বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৫
রানী আমিনা
“তুমি কেন তৈরি হচ্ছো সাইয়্যিদ? আমাদের আম্মার বার্থডেতে তুমি গিয়ে কি করবে?”
হাতের ছোট্ট মুঠিটি মুঠি শক্ত করে ঝাঝালো স্বরে জিজ্ঞেস করলো ফিরাস৷ বিরাট কামরার দুপাশ জুড়ে তিন তিন করে পর পর ছ’টা বিছানা৷ প্রতি বিছানার নিজস্ব আলমিরা, পড়ার টেবিল, স্ট্যান্ড মিরর৷
নিজের স্ট্যান্ড মিররের সামনে দর্জির সদ্য তৈরিকৃত পাঞ্জাবিটি নিজের ছোট ছোট হাতে গায়ে চড়িয়ে নিতে থাকা সাইয়্যিদ ফিরলো ওর দিকে৷ শান্ত স্বরে বলল,
“বাবা আমাকেও যেতে বলেছেন৷”
“তুমি একদম যাবেনা! তোমার জন্যই আম্মা আমাদের সাথে থাকেন না! আমাকে তোমাকে একটুও পছন্দ করেন না!
“আমি বাবার আদেশ অমান্য করতে পারবোনা৷”
পূর্বের মতোই শান্ত স্বরে বলল সাইয়্যিদ। ফিরাসের চোয়াল শক্ত হলো তাতে, আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সাইয়্যিদের দিকে এগোতে নিলো সে। সেই মুহুর্তেই মিশআল এসে সামনে দাঁড়ালো তার, দৃঢ় গলায় বলল,
“তুমি আর এক পা’ও এগোলে আমি বাবাকে বলে দিব তুমি সাইয়্যিদের সাথে আবার খারাপ ব্যাবহার করেছো।”
জিবরান বিছানায় বসে তার আম্মার জন্য কেনা উপহারটা দেখছিলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। রুবিতে খোদাই করা এক ছোট্ট পাখি, ডানা মেলে উড়াল দিচ্ছে যেন। বাবা বলেছিলেন আম্মা পশুপাখি অনেক পছন্দ করেন, সেদিন বাবার সাথে শপিংয়ে গিয়ে আম্মার জন্য এটা কিনে ফেলেছে সে। এটা পেলে আম্মা অনেক খুশি হবেন, খুশি হয়ে উনি যদি ওদের সাথে প্রাসাদে ফিরে আসতে রাজি হয়ে যান! বাকবিতণ্ডা শুনে এগিয়ে এসে সে ফিরাসকে বলল,
“আমাদের আম্মা নিজ ইচ্ছায় আমাদের থেকে দূরে আছেন, এখানে সাইয়্যিদের কোনো দোষ নেই৷ ওকে বিরক্ত কোরো না। বাবা জানলে তোমাকে শাস্তি দিবেন৷”
কাসওয়ার চুপচাপ দেখছিলো এতক্ষণ, জিবরানের কথা শুনে বড়বড় পা ফেলে ফিরাসের পাশে এসে দাঁড়িয়ে সে উগ্র স্বরে বলে উঠলো,
“ফিরাস যা বলেছে ঠিকই বলেছে। সাইয়্যিদ কেন যাবে আমাদের আম্মার বার্থডেতে? ও তো আমাদের নিজের ভাই না, ও তো আম্মার কেউ নয়। ও কেন যাবে? ওকে দেখলে আম্মা আরও কষ্ট পাবেন!”
“তোমরা সাইয়্যিদকে এ ধরণের কথা বলেছো শুনলে বাবা কষ্ট পাবেন৷ তোমরা সবসময় সাইয়্যিদের সাথে এমন করতে পারোনা, বাবা মেনে নিবেন না৷ বাবা কি বলেছেন ভুলে গেছো? সাইয়্যিদ আমাদেরই ভাই, আমাদের মত সেও বাবার সন্তান৷ তোমরা এমন করলে আমি বাবাকে বলে দিব।”
কাঠকাঠ স্বরে বলল মিশআল।
আরসালান পড়ার টেবিলে বসে পশুর ছবি ওয়ালা মস্ত এক বইতে মুখ গুজে ছিল। কথার শব্দে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে মাথা তুললো সে, ওদের উদ্দ্যেশ্যে হুমকির স্বরে বলে উঠলো,
“এখানে আর একটাও কথা হলে কারো পোশাক আস্ত থাকবে না৷”
ঝগড়া থামিয়ে শান্ত হলো সবাই। আরসালানকে নিয়ে বিশ্বাস নেই, সে যেটা বলবে সেটাই করে দেখাবে৷ ফিরাস মুখ ঝামটা মেরে অন্যদিকে ফিরে তৈরি হতে ব্যাস্ত হলো। মিশআল কাসওয়ারকে পাঠিয়ে দিল পাঞ্জাবি পরে নিতে৷ জিবরান দাঁড়ালো সাইয়্যিদের পাশে, শান্ত স্বরে বলল,
“ওদের কথায় কিছু মনে কোরো না সাইয়্যিদ, জানোই তো ওরা দুজন কেমন।”
সাইয়্যিদ সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালো, মিশআল এগিয়ে এসে চাপা স্বরে বলল,
“বাবাকে এ ব্যাপারে কিছু বলার প্রয়োজন নেই, সাইয়্যিদ। উনি শুনলে রেগে যাবেন৷ এমন সুন্দর দিনে তুমি নিশ্চয় তাকে রাগাতে চাইবেনা!”
“ঠিক আছে, আমি বাবাকে কিছুই জানাবো না।”
মিশআলের মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটলো, সাইয়্যিদের কাধ চাপড়ে দিয়ে সে এগোলো নিজে তৈরি হতে।
ক্ষণিক পরেই লিও ঢুকলো কামরাতে, আনুগত্যের সাথে বলল,
“শেহজাদারা, হিজ ম্যাজেস্টি আপনাদের জন্য বারান্দায় অপেক্ষা করছেন।”
“আমরা এখনি আসছি লিও।”
বলল মিশআল। লিও আনুগত্য জানিয়ে বেরিয়ে গেলো আবার৷ বর্তমানে রয়্যাল ফ্লোর নারী শূন্য থাকায় মহসিনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে হেরেমে। পরিবর্তে লিও, কাঞ্জি আর ওকামিকে রাখা হয়েছে শেহজাদাদের দেখা শোনার জন্য৷ সাইয়্যিদ ব্যাতিত বাকি বাচ্চাগুলো এখন থেকেই যতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে তাতে সাধারণ দাস গুলো তাদের নিকট নিরাপদ নয়, তারা শেহজাদাদের সামলাতেও ব্যর্থ। তাই ওদেরকেই মোতায়েন করেছে মীর। যেন অন্তত বলে পেরে ওঠে৷
লিও বেরিয়ে গেলে মিশআল সবাইকে দ্রুত তৈরি হতে বলল। বড় ভাইয়ের তকমাটা গায়ে লাগানো বিধায় সবার দায়িত্ব নিজের কাধে আপনিই নিয়ে নিয়েছে সে।
সাইয়্যিদকে পাঞ্জাবীর স্লিভের বোতাম লাগাতে বারবার ব্যর্থ হতে দেখে এগিয়ে গেলো মিশআল, লাগিয়ে দিল বোতামটি। ফিরাস সেদিকে একবার আড়চোখে চেয়ে না দেখার ভান করে এগোলো দরজার দিকে, বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,
“ওকে আমি ভাই হিসেবে কোনোদিনও মানবোনা!”
মিশআল সবাইকে ডেকে নিয়ে বের হলো কামরা থেকে। সবার পেছনে এলো আরসালান। মুখখানা নির্বিকার তার, যেতে চায়না সে তার আম্মার সাথে দেখা করতে, জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। যে আম্মা ওদের থেকে নিজ স্বার্থে দূরে থাকে তার সাথে দেখা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ওর নেই। বুক ভর্তি অভিমানে চোখের কোণে জল দেখা দিল তার, সবার অগোচরে সেটুকু মুছে নিলো সে৷
মীর বারান্দায় দাঁড়িয়ে, আকাশের বুক ফেড়ে উঠে যাওয়া দূর কিমালেবের পর্বতসারি দেখছিলো। ছোট ছোট পদধ্বনি গুলো শুনতে পেয়ে পেছনে তাকাল সে, চোখ জুড়িয়ে গেলো তার! স্নিগ্ধ চোখে তার সন্তানদের ছোট্ট ছোট্ট, নিষ্পাপ মুখগুলো দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো একটা৷ গলা পরিষ্কার করে বলে উঠলো,
“সবাই তৈরি?”
সবেগে মাথা নাড়ালো ওরা সকলে। মীর এগোলো রয়্যাল ফ্লোরের প্রবেশদ্বারের দিকে। বাচ্চারা ক্রমানুসারে সারিবদ্ধভাবে এগোলো তার পেছন পেছন।
ট্রি হাউজের ভেতর চুপচাপ বসে আনাবিয়া, তার সম্মুখে রাখা একটি বিরাট বক্স, ওপরে একটা চিরকুট। আনাবিয়া তুললো সেটা, ভাজ খুলে দেখলো —মীরের হস্তাক্ষর,
“আজকের দিনে অন্তত অভিমান পুষে রেখোনা, আমরা অপেক্ষায় থাকবো।”
আনাবিয়া চিরকুট খানা ভাজ করে তুলে রাখলো ওর ডায়েরির পাতার ভেতর। বক্স খুলে দেখলো ভেতরে একটা লাইট ব্লু গাউন, সাথে ম্যাচিং জুয়েলরি। আনাবিয়া নিজের সামনে একবার তুলে ধরে দেখলো সেটা। অতঃপর আবারও ঢুকিয়ে রাখলো বক্সের ভেতর।
নিজের আলমারি খুলে একটা অফ হোয়াইটের সাদামাটা পোশাক পরে নিল। তারপর তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লো মীরের দেওয়া লোকেশনের উদ্দ্যেশ্যে।
হারবরে যখন পৌছোলো তখন চারদিকে সুনসান হয়ে আছে৷ এদিকে লোকজনের আনাগোনা নেই বললেই চলে, তার ওপর রাত৷ দূরে, সমুদ্রের তীরে ভেড়ানো আনাবিয়ার ইয়টখানা। ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে সেটি। নিরব পরিবেশ, অথচ মীরের উপস্থিতি প্রকট!
আনাবিয়া এগোলো সেদিকে, ডকে হেটে ইয়টের সিড়ি বেয়ে উঠলো ওপরে। আঁধারে ঘেরা চতুর্দিক, আকাশে চাঁদটাও নেই আজ। তীর হতে ঝিঝির তীক্ষ্ণ স্বর ভেসে আসছে একাধার৷ আনাবিয়া ফোরডেকে পৌঁছাতেই জ্বলে উঠলো আলো, ঝলমলে আলোকসজ্জায় ভরে উঠলো সম্পূর্ণ ইয়টটি। বাচ্চারা উচ্ছ্বসিত, সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠলো,
“হ্যাপি বার্থডে আম্মা!”
হঠাৎ এমন ঝলমলে আলোয় চোখ কুচকে নিলো আনাবিয়া, পরমুহূর্তে চোখ খুলতেই দেখলো ছুটে আসছে ওর বাচ্চারা। আনাবিয়া হাটু গেড়ে বসে পড়লো সেখানে, দুহাত বাড়িয়ে দিল ওদের দিকে। ফিরাস সবার আগে ছুটে এসে ঝাপিয়ে পড়লো মায়ের বুকে। একে একে সকলে এসে সজোরে জাপটে ধরলো ওকে! মিশআল আর কাসওয়ার দু পাশ থেকে উপর্যুপরি চুমুতে ভরিয়ে দিলো ওর মুখ।
খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো আনাবিয়া। চুমুর আক্রমণ সামলে সামনে তাকাতে দেখতে পেলো দূরে দাঁড়িয়ে আরসালান৷ ওর পাশে দাঁড়িয়ে মীর, মীরের পেছনেই গুটিসুটি মেরে দাঁড়ানো সাইয়্যিদ৷
আরসালানের মুখখানা ভার, চোখ জোড়া ছলছল। নাকের পাটা কান্না আটকানোর চেষ্টায় ফুলে ফুলে উঠছে ক্ষণিক পর পর৷ আনাবিয়া তাকাতেই মুখ ফিরিয়ে নিলো সে, বাবার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো মুখ লুকিয়ে।
মীর বসলো ওর সামনে, অভিমানে ঠোঁট ফুলে আছে ছেলের। মোলায়েম স্বরে মীর বলল,
“কি কথা হয়েছিলো আমাদের? আম্মার কাছে যাও, গিয়ে আম্মাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেয়ে আসো।”
“আমি একটুও যাবোনা! আম্মা আমাদের থেকে দূরে কেন থাকেন?”
বলতে বলতে চোয়ালের ওপর ফোটায় ফোটায় পানি গড়িয়ে পড়লো তার, ঠোঁট ফুলে উঠলো আরও। মীর আলতো হাতে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি আম্মাকে বলব যেন আম্মা আমাদের সাথে ফিরে আসেন, ঠিক আছে?”
“প্রমিস?”
“অনেক প্রমিস।”
আরসালানের কপালে সশব্দে চুমু খেলো মীর। পিঠ চাপড়ে পাঠিয়ে দিল ওকে আনাবিয়ার কাছে। আরসালান গুটি গুটি পায়ে এগোলো, ফিরাস সরে দাঁড়ালো সামনে থেকে। আরসালান তাকিয়ে রইলো নিচে, মায়ের সাথে দৃষ্টি মেলালেই যেন হয়ে যাবে কিছু একটা!
আনাবিয়া ডাকলো,
“আরসালান! বাবা আমার, আমার কাছে আসবেনা?”
হাত বাড়িয়ে দিলো আনাবিয়া, এ আহ্বান উপেক্ষা করার শক্তি পেলোনা আরসালান৷ ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে সে আছড়ে পড়লো মায়ের বুকে। আনাবিয়া দুহাতে সজোরে জড়িয়ে নিলো ওকে, চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলো ওর ছোট্ট মুখখানা।
সাইয়্যিদ বাবার পেছন থেকে উঁকি দিয়ে দেখতে রইলো মা আর তার সন্তানদের আবেগঘন মিলন। বাবার পাঞ্জাবীর কোণা মুঠি করে ধরে রইলো সে৷ মীর এক হাতে জড়িয়ে নিলো ওকে। আরসালানের অভিমানী কান্না যেন শেষই হলো না!
ক্ষণিক পরেই উৎসবমুখর পরিবেশে পরিণত হলো ইয়টের ডেক। কেক কাটার পর্ব শেষ করে আনাবিয়া খাইয়ে দিলো বাচ্চাদের, বাচ্চারা ক্ষণিক কেক মাখামাখি করে অবশেষে পরিষ্কার হয়ে ফিরে এলো আনাবিয়ার নিকট৷ ওদের দেখে আনাবিয়া জিজ্ঞেস করলো,
“আমার গিফট কই?”
জিভ কাটলো ওরা, গিফটের কথা তো ভুলেই গেছে! মিশআল ছুটে এসে দাঁড়ালো আনাবিয়ার সামনে, পাঞ্জাবীর পকেট হাতিয়ে একটা ছোট্ট গিফট বক্স রাখলো আনাবিয়ার সম্মুখে। শিশুসুলভ, উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠলো,
“খুলে দেখুন আম্মা!”
আনাবিয়া খুললো, ভেতরে স্যাফ্যার পাথরের একটা সুন্দর আংটি। আনাবিয়া মিষ্টি হেসে বলল,
“এটা অনেক সুন্দর মিশআল, তুমি এটা কিভাবে কিনেছো?”
“হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে কিনেছি আম্মা!”
মিশআলের মুখে গর্বের হাসি, আনাবিয়া বক্স টা এগিয়ে দিলো ওর কাছে, বলল,
“পরিয়ে দিবে না?”
মিশআল নিজের ছোট ছোট হাতে আনাবিয়ার হাত খানা টেনে নিয়ে পরিয়ে দিলো আংটি৷ আনাবিয়া সস্নেহে একটা চুম্বন এঁকে দিল ওর গালে৷ মীর টেবিলের বিপরীতের চেয়ারে বসে দেখতে রইলো ওদের৷
ফিরাস এগিয়ে এলো তৎক্ষনাৎ, আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠলো,
“আম্মা, আমার গিফট সবার চেয়ে বেশি সুন্দর!”
“তাই? কই দেখি!”
ফিরাস, নিজের পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা লম্বা বক্স বের করে মেলে ধরলো আনাবিয়ার সামনে, রূপোর ভেতর ছোট্ট ছোট্ট হীরে বসানো এক জোড়া নূপুর। আনাবিয়া খুশি হলো প্রচন্ড, উৎফুল্ল চোখে ফিরাসের দিকে চেয়ে বলল,
“এটা আসলেই অনেক অনেক বেশি সুন্দর, ফিরাস!”
ফিরাস খুশিতে গদগদ হয়ে এলো, উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে উঠলো,
“পরিয়ে দিই আম্মা?”
“দাও।”
আনাবিয়া পা বাড়িয়ে দিল, ফিরাস খুব মনোযোগের সাথে নূপুর জোড়া পরিয়ে দিতে রইলো, কিন্তু আটকাতে ব্যর্থ হতে রইলো বার বার৷ পরাজিত হয়ে সাহায্যের জন্য বাবার দিকে তাকালো সে, মীর উঠে এলো তৎক্ষনাৎ, সযত্নে নূপুর জোড়া আটকে দিলো সে আনাবিয়ার পায়ে৷ ফিরাস দুগালে হাত দিয়ে সেখানে বসেই মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইলো মায়ের পায়ের দিকে, খুশি খুশি গলায় বলে উঠলো,
“আপনাকে অন্নেক সুন্দর লাগছে আম্মা!”
জিবরান এলো তখন, কোনো সূচনা ছাড়াই নিরবে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা বক্স বের করে আনাবিয়ার হাতে দিল সে। আনাবিয়া খুললো সেটা, রুবিতে খোদাই ছোট্ট ডানা মেলা পাখিটাকে দেখে শিশুদের মতন হেসে উঠলো সে, বলল,
“এটা অনেক অনেক সুন্দর, জিবরান। এই আইডিয়া তোমাকে কে দিয়েছে?”
“বাবা। বাবা বলেছিলেন আপনার এসব অনেক পছন্দ। আপনার ভালো লেগেছে আম্মা?”
আনাবিয়া তাকালো একবার মীরের দিকে, পরক্ষণেই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে উঠলো,
“খুব খুব ভালো লেগেছে, এটা অনেক অনেক সুন্দর!”
কাসওয়ার জিবরানকে ঠেলে চলে এলো সামনে, ওকে এক হাতে ওদিকে সরিয়ে দিয়ে আনাবিয়ার দিকে এগিয়ে দিল একটা বক্স, আনাবিয়া খুলে দেখলো দামী পাথরের নকশা করা একটা আইভরির তৈরি চিরুনী। জিবরান উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে উঠলো,
“আপনার সুন্দর চুল গুলো এটা দিয়ে আচড়াবেন আম্মা! দেখবেন আরও সুন্দর হয়ে যাবে।”
“তাই?”
“হু, শপকিপার বলছিলো এই চিরুনীটা নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চুল আচড়ানোর জন্য, তাই আমি এটা নিয়ে চলে এসেছি! কারণ বাবা বলেছেন, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর চুল আপনার।”
আনাবিয়া ভ্রু তুলে মিষ্টি হাসিতে ঠোঁট ভাজ করে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে, জিবরান চোখ ঘুরিয়ে বলতে রইলো,
“বাবা যদিও বলেছিলেন আপনার জন্য নেকলেস নিতে, কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর চুল আঁচড়ানোর চিরুনী রেখে এলে তো অন্য কেউ নিয়ে নিত, তখন চিরুনীটা কষ্ট পেতো না! তাই আমি এটাই কিনেছি। এখন ও অনেক খুশি থাকবে৷”
ভ্রু নাচিয়ে উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বলল সে। আনাবিয়া হেসে উঠলো সশব্দে। সম্মুখে চেয়ে দেখলো আরসালান এক কোণে অপরাধী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ, ডাকলো সে,
“আরসালান! বাবা আমার, তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এদিকে এসো!”
আরসালান গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এলো, ছলছল চোখে তাকালো আনাবিয়ার দিকে, আনাবিয়া চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে বাবা? কাঁদছো কেন?”
“আপনার জন্য যে উপহার নিয়ে এসেছিলাম সেটা নষ্ট হয়ে গেছে!”
কান্না মিশ্রিত স্বরে বলে উঠলো আরসালান৷ আনাবিয়া হাসলো তাতে, ওর ছোট্ট মুখখানা দুহাতে তুলে ধরে বলল,
“তাতে আম্মা একটুও মন খারাপ করবেনা, তুমি যেমন উপহারই দেবে আম্মা তাতেই খুশি, অনেক অনেক খুশি! হুম? এখন যাও, তোমার উপহার নিয়ে এসো৷”
আরসালান দোনোমনা করে এগিয়ে গেলো ডেকের পেছন দিকে, হাতে সাদা রঙা অর্কিডের এক গুচ্ছ নিয়ে ফিরলো আবার। নুয়ে পড়েছে সেগুলো, হারিয়েছে উজ্জ্বলতা। আরসালান সেগুলো দুহাতে ধরে ফুঁপিয়ে বলে উঠলো,
“বাবা বলেছিলেন আপনার এই ফুল অনেক পছন্দ! সকাল বেলা লিও ভাইজানের সাথে গিয়ে আমি তুলে এনেছি, কিন্তু পানিতে রাখতে ভুলে গিয়েছি! আপনার উপহার নষ্ট করে ফেলেছি আম্মা!”
আনাবিয়া স্নিগ্ধ হেসে কাছে টেনে নিলো ওকে, হাত থেকে ফুল গুলো নিয়ে সশব্দে চুমু খেয়ে বলল,
“আমার সাহসী বাবা! আমার জন্য কত কষ্ট করেছো তুমি, অতদূর গিয়ে আমার পছন্দের ফুল তুলে এনেছো যে এতেই আমি খুশি। এদিকে আসো দেখি!”
আরসালানকে কোলে তুলে নিয়ে ওর চোখ মুছিয়ে দিয়ে গালে চুমু খেলো আনাবিয়া। আরসালান মায়ের বুকের সাথে লেপ্টে পড়ে রইলো। ফিরাস এক কোণে দাঁড়িয়ে ফুসতে রইলো তাতে, মিশআল ওকে শান্ত করতে ব্যাস্ত হয়ে গেলো।
মীর নিজের পেছনে লুকিয়ে থাকা সাইয়্যিদের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“সাইয়্যিদ? কি কথা হয়েছিলো তোমার সাথে?”
সাইয়্যিদ ইতস্তত ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলো বাবার পেছন থেকে। মীর ওকে এগিয়ে দিল সামনে৷ সাইয়্যিদ ভয়ে ভয়ে এগুলো, আড়চোখে ফিরাসের দিকে তাকালো একবার। ফিরাস পারেনা ওকে চোখ দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। সাইয়্যিদ গিয়ে দাঁড়ালো আনাবিয়ার সামনে, ভীত স্বরে ডেকে উঠলো,
“শেহজাদী!”
আনাবিয়া আরসালানকে নামিয়ে দিলো, সাইয়্যিদ এগিয়ে গেলো আরও, কাঁপা হাতে আনাবিয়ার দিকে এগিয়ে দিল একটা বক্স। আনাবিয়া নিল সেটা, সাইয়্যিদ দুহাতে পাঞ্জাবির কোন দুইটা মুঠি করে ধরে ঢোক গিলতে রইলো বার বার। আনাবিয়া বক্স খুলে দেখলো একটা স্বর্ণের ব্রেসলেট, ওপরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হীরে বসানো।
আনাবিয়া বক্স টা ফিরিয়ে দিলো ওর হাতে, সাইয়্যিদ সেটা হাতে নিয়ে মর্মাহত চোখে চেয়ে রইলো। ক্ষণিক পর আনাবিয়া মোলায়েম স্বরে বলল,
“পরিয়ে দিবেনা?”
হাত বাড়িয়ে দিলো সে, সাইয়্যিদ বিস্মিত চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে। সাথে সাথেই বক্স থেকে ব্রেসলেট টা নিয়ে আনাড়ি হাতে পরাতে রইলো, কিন্তু কোন এক অজানা ত্রাসে হাত কাঁপতে রইলো তার, ব্রেসলেটটা শেষ পর্যন্ত হাত ফসকে পড়ে গেলো। সাইয়্যিদ ভীত চোখ তুলে দেখলো একবার আনাবিয়াকে, পরক্ষণেই আবার ব্রেসলেট টা তুলে পরাতে লেগে গেলো। আনাবিয়া জিজ্ঞেস করলো,
“ভয় পাচ্ছো?”
সাইয়্যিদের হাত থেমে গেলো, শঙ্কা নিয়ে তাকালো সে আনাবিয়ার দিকে৷ শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেলো তার, হৃৎপিণ্ডের জোরালো ঢিপঢিপ ধ্বনি আনাবিয়ার কান পর্যন্ত পৌছে গেলো যেন।
আচমকা ওকে দুহাতে কাছে টেনে নিলো আনাবিয়া, সাইয়্যিদ ভয় পেলো আরও, দ্বিধাভরে বাবার দিকে তাকালো একবার! আজ পর্যন্ত এই চোখ ধাধানো সুন্দরী মেয়েটি, যে কিনা তার অন্য ভাইদের জন্মদাত্রী আম্মা, তার বাবার স্ত্রী, কখনো স্পর্শ করেননি তাকে, কখনো তাকিয়েও দেখেননি তাকে, কখনো কথা বলেননি তার সঙ্গে। আজ তার এই হঠাৎ আলিঙ্গনে সাইয়্যিদ ভীতসন্ত্রস্ত, দিশেহারা হয়ে পড়লো।
মীর মাথা নেড়ে অভয় দিল ওকে, আনাবিয়া ওর মুখখানা দুহাতে ধরে বলে উঠলো,
“কোনো ভয় নেই, এখন পরাও দেখি!”
আনাবিয়া হাত রাখলো ওর সামনে। সাইয়্যিদ ইতস্তত করে ব্রেসলেটটা পরিয়ে দিতে উদ্যত হলো আবারও। আশ্চর্যজনক ভাবে এবার হাত কাঁপলোনা ওর৷ ব্রেসলেট টা পরিয়ে দিয়ে আনাবিয়ার দিকে মুখ তুলে তাকালো সে আবার, আনাবিয়া শুধোলো,
“কেমন লাগছে?”
সাইয়্যিদ বিস্মিত হলো আরও, একটা শুকনো ঢোক গিলে আনাবিয়ার হাতের দিকে চেয়ে সময় নিয়ে উত্তর দিলো,
“সুন্দর, অনেক সুন্দর৷”
এরপর অকস্মাৎ ছোট ছোট দুহাতে আনাবিয়ার মাখনসম হাতটা ধরে বলে উঠলো,
“আপনার হাত অনেক অনেক সুন্দর, শেহজাদী। অনেক নরম।”
আনাবিয়া মুচকি হাসলো। সাইয়্যিদ ওর কোলের ভেতরেই দাঁড়িয়ে রইলো, সরে এলোনা৷ ক্ষণিক পর পর আনাবিয়ার মুখের দিকে চেয়ে দেখতে রইলো৷ আনাবিয়া জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলবে?”
সাইয়্যিদ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বাধো বাধো গলায় বলে উঠলো,
“আ-আপনাকে আম্-আমিও আম্মা বলে ড্-ডাকবো?”
“সম্পর্কে আমি তোমার আম্মাই হই, সাইয়্যিদ, তাই ডাকতে পারো।”
সাইয়্যিদ আনাবিয়ার হাত খানা তখনো ধরে, চোরা চোখে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো,
“আ-আম্মা!”
“জ্বি।”
“আপনি কি আমাকে খুব অপছন্দ করেন?”
“কে বলেছে?”
“স্-সবাই বলে…. আপনি আমার ওপর রাগ করে প্রাসাদে থাকেন না! আমি কি খুব খারাপ?”
“না, সাইয়্যিদ, তোমাকে আমি একদমই অপছন্দ করিনা। তুমি অনেক ভালো ছেলে৷ তুমি একদিন অনেক বড় হবে, অনেক ভালো মানুষ হবে৷ আমি প্রাসাদে থাকিনা কারণ আমি অনেক ব্যাস্ত, আমার অনেক কাজ থাকে বাইরে, প্রাসাদে আসার সময় পাইনা। এ ধরণের কথা তোমাকে আর কেউ কখনো বললে তুমি তাদেরকে বলে দিবে, ঠিক আছে?”
সাইয়্যিদ মাথা নাড়ালো ওপর নিচে৷ আনাবিয়া ওকে কোল থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
“এখন যাও, ভাইদের সাথে খেলো।”
সাইয়্যিদ কৃতজ্ঞ চোখে তাকালো ওর দিকে, পরক্ষণেই বাবার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হেসে ছুটে গেলো অন্যদের কাছে। মিশআল আর জিবরান মিলে সবাইকে নিয়ে ঢুকে গেলো স্যালুনের ভেতর, ওদের হৈচৈ এর আওয়াজে চাপা পড়ে গেলো রাতের নিকষ নিরবতা৷
বাচ্চারা চোখের আড়াল হতেই মীর বলে উঠলো,
“আমার দেওয়া পোশাক তবে পরলেনা!”
“সব সময়ে তোমার পছন্দকেই প্রাধান্য দিতে হবে এমন কোথাও লেখা নেই৷”
“ভালোবাসা থেকেও প্রাধান্য দেওয়া যায়।”
“অনেক দিয়েছি, কখনো কখনো নিজেকে প্রাধান্য দিতেও ইচ্ছে করে৷”
বলল আনাবিয়া। মীর চেয়ে রইলো ওর দিকে, শ্বাস ছেড়ে বলল,
“বাচ্চাদের কথা দিয়েছি, তোমাকে প্রাসাদে ফিরিয়ে নিয়ে যাব৷ ওরা মিস করে তোমাকে, তোমার কাছে থাকতে চায়৷ আমিও তোমার কাছে থাকতে চাই৷”
“আমি এ মুহুর্তে ফিরতে পারব না৷”
“কবে ফিরবে?”
“জানা নেই৷”
“ওরা অপেক্ষায় আছে, তোমার ফেরার৷”
“আমি জানি।”
“আমার জন্য না হোক, ওদের জন্য হলেও ফিরে আসো৷ এভাবে জেদ ধরে থাকা কেমন দেখায় বলো!”
“আমি জেদ ধরে নেই, ওইখানে গেলে আমি শান্তি পাইনা, অশান্তিতে থাকি৷ তাই ওখানে ফিরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷”
“সাইয়্যিদের জন্য?”
“সাইয়্যিদের কোনো দোষ নেই৷ সাইয়্যিদ খুবই জেন্টেল একজন ছেলে, ওর ওপর আমার রাগ করার কোনো প্রশ্নই আসেনা, কিন্ত….!”
“কিন্তু?”
“আমার চোখের সামনে তোমার একটা জলজ্যান্ত ভুল ঘুরে বেড়ায় যে কিনা আমাকে তোমার অতীতের করা সমস্ত কাজ মনে করিয়ে দেয়, যে কাজ গুলোতে আমি কষ্ট পেয়েছি। এটা আমাকে অনেক প্রেশার দেয়, আমাকে মানসিক পীড়া দেয়। আমি হয়তো বরাবরের মতো সবই মেনে নিতে পারতাম, তোমাকে হয়তো এবারও ক্ষমা করতে পারতাম, হয়তো সবই আবার আগের মত হয়ে যেত কিন্তু আমি পারছিনা৷ আমি চেষ্টা করলেও পারবনা৷ তাই ভালো হয় তুমি আমাকে আর কখনো প্রাসাদে ফিরতে বলবেনা৷”
“বাচ্চাদের দিকে একবার দেখো। ওরা সবাই তোমাকে চায়, আমি তোমাকে চাই, সাইয়্যিদ পর্যন্ত তোমাকে প্রাসাদে চায়। ওদের সবার তোমাকে প্রয়োজন, আমার তোমাকে প্রয়োজন।”
মীরের কন্ঠে ব্যাকুলতা স্পষ্ট হলো, আনাবিয়া মাথা নিচু করে রইলো। ক্ষণিক পর ঠোঁট ভিজিয়ে বলে উঠলো,
“তুমি..তুমি বুঝতে পারছোনা মীর! তুমি অবশ্যই জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি, তোমাকে কতটা মেনে চলি, তোমাকে কতটা প্রাধান্য দিই। আমি জানি আমার পক্ষে কখনো সম্ভব হবেনা তোমার থেকে নিজেকে দূরে রাখা, তাই তুমি আমার সাথে যা-ই করো না কেন! আমি পারিনি কখনো, হয়তো পারবো ও না। সৃষ্টিকর্তা আমাকে সেই সক্ষমতা দেননি। কিন্তু আমি চাই…! আমি চাই তোমাকে ওভার কাম করতে, আমি নিজে সক্ষম হতে চাই। তোমার ছায়াতলে থাকলে আমি শুধু একটা ডানা ভাঙা ঈগল হয়ে ঘুরবো, যার নাম যশ আছে কিন্তু ক্ষমতা নেই!”
মীর শুনলো, বললনা কিছুই। ক্ষণিক নিরবতার পর আনাবিয়া আবার বলল,
“আমি পারিনা, আমি চেষ্টা করলেও পারিনা। ওই প্রাসাদ আমাকে সব সময় সব মনে করিয়ে দেয়। এটা পূর্বে এত প্রকট ছিলনা, কিন্তু এখন….! এখন সবই আমার কাছে জীবন্ত মনে হয়! আমার মনে পড়ে যায় প্রথম যেদিন তুমি… তুমি…. আমি এসব নিয়ে কোনো কথা বলতে চাইনা। আমি এসব মনে করতে চাইনা! এসব আমার ভালো লাগে না, এসবে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে৷”
“তুমি কি এসব কারণে বাচ্চাদেরকে তাদের মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করছো না?”
“আমি ওদেরকে ভালোবাসি, ওরা আমার সন্তান! আমি অবশ্যই ওদের ভালোবাসি, নিজের চাইতেও অনেক অনেক বেশি, ওদের সাথে থাকতে চাই। কিন্তু প্রাসাদে নয়৷”
“ওদেরকে আমি প্রাসাদের বাইরে থাকতে দেবনা এটা তুমিও জানো। আমার সন্তানেরা অব্যশ্যই বনে জঙ্গলে রাত কাটাবে না!”
“তবে আমি ওদেরকে দূর থেকেই ভালোবাসবো।”
মীর উপহাসের হাসি হাসলো, শ্লেষাত্মক স্বরে বলল,
“তুমি বোধ হয় জানোনা তোমার সন্তানদের মনে ইতোমধ্যে তোমাকে নিয়ে বিরূপ ধারণা জন্মেছে। ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি ক্লান্ত, ওদের কাতর মুখশ্রী আমাকে পীড়া দেয়৷ রাতে ওরা ওদের মায়ের উষ্ণতা খোঁজে যা আমি ওদের দিতে পারিনা। ওদের তিন বছর বয়সে তুমি ওদের পরিত্যাগ করেছো—”
“আমি কখনোই ওদের পরিত্যাগ করিনি! আমি শুধু তোমার সামনে আসতে চাইনা!”
“অবশ্যই পরিত্যাগ করেছো শিনজো। বিগত দু বছর ধরে আমার ছ’জন সন্তানের পিতা এবং মাতা উভয়ের দায়িত্ব আমি পালন করি। তোমার এখানে কোনোই অবদান নেই, তুমি আমাদের সন্তানদের জন্য কোনো সুখময় স্মৃতি রাখোনি, ওরা বুঝতে শিখলে ধরে কখনো দেখেনি ওদের বাবা মা একত্রে বাস করে। এগুলো যে ওদের মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে এগুলো তোমার বোঝা উচিত৷ সবসময় জেদ খাটালে চলেনা শিনজো! আমরা কেউ এই দুনিয়াতে একা নই, সবাইকে নিয়েই আমাদের জীবন। তুমি চাইলেই তোমার আপন জনদের এড়িয়ে যেতে পারো না!”
“এসবই ঠিক হয়ে যাবে যদি তুমি আমাকে মুক্তি দাও! তুমি যদি আমাকে আর নিজের মত নিয়ন্ত্রণ করতে না চাও, তুমি যদি আর নিজের সব সিদ্ধান্ত আমার ওপর জবরদস্তি চাপিয়ে না দাও, তুমি যদি আমার জীবনের সব সিদ্ধান্ত না নাও!”
চাপা আর্তনাদের স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর ক্ষণিক নিরবে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে, ওর চোখের ভাষা বোঝা দায় হলো আনাবিয়ার জন্য। মীর আচমকা হাল ছেড়ে দেওয়া স্বরে বলে উঠলো,
“ঠিক আছে, তুমি মুক্তি পাবে৷ তোমাকে আগামী ছ’মাস সময় দিলাম৷ এর ভেতরে তুমি প্রমাণ করে দাও যে তোমার আমাকে প্রয়োজন নেই। তুমি যদি আমাকে ছাড়াই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারো, যদি তোমার কোনো অসুবিধা না হয়, যদি তুমি সেইফ অ্যান্ড সাউন্ড থাকো উইদাউট মাই ইন্টারফেয়ারেন্স তবে তুমি যা চাইবে তাই পাবে, মুক্তি চাইলে মুক্তি পাবে, এবং আমিও তোমার জীবন থেকে উইলিংলি সরে যাবো। তোমাকে কখনো বিরক্ত করবো না, ইভেন তোমার সামনেও আমি যাবনা।”
আনাবিয়া বিস্মিত হলো, অবিশ্বাস্য চোখে মীরের দিকে চেয়ে শুধোলো,
“তুমি শিওর?”
“সেন্ট পার্সেন্ট৷”
“ আমাকে আর সত্যিই কখনো বিরক্ত করবেনা?”
“না৷”
“আমার সামনেও আসবেনা?”
“না।”
“ছ’মাস?”
“হুম।”
“ঠিক আছে, আমি রাজি।”
“কবে থেকে শুরু করতে চাও?”
“আগামী কাল থেকেই।”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৪
ওদের কথার মাঝেই স্যালুন থেকে কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ ভেসে এলো, পরক্ষণেই সাইয়্যিদের যন্ত্রণাবিদ্ধ চিৎকার শুনলো দুজনেই। শঙ্কিত চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছুটে গেলো তৎক্ষনাৎ!
