আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৭
সাবিলা সাবি
লিওনের তর্জনী ধীরে ধীরে ট্রিগারের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিল। তার তীক্ষ্ণ বাদামি দৃষ্টি আকাশে চক্রাকারে উড়তে থাকা সোনালি ঈগলটির ওপর নিবদ্ধ। বহুদিন ধরে এই ঈগলটিই ছিল হিয়ার নীরব দূত, তার প্রতিটি পদক্ষেপের অদৃশ্য সাক্ষী। আজ সেই নজরদারির ইতি টানতেই অস্ত্র তুলেছিল সে।
ট্রিগার সম্পূর্ণ চেপে বসার আগমুহূর্তে বিদ্যুতের গতিতে একটি ছায়ামূর্তি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিকট বিস্ফোরণে চারদিক কেঁপে উঠল। লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেটটি ঈগলটিকে স্পর্শ না করে দূরের পাথরে আঘাত হানল। মুহূর্তেই পাথরের গা চিরে আগুনের ফুলকির মতো স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠল। প্রচণ্ড ধাক্কায় লিওনের ভারসাম্য ভেঙে গেল। শক্ত মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি শরীর এসে তার ওপর আছড়ে পড়ল। আকস্মিক অভিঘাতে দুজনের মুখের দূরত্ব বিলীন হয়ে গেল। হিয়ার নরম অধর অনিচ্ছাকৃতভাবে ছুঁয়ে গেল লিওনের অধর।
সময় এক নিঃশ্বাসের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। লিওনের বিস্ফারিত চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল নিখাদ বিস্ময়। সচেতন অবস্থায় এই প্রথম সেই দুর্ধর্ষ ক্রিমিনাল মেয়েটার অধর স্পর্শ করল তার অধর।
লিওনের বিস্ফারিত দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল হিয়ার মুখে। অদ্ভুতভাবে তার সমস্ত মনোযোগ গিয়ে আটকাল সেই চোখ দুটোর ওপর। আজ সেই চোখে পরিচিত উন্মাদনা নেই, নেই বিদ্রূপমাখা হাসির রেশ। নীলাভ গভীরতা মুহূর্তেই রক্তিম আগুনে রূপ নিয়েছে। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা সেই দৃষ্টিতে এমন এক তীব্র ক্রোধের প্রকাশ, যা এর আগে কখনো দেখেনি লিওন। একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে অসংখ্য নৃ*শংস অপরাধী, পেশাদার খু/নি আর সা*ইকোপ্যা/থের মুখোমুখি হয়েছে সে। মৃ/ত্যুর হু/মকিও তাকে বিচলিত করতে পারেনি। অথচ এই মুহূর্তে হিয়ার রক্তবর্ণ দৃষ্টির সামনে তার বুকের ভেতর অজান্তেই এক মুহূর্তের অস্বস্তি দোলা দিয়ে গেল।
হিয়ার দ্রুত ওঠানামা করা বক্ষপিঞ্জরই বলে দিচ্ছিল, সে নিজের রাগ সংযত রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে। কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না সে। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল লিওনের চোখে। তারপর ভারী, নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“কী করতে যাচ্ছিলে… অফিসার লিওনার্দো?”
সম্বোধনটা শুনে লিওনের ভ্রু কুঁচকে উঠল।
অফিসার লিওনার্দো।
কথাটা কানের ভেতর অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হলো।
আজ পর্যন্ত হিয়া কখনো তাকে এই নামে ডাকেনি। কখনো “লিওন”, কখনো ইচ্ছাকৃত খুনসুটিভরা সম্বোধন, কখনো বা এমন এক অধিকার নিয়ে কথা বলেছে, যার অনুমতি সে কোনোদিন দেয়নি। কিন্তু আজ তার কণ্ঠে ব্যক্তিগত আবেগের লেশমাত্র নেই। উচ্চারিত প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠেছে নির্মম শীতলতা।
লিওন বুঝতে পারল, আজ হিয়া সত্যিই রেগে গেছে। সে চোয়াল শক্ত করে হিয়াকে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল।
“আমার ওপর থেকে সরে দাঁড়াও।”
কিন্তু হিয়া নড়ল না।
বরং দু’হাতের ভর আরও দৃঢ় করে লিওনের দিকে সামান্য ঝুঁকে এল। তার রক্তাভ চোখে এবার খানিকটা যন্ত্রণা দেখা গেলো। নিচু স্বরে সে বলল, “আমার শ্যাডোকে গু/লি করতে যাচ্ছিলে তুমি।”
কথাটা উচ্চারণ করার পর কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল হিয়া। তার র/ক্তাভ দৃষ্টি একবার আকাশে চক্কর দিতে থাকা সোনালি ঈগলটির দিকে গিয়ে থামল, তারপর আবার ফিরে এল লিওনের চোখে।
কণ্ঠের ভার আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
“তুমি আমাকে গু/লি করেছিলে। আমার কাঁধের নিচে এখনও সেই বুলেটের দাগ রয়ে গেছে। সেটাকে আমি কখনো ঘৃণাও করিনি। বরং নিজের মতো করে ভালোবাসার স্মৃতি বানিয়ে সেখানে ট্যাটু পর্যন্ত করেছি। কিন্তু আজ তুমি আমার শ্যাডোর দিকে বন্দুক তুললে?”
হিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“অফিসার লিওনার্দো, একজন সিআইডি অফিসার হয়ে ক্রিমিনালের প্রতি তোমার যত রাগ, যত ঘৃণা থাকটা স্বাভাবিক আর সেই রাগ ঘৃনা সব আমার ওপর উগরে দিতে পারো। প্রয়োজন হলে আবার গু/লি করো আমাকে। কিন্তু একটা নিরীহ ঈগলের প্রাণ নেওয়ার চেষ্টা তুমি কিভাবে করলে?”
কথাগুলো শেষ হতেই লিওনের অধরে ধীরে ধীরে তাচ্ছিল্যের একরেখা হাসি ফুটে উঠল। তার দৃষ্টি স্থির রইল হিয়ার চোখে।
“সত্যিই অবাক হলাম।” শান্ত অথচ ধারালো কণ্ঠে বলল সে। “যে মেয়ে নিজের হাতে নিরীহ অসংখ্য মানুষকে খু/ন করেছে আর সে আজ একটা পাখির জন্য নীতিকথা শোনাচ্ছে? তোমার মুখে নিরীহ শব্দটা বড় বেমানান লাগছে, হিয়া।”
এক মুহূর্তের জন্যও হিয়ার অভিব্যক্তি বদলাল না।
সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।কণ্ঠে শীতল বিষণ্নতা মিশিয়ে বললো —”মানুষের চেয়ে পশুপাখি অনেক ভালো, অফিসার। মানুষ রক্তের সম্পর্ক হয়েও বিশ্বাসঘাতকতা করে। স্বার্থের জন্য আপনজনকে মেরে ফেলে। ভালোবাসার নামে প্রতারণা করে, মিথ্যে বলে, পিঠে ছু/রি মারে। কিন্তু একটা পশু বা পাখি…”
হিয়ার দৃষ্টি আবার আকাশের দিকে উঠল। সোনালি ঈগলটি তখনও তাদের মাথার ওপর বৃত্ত এঁকে উড়ছে। তার অধরে মৃদু এক হাসি ফুটে উঠল। খুব ধীরে, প্রায় ফিসফিসিয়ে সে বলল,
“ওরা বিশ্বাসঘাতকতা করতে জানে না। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত যাকে আপন ভাবে, তার পাশেই থাকে। বিশ্বস্ততা শিখতে হলে মানুষের কাছে নয়, পশুপাখির কাছেই শিখতে হয়। They are far more loyal than humans.”
হিয়ার শেষ কথাটি বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চারপাশে ভারী বুটের শব্দ গর্জে উঠল। টানেলের বিভিন্ন দিক থেকে মুহূর্তের মধ্যে ছুটে এলো অস্ত্রধারী গার্ডরা। হিয়া লিওনকে ছেড়ে উঠে দাড়াতেই, লিওন দ্রুত গতিতে উঠে পড়লো কিন্তু কয়েক নিঃশ্বাসের ব্যবধানেই গার্ডরা লিওনকে ঘিরে ফেলল। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়েই লিওন বুঝে গেল, বেরিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তবু হার মানার মানুষ সে নয়।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক গার্ডের বুকে সজোরে লাথি মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। পাশের আরেকজনের কবজি মুচড়ে অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই বাকি গার্ডরা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কয়েক মিনিট ধরে চলল তীব্র ধস্তাধস্তি। শেষ পর্যন্ত সংখ্যার কাছে একা মানুষটিকে থামতেই হলো। চারজন গার্ড মিলে তার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরল। আরেকজন ইস্পাতের হাতকড়া পরিয়ে দিল কবজিতে। সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নির্বিকার চোখে সবকিছু দেখছিল হিয়া। তবে তার মুখে কোনো বিজয়ের উল্লাস নেই। শান্ত স্বরে সে বলল,
“ওকে আন্ডারগ্ৰাউন্ডে নিয়ে যাও।”
টানেলের বহুস্তর নিচে, মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে আরেকটি গোপন স্থাপনা। বিশাল বাঙ্কারটি প্রায় সম্পূর্ণ ফাঁকা। ধূসর কংক্রিটের দেয়াল, মাথার ওপর সারি সারি সাদা আলো, আর সেই বিস্তীর্ণ হলঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকার স্বচ্ছ কাচের একটি কক্ষ। কক্ষ নয়, বরং নিখুঁতভাবে তৈরি এক বন্দিশালা। বহুস্তর বুলেটপ্রুফ কাচে ঘেরা সেই ঘরের ভেতরে রয়েছে কেবল অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা। বাইরে থেকে ভেতরের প্রতিটি নড়াচড়া স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু ভেতরে থাকা মানুষের জন্য বেরিয়ে আসার কোনো পথ নেই।
গার্ডরা দরজার ইলেকট্রনিক লক খুলে লিওনকে ভেতরে ঠেলে দিল। পরের মুহূর্তেই ভারী কাচের দরজাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। লিওন এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। সমস্ত শক্তি একত্র করে কাচের দেয়ালে সজোরে ঘুষি বসাল। বিকট শব্দে পুরো কাচ কেঁপে উঠল, কিন্তু তাতে কোনো ফাটল ধরল না।
আবার। আরও জোরে। একের পর এক আঘাতে তার হাতের গাঁট ছিঁড়ে রক্ত বেরিয়ে আসার উপক্রম। অথচ সেই কাচ অবিচল। লিওন তবুও থামল না। মুক্তির পথ না পাওয়া পর্যন্ত থামার প্রশ্নই ওঠে না। কিছুক্ষণ পর শ্বাস ভারী হয়ে এলে সে চারদিকে তাকাল।
হিয়া এখানে নেই। তাকে এই কাচের বন্দিশালায় আটকে রাখার নির্দেশ দিয়ে কোথাও একটা গেছে। বিশাল ভূগর্ভস্থ হলঘরটিতে তখন ভেসে বেড়াচ্ছে শুধু লিওনের আঘাতের প্রতিধ্বনি।
প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেছে।
মাটির বহুস্তর নিচে নির্মিত সেই বিশাল ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সময়টা থেমে আছে। মাথার ওপর সারিবদ্ধ সাদা আলোগুলো একই তীব্রতায় জ্বলছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। কেবল কাচের বন্দিশালার ভেতরে পায়চারি করছে লিওন।
বারবার মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে তার দুই হাতের গাঁট ছিঁড়ে গেছে। শুকিয়ে আসা রক্তের হালকা দাগ এখনও কাচের গায়ে লেগে আছে।
ঠিক তখনই ভারী ধাতব দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
পায়ের শব্দে নিস্তব্ধ বাঙ্কার কেঁপে উঠলো মনে হলো। লিওনের দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেদিকে ঘুরে গেল। হিয়া ধীর, স্থির পদক্ষেপে ভেতরে প্রবেশ করল। হাতে ধরা জলন্ত সিগারেট এই মুহূর্তে তার পরনে ছিল গাঢ় খয়েরি রঙের টেইলরড ব্লেজার স্যুট। কোমর পর্যন্ত নিখুঁত ফিটিংয়ের সিঙ্গেল-ব্রেস্টেড ব্লেজারটি তার দৃঢ় ব্যক্তিত্বকে আরও শাণিত করে তুলেছে। ভেতরে পরা কালো হাই-নেক টপটি খয়েরি রঙের সঙ্গে এক মার্জিত বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। একই রঙের স্ট্রেইট-ফিট ট্রাউজার লম্বা গড়নটাকে আরও অভিজাত করে তুলেছে। পায়ে ছিল গাঢ় বাদামি লেদারের চেলসি বুট। কব্জিতে কালো ডায়ালের ঘড়ি আর ব্লেজারের হাতা সামান্য গুটিয়ে রাখায় তার সাপের নকশার ট্যাটুর একাংশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা উলফ-কাট চুলগুলো আজ পরিপাটি করে সেট করা। ভ্রুর পিয়ার্সিংয়ে পড়া আলো তার চোখের শীতলতাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। এক হাতে ধরা ছিল সাদা গোলাপের বড় একটি তোড়া। আজ তার মুখে ছিল নিখুঁত, সংযত মেকআপ। অধরে ম্যাট নিউড লিপস্টিক, চোখে হালকা স্মোকি শেড আর দীর্ঘ পাপড়িতে মাসকারার সূক্ষ্ম ছোঁয়া। তবু তার সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ প্রসাধনে নয়; তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি আর জন্মগত আভিজাত্যই তাকে ভয়ংকর রকমের সুন্দর করে তুলেছে। তার মুখে যে শীতল ব্যক্তিত্বের ছাপ ছিলো তা একই সঙ্গে মুগ্ধও করে, আবার অকারণেই সতর্কও করে তোলে।
কাচের বন্দিশালার ঠিক সামনে রাখা একটি লোহার চেয়ার টেনে এনে বসল সে। এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে হেলান দিল চেয়ারের পিঠে। সিগারেটে ধীরে একটি টান দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে ভাসিয়ে দিল। তারপর সাদা গোলাপের তোড়াটা নিজের কোলে আলতো করে রেখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল লিওনের দিকে।
বন্দিশালাটি বহুস্তর বুলেটপ্রুফ কাচে তৈরি হলেও সেটি সম্পূর্ণ সাউন্ডপ্রুফ নয়। নিয়ন্ত্রিত বায়ু চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থার কারণে কাচের দুই পাশ থেকে অনায়াসেই কথা বলা যায়। ফলে তাদের মাঝখানে অটুট কাচের দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকলেও কণ্ঠস্বর পৌঁছে যাচ্ছিল একে অপরের কাছে।
কাচের ওপাশ থেকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে লিওন বলল, “আবার কী নাটক শুরু করলে?”
হিয়া মৃদু হেসে সাদা গোলাপগুলোর দিকে তাকাল।
“নাটক নয়। দেখো দিলবার তোমার প্রিয় ফুল নিয়ে এসেছি।”
সে আলতো করে একটি গোলাপের পাপড়িতে আঙুল বুলিয়ে দিল।
“হোয়াইট রোজ-তো তোমার খুব পছন্দ তাইনা। কারণ তোমার বিশ্বাস, এই ফুল নির্মল হৃদয়, আন্তরিকতা আর পবিত্র ভালোবাসার প্রতীক।”
কথাটা শুনে লিওনের চোখে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবে হিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে সে ধীর স্বরে বলল, “এসব তুমি জানলে কীভাবে?”
উত্তর পাওয়ার আগেই নিজের প্রশ্নের উত্তর যেন নিজেই খুঁজে পেল সে। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। “তার মানে… ভার্সিটির সময় থেকেই তুমি আমাকে স্টক করতে?”
হিয়া ধীরে মাথা নেড়ে বললো “না। তখন তোমাকে স্টক করিনি। তবে তোমাকে লক্ষ করতাম। তবে রিসেন্টলি…”
সে একটু থামলো তার অধরে শান্ত হাসি ফুটে উঠল।তারপর বাকি কথাটা সম্পুর্ন করলো —”হ্যাঁ, তোমার প্রতিটি অভ্যাস, প্রতিটি পছন্দ, প্রতিটি পদক্ষেপ আমার অজানা নয় বর্তমানে।”
লিওন বিরক্তিতে ঠান্ডা হেসে ফেলল।
“রিয়েলি? তাহলে এতদিন ধরে আমার জীবন নিয়েই পড়ে আছ?”
হিয়া কোনো জবাব দিল না। কোলে রাখা গোলাপের তোড়াটা দুই হাতে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে কাচের কাছে এগিয়ে এল। তার দৃষ্টি এবার আশ্চর্যরকম শান্ত।
“আজ তোমাকে প্রপোজ করব, লিওন।”
লিওন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “Are you insane, হিয়া?”
হিয়া মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।
“জানো, সাদা গোলাপ আর আমার নামের মধ্যে একটা মিল আছে। ‘নুজহাত হিয়া’ অর্থ পবিত্র হ্নদয়। আর সাদা গোলাপও পবিত্র হৃদয়, নিষ্কলুষ ভালোবাসা আর আন্তরিক অনুভূতির প্রতীক।”
কয়েক মুহূর্ত সে গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
“একটা সময় হয়তো আমিও এই ফুলের মতোই ছিলাম। পরিষ্কার, নির্ভার, র/ক্তের দাগহীন। কিন্তু আজকের হিয়া…”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এল।
“আজকের হিয়া আর সাদা গোলাপ নয়। আমি নিজের হাতেই নিজেকে কালো গোলাপে পরিণত করেছি, But my love for you… it’s still as pure as this white rose।”
সে আবার চোখ তুলে লিওনের দিকে তাকিয়ে বললো
—”আমি চাই, আমার ভালোবাসাটা তোমার প্রতি সারাজীবন এই সাদা গোলাপের মতোই নির্মল থাকুক।”
গোলাপের তোড়াটা বুকে জড়িয়ে ধরে সে ধীরে, স্পষ্ট স্বরে বলল, —”will you accept me? Will you ever love me দিলবার?”
লিওনের অধরে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল। তারপর সে বললো “একটা কথা ঠিক বলেছ। সাদা গোলাপ সত্যিই আমার প্রিয়। কারণ এটা পবিত্র হৃদয়, নির্মল ভালোবাসা আর সততার প্রতীক।”
তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
“কিন্তু তুমি? তুমি সেই সাদা গোলাপ নও, হিয়া। তুমি ভাইপার, কালো গোলাপের মতোই অন্ধকার। রক্ত, মৃত্যু আর পাপের গন্ধ ছাড়া তোমার অস্তিত্বে আর কিছু নেই। And you expect me to love you? Seriously?”
লিওনের কণ্ঠে এবার তীব্র ঘৃণা ঝরে পড়ল।
“শুনে রাখো, তোমাকে আমি কোনোদিন ভালোবাসব না। না এই জীবনে, না আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আলো আর অন্ধকার কোনোদিন এক পথে হাঁটে না। একজন সিআইডি অফিসার আর একজন সিরিয়াল কিলারের মাঝে ভালোবাসা হয় না।” কথাটা বলেই লিওন কাচের একেবারে কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“I hate you, Hiya.” লিওন প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল দাঁত চেপে। তার দৃষ্টি ছুরির ফলার মতো ধারালো হয়ে উঠল।
“শুধু তোমাকে নয়, তোমার অস্তিত্বকেও ঘৃণা করি। তোমার ছায়া পর্যন্ত আমার কাছে ঘৃণ্য। এখনও বলছি… আমাকে যেতে দাও। এটাকে আমার শেষ ওয়ার্নিং মনে করো।”
হিয়ার চোখের পলকে জমে থাকা কোমলতার শেষ রেখাটুকুও মিলিয়ে গেল। সে খুব ধীরে বলল,
“So… you’ll never be mine, ডার্লিং?”
লিওন এক মুহূর্তও দেরি করল না উত্তর দিতে। “Never.”
শব্দটা এতটাই দৃঢ় ছিল যে পুরো বাঙ্কারে প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে এল।
হিয়া চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল। আবার চোখ খুলতেই সেখানে ফিরে এসেছে ভাইপার।
“তাহলে তুমিও শুনে রাখো, অফিসার লিওন। সারাজীবন সিঙ্গেল থেকে মরো, তবু অন্য কারো হতে পারবেনা। কারণ তুমি যদি আমার না হও…” হিয়া একটু থামলো তার অধরে ধীরে ধীরে ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠল।
“…আমি তোমাকে কারও হতে দেব না। এই পৃথিবীতে কেউ তোমাকে পাবে না। কেউ না।” কথাটা শেষ করেই হিয়া কাচের ওপর আলতো করে হাত রাখল।
“Do you understand me?”
লিওনের মুখের কঠোরতা এতটুকুও নরম হলো না। কাচের দেয়ালের সামনে এসে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার বাদামি চোখে জমাট বেঁধে আছে অবজ্ঞা আর তীব্র ঘৃণা। প্রতিটি শ্বাস ভারী, প্রতিটি স্নায়ু টানটান। ঠান্ডা, ধারালো কণ্ঠে সে বলল, —”আমার জীবন একান্তই আমার। আমার সিদ্ধান্ত, আমার ইচ্ছা, সবকিছুর মালিক আমি। তুমি আমাকে কিনে রাখোনি যে আমার ওপর অধিকার ফলাবে।”
কথাগুলো হিয়ার বুকের ভেতর ছুরির ফলার মতো এসে আঘাত করল। হিয়া নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের গভীরে জমে থাকা কঠিন দৃষ্টি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হলো। হাতে ধরা সাদা গোলাপগুলোর ওপর আলতো করে আঙুল বুলিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল সে। তারপর গভীর একটা শ্বাস নিয়ে মুখ তুলল। তার কণ্ঠে প্রথমবারের মতো জেদের বদলে চাপা ক্লান্তি ধরা পড়ল।
“তাহলে… কী চাও তুমি, লিওন?”
প্রশ্নটা শুনে লিওনের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠল। কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে উত্তর দিল, —”আমাকে এখান থেকে যেতে দাও।” সে আরও এক পা এগিয়ে এল। দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা স্বচ্ছ কাচে তার প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“সত্যিই কি বিশ্বাস করো, আমাকে বন্দি করে রাখলে আমার ভালোবাসা পাবে?”
লিওনের অধরে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল।
“You’re forcing everything, Hiya.”
কয়েক সেকেন্ড থেমে প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করল লিওন, “এই বন্দিদশা, এই জোর, এই অধিকার ফলানোর চেষ্টা… এগুলোর কোনোটাই আমাকে তোমার কাছাকাছি আনছে না। বরং প্রতিটা মুহূর্তে তোমার প্রতি আমার ঘৃণা আরও গভীর হচ্ছে।”
তার চোখ তখনও সরাসরি হিয়ার চোখে স্থির রইল।
“এখনও কি বুঝতে পারছ না? ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় না। কাউকে বন্দি করে শুধু শরীরকে আটকে রাখা যায়, হৃদয়কে নয়।”
হিয়া অনেকক্ষণ নীরবে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে আর আগের সেই উত্তেজনা নেই। গভীর, স্থির এক দৃষ্টি নিয়ে সে সাদা গোলাপের তোড়াটা চেয়ারের ওপরে রেখে পুনরায় লিওনের কাছে এগিয়ে এলো। সিগারেটের শেষ অংশটা মেঝেতে ফেলে পায়ের নিচে পিষে দিল। তারপর কাচের একেবারে সামনে এসে থামল। তার কণ্ঠ ছিল অস্বাভাবিক শান্ত।
“ঠিক আছে, বাজপাখি। তোমাকে আমি এখান থেকে যেতে দেব…”
কথাটা বলেই কয়েক মুহূর্ত থেমে লিওনের চোখের দিকে তাকিয়ে হিয়া মৃদু হেসে বললো
“…তবে একটা শর্তে।”
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
হিয়া ধীর স্বরে বলতে শুরু করল,
“মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা। এই চব্বিশ ঘণ্টা তুমি আমার সঙ্গে কাটাবে। ভালোবাসতে হবে না, প্রেমের অভিনয়ও করতে হবে না। শুধু একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবে, ডিনার করবে, একটু গল্প করবে, কয়েকটা গেম খেলবে। ব্যস। চব্বিশ ঘণ্টা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজের হাতে তোমাকে মুক্ত করে দেব।”
কথা শেষ করে সে নিঃশব্দে লিওনের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায় রইল। লিওনের মুখে ধীরে ধীরে অবিশ্বাসের ছাপ ফুটে উঠল। তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মাথা নাড়ল।
“What the hell…!” সে বিরক্ত গলায় বলল,
“এসব কী ধরনের চাইল্ডিশ আবদার, হিয়া? তুমি কি সত্যিই ভাবছ এগুলো করে কিছু বদলে যাবে?”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি অফার দিয়েছি”
তারপর চোখ টিপে মৃদু স্বরে যোগ করল,
“Choice is yours, Darling.”
হিয়া এক পা পিছিয়ে গিয়ে পুনরায় বললো “বাকিটা তোমার সিদ্ধান্ত। রাজি না থাকলে কোনো সমস্যা নেই। এই কাচের বন্দিশালাতেই বন্দি হয়ে থেকো।”
আর একটি শব্দও বলল না সে। ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করল।বাঙ্কারের ভেতর আবার নেমে এল চাপা নীরবতা। হিয়া একবারও পেছনে তাকাল না। ভারী লোহার দরজার একেবারে কাছে পৌঁছে হাত বাড়াল দরজার কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে লিওনের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।
“আমি রাজি।”
হিয়ার বাড়িয়ে দেওয়া হাত মাঝ থেমে গেল মুহুর্তেই।তার অধরের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক তৃপ্তির হাসি।
কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ রেখেই সে নিঃশ্বাস নিল, তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এখনও তাকে ঘৃণা করে—তবু প্রথমবারের মতো নিজের ইচ্ছায় তার দেওয়া একটি শর্ত মেনে নিয়েছে। সেই ছোট্ট সম্মতিটুকুই এই মুহূর্তে হিয়ার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জয়।
হিয়া আর কোনো কথা বলল না। কাচের বন্দিশালার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করতেই ভারী দরজাটা ধীরে ধীরে সরে গেল। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে লিওন বাইরে পা রাখল। তার চোখে তখনও একই সতর্কতা। চারপাশের প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি ক্যামেরা আর প্রতিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একজন সিআইডি অফিসারের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে সে।
হিয়া নীরবে সামনে হাঁটতে শুরু করল। কোনো কথা নয়, কোনো তাড়া নয়। লিওনও অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার পিছু নিল। টানেলের একাধিক নিরাপত্তা গেট অতিক্রম করে তারা পৌঁছাল একটা ব্যক্তিগত কক্ষে। পুরো আস্তানার মধ্যে এই কক্ষটাই সবচেয়ে আলাদা। নরম আলো, কাঠের আসবাব, বুকশেলফ, বড় কাচের জানালার বদলে বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিন—সব মিলিয়ে জায়গাটা অপরাধজগতের কোনো ডেরার চেয়ে ব্যক্তিগত আশ্রয়স্থল বলেই বেশি মনে হয়।
কক্ষে ঢুকেই হিয়া ইন্টারকমের সুইচ অন করল।কক্ষজুড়ে নেমে এল প্রশান্ত নীরবতা। সে ওয়াল প্যানেলে লাগানো কলিং বেল চাপতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একজন সার্ভেন্ট দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল।
দরজা খুলে হিয়া শান্ত স্বরে একের পর এক খাবারের নাম বলতে শুরু করল।
“স্পাইসি গ্রিলড স্টেক, পেরি-পেরি চিকেন, থাই চিলি বিফ, এক্সট্রা স্পাইসি ফ্রাইড রাইস… সঙ্গে হট সস আর চিলি ফ্লেক্স থাকবে।”
সার্ভেন্ট মাথা নত করে সবকিছু নোট করে নিল। হিয়া আর কিছু না বলে দরজাটা বন্ধ করে দিল। পুরো সময়টা লিওন নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে বিস্ময় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। হিয়া যেসব খাবারের নাম বলল, প্রতিটাই তার ভীষণ পছন্দের।
হিয়া ইন্টারকমটা রেখে তার দিকে তাকাল। অধরের কোণে মৃদু হাসি। “কিছু বাদ পড়েছে?”
লিওন উত্তর দিল না। সে বুঝতে পারছে, এই মেয়েটা তার সম্পর্কে যতটা জানে, সেটা স্বাভাবিক নয়।
কিছুক্ষণ পর দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
এবার একে একে কয়েকজন সার্ভেন্ট ভেতরে ঢুকল। তাদের হাতে ধোঁয়া ওঠা অসংখ্য খাবারের ট্রে। তারা বিছানার সামনে নরম কার্পেটের ওপর একটি নিচু, প্রশস্ত কাঠের টেবিল সাজিয়ে তার ওপর একে একে সব খাবার গুছিয়ে রাখতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো টেবিল ভরে গেল রঙিন, ধোঁয়া ওঠা নানা পদে। লাল মরিচ আর মসলার তীব্র সুবাস পুরো কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। সবকিছু গুছিয়ে রেখে সার্ভেন্টরা নীরবে বেরিয়ে গেল।
হিয়া বিছানার পাশে কার্পেটের ওপর গিয়ে বসল। টেবিলের এক পাশে তার জায়গা। কয়েক সেকেন্ড লিওনের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলল,
“Come on, দিলবার। আজ টেবিল-চেয়ারে নয়। আজ এখানেই বসে খাওয়া হবে।”
লিওন কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অনিচ্ছা স্পষ্ট রেখেই ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলের বিপরীত পাশে গিয়ে বসল। দুজনের মাঝখানে রাখা ধোঁয়া ওঠা খাবারে ভরা বড় টেবিলটা ছাড়া আর কোনো দূরত্ব নেই। লিওন জানে, সিআইডি অফিসার হিসেবে তাকে প্রতিদিন কঠোর শরীরচর্চা করতে হয়। নিজের ফিটনেস নিয়ে সে কখনো আপস করে না। তবু একটা দুর্বলতা তার সবসময়ই ছিল—ঝাল খাবার। যত ঝাল, ততই তার পছন্দ।
লিওন আর কোনো কথা না বলে নিজের প্লেটটা টেনে নিল। ছুরি-কাঁটাচামচ হাতে নিয়ে ধীর, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাওয়া শুরু করল। কয়েক সেকেন্ড নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল হিয়া। তারপর নিজের প্লেটেও একই খাবার তুলে নিল।
টেবিলে রাখা প্রতিটি পদই ছিল অতিরিক্ত ঝাল। লাল মরিচ, চিলি সস আর মসলার তীব্র গন্ধেই বোঝা যাচ্ছিল খাবারগুলো সাধারণ মানুষের জন্য নয়। প্রথম লোকমাটা মুখে দিতেই হিয়ার বুকের ভেতর জ্বালা করে উঠল। তবু তার মুখের অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন আনল না সে। ধীরে ধীরে দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয় লোকমাও মুখে তুলে নিল।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠল। অধর দুটো পাকা স্ট্রবেরির মতো রক্তিম হয়ে গেছে। নাকের ডগাও লাল হয়ে উঠেছে। চোখের কোণে চিকচিক করছে জল, কিন্তু সে মরিয়া হয়ে সেই জল গড়িয়ে পড়তে দিচ্ছে না। ঝালের তীব্রতায় তার গলা জ্বলছে, তবু সে থামল না।
লিওন খেতে খেতেই আড়চোখে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। অবশেষে কাঁটাচামচটা নামিয়ে রেখে বিরক্ত গলায় বলল,
“স্পাইসি ফুড খেতে না পারলে খেও না। জোর করে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ কেন?”
কথাটা শুনে হিয়ার চোখ দুটো ধীরে ধীরে তার দিকে উঠল। কয়েক সেকেন্ড সে নির্বাক তাকিয়ে রইল।তারপর অধরে মৃদু হাসি ফুটিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“You’re worried about me?”
প্রশ্নটার উত্তর দিল না লিওন। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার নিজের খাবারের দিকে মন দিল।
কিন্তু হিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসিটা আর মিলিয়ে গেল না। উত্তর না পেলেও তার আপত্তি নেই। লিওন অন্তত একবার তার দিকে তাকিয়েছে। একবার হলেও তার অস্বস্তিটা খেয়াল করেছে। এই সামান্য যত্নটুকুই হিয়ার হৃদয়ে অদ্ভুত এক শান্তি ছড়িয়ে দিল। সে আবার চুপচাপ নিজের প্লেট থেকে এক টুকরো ঝাল খাবার তুলে মুখে দিল।
খাবার শেষ হতেই হিয়া দ্রুত গ্লাসটা তুলে এক নিঃশ্বাসে প্রায় পুরোটা পানি খেয়ে ফেলল। ঝালের তীব্রতা এখনও তার কণ্ঠনালিতে আগুনের মতো জ্বলছে। চোখ দুটো টলমল করছে, তবু মুখে কোনো অস্বস্তির ছাপ রাখল না সে। গ্লাসটা ধীরে টেবিলের ওপর রেখে ঠোঁটের কোণে পরিচিত সেই দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“এবার গেম হবে। দেখা যাক, অফিসার লিওন… আমাদের দুজনের মধ্যে কার মাথা বেশি ঠান্ডা আর কার চাল বেশি নিখুঁত।”
কথা শেষ করেই সে উঠে পাশের ক্যাবিনেট থেকে পালিশ করা কাঠের একটি দাবার বোর্ড নিয়ে এল। যত্ন করে বোর্ডটা টেবিলের মাঝখানে রেখে একে একে সব গুটিও সাজিয়ে দিল।
লিওন নিশ্চুপ বসে রইল। এই চব্বিশ ঘণ্টার শর্ত সে নিজেই মেনে নিয়েছে। তাই ইচ্ছে না থাকলেও আপাতত খেলার টেবিল ছেড়ে ওঠার সুযোগ নেই।
তবে দাবা তার কাছে নতুন কিছু নয়। শৈশব থেকেই দাবা ছিল তার প্রিয় খেলা। স্কুল, কলেজ—অসংখ্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একের পর এক চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সে। প্রতিপক্ষের চাল পড়ে ফেলা তার পুরোনো অভ্যাস।
হিয়া সাদা গুটিগুলোর সামনে গিয়ে বসল।তারপর ভ্রু নাচিয়ে বলল, “শুধু দাবা খেললে মজা হবে না। একটা চ্যালেঞ্জ থাকুক?”
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। “কী চ্যালেঞ্জ?”
হিয়ার অধরে ধীরে ধীরে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। “তুমি হারলে আমাকে কিস করবে।”
এক সেকেন্ড থেমে সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে যোগ করল, “আর আমি হারলে… আমিই তোমাকে কিস করব।”
কথাটা শুনে লিওনের মুখের রঙ বদলে গেল। সে কয়েক মুহূর্ত নির্বাক তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“What? এ দুটোর মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?”
হিয়া কাঁধ ঝাঁকাল।
“আমার কাছে তো বেশ পার্থক্য আছে।”
লিওন বিরক্তিতে কপালে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করল, “অবিশ্বাস্য… একটা মেয়ে এতটা সেইমলেস কীভাবে হতে পারে!”
হিয়ার হাসিটা আরও গভীর হলো। সে কোনো রাগ করল না। বরং লিওনের চোখে চোখ রেখে শান্ত স্বরে বলল, “Yes… I’m shameless. I’m bold.”
তার কণ্ঠ নরম হয়ে এল কিছুটা “তবে সবার জন্য না। শুধু তোমার জন্য। আর শুধু তোমার কাছেই।”
লিওন বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললো “আমি এই হাস্যকর চ্যালেঞ্জে রাজি নই।”
হিয়া আলতো করে একটি সাদা পন হাতে তুলে নিল।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,”ওহ… তাহলে নিজের ওপর তোমার কনফিডেন্স নেই?”
লিওন ধীরে মাথা তুলল। হিয়া কথাটা শেষ করল, —”আগেই বুঝে গেছো, আমার কাছে হেরে যাবে?”
শব্দগুলো সোজা গিয়ে আঘাত করল লিওনের অহংবোধে।তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখে জ্বলে উঠল প্রতিযোগিতার পুরোনো আগুন। কয়েক সেকেন্ড হিয়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে ধীরে বলল,
“Fine…”
তারপর দাবার বোর্ডের দিকে হাত বাড়িয়ে প্রথম গুটিটা স্পর্শ করে বললো “Challenge accepted.”
দাবার গুটিগুলো সাজিয়ে শেষ করতেই হিয়া একজন সার্ভেন্টকে ভেতরে আসতে বললো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সার্ভেন্ট একটি রূপালি ট্রে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল। ট্রের ওপর রাখা ছিল গাঢ় লাল ওয়াইনের বোতল, দুটি ক্রিস্টালের গ্লাস, দামি ব্র্যান্ডের সিগারেটের একটি প্যাকেট আর সোনালি রঙের লাইটার।সবকিছু টেবিলের পাশে রেখে সার্ভেন্ট নীরবে বেরিয়ে গেল। হিয়া বোতলের কর্ক খুলে ধীরে ধীরে একটি গ্লাসে ওয়াইন ঢালল। গাঢ় লাল তরলটা কাঁচের গ্লাসে ঘূর্ণি তুলে থেমে গেল।
গ্লাসটা সে লিওনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
“Wine?”
লিওন গ্লাসটার দিকে একবার তাকিয়েই মাথা নাড়ল।
“I don’t drink.”
হিয়া কোনো মন্তব্য করল না।
সিগারেটের প্যাকেট খুলে একটি নিজের অধরে গুঁজে নিল। লাইটারের আগুনে সেটি জ্বালিয়ে ধোঁয়ার প্রথম টানটা ধীরে বাতাসে ছেড়ে দিল। এরপর আরেকটি সিগারেট বের করে লিওনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
লিওন শান্ত কণ্ঠেই বলল, “I don’t smoke.”
হিয়া ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো। “Never?”
লিওন সরাসরি জবাব দিলো “Never.”
এক মুহূর্ত লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল হিয়া। তারপর নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে ফেলল। “আমি জানতাম।”
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
হিয়া সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে বলল, “তবু ইচ্ছে করেই অফার করলাম। মাঝে মাঝে অসম্ভব জিনিসের দিকেও হাত বাড়াতে ইচ্ছে করে।”!”
কথাটা শেষ করে সে ইন্টারকমের বোতাম টিপল। তারপর সার্ভেন্টকে নির্দেশ দিলো —”এক গ্লাস ফ্রেশ ওয়াটারমেলন জুস নিয়ে আসো।”
কিছুক্ষণ পর সার্ভেন্ট ঠান্ডা তরমুজের রস ভরা লম্বা একটি গ্লাস এনে লিওনের সামনে রেখে গেল।
হিয়া গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“এটা অন্তত ফিরিয়ে দেবে না, দিলবার। তোমার প্রিয় জুস।”
লিওন কোনো উত্তর দিল না। শুধু একবার গ্লাসটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে সেটি তুলে নিল।
হিয়ার অধরে অজান্তেই তৃপ্তির এক ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
সে জানত, লিওন ধূমপান করে না। মদও স্পর্শ করে না। তবু প্রতিবারের মতো আজও সে নিজের ইচ্ছেটুকু একবার প্রকাশ করেছিল—যদি কোনোদিন, কোনো এক মুহূর্তে, লিওন তার বাড়িয়ে দেওয়া কোনো জিনিস স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে।
লিওন জুসে চুমুক দিয়ে গ্লাসটা ধীরে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল হিয়ার মুখে। চোখে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে সে বলল,—”অদ্ভুত তুমি। একদিকে বলো আমাকে ভালোবাসো, অন্যদিকে আবার সিগারেট, ওয়াইন এসব অফার করছো। সত্যিই যদি ভালোবাসতে, তাহলে আমার শরীরের ক্ষতি হতে পারে এমন একটা জিনিসও আমার সামনে রাখতে না।”
হিয়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অধরের কোণে ধীরে ধীরে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোঁয়াটা ধীরে লিওনের দিকেই ছেড়ে দিল। “আমার ফুসফুস ড্যামেজের পথে তাহলে তোমারটা সুস্থ রাখবো কেনো? আমি যদি একদিন মরে যাই, তুমি তো আরেকটা মেয়ের হাত ধরে নতুন জীবন শুরু করবে। সেটা আমি কেন হতে দেব?” হিয়ার চোখের দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে উঠল।
“তাই ভাবলাম… একসঙ্গেই দুজন শেষ হই। দুজনেরই ফুসফুস ড্যামেজ হোক। Fair deal, isn’t it?”
লিওন কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইল।তারপর মনে মনে শুধু একটাই কথা ভেসে উঠল—”কী ভয়ংকর মানসিকতার মেয়ে! মেয়েটা কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে, নাকি ভালোবাসার নাম করে ধ্বংসকে আলিঙ্গন করে?”
এদিকে কক্ষের বাইরে করিডোরে নিস্তব্ধতা নেমে আছে। দরজার দুই পাশে দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মার্ক আর ইভানা। ভেতর থেকে মাঝে মাঝে অস্পষ্ট কথোপকথনের শব্দ ভেসে আসছে। মার্ক দেয়ালে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মাথা নেড়ে নিচু স্বরে বলল,
“সত্যি বলছি ইভানা, মিস্ট্রেস ওই অফিসারটার জন্য এতটা পাগল কীভাবে হলো, আল্লাহই জানেন। আমার তো মনে হচ্ছে এই ভালোবাসাই একদিন তাকে শেষ করে দেবে। শুধু তাকেই না… আমাদের সবাইকেও টেনে নিয়ে যাবে সেই ধ্বংসের দিকে।”
ইভানা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। তার চোখে বিরক্তি নয়, বরং গভীর একটা নীরবতা। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে শান্ত গলায় বলল, “তুমি ভালোবাসা বলতে কী বোঝো, মার্ক?”
মার্ক ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
ইভানা আবার বলল, “কাউকে কোনোদিন সত্যিই ভালোবেসেছ?”
মার্ক কোনো উত্তর দিল না।
ইভানা মৃদু হেসে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
“যেদিন বাসবে, সেদিন বুঝবে,ভালোবাসা মানুষকে সবচেয়ে শক্তিশালীও বানায়, আবার সবচেয়ে দুর্বলও করে দেয়।”
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৬
সে দরজার দিকে একবার তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “মিস্ট্রেসের ভালোবাসাটা স্বাভাবিক নয়, আমি জানি। কিন্তু ওনার অনুভূতিটা মিথ্যেও নয়। সেই মানুষটার জন্য উনি নিজের সবকিছু ছেড়ে দিতে পারবে… আবার পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে পারবে।”
মার্ক নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।—”সেটাই তো আমার ভয়, ইভানা। ভালোবাসা যখন নেশায় পরিণত হয়, তখন শেষটা খুব কমই সুন্দর হয়।”
