ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২৫ (২)
নওরিন কবির তিশা
“শ্রীনগরের আকাশে তখন সায়াহ্নের শেষ স্বর্ণালি আলোটুকু পাহাড়ের বরফাবৃত চূড়া স্পর্শ করে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সকাল ছয়টার সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের ফ্লাইট ধরে, নানাবিধ আনুষ্ঠানিকতা আর চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক হলো ওরা ডাল লেকের শান্ত জলের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সুদৃশ্য এক কটেজে এসে পৌঁছেছে আরাভ-তিয়াশা।
সাতটা বাজতে চলল প্রায়। অক্টোবরের শেষাংশ হওয়ায় ধুম্রজালের ন্যায় ঘনিয়ে আসছে কুহেলির দলবল। পাহাড়ের ঢালে পাইন আর দেবদারু গাছের সারিগুলোর ওপর তখন অন্ধকারের ঘন চাদর জমতে শুরু করেছে। দূর দিগন্তে পীর পাঞ্জাল পর্বতমালা যেন শুভ্র মুকুটের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হিমালয় হতে বয়ে আসা এক চিলতে শীতল হাওয়া তিয়াশার রেশম কোমল চুলে বিলি কেটে যেতেই ও দুই হাত প্রসারিত করে এক দীর্ঘ, তৃপ্ত নিশ্বাস টেনে নিল।
হঠাৎ, পেছন থেকে সুপরিচিত ও চেনা এক জোড়া উষ্ণ হাত এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল ওর কোমর। নিজ চাদরে ওর ক্ষীণ কায়া ঢেকে,আরাভ নিজের চিবুকটা তিয়াশার কাঁধে ঠেকিয়ে, হিমশীতল হাওয়ার বিপরীতে ওর তপ্ত নিশ্বাসের স্পর্শ লেপে দিয়ে আর্দ্র কণ্ঠে ফিসফিসালো,,
– জায়গাটা আসলেও বড্ড বেশি সুন্দর। তাই না?
তিয়াশা চমকে উঠলেও নিজেকে আর ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না। বরং আরাভের চওড়া বুকে নিজের পিঠটা পরম ভরসায় এলিয়ে দিয়ে, ডাল লেকের শান্ত জলে চাঁদের আলোর প্রতিবিম্ব অবলোকন করতে করতে ফিসফিসিয়ে বললো,
– সুন্দর শব্দটা বড্ড ছোট, মিস্টার খান। সৌন্দর্যের কোনো সুপারলেটিভ ফ্রম থাকলে সেটাও এখানে অতি সামান্য বলে ঠাওর হতো।
– আচ্ছা?
– হুম!
– আমার কাছে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য আপেক্ষিক। শুধু… তার সৌন্দর্য ব্যতীত।
তিয়াশা ভ্রু গোঁটালো; কৌতূহলী দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,
– কার?
হঠাৎ,আরাভ তিয়াশার কোমরের বাঁধনটা আরও কিঞ্চিৎ দৃঢ় করে ওর কানের লতিতে নিজের ওষ্ঠাধর আলতো করে ছুঁইয়ে দিল,,
- যার বাহুডোরে আমার আস্ত পৃথিবী বন্দি।
জোৎসাস্নাত রজনীর, চন্দ্রের রুপালি কিরণ লেকের শান্ত পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। মৃদু ঠান্ডা হাওয়া আর চারপাশের নিস্তব্ধতা তিয়াশাকে এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্নতায় বুঁদ করে রেখেছিল। ওই মোহময়ী রূপ ছেড়ে কটেজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ওর ছিল না। অগত্যা, একাই কটেজের ভেতরে এসেছে আরাভ। অবশ্য তিয়াশা না আসায় ভালোই হয়েছে। সারপ্রাইজ প্ল্যানিংটা ভালোভাবেই বাস্তবায়ন করা যাবে এবার।
রাত তখন ঘনীভূত। ঘড়ির কাঁটা নয়টার ঘর ছুঁইছুঁই। তিয়াশা লেকের ধারের সেই কাঠের রেলিংটা ধরে আনমনে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির অমলিন রূপসুধা পান করছিল। আকস্মিক, সমগ্র উপত্যকার বুক চূর্ণবিচূর্ণ করে এক প্রলয়ংকরী ও বিকট শব্দ হলো। যেন সহস্র বজ্রপাত একসাথে আছড়ে পড়ল ডাল লেকের শান্ত বক্ষে। শব্দের তীব্রতায় কটেজের কাঁচের জানালাগুলো মড়মড় করে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। মুহূর্তের ভগ্নাংশে অন্ধকারের চাদর ফুঁড়ে এক দানবীয় আগুনের ফুলকি আর কালচে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের পানে ধাবিত হলো।
চারপাশ থেকে মানুষের গগনবিদারী চিৎকার আর আর্তনাদে শান্ত শ্রীনগর যেন এক নিমেষে জীবন্ত জা’হা’ন্না’মে পরিণত হলো।কটেজের ভেতরে থাকা আরাভ এই আকস্মিক বিস্ফোরণে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। ওর প্রখর মস্তিষ্ক কিছুক্ষণের জন্য অবশ হয়ে গেল। কোনোরকমে টাল সামলে, ভাঙা কাঁচের ওপর দিয়েই জানালার বাইরে চোখ রাখতেই ওর হৃৎপিণ্ড যেন থমকে গেল।
দিকভ্রান্ত, নিয়ন্ত্রণ হারানো এক যাত্রীবাহী বিমান যান্ত্রিক ত্রুটির জেরে লেকের ঠিক ওপর আছড়ে পড়েছে। বিমানটির ডানার একাংশ কটেজের সামনের ল্যান্ডস্কেপ ধুলিসাৎ করে লেকের তলদেশে নিমজ্জিত হচ্ছে। চারিপাশে দাউদাউ করে জ্বলছে লেলিহান শিখা, যার রক্তিম আভায় ডাল লেকের পানি এখন তরল র’ক্তের মতো প্রতীয়মান,,
– তিয়াশাআআআআআ!
আরাভের কণ্ঠ চিরে এক পৈশাচিক চিৎকার বেরিয়ে এলো। ও নিজের সমস্ত শক্তি বাজি রেখে দোতলার ব্যালকনির রেলিং টপকে এক ঝটকায় নিচে জ্বলন্ত আগুনের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পায়ে কাঁচের আঘাত, শরীরের চামড়া ঝ’ল’সা’নো আ’গু’নের তীব্র উত্তাপ—কোনো কিছুই এই মুহূর্তে ওই দুর্ধর্ষ পুরুষের স্নায়ুকে স্পর্শ করতে পারল না। ওর দুচোখে তখন কেবলই এক ডাগর চোখের মায়াবী মুখচ্ছবি।
ও উন্মাদ পশুর মতো আগুনের লেলিহান শিখা আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে ছুটে বেড়াতে লাগল। লেকের ধার ঘেঁষে যেখানে কিছুক্ষণ আগে তিয়াশা দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানটায় এখন কেবলই বিমানের জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ আর ফুটন্ত জল।
– জান! কোথায় তুমি? প্রেম আমার, একটা বার কথা বলো! তিয়াশা!
আরাভ পুড়তে থাকা কাঠের তক্তাগুলো খালি হাতে সরাতে লাগল। আগুনের হল্কায় ওর গায়ের চামড়া পুড়ে খসে যাচ্ছে, ফুসফুস ভরে উঠছে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইডে। কিন্তু ও থামল না। ও জানত, ওর ভালোবাসা এখানেই ছিল। কিন্তু চারপাশের তীব্র হাহাকার আর লা-শের গন্ধের মাঝে তিয়াশার কোনো সাড়াশব্দ মিলল না।
– ইয়া আল্লাহ!ও আরশের অধিপতি! আমার থেকে… আমার থেকে আমার প্রাণটা এভাবে ছিনিয়ে নিও না। ও আল্লাহ!
আরাভের কণ্ঠস্বর এবার বুজে এলো। ভাঙা, নিঃস্ব ও চরম আর্তনাদে ও শেষবারের মতো চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কেবল এক দলা রক্ত বেরিয়ে এলো। চারপাশের আগুনের লাল আভা ওর চোখের সামনে ধীরে ধীরে কালচে অন্ধকারে রূপ নিতে লাগল। বিষাক্ত ধোঁয়া আর শরীরের চরম অবসন্নতায় ওর দাপুটে অবয়বটি আর সোজা হয়ে থাকতে পারল না।
ল্যান্ড ক্রুজারের গতিতে ছুটে চলা জীবনের অধীশ্বর আজ ওই লেকের তপ্ত বালুচরে ধুলোবালি আর রক্তের মাঝে অবলীলায় লুটিয়ে পড়ল। মাটিতে শুয়ে পড়তে পড়তেই ওর দুহাত শূন্যে কিছু একটা খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ওষ্ঠাধর কাঁপল শেষবারের মতো, যেন বলতে চাইলো,,
– আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না, সুইটহার্ট।
ধীরে ধীরে প্রখর নেত্রযুগল বুজে আসলো আরাভের। চারিপাশে মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আর্তনাদের মাঝে সমস্ত দুনিয়া থমকে গেল ছোট্ট এক বিন্দুতে।
দিন আসে দিন যায়। দেখতে দেখতে আজ পাঁচটি মাস অতিবাহিত। মৃত্যুপুরীর করাল গ্রাস থেকে সময়ের চাকা ঘুরে গেলেও, খান মহল আর চৌধুরী ভিলার আকাশ থেকে সেই কালবৈশাখী ঝড়ের কালো মেঘ সরেনি লেশমাত্র। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে দিন আসে, দিন যায়, কিন্তু দুটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের প্রবীণ চারজন মানুষের চোখের জল আর শুকায় না।
মৃ’ত্যস্পর্শী সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে আরাভকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও পাওয়া যায়নি তিয়াশার লা’শ। একমাত্র আদরের কন্যাকে হারিয়ে ডিআইজি তাহের চৌধুরী আর রেহানা বেগম জীবন্ত পাথরে পরিণত হয়েছেন। যে চৌধুরী ভিলা একদা তিয়াশার চঞ্চল চরণে মুখরিত থাকত, সেখানে এখন কেবলই এক নিঃসীম শূন্যতা আর গুমোট হাহাকার।
তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও বীভৎস পরিণতি নেমে এসেছে আরাভ খানের জীবনে। শ্রীনগরের সেই অভিশপ্ত রজনীতে তিয়াশাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টায় ওর সুঠাম অবয়বের অনেকাংশই লেলিহান আগুনে ঝলসে গিয়েছিল। উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে শরীরের বাহ্যিক ক্ষতগুলো চামড়ার জোড়াতালিতে কোনোমতে ভরাট করা সম্ভব হলেও, ওর অবিনশ্বর মনস্তত্ত্ব আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত।
দেশে ফিরিয়ে এনে ওকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখাকালীন চিকিৎসকেরা এক অতি দুর্লভ ও ভয়ংকর মানসিক ব্যাধির ঘোষণা করলেন। আরাভ আক্রান্ত হয়েছে ‘কোটার্ড সিন্ড্রোম’ নামক এক জটিল স্নায়ুবিক রোগে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি বেঁচে থেকেও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে আসলে মৃত, তার শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পচে গলে গেছে কিংবা তার আত্মার কোনো অস্তিত্ব নেই।
দাপুটে, বেপরোয়া পুরুষটি পরিণত হলো এক জীবন্ত লা’শে। দেশে-বিদেশে কোথাও ভালো চিকিৎসা মিলল না।
অবশেষে বছর খানেক বাদে…..
খোঁজ মিললো লাহোরের বিখ্যাত সাইক্রিয়াটিস্ট মোহাম্মদ আলী আর সাইকোলজিস্ট ইব্রাহিম খলিলীর। এনাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলো আরাভ খান। তবে জীবনের গতিপথ রুদ্ধ ওর। বেঁচে থাকার শেষ ইচ্ছাটুকু অবশিষ্ট নেই ভেতরে। হঠাৎ নুরের হদিস মিললো, পাপিষ্ট অন্তরে হেদায়েত দিলো হয়তো মহান সৃষ্টিকর্তা।
বাবা মায়ের সঙ্গে হজ্ব সম্পন্ন করে ফের পাকিস্তানে ফিরে আসলো আরাভ। কারণ একটাই, যে দেশে তার প্রিয়তমার সঙ্গে সংসার হওয়ার কথা ছিল। সেখানে সে একা থাকতে পারবে না। পাকিস্তানি ফিরে এবার শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। তবে সেখানে ছায়ার মতো ওকে সঙ্গ দিয়েছে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড সাইদ আর তোমার বাবা ইব্রাহিম খলিলী!”
আদ্রিতার বলা শেষ কথাটি কর্ণগোচর হওয়ামাত্র এক তীব্র বজ্রপাতে স্তব্ধ হয়ে গেল ইনশিরাহ। ওর হাতের কলমটি অবলীলায় আঙুলের ফাঁক গলে মেঝের বুকে আছড়ে পড়ল। ঘরের ভেতরের প্রশস্ত নৈঃশব্দ্যকে আরও খানিকটা ঘনীভূত করে দিয়ে ল্যাম্পশেডের হলুদাভ আলোয় ইনশিরাহর ডাগর চক্ষুদ্বয় জলে টইটম্বুর হয়ে উঠল। এতক্ষণ ধরে শুনে চলা এক অলীক উপন্যাসের ন্যায় গল্পটি যে বাস্তব জীবনের কঠোর সত্য, তা মানতে নারাজ বিক্ষিপ্ত হৃদয়।
চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ওর ফর্সা কপোলে; বক্ষের অভ্যন্তরে তখন এক প্রলয়ংকরী ওলটপালট। যে মানুষটি প্রতিদিন অফিসে সামান্য ভুলে ওকে তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে জর্জরিত করে, ফাইলের অবহেলায় সিংহের মতো গর্জে ওঠে, আর যার গম্ভীর অবয়বে কাঠিন্য ছাড়া দ্বিতীয় কোনো অভিব্যক্তি ও কোনোদিন দেখেনি—সেই আরাভ খানের বুকের নিচে যে এক জীবন্ত জা-হা-ন্নাম প্রতিনিয়ত ধিকিধিকি জ্বলছে, তা কল্পনা করতেও ইনশিরাহর সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল।
ইনশিরাহ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,,
– ভালোবাসা মানুষকে এতটা পরিবর্তন করতে পারে?
আদ্রিতা দীর্ঘ নিঃশ্বাস চেপে বলল,,
– এর চেয়েও সহস্র গুণ। আরাভ ভাইয়ের ক্ষেত্রে কোটির অধিক।
ইনশিরাহ কৌতুহলী দৃষ্টিতে চাইলো আদ্রিতার চোখের কোণ বেয়েও তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। ও ইনশিরাহর কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত কাঁপা, নিচু ও হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠে আওড়াল,
– ৯ই জিলহজ আরাফার ময়দানে দোয়া কবুল হয় বলে,আরাভ মোনাজাতে হাত তুলে ভাই কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। আর, দোয়া কি ছিলো জানো? আল্লাহ যাতে তিয়াশাকে উনার কাছে ফিরিয়ে দেয় অথবা উনাকে তিয়াশার কাছে নিয়ে যায়। বুঝো? একটা মানুষ ঠিক কতটা ভালোবাসলে, স্ত্রী মারা গেছে জানার পরও তাকে এভাবে পরম শূন্যতায় ফিরে পেতে চায়?
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২৫
অসমাপ্ত…….
[গল্প এখনো সমাপ্ত হয়নি তাই গালাগালি দিবেন না। এর ভিতর ভীষণ বড় একটা টুইস্ট আছে। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ লিখব না ভেবেছিলাম। সামনের সপ্তাহ থেকে শুরু করব ইনশাআল্লাহ। হতাশ হবেন না কেউ স্যাড এন্ডিং হবে না]
