোন্ট মেক অ্যানি সিন হিয়ার। জাস্ট গেট অন দা বাইক।
তিয়াশা ওষ্ঠাধর ইঞ্চি কয়েক বাঁকিয়ে দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে বাঁধল। জেদি গলায় বলল,,
— আমি যাব না মানে যাব না! আপনার মতো একজন উগ্র, বেপরোয়া মানুষের পেছনে এভাবে বসে যাওয়ার চেয়ে আমার হেঁটে যাওয়া ঢের ভালো। আপনার বাইকের স্পিডকে আমার বড্ড ভয় লাগে।
তিয়াশা যে মূলত ওর স্পর্শ এড়াতে ভয়ের অজুহাতে পিছিয়ে যাচ্ছে, তা আরাভের বুঝতে এক সেকেন্ডও বিলম্ব হলো না। ও হুট করেই তিয়াশার বড্ড কাছে ঝুঁকে এলো। ওর কানের লতি স্পর্শ করে বলল,,
— ভয় পাচ্ছ সুইটহার্ট? জাস্ট ট্রাস্ট মি, আজ কোনো স্পিড ডেমন রূপ দেখতে হবে না তোমাকে। একদম জেন্টলম্যানদের মতো সেফ স্পিডে ড্রাইভ করব। আর যদি বেশি ভয় লাগে…
ও একটু থেমে তিয়াশার কোমরের দিকে এক পলক চেয়ে বলল,
— তবে পেছনের ওই শক্ত হাত দুটো দিয়ে আমার এই চওড়া কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখো। আই ডোন্ট মাইন্ড, ওয়াইফি!
— ইউ জাস্ট শাট আপ! অসভ্য, ইডিয়ট একটা!
ক্রোধের তীব্র লালিমায় তিয়াশার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্তিম বর্ণ ধারণ করল। ও বুঝল, এই অবাধ্য লোকের সাথে বাকবিতণ্ডা করে জেতার সাধ্য আপাতত ওর নেই। এদিকে আদ্রিতার বাসায় পৌঁছানোর জন্য সময়ও ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে; রুদ্রদ্বীপ আর ওর বাবা হয়তো এতক্ষণে সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন। সময়ের এই নিদারুণ তাগিদেই তিয়াশা নিজের সমস্ত আত্মসম্মান আর দ্বিধাবোধকে বিসর্জন দিয়ে এক বুক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ও চরম ঘৃণায় আর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কোনোমতে বাইকের পেছনের সিটটায় একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসল। ওর বসার ভঙ্গি দেখেই আরাভ মুচকি হাসল। ও বাইকে উঠে তা স্টার্ট দিয়ে বলল,,
— হোল্ড অন টাইট, সুইটহার্ট। রাস্তা কিন্তু বড্ড আঁকাবাঁকা।
মুহূর্তেই দিকবিদিক কাঁপিয়ে বাইকের সেই পরিচিত গর্জন প্রতিধ্বনিত হলো রাজপথে। তিয়াশা জানালার গ্রিলের মতো করেই আরাভের জ্যাকেটের এক কোণ বড্ড সাবধানে দুই আঙুলে চেপে ধরল। প্রকৃতিতে তখন বৈকালিক ম্লান আলোর মায়াজাল, আর সেই মায়ার মাঝেই কাঙ্খিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে তীব্র গতিতে ছুটে চলল কৃষ্ণবর্ণের যান।
কৃষ্ণবর্ণের যানটি রাজপথের তীব্র কোলাহল ভেদ করে ক্রমশ সম্মুখ পানে এগিয়ে চলেছে। তিয়াশার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ আরাভের শরীর থেকে নিজের শরীরের দূরত্ব বজায় রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টায়। ও সিটের একদম শেষ প্রান্তে কিঞ্চিৎ জড়সড় হয়ে বসেছে, যেন সম্মুখের পুরুষটির বিন্দুমাত্র স্পর্শও ওর সর্বাঙ্গে এক বিষাক্ত কণ্টকের ন্যায় বিঁধবে।
তিয়াশার এই সুকৌশলী দূরত্ব এবং জ্যাকেটের এক কোণ দুই আঙুলে অতি সাবধানে চেপে ধরার এই করুণ প্রয়াস আয়নার প্রতিচ্ছবিতে ধরা পড়ল আরাভের। ওর ঠোঁটের কোণে এক ক্রুর হাসির রেখা ফুটে উঠল। মনে মনে এইশ কৌশলী পরিকল্পনার ফাঁদ পেতে ও আচমকা বাইকের এক্সিলারেটরটা সশব্দে ঘুরিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে সেই যান্ত্রিক দানবটি যেন এক উন্মত্ত সিংহের ন্যায় গর্জে উঠে দ্বিগুণ গতিতে সামনের দিকে এক মস্ত লাফ দিল।
ঘটনার আকস্মিকতায় এবং তীব্র গতিবেগের আকুল ধাক্কায় তিয়াশা নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারল না। এক লহমায় ও ছিটকে এসে সরাসরি আছড়ে পড়ল আরাভের সেই চওড়া, শক্ত পিঠের ওপর। ওর দুই হাত অবচেতনভাবেই আড়াআড়িভাবে জড়িয়ে ধরল আরাভের শক্ত কোমর। তিয়াশার তপ্ত নিঃশ্বাস আরাভের ঘাড়ের চামড়া স্পর্শ করতেই ওর ঠোঁটের কোণের বক্র হাসিটা আরও চওড়া হলো।
তিয়াশা মুহূর্তের মধ্যে নিজের এই অবস্থান টের পেয়ে আতঙ্কে ও লজ্জায় শিউরে উঠল। ও তড়িৎগতিতে নিজেকে সামলে নিয়ে পুনরায় পেছনে সরার চেষ্টা করতে করতে প্রায় চেঁচিয়ে বলল,
— স্টপ ইট, আরাভ! হোয়াট ইজ দিস ক্রেজিনেস? আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? স্পিড কমান বলছি, নইলে আমি এই চলন্ত বাইক থেকেই লাফ দেব!
আরাভ গতি বিন্দুমাত্র না কমিয়ে, বরং বাইকটিকে আরও একটু সর্পিল গতিতে বাঁকিয়ে আয়েশের সুরে জবাব দিল,,
— লাফ দিবা? ট্রাই করে দেখতে পারো সুইটহার্ট। আমি তো আগেই বলেছিলাম,রাস্তা বড্ড আঁকাবাঁকা, একটু তো ধাক্কা লাগতেই পারে!
তিয়াশা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের হাত দুটো ওর কোমর থেকে সরিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল,,
— রাস্তা আঁকাবাঁকা নয়, আপনার মনটা বাঁকা! আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে এই নোংরামি করছেন। ইডিয়ট, সস্তা গুন্ডা একটা! হাত ছাড়ুন বলছি, আমি এভাবে আপনার গায়ের ওপর লেপ্টে থাকতে পারব না!
আরাভ আয়নায় ওর আরক্তিম ললাট আর ক্রুদ্ধ ডাগর চক্ষুদ্বয়ের দিকে চেয়ে চোখ টিপল। অতঃপর ফুরফুরে স্বরে বলল,,
— উফ ওয়াইফি! এত চিল্লাচ্ছ কেন? এই রোম্যান্টিক ওয়েদারে তোমার এই কড়া চিল-চিৎকারে তো রাস্তার পাবলিক রোম্যান্টিক সিন বাদ দিয়ে আমাদের দিকে ঝগড়াটে কাপল ভেবে তাকাবে! আর হাত সরাচ্ছ কেন? এই কড়া স্পিডে যদি হাত ছেড়ে দাও, তবে ডিরেক্ট পিচের রাস্তায় আলতা রাঙা মুখটা আছাড় খাবে। তখন তো ওই সুন্দর গালে ব্যান্ডেজ করা লাগবে। আমি তো জাস্ট তোমার সেফটি এনশিওর করছি।
তিয়াশা অপমানের তীব্র জ্বালায় ওষ্ঠাধর দংশন করল। ও বুঝল, এই অবাধ্য, বেপরোয়া পুরুষের সাথে কোনো যুক্তি চলবে না। ও পরম ঘৃণায় নিজের মুখটা আরাভের কাঁধের আড়ালে লুকিয়ে চোখ বুজল। বাইকের তীব্র গতির দমকা হাওয়া ওর চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছে, আরাভের ভেতরের উগ্র খামখেয়ালি সত্তাটা তিয়াশার এই অসহায় রাগটুকুকে পরম তৃপ্তিতে উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চলল আদ্রিতার আবাসের পানে।
মুহূর্ত কয়েকের মাঝেই আদ্রিতার বাড়ির সম্মুখে এসে পৌঁছালো ওরা। তিয়াশা আর কথা না বাড়িয়ে তড়িঘড়ি নামলো বাইক থেকে। আরাভ হেলমেট পরিহিত অবস্থাতেই এক ঝলক তিয়াশার দিকে চেয়ে বলল,,
— হ্যাভ আ গুড আফটারনুন সুইটহার্ট! আমি এখান থেকে পার্টি অফিসে যাব ফেরার পথে তোমাকে নিয়ে ফিরবো। হ্যাঁ?
তিয়াশা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো শুধু। অতঃপর চটজলদি পদক্ষেপে প্রবেশ করলে ভেতরের দিকে। আরাভ শেষ অবধি ওর প্রস্থান পথে দিকে চেয়ে রইল। ও ভিতরে ঢুকে গেট লাগিয়ে দেওয়ার পর,তবে বাইক স্টার্ট দিল।
আদ্রিতাদের বাড়ির প্রধান দরজা অতিক্রম করতেই তিয়াশার বুকের ভেতরটা যেন সহস্র তরঙ্গের অভিঘাতে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। ড্রইংরুমের শেষ প্রান্তে সোফায় উপবিষ্ট সেই চিরচেনা, পরম নির্ভরযোগ্য অবয়বটি ওর দৃষ্টিগোচর হলো। ধূসর কারুকার্যখচিত পাঞ্জাবিতে আবৃত, বার্ধক্যের সকরুণ রেখাপাতযুক্ত জীর্ণ এক পিতা– ডিআইজি তাহের চৌধুরী।
বিগত কয়েকটি দিনের অবরুদ্ধ নরকযন্ত্রণা, একাকীত্ব আর গুমোট কান্নার সমস্ত বাঁধ এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তিয়াশার। ও আর নিজের আবেগ সংবরণ করতে পারল না। দুই চোখ বেয়ে অশ্রুধারা প্লাবনের মতো নেমে এলো। ও —‘বাবা!’ বলে এক আর্তচিৎকার করে অবুঝ বালিকার ন্যায় ছুটে গিয়ে তাহের চৌধুরীর বক্ষে আছড়ে পড়ল, ওনাকে দুই বাহুতে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরল।
তাহের চৌধুরীও এতদিন পর নিজের কলিজার টুকরোকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেয়ে আর স্থির থাকতে পারলেন না। ওনার সেই সিংহসুলভ কঠিন পুরুষালি অবয়ব নিমেষেই এক স্নেহাতুর পিতার কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওনার কম্পিত হাত দুটো দিয়ে তিয়াশাকে বুকের সাথে শক্ত করে লেপ্টে ধরে, ওর মাথায় বারবার চুম্বন এঁকে দিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে বলতে লাগলেন,,
— মা! আমার মা এসেছে! তুই ভালো আছিস তো মা? ওই জানোয়ারটা তোর কোনো ক্ষতি করেনি তো? একটিবার বল মা!
তিয়াশা পিতার বুকে মুখ গুঁজে কেবলই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। কক্ষের ঠিক এক কোণে দাঁড়িয়ে এই অভূতপূর্ব, সকরুণ পিতৃ-কন্যার পুনর্মিলন অত্যন্ত নিবিড় মনোযোগে অবলোকন করছিল রুদ্রদ্বীপ। ওর প্রখর, সন্ধানী দৃষ্টি জোড়া স্থির হয়ে রইল তিয়াশার আননের ওপর। গত এক সপ্তাহে তিয়াশার মাঝে যেন এক অলৌকিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অবরোধের তীব্র গ্লানি আর মানসিক দহন সত্ত্বেও, অপরাহ্নের এই ম্লান আলোয় মেয়েটিকে আজ বড্ড বেশি মায়াবী আর অপরূপা ঠাওর হলো রুদ্রর চোখে।
অবিন্যস্ত অলকগুচ্ছ কপাল বেয়ে নেমে এসেছে, আরক্তিম ওষ্ঠাধরের সূক্ষ্ম কম্পন আর অশ্রুসিক্ত ডাগর চক্ষুদ্বয়ের সেই নোনা জলের ধারা—সব মিলিয়ে তিয়াশার এই সিক্ত সৌন্দর্য যেন এক অপার্থিব দীপ্তি ছড়াচ্ছে। রুদ্রদ্বীপ এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনের অবাধ্য মুগ্ধতাটুকুকে অতি সন্তর্পণে দমন করল। ও দু-পা এগিয়ে এসে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় বলল,,
— তিয়াশা, নিজেকে শান্ত করুন। আমাদের হাতে সময় বড্ড কম। যেকোনো মুহূর্তে ওই সাইকোটা এখানে হানা দিতে পারে।
রুদ্রর কণ্ঠস্বরে তিয়াশা একটু ধাতস্থ হলো। ও পিতার বক্ষ ছেড়ে ধীর চরণে সোফায় বসল এবং ওড়না দিয়ে নিজের চোখের জল মুছে নিল। তাহের চৌধুরী মেয়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেই রুদ্রর দিকে চাইলেন। রুদ্রদ্বীপ এবার তিয়াশার ঠিক সম্মুখে এসে বসল। ওর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে অত্যন্ত পেশাদারী তবে আর্দ্র কণ্ঠে শুধাল,,
— তিয়াশা, আই নো আপনি এখন মস্ত বড় কোনো ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু জাস্ট ট্রাস্ট মি, দেশের পুরো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট আপনার পেছনে আছে। কোর্টে আমরা আরাভের ওইসব কাবিননামা এক সেকেন্ডে বাতিল করে দেব। শুধু আপনার একটা স্পষ্ট স্টেটমেন্ট চাই। তুমি আমাদের খোলামেলা বলো— ঠিক কী দিয়ে ওই ক্রিমিনালটা আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করছে? ও কিসের ভয় দেখিয়ে আপনাকেকে ওই কাগজে সই করাতে বাধ্য করেছে?
পিতার ব্যাকুল চাউনি আর রুদ্রর এই ধারালো প্রশ্নে তিয়াশার চোখের মণি দুটো আবার আতঙ্ক-সংশয়ে কেঁপে উঠল। আরাভের সেই বিষাক্ত হুমকি আর মোবাইল স্ক্রিনের ওই বিকৃত ছবিগুলোর কথা মনে পড়তেই ওর ফর্সা ললাট জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। ও বলতে চাইল, কিন্তু এক অদৃশ্য ভয়ের বেড়াজাল যেন ওর কণ্ঠনালীকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরেছে।
মেয়ের এই বিবর্ণ ও আতঙ্কগ্রস্ত মুখচ্ছবি দেখে তাহের চৌধুরীর পিতৃসত্তা ব্যাকুল হয়ে উঠল। তিনি তিয়াশার হাতদুটো আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরে পরম আশ্বাসে বললেন,
— কোনো ভয় নেই মা। তুই নিঃসংকোচে সব বল। তোর বাবা এখনও বেঁচে আছে, কোনো অন্যায়কারী তোকে ছুঁতে পারবে না।
রুদ্রদ্বীপও নিজের কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব কোমল করে যোগ করল,
— আপনি একদম নিশ্চিন্তে বলতে পারেন, তিয়াশা। এখানে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। নিজেকে একা ভাববেন না, আইন এবং আমরা সম্পূর্ণ আপনার সাথে আছি।
তাদের এই ইস্পাতকঠিন আশ্বাস যেন তিয়াশার অবরুদ্ধ চিত্তে সাহসের এক নতুন জোয়ার আনলো। ও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মনের গহীনে চেপে রাখা সেই বি-ষাক্ত সত্যের অর্গল এক এক করে উন্মোচন করতে লাগল। আরাভ কীভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ওর কিছু অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও বিকৃত ছবি তৈরি করেছে, এবং সেইসব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ওর পরিবারকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছে—সবটা ও সবিস্তারে প্রকাশ করল।
কন্যার মুখ থেকে এই হীন ও পৈশাচিক ব্ল্যাকমেইলের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ শুনে তাহের চৌধুরীর শিরা-উপশিরায় যেন অগ্নিস্রোত বয়ে গেল। ক্রোধে ও অপমানে তাঁর সিংহসুলভ অবয়ব রীতিমতো ফুঁসে উঠল। তিনি সোফার হাতলে এক তীব্র চাপ দিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলেন,
— ওই বা””স্টা””র্ডটা কী ভেবেছে নিজেকে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে হলেই পার পেয়ে যাবে? এই তাহের চৌধুরী ওর এই নোংরা দম্ভকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে!
রুদ্রদ্বীপের চোয়ালও শক্ত হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যেই, চোখের মণি দুটোয় ক্ষোভের অগ্নিশিখা দাউদাউ করে প্রজ্জ্বলিত। তবে ও পেশাদারত্বের খাতিরে বহু কষ্টে নিজের ভেতরের এই আদিম উত্তেজনাকে সংবরণ করল। এক গভীর দীর্ঘশ্বাস চেপে ও তিয়াশাকে আশ্বস্ত করে বলল,
— আপনি আর বিন্দুমাত্র টেনশন করবেন না, তিয়াশা। এই সাইবার ক্রাইমের ডিজিটাল প্রমাণ আমরা অতি দ্রুতই আমাদের স্পেশাল উইং দিয়ে রিকভার এবং ডিলিট করার ব্যবস্থা করছি। আর বেশি দিন নয়, আমরা আইনি সমস্ত ফাঁদ প্রস্তুত করে খুব জলদিই আপনাকে ওই নরক থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করে আনব।
রুদ্র একটু থেমে দেওয়াল ঘড়ির দিকে চেয়ে সতর্ক গলায় বলল,
— তবে আমাদের এখানে আর বেশিক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক হবে না। আপনি আপাতত ও আসার আগ অব্দি এখানে থাকুন আর সাবধানে ওর সাথে ফিরবেন। ও যেন কিছু ঘুনাক্ষরেও বুঝতে না পারে। বাকিটা আমরা দেখছি।
পার্টি অফিসের পেছনের নিভৃত কক্ষটায় ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে বসে ছিল আরিয়ান ও সাইদ। সপ্তাহখানেক হলো ক্লাবে দেখা মেলে না আরাভের তাই বাধ্য হয়েই বন্ধু মহল এখানে এসেছে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে আজ ওদের চির পরিচিত পানিওর বদলে টেবিলে অবস্থান করছে চা আর স্বাভাবিক খাদ্যদ্রব্য। যদিও সঙ্গে ক্ষুদ্র পরিসরে সিগারেটের অবস্থানও লক্ষণীয়। আরিয়ান অবাক কণ্ঠে বললো,,
— তোর কি হয়েছে রে মামু? এত জলদি! এত চেঞ্জ?
আরাভ নিজের শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি গুটিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,,
— আমি ভাবছি আব্বুর ফ্যামিলি বিজনেসে জয়েন করব। পলিটিক্স আর ক্লাবের এই লাইফটা থেকে একটু দূরত্ব দরকার। একটা রেসপন্সিবল জব খুব প্রয়োজন এখন আমার।
কথাটা শোনামাত্রই আরিয়ান মুখ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে হো হো করে হেসে উঠল। ও আরাভের কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে টিপ্পনী কাটল,,
— হোয়াট? তুই করবি ফ্যামিলি বিজনেস? মামু, তুই তো দেখি আসলেই ওই ডিআইজির মেয়ের প্রেমে পুরাই মজনু হয়ে গেলি রে! ভাবি তোরে যা যা শিখাইতাছে, তুই তো একদম বাধ্য ছাত্রের মতো তাই করতাছস!
সাইদ এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। ও গ্লাসটা টেবিল নামিয়ে রেখে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলল,,
— আই টোল্ড ইউ আরিয়ান, আরাভকে এভাবে জাজ করিস না। ও যা করছে, বেশ বুঝেশুনেই করছে। নিজের লাইফটাকে ট্র্যাকে আনাটা কোনো মজনুগিরি না, একেই বলে রিয়েল ম্যাচিউরিটি।
আরিয়ান এবার একটু গম্ভীর ভঙ্গিতে আরাভের দিকে তাকিয়ে বলল,,
— আরেহ রাখ তোর ফিলোসফি, সাইদ! আচ্ছা আরাভ, তুই সত্যি সত্যি ভাবির ওই কড়া কড়া ডায়লগ শুইনা নিজেরে চেঞ্জ করার ডিসিশন নিলি? সেইদিন ক্লাবে মদ ছাড়লি, আর আজকে ডিরেক্ট জেন্টলম্যান সাজনের লাইগা বিজনেসে নামতাছস? ভাবির পাওয়ার তো নেক্সট লেভেলের, মামু!
আরাভ ওদের এই খুনসুটি শুনে রাগ করল না, বরং চেয়ারে হেলান দিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,
— পাওয়ারের কিছু না, আরিয়ান। তিয়াশা আমাকে ওপেন চ্যালেঞ্জ করেছে- অন্যের টাকায় হিরোগিরি দেখানো নাকি বড্ড সহজ। ও দেখতে চায় আরাভ খান নিজের ক্ষমতায় কী করতে পারে। সো, আই জাস্ট ওয়ান্ট টু প্রুভ মাইসেলফ। ওকে আমি ফুল স্পিডে জেন্টলম্যান হয়েই দেখাব, তবে ওই যে বললাম-ভালোবাসা আর ওকে আগলে রাখার ক্ষেত্রে এই আরাভ খান আজীবন ওর লাইফের সেই অবাধ্য ভিলেনই থাকবে।
সাইদ একটা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,,
— দিস ইজ লাইক আ ম্যান, আরাভ। তোর এই জেদটাই তোরে বাকিদের থেকে আলাদা করে।
সাইদের এই কথায় আরিয়ান আর এতক্ষণ চুপ করে থাকা আবির ও ইরান একে অপরের দিকে তাকাল। পুরো বন্ধুমহলে সাইদ সবসময়ই একটু আলাদা। ওদের মতো উগ্রতা, হুজুগ বা আবেগে ভেসে যাওয়ার স্বভাব সাইদের কখনোই ছিল না। আবির এবার চেয়ারটা টেনে একটু সামনে ঝুঁকে বসল। কপালে সামান্য ভাঁজ ফুটিয়ে সাইদের দিকে তাকিয়ে বলল,,
— আচ্ছা সাইদ, একটা জিনিস আমি মেলাতে পারি না। তুই প্রথম থেইকাই এত সাধু ক্যামনে? আমাদের মতো উগ্রতা, মারামারি, ক্লাবিং কোনো কিছুতেই তোরে কখনো ওভাবে এক্সাইটেড হইতে দেখলাম না। তুই সবসময় এত ব্যালেন্সড ক্যামনে থাকস রে ভাই?
ইরানও আবিরের কথায় সায় দিয়ে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে বলল,,
— এক্স্যাক্টলি! আমাদের গ্রুপে তুই হইলি একমাত্র জেন্টলম্যান।
আরিয়ান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে টেবিল চাপড়ে বলল,,
— আরেহ না, কাহিনী অন্য কিছু। আচ্ছা সাইদ ভাই, তোর লাইফে কি এমন কেউ ছিল, যে তোরে এইভাবে ম্যাচিউর বানায়া দিয়া গেছে? মানে, কোনো ছ্যাকা-ট্যাকার হিস্ট্রি আছে নাকি?
ওদের সবার একযোগে করা প্রশ্নে সাইদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসের গায়ে আঙুল দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মলিন হাসি ফুটিয়ে বলল,,,
— জন্ম থেকে কেউ ম্যাচিওর হয় না রে, আবির। মানুষ ঠেকে শেখে। তোরা আজ আরাভকে দেখে মজনু বলছিস, কিন্তু ও লাকি যে ও সময় থাকতে নিজেরে ট্র্যাকে ফেরাচ্ছে। আমি তো সেই সুযোগটাও পাইনি।
সাইদের গলার শহরের এমন আমূল পরিবর্তনে পুরো টেবিলটা হুট করে নীরবতাই নিমজ্জিত হলো। আরিয়ান রসিকতা থামিয়ে সোজা হয়ে বসল।আরাভ সাইদের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,,
— তার মানে? ছিলো কেউ?
সাইদ শূন্য দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল,,
— হ্যাঁ, ছিল। কোনো এক ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যের অধিকারিণী আমার জীবনেও এসেছিল। যার চোখের এক পলকেই আমার পুরো দুনিয়া থমকে যেত।
ইরান কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,,
— তাহলে কী হইছিল? ব্রেকআপ? সে তোরে ছাইড়া চলে গেছে?
— না, ও আমাকে ছাড়েনি। আমি বাধ্য করেছি ওকে চলে যেতে,
সকলে সমস্বরে বললো,,
— মানে?
সাইদ ধীর চরণে উঠে জানালার দিকে গিয়ে দাঁড়াল, বাইরে তখন অপরাহ্নের ম্রিয়মাণ রৌদ্ররশ্মির দেখা মিলছে। ও পকেটে হাত রেখে বলতে লাগল,,,
— আজকের আরাভের মতো আমিও তখন ভাবতাম, বাপের টাকায় ডনগিরিই বুঝি লাইফ। এক্কেবারে ছন্নছাড়া, ভবঘুরে একটা জীবন ছিল আমার। ও বারবার আমাকে বোঝাতে চেয়েছিল, নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলেছিল। কিন্তু আমার ওই ইগো আর উগ্রতার চক্করে আমি ওর কোনো কথাই কানে তুলিনি। রেজাল্ট কী হলো? আমার এই ছন্নছাড়া ভবঘুরে লাইফস্টাইলের জন্যই একদিন ও আমার জীবন থেকে চিরকালের মতো হারিয়ে গেল।
সাইদ ঘুরে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের দিকে তাকাল। ওর অশ্রুহীন নেত্রে এক বুক খাঁ খাঁ করা আফসোস স্পষ্ট। ও আরাভের কাঁধে হাত রেখে বল,,
— ও যাওয়ার পর যখন আমার রিয়েলিটি চেক হলো, তখন আমি নিজেকে বদলেছি। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে ভাই। এইজন্যই তোকে বলছি,সময় থাকতেই মূল্য দে। না হলে আমার মত সারা জীবন আফসোস করবি।
আরাভ তিয়াশার কথা মনে করে আনমনে মুচকি হাসলো। অতঃপর একবার ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে বলল,,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৪
— ওকে, তোরা থাক আমার যাইতে হবে। ওকে বাসায় পৌঁছাতে হবে সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
বন্ধুগুলো একযোগে হাসলো এবার। আরাভের প্রস্থান পথের দিকে চেয়ে বলল,,
— তুমি ফেঁসে গিয়েছো রোমিও! বেস্ট অফ লাক মামু।
