Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৬

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৬

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৬
সুমি চৌধুরী

কেটে গেছে আরও পাঁচটা দিন।এই পাঁচ দিনে রূপা নিয়মিত কলেজে যাচ্ছে। আর বাঁধন নিজের ডিউটি নিয়ে ব্যস্ত। বাঁধনের সঙ্গে এখন রূপার একদমই দেখা হচ্ছে না বললেই চলে। অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে বাঁধন। রূপাকে খাইয়ে দিয়ে ঘুমাতে চলে যায় সে।আর রূপাও চুপিচুপি গিয়ে বাঁধনের বুকে শুয়ে পড়ে।এই নিয়ে বাঁধন এখনো পর্যন্ত কিছু বলেনি। সকালে ঘুম ভাঙার পর নিজের বুকে রূপাকে দেখলেও কোনো প্রশ্ন করেনি, কোনো আপত্তিও জানায়নি।বাঁধনের এই নীরবতাই রূপাকে দিন দিন আরও সাহসী করে তুলেছে।এরই মধ্যে একদিন আকাশের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে রূপার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল রজনী রহমান। রূপাকে অনেকবার বুঝিয়েছেন বাড়িতে ফিরে যেতে। কিন্তু রূপা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। সে বাড়ি ফিরে যায়নি।শেষমেশ রজনী রহমানও আর বেশি মাথা ঘামাননি। সহজভাবে কাজ হয়ে গেলেই হলো, এতেই তিনি সন্তুষ্ট।আজ রূপাদের কলেজে বিদায় অনুষ্ঠান।খুব সকালেই বৃষ্টি এসে হাজির হয় রূপার ফ্ল্যাটে। বৃষ্টির সাহায্যে তৈরি হয়ে নেয় রূপা। কালো রঙের কাজ করা লং কামিজ পরেছে সে। সঙ্গে ম্যাচিং সাদা টাইটস আর ওড়না।আজ রূপাকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে।বাঁধন আকাশকে দিয়ে রূপার জন্য ব্যান্ড আর চুড়ি আনিয়ে দিয়েছিল। সেগুলোও পরে নিয়েছে রূপা। সবকিছু শেষ করে বৃষ্টির সঙ্গে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে সে।কলেজে ঢুকতেই সীমা আর ইসরাতের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় রূপার। কলেজের কেউ এখনো জানে না, রূপা বিবাহিত।রূপাকে দেখেই সীমা এগিয়ে এলো। কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে বলল,

—-“তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে”
রূপা মৃদু হেসে বলল,
—-“আর তোমাকেও।”
সীমা কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইল রূপার দিকে।
মেয়েটা কত ভাগ্যবতী।যাকে সীমা নিজের সবটুকু আবেগ দিয়ে ভালোবাসে, সেই ইশতিয়াক রূপার প্রেমে পাগল।বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো সীমার।এতদিনে ইশতিয়াকের সঙ্গে তার বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে উঠেছে। অথচ সেই বন্ধুত্বের পেছনেও যেন স্বার্থ লুকিয়ে আছে। বন্ধু হয়ে সীমাকে রূপার সঙ্গে ইশতিয়াকের প্রেম করিয়ে দিতে হবে এমনই আবদার ইশতিয়াকের।সীমা মৃদু হাসল।কী অদ্ভুত ভাগ্য তার।যাকে সে ভালোবাসে, তাকে অন্য কারও সঙ্গে ভালোবাসিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও শেষমেশ তার কাঁধেই এসে পড়েছে।রূপা, বৃষ্টি, ইসরাত, সীমা আর তাদের বাকি বন্ধুরা গিয়ে মঞ্চের সামনে রাখা চেয়ারগুলোতে বসে পড়ল। ধীরে ধীরে বিদায় অনুষ্ঠানের সময় ঘনিয়ে এলো।মঞ্চের চারপাশে তখন ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। একে একে সবাই নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কোলাহলে পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠেছে।এরই মধ্যে মঞ্চে উঠে এলেন প্রিন্সিপাল স্যার।
স্যারকে মঞ্চে উঠতে দেখেই উপস্থিত সকল ছাত্র-ছাত্রী একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠল।মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন প্রিন্সিপাল স্যার। একবার গলা খাঁকারি দিয়ে মঞ্চের সামনে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালেন। তারপর মৃদু হেসে বলতে শুরু করলেন,

—-“সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ এবং আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা, আশা করি তোমরা সবাই ভালো আছো।আজ আমাদের কলেজে বিদায় অনুষ্ঠান। বিদায় শব্দটা শুনতেই কেমন যেন বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে, তাই না? কারণ আজকের পর তোমাদের অনেকেই এই কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের নতুন পথে পা রাখবে।এই কলেজের সঙ্গে তোমাদের যেমন মায়া জড়িয়ে আছে, তেমনই তোমাদের সঙ্গেও আমাদের অনেক মায়া জড়িয়ে আছে। তোমাদের হাসি, তোমাদের দুষ্টুমি, ক্লাসে করা হাজারো বায়না সবকিছুই আমরা খুব মিস করব।”
শিক্ষার্থীদের ভেতর থেকে হালকা হাসির শব্দ ভেসে এলো।প্রিন্সিপাল স্যারও মৃদু হাসলেন।
—-“তবে বিদায় মানেই কিন্তু শেষ নয়। বরং এটা তোমাদের জীবনের নতুন একটা অধ্যায়ের শুরু। তোমরা জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যাবে, সফল হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমাদের দোয়া আর শুভকামনা সবসময় থাকবে।”
কথা শেষ করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন স্যার।তারপর হঠাৎই তাঁর মুখে রহস্যময় একটা হাসি ফুটে উঠল।
—-“আচ্ছা, এবার আসি আজকের অনুষ্ঠানের বিশেষ চমকে।”
স্যারের কথা শুনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।প্রিন্সিপাল স্যার মাইক্রোফোনের আরও কাছে ঝুঁকে বললেন,

—-“আজকের বিদায় অনুষ্ঠানে আমাদের একজন বিশেষ অতিথি আসছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ হয়তো তাকে চেনো, আবার কেউ হয়তো চেনো না। তবে খুব শীঘ্রই তিনি এই মঞ্চে উপস্থিত হবেন।”
কথাটা শুনে সবাই আগ্রহী হয়ে উঠল।স্যার আবার বললেন,
—-“তাই আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটা ছোট্ট দায়িত্ব আছে। তোমাদের পেছনে কয়েকটি ফুলের তোড়া এবং কিছু ফুল রাখা আছে। তোমরা সেগুলো নিয়ে কলেজের গেটের কাছে চলে যাও। আমাদের বিশেষ অতিথিকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানিয়ে সম্মানের সঙ্গে ভেতরে নিয়ে আসবে।”
একটু থেমে মুচকি হেসে যোগ করলেন,
—-“আশা করি আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে হতাশ করবে না।”
প্রিন্সিপাল স্যারের কথা শেষ হতেই একে একে সকল ছাত্র-ছাত্রী ফুলের তোড়া হাতে কলেজের গেটের কাছে চলে এলো।রূপা, বৃষ্টি, সীমা আর ইসরাতও এসে দাঁড়াল সবার সঙ্গে।কৌতূহলে সবার চোখ তখন কলেজের গেটের দিকে।
কে আসছে?এমনকি রূপার বুকের ভেতরেও কেমন যেন অদ্ভুত একটা কৌতূহল জন্ম নিয়েছে।বৃষ্টি রূপার একদম কাছে এসে তার কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

—-“কি আসবে রে?”
রূপা চোখ সরু করে গেটের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল,
—-“আমিও তো জানি না। চুপ থাক, আসলেই দেখতে পাবি।”
বৃষ্টি আর কোনো কথা বলল না।দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।কয়েক মিনিট পর হঠাৎ করেই কলেজের গেটের সামনে এসে থামল একটি কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি।গাড়িটা থামতেই মুহূর্তের মধ্যে সবার চোখ সেদিকে ঘুরে গেল।কৌতূহল নিয়ে একসঙ্গে সামনে তাকাল সবাই।পরক্ষণেই গাড়ির ড্রাইভিং সাইডের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো আকাশ।বৃষ্টির চোখ কপালে উঠে গেল।মনে হলো, এক মুহূর্তের জন্য কারেন্টের শর্ট খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।আকাশ!তার মানে আকাশই সেই বিশেষ অতিথি?কিন্তু আকাশ কীভাবে বিশেষ অতিথি হয়?সে তো এই কলেজেরই স্যার!বৃষ্টির মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।তবে তার ভাবনার মাঝেই গাড়ির সামনের ডান পাশের দরজাটা খুলে গেল।আর ঠিক তখনই গাড়ি থেকে নামল বাঁধন।মুহূর্তের মধ্যে যেন চারপাশের সব শব্দ থেমে গেল।কেউ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।কেউ আবার চোখ বড় বড় করে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে রইল।আর রূপা?রূপার চোখ দুটো বিস্ময়ে কপালে উঠে গেল।বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই ধক করে উঠল তার।হার্টবিট অস্বাভাবিক দ্রুততায় ছুটতে শুরু করেছে।বাঁধন!কিন্তু আজকের বাঁধন যেন সেই পরিচিত বাঁধন নয়।সাদা রঙের ইতালিয়ান কাট ফরমাল শার্ট পরেছে সে। শার্টের ওপর গায়ে জড়ানো ব্ল্যাক টেইলর্ড টাক্সেডো ব্লেজার।

ব্লেজারের সামনের বোতামগুলো খোলা, ফলে ভেতরের সাদা শার্টের নিখুঁত সৌন্দর্যটুকু স্পষ্ট হয়ে আছে।পরনে ডিপ ব্ল্যাক স্লিম-ফিট ট্রাউজার। পায়ে চকচকে ব্ল্যাক পেটেন্ট লেদার অক্সফোর্ড শু।বাঁ হাতের কবজিতে ঝলমল করছে দামি ক্রোনোগ্রাফ ওয়াচ।চোখে কালো অ্যাভিয়েটর সানগ্লাস।গাড়ির দরজা বন্ধ করে ধীর পায়ে দাঁড়িয়ে গেল বাঁধন।তার পুরো উপস্থিতিতেই এমন এক নিঃশব্দ কর্তৃত্ব, যেন সে কোথাও প্রবেশ করেনি বরং জায়গাটা তার উপস্থিতিতে নিজের গুরুত্ব খুঁজে পেয়েছে।রূপা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।এই মানুষটা তার বাঁধন।তার স্বামী।কিন্তু আজ তাকে দেখে রূপার মনে হলো। এই মানুষটাকে সে যেন নতুন করে দেখছে।বাঁধন ধীরে ধীরে সানগ্লাস খুলে এক হাতে নিল।তারপর চোখ তুলে তাকাল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে।আর ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁধনের চোখ গিয়ে থামল রূপার ওপর।রূপার বুকের ভেতরটা আবারও ধক করে উঠল।চোখাচোখি হতেই রূপা তড়িঘড়ি চোখ নামিয়ে নিল।বাঁধনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ক্ষীণ এক হাসি।রূপাকে আজ যে অসম্ভব সুন্দর লাগছে, সেটা বাঁধনের চোখ এড়ায়নি।একটুও না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাঁধনকে দেখে ভিড়ের মধ্যে থেকে কয়েকজন উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,

—-“আরে! এ তো এসপি বাঁধন রহমান! রহমান পরিবারের বড় ছেলে! এই গোটা জেলার এসপি! স্বয়ং এসপি আমাদের কলেজের বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন! আমি তো ভাবতেই পারছি না!”
মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল। এতক্ষণ যে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিল, তারা সবাই একসঙ্গে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে পড়ল। কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে মুগ্ধতা, আবার কারও চোখে স্পষ্ট উত্তেজনা।বাঁধন অবশ্য কারও দিকে তাকাল না।
আকাশের সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে কলেজের ভেতরে প্রবেশ করল সে। দুজনের পরনেই একই রকম পোশাক। সাদা শার্ট, কালো ব্লেজার, কালো ট্রাউজার। শুধু বাঁধন আকাশের চেয়ে সামান্য লম্বা। পাশাপাশি হাঁটতে থাকা দুজনকে দেখে দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন একই মায়ের পেটের দুই ভাই।তবে দুজনের ব্যক্তিত্বে একটাই পার্থক্য।আকাশের মুখে একটা মৃদু হাসি লেগে আছে। আর বাঁধনের মুখ?সেটা যেন পাথরে খোদাই করা।গেটের ভেতরে ঢুকতেই কয়েকজন মেয়ে ফুলের তোড়া হাতে ছুটে এলো বাঁধনের সামনে। মেয়েগুলোর চোখেমুখে স্পষ্ট উত্তেজনা। কেউ লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে আছে, কেউ আবার বাঁধনের দিকে তাকিয়ে নিজের চুল ঠিক করছে।একজন মেয়ে সাহস করে বাঁধনের সামনে দাঁড়িয়ে ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিল।

—-“স্যার, এটা আমাদের পক্ষ থেকে।”
বাঁধন মেয়েটার দিকে এক পলকও তাকাল না।তার চোখ সোজা সামনের দিকে।গম্ভীর কণ্ঠে শুধু বলল,
—-“থ্যাংক ইউ।”
ফুলের তোড়াটা নেওয়ার প্রয়োজনটুকুও মনে করল না বাঁধন। মেয়েটার দিকে আর একবারও না তাকিয়ে বড় বড় পা ফেলে সোজা মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল।মেয়েটা ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।তার মুখের অবস্থা দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো মুখ চেপে হাসতে লাগল।
—-“আরে! বড়লোক ঘরের ছেলে, তার ওপর এসপি! দেখতেও একেবারে আগুন! এরকম ছেলের এটিটিউড থাকবে না তো কার থাকবে?”
পাশের মেয়েটা বাঁধনের দিকে তাকিয়ে প্রায় মুগ্ধ হয়ে বলল,
—-“আমি তো পুরাই ক্রাশ খেয়ে গেছি! এমন একটা হ্যান্ডসাম ছেলে পেলে জীবনে আর কি লাগে বল তো?।”
—-“উফফ! কী লম্বা দেখেছিস?”
—-“চোখে সানগ্লাস পরে আরো বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে!”
—-“আমি তো জানতামই না আমাদের কলেজে আজ এত বড় কেউ আসবে!”
একজনের কথা শেষ হতে না হতেই আরেকজন যোগ দিচ্ছে। বাঁধনকে ঘিরে মেয়েদের ফিসফাস যেন মুহূর্তের মধ্যেই পুরো জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল।রূপা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
প্রথমে তার ভালোই লাগছিল। তারপর একসময় চারপাশ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো কানে একটু বেশিই লাগতে শুরু করল।

—-“আমি তো পুরাই ক্রাশ!”
—-“এমন একটা হ্যান্ডসাম ছেলে পেলে আর কিছু চাই না!”
—-“উফফ, কী সুন্দর!”
রূপার ভ্রু দুটো ধীরে ধীরে কুঁচকে গেল।নিজের অজান্তেই একবার বাঁধনের দিকে তাকাল সে।বাঁধন তখন আকাশের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার চারপাশে এতগুলো মেয়ে তাকিয়ে আছে, অথচ লোকটার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই।রূপার ঠোঁট দুটো অজান্তেই শক্ত হয়ে গেল।পাশ থেকে বৃষ্টি সবকিছু বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। মেয়েদের ফিসফাস শুনে সে বিরক্তিতে মুখ মুচড়ে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-“এমন ভাব করছে যেন জীবনে আর কোনো ছেলে দেখেইনি!”
রূপা সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির দিকে তাকাল।বৃষ্টি তখনো বিরক্ত মুখে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে আছে।
—-“সত্যি বলছি রে! একটা মানুষকে দেখে এত লাফালাফি করার কী আছে?, পৃথিবীতে কি আর কোনো ছেলে নেই?”

রূপা কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।কিছুক্ষণ পর সবাই আবার মঞ্চের সামনে গিয়ে নিজেদের জায়গায় বসে পড়ল। রূপাদের তিন সারি পরেই ছিল প্রিন্সিপাল স্যারের চেয়ার। আর ঠিক প্রিন্সিপাল স্যারের পাশেই বসে আছে বাঁধন। তার পাশে আকাশ। দুজনেরই পিঠ এদিকে থাকায় রূপা বাঁধনের মুখটা দেখতে পারছিল না।কিছুক্ষণ পর মঞ্চে উঠে এলো আকাশ। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মৃদু হেসে বলল।
—-“সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ এবং আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা, আজ আমাদের আনন্দ মোহন কলেজের বিদায় অনুষ্ঠান। সত্যি বলতে, আজকের দিনটা নিয়ে আমার ভেতরেও অনেক রকম অনুভূতি কাজ করছে। একদিকে তোমাদের জন্য আনন্দ হচ্ছে, কারণ তোমরা জীবনের নতুন একটা অধ্যায়ে পা রাখতে চলেছ। আর অন্যদিকে সত্যিই খারাপ লাগছে, কারণ আজকের পর থেকে তোমাদের অনেককেই আর প্রতিদিন দেখতে পাব না।”
আকাশের কণ্ঠে হালকা আবেগ মিশে গেল।

—-“এই কলেজে তোমাদের সঙ্গে কাটানো সময়গুলো হয়তো এখন খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ক্লাসে দেরি করে এসে স্যারের বকা খাওয়া, পরীক্ষার আগে পড়ার বদলে গল্প করা, আর একসঙ্গে বসে হাজারো পরিকল্পনা করা এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই একদিন তোমাদের সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে। জীবনে অনেক বড় হবে তোমরা, নতুন মানুষ চিনবে, নতুন জায়গায় যাবে, কিন্তু কলেজ জীবনের এই সময়টা আর কখনো ফিরে পাবে না। তাই আমার অনুরোধ, জীবনে যত দূরেই যাও না কেন, এই কলেজ আর এখানে কাটানো সুন্দর সময়গুলোকে কখনো ভুলে যেও না।”
বৃষ্টি মনোযোগ দিয়ে আকাশের কথাগুলো শুনছিল। রূপাও চুপচাপ বসে আছে। আকাশ আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর হঠাৎ মুচকি হেসে মাইক্রোফোনে বলল।
—-“এবার আমি মঞ্চে ডাকছি আমার খুব কাছের একজন মানুষকে। আমি আশা করি, বন্ধু আমার ডাক শুনে মঞ্চে আসবে।”
আকাশ একটু হাসল। তারপর মাইক্রোফোনে বলল,

—-“বাঁধন, তুই মঞ্চে আয়।”
মুহূর্তেই পুরো হলরুম হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল। বাঁধন ধীর পায়ে উঠে মঞ্চের দিকে এগিয়ে এলো। মঞ্চে উঠে আকাশের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে নিল সে। মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব, যেন এত মানুষের দৃষ্টি তার ওপর আটকে থাকলেও তাতে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।আকাশ বাঁধনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মাইক্রোফোনে বলল।
—-“এ হচ্ছে বাঁধন রহমান। আমাদের রহমান পরিবারের আমার বড় চাচুর একমাত্র বড় ছেলে। অর্থাৎ এই শহরের এসপি। অনেকেই হয়তো আমাদের দেখে ভেবেছো, আমরা আপন ভাই। হ্যাঁ, আমরা এক মায়ের গর্ভের ভাই নই, কিন্তু সম্পর্কের দিক থেকে ও আমার কাছে আপন ভাইয়ের থেকেও কোনো অংশে কম নয়। বাঁধনের থেকে আমি আট মাসের ছোট। আমরা প্রায় পনেরো বছর একসঙ্গে বড় হয়েছি। ওর সঙ্গে আমার হাজারো স্মৃতি আছে, হাজারো গল্প আছে। সত্যি বলতে, সেই গল্প বলতে শুরু করলে আজকের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে, তবুও গল্প শেষ হবে না।
মুহূর্তেই মেয়েদের মধ্যে চিৎকার শুরু হয়ে গেল। মঞ্চে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুজন হ্যান্ডসাম ছেলেকে দেখে মেয়েদের ফিসফিসানি যেন আরও বেড়ে গেল।
একটা মেয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,

—-“দেখ, মনে হচ্ছে মঞ্চে দুটো চাঁদ উঠেছে আর আমরা সেই চাঁদ দেখছি!”
আরেকজন চাপা গলায় বলল,
—-“দুজনেই অনেক হ্যান্ডসান, বিশেষ করে বাঁধন।”
মেয়েদের কথাগুলো রূপার কানে স্পষ্টভাবে পৌঁছাচ্ছিল। আর অদ্ভুতভাবে প্রতিটা কথাই তার ভীষণ বিরক্ত লাগছে।
মনে হচ্ছে, মেয়েগুলো যেন তার কাছ থেকে বাঁধনকে কেড়ে নেওয়ার জন্য গোপনে কোনো ফন্দি আঁটছে।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই রূপা নিজেই কেমন অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কিন্তু তারপরও মঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েগুলোর ওপর থেকে তার বিরক্তি একটুও কমল না।আকাশ এবার বাঁধনের দিকে মাইক্রোফোনটা এগিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলল।

—-“এবার তুই কিছু বল।”
বাঁধন একবার মাইক্রোফোনের দিকে তাকাল। তারপর ধীর সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুহূর্তেই তার গম্ভীর মুখটা আরও কঠিন হয়ে উঠল। মেয়েদের চিৎকার ধীরে ধীরে থেমে পুরো হলরুম শান্ত হয়ে গেল।বাঁধন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল।
—-“আমি খুব বেশি কথা বলি না। তাই বড় কোনো বক্তব্য দেওয়ার মতো মানুষও আমি নই। তবে আজ এখানে দাঁড়িয়ে তোমাদের একটা কথা বলতে চাই। তোমরা যারা আজ এই কলেজ থেকে বিদায় নিচ্ছ, তোমাদের জীবনে তোমাদের বাবা-মায়ের পর সবচেয়ে বড় অবদান যাদের, তারা হলেন তোমাদের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তোমরা হয়তো অনেক সময় তাদের বকা খেয়েছ, তাদের কঠিন কথা শুনেছ, কখনো হয়তো মনে হয়েছে স্যার-ম্যাডামরা অযথাই এত কঠোর হচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বাস করো, তাদের সেই কঠোরতার পেছনেও তোমাদের ভালো চাওয়াটাই ছিল।”
বাঁধনের গম্ভীর কণ্ঠে পুরো হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে শুনছিল।

—-“তোমরা জীবনে অনেক বড় হবে। ভালো চাকরি করবে, ব্যবসা করবে, অনেক টাকা উপার্জন করবে, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করবে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, মানুষের আসল পরিচয় তার পদবি বা অর্থে না, তার ব্যবহারে। তাই জীবনে যত বড়ই হও, নিজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সম্মান করতে কখনো ভুলবে না। Because respect is earned, not demanded.”
বাঁধনের শেষ কথায় কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী মুগ্ধ হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল।বাঁধন এবার সামনে বসে থাকা শিক্ষকদের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-“আপনারা শুধু বইয়ের শিক্ষা দেননি, আমাদের মতো অসংখ্য মানুষকে জীবনের পথে চলার শিক্ষা দিয়েছেন। আপনাদের দেওয়া একটা ছোট উপদেশও হয়তো কোনো ছাত্রের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে। তাই আজ যারা এখান থেকে বিদায় নিচ্ছ, তারা তোমাদের শিক্ষকদের কথা মনে রেখো। জীবনে যত দূরেই যাও, নিজের শিকড়কে কখনো ভুলে যেও না।”

বাঁধন আর কোনো কথা না বলে মাইক্রোফোনটা আকাশের দিকে ফিরিয়ে দিল।মুহূর্তের জন্য পুরো হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে রইল। তারপরই চারপাশ হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল।রূপা চুপচাপ বাঁধনের দিকে তাকিয়ে রইল। বাঁধনের গম্ভীর কণ্ঠ, শিক্ষকদের প্রতি সম্মান আর কথার ভেতরের দৃঢ়তা সবকিছুই অদ্ভুতভাবে তার চোখে আটকে গেল।তবে পরক্ষণেই বাঁধনের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকা মেয়েগুলোকে দেখে রূপার মুখটা আবারও গম্ভীর হয়ে গেল।
এবার অংশগ্রহণের পর্ব শুরু হলো। আকাশ নিজেই অংশগ্রহণকারীদের তালিকা সম্বলিত ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল। তালিকার একদম উপরের নামটা পড়েই আকাশের চোখ কপালে উঠল। সে এক মুহূর্ত বাঁধনের দিকে তাকাল। বাঁধন মঞ্চ থেকে নিচে নামার জন্য এক পা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই আকাশ মাইক্রোফোনে ঘোষণা করল,

—- “আমাদের আজকের বিদায় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব কবিতা আবৃত্তি। তালিকায় সবার উপরে আছে রূপা। রূপা, তুমি মঞ্চে উঠে এসো।”
রূপার নামটা ঘোষণা হতেই বাঁধনের পায়ের পাতা মঞ্চের মেঝেতে যেন আটকে গেল। সে আর নিচে নামল না, বরং সোজা দৃষ্টিতে নিচে চেয়ারে বসে থাকা রূপার দিকে তাকাল। রূপার সারা শরীর তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। নিজের নাম শুনেই সে পাথরের মূর্তির মতো জমে গেছে। রূপার এমন জড়তা দেখে বৃষ্টি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
—- “কী হলো? ওঠ, যা!”

রূপা ধীরে পায়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে কবিতার ডায়েরিটা বের করে মাথা নিচু করে ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। রূপার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন হাজারটা কাঁটা বিছানো। আকাশ মাইক্রোফোনের সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। রূপা কাঁপা কাঁপা পায়ে মাইক্রোফোনের স্ট্যান্ডটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই বাঁধন স্থির পায়ে হেঁটে এসে রূপার ঠিক গা ঘেঁষে দাঁড়াল। বাঁধনকে এমন আচমকা নিজের পাশে দেখে রূপা চমকে উঠল, তার হৃৎস্পন্দন যেন বুকের ভেতর ড্রাম পিটাতে শুরু করল। এই মানুষটা কেন তার পাশে? বাঁধনের এই তীব্র পুরুষালি উপস্থিতি রূপার অস্তিত্বকে যেন গ্রাস করে ফেলছে। এই অবস্থায় কবিতা আবৃত্তি করা তো দূরের কথা, ঠিকমতো শ্বাস নেওয়াও রূপার কাছে অসম্ভব বলে মনে হতে লাগল।সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে তার। গলা দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছে না। বাঁধন রূপার এই অবস্থা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করল। তারপর ঝিমঝিম করা গলার স্বরে নিচু গলায় ফিসফিসিয়ে উঠল।

—- “আমি এখানে রোমান্স করছি না যে আমাকে দেখে এভাবে কাঁপতে হবে। ইডিয়ট, না কেঁপে শুরু কর।”
বাঁধনের কণ্ঠের এই আদেশের ধমকে রূপা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল। দ্রুত একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে সে কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়েরিটা খুলল। সামনে তাকিয়ে জোর করে ঠোঁটে একটা মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে নিয়ে বলল,
—- “আসসালামু আলাইকুম। আমি রূপ…”
বাকিটুকু উচ্চারণ করার আগেই কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বাঁধন তাকে থামিয়ে দিল।
—- “উহু, দ্যাটস নট ইয়োর নেম এনিমোর। মিসেস বাঁধন রহমান।”
মুহূর্তেই থমকে গেল রূপা। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাঁধনের দিকে তাকাতেই দেখল, লোকটা দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে কোনো হাসি নেই, চোখেমুখে নেই বিন্দুমাত্র দ্বিধা। রূপা কিছুটা ইতস্তত করে নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,
—- “এখন এই নামটাই বলব আমি?”
বাঁধন কোনো নড়চড় ছাড়াই দৃঢ় সংক্ষিপ্ত স্বরে জবাব দিল,
—- “ইয়েস। দ্যাটস ইয়োর আইডেন্টিটি নাউ।”
রূপা ঢোক গিলল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে,
—- “কিন্তু সবাই…!”
বাঁধন আবারও তাকে থামিয়ে দিল।

—- “সবাই কী ভাবল আর কী ভাবল না, তাতে কিছু যায় আসে না আমার। আই ডোন্ট কেয়ার। বাট এখন আমি কোনো এক্সকিউজ শুনতে চাচ্ছি না।”
এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল রূপা। চারপাশের ভিড়, হাজারো চোখের চাহনি সব যেন এক নিমেষে অর্থহীন হয়ে গেল তার কাছে। অসহায়ের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আবার মাইক্রোফোনের সামনে ঝুঁকে দাঁড়াল। লজ্জায় কান দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠলেও, সে নিজেকে সামলে নিল। মিষ্টি হেসে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে উঠল,
—- “আসসালামু আলাইকুম। আমি মিসেস বাঁধন রহমান। উপস্থিত সম্মানিত অধ্যক্ষ মহোদয়, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রিয় অতিথিবৃন্দ এবং আমার প্রাণের সহপাঠী সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। আজকের এই বিদায় অনুষ্ঠান আমাদের সবার জীবনের এক আবেগঘন মুহূর্ত। হাসি, আনন্দ, স্মৃতি আর কিছুটা বিষাদের মিশেলে সাজানো এই আয়োজন চিরকাল আমাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। সেই অনুভূতিকে হৃদয়ে ধারণ করে আমি এখন একটি কবিতা আবৃত্তি করতে যাচ্ছি। আশা করি, কবিতাটি আপনাদের ভালো লাগবে। ধন্যবাদ।”

অবিবাহিত মেয়ের মুখে ‘মিসেস বাঁধন রহমান’ পরিচয়টা শোনার পর পুরো অডিটোরিয়ামে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। ছাত্র-ছাত্রীরা কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরোপুরি পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল, যেন তারা নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু সেই বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই শুরু হলো অট্টহাসি। সবার মনে হলো, এটা হয়তো কোনো সস্তা কৌতুক বা অভিনয়। তাদের উপহাসের হাসি আর ফিসফাস অডিটোরিয়ামের বাতাসে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগল।রূপা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, লজ্জায় মাথাটা তার মাটির দিকে নেমে এল। তার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে সবাই কেন এভাবে উপহাস করছে? আমি কি কোনো ভুল করলাম? চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল তার।
সবার এই মশকরায় বাঁধনের চোয়াল শক্ত হয়ে কাঠ হয়ে গেল। তার চোখের তখন দৃষ্টিতে আগুনের তীব্রতা। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। মাইক্রোফোনটা এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে রূপাকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে জড়িয়ে ধরল। যেন সে পুরো জগতের সামনে নিজের অধিকার জাহির করছে। বাঁধন গর্জে উঠল,

—- “শি ইজ মাই ওয়াইফ!”
বাঁধনের একটি শব্দে পুরো মঞ্চে যেন বোমা ব্লাস্ট হলো। হাসির শব্দ মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে এক গভীর স্তব্ধতা নেমে এল। সবার চোখ ছানাবড়া, অবিশ্বাস আর বিস্ময়ে ছাত্রীদের মুখ হাঁ হয়ে গেল। বাঁধন রূপাকে আরও শক্ত করে ধরে সামনে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—- “রূপা, শী ইজ মাই ওয়াইফ, অর্থাৎ মিসেস বাঁধন রহমান। সে নিজের পরিচয়ই দিয়েছে। এখানে এই নাম নিয়ে হাসার মতো কী হলো? তোমরা হয়তো জানো না, কিন্তু জানার দরকার ছিল। কেন সে ‘মিসেস’ বলল একটা অবিবাহিত মেয়ে এমনটা দাবি করল কেন, তা নিয়ে মজা শুরু করার আগে তোমাদের জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল?”
বাঁধন এবার ডান হাতে লেকটার্নটা সজোরে চেপে ধরল,। তার গলার রগ ফুলে উঠল রাগে। সে আবার গর্জন করে উঠল,

—- “পড়াশোনা করে এই শিক্ষা পেয়েছ তোমরা? কার সাথে কীভাবে আচরণ করতে হয়, সেই সেন্স কি হারিয়ে ফেলেছ? যাক, সেটা আমার দেখার বিষয় না, দ্যাটস ইউর পার্সোনাল ম্যাটার। এখন আমার কথা সবাই সরি বলবে ওকে। রাইট নাউ।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো অডিটোরিয়াম যেন জমাট বেঁধে গেল। বাঁধনের সেই গম্ভীর এবং রাগী হুমকির পর ছাত্রছাত্রীরা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। কারও সাহস হলো না মাথা তুলে তাকানোর। একে একে সবাই অপরাধীর মতো নিচু স্বরে উচ্চারণ করতে লাগল,
—- “সরি রূপা।”

সবাই সরি বলা শেষ করার পর মঞ্চে এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এল। অডিটোরিয়ামের বাতাস যেন ভারী হয়ে আছে। মেয়েদের চোখ বারবার রূপার দিকে ঘুরে যাচ্ছে, যেন তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না এই শহরের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এসপির স্ত্রী এই রূপা! যে ছেলেটিকে নিয়ে এতক্ষণ তারা নিজেদের মতো করে সুখের স্বপ্ন বুনছিল, সেই ছেলেটি যে বিবাহিত এই অমোঘ সত্যটি তাদের সব স্বপ্নকে নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দিল। প্রেমে পড়ার আগেই যেন সবাই এক চরম ‘ছ্যাঁকা’ খেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। সবকিছু যেন এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল।বাঁধন রূপার দিকে তাকিয়ে শীতল ও দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দিল,
—- “চুপ করে না থেকে শুরু কর। ডোন্ট ওয়েষ্ট মাই টাইম।”
রূপা এক মুহূর্তের জন্য বাঁধনের দিকে তাকাল। লোকটার রাগী চেহারার আড়ালে এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব। সে বাধ্য হয়েই আবার মাথা উঁচু করল। ডায়েরির পাতার দিকে তাকিয়ে মুখে জোর করে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে নিল। এরপর শান্ত কিন্তু স্পষ্টভাবে কবিতা আবৃত্তি শুরু করল।অডিটোরিয়ামের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী এখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিস্তব্ধ হয়ে সেই আবৃত্তি শুনছে। বাঁধন দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে মূর্তিমানের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার স্থির দৃষ্টি রূপার ওপর আটকে আছে। রূপার ঠোঁট নাড়ানোর ভঙ্গি, তার সেই মিষ্টি হাসি আর প্রতিটি শব্দের আবেগ সবকিছু বাঁধনের বুকের ভেতর এক অদৃশ্য আলোড়ন তুলে দিয়ে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে চারটা বেজে গেল। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা যে যার গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, নাদিয়া আর কেয়া রূপাকে টেনেহিঁচড়ে এক কোণে নিয়ে গিয়ে যা ইচ্ছে তাই বলছে। রূপার বিয়ে হয়েছে অথচ ওরা কেন জানল না, তাও আবার তার সৎ ভাইয়ের সাথে! এই খবরটা মুহূর্তে পুরো কলেজ চত্বরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। যারা রূপা আর বাঁধনকে চেনে, তারা এখন আড়ালে ফিসফাস শুরু করেছে—”ভাই-বোন বিয়ে করল! একটুও লজ্জা করল না! ছিঃ, এরকম সন্তান যেন কারো ঘরে না হয়!” লোকগুলো আড়ালে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করলেও, সামনে গিয়ে কিছু বলার সাহস কারোরই নেই। বাঁধন আর আকাশ ততক্ষণে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত।

ওদিকে সীমা যেন শোকে পাথর হয়ে গেছে। রূপা বিবাহিত এই কথাটা সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। আতঙ্কে তার সারা শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। ইশতিয়াকের কথা ভাবতেই সীমার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। ইশতিয়াক যদি এই সত্যিটা জেনে যায়, তবে সে কি আদৌ এটা মেনে নিতে পারবে?সীমার এলোমেলো ভাবনার মাঝেই তার হাতের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ভেসে উঠেছে ‘প্রিয় স্বামী জান’ নামটা দেখেই তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। ইশতিয়াক ইদানীং কাজের প্রয়োজনে ঢাকা গেছে, কিছুদিনের মধ্যেই ফেরার কথা। ইশতিয়াক ফোনে সবসময় রূপার খোঁজখবর নেয়। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সীমা স্থবির হয়ে রইল, ফোনটা রিসিভ করবে কি করবে না বুঝতে পারছে না। তার দ্বিধার মাঝেই ফোনটা একবার কেটে গিয়ে আবারও বেজে উঠল। এবার বাধ্য হয়ে সীমা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশ থেকে ইশতিয়াকের বিরক্ত কণ্ঠ ভেসে এল,

—- “অনুষ্ঠান কি এখনো শেষ হয়নি? কল কেন ধরছিলে না?”
সীমা শুকনো ঢোক গিলল। তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা গলায় কোনোমতে বলল,
—- “ওই আসলে একটু ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম তো, তাই খেয়াল করিনি।”
ইশতিয়াক শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—- “কোথায় তুমি এখন?”
সীমা কাঁপা গলায় উত্তর দিল,
—- “কলেজে।”
—- “ও, তার মানে অনুষ্ঠান শেষ হয়নি?”
—- “হুম, শেষ হয়েছে।”
—- “রূপা কি আশেপাশেই আছে?”
সীমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ফোনটা কানে চেপে সে দ্রুত চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কিছুটা দূরেই গেটের কাছে রূপাকে দেখা যাচ্ছে, বান্ধবীদের সঙ্গে কী যেন বলছে। সীমা নিচু স্বরে বলল,
—- “হ্যাঁ, আশেপাশে আছেই।”
ইশতিয়াক কোনো রাখঢাক না করেই বলে উঠল,

—- “শোনো সীমা, আমি এবার ফিরে এসেই রূপাকে প্রপোজ করব। আর এই সব ম্যানেজ করার দায়িত্ব তোমার। তুমি যেভাবে পারো, ওকে রাজি করাবে। আমি ঢাকা এমনি আসিনি, বড় একটা চাকরির বন্দোবস্ত হয়েছে আমার। আমার প্ল্যান একদম পরিষ্কার ফিরেই রূপাকে প্রপোজ করব, এরপর তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে ওকে বিয়ে করে ফেলব।”
ইশতিয়াকের প্রতিটি কথা যেন সীমার বুকের ভেতর ধারালো ছুরির মতো বিঁধল। তার পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। রূপা যে বিবাহিত এই অমোঘ সত্যিটা ইশতিয়াক জানলে কী করবে, তা ভেবেই সীমার মাথা ঘুরছে। লোকটা যে জেদি, এই সত্যিটা সে কোনোভাবেই মেনে নেবে না। সীমা চুপ করে আছে দেখে ইশতিয়াক বিরক্তির সুরে বলল,

—- “কিছু বলছো না যে? শরীর কি খারাপ তোমার?”
সীমার চোখের কোণ দিয়ে দুই ফোঁটা উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে দ্রুত হাত দিয়ে চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলল,
—- “না, আমি একদম ঠিক আছি। আপনি দ্রুত আসেন, আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব।”
ইশতিয়াক এবার বেশ খুশি হয়েই বলল,
—- “ধন্যবাদ সীমা। আমি মন থেকে দোয়া করি, আমার কাছ থেকে যাওয়ার পর তুমি যেন একজন যত্নশীল মানুষের হাতে পড়ো, যে তোমাকে অনেক ভালোবাসবে।”
সীমার গলাটা একদম বুজে আসছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো বুকটা ফেটে রক্ত বের হবে। কোনোমতে নিজেকে সামলে, ভাঙা গলায় ফুঁপিয়ে উঠল সে।
—- “আপনার দোয়া আমার চাই না।”

বলেই সে ফোনটা কেটে দিল। হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা যেন সীমার কাছে এখন জ্বলন্ত কয়লা। বুকের ভেতর দাউ দাউ করে জ্বলছে এক অসহ্য যন্ত্রণা, যা সহ্য করা সীমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কান্নার দমক আড়াল করতে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ইসরাতকে হাত ধরে টেনে নিয়ে দ্রুত কলেজের গেট থেকে বেরিয়ে গেল সে।অন্যদিকে, বাঁধন আর আকাশ প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে কথা শেষ করে বেরিয়ে এল। নাদিয়া আর কেয়া তখনও রূপার কাছাকাছি ছিল, কিন্তু বাঁধনকে দেখেই ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে দ্রুত বিদায় নিয়ে কেটে পড়ল। এখন গেটের সামনে রূপা আর বৃষ্টি দাঁড়িয়ে, তাদের মুখোমুখি বাঁধন আর আকাশ। আকাশ কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল, এরপর একটা চাতুর্যের হাসি হেসে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলল।

—- “বাঁধন, সারাদিন তো গুমোট হয়ে কাটল। চল, কোথাও একটু ঘুরে আসি?”
বাঁধন কোনো উত্তর দিল না। তার শান্ত চোখের দৃষ্টিতে হঠাৎ একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। পরনের কালো ব্লেজারটা এক ঝটকায় খুলে রূপার দিকে ছুড়ে মারল সে। ব্লেজারটা গিয়ে সরাসরি রূপার মাথার ওপর আছড়ে পড়ল। রূপা চমকে উঠল, ব্লেজারটা খামচে ধরে রাগী চোখে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে ফুঁসে উঠল,
—- “এটা কি হলো? এভাবে ছুড়ে মারলেন কেন?”
বাঁধন তার কথার কোনো গুরুত্বই দিল না। ধীরস্থিরভাবে শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে সে আকাশের দিকে ফিরল। তার চোখের চাহনিতে এখন এক অদ্ভুত দাপট,

—- “কোথায় যাবি?”
আকাশ এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল,
—- “চল, কাছেই নদীটা আছে। শুনেছি বর্ষায় পানি অনেক বেড়েছে, ঝোড়ো হাওয়াটাও উপভোগ করা যাবে। চল, সেখানে যায়।”
বাঁধন আর কোনো কথা বাড়াল না। সে রূপা আর বৃষ্টির পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একচ্ছত্র দাপট। না থেমে, পিছন ফিরেও না তাকিয়ে আকাশকে নির্দেশ দিল,
—- “দুটোকেই নিয়ে আয়।”
আকাশ রূপা আর বৃষ্টির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
—- “দাঁড়িয়ে না থেকে চল।”
বৃষ্টি পরিস্থিতি বুঝে কুঁকড়ে গেল। সে ইতস্ততবোধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে করজোড়ে বলল।
—- “স্যার, আপনারা যান। সন্ধা হয়ে আসছে, আমি বাসায় চলে যাই।”
আকাশ বৃষ্টির দিকে এক পা এগিয়ে গেল। তার চাউনিতে এখন আর আগের সেই বন্ধুসুলভ ভাব নেই, আছে এক তীব্র কর্তৃত্ব। সে ধমকের সুরেই বলল,
—- “তোমার কাছে কি আমি জানতে চেয়েছি তুমি কোথায় যাবে? আমি বলেছি যখন, তখন কোনো কথা না বলে চুপচাপ আমাদের সাথে চলো।”

বৃষ্টি আর টু শব্দ করার সাহস পেল না। আকাশের শীতল আর কড়া চাহনি দেখে তার মুখ দিয়ে কথা সরে গেল। রূপা আর বৃষ্টি বাধ্য হয়ে আকাশের পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা গাড়ির কাছে পৌঁছাল। রূপা আর বৃষ্টি নিভৃতে গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসল। সামনের ড্রাইভিং সিটে বাঁধন বসল পাথরের মতো শক্ত হয়ে, তার পাশের সিটে আকাশ। পুরোটা পথ গাড়ির ভেতরে এক দমবন্ধ করা নীরবতা। বাঁধন খুব সাবলীলভাবে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল এবং কিছুক্ষণ পর নদীর পাড়ে এসে গাড়ি থামাল।
চারজন গাড়ি থেকে নেমে নদীর একদম কিনারে গিয়ে দাঁড়াল। সন্ধ্যার ম্লান আলোয় নদীর পানি আঁকাবাঁকা ঢেউয়ে ছন্দ তুলছে। নদীর হিমেল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে চারপাশ দিয়ে। রূপার মনটা মুহূর্তের মধ্যে বিষাদ ভুলে খুশিতে ঝলমল করে উঠল। বাঁধনের বিশাল ব্লেজারটা তার বুকে জড়িয়ে আছে, সেটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে রূপা চোখ বন্ধ করল। বাতাসের ঝাপটায় তার চুলগুলো উড়ছে, বৃষ্টির মনের সব ভয় কাটিয়ে সেখানে এখন একরাশ মুগ্ধতা।রূপার খুব ইচ্ছে হলো পানিটা একবার ছুঁয়ে দেখার। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, ঢালু বালি বেয়ে নিচে নামার জন্য এক পা বাড়াতেই বাঁধন বিদ্যুতের গতিতে রূপার হাত চেপে ধরল। বাঁধনের কণ্ঠস্বর এখন আগুনের মতো উত্তপ্ত।

—- “ওইদিকে কোথায় যাস?”
রূপা তার হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতে বলল।
—- “একটু পানি ধরব! হাতটা ছাড়ুন না, প্লিজ!”
বাঁধন তার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল,
—- “ছুঁতে হবে না! দেখছিস না পানি কত বাড়ছে? একদম নিচে নামবি না, কথা কানে যাচ্ছে না?”
রূপা গাল ফুলিয়ে জেদ ধরল।
—- “প্লিজ একটু! জাস্ট একটু ধরব! প্লিজ, প্লিজ!”
বাঁধন ধমক দিয়ে গর্জে উঠল।
—- “আমি না করছি শুনতে পাচ্ছিস না? আই অ্যাম উইক ফর ইউ, রূপ। তোকে নিয়ে বিন্দুমাত্র রিক্স নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।”
বাঁধনের এসব আবেগমাখা কথার ধার ধারছে না রূপা। তার মাথায় তখন অন্য এক নেশা চেপেছে, যে করেই হোক তাকে পানি ছুঁতেই হবে। সুযোগ বুঝে রূপা এক ঝটকায় বাঁধনের কব্জিতে সজোরে দাঁত বসিয়ে দিল। বাঁধন ব্যথায় আর্তনাদ করে হাত ছাড়িয়ে নিল।

—- “আহহ! রূপের বাচ্চা!”
হাত ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রূপা ব্লেজারটা জড়িয়ে ধরেই বালি বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে গেল। নদীর কিনারে পৌঁছেই সে পানি নিয়ে অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠল। দুই হাতে পানি ছিটিয়ে সে খিলখিল করে হেসে উঠল, তার সেই হাসি যেন নদীর ঢেউয়ের চেয়েও বেশি প্রাণবন্ত আর ছন্দময়।বাঁধন যন্ত্রণায় হাতটা ধরে রাগে কাঁপছিল, কিন্তু রূপার সেই হাসির শব্দ কানে যেতেই সে নিচে তাকাল। পানির ছিটায় ভিজে যাওয়া রূপার সেই বাঁধনহারা খুশি দেখে বাঁধনের ভেতরের সমস্ত রাগের আগুন নিমেষেই নিভে গেল। হাতের যন্ত্রণার কথা সে ভুলেই গেল। এক অদ্ভুত ঘোর লাগা দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইল রূপার দিকে, তার মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য যেন ওই একটুকরো হাসিতে আটকে আছে।রূপার বাঁধনহারা খুশি দেখে বৃষ্টিও আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক মুহূর্তের দ্বিধা কাটিয়ে সে-ও বালি পেরিয়ে নিচে নেমে এল। দুই বান্ধবী তখন নদীর পানিতে একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে খুনসুটিতে মত্ত। ওপরে দাঁড়িয়ে বাঁধন আর আকাশ দুজনেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই দুই প্রাণবন্ত মূর্তির দিকে তাদের চোখে এখন এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।হঠাৎ খেলার মাঝখানে রূপা কী ভেবে যেন বালি থেকে এক মুঠো ভেজা কাদা তুলে নিল। তার চোখে তখন দুষ্টুমির ঝিলিক। ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁধনের দিকে তাক করে সে মুহূর্তের মধ্যে কাদাটা ছুড়ে মারল। ‘প্যাঁত’ করে শব্দ হলো কাদাগুলো গিয়ে সরাসরি বাঁধনের ধবধবে সাদা শার্টের কাঁধ আর বুকের ওপর লেপ্টে গেল। সাদা শার্টে কাদার কালো দাগটা যেন রূপার চরম স্পর্ধা। রূপার এমন কাণ্ড দেখে বৃষ্টিও সাহস পেয়ে গেল সে-ও এক মুঠো পানি তুলে সজোরে আকাশের গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল।

—- “হ্যাপি এনজয় স্যার! একটু না ভিজলে ঘোরার মজাই পাওয়া যাবে না!”
মুহূর্তের মধ্যে বাঁধন আর আকাশের চেহারা বদলে গেল। তাদের চোখের শান্ত দৃষ্টিতে এখন রাগের আগুন জ্বলছে। শিকারি বাঘের মতো তারা দুজনে বালি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। বৃষ্টি দুজনের অবস্থা দেখেই আঁচ করতে পারল মহাবিপদ! সে অন্য দিকে ঘুরে বালির ওপর দৌড়াতে শুরু করল আর চিৎকার করে রূপাকে সতর্ক করল।
—- “রূপা ভাগ! সিংহ খেপেছে! একবার ধরতে পারলে আস্ত খেয়ে ফেলবে!”
রূপা দৌড়ানোর আগে বাঁধানের দিকে তাকাল দেখল বাঁধন আগুনের মতো রাগী চোখে সোজা তার দিকেই ধেয়ে আসছে। মুহূর্তের দেরি না করে রূপা বৃষ্টির পিছু পিছু দৌড় শুরু করল। বাঁধন আর আকাশও ওদের পেছনে ছুটল। বাঁধনের গলার গর্জন বাতাস চিরে বেরিয়ে এল।

—- “রূপ! দাঁড়া বলছি!”
ওদিকে আকাশ বৃষ্টির পেছনে মরিয়া হয়ে ছুটছে। বৃষ্টি দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপাচ্ছে, তার গায়ের জামাটা বালিতে জড়িয়ে যাচ্ছে, তবুও সে প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে আর আর্তনাদ করছে।
—- “স্যার, ভুল হয়ে গেছে! খুশির চোটে কখন যে কী করেছি নিজেও জানি না! সরি স্যার, প্লিজ আর হবে না, মাফ করে দিন!”
এদিকে দৌড়াতে দৌড়াতে রূপার পায়ের তলার বালু সরে গেল। ভারসাম্য রাখতে না পেরে রূপা আছাড় খেয়ে পড়ল পিচ্ছিল কাদায়। বাঁধনের সেই দামী, পরিষ্কার ব্লেজারটা যা রূপা নিজের গায়ে জড়িয়ে রেখেছিল, সেটা মুহূর্তের মধ্যে কাদায় মাখামাখি হয়ে নষ্ট হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁধন এসে রূপার সামনে এসে দাঁড়াল। সে দাঁত চেপে, আগুনের মতো জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকিয়ে রইল।বাঁধনের রাগী চাহনি দেখে রূপা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সে পিছিয়ে যেতে যেতে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল।

—- “সরি, মজা করেছি! প্লিজ, ভুল হয়ে গেছে ভাইয়া!”
কিন্তু বাঁধন কোনো চেঁচামেচি করল না। সে মুহূর্তের মধ্যে রূপার সামনে কাদার ওপরই হাঁটু গেড়ে বসল। রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে সে এক অদ্ভুত, মিষ্টি হাসি হাসল। এতক্ষণ পর এই শান্ত হাসি দেখে রূপার ভয় যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে এত রাগী মানুষটা হুট করে এত শান্ত হয়ে গেল কীভাবে?বাঁধন রূপার চোখের আড়ালে, কোনো এক ফাঁকে বালু থেকে দুই হাতে কাদা তুলে নিল। সে বাঁকা হেসে আলতো করে রূপার গাল দুটো নিজের দুই হাতে ধরল। রূপার ত্বকে বাঁধনের হাতের শীতল স্পর্শ আর কাদার ঠান্ডা অনুভূতি লাগতেই সে শিউরে কেঁপে উঠল। বাঁধন স্থির দৃষ্টিতে রূপার চোখের গভীরের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল।
—- “আরে ইয়ার, জানুটুস, ভয় পাচ্ছিস কেন? কিছু করব না তো।”
হঠাৎ রূপার মনে হলো, তার গালে খুব ঠান্ডা কিছু একটা লেগে আছে। সে দ্রুত বাঁধনের হাতটা নিজের গাল থেকে সরিয়ে নিল, আর আঙুলের ডগায় লেগে থাকা সেই ভেজা কাদার আস্তরণ দেখে তার চোখ কপালে উঠল। সে ধড়ফড় করে বাঁধনের দিকে তাকাল। বাঁধন তখনো তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, ঠোঁটের কোণে বাঁকা,হাসি। রূপা বিরক্তির সুরে জিজ্ঞেস করল।

—- “এটা কী হলো?”
বাঁধন যেন কিছুই জানে না এমন একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—- “কী হয়েছে?”
রূপা এবার রাগে ফুঁসে উঠল,
—- “আপনি আমাকে কাদা দিলেন কেন?”
বাঁধন এবার রূপার মুখের একদম কাছে ঝুঁকে এল। বাঁধনের গরম নিশ্বাস রূপার মুখমণ্ডল ছুঁয়ে যেতেই রূপার সারা শরীর একটা অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল। সে যেন স্থবির হয়ে গেল। বাঁধন ফিসফিস করে বলল।
—- “প্রতিশোধ নিয়েছি।”

রূপা কোনো কথা বলতে পারল না। কাদা মাখা গালে সে চুপচাপ কাদার ওপরেই বসে রইল। রূপার সেই নীরবতা বাঁধন খেয়াল করল। রূপার ধবধবে ফর্সা গালের দুই পাশে কাদার কালো দাগগুলো দেখে বাঁধনের ভেতরে হাসির ফোয়ারা ছুটছে, কিন্তু সে অমানুষিক শক্তিতে ঠোঁট কামড়ে সেই হাসি চেপে রাখল।এরপর বাঁধন রূপার সামনে থেকে উঠে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে বসল। দুই হাত পেছনে ভর দিয়ে নদীর দিকে তাকাল। দূরের নদীর ঢেউগুলো তখন আঁধারে দোল খাচ্ছে। বাঁধন এক অদ্ভুত ঘোর লাগা, গভীর কণ্ঠে গেয়ে উঠল।

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৫

“নদীর পানি দেখলে তোমায় করে ছলো ছল
“দোহাই লাগে উড়ায়ও না শাড়িরও আঁচল”
এক মুহূর্ত থামল সে, তারপর চোখ ফিরিয়ে রূপার পানে চেয়ে আবার গাইল।
“তুমি বাঁকা ঠোঁটে আর হেসো না, দেখবো যে জ্বর আসিলে”
“বাতাস লাগে না আমার প্রাণে”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here