ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২৪
নওরিন কবির তিশা
নিঝুম, নিস্তব্ধ এক নগরীর ন্যায় এই ব্যস্ত কোলাহলময় শহর থেকে যেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক কোণে একাকী দিনাতিপাত করছেন জয়নব বেগম অর্থাৎ ফরিদা খান। পার্থিব কোনো পিছুটান কিংবা হারানোর ভয় যার নেই, তার অবয়বে যে অলৌকিক উদাসীনতা ও প্রশান্তি বিরাজ করে, ওনার চোখে-মুখেও ঠিক তেমনটাই প্রতিভাত।
চিরাচরিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে আকস্মিক ঘরের কলিং বেলটি কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। এই অসময়ে ওনার এই নির্জন কুটিরে কার আগমন ঘটতে পারে, তা ভেবে উনি কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন। পরনের সাধারণ সুতি শাড়িটির আঁচলটা মাথায় টেনে নিয়ে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে কণ্ঠস্বর সামান্য উঁচিয়ে বললেন,,
- আসছি, একটু দাঁড়ান।
দরজার ভারী কাঠের পাল্লাটি সশব্দে উন্মুক্ত হতেই জয়নব বেগমের চক্ষুদ্বয় বিস্ময়ে পুরোপুরি স্থির হয়ে গেল; ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে রইল, মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোলো না। ওনার সম্মুখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে আছে তিয়াশা আর আরাভ। দেড়টা মাসের ব্যবধানে আরাভকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও সবল দেখে ওনার চোখ দুটো মুহূর্তেই পরম মায়ায় সজল হয়ে উঠল।
– তোরা?
তিয়াশা চটপটে কণ্ঠে উত্তর দিয়ে বলল,,
– জ্বি ম্যাম,ভেতরে আসতে বলবেন না?
জীবনে প্রথমবারের মতো তিয়াশার এমন প্রাণোচ্ছল রুপ অবলোকন করে থমকালো আরভের দৃষ্টিযুগল। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে ও একদৃষ্টে চেয়ে রইলো তিয়াশার পানে। এদিকে চূড়ান্ত বিষ্ময়ে স্থাণুর ন্যায় জমে যাওয়া ফরিদা খান তিয়াশার কণ্ঠে সম্বিৎ ফিরে পেলেন।
– হ-হ্যাঁ। আ-আয়।
উচ্ছ্বাস সামলে জয়নব বেগম ওদের ঘরের ভেতরে আসার জন্য পথ ছেড়ে দিতেই, ওনার দৃষ্টি গেল ওদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তৃতীয় অবয়বটির পানে। ধীর, গম্ভীর পদক্ষেপে ঘরটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে চেনা অথচ বহুকাল না শোনা এক কণ্ঠে সেই পুরুষটি শুধাল,
- শুধু ওদেরই ভেতরে ডাকবে ফরিদা? আমাকে কি এভাবেই চৌকাঠে দাঁড় করিয়ে রাখবে?
কণ্ঠস্বরটি শোনামাত্রই জয়নব বেগমের সর্বাঙ্গে যেন এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। ওনার কম্পিত দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হলো সুপরিচিত সেই দাপুটে অবয়বটির ওপর। ক্ষমতা আর আভিজাত্যের চাদরে মোড়ানো স্বয়ং আনোয়ার খান আজ সমস্ত ইগো বিসর্জন দিয়ে ওনার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। এই বিস্ফোরক সত্যটি হজম করতে ফরিদা বেগমের বেশ বেগ পেতে হলো।
ওনার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, কিন্তু কোনো শব্দ ফুটল না। আরাভ আর তিয়াশা নিঃশব্দে একপাশে দাঁড়িয়ে প্রবীণ এই দম্পতির ভেতরের নীরব ঝড় অবলোকন করছিল। আনোয়ার খান এক পা বাড়িয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। ফরিদা বেগমের কম্পিত হাতটি নিজের দুই হাতের অঞ্জলিতে আগলে নিয়ে অতি মৃদু স্বরে বললেন,,
- ভুল আমারই ছিল ফরিদা। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে আমি হিরের টুকরো হারিয়ে কাচ কুড়িয়েছিলাম। এই দীর্ঘ দেড় দশকের একাকীত্ব আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, রাজপ্রাসাদের চেয়ে তোমার এই শান্ত কুটিরই আমার আসল আশ্রয়। ক্ষমা কি পাব না?
ফরিদা বেগম আর কোনো বাধা দিতে পারলেন না। ওনার বুক চিরে এক দীর্ঘ প্রলম্বিত শ্বাস বেরিয়ে এলো। উনি আনোয়ার খানের হাত থেকে নিজের হাতটি ছাড়িয়ে না নিয়ে, মাথাটা আলতো নুইয়ে বললেন,,
- ভেতরে এসো।
– সকাল সকাল এগুলো কোন ধরনের ইয়ার্কি আদ্রিতা?
– আ’ম সিরিয়াস!
– ফোন রাখো অসভ্য মেয়ে!
বরাবরের ন্যায় সাইদের এমন ধমকে কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলো তরুণীর ক্ষীণ কায়া। তবুও দমে না গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়লো,,
– আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন না?
– বুঝতে চাই না স্টুপিড।
– আরে ভাই! বুঝুন, সিরিয়াসলি দেখাশোনা চলছে আমার।
– তাতে আমি কি?
– বা*ল! বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান।
এ পর্যায়ে ফুঁসে উঠল আদ্রিতা! মানে,তখন থেকে একটা জিনিস বোঝানোর চেষ্টা করছে আর এই লোক বুঝতেই নারাজ! এদিকে, ওর এমন ক্রোধে ওকে মানানোর পরিবর্তে দ্বিগুণ তেজস্বী গলায় সাইদ বললো,,
– এই মেয়ে? আমি তোমার প্রেমিক? নাকি কখনো বলেছি তোমায় ভালোবাসি? এমন পাগলামি করছো কেন?
এতক্ষণের চঞ্চল অক্ষিপট মুহূর্তেই সিক্ত হলো অশ্রুকণায়। কান্না চেপে ধরা গলায় বলল,,
- প্রেমিক হতে হবে কেন? একবার মন থেকে বলতে পারেন না যে আপনি আমাকে চান?
সাঈদ ওপাশ থেকে তপ্ত এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত রুক্ষ স্বরে বলল,,
– ধুর! আজেবাজে কথা বোলো না তো। বিয়ে-শাদি বড্ড ঝামেলার জিনিস, ওসব আমার জন্য নয়। তোমার বিয়ে যেখানে ঠিক হচ্ছে, চুপচাপ বসো গিয়ে!
কান্নার বেগ আর সামলাতে পারল না আদ্রিতা। ও হড়বড় করে কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে উঠলো,,
– ওকে ফাইন! আমি যখন নিজেকে চিরতরে শেষ করে দেব, তখন বুঝবেন! আমার ম”রা মুখ দেখার পর আপনার এই দেমাগ ধুয়ে পানি খাবেন!
কথাটা বলেই ও ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে দিতে চাইল, কিন্তু সাইদ ক্ষিপ্ত সিংহের ন্যায় গর্জে উঠল,,
– খবরদার আদ্রিতা! একদম ফোন কাটবে না! নিজের জীবন শেষ করার হুমকি দিয়ে আমায় ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছ? যা ইচ্ছা করো গে যাও! আমার কিছু যায় আসে না!
সাইদের এই চরম নির্মমতায় আদ্রিতার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। ও কাঁদতে কাঁদতে এবার ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,,
– সত্যিই কিছু যায় আসে না আপনার? আচ্ছা, বেশ! আপনাকে আমার লা”শের খাটিয়া বহন করার আহ্বান রইলো।
আদ্রিতার এই ক্ষ্যাপাটে হুমকির মুখে সাইদের ললাটের শিরাগুলো সজোরে দপদপ করে উঠল। ও খুব ভালো করেই জানে, এই পাগলী মেয়েটা জেদের বশে যেকোনো মুহূর্তেই বড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসতে পারে। আর সত্যি সত্যিই যদি ও এমন কিছু করে বসে, তবে ও বেঁচে থাকলেও সাইদের পুরো জীবনটা তছনছ হয়ে যাবে।সাইদ নিজের কপালে হাত দিয়ে বড্ড চড়া এক ধমক দিয়ে বলল,,
– স্টপ ইট, আদ্রিতা! জাস্ট স্টপ ইট! মাথা একদম গেছে তোমার? একটা সামান্য বিয়ের প্রস্তাবে মানুষ এমন পাগলামি করে?
- আমি পাগলামি করছি না! আমার হাতে আর ৮ ঘণ্টা সময় আছে। পাত্রপক্ষ বিকেলে দেখতে আসবে। আপনি যদি এর মধ্যে আমার বাবার সামনে এসে নিজের পরিচয় না দেন, তবে কালকের খবরের কাগজে আমার ছবি দেখতে পাবেন!
প্রকৃত অর্থে সাইদ এবার ঘামতে শুরু করেছে। সর্বাঙ্গ জুড়ে স্বেদের প্রবাহ;ও দাঁতে দাঁত চেপে, চরম অস্বস্তি ও অদ্ভুত এক ভালোলাগার মিশ্রণে আচ্ছন্ন হয়ে বলল,,
- ঠিক আছে, বাবা! ঠিক আছে! থামো এবার। অত কান্নাকাটি করতে হবে না। তোমার বাসার ঠিকানা আর তোমার বাবার মোবাইল নম্বরটা এক্ষুনি টেক্সট করো আমাকে। আমি… আমি নিজেই বিকেলে আসছি ওনার সাথে কথা বলতে। তবে মনে রেখো, তোমার বাবা যদি আমাকে ধমক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তার দায় কিন্তু তোমার!
সাঈদের মুখ থেকে এই কাঙ্ক্ষিত সম্মতিটুকু আদায় করতেই আদ্রিতার চোখের জল নিমেষেই উবে গেল। ও ওষ্ঠাধরে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে চোখের পানি মুছে বলল,,
– ধমক দেবে না। আমি অ্যাড্রেস পাঠাচ্ছি, জলদি চলে আসুন!
সাইদ কোনো উত্তর না দিয়ে খট করে ফোনটা কেটে দিল। কিন্তু ওপাশে ফোনটা কেটে গেলেও, ওর বুকের বাম পাশটায় তখন এক অন্যরকম মিষ্টি ঝড় বয়ে চলেছে। ও নিজের বাইকের চাবির রিংটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে মনে মনে বলল,,
– আজব মেয়ে! এই এক ফোঁটা মেয়ের পাল্লায় পড়ে আমার মতো সাঈদেরও আজ বিয়ের পিঁড়িতে বসার দশা!
– ম্যাম?
তিয়াশার ডাকে পিছন ঘুরে চাইলেন ফরিদা খান। সোফাতে অবস্থানরত তিয়াশা উঠে উনার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফরিদা খান পিছু ঘুরে বললেন,,
– জ্বী? বল?
– আমরা, আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি।
ফরিদা খানের শান্ত অবয়বে ক্ষণিকের জন্য এক চিলতে বিষাদের মেঘ জমে উঠল। ওনার প্রখর নেত্রজোড়া জানালার ওপারে শূন্য দিগন্তে নিবদ্ধ করে অত্যন্ত নিচু, ম্লান স্বরে বললেন,,
– ফিরিয়ে নেওয়ার মতো অধিকার কি তোমরা এখনো অবশিষ্ট রেখেছ, তিয়াশা? যে সংসার আমি দেড় দশক আগে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছি, সেখানে নতুন করে কোনো নাটক সাজানোর ইচ্ছা আমার নেই।
আনোয়ার খান এক কদম এগিয়ে এসে ওনার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। এক অপরাধী স্বামীর আকুল আত্মসমর্পণে মাথা নুইয়ে বললেন,,
– ফরিদা, সংসার কখনো একতরফা নষ্ট হয় না। আমার ক্ষমতার লোভ আর অন্ধ অহংকার তোমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, কিন্তু আজ আমি খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েও তোমার এই নিঃস্বার্থ সত্তার কাছে বড্ড দেউলিয়া। জীবনের শেষ কটা দিন অন্তত আমার এই শূন্য রাজপ্রাসাদকে পূর্ণ করো।
ফরিদা খান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন ওষ্ঠাধর ইঞ্চি কয়েক বাঁকিয়ে বড্ড যৌক্তিকভাবে আনোয়ার খানের যুক্তি খণ্ডন করে বললেন,,
- ক্ষমতার দাপটে অন্ধ মানুষেরা যখন নিঃসঙ্গ হয়, তখন তারা আশ্রয় খোঁজে, আনোয়ার। এটাকে অনুশোচনা বলে না, একে বলে একাকীত্বের ভয়। তোমরা আজ তিয়াশা আর আরাভের সুখের দোহাই দিয়ে আমাকে সেই নোংরা পলিটিক্যাল লাইফে ফেরত নিয়ে যেতে চাইছ, যেখানে আমার কোনো অস্তিত্বই কোনোদিন ছিল না।
আনোয়ার খান নিস্পৃহের ন্যায় মাথা নিচু করলেন। ওনার মতো দাপুটে পুরুষকে এভাবে বাকরুদ্ধ হতে দেখে আরাভ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ফরিদা খানের অতি নিকটে দাঁড়াল। ও ওনার আঁচলটা আলতো করে নিজের আঙুলে পেঁচিয়ে বড্ড ভাঙা, গভীর স্বরে আওড়াল,,
– ম্যাম, আনোয়ার খানের ওপর আপনার সহস্র ক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু এই আরাভের ওপর কি কোনো অধিকার নেই? জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে আমি কেবল একাকীত্বের ন-র-ক দেখেছি। আজ যখন সব ঠিক হতে চলেছে, তখনো কি আপনি আপনার এই একমাত্র ছেলেকে একা ফেলে রাখবেন? আমার আপনার সাথে ব্যক্তিগত কিছু কথা আছে।
একমাত্র ছেলের এই চঞ্চল ও আকুল আর্তি ফরিদা খানের ভেতরের মাতৃত্বকে সজোরে আঘাত করল। আরাভের প্রখর নেত্রের ভেতরের অবুঝ বালকের সত্তাটাকে ও কোনোমতেই অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। ওনার শক্ত মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল মুহূর্তেই ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেল। ও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরাভের হাতটা ধরে বললেন,,
- চলো, পাশের ঘরে চলো।
আনোয়ার খান আর তিয়াশাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে ফরিদা খান আরাভকে নিয়ে ধীর পায়ে পাশের শয়নকক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন।
শয়নকক্ষের দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিতেই ভেতরের নিস্তব্ধতা আরও খানিক ঘনীভূত হলো। ফরিদা খান খাটের একপাশে বসলেন; আরাভ দাঁড়িয়ে রইল ওনার ঠিক মুখোমুখি। ও নিজের দাপুটে ব্যক্তিত্বের খোলসটা বাইরে রেখেই ঘরের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে ফরিদা খানের কোলের ওপর হাত দুটি রাখল। দীর্ঘশ্বাস চেপে বড্ড খীন ও অবুঝ কণ্ঠে ও বলতে শুরু করলো,,
– ম্যাম, আপনি যখন এই প্রাসাদ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তখন আমার বয়স কত ছিল জানেন? ৭ কি ৮! খুব ছোট। শৈশবের সেই দিনগুলোয় যখন অন্য বাচ্চারা মায়ের আঁচল ধরে বায়না করত, তখন আমি বন্ধ ঘরের দেওয়ালে নিজের ছায়া দেখে গল্প করতাম। আনোয়ার খানের ক্ষমতা ছিল, কিন্তু একটা দিনও এই মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। আমি বড্ড একাকীত্বে বড় হয়েছি, ম্যাম।
ফরিদা খানের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা নোনা জল টুট গড়িয়ে পড়ল। ওনার হাত দুটো অবলীলায় আরাভের অবিন্যস্ত চুলে বিলি কেটে দিল। ও বড্ড ভাঙা কণ্ঠে বলল,,
- আরাভ, তুমি তো জানিস ক্ষমতার ওই নোংরা লোভ আমাকে কতটা দমবন্ধ করে ফেলেছিল। আমি না চলে গেলে হয়তো ওখানেই ম”রে যেতাম।
আরাভ ওষ্ঠাধরে এক বিষণ্ণ হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়াল,,
- আমি জানি, ম্যাম। বাবার ক্ষমতার লোভ বড্ড নোংরা ছিল। কিন্তু আমার অপরাধটা কী ছিল? আপনি নিজের আদর্শ আর লড়াইকে জেতাতে গিয়ে আমাকে তো এক ন-র-কের অন্ধকূপে একা ফেলে চলে গেলেন। আজ যখন তিয়াশা আমার জীবনে এসেছে, যখন আমি একটু সুস্থির হতে চাইছি, তখনও কি আপনি নিজের ইগো আর অতীতের জেদ ধরে রাখবেন? একটা বারের জন্য কি এই ছেলেকে নিজের মায়ের স্নেহের অধিকারটুকু দেবেন না?
আরাভের এই মর্মস্পর্শী যুক্তির সামনে ফরিদা খানের দেড় দশকের জমানো সমস্ত জেদ ও আত্মসম্মানের দেয়াল এক নিমেষে বালির বাঁধের মতো ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ও আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে আরাভকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। ড্রয়িংরুমে বসে থাকা তিয়াশা আর আনোয়ার খানের স্পষ্ট কর্ণগোচর হলো পাশের ঘর থেকে ভেসে ফরিদা খানের সেই অবরুদ্ধ কান্নার শব্দ ভেসে এলো। তিয়াশার ওষ্টাধর প্রান্তে ঝুলন্ত তৃপ্তির হাসি দেখে আনোয়ার খান এগিয়ে গিয়ে ওর মাথায় হাত রেখে বলল,,
– তুমি আমাদের বাড়ির পরশপাথর মা। কোনো রত্ন নাও, রত্নের সৃষ্টিকারীনি। দূর্লভ পরশপাথর যার স্পর্শে তামাও হীরেতে রুপ নেয়।
সন্ধ্যা পেরিয়েছে বহুক্ষণ। নব রজনীর সঙ্গে সঙ্গে নব জীবনের সূচনা ঘটেছে একজোড়া কপত-কপোতির। হালাল অধ্যায় পদার্পণ করেছে তারা কিছুক্ষণ পূর্বে। মূলত, আদ্রিতা কথা অনুসারে সাইদ পুরো পরিবার সমেত গিয়েছিল ওকে দেখা কথা পাকা করতে। অথচ গিয়ে দেখে ভিন্ন পরিস্থিতি। হাতের বাইরে চলে গিয়েছে বলা যায়!
আদ্রিতাকে যে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল, সেই ছেলে পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং কালই তার আমেরিকার ফ্লাইট। তাই তারা শুধু দেখাশোনা নয়, একেবারে কাজী ডেকে আজই বিয়ে সম্পন্ন করে মেয়ে নিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আদ্রিতা তখন ঘরের কোণে বসে কাঁদতে কাঁদতে নিজের চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। ঠিক এই চরম মুহূর্তেই সাইদের উপস্থিতি এক দুর্দান্ত নাটকীয়তার সৃষ্টি করল।
সাঈদের বাবা যেহেতু ওই এলাকার এক বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী শিল্পপতি, তাই ওনার সামাজিক প্রতিপত্তির সামনে পাত্রপক্ষ ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সাঈদ অত্যন্ত বিনম্র কন্ঠে আদ্রিতার বাবার সম্মুখে নিজের অধিকারের কথা স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করল। বহু অনুনয়-বিনয়, হালকা হট্টগোল আর সাঈদের বাবার ব্যক্তিত্বের ওজনের ওপর ভর করে অবশেষে সমস্ত বাধা ধূলিসাৎ হলো। আমেরিকার পাত্র বিদায় হলো আর সেই কাজীর হাত ধরেই আদ্রিতা সাইদের শুভ পরিণয় সম্পন্ন হল।
বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে আদ্রিতাকে গাড়ির পেছনের সিটে নিয়ে বসানো হয়েছে,সাইদ গাড়ির গিয়ারবক্সে হাত রেখে আড়চোখে ওর দিকে চাইল। অতঃপর বলল,
– খুশি তো এবার, লেডি ডন? নিজের লা’শের খাটিয়া বহন করানোর হুমকি দিয়ে শেষমেশ আমাকে ছাদনাতলায় টেনেই আনলে!
আদ্রিতা ওড়নার কোণা দিয়ে চোখের জল মুছে সাইদের বাহুতে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল। বড্ড চঞ্চল কণ্ঠে আওড়াল,,
– আমি আপনাকে ভালোবাসি। নিজের থেকেও বহু গুণ বেশি।
আদ্রিতার অকপটে বলা স্বীকারোক্তিতে হিম শীতল বরফখন্ডের ন্যায় জমে গেল সাইদ। ব্যর্থ জীবনে এমন সুখের ছোঁয়া পাবে কক্ষনো ভাবেনি ছেলেটা। কোনো এক অনুরাগিনীর পর, জীবনে আর কখনো কাউকে ঠাই দিতে না চাওয়া ছেলেটাও আজ, ভালোবাসা কাকে বলে? মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। সমস্ত জড়তা একপাশে ঠেলে আদ্রিতাকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করলো সাইদ। সামান্য ঝুঁকে আদ্রিতার ছোট্ট ললাটে কম্পিত ওষ্টাধরের আলতো পরশে পরিপূর্ণ করলো প্রনয়ের চিহ্ন।
– বাবা?
খান মহলের সুপ্রশস্ত তোরণ পেরিয়ে গাড়িটি এসে থামতেই, শাশুড়িকে বরণ করে ঘরে তোলার উদ্দেশ্যে তিয়াশা সকলের আগে চঞ্চল পায়ে ড্রয়িংরুমের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেই ওর চক্ষুদ্বয় বিস্ময়ে পুরোপুরি স্থির হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের সোফায় অত্যন্ত স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন ডিআইজি তাহের চৌধুরী এবং ওনার পাশে অশ্রুসজল নেত্রে রেহানা বেগম। নিজের জন্মদাতা বাবা-মাকে এই চেনা শত্রু শিবিরে এভাবে বসে থাকতে দেখে তিয়াশার হাত-পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করল। ও কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
তাহের চৌধুরী মেয়ের ওই কম্পিত অবয়ব দেখা মাত্রই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ও এক পা বাড়িয়ে তিয়াশাকে নিজের দুই বাহুর মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। রেহানা বেগমও এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তিয়াশা বাবার চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল। বড্ড আর্দ্র কণ্ঠে তাহের চৌধুরী আওড়ালেন,,
– অনেক হয়েছে মা, আর নয়। নিজের জন্মদাতা বাবাকে কি তুই সারাজীবন এই অপরাধবোধের আগুনে পুড়িয়ে মারবি? আমি তোকে নিতে এসেছি,টিয়ু।
তিয়াশা কান্নাভেজা চোখে বাবার মুখপানে চাইল। ওপাশ থেকে আনোয়ার খান ও ফরিদা খান ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। আনোয়ার খান অত্যন্ত মার্জিত স্বরে তাহের চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বললেন,,
– তাহের সাহেব, অতীতকে পেছনে ফেলে আমরা যদি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করি, তবে কেমন হয়? ও, আমাদের এই ভেঙে যাওয়া পরিবারকে সযত্নে জোড়া লাগিয়েছে। ও আমাদের বাড়ির পরশপাথর। তাই ওকে জোরপূর্বক নিয়ে যেতে চাইবেন না প্লিজ! অনুরোধ করছি!
তাহের চৌধুরী আনোয়ার খানের দিকে চাইলেন, অতঃপর ওনার দৃষ্টি গিয়ে থামল আরাভের ওপর। আরাভ তখনো বড্ড শান্ত, গম্ভীর মুখে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তাহের চৌধুরী ধীর পায়ে আরাভের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ওনার ডান হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত ভারী ও গম্ভীর স্বরে বললেন,,
– আরাভ খান, একজন ডিআইজি হিসেবে হয়তো তোমার অতীতকে আমি কখনো সমর্থন করব না। কিন্তু একজন বাবা হিসেবে, বিগত মাসগুলোতে তুমি যেভাবে আমার মেয়েকে আগলে রেখেছ, তার জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। তিয়াশাকে আমি কয়েকদিনের জন্য চৌধুরী ভিলায় নিয়ে যেতে চাই। আশা করি, স্বামীর অধিকার নিয়ে তুমি বাধা দেবে না?
আরাভ ওষ্ঠাধরে এক চিলতে মার্জিত হাসি ফুটিয়ে তাহের চৌধুরীর হাতখানা নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। বড্ড বিনম্র কণ্ঠে জবাব দিল,,
– শ্বশুর আব্বার অর্ডারে এই আরাভ খানের কোনো আপত্তি থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তিয়াশা ওর নিজের বাড়িতে যাবে, এতে আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না। তবে মনে রাখবেন, আমার এই হৃদয়ের স্পন্দন কিন্তু ওখানেই গচ্ছিত রইল।
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২৩
আরাভের অকপটে বলা স্বীকারোক্তিতে ড্রয়িংরুমের গুমোট আবহাওয়া নিমেষেই এক মধুর হাসিতে ভরে উঠল। তিয়াশা লজ্জায় ওষ্ঠাধর কামড়ে আরাভের দিকে এক রাগী চাউনি ছুড়ে দৃষ্টি ঘোরালো। বিগত দীর্ঘ কয়েক মাসের সহস্র ক্ষোভ, ক্ষমতার লড়াই আর মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে অবশেষে দুই পরিবারের মাঝে এক মধুর মিলন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
